নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 2 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • নুর নবী দুলাল
  • সুব্রত শুভ

নতুন যাত্রী

  • মহক ঠাকুর
  • সুপ্ত শুভ
  • সাধু পুরুষ
  • মোনাজ হক
  • অচিন্তা দত্ত
  • নীল পদ্ম
  • ব্লগ সার্চম্যান
  • আদি মানব
  • নগরবালক
  • মানিকুজ্জামান

আপনি এখানে

লেখকের স্বাধীনতা, আমাদের তালেবর বুদ্ধিবৃত্তির সেকাল – একাল এবং দাউদ হায়দারের “ভীমরতি” প্রসঙ্গে।


১.
আমি ফেসবুকে অনুপস্থিত থাকার কারণে এই সকল “গরম বিষয়” বা হট-টপিক আমার কাছে এখন বেশ পুরানো হয়ে আসে। পুরানো হয়ে আসার একটা ভালো দিক হচ্ছে, যখন সব কিছু থিতিয়ে আসে, তখন চিন্তা করার সুযোগ পাওয়া যায় ভালো, অনুধাবন করার সুযোগ পাওয়া যায় ভালো। এ কথা আমি আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই বহুবার জেনেছি, প্রতিক্রিয়াবিদ্ধ হয়ে আর যাই হোক কোনো যৌক্তিক লেখালেখি করা যায়না। কেবল আক্রমণ – পাল্টা আক্রমণ আর স্থুল গালিগালাজ করা যায়। আমাদের বাংলা ভাষাভাষী ফেসবুক বা অনলাইন জগতে এখনকার প্রধান সংস্কৃতিই হচ্ছে এটা। যাইহোক, শিরোনামে আমি তিনটি প্রসঙ্গের অবতারণা করেছি। লেখকের স্বাধীনতা, আমাদের তালেবর বুদ্ধিবৃত্তির সেকাল-একাল এবং নির্বাসিত কবি দাউদ হায়দারকে নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্কের প্রসঙ্গ। “তালেবর” শব্দটির অর্থ হচ্ছে “ধনী”, “ধন্য”, “কৃতি”, “মান্যগণ্য”। আমাদের অনলাইনে এই ধরনের তালেবর বুদ্ধিজীবী এখন শত শত। আমি তাঁদেরকে ভালোবাসি, শ্রদ্ধা করি, অনুসরণ করি। তাই দাউদ হায়দারের লেখাটি নিয়ে তাঁদের লেখালেখি আমি গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়েছি। পড়েছি এবং ভেবেছি। তারপরে, এই কয়েকদিন পরে এই লেখাটি তৈরী করেছি। আমি জানি এই লেখার জন্যেও আমি আমাদের বাংলা ভাষাভাষী অনলাইন বুদ্ধিবৃত্তির কোপানলে পড়তে পারি। কিন্তু কি আর করা, এটাইতো মত প্রকাশের স্বাধীনতা, অর্থাৎ আমার মত আমি বলবোই, লিখবোই। তাতে যদি সবাই ছিঃ ছিঃ করে ওঠেন, সমাজচ্যুত করেন, “কোনো পরোয়া নেই”।

২.
সময়কালটা ছিলো ১৯৯৫ - ৯৬ সাল। তখনও বাংলাদেশে ইন্টারনেট নামক প্রযুক্তিটি আসেনি। অন্তত সুলভ নয়। তেমন সময়ে, আকিমুন রহমান নামের একজন লেখক বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে তার পিএইচডি শেষ করে লেখালেখির জগতে তার উপস্থিতি জানান দিয়েছেন। পেশায় বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক এই লেখক সেই সময়কার একটি সাহিত্য পত্রিকা “শৈলী” তে একটি সিরিজ লিখছিলেন “বিবি থেকে বেগম” শিরোনামে। এই লেখাটি ছিলো বাঙালি মুসলমান নারীর বিবর্তন নিয়ে তাঁর একটি দীর্ঘ গবেষণার খানিকটা সহজবোধ্য সংস্করণ বলা যেতে পারে। সহজবোধ্য করে লেখা হলেও লেখাটিতে মূল গবেষণার গভীরতা ও ধ্রুপদী পদ্ধতি বজায় ছিলো পুরোমাত্রায়। কোনো সন্দেহ নেই, বাংলাদেশের নারী, নারীমুক্তি ও মুসলিম নারীর বিবর্তনের ইতিহাসকে এইরকম পদ্ধতিগতভাবে কেউ বিশ্লেষণ করেননি। অন্তত আকিমুন রহমানের আগে কেউ দেখাননি, বাংলাদেশের নারীমুক্তির “আইকন বা অঙ্কিত প্রতিমূর্তি” বলতে আমরা যাঁদেরকে জানি, তাঁরা কমবেশি সকলেই আসলে পিতৃতন্ত্রের ছাঁচে গড়ে ওঠা, বেড়ে ওঠা নারীমুক্তির প্রতীক, নারীবাদী। বেগম রোকেয়া থেকে শুরু করে, নুরজাহান বেগম কিংবা সুফিয়া কামাল। সেই সময়ের মুসলমান সমাজের প্রগতিশীল পত্রিকা বলে কথিত সওগাত কিংবা বেগমে প্রকাশিত নারী বিষয়ক লেখালেখিগুলো ছিলো ঐতিহাসিকভাবেই পিতৃতন্ত্রের ব্যবস্থাকে না চটিয়ে, না ঘাটিয়ে, না বিরক্ত করে যতটুকু নারীমুক্তির কথা বলা যায়, লেখা যায়, সেই রকমেরই লেখালেখি। আকিমুনের বিশ্লেষণটা ছিলো এমনই। ড. আকিমুন রহমান তাঁর পাঠকদের কাউকে তাঁর সাথে একমত হবার দোহাই – দিব্যি দিয়েছিলেন বলে আমার মনে পড়েনা। তিনি শুধু তার বিশ্লেষণটি ব্যাখ্যা করেছিলেন পদ্ধতিগতভাবে।

আমাদের বুদ্ধিবৃত্তির জগতে পদ্ধতিগত গবেষণার পুস্তকের কোনো বাজার নেই। আমরা যতটা আগ্রহ নিয়ে “বেস্ট সেলার বা সর্বাধিক বিক্রিত” তকমাওয়ালা পুস্তক পড়ি, তার হাজার ভাগের একভাগও কোনো মৌলিক গবেষণার পুস্তক পড়িনা। তাই আকিমুন রহমানের এই মৌলিক গবেষণাপুস্তকটি বাংলাদেশে চলেনি। বাংলাদেশে আকিমুন রহমান কোনো বিখ্যাত কেউ হয়ে ওঠেননি। তিনি নারীবাদের “নবী” হয়ে ওঠেননি। বরং এই বই লেখার “অপরাধে” অবধারিতভাবেই আকিমুনের ভাগ্যে জুটেছিলো বাঙালি “মুক্তবুদ্ধি”র চর্চ্চা নিবেদিত “বুদ্ধিজীবী” সমাজের দেয়া দন্ড। এই প্রবন্ধ সিরিজটি যখন “শৈলী” পত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছিলো, কয়েকটি পর্ব প্রকাশিত হবার পর বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় ৫৬ জন বুদ্ধিজীবী যৌথবিবৃতি দিয়ে হামলে পড়েছিলেন আকিমুন রহমানের উপরে, হুমকি-ধামকি দিয়েছিলেন শৈলী পত্রিকার সম্পাদককে। এই সবই ঘটেছে প্রকাশ্যে, বিবৃতি দিয়ে। এই ৫৬ জন বুদ্ধিজীবির মাঝে কোনো মৌলবাদী বুদ্ধিজীবি ছিলেন না, এঁদের সবাই জাতীয়ভাবে দারুন প্রগতিশীল, মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তির বুদ্ধিজীবি। এঁদের মাঝে ছিলেন জাতীয় অধ্যাপক, সব্যসাচী লেখক, বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, কবি, বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপক, এঁদের মাঝে পুরুষ ছিলেন, নারী ছিলেন, সকলেই ছিলেন। তাঁদের দাবী ছিলো, ড. আকিমুন রহমানের লেখা ছাপা বন্ধ করা না হলে, তাঁরা সকলেই শৈলী পত্রিকাকে বর্জন করবেন। এই সকল “দলবাজ” বুদ্ধিজীবীদের কাছে নতি স্বীকার করে শৈলী পত্রিকাটি। আকিমুনের লেখাটির প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যায়।

পরবর্তীতে আকিমুন রহমানের লেখাটি বই আকারে প্রকাশিত হলেও, কখনই ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা পায়নি। আকিমুন রহমানকে উপেক্ষা করা হয়েছে, সঙ্ঘহীন করা হয়েছে। একাকী করা হয়েছে। কারণ আকিমুন পদ্ধতিগতভাবে দেখিয়েছিলেন পিতৃতন্ত্রের ছাঁচে গড়ে ওঠা বাঙালী নারীর বিবর্তনকে যা আমাদের দেশের নারীমুক্তির আইকন বা অঙ্কিত প্রতিমূর্তিদের জন্যে এক রকমের মূর্তি বিধ্বংসী ছিলো। অবশ্য এটাও সত্য যে ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা পাবার জন্যে যে রকমের “স্টান্ট” থাকা দরকার, তা এই বইতে নেই। এই বইতে যা আছে তাকে আমরা ইংরাজিতে বলি – “ক্রিটিক্যাল থিংকিং/ সমালোচনামূলক চিন্তা” বা “ক্রিটিক্যাল এনালাইসিস/জটিল বিশ্লেষন”, বাঙালী জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে যার উপস্থিতি বিরল। পাঠকেরা পুস্তকটি পড়তে পারেন (প্রতিক্রিয়াবিদ্ধ হবার সম্ভাবনা ১০০% নিশ্চিত।), কিন্তু যে কারণে এই প্রসঙ্গটির অবতারণা করা তা হলো, ইতিহাসের আরেকবার পুনুরুল্লেখ করা যে, লেখকের স্বাধীনতা কেবল মৌলবাদীদের দ্বারাই নিহত হয়না, বহু লেখককে সামাজিক ভাবে, সাংস্কৃতিক ভাবে হত্যা করেছেন আমাদের কথিত “প্রগতিশীল”, “মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ”, “মুক্তচিন্তক”, ‘নারীবাদী”, “মানবতাবাদী” এই সকল তকমা সাঁটা মানুষেরা। ড. আকিমুন রহমান কেবল একটি উদাহরণ মাত্র।

৩.
দাউদ হায়দার প্রবাসী, প্রবীণ মানুষ। নানান কারণে লেখক ও কবি দাউদ হায়দার কখনই আমাকে টানেননি। তার একটি প্রধান কারণ, দাউদ হায়দার দেশ ছেড়েছেন আমার জন্মের আগে। আমি যখন কবিতা পড়তে শিখি তখন বাংলাদেশ সামরিক শাসকের অধীনে, তখন ঢাকায় কবিতার চর্চ্চা মানেই রাজনীতি, সামরিক শাসকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো। সেই অর্থে কবিতা তখন আমাদের কাছে মানুষের রাজনৈতিক মুক্তির একটি হাতিয়ার, ভৌগলিক অবস্থানের কারণেই সেখানে দাউদ হায়দার ছিলেন সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। দাউদ হায়দার এখনও সেখানে অনুপস্থিত। আর দ্বিতীয় কারণটি ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক, আমার তারুণ্য ও যৌবনে, সাহিত্য ও লেখালেখির চাইতেও মার্কসবাদী রাজনীতিতে দিনের পুরোটা সময় ব্যয় করা। ব্যক্তিগতভাবে কোনও লেখক, সাহিত্যিক বা কবির প্রতিই আমার কোনো অপার মুগ্ধতা নেই, দুঃখজনকভাবে ছিলোও না কখনও। দাউদ হায়দার কবি, তাঁর মাঝে কবিত্ব আছে, তাঁর লেখা কবিতা এক সময় বাংলা কবিতার জমিনে আলোচিত হয়েছে। আমাদের তারুণ্যে দাউদ হায়দারের যে সামান্য কয়েকটি কবিতা পড়েছিলাম, তাতে তাঁর কবিত্ব নিয়ে আমার ব্যক্তিগত কোনও সন্দেহ নেই। তিনি কবি। কবিতার জমিনে বেঁচে থাকার জন্যে দুই হাজারটি “মহৎ” কবিতা লেখার দরকার নেই। দুটি উত্তীর্ণ কবিতাই যথেষ্ট। দাউদ হায়দারের তা আছে। দাউদ হায়দারের যে কয়েকটি কবিতা আমি পড়েছি, আমি মনে করতে পারিনা তার কোনোটি আমি বহুবার পড়েছি কিনা। তবে দাউদ হায়দারের সাম্প্রতিক আলোচিত কবিতাটি দু’তিনবার পড়লাম। আমি এই লেখাটিকে একজন কবির লেখা একটি কবিতা মনে করি। এটা লেখার ব্যাপারে তিনি ১০০% ভাগ স্বাধীন। কবিতাটি আমার কেমন লাগলো বা কবিতাটি আদৌ “কবিতা” হয়ে উঠেছে কিনা তার সাথে দাউদ হায়দারের এই কবিতাটি লেখার “অধিকারের” বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই।

৪.
দাউদ হায়দারের লেখাটির একটি ছবি আমাকে পাঠিয়েছেন আমার এক বন্ধু। লেখাটি আমার ভালো লাগেনি কয়েকটি কারণে। প্রথমেই বলে নিই, লেখাটিতে কোনো একজন বেগানা নারীর প্রতি যে সকল শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে সেটাই আমার “ভালো না লাগার” মূল কারণ নয়। বরং আমি বাংলা ভাষায় নারীর প্রতি অনেক খিস্তিখেউড় করে লেখা আরো কবিতা পড়েছি। এর মাঝে দুই একটি আমার খুব ভালো লাগার কবিতাও আছে। শামসুর রাহমানের লেখা “এই মাতোয়ালা রাইত” তাদের অন্যতম। ধরুন, পুরানো ঢাকার এক মেথর সর্দার কিম্বা কোনও সমাজের এক প্রান্তিক প্রতিনিধি মাতাল হয়ে মাঝরাতে যখন বাড়ী ফেরেন, তাঁর মুখের ভাষাটিকে, তাঁর ভাবনা, শব্দকে, স্বপ্নকে, জীবনজিজ্ঞাসাকে কিভাবে কবিতায় বাঁধতে হয় সেটা দেখিয়েছেন কবি শামসুর রাহমান। কবিতা না বোঝা মানুষের কাছে এটা কেবলই খিস্তি মনে হতে পারে। কিন্তু যারা কবিতাটি পড়েছেন তাঁরা জানেন, কবিতাটিতে ব্যবহার করা কথিত “অশ্লীল” বা “খিস্তি” শব্দগুলো কিভাবে তার শাব্দিক অর্থকে অতিক্রম করে শিল্প হয়ে উঠেছে, স্বপ্ন হয়ে উঠেছে, আত্ম অনুসন্ধিৎসু হয়ে উঠেছে। একজন নবিশ কবিতা পাঠক হিসাবে আমি বোধ করেছি, দাউদ হায়দারের লেখাটিতে শব্দগুলো তাদের শাব্দিক অর্থকে অতিক্রম করে যেতে পারেনি। যে কোনো কবিতা পাঠকই বুঝতে পারবেন, কবিতাটির কবিতা হয়ে ওঠার চাইতেও আরো ভিন্ন কোনো উদ্দেশ্য হয়তো ছিলো। এবং সে কারণেই এই কবিতাটি কবিতার পাঠকদের কাছে হয়তো খুব দীর্ঘস্থায়ী হবেনা। এরকমের হাজারো উদাহরণ আছে আমাদের চারপাশের লেখালেখিতে। শুধু দাউদ হায়দার একা নন এই খিস্তিখেউড় করার তালিকায়। দাউদ হায়দার যাকে বা যাদেরকে নিয়ে খিস্তিখেউড় করছেন তারাও আছেন এই খিস্তিমূলক সাহিত্য রচনাকারী “সম্মানীয়”দের তালিকায়। এটা আমাদের বাঙালি লেখালেখির জগতের এক “অবিচ্ছেদ্য” অংশ। এজন্যেই আমার কাছে দাউদ হায়দারের এই লেখাটি বাংলা ভাষার খিস্তি করে লেখা আরো হাজার খানেক অনুল্লেখযোগ্য লেখার একটি মনে হয়েছে । ব্যস, এই “কবিতা”টি সম্পর্কে আমি হয়তো এই কয়েক লাইনেই থেমে যাবো। কিন্তু বাংলা অনলাইন তালেবর বুদ্ধিজীবিরা থামেন নি। তা নিয়েই আজকের এই লেখাটি।

৫.
দাউদ হায়দারের লেখাটির ভাষা আমাকে প্রতিক্রিয়াবিদ্ধ করেনি। কেননা, আমি পিতৃতন্ত্রের ভাষা জানি। আমি পিতৃতন্ত্রের অন্য প্রতিনিধিদেরকেও জানি। সেই তালিকায় যেমন আমি আছি, আমার বাবা আছেন, আমার মা আছেন তেমনি বহু স্বনামধন্য কবি-লেখক-সাহিত্যিক-রাজনীতিবিদ-খেলোয়াড় এমন কি আত্মদাবীকৃত বহু নারীবাদীও আছেন। এমন কি যারা দাউদ হায়দারকে নিয়ে খিস্তিখেউড় করে চারদিক ম-ম করে তুলেছেন তাঁদেরও একটা বিরাট অংশ পিতৃতন্ত্রেরই প্রদায়ক। যারা দাউদ হায়দারের কবিতাটির “কুৎসিত” দিক নিয়ে লিখছেন, তাদের অনেককেই দেখেছি নারীর শরীর নিয়ে, ওজন নিয়ে, রঙ নিয়ে, পোশাক নিয়ে, মুখশ্রী নিয়ে, যোগ্যতা নিয়ে, মেধা নিয়ে বিচিত্র সব ভাষায় কটাক্ষমূলক লেখালেখি করতে। তাই এই সকল ভাষা আমাকে প্রতিক্রিয়াবিদ্ধ করেনা, আমি জানি আমার চারপাশের “পিতৃতন্ত্রের প্রতিনিধি”রা কত বিচিত্র সব পোশাক পরিধান করে আছেন। সেই দলে দাউদ হায়দার আছেন, তাকে গালিগালাজ করা নামী – দামী অনলাইন পয়গম্বরবৃন্দও আছেন। এঁদের পোশাক-আশাক ভিন্ন, মগজের ভাষা অভিন্ন।

৬.
কিন্তু দাউদ হায়দারের কবিতাটিকে কেউ কি বিশ্লেষণ করেছেন কবিতার ব্যাকরণ দিয়ে? কেনো কবিতা হিসাবে এটি একটি ব্যর্থ কবিতা? এটা কবিতা হিসাবে ব্যর্থ কি এইজন্যেই যে তিনি এই কবিতায় ইঙ্গিতে একজন নারীবাদী কবিকে অশ্লীল ভাষায় আক্রমণ করেছেন? বাংলা ভাষার আরো স্বনামধন্য লেখকদের প্রতি কি অশ্লীল ইঙ্গিত করে লেখালেখি হয়নি সাম্প্রতিক ইতিহাসে? এটা কবিতা হিসাবে ব্যর্থ হয়েছে তা অন্তত দুটি প্রধান দিক থেকে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। প্রথমত – কবিতার ব্যাকরণ দিয়ে দেখানো যেতে পারে কেনো এটি কবিতা হয়ে ওঠেনি। দ্বিতীয়ত – কবিতার বোধ, উদ্দেশ্য, চিত্রকল্প, শব্দ, উপমা, বিন্যাস এই সকলের বিশ্লেষণের মধ্য দিয়েও ব্যাখ্যা করা যেতে পারে, কেনো কবিতাটি কোনো উত্তীর্ণ শিল্পকর্ম হয়ে ওঠেনি। কিন্তু দাউদ হায়দারের লেখাটির প্রতিক্রিয়ায় আমরা কি দেখলাম? আমাদের স্বভাবসিদ্ধ প্রতিশোধপরায়ণতা। যারা গত কয়েকদিন বাংলা অনলাইন “ফাটিয়ে” দিলেন দাউদ হায়দার বিষয়ে, যারা মনে করেছেন দাউদ হায়দার কে অনলাইনে গালিগালাজ করে তাঁর সারা গায়ে “চুতরা পাতা ঘষে” দেয়া হয়েছে, তাঁর “দাঁত ভাঙ্গা” জবাব দেয়া হয়েছে, তাঁদের মূল অনুপ্রেরণা হচ্ছে ব্যক্তিগত প্রতিশোধপরায়ণতা। সুযোগের অভাবে যা এতোদিন চাপা ছিলো, আজ দাউদ হায়দারের কবিতাটি সে আগ্নেয়গিরিতে একটা ফাটল তৈরী করেছে মাত্র। আর সেই ফাটল দিয়ে গলগল করে বেরিয়ে পড়েছে আমাদের অনলাইনের তালেবর বুদ্ধিজীবীদের তাবৎ প্রতিশোধপরায়ণতা। ড. আকিমুন রহমানের বেলাতে তাও কিছুটা পোশাকী বিষয় ছিলো আমাদের সেকালের তালেবর বুদ্ধিজীবীদের, আমাদের একালের অনলাইন “নায়ক” বুদ্ধিজীবীদের সেই পোশাকের বালাইটিও নেই। তাই দাউদ হায়দারের এই কবিতাটি নিয়ে বেশীরভাগ প্রতিক্রিয়া আসলে মানুষের ব্যক্তি স্বাধীনতার পরিপন্থী প্রতিক্রিয়া, লেখকের স্বাধীনতার বিরোধী প্রতিক্রিয়ায় পর্যবসিত হলো। বেশীরভাগ প্রতিক্রিয়াই হচ্ছে বাঙালির চিরাচরিত প্রতিশোধপরায়ণ প্রতিক্রিয়া। এই সকল প্রতিশোধপরায়ণ প্রতিক্রিয়ার বিপরীতে পাঠকের ভাবনার জন্যে আমি কিছু প্রশ্ন রাখছি, ভেবে দেখুন। এসকল বিষয়ে আমার কোনও সুনির্দিষ্ট মতামত দিচ্ছিনা। শুধু আমার প্রশ্নগুলো করছি –

  • কবি দাউদ হায়দার কি এই কবিতাটি লিখে কোনো অপরাধ করেছেন?
  • এই কবিতাটি লেখার সাথে ব্যক্তি দাউদ হায়দারের স্বভাব, চরিত্র, তাঁর মদ্যপান, অর্থনৈতিক লেনদেনে অস্বচ্ছতা ইত্যাদির কোনো সম্পর্ক আছে?
  • কবির কি বেশ্যালয়ে যাওয়া মানা? বিশেষত যে দেশে বেশ্যালয় আইনত বৈধ? আর দাউদ হায়দারই কি দুনিয়ার একমাত্র কবি যিনি বেশ্যালয়ে গিয়ে “দর কষাকষি” করেছেন?
  • বেশ্যালয়ে গিয়ে দর কষাকষি’র সাথে কি কবি হয়ে ওঠার বা না হয়ে ওঠার কোনো সম্পর্ক আছে?
  • কবিতা লেখার অপরাধে যারা তাঁর ব্যক্তিচরিত্র নিয়ে টানা হ্যাচড়া করছেন, তাঁদের মূল উদ্দেশ্যটি কি? তাঁরা কি লেখকের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন?
  • যারা লেখকের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন, তাঁরা কি কোনোভাবেই একজন লেখক কি লিখবেন আর লিখবেন না তা বেঁধে দিতে পারেন?
  • কোনটা কবিতা আর কোনটা কবিতা নয়, সেটা কে নির্ধারণ করবে? কিভাবে নির্ধারণ করবে? কবিতাকে কি “শালীন” হতে হবে? কে নির্ধারণ করবেন সেই “শালীনতা”? কিভাবে নির্ধারিত হবে সেই “শালীনতা”?
  • যারা ব্যক্তি স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন, বিশেষত ইউরোপে এবং পশ্চিমে আমরা যে ব্যক্তিসাতন্ত্র্যবাদ বা “ইন্ডিভিজুয়ালিজম” ও “লিবার্টি/মুক্তি” বিষয়ক ধারণা পাই, তাতে কে সারাবছর মদ খাবেন কিংবা বেশ্যালয়ে রাত কাটাবেন, তাতে একজন তৃতীয় মানুষ হিসাবে কি আমার বলার কিছু আছে?
  • কবিকে কি “সৎ” হতে হবে? কবিকে কি “চরিত্রবান” হতে হবে? কে ঠিক করে দেবে সেই “সততা” ও “চরিত্রবান” হবার মানদন্ড? বাংলাদেশের অনলাইন বুদ্ধিজীবিরা?
  • এই কবিতাটি লেখার কারণে কি কবি দাউদ হায়দারের পূর্ববর্তী সকল লেখা খারিজ হয়ে যায়?
  • এই লেখাটির সাথে কি দাউদ হায়দারের ব্যক্তি চরিত্র যেমন “টাকা ধার চাওয়া”, “বিনা পয়সায় মদ্যপান করাতে বাধ্য করা” ইত্যাদি অভিযোগের কোনো সম্পর্ক আছে?
  • দাউদ হায়দার এর চরিত্র “ভালো” নয় বলেই কি এই রকমের একটি কবিতা লিখেছেন? যদি তাইই করে থাকেন, সেটাও কি অপরাধ? অনুচিত?
  • তাহলে, এই কবিতাটিকে কেন্দ্র করে যারা ব্যক্তি দাউদ হায়দারকে নিয়ে মেতে উঠেছেন, তাঁদের মূল লক্ষ্য ও অনুপ্রেরণা আসলে কি?


(নবীর অন্ধ অনুসরনের আগে ভাবুন, দলের অন্ধ অনুসরনের আগে ভাবুন।)

প্রশ্নগুলো করলাম শুধুই ভাবনার জন্যে। আসুন ভাবি, ভাবা প্র্যাকটিস করি। একমত হতে হবেনা, বরং দ্বিমত হোন, বহুমত হোন। কিন্তু দ্বিমত – বহুমত হবার আগে ভাবুন।অন্ধ অনুকরনের আগে ভাবুন, জনপ্রিয় হবার জন্যে ঝাকের কইয়ের সাথে ভেসে যাবার আগে ভাবুন। আমি জানি, এই প্রত্যেকটি প্রশ্নের হয়ত দশ – বারো রকমের উত্তর হবে। তাই পাঠকের উপরেই ছেড়ে দিচ্ছি, শুধু ভাবনার জন্যে। “কবিতা” কিম্বা অকবিতা লেখার অপরাধে কারো ব্যক্তি চরিত্রের উপরে হামলে পড়ার আগে, ভাবুন।

৭.
ভেবে দেখুন তো যে দেশের সবচাইতে শিক্ষিত, অগ্রসর, প্রগতিশীল, আধুনিক, মানবিক বলে দাবীদার সমাজ, বুদ্ধিজীবিরা বেগম রোকেয়া বা সুফিয়া কামালের উপর একটি নিরেট একাডেমিক, পদ্ধতিগত সমালোচনা বা ক্রিটিক্যাল এনালাইসিসকে গ্রহণ করতে পারেনা, পুরোটুকু প্রকাশিত হবার আগেই হুমকি-ধামকি দিয়ে বন্ধ করে দেয়, সেই দেশের সুবিধাবঞ্চিত, অশিক্ষিত, ধর্মান্ধ, সভ্যতার হিসাবে – প্রযুক্তির ব্যবহারে পিছিয়ে থাকা মানুষের প্রতিক্রিয়াটি কেমন হতে পারে, যখন আমরা তাঁদের নবী মুহাম্মদকে “মহা-উন্মাদ” লিখি? যখন আমাদের কারো কারো সকল লেখালেখির বিষয় হয়ে দাঁড়ায় মুহাম্মদের যৌনজীবন আর তার স্ত্রীদের সম্পর্কে রগরগে আলোচনা? এরাও আমাদের উপরে চড়াও হয়। রামদা – চাপাতি নিয়ে হামলে পড়ে, চিরতরে লেখালেখি স্তব্ধ করে দেয়। কেউ বিবৃতি দিয়ে লেখালেখি স্তব্ধ করে দেয় আর যাঁদের বিবৃতি দেবার ক্ষমতা নেই, তারা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে ধারালো অস্ত্র হাতে। একটা দুঃখজনক সত্যি হচ্ছে, এই দুই দলেরই অনুপ্রেরণা হচ্ছে অভিন্ন – এক ধরনের “নবীতন্ত্র”। কারো নবী চৌদ্দশ বছর আগে মৃত কিন্তু এখন সমান হিংস্রতা নিয়ে উপস্থিত, কারো নবী চল্লিশ বছর আগে মৃত আবার কারোবা নবী এখনও জীবিত ও দেদীপ্যমান। “নবীতন্ত্র” আমাদের সবাইকে অনুপ্রাণিত করে আমাদের নবীর প্রতি প্রশংসামূলক নয় এমন সকল কিছুর বিরুদ্ধে দল বেঁধে জড়ো হতে। এই জড়ো হওয়ার মাধ্যম ভিন্ন, ধরণ ভিন্ন, প্রকাশ ভিন্ন কিন্তু উদ্দেশ্য এক, অভিন্ন। যখনই কোনো লেখা, চিন্তা, কবিতা, গল্প বা সাধারণ বক্তৃতা আমার নবীর প্রতি প্রশংসাসূচক নয়, তখন সেই সকল মানুষের লেখার অধিকার, বলার অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করা, স্তব্ধ করা। দাউদ হায়দারের লেখাটির বিরুদ্ধে যে খিস্তি-খেউড়ের মহোৎসব, তা আমাদের “নবীতান্ত্রিক” সংস্কৃতির আরেকটি প্রকাশ মাত্র। কোনো রকমের পদ্ধতিগত সমালোচনার বদলে খিস্তিখেউড় আর ব্যক্তিচরিত্রের যে হনন উৎসব, তা একটি আদর্শ “নবীতান্ত্রিক” চর্চ্চার নজির হয়ে রইলো।

৮.
দাউদ হায়দারের কবিতাটি কতটুকু কবিতা হয়ে উঠেছে আর কতটুকু ব্যক্তিগত প্রতিশোধ পরায়ণতা, তা নিয়ে খুব বেশী পদ্ধতিগত আলোচনা হবেনা। আমাদের যে বর্তমান বুদ্ধিবৃত্তির দৌড়, তাতে আমি তা আশা করিনা। আমি খিস্তিখেউড়ই আশা করি। আমাদের নবীতান্ত্রিক সংস্কৃতি থেকে আমি এর চাইতে বেশী কিছু আশা করিনা। অথচ সেটাই হতে পারতো আসল কাজ। পিতৃতন্ত্রের অধীনে, যে নারী পিতৃতন্ত্রকে চ্যালেঞ্জ করে তাকে “ছিনাল” বলাটা কি কেবল আজকের এক কবিই বললেন? ইউরোপে নারীবাদের ইতিহাসে, পশ্চিমের কিম্বা আমেরিকার নারীবাদের ইতিহাসে কি অহরহই নারীবাদীদের “হোর” কিম্বা “স্লাট” বলা হয়নি? এমন কি ইউরোপীয় এনলাইটেনমেন্ট এজ বা জ্যোতির্ময়তার কাল এর পন্ডিত- পুরোহিতদের মাঝে কি চরম নারী বিদ্বেষী মানুষ ছিলেন না? মুশকিল হচ্ছে, এই সকল ইতিহাসে এই আক্রমণগুলো ব্যক্তির চাইতে পদ্ধতির উপরেই, চিন্তার উপরেই তাক করা হয়েছে, আক্রমনের লক্ষ্য ছিলো চিন্তা, ব্যক্তি নয়। অর্থাৎ পিতৃতন্ত্রের ব্যক্তি প্রতিনিধির চাইতেও আঘাতের মূল লক্ষ্য হয়েছে চিন্তা, পদ্ধতি, পিতৃতন্ত্রের প্রতিপালক প্রতিষ্ঠান সমূহ, পিতৃতন্ত্রের ভাষা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, ইউরোপে নারী মুক্তি এগিয়েছে চিন্তা, পদ্ধতি অর প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে আর আমাদের ভুমিতে যেকোনো সংগ্রামের শুরু ব্যক্তি আক্রমনে এবং শেষও ব্যক্তি আক্রমনে। পশ্চিমের সাথে আমাদের সংগ্রামের গুণগত পার্থক্য এখানে। এই পার্থক্যের কারণ কি? আসুন ভাবি।


(আমাদের সমাজের প্রতিচ্ছবি, যেখানে অন্ধ উম্মতের সংখ্যার তুলনায় ক্রিটিক্যাল থিঙ্কার এর সংখ্যা বিরল)

একটা গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হচ্ছে আমাদের আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় “নবীতন্ত্র” বা “পুরোহিততন্ত্র”র দোর্দণ্ড উপস্থিতি । আমরা আমাদের সংগ্রামকে নিবেদিত করেছি আমাদের ব্যক্তিগত নবী - পুরোহিতের প্রতি শর্তহীন নিবেদনে আর তার বিপক্ষ পুরোহিতদের যুক্তিহীন বিরোধীতায়। ব্যাস।

৯.
একটু ভিন্ন প্রসঙ্গ তুলি। বিখ্যাত নারীবাদী গবেষক ন্যান্সী ফ্রসার মনে করেন, আজকাল আমরা যে সকল চিন্তা ও লেখালেখিকে পপুলার অর্থে “ফেমিনিজম” বলি, সেসব আসলে “১% ফেমিনিজম”, আমাদের দরকার “৯৯% ফেমিনিজম”। ন্যান্সী ফ্রসার তার গবেষণায় দেখিয়েছেন কিভাবে এই “১% নারীবাদ” আসলে কর্পোরেট তন্ত্রের একটা সাংস্কৃতিক রুপভেদ মাত্র। আর কেনা জানে, আধুনিক কর্পোরেটতন্ত্র আর কিছুই নয়, পিতৃতন্ত্রের পোশাকী পাহারাদার। এখন যদি প্রশ্ন করি নারীবাদ বলতে আমরা বাংলা ভাষায় যা বুঝি তাতো এক ধরনের শহুরে এলিট নারীবাদ, তাই না? ন্যান্সী ফ্রসার এর ভাষায় বললে বলা যাবে “১% নারীবাদ”।


(অধ্যাপক ন্যান্সী ফ্রসার পুঁজিবাদ ও নিও-লিবারাল দর্শনের সমর্থক নারীবাদের স্বরূপ উন্মোচন করে চলেছেন গত চল্লিশ বছর ধরে, আধুনিক নারীবাদের "নারীবিরোধী" অবস্থান জানার জন্যে ন্যান্সী ফ্রসার এর পাঠ জরুরী। বাংলা ভাষায় নারীবাদ, পুঁজিবাদ ও নিও-লিবারাল দর্শনের সম্পর্ক নিয়ে বিতর্ক জরুরী হয়ে উঠেছে)

আমাদের সেই নারীবাদ বা শহুরে নারীবাদীরা কি পিতৃতন্ত্রের পৃষ্ঠপোষক? কি জানি। যাদের প্রতিটি লেখা কোনো না কোনোভাবে পুরুষ অথবা পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে, তাঁরা কি করে পিতৃতন্ত্রের পৃষ্ঠপোষক হন? আমি জানি এই প্রশ্ন তোলাটাও হয়তো একটা বিরাট অপরাধ হয়ে উঠতে পারে। প্রশ্নটি তুলছি দাউদ হায়দার ও আমাদের “নারীবাদী”দের মাঝে একটি গুরুত্বপূর্ণ মিলের কথা বলার জন্যে। এই সময়েরই কোনো কোনো তাত্ত্বিক আলোচনা রয়েছে, আজকের যুগের পিতৃতন্ত্রের দুইটি প্রধান পৃষ্ঠপোষক, পুঁজিবাদ আর ধর্ম। আমাদের নারীবাদের “পুরোহিত”দের অনেকেই ধর্মের বিরুদ্ধে সোচ্চার তা আমরা সবাই জানি। কিন্তু আজকের যুগে ধর্মেরও পিতা-প্রতিপালক হচ্ছে আধুনিক পুঁজিবাদ। সারা দুনিয়ায় সৌদীআরব কিম্বা ইজরাইলের মতো দুই চরম বিরোধী ধর্মীয় গোষ্ঠীকে এক টেবিলে বসতে বাধ্য করে আধুনিক পুঁজিবাদ। আজকের দুনিয়ায়, ধর্মের যাবতীয় রসদের প্রধান সরবরাহকারী হচ্ছে আধুনিক পুঁজিবাদের দার্শনিক স্কুল নিও-লিবারাল দর্শন। পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে, নিও-লিবারাল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দর্শনের বিরুদ্ধে, দানবের মতো বেড়ে ওঠা কর্পোরেটতন্ত্রের বিরুদ্ধে, আমাদের শহুরে এলিট নারীবাদীদের বা দাউদ হায়দারের কারো কোনো লেখালেখি চোখে পড়েছে, কোনো সোচ্চার প্রতিবাদ বা সোচ্চার অবস্থান চোখে পড়েছে বলে মনে পড়েনা।এই অবস্থানের দিক থেকে আমাদের নারীবাদীদের ও দাউদ হায়দারের চিন্তার মাঝে কোনও পার্থক্য নেই। কিন্তু এই নারীবাদীদের কারোকারো মতোই দাউদ হায়দারও ভিন্ন একটি সময়ে ধর্মের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে দেশান্তরিত হয়েছিলেন। এদিক থেকে এঁরা সকলেই পিতৃতন্ত্রের এক পরাক্রমশালী প্রতিষ্ঠান ধর্মের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন এক সময়। আমি যদি ইতিহাসকে অস্বীকার না করি, তাহলে পিতৃতন্ত্রের এক প্রবল পরাক্রমশালী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এঁরা সকলেই লড়েছেন, দুটি ভিন্ন সময়ে, দুটি ভিন্ন প্রেক্ষিতে। সেই ভুমিকার সাথে এঁদের ব্যক্তি চরিত্রের কোনো সম্পর্ক আছে? সেই ভুমিকার বিষয়ে এঁদের মাঝে কোনো বিরোধ আছে? আমার ধারণা নেই। এঁরা সবাই ধর্ম নামের প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন। কিন্তু নারীবাদ প্রসঙ্গে দাউদ হায়দারকে যেভাবে আমাদের আত্মদাবীকৃত নারীবাদীরা, নারীর ও নারীবাদের মুখোমুখি দাঁড় করাচ্ছেন, সেজন্যেই আমি প্রশ্ন তুলতে চাই - আমরা যাদেরকে নারীবাদী বলছি বা কাউকে কাউকে নারীবাদের নবী বানাচ্ছি, তাঁরা আসলেই কতটুকু নারীবাদী এবং তাঁদের চর্চার কতটুকু অংশ নারীবাদ সেই প্রশ্নটা তোলাও জরুরী হয়ে উঠেছে। মুশকিল হচ্ছে আমাদের দেশে আমাদের ভাষায় “স্ট্যাটাস কুয়ো” বা “প্রতিষ্ঠিত ধারা” কে চ্যালেঞ্জ করাটা দণ্ডনীয় অপরাধ, তা সে সামরিক শাসন হোক, গণতান্ত্রিক দলে হোক, শিল্প-সাহিত্য’র জগতে হোক কিম্বা নারীবাদী চিন্তা দর্শনে হোক। আমি বলছিনা, দাউদ হায়দার তার লেখাটি দিয়ে কোনও “স্ট্যাটাস কুয়ো” কে চ্যালেঞ্জ করেছেন, তার লেখাটি কোনও কাজের কাজই হয়ে ওঠেনি। আমি শুধু বলছি, দাউদ হায়দার একা আর প্রতিপক্ষে “নারীবাদী” বলে আত্মদাবীকৃত একটি বিরাট গোষ্ঠী, এঁদের বিরোধের মাঝে প্রকৃত অর্থেই নারী বা নারীবাদ নেই, আছে ব্যক্তিগত ক্রোধ, আক্রোশ, প্রতিশোধ পরায়নতা। এই ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব, ক্রোধ, প্রতিশোধ পরয়নতার যুদ্ধকে যারা নারীর বিরুদ্ধে বা নারীবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হিসাবে চালিয়ে দিতে চাচ্ছেন, তাঁদের প্রতিই আমার এই সকল প্রশ্ন। ভেবে দেখুন, এটা কি দাউদ হায়দার বনাম নারী ও নারীবাদ? নাকি শ্রেফ দাউদ হায়দার বনাম আরেকজন বা একাধিক ব্যক্তি? ইতিমধ্যেই, কেউ একজন অতিশয় “কনফিডেন্স” এর সাথে ঘোষণা করেছেন, দাউদ হায়দার এই “কবিতাটি” লিখেছেন, “এক বোতল ওয়াইনের বিনিময়ে”। অর্থাৎ লেখাটি একটি প্ররোচিত লেখা। ভিন্ন একজন ব্যক্তি দাউদ হায়দার কে এক বোতল ওয়াইন খাইয়ে আরেকজন একক ব্যক্তির বিরুদ্ধে এই কবিতাটি লিখিয়ে নিয়েছেন। তাহলে বিষয়টি কি দাঁড়ালো? বিষয়টি কি দাউদ হায়দার বনাম একজন কবি (যিনি হয়তো একজন নারীবাদী পুরোহিতও বটে)? নাকি দাউদ হায়দার বনাম সমগ্র নারীকুল বা নারীবাদ? ভাবুন।

১০.
অনেকেই দাউদ হায়দারের এই কবিতা লেখাটিকে তার বুড়ো বয়সে “ভীমরতি” বলে উল্লেখ করেছেন। আমার কাছে থাকা বাংলা অভিধানগুলো ঘেঁটে দেখলাম, “ভীমরতি” শব্দটির সবচাইতে গ্রহণযোগ্য অর্থটি পেলাম এভাবে – “বৃদ্ধ বয়সে বুদ্ধিভ্রষ্ট হবার অবস্থা”। প্রথমত বৃদ্ধ বয়সে বুদ্ধিভ্রষ্ট হবার নানান কারণ থাকে। থাকতে পারে। কিন্তু আমরা সকল ধরনের বুদ্ধিভ্রষ্টতার কথা বলতে গিয়ে “ভীমরতি” শব্দটি ব্যবহার করিনা। বাঙালি কেবল বুড়ো বয়সে কোনো পুরুষের নারী বিষয়ক সংশ্লিষ্টতাকেই “ভীমরতি” বলে উল্লেখ করে থাকি। কোনো একজন নারীবাদী কবিকে লক্ষ্য করে লেখা কবিতা যদি হয় “নারী বিষয়ক সংশ্লিষ্টতা” তাহলে হয়তো এটাকে দাউদ হায়দারের “ভীমরতি”ই বলা যাবে। এটা কতটা লেখকের স্বাধীনতা আর কতটা “ভীমরতি” তা নির্ভর করবে আপনি বা আমি আসলে কতটুকু বুঝি ও বিশ্বাস করি “লেখকের স্বাধীনতা” কিংবা “মত প্রকাশের স্বাধীনতা” এই বিষয়গুলোকে । অনলাইনের কিছু নমুনা যা দেখলাম – পড়লাম, তাতে বাংলা ভাষাভাষী অনলাইনের মুক্তচিন্তার তালেবর পন্ডিতেরা বাংলাদেশের ব্লগারদের জন্যে আন্তর্জাতিক “ফান্ডিং” বা টাকা পয়সার বিষয়টা যত ভালো বোঝেন, লেখকের স্বাধীনতা’র বিষয়টির কানা-কড়িও বোঝেন না। তাই দাউদ হায়দারের এই ব্যর্থ কবিতাটি কেবলই কবিতা লেখার এক ব্যর্থ প্রয়াস হয়নি তাঁদের কাছে, তাঁদের কাছে এটা লেখকের স্বাধীনতা নয়, এটা “ভীমরতি”।

১১.
লেখক স্বাধীন। পাঠকও স্বাধীন। কবির কি লেখা উচিৎ আর কি লেখা অনুচিত, শিল্পীর কি আঁকা উচিৎ আর কি আঁকা অনুচিত এসব প্রশ্ন নিয়ে ইউরোপে প্রায় একশো বছর আগে বিতর্ক হয়েছে। ভারতবর্ষেরও সেই বিতর্কের ইতিহাস একশো বছরের কাছাকাছি। কিন্তু এখনও আমরা কবিকে দন্ডিত করছি “শালীনতার” প্রশ্নে, “ঔচিত্যবোধের” প্রশ্নে। যারা নারীবাদী লেখকদের লেখা পড়ে তাঁদের সতীত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, তাঁদের কয়টি বিয়ে হয়েছে, কয়টি ডিভোর্স হয়েছে সেই সকল হিসাব-নিকাশের প্রশ্ন তোলেন আর যারা দাউদ হায়দারের কবিতা হয়ে উঠতে ব্যর্থ হওয়া একটি লেখা পড়ে তাঁর ব্যক্তিগত চরিত্র নিয়ে হামলে পড়েন, এই দুই গোষ্ঠীর মাঝে মৌলিক পার্থক্য প্রায় নেই বললেই চলে। পোষাকে পার্থক্য আছে, মগজে নেই। অর্থাৎ আমার পছন্দ না হলেই, তাঁর ব্যক্তি চরিত্রের উপরে হামলে পড়তে হবে। তা নারীবাদী লেখা হোক বা দাউদ হায়দার কবিতা না হয়ে ওঠা একটি লেখা হোক।

১২.
দাউদ হায়দার কেবল একটি কবিতাই লিখেছেন। সেই কবিতায় জরজর ক্রোধ আছে, যে ক্রোধ তার কবিত্ব’র প্রতি স্ববিচার বা সুবিচার করতে দেয়নি। কিন্তু অনুত্তীর্ণ কবিতা লেখার অপরাধে আমাদের অনলাইন তালেবর বুদ্ধিজীবিরা তাঁদের বুদ্ধির, সৃজনশীলতার যে দৌঁড় দেখালেন সেটাও কম বিনোদনের নয়। একটি কবিতাকে কবিতার ভাষা দিয়ে – পদ্ধতি দিয়ে ব্যাখ্যা করার মুরোদ নেই আমাদের অনলাইন “নায়ক”দের। আর দাউদ হায়দারও পরাজিত করেছেন তার কবি সত্ত্বাকে তার স্থুল ব্যক্তিক্রোধ দিয়ে। দাউদ হায়দারের সুস্থতা কামনা করছি, যদি আবারো তিনি কখনো একটি সত্যিকারের উত্তীর্ণ কবিতা লিখে উঠতে পারেন। সেই সাথে চিন্তার সুস্থতা কামনা করছি আমাদের একালের অনলাইন “মুক্তমনা” বলে আত্মদাবীকৃত বুদ্ধিজীবীদের। এরাও যেনো লেখার জবাব লেখা দিয়েই দেবার মতো মুরোদ অর্জন করে উঠতে পারেন। লেখার দায়ে লেখকের চরিত্র হননের যে আবর্জনাময় সাংস্কৃতিক চর্চায় এদের মস্তিষ্ক-করোটি পরিপূর্ণ, সেখানে যেনো খানিকটা হলেও সৃজনশীলতা চর্চ্চার ক্ষেত্র তৈরী হয়।

১৩.
কবিতা হয়েছে কি হয়নি সেই প্রশ্নের বাইরেও একটা বিষয় মোটাদাগে পরিস্কার সেটা হচ্ছে, দাউদ হায়দার তাঁর কবিতাটিতে বাঙালীর প্রচলিত “শালীনতাবোধ” রক্ষা করেননি। সেই “শালীনতাবোধ” ভঙ্গ করার অধিকার তাঁর আছে কিনা সেই প্রশ্নটিকে আজকের মতো মূলতুবী রেখে আসুন একটি নারীবাদী কবিতা পাঠ করি।

পারো তো ধর্ষণ করো

“আর ধর্ষিতা হয়ো না, আর না
আর যেন কোনও দুঃসংবাদ কোথাও না শুনি যে তোমাকে ধর্ষণ করেছে
কোনও এক হারামজাদা বা কোনও হারামজাদার দল।
আমি আর দেখতে চাই না একটি ধর্ষিতারও কাতর করুণ মুখ,
আর দেখতে চাই না পুরুষের পত্রিকায় পুরুষ সাংবাদিকের লেখা সংবাদ
পড়তে পড়তে কোনও পুরুষ পাঠকের আরও একবার মনে মনে ধর্ষণ করা ধর্ষিতাকে।
ধর্ষিতা হয়ো না, বরং ধর্ষণ করতে আসা পুরুষের পুরুষাঙ্গ কেটে ধরিয়ে দাও হাতে,
অথবা ঝুলিয়ে দাও গলায়,
খোকারা এখন চুষতে থাক যার যার দিগ্বিজয়ী অঙ্গ, চুষতে থাক নিরূপায় ঝুলে থাকা
অণ্ডকোষ, গিলতে থাক এসবের রস, কষ।
ধর্ষিতা হয়ো না,পারো তো পুরুষকে পদানত করো, পরাভূত করো,
পতিত করো, পয়মাল করো
পারো তো ধর্ষণ করো,
পারো তো ওদের পুরুষত্ব নষ্ট করো।
লোকে বলবে, ছি ছি, বলুক।
লোকে বলবে এমন কী নির্যাতিতা নারীরাও যে তুমি তো মন্দ পুরুষের মতই,
বলুক, বলুক যে এ তো কোনও সমাধান নয়, বলুক যে তুমি তো তবে ভালো নও
বলুক, কিছুতে কান দিও না, তোমার ভালো হওয়ার দরকার নেই,
শত সহস্র বছর তুমি ভালো ছিলে মেয়ে, এবার একটু মন্দ হও।

চলো সবাই মিলে আমরা মন্দ হই,
মন্দ হওয়ার মত ভালো আর কী আছে কোথায়!”

১৪.
আমি কাব্যবোদ্ধা নই। তাই এই কবিতাটির কাব্যগুণ বিচারের ভার আমার অনলাইনের নারীবাদী কবিতা বিশেষজ্ঞ বুদ্ধিজীবী বন্ধুদের উপরে ছেড়ে দিলাম। কিন্তু যে প্রসঙ্গটি এই লেখার শুরুতে উল্লেখ করেছিলাম, সেটা হচ্ছে আমাদের নারীবাদ মূলত পুঁজিবাদ ও নিও-লিবারাল দর্শনের ফাঁকে বন্দী থাকা নারীবাদ। তার একটি উল্লেখযোগ্য প্রমান হচ্ছে এই কবিতাটি। এরকমের আরো হাজার হাজার লেখা আছে আমাদের চারপাশে। কবিতাটির মর্মশাস এর সাথে কেউই দ্বিমত করবেন না, কেননা, আমরা কেউই ধর্ষণের মতো একটি আদিম ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, আক্রমন দেখতে চাইনা, আর একটিও না। কিন্তু কবিতাটিতে বাতলে দেয়া পথটি আগ্রহউদ্দীপক এবং এই পথটিই হচ্ছে নিও-লিবারাল দর্শন বা আধুনিক পুঁজিবাদের বাতলে দেয়া পথ। কিভাবে? বলছি -

(এটাই নিও লিবারালিজম এর সমাধান। একজন ক্ষুধার্ত মানুষের কোমরের বেল্ট টা টাইট করা দরকার, তার জন্যে খাদ্য নিশ্চয়তা দেয়া নয়।)

নিও-লিবারালিজম আমাদেরকে শেখায়, সমাজ বলে কিছু নেই, মানুষ বলে কিছু নেই, আছে কেবল ব্যক্তি, একক ব্যাক্তি; ব্যক্তিই সব। আর আছে বাজার এবং বাজার, “ফ্রি-মার্কেট”। বাজার আর ব্যক্তি ছাড়া আর কিছুই নেই দুনিয়াতে। ব্যক্তির দায়িত্ব তাই কেবলই ব্যক্তির। সমাজ নয়, রাষ্ট্র নয়, পাড়া-মহল্লা-প্রতিবেশী নয়, ব্যক্তিই হচ্ছে তাঁর নিজের সকল দায়িত্ব নেয়ার মালিক। নিও-লিবারালিজম বলে, সমাজ ভেঙ্গে দাও, ব্যক্তিকে মহান করে তোলো। সেজন্যেই, এই কবিতাটির মতো করেই আধুনিক পুঁজিবাদ আমাদের শেখায়, ধর্ষণের প্রতিরোধের সকল দায়িত্ব হচ্ছে কেবল আক্রান্ত ব্যক্তিটির। তাকেই দায়িত্ব তুলে নিতে হবে ধর্ষকের লিঙ্গ ও অণ্ডকোষ কেটে তার গলায় ঝুলিয়ে দেবার। প্রতিরোধের জন্যে সমাজ নয়, আইন নয়, সংস্কৃতি নয়, শিক্ষা নয়, পরিবার নয়, ব্যক্তিকেই নিতে হবে এই দায়িত্ব এবং তা হচ্ছে লিঙ্গ ও অন্ডকোষ কর্তনের মাধ্যমে। যুক্তিটা হচ্ছে, জগতের সকল ধর্ষকের লিঙ্গ ও অণ্ডকোষ যদি কেটে ফেলা যায়, তাহলে আর কোনো “ব্যক্তি” নারী ধর্ষিত হবেনা। সুতরাং ক্যারী অন। এটাই আমাদের নারীবাদ। যার অন্তর হচ্ছে আধুনিক পুঁজিবাদের “মহান” দর্শন নিও-লিবারালিজম।

১৫.
দাউদ হায়দার পিতৃতন্ত্রের বনেদী প্রতিনিধি আর আমাদের নারীবাদী অনলাইন তালেবর বুদ্ধিজীবিরা হচ্ছেন পিতৃতন্ত্রের প্রধান পাহারাদার নিও-লিবারালিজম এর মেধাবী সন্তান। এরা দুপক্ষই ধর্মের বিরুদ্ধে বলে – লিখে দেশান্তরিত হয়েছিলেন কিন্তু এরা কেউই পিতৃতন্ত্রের প্রধান পৃষ্ঠপোষক পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ান না, কর্পোরেটতন্ত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়ান না। বলুন তো এদের মাঝে মিল আর তফাৎটা ঠিক কোথায়? বলুন তো এদের মাঝে সংঘাতের বিষয়গুলো কতটুকু আদর্শিক আর কতটুকু ব্যক্তিগত – “নবীতান্ত্রিক”? উত্তর আপনাদের কাছেই চাচ্ছি।

১৬.
আজকের বাঙ্গালীর গতরে – মনে সর্বত্রই হচ্ছে মুৎসুদ্দি চরিত্র, কেরানী, মধ্যসত্ত্বভোগী। তাইতো নিও-লিবারাল হয়ে নিজের ব্যক্তি স্বাধীনতার বিষয়টি একশোভাগ বুঝে নিলেও অন্যের ব্যক্তিস্বাধীনতায়, লেখকের স্বাধীনতার, অন্যের মত প্রকাশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে দলবেঁধে খিস্তি করতে নেমে যায় এরা। লেখার অপরাধে অন্যের চরিত্র হননে নেমে যান দল বেঁধে। এই না হলে আর আদর্শ বাঙালী? সে যেখানেই থাকুন না কেনো, নিউইয়র্ক, ব্রাসেলস, প্যারিস কিম্বা বার্লিনে!

বাঙালীর মত প্রকাশের স্বাধীনতার ইতিহাসটি যেনো এই ছবিটির মতোই। ইতিহাসের সত্য হচ্ছে মত প্রকাশের স্বাধীনতা শুধু মৌলবাদীদের হাতেই খুন হয়নি, আত্মদাবীকৃত প্রগতিশীল, মুক্তমনাদের হাতেও খুন হয়েছে। আশার কথা হচ্ছে এখান থেকেই ভবিষ্যতের নতুন কলম তৈরী হবে।

১৭.
ভাই ও ভগ্নীসকল, আসুন একটু ভাবি, ভাবা প্র্যাকটিস করি।
আমিন।

Comments

আব্দুর রহিম রানা এর ছবি
 

"আমাদের নারীবাদ মূলত
পুঁজিবাদ ও নিও-লিবারাল দর্শনের
পাঁকে বন্দী থাকা নারীবাদ।"

"আমাদের নারীবাদী
অনলাইন তালেবর বুদ্ধিজীবিরা হচ্ছেন
পিতৃতন্ত্রের প্রধান পাহারাদার নিও-
লিবারালিজম এর মেধাবী সন্তান।
এঁরা দুপক্ষই ধর্মের বিরুদ্ধে বলে – লিখে
দেশান্তরিত হয়েছিলেন কিন্তু এঁরা
কেউই পিতৃতন্ত্রের প্রধান পৃষ্ঠপোষক
পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ান না,
কর্পোরেটতন্ত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়ান না।"

(এই দুটি কোটেশন এর সারমর্ম জানার জন্য বা বোঝার জন্য আমাদের দেশের তথাকথিত নারীবাদী ও উর্বর মস্তিষ্কওয়ালা মুক্তচিন্তকরা একটু ভাবুক। আর ন্যান্সী ফ্রসার দেখায় তথাকথিত এলিট শ্রেণীর ১% নারীবাদই যেন বারবার না কচলান সেই আশাই রাখি )

গোলাম সারওয়ার ভাই আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ, এর চাইতে বেশি কিছু বলার নেই । এবং ভাবছি, ভাবা
প্রাক্টিস করছি।

 
গোলাপ মাহমুদ এর ছবি
 

সময়টি ছিল ১৯৭৪ সালের দিকে। সদ্য স্বাধীন আমাদের বাংলাদেশ! আমাদের কলেজের বেশ কিছু ছাত্র কলেজ ক্যাম্পাসে মিছিল বের করেছেন, কবি দাউদ হায়দারের বিরুদ্ধে। তাঁর অপরাধ, তাঁর কবিতা, "জন্মই আমার আজন্ম পাপ!" এই ছাত্রদের কেহই কোন ইসলামী মৌলবাদী দলের সদস্য ছিলেন না। বহু বছর প্রবাসে কর্মজীবন কাটানোর পর দেশে এসে আবার সেই একই চিত্র প্রত্যক্ষ করলাম। ১৯৯৪ সাল। এবার লেখিকা ডাঃ তসলিমা নাসরিনের বিরুদ্ধে। আমি তখন ঢাকা শিশু হাসপাতালে কর্মরত। আমার সহকর্মী যারা ছিলেন, তাঁদের প্রায় সকলেই তসলিমা-কে দেশ ছাড়া করার স্ব-পক্ষে সোচ্চার! আমি ও কুষ্টিয়ার একজন ডাক্তার তাদের বিপক্ষে। আমাদের যুক্তি হলো, একজন মানুষের স্বাধীন মুক্ত মত প্রকাশের বিরুদ্ধে 'এ ধরনের উগ্রতা' কখনোই গ্রহণ যোগ্য হতে পারে না। ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ থেকে পাশা করা তসলিমার দুই ক্লাশ জুনিয়ার এক ডাক্তার সাহেব (তাঁর ভাষ্য মতে) আমাদের দু'জনের ওপর এতটাই ক্ষিপ্ত হয়েছিলেন যে সেই ঘটনার এত বছর পরেও ঘটনা-টি আমি স্পষ্ট মনে করতে পারি। এই ডাক্তার সাহেবদের কেহই কোন ইসলামী মৌলবাদী দলের সদস্য ছিলেন না।

"নবী-তান্ত্রিক" সংস্কৃতির লালন পালন অব্যাহত রেখে মৌলবাদ ও "পিতৃ-তান্ত্রিকতার" বিরুদ্ধে শ্লোগান হলো শুভঙ্করের ফাঁকি। মানুষের মুক্ত মত প্রকাশ ও চিন্তার স্বাধীনতাকে খর্ব করে আর যাইই করা যাক না কেন, নিজেকে 'সভ্য' বলে দাবী করা যায় না। @গোলাম সারওয়ার ভাই, আপনার এই লেখাটি অসাধারণ।

গোলাপ মাহমুদ

 

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

গোলাম সারওয়ার
গোলাম সারওয়ার এর ছবি
Offline
Last seen: 1 week 1 দিন ago
Joined: শনিবার, মার্চ 23, 2013 - 4:42পূর্বাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

কু ঝিক ঝিক

ফেসবুকে ইস্টিশন

SSL Certificate
কপিরাইট © ইস্টিশন.কম ® ২০১৬ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর