নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 5 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • সাইয়িদ রফিকুল হক
  • রাজর্ষি ব্যনার্জী
  • ড. লজিক্যাল বাঙালি
  • মোমিনুর রহমান মিন্টু
  • রহমান বর্ণিল

নতুন যাত্রী

  • আদি মানব
  • নগরবালক
  • মানিকুজ্জামান
  • একরামুল হক
  • আব্দুর রহমান ইমন
  • ইমরান হোসেন মনা
  • আবু উষা
  • জনৈক জুম্ম
  • ফরিদ আলম
  • নিহত নক্ষত্র

আপনি এখানে

মানসী, ছকিনা ও এক সন্ন্যাসির গল্প!


তিল তিষি ধান কাউনের কতনা মেঘলা জলের খামার ভরা গাঁয়ের হিন্দু জেলে পরিবারে জন্ম আমার। কৈশোর থেকে যৌবন পর্যন্ত ঝড়জলে যুদ্ধ করে বড় হয়েছি আমি। একজন পাকা হিন্দু জলদাস জেলে হিসেবে খুব সুনাম ছিল আমার গ্রামে। তাই জেলে পাড়ার সবচেয়ে সুন্দরী স্কুল পড়ুয়া মানসীর সাথে যখন বিয়ের প্রস্তাব গেল আমার, তখন মানসীর পরিবার ও মানসী কেউই অমত করলো না এ বিয়েতে। মধ্যবিত্ত সুন্দরী মানসীর বিয়ে হয়তো হতো শহরের শিক্ষিত কোন চাকুরে হিন্দু ছেলের সাথে। কিন্তু মানসী আমার মেঘনার ঝড়জলে সারাক্ষণ সাঁতরে বেড়ানো, নৌকো বাওয়ার নিটোল পারদর্শিতা, ডুবসাঁতারের হৃদকাঁপানো নিপুণতায় আমাকেই তার বর হিসেবে সব সময় চাইতো ভগবানের কাছে। একবার এক সন্ন্যাসিকে মানসী আমার চুল আর নখ নিয়ে গোপনে দিয়েছিল এ প্রত্যাশায় যে, "আমি যেন তার জন্যে পাগল হই"। চুল নখের জাদুর জন্যে কিনা জানিনা, তবে ১৭/১৮ বছরের মোহিনি মানসীর জন্যে সত্যি এক সময় উত্তাল হয়েছিল আমার মন। মেঘনার জলঘুর্ণীপাকে হিমালয়সম ঢেউয়ের মতই ছিল সে ভালবাসা। যা ছিল নিটোল রমণীয় শরীরি স্বাদের মিষ্টি গন্ধের জারুল ফুলের সৌরভে ভরা।
:
আমি যখন সাগর মোহনায় মাছ ধরতে যেতাম, মানসী সারাক্ষণ অপেক্ষা করতো আমার ফিরে আসার প্রতিক্ষায়। এক শুক্লাপক্ষের রাতে শিশিরভেজা ভোরের দিকে যখন ফিরে আসি আমি জেলে পল্লীর নল-পাতার কুঁড়েতে আমার, তখনো মানসী পরিপার্টি করে ভাত নিয়ে বসে ছিল আমার জন্যে। কিন্তু মানসীর চেয়ে সমুদ্রকে ভালবাসতাম আমি সারাক্ষণ। তাই সাগরে গেলে ১০/১২ দিনের আগে কখনো ফিরতাম না আমি। তখন মানসী পাগল হতো আমার জন্যে একাকি মেঘনার জলবাতাসের খোলা ঘরে। সে কেবল ভালবাসতো আমাকেই। আর আমি সমুদ্র এবং মানসীকে অঙ্গাঙ্গিভাবে!
:
একবার পনের দিনের মাথায় সমুদ্রসঙ্গম শেষে ফিরে এসে দেখি, জটাশুশ্রুযুক্ত গেরুয়া পোশাকের এক কামরূপ সন্ন্যাসি এসেছে গাঁয়ে। রাতে মানসী আমাকে অনেকটা জোর করে নিয়ে গেলো ঐ সন্ন্যাসির কাছে। আমাকে গুরুজির পছন্দ হয়েছে খুব, তাই তার শিষ্য বানাতে চায় আমাকে জানালো মানসী। সন্ন্যাসিভক্ত মানসী তখনই শিষ্যত্ব বরণ করালো আমায় অনেকটা ইচ্ছের বিরুদ্ধে। আমি যেন আর জলের সাথে প্রেম না করি, কেবল মানসীর সাথেই করি, তাই সন্ন্যাসির সাথে কদিন থাকতে বললো আমায় সে। রাতে সন্ন্যাসি কি যে করলো আমায় জানিনা আমি। ধোয়াশাময় খুব ভোরে আমি কাউকে কিছু না জানিয়ে, কিছু না বলে, নিরুদ্দেশ হলাম সন্ন্যাসির সাথে তার পিছু পিছু এক অজানা পথে। কত পথ, সড়ক, জঙ্গল, পাহাড় ভেঙে কাটালাম কত অজানা জীবন, সব জানিনা আমি। মানসী কিংবা আমার গাঁ কাউকেই মনে পড়লোনা আমার আর। কত দিন, কত মাস, কত বছর আমি কাটালাম জঙ্গল-পাহাড়ে কিছুই মনে নেই আমার। এটা কি দশ বছর, পনের বছর, কুড়ি বছর নাকি আরো বেশি?
:
অধঃপতিত নষ্ট সময়ের টানে কতনা ভুল পাখির ডানা ঝাপটানোর অনেকদিন পর আকস্মিক এক স্বপ্নঘোরে মানসীর কথা মনে পড়লো আমার। মানসীকে আমি ফেলে এসেছিলাম আমার দূর দ্বীপগাঁয়ে একাকি। বিয়ের কদিন পরই ওর মা-বাবা চলে গিয়েছিল ভারতে মানসীকে আমার হাতে সমর্পণ করে। যাকে অনেক ভালবেসে প্রাজাপত্য বিয়ে করেছিলাম আমি কপালে সিঁদুর আর ৭-পাঁকে বেঁধে একদিন। সেই মানসী কই আমার! এবার সত্যি পুরো মনে পড়লো আমার দ্বীপ, এর বাসিন্দা, জেলে নৌকো আর মানসীকে। এবং পথের সব পাহাড় জঙ্গল চড়াই-উৎড়াই ডিঙিয়ে দিনরাত আমি হাঁটতে হাঁটতে একদিন পৌছে গেলাম আমার চিরচেনা সেই ঝড়জলের নদীতীরে। কিন্তু কই আমার ঘর? কই মানসী?
:
পরিচিত কজন আমাকে দেখে প্রথমে অচেনা সন্ন্যাসি ভাবলো। শেষে জলদাসেরা চিনলো আমার কথা শুনে। কিন্তু মানসীর কথা বলাতে সবাই কুঁকড়ে গেলো কেমন যেন? একজন বললো, মানসী আছে ওপারের সবচেয়ে বড় জনপদ "তালুকদারের চরে" তার নিজ বাড়িতে। মানসীর জন্যে প্রবল জীবন তাড়নায় উত্তাল মেঘনা ডিঙিয়ে চরের তালুকদারের বাড়িতে উপস্থিত হলাম আমি তখনই। এবং বাড়ির উঠোনেই পেয়ে গেলাম মানসীকে আটপৌড়ে দেহাতি শাড়ির মাঝেই। এক নজরে মানসীও চিনতে পারলো আমায়, আমিও তাকে। ভালবাসাহীন জীবনের ধূসর রঙজ্বলা জীর্ণ পাতার মত ও পলকহীন তাকিয়ে রইলো আমার দিকে। বললাম -
"মানসী, আমিতো মরে যাইনি। কপালে সিঁদুর নেই কেন তোমার? সিঁদুর কেন মুছে ফেললে তুমি"?
বোবা মানসী কোন কথা বললো না, অহল্যা পাথর মূর্তির মত চোখে আষাঢ়ের বর্ষা ঝরিয়ে কাঁদতে থাকলো ক্রমাগত। কিছু না বুঝে আবার বললাম - "কাঁদছো কেন মানসী, তোমার জলদাসতো ফিরে এসেছে! আর কাঁদবে কেন"?
:
কথা শুনে ঘর থেকে বের হলো আমার কৈশোরিক পরিচিত ছফরুদ্দিন তালুকদার, আমার স্কুলপড়ুয়া পুরনো বন্ধু! কাছে এসে গলা খাঁকাড়ি দিয়ে বললো - "স্লামালেকুম ফকির সাব। ও তুমি ছিদাম জলদাস না? তো এই কুড়ি বছর পর কি মনে কইরা ছিদাম?
- আমি মানসীর স্বামী। তার কাছে ফিরে এসেছি তালুকদার সাব!
- ও তুমিতো আমার বিবি ছকিনার পেরথম সোয়ামি আছিলা তাইনা? কুড়ি বছছরে কি কেউ আর কারো বিবি থাকে ছিদাম? তুমি নিরুদ্দেশ হওনের ৩-বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করছিল ছকিনা তোমার জইন্যে। কত কষ্ট করলো মাইয়া মানুষটা! কিন্তু কি কইরা থাকে একেলা একটা হিন্দু সুন্দরি জুয়ান বউ এই মোছলমানের দেশে? শেষে আমি দয়াপরবশ হইয়া তারে শরিয়ত মুতাবেক মুছলমান বানাইছি। না হইলে চিল শকুনে ছিইড়া খাইতো তারে খালি ঘরে। কলেমা পইরা ছকিনা নাম রাইখা পঞ্চাশ হাজার টেকা মোহরানায় শাদি করছি তারে। ভালা করিনাই কও?
:
প্রেম দেবতার ধ্বংসমত্ত অন্ধকার কষ্টদলা ফালি ফালি করে কেটে মানসীর দিকে তাকাই আমি। এক শুভলগ্নে নারায়ণ, অগ্নি, শিবকে সাক্ষি করে, শুভমঙ্গল মন্ত্রের উচ্চারণে, উলুধ্বনি আর শঙ্খধ্বনির সমাহারে কতনা মন্ত্রযজ্ঞ করেছিলাম আমি মানসীর কপালে সিঁদুর দিয়ে। প্রতিজ্ঞা করেছিলাম আমি "যদেতত্ হৃদয়ং তব তদস্তু হৃদয়ং মম, যদিদং হৃদয়ং মম, তদস্তু হৃদয়ং তব"। প্রতিজ্ঞা করেছিল মানসী - "ভার্যায়ৈ পূর্বমারিণ্যৈ দত্ত্বাগ্নীনন্ত্যকর্মণি/পুনর্দারক্রিয়াং কুর্যাৎ পুনরাধানমেব চ"! তোমার এ হৃদয় আমার হোক, আমার এ হৃদয় তোমার হোক! সে প্রতিজ্ঞা কই গেল মানসী! মানসী তুমি কি বলবে না কিছু? “সত্যমেব জয়তে” মন্ত্র কি লীন হবে তবে মানসী! পাটিপত্র, লগ্নপত্র আর মঙ্গলাচরণের কি হবে তবে! পানখিল, দধি মঙ্গল, গাত্রহরিদ্রা, শঙ্খ কঙ্কন কই তোমার মানসী? অগ্নাহুতি আর সিঁথির সিঁদুর সব মুছে যাবে তোমার মানসী!
:
আধাপাকা দাঁড়িতে হাত বুলিয়ে ছফরুদ্দিন বলে, "কি কও মিয়া এইসব? সন্ন্যাসি হইয়া তোমার মাথাডা কি পুরাই খারাপ হইছে? জানো ছকিনা আমার নিকা করা স্ত্রী? ছকিনা এখুন আমার ৩-ছেলের মা, এটটু পর দেখবা স্কুল থাইকা তার ছেলেরা ফিরা আইবো। তুমি কি খাইবা কিছু? তবে ছকিনার হাতে খাইতে পারবা না তুমি। সেইটা হারাম অইবো ছিদাম! স্কুলে পড়তা তুমি আমার লগে। তাই কিছুটা মহব্বত আছে তোমার লাইগা আমার এখনো"!
:
ভালবাসাহীন রক্তচশমা চোখে কালোশিরার দুখভাঙা অসুখ জ্বরে আক্রান্ত হই আমি। কি কয় মানসী? এসব কি সত্যি? হিন্দু বিয়েতো সাত জন্ম জন্মান্তরের! এ মন্ত্র কি তবে মিথ্যে - "যদেতত্ হৃদয়ং তব তদস্তু হৃদয়ং মম, যদিদং হৃদয়ং মম, তদস্তু হৃদয়ং তব"! তুমি কি সত্যি মুসলমান হয়েছো মানসী! কোন কথা বলেনা আমার কুড়ি বছর আগের বিয়ে করা সনাতন ধর্মী স্ত্রী মানসী দাস। তালুকদার সাব চোখ রাঙানির আগেই সাত-আট বছরের ২-ছেলে বই হাতে মানসীর পাশে এসে দাঁড়িয়ে বলে - "মা এই জটওলা ব্যাডা কেডা? আমাগো বাড়িতে ক্যান? এই ব্যাডা কি ফকির"?
:
আসরের আযান শোনা যায় তালুকদার বাড়ির মসজিদ থেকে। ছফরুদ্দিন এবার কিছুটা ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলে - "ছকিনা ওজু কইরা নামাজ পড়তে যাও। ছিদাম তুমি এইবার আসো। আমাগো নামাজের টাইম হইছে"। কষ্টপথের ধূলো-ধোঁয়ায় উড়ে উড়ে কতনা পথ ভেঙে কেন এলাম ছকিনারূপী মানসীর কাছে আমি! হলদে মাঠের ঝরা ফসলের ক্লেদময় দুখগান বুকে নিয়ে এবার মাঠে নামি আমি। ধীবর প্রেমে সাগর জলতলে জ্বালিয়ে রাখা প্রেমজ শিখারা আমায় বলে - "চলে যাবে তুমি মানসীকে ছেড়ে"! সাতসাগর আর তের অনাবৃত নদীর কষ্টঘূর্ণীতে ঘুরে শেষবার তাকাই মানসীর দিকে আমি। জলতলে কতনা প্রেমহারাণো মীনকুমারীর শঙ্খকান্না একসাথে বাজে মানসীর চোখে। ভালবাসাহীন নিকষ জীবনের অগাধ দুখজলধি ধুয়ে মানসী উঠুনেই ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। আমার ধুলোপথের দিকে মৃত ইলিশের মত নিষ্পলক তাকিয়ে!
:
অপেক্ষমান নদীর ঘাটে দেখা হয় পুরনো স্কুলবন্ধু রফিকের সঙ্গে। অনেকটা জোর করে নিয়ে যায় তার বাড়ি। সান্ত্বনার বাণী শুনিয়ে বলে, "ছফরুদ্দিন মানুষ খারাপ না। তোর আমার ক্লাসমেট ছিল স্কুলে। কিন্তু দীর্ঘদিন তোর খোঁজখবর না পাওয়াতে, আমরাই সবাই মানসীর এ ব্যবস্থাটা করি। বর্তমানে সে মুছলমান ও ৩-সন্তানের জননী। সুতরাং এখন করার কি আছে ক তুই? ইচ্ছের বিরুদ্ধে সারাদিনের অভুক্ত আমাকে জোর করে খাওয়ায় রফিক আর তার স্ত্রী। ঘুমোতে বলে বারান্দায় এসব চিন্তা বাদ দিয়ে জলবাতাসে।
:
মোরগ ডাকা ভোর রাতের আগেই তালুকদার বাড়ির মসজিদের মাইকে ঘোষিত হয়, "ছফরুদ্দিন তালুকদারের স্ত্রী ছকিনা বিবি বিষপানে আত্মহত্যা করেছে একটু আগে"! তালুকদার সাব খবর দেন আমাকে আর রফিককে। আমরা যেন নিয়ে যাই জাহান্নামি ছকিনাকে তার বাড়ি থেকে এখনই। একটা চিঠি তুলে দেন তিনি আমার হাতে, মানসীর শেষ চিঠি। নিজ হাতে লেখা -
""যদেতত্ হৃদয়ং তব তদস্তু হৃদয়ং মম, যদিদং হৃদয়ং মম, তদস্তু হৃদয়ং তব" মন্ত্রপাঠে তোমার নামে সিঁথিতে সিঁদুর পরেছিলাম আমি একদিন। সনাতন ধর্মে জন্মজন্মান্তরে স্বামী তুমিই আমার। তুমি সেটা বোঝনি কখনো। সাগর আর সন্ন্যাসজীবনকে ব্রুত হিসেবে নিয়েছিলে তুমি আমায় পথে ফেলে। খুব কঠিন সময় তালুকদার সাব আশ্রয় দিয়েছিল আমায়। সমাজ আর রাষ্ট্রব্যবস্থার কারণে ধর্মান্তর ছাড়া উপায় ছিলনা আমার। তুমি আর তালুকদার, সনাতন আর মুসলমানিত্বের মাঝে বাঁচতে পারবো না আমি কিছুতেই। তাই আত্মাহুতি ছাড়া পথ নেই আমার কোনো এ জগতে। সন্তানের মায়াও এ রৌরব যন্ত্রণা থেকে আটকাতে পারলোনা আমায়। শেষ মিনতে রেখে চলে যাচ্ছি আমি। আমার কপালে আরেকবার সিঁদুর দিয়ে নিজ হাতে চিতায় তুলো তুমি আমায়! আর দাহকালে এ মন্ত্রটি পড়তে ভুলোনা যেন -"যদেতত্ হৃদয়ং তব তদস্তু হৃদয়ং মম, যদিদং হৃদয়ং মম, তদস্তু হৃদয়ং তব"! মানসী"!
:
চিঠি পড়া শেষে এবার রক্তবর্ণা চোখেও জল দেখি ছফরুদ্দিনের। ধরা গলায় বলে, "ছিদাম তুমি আমার বন্ধু। তুমি নিয়া যাও মানসীরে। হিন্দুরীতিতে দাহ করো তারে। রফিক তোমরা সাহায্য করো ছিদামকে। আমার বাড়িতে আর এক দন্ড রাইখোনা তারে! ছকিনা না, মানসী হিসাবে নিয়া যাও হ্যারে"!
:
রফিকের বাড়ির অদূরে নদীর ঘাসচরে আমার সকল পুরনো বন্ধু আর হিন্দু জলদাসরা অংশ নেয় নীলকণ্ঠ মানসীর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায়। চিতায় তোলার আগে ঘি-চন্দন মাখিয়ে মানসীর দুকান, নাকে, চোখ ও মুখে সাত টুকরা কাঁসা দিয়ে পিন্ড দেই আমি নিজ হাতে। শব চিতায় তোলার প্রাকলগ্নে ক্লান্ত রাতের ঝরা শিশিরের হাজারো কণ্ঠের ট্রাজিক গানেভরা মানসীর সিঁথিতে সিঁদুর পরাই আমি। কর্পুর মিশ্রিত ঘিয়ের প্রদীপ হতে অগ্নিদহনকালে বৃহদারন্যক উপনিষদের মন্ত্র "এতদ বৈ পরমং তপো যত্ প্রেতমপ্লবভ্যা দধতি" পাঠকালে অনেকগুলো ট্রলারে কয়েকশ মানুষ আসতে দেখি আমাদের দিকে। ট্রলারগুলো কাছে এলে আগতরা আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে "আল্লাহু আকবর" ধ্বনি তোলে। চিতার নিকটে এসে তারা জানায় "আলিমাবাদ মাদ্রাসা" থেকে এসেছে তারা। তারা শুনেছে ইসলাম ধর্ম গ্রহণকারী বিবি ছকিনাকে দাহ করা হচ্ছে এখানে হিন্দু রীতিতে। এ বে-শরিয়তি হারাম কাজ কখনো হতে দেবেনা তারা। ছকিনা এককালে হিন্দু থাকলেও, ইসলাম গ্রহণের পর আর সে হিন্দু থাকেনা। আর কোন ইসলাম ধর্মগ্রহণকারী কখনো হিন্দু বা অন্য ধর্ম গ্রহণ করতে পারেনা। সুতরাং কখনো বিবি ছকিনাকে দাহ করতে দেয়া হবেনা। চিতা থেকে মানসীর নিথর নীলাভ বিষময় দেহ কেড়ে নেয় তারা।
:
আমার বন্ধু রফিক, জামাল, সেকান্দার সবাই ধর্মযুক্তিতে পরাজিত হয় আগত ধর্মুগ্র মাদ্রাসা ছাত্রদের কাছে। দুপুরের তপ্ত রোদ আকাশের গোলাপিবরণ কন্যার আভার মত মানসীর আভা নিষ্প্রভ হয় তখন। হৃদয় ছানা হৃদয়ের গভীর গহ্বরে থাকে যে আকাশ দেবতা, সে তখন সমর্পণ করতে বলে মানসীকে ওদের হাতে আমায়। ওরা মু্সলিম রীতিতে সব কার্য সমাধা করে মানসীর। রফিক, জামাল, সেকান্দার কবর খোড়ে ওখানেই। যেখানে চিতা সাজিয়েছিলাম আমরা একটু আগে।
:
গাঁয়ের সমস্ত মানুষ জড়ো হয় মানসীর লাশের পাশে। তালুকদার ছফরুদ্দিন আসে, আসে মানসীর তিন শিশু সন্তানও। হাজারো মানুষ জানাজায় অংশ নেয় মানসীর, কেবল আমি চৈত্রঘুর্ণী বাতাসে উড়ে চলা পথের পাতার মতো চেয়ে থাকি মানসীর দিকে। প্রাকসন্ধ্যার গোধূলির রক্তিম আভা মেখে মানসীর লাশ রাখা হয় কবরে। একদলা মাটি আমার হাতে তুলে দিয়ে ছফরুদ্দিন তালুকদার বলে - "ছিদাম এ মাটি তোমার বিবির করবে দিয়ে পড়তে থাকো আমার সাথে -"মিনহা খালাক্বনা-কুম ওয়া ফীহা নুঈদুকুম ওয়া মিনহা নুখরিজুকুম তারাতান উখরা’। আমি বলি এ আরবি কথার মানে কি ছফরুদ্দিন ভাই? আমাদের কৈশোরিক খেয়ালের খেলাঘরের মেটে আসবাব ভাঙার শব্দের মত ছফরুদ্দিন বলে- "এই মাটি থেকেই তোমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে, এখানে তোমাদের ফিরে আসতে হবে এবং এখান থেকেই আরো একবার তোমাদের ফিরিয়ে আনা হবে"। বৈদিক সন্ন্যাসি আমি। তারপরো এক অদেখা ঈশ্বরের বাণী হিসেবে ছফরুদ্দিনের সাথে কাঁপা গলায় বলে যাই আমি - "মিনহা খালাক্বনা-কুম ওয়া ফীহা নুঈদুকুম ওয়া মিনহা নুখরিজুকুম তারাতান উখরা"!
:
নীলাভ রাতের জেগে থাকা চৈতি চাঁদের আলোয় বুনো ঘাসচরে মানসীকে একাকি কবরে রেখে আমার পরিচিত রফিক আর ছফরুদ্দিনের সাথে হাঁটতে থাকি আমি। ভয়াকুল মানুষের মৃতপরবর্তী পাতাল-প্রেতপুরের মরীচিকার মত মানসী পিছু পিছু হাঁটে আমার। নৌকোডোবা ফণিমনসার কেউটে - ঢেউয়ের ফেনার মত ফণাতুলে চারদিকে হিসহিস করে কতনা সমুদ্রঢেউ। মানসীহীন অনাথ পৃথিবীতে জেগে থাকি আমি অনেক দিন, অনেক রাত। উড়তে থাকি বুড়ো ক্লেদময় আকাশে ফুটো ফানুসের মত। অহল্যাসম এ পাথুরে পথের নিগুঢ় কষ্টেরা পথ চলতে থাকে আমার সাথে গলাগলি করে! ঘাসচরে মানসীর কবরের পাশে দাঁড়াই আমি ঘুঘুডাকা তপ্ত দুপরে, আর একাকি পাঠ করতে থাকি ছফরুদ্দিনের শেখানো ধর্মবাণী - "মিনহা খালাক্বনা-কুম ওয়া ফীহা নুঈদুকুম ওয়া মিনহা নুখরিজুকুম তারাতান উখরা"! কিন্তু মানসী তার দাহকালে আমায় বলতে বলেছিল -"যদেতত্ হৃদয়ং তব তদস্তু হৃদয়ং মম, যদিদং হৃদয়ং মম, তদস্তু হৃদয়ং তব"! তা কেন বলতে পারিনি আমি এ নিষ্ঠুর মানবিক সমাজে!

Comments

ড. লজিক্যাল বাঙালি এর ছবি
 

!

===============================================================
জানার ইচ্ছে নিজেকে, সমাজ, দেশ, পৃথিবি, মহাবিশ্ব, ধর্ম আর মানুষকে! এর জন্য অনন্তর চেষ্টা!!

 

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

ড. লজিক্যাল বাঙালি
ড. লজিক্যাল বাঙালি এর ছবি
Online
Last seen: 1 ঘন্টা 14 min ago
Joined: সোমবার, ডিসেম্বর 30, 2013 - 1:53অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

কু ঝিক ঝিক

ফেসবুকে ইস্টিশন

SSL Certificate
কপিরাইট © ইস্টিশন.কম ® ২০১৬ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর