নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 3 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • বিকাশ দাস বাপ্পী
  • রসিক বাঙাল
  • এলিজা আকবর

নতুন যাত্রী

  • সাতাল
  • যাযাবর বুর্জোয়া
  • মিঠুন সিকদার শুভম
  • এম এম এইচ ভূঁইয়া
  • খাঁচা বন্দি পাখি
  • প্রসেনজিৎ কোনার
  • পৃথিবীর নাগরিক
  • এস এম এইচ রহমান
  • শুভম সরকার
  • আব্রাহাম তামিম

আপনি এখানে

ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়ন বিষয়ক আইন



যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণ কেবল অপরাধ নয়, এটি একটি ব্যাধি। এটি কেবল ব্যক্তি বিশেষের তথা অপরাধীর ব্যাধি নয়, পুরো সমাজেরই ব্যাধি। বর্তমানে পুরো বাংলাদেশে যেভাবে মহামারীর মত এই ব্যাধিটি ছড়িয়ে পড়েছে, তাতে এর আশু চিকিৎসা আবশ্যক হয়ে পড়েছে। এখান থেকে মুক্তির জন্যে তীব্রে সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক আন্দোলন দরকার। যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণ নিয়ে আইনী আলোচনা এই আন্দোলনের খুব ছোট একটি অংশ, কেননা এটি কেবল দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনের উপরে দৃষ্টি দেয়। কিন্তু দুষ্টের দুষ্ট হয়ে ওঠার মনস্তাত্ত্বিক তথা সামাজিক- সাংস্কৃতিক- রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট যেহেতু আইনের আওতাধীন নয়, সেহেতু সে দুষ্টের দমনের মাধ্যমে দৃষ্টান্ত তৈরি করে সমাজ থেকে অপরাধ নির্মূলের চেষ্টা করে। সে কারণেই কেবল যথাযথ আইন ও বিচার ব্যবস্থা দিয়েই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। কিন্তু আইনের মাঝেই যদি গলদ থাকে, বিচারে যদি ফাঁকি থাকে, তবে সাধারণ মানুষের যাওয়ার আর কোন জায়গাই থাকে না। সে জায়গা থেকেই আইন-আদালতের আলাপটাও খুব জরুরি। আলোচ্য লেখায় বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণ বিরোধী আইনগুলোর পর্যালোচনা করা হয়েছে, তা করতে গিয়ে অন্যান্য দেশের এ সংক্রান্ত কিছু আইনের সাহায্যও নেয়া হয়েছে।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন বনাম ‘দণ্ডবিধি’র ধারা ৩৭৫

বাংলাদেশে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়ন বিষয়ক আইন হচ্ছে প্রধানত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (২০০৩ এ সংশোধিত)। এছাড়া ধর্ষণ বিষয়ক বিধান আছে ১৮৬০ সালের ‘দণ্ডবিধি’র (Penal Code 1860) ৩৭৫ নম্বর ধারায়। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০ সর্বশেষ প্রণীত আইন বিধায় পূর্বতন এ সংক্রান্ত আইনের চাইতে এই আইনের ধারাসমূহ অগ্রাধিকার পাবে। তবে এই আইনের সংজ্ঞা নামক বিধানটিতে একটি অদ্ভুতুড়ে ব্যাপার রয়ে গেছে, যেখানে ধর্ষণের সংজ্ঞায় ‘দণ্ডবিধি’ ৩৭৫ কে স্মরণ করা হয়েছে! ‘দণ্ডবিধি’র ৩৭৫ ধারায় ধর্ষণের সংজ্ঞা হিসেবে ৫ টি বৈশিষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে, সেই সাথে একটি ব্যাখ্যা (ধর্ষণের ক্ষেত্রে যৌন সঙ্গমের ব্যাখ্যা) ও একটি ব্যতিক্রম (বিবাহিত নারীর ক্ষেত্রে এইজ অব কনসেন্টের ব্যতিক্রম) আছে। উল্টোদিকে তুলনামূলক নতুন করা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০ –এর ৯ নম্বর ধারায় শাস্তি সংক্রান্ত বিধান দিতে গিয়ে ধর্ষণের "ব্যাখ্যা" হিসেবে একটি পরিচ্ছেদ রাখা হয়েছে, সেখানে ‘দণ্ডবিধি’র ধর্ষণের ৫ টি বৈশিষ্টের জায়গায় ৪ টি বৈশিষ্ট পাওয়া। অনেকে ধর্ষণ সংক্রান্ত আইনি আলোচনায় ‘দণ্ডবিধি’কে উল্লেখ করেন, বাস্তবে তা ভুলভাবেই করেন। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ -কেই ‘দণ্ডবিধি’র ৩৭৫ ধারার উপরে অগ্রাধিকার দিতে হবে, কেননা এই আইনের ৩ নম্বর ধারায় (আইনের প্রাধান্য) বলা হয়েছেঃ “আপাততঃ বলবৎ অন্য কোন আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, এই আইনের বিধানাবলী কার্যকর থাকিবে”। ফলে, কেবলমাত্র যে জায়গায় এই আইনে কোন কিছু বলা হয়নি, কেবল সে জায়গাটিতে ‘দণ্ডবিধি’র ৩৭৫ ধারা অনুসরণ করা হবে। বাকিক্ষেত্রে, অর্থাৎ বিশেষ করে যেখানে ‘দণ্ডবিধি’র ধারা ৩৭৫ এবং শিশু ও নারী নির্যাতন দমন আইন-২০০০ বিপরীত বা ভিন্ন বিধান দেয়, সেক্ষেত্রে নতুন আইনের বিধান পুরাতন আইনের বিধানের উপরে প্রাধান্য পাবে। সে হিসাবে ৯ নম্বর ধারা অনুযায়ী ধর্ষণের ব্যাখ্যা দেখা যাকঃ “যদি কোন পুরুষ বিবাহ বন্ধন ব্যতীত ষোল বৎসরের অধিক বয়সের কোন নারীর সহিত তাহার সম্মতি ব্যতিরেকে বা ভীতি প্রদর্শন বা প্রতারণামূলকভাবে তাহার সম্মতি আদায় করিয়া,অথবা ষোল বৎসরের কম বয়সের কোন নারীর সহিত তাহার সম্মতিসহ বা সম্মতি ব্যতিরেকে যৌন সঙ্গম করেন,তাহা হইলে তিনি উক্ত নারীকে ধর্ষণ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবেন”। সুতরাং এই ব্যাখ্যানুযায়ী ধর্ষণ হিসেবে বিবেচিত হবেঃ

১/ বিবাহ বন্ধন ছাড়াই ১৬ বছরের উপরের কোন নারীর সাথে সম্মতি ছাড়া বা ইচ্ছার বিরুদ্ধে যৌন সঙ্গম করলে
২/ বিবাহ বন্ধন ছাড়াই ১৬ বছরের উপরের কোন নারীকে ভয় দেখিয়ে যৌন সঙ্গম করলে
৩/ বিবাহ বন্ধন ছাড়াই ১৬ বছরের উপরের কোন নারীর সাথে প্রতারণামুলকভাবে সম্মতি আদায় করে যৌন সঙ্গম করলে
৪/ ১৬ বছরের নীচের কোন নারীর সাথে তার সম্মতিতে বা সম্মতি ছাড়া যৌন সঙ্গম করলে

অপরদিকে ‘দণ্ডবিধি’র ৩৭৫ ধারায় বলা হচ্ছেঃ
যে ব্যক্তি নিম্নোক্ত ৫ প্রকার বর্ণনাধীন যেকোন অবস্থায় কোন নারীর সাথে যৌন সহবাস করে, সে ব্যক্তি “ধর্ষণ” করে বলিয়া গণ্য হবেঃ

  • প্রথমত, তাহার ইচ্ছার বিরুদ্ধে (Against her will)
  • দ্বিতীয়ত, তাহার সম্মতি ব্যতিরেকে (Without her consent)
  • তৃতীয়ত, তাহার সম্মতিক্রমে, যেক্ষেত্রে তাহাকে মৃত্যু বা আঘাতের ভয় দেখাইয়া তাহার সম্মতি আদায় করা হয় (With her consent, when her consent has been obtained by putting her in fear of death, or of hurt.)
  • চতুর্থত, তাহার সম্মতিক্রমে, যেক্ষেত্রে লোকটি জানে যে, সে তাহার স্বামী নহে, এবং সে (নারীটি) এই বিশ্বাসে সম্মতিদান করে যে, সে (পুরুষ) এমন কোন লোক যাহার সহিত সে আইনানুগতভাবে বিবাহিত অথবা সে নিজেকে তাহার সহিত আইনানুগতভাবে বিবাহিত বলিয়া বিশ্বাস করে (With her consent, when the man knows that he is not her husband, and that her consent is given because she believes that he is another man to whom she is or believes herself to be lawfully married)।
  • পঞ্চমত তাহার সম্মতি সহকারে বা ব্যতিরেকে, যেক্ষেত্রে সে চৌদ্দ বৎসরের কম বয়স্কা হয় (With or without her consent, when she is under fourteen years of age)

‘দণ্ডবিধি’র এই ৩৭৫ নম্বর ধারায় উল্লেখিত ৫ টি বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি যৌন সঙ্গমের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছেঃ “Penetration is sufficient to constitute the sexual intercourse necessary to the offence of rape” এবং একটি ব্যতিক্রমের কথা জানানো হয়েছে- “কোন পুরুষ কর্তৃক তাহার স্ত্রীর সাথে যৌন সহবাস, স্ত্রীর বয়স তের বৎসরের কম না হইলে, নারী ধর্ষণ বলিয়া গণ্য হইবে না” (“Sexual intercourse by a man with his own wife, the wife not being under thirteen years of age, is not rape”)।

পাশাপাশি খেয়াল করলে দেখা যাবে- ‘দণ্ডবিধি’ ৩৭৫ এর যে ৫ টি কারণ বলা হয়েছে- তার সাথে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯ নম্বর ধারায় উল্লেখিত ধর্ষণের সংজ্ঞার খুব বেশী পার্থক্য নেই। ‘দণ্ডবিধি’র বৈশিষ্ট্যের ১ ও ২ নম্বরে উল্লেখিত Against her will আর Without her consent বাস্তবে একই, সেটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০ এর ৯ নম্বর ধারায় "সম্মতি ব্যতিরেকে" দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়েছে। ‘দণ্ডবিধি’র বৈশিষ্ট্য ৩ এর putting her in fear of death, or of hurt-ও "ভীতি প্রদর্শন" দিয়ে প্রতিস্থাপিত হয়েছে, আর ‘দণ্ডবিধি’র বৈশিষ্ট্য ৪ এর একটি বিশেষ ধরণের প্রতারণাকে- সাধারণভাবে “প্রতারণামূলকভাবে সম্মতি আদায় করে” দিয়ে প্রতিস্থাপিত করার মাধ্যমে এই সংক্রান্ত ধর্ষণের সীমাকে বর্ধিত করা হয়েছে। ‘দণ্ডবিধি’র ৫ নম্বর বৈশিষ্ট্যে এইজ অব কনসেন্ট ১৪ বছর ছিল, যেটি ২০০০ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন করার সময়ে ১৪ বছরই ছিল, পরে ২০০৩ সালের সংশোধনীতে ১৬ বছর করা হয়েছে। আর ‘দণ্ডবিধি’তে উল্লেখিত ব্যতিক্রম (Sexual intercourse by a man with his own wife, the wife not being under thirteen years of age, is not rape.) সাধারণভাবে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনের মাধ্যমে রহিতকৃত। কেননা ১৮ বছরের কম বয়সী নারীর সাথে বিয়ে আমাদের আইনানুযায়ী অস্বীকৃত। যদিও,অধুনা বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনের বিশেষ বিধান ঐ ধারাটিকে ক্ষেত্র বিশেষে পুনরুজ্জীবন দেয়ার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে (অর্থাৎ বিশেষ বিধান অনুযায়ী ১৩-১৬ বছর বয়সী কোন নারীর সাথে বিয়ে হলে- তার সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপনে এখন আর কোন বাঁধা থাকছে না)।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ধর্ষণের সংজ্ঞায় ‘দণ্ডবিধি’কে নির্দেশ করার বিরোধিতা অনেকেই করেন, সংজ্ঞা অংশ থেকে ‘দণ্ডবিধি’র ৩৭৫ ধারাকে দূর করে ৯ নম্বর ধারার ব্যাখ্যা অংশটিকে নিয়ে আসার দাবিও অনেকেই করেন। এতে অহেতুক ভুল বোঝাবুঝির সম্ভাবনা কমে। অবশ্য ‘দণ্ডবিধি’র ঐ ধারায় নির্দেশিত “ব্যাখ্যা” অংশটুকু নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের কোথাও নেই। অর্থাৎ ধর্ষণে উল্লেখিত যৌন সঙ্গম (sexual intercourse) বলতে কি বোঝানো হচ্ছে, সে সম্পর্কিত কোন ব্যাখ্যা/ নির্দেশনা নতুন এই আইনের কোথাও নেই। এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিকে নতুন আইনে যুক্ত করতে না পারার কারণ কি? ‘দণ্ডবিধি’তে বলা হয়েছেঃ Penetration is sufficient to constitute the sexual intercourse necessary to the offence of rape। এরকম লাইন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে (বাংলায়) রাখতে সমস্যা কি ছিল? বেশিরভাগ দেশের আইনেই ধর্ষণের সংজ্ঞায় এই Penetration শব্দটি বহুল ব্যবহৃত। কিন্তু বাংলায় এর জন্যে যথোপযুক্ত প্রতিশব্দ খুঁজে পাওয়া ভার! এটিএম কামরুল ইসলাম এর “দণ্ডবিধি” নামের বইয়ে এই লাইনটির বাংলা করা হয়েছে এভাবেঃ “অনুপ্রবেশই নারী ধর্ষণের অপরাধরূপে গণ্য হইবার যোগ্য যৌন সহবাস অনুষ্ঠানের নিমিত্ত যথেষ্ট বিবেচিত হইবে”।

যাহোক, এই বিষয়টি কেমন গুরুত্বপূর্ণ সেটি বোঝানোর জন্যে অন্য আইনের কিছু উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। নেদারল্যাণ্ডে ২০১৩ সালের ১২ মার্চ তারিখে একটি রায়ে জানানো হলো, আইনে বর্ণিত sexual penetration এর আওতায় অসম্মতিতে জিহবা চুম্বন (Tongue kiss) বা ফ্রেঞ্চ কিস (French kiss) ধর্ষণ হিসেবে বিবেচিত হবে না (এর আগে বিবেচিত হতো)! জোর করে ফ্রঞ্চ কিস করলে সেটি যৌন নিপীড়ন হিসেবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হবে, কিন্তু সেটি ধর্ষণ নয় (নেদারল্যাণ্ডে ধর্ষণের শাস্তি সর্বোচ্চ ১২ বছর, আর যৌন নিপীড়নের শাস্তি ৮ বছর; ধর্ষণে মৃত্যু ঘটলে অবশ্য শাস্তি ১৮ বছরের কারাভোগ)। অর্থাৎ ঠিক কোন কাজটিকে ধর্ষণ বলা হচ্ছে সেটির ব্যাখ্যা বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।

যুক্তরাজ্যের যৌন অপরাধ বিষয়ক আইনের উদাহরণঃ
২০০৩ সালে যুক্তরাজ্য Sexual Offences Act 2003 নামে আলাদা একটি আইনই করে ফেলেছে। সেখানে ধর্ষণের সংজ্ঞার মাঝেই উল্লেখ করেছেঃ ধর্ষণ হবে যদি এক ব্যক্তি আরেক ব্যক্তির সম্মতি ছাড়াই “ইচ্ছাকৃতভাবে তার পুরুষাঙ্গ অপর ব্যক্তিটির যোনী, পায়ু বা মুখে প্রবেশ করায়” (“intentionally penetrates the vagina, anus or mouth of another person with his penis”)। এর শাস্তি যাবজ্জীবন কারাভোগ। ঠিক এর পরেই আরেকটি অপরাধের কথা বলা হয়েছে, সেটি ধর্ষণ নয়, সেটির নাম Assault by penetration। এই অপরাধটি তখন যখন এক ব্যক্তি আরেক ব্যক্তির সম্মতি ছাড়াই “ইচ্ছাকৃতভাবে তার শরীরের কোন অঙ্গ বা অন্য কিছু অপর ব্যক্তিটির যোনী বা পায়ুপথে প্রবেশ করায়” (“intentionally penetrates the vagina or anus of another person with a part of his body or anything else” এবং “the penetration is sexual”)। এই অপরাধের শাস্তিও অনুরূপ অর্থাৎ যাবজ্জীবন কারাভোগ। ভ্যাজাইনা পেনিট্রেশন বলতে কি বোঝাবে, সেটি সম্পর্কেও স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছেঃ “Vagina” includes vulva”। একইভাবে Sexual assault অপরাধের সংজ্ঞায় বলা হচ্ছেঃ যখন এক ব্যক্তি আরেক ব্যক্তির সম্মতি ছাড়াই উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে স্পর্শ করবে (he intentionally touches another person) এবং স্পর্শের ধরণ হবে যৌন আবেদনমূলক (“the touching is sexual”)। এই অপরাধের শাস্তি সর্বোচ্চ ১০ বছর, তবে এ ধরণের অপরাধের লঘুমাত্রার ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক সাজা হিসেবে ৬ মাসের জেল ও জরিমানাও মেজিস্ট্রেট করতে পারবে। এভাবে নানা ধরণের যৌন অপরাধের ব্যাপারে উল্লেখ আছে এই আইনে। ১৩ বছরের কম বয়সীর সাথে যৌন অপরাধের ক্ষেত্রে, সম্মতির কোন উল্লেখই নেই (যুক্তরাজ্যে এইজ অব কনসেন্ট ১৩ বছর)। একইভাবে পারিবারিক সদস্য, সামাজিক দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির ক্ষেত্রে বিধান কেমন হবে এরকম অনেক কিছু আছে। আমাদের আইনে যেমন বিবাহ বন্ধন একটি বিশেষ ব্যাপার, এখানে বিবাহ বন্ধন বলে কোন কিছুই নেই। ১৩ বছরের বেশি বয়সের কারো সাথে সম্মতি ছাড়া যৌন সঙ্গম আর ১৩ বছরের নীচে কারো সাথে সম্মতিতে বা অসম্মতিতে যৌন সঙ্গম হলেই সেটি ধর্ষণ, বৈবাহিক সম্পর্ক থাকুক বা না থাকুক। আবার আমাদের আইনে যেমন সম্মতির রকমফের দেখিয়ে চার-পাঁচটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হয়েছে, এখানে সম্মতির জন্যে আলাদা দুটি ধারাই (৭৫ ও ৭৬) রয়েছে। অসম্মতি বলতে বোঝানো হয়েছেঃ

“(2) The circumstances are that—
a) any person was, at the time of the relevant act or immediately before it began, using violence against the complainant or causing the complainant to fear that immediate violence would be used against him;
b) any person was, at the time of the relevant act or immediately before it began, causing the complainant to fear that violence was being used, or that immediate violence would be used, against another person;
c) the complainant was, and the defendant was not, unlawfully detained at the time of the relevant act;
d) the complainant was asleep or otherwise unconscious at the time of the relevant act;
e) because of the complainant’s physical disability, the complainant would not have been able at the time of the relevant act to communicate to the defendant whether the complainant consented;
f) any person had administered to or caused to be taken by the complainant, without the complainant’s consent, a substance which, having regard to when it was administered or taken, was capable of causing or enabling the complainant to be stupefied or overpowered at the time of the relevant act.”

ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের সাজাঃ
আমাদের আইনের সাজার ব্যাপারটি বেশ কড়া। যাকে বলে বজ্র আটুনি, ফস্কা গেরো! ধর্ষণের ব্যাখ্যায় বলা ধর্ষণ হলে (বিবাহ বন্ধন ছাড়া সম্মতি বাদে, ভয় দেখিয়ে, প্রতারণা করে এবং ১৬ বছরের নিচে হলে সম্মতিতে বা সম্মতি ছাড়া যৌন সঙ্গম করলে)- সবার শাস্তিই যাবজ্জীবন, ভিকটিম মারা গেলে শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন, দলগত ধর্ষণ হলে ও ভিকটিম মারা গেলে- দলগত ধর্ষণে অংশ নেয়া সকলের সাজা মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন। ধর্ষণের চেষ্টা করা হলে (ধর্ষণ না হয়ে থাকলে) সর্বোচ্চ ১০ বছর, সর্বনিম্ন ৫ বছরের সাজা। পুলিশী হেফাজতে ধর্ষণ হলে হেফাজতের দায়িত্বে থাকা প্রত্যেকের সর্বোচ্চ ১০ বছর, সর্বনিম্ন ৫ বছরের সাজা (ধর্ষকের সাজা যাবজ্জীবন)। ধর্ষণের চেষ্টা কিংবা পুলিশী হেফাজতে ধর্ষণের সাজার বিধান নিয়ে আপত্তি নেই, কিন্তু ধর্ষণ হিসেবে উল্লেখিত বাকি সবগুলো বৈশিষ্ট্যের জন্যে কেবল একটি সাজা (যাবজ্জীবন, মৃত্যু ঘটলে মৃত্যুদণ্ড) থাকা এবং আরো অন্যান্য নানা ঘটনা (কনসিকুয়েন্স) এর উল্লেখ না থাকা- বিষয়টিকে অনেক সময় লঘু করে দিতে পারে। যেমনঃ কিশোর-কিশোরির প্রেমের সম্পর্কের মাধ্যমে যৌন সম্পর্ক হলে এবং কিশোরীর বয়স ১৬ বছরের নিচে হলে আইনানুযায়ী এটিকে ধর্ষণ বলা যাবে, আবার একজন শিশুকে একজন বয়স্ক ব্যক্তি জোরপূর্বক যৌন সঙ্গমে লিপ্ত হলে সেটিও ধর্ষণ এবং আইন মোতাবেক উভয়ের সাজাই যাবজ্জীবন কারাভোগ! একইভাবে প্রতারণার মাধ্যমে যৌন সঙ্গমে লিপ্ত হওয়াও ধর্ষণ; কিন্তু প্রতারণা বিষয়টি তো বিস্তৃত। বিয়ের আশ্বাস দিয়ে সম্মতিতেই যৌন সঙ্গম করার পরে বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানানোও যেমন প্রতারণা, তেমনি একজন নারীর সামনে নকল বর সেজে যৌন সঙ্গমে লিপ্ত হওয়াও ধর্ষণ। এই সব ধর্ষণের ক্ষেত্রে অপরাধের মাত্রা এক হওয়া উচিৎ না হলেও আমাদের আইনে সবকিছুর জন্যে একটিই সাজা- যাবজ্জীবন কারাভোগ!

ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের হারঃ
আমাদের দেশে প্রকৃত অর্থে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের হার কেমন, সেটার কোন চিত্র আমাদের সামনে নেই। অনেক ধর্ষণ ঘটনার বীভৎসতার কারণেই আমাদের মিডিয়ায় এ সংক্রান্ত বেশ কিছু খবর সমাজে আলোড়ন তৈরি করতে পারে, কিন্তু অধিকাংশ ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের ঘটনায় আক্রান্তরা নীরবে- নিভৃতে চোখের পানির ফেলে সবকিছু আড়াল করে। সরকারী- বেসরকারী কোন জায়গা থেকেই সারাদেশের নারী ও শিশুদের ধর্ষিত ও যৌন-নিপীড়িত হওয়ার তথ্য সংগ্রহের কোন উদ্যোগ নেই, মাঝেমধ্যে কিছু এনজিও’র কিছু বিক্ষিপ্ত জরিপ কর্ম বাদে। ফলে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ধর্ষণ ও নারী নিপীড়নের জন্যে পত্রিকায় প্রকাশিত খবর, ধর্ষণ কেন্দ্রিক মামলা এবং ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে চিকিৎসা সহায়তা নিতে যাওয়া আক্রান্তদের সংখ্যা- এসব তথ্যের বাইরে অন্য কোন উপায় নেই। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী,গত পাঁচ বছরে দেশের বিভিন্ন থানায় ১৮ হাজার ৬৬৮টি ধর্ষণের মামলা হয়েছে। অর্থাৎ গড়ে বছরে প্রায় তিন হাজার সাতশ ধর্ষণের মামলা হয়েছে। কিন্তু ধর্ষণের ঘটনা যতখানি ঘটে, তার খুব অল্প সংখ্যকই মামলা করে। ২০০১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হয়ে চিকিৎসা সহায়তা নিতে আসেন ২২ হাজার ৩৮৬ জন নারী। তার মধ্যে মামলা হয় ৫০০৩ ঘটনায় (সূত্রঃ ধর্ষণ মামলায় হাজারে সাজা মাত্র ৪ জনের - ২৮ মে, ২০১৭, সমকাল)। অর্থাৎ (ঐকিক নিয়মে হিসাব করলে) প্রতি ৯ জনে চিকিৎসা সহায়তা নিতে আসা আক্রান্ত নারীর মধ্যে মাত্র ২ জন মামলা করেছে। ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে যেহেতু কাউন্সেলিং করা হয়- সেহেতু অনেকে মামলা করতে উদ্বুদ্ধ হয়, ফলে যারা এই সেন্টারে আসে না- তাদের মধ্যে মামলা করার হার আরো কম। তারপরেও উপরের হার (২ জন মামলা করলে আক্রান্ত নারীর সংখ্যা ৯) ধরে হিসেবে করলে বছরে ৩ হাজার সাতশ মামলার বিপরীতে প্রকৃত আক্রান্ত নারীর সংখ্যা কমপক্ষে হয় সাড়ে ১৬ হাজার। বলাই বাহুল্য এই সংখ্যা ধারণা প্রসূত এবং প্রকৃত চিত্র আরো অনেক বেশি। কেননা, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব ঘটনা চেপে যাওয়া হয়। কেননা জানাজানি হলে সমাজে ধর্ষিত নারীরই নানাভাবে নিগৃহীত হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়; অনেক সময়ে ধর্ষিত নারীর শারীরিকভাবে নিগৃহীত হওয়ার ঘটনা যেমন আছে, তারও চাইতে বড় ভয় হচ্ছে- সামাজিক অপমানের ভয়! বেশিরভাগ বাবা-মা ভয় পায় যে, এই লজ্জার কথা জানাজানি হয়ে গেলে মেয়ের বিয়ে হবে না; ফলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পারিবারিকভাবেই এই ‘লজ্জা’র কথা গোপন রাখার আয়োজন সম্পন্ন হয়। অনেক সময় মেয়েটিকেই দায়ী করে পারিবারিকভাবে তার উপরে মানসিক- শারীরিক নির্যাতন চালানো হতে পারে, এই ভয়ে দেখা যায় যে আক্রান্ত এমনকি নিজ পরিবারের কাছেও এটি প্রকাশ করতে পারছে না। ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়নের এর পরিসংখ্যান পৃথিবীর অনেক দেশেই কেবল সংবাদ মাধ্যমে থেকে বা পুলিশ রিপোর্টের উপর ভিত্তি তৈরী করা হয় না! যেমন নেদারল্যাণ্ডে প্রতি ৩ বছর পর পর সরকারী অর্থায়নে ১৫ বছর ও তার উপরের বয়সী নারীদের মধ্যে জরিপ চালায় Rutgers WPF নামে সেক্সুয়ালিটি এক্সপার্টিজ কেন্দ্র বা সংগঠন। যেখানে নারীরা নির্ভয়ে- নিজেদের পরিচয় গোপন রেখেই তাদের উপর যৌন আক্রমণের বিবরণ- তথ্য দেয়। সুতরাং- যারাও বা চেপে যায়- তাদেরও একটা বড় অংশের তথ্যও এইসব জরিপের মাধ্যমে উঠে আসে। আমাদের মত দেশে এমন উদ্যোগ খুব জরুরি এবং আইনেও এরকম বাধ্যবাধকতা থাকা দরকার। (সূত্রঃ www.womenlobby.org/IMG/pdf/2714_netherlands_lr.pdf)

ধর্ষণ/ যৌন নিপীড়ন বিষয়ক আইনে লিঙ্গ বৈষম্য
ধর্ষণের বহুল প্রচলিত ও ব্যবহৃত সংজ্ঞা ও অর্থ মোতাবেক আমরা এমনটা ভেবে অভ্যস্থ যে- ধর্ষণ কর্মটি ঘটায় পুরুষ এবং যার উপরে এটি ঘটানো হয়- সে হচ্ছে নারী। এই প্রচলিত ধারণার একদম সম্পূর্ণ বিপরীতটি সম্ভব কি না- অর্থাৎ একজন নারী কি পুরুষকে ধর্ষণ করতে পারে? প্রশ্নটিকে আমরা একটু ভেঙ্গে ভেঙ্গে দেখতে চাই। অর্থাৎ ধর্ষিত হিসেবে নারীর জায়গায় পুরুষ এবং ধর্ষক হিসেবে পুরুষের জায়গায় নারী- হতে পারে কি? সেক্ষেত্রে, প্রশ্নগুলো হবেঃ

১/ একজন পুরুষ কি আরেক পুরুষকে ধর্ষণ করতে পারে?
২/ একজন নারী কি আরেক নারীকে ধর্ষণ করতে পারে?
৩/ একজন নারী কি কোন পুরুষকে ধর্ষণ করতে পারে?

মূল প্রশ্ন, অর্থাৎ ৩ নাম্বার প্রশ্নটি থেকেই শুরুর আলোচনায় প্রবেশ করা যাক। নারী কি পুরুষকে ধর্ষণ করতে পারে? হুমায়ুন আজাদ তার নারী গ্রন্থে "ধর্ষণ" শীর্ষক প্রবন্ধের শুরুতেই জানিয়েছেনঃ "নারীর উপর পুরুষের বলপ্রয়োগের চরম রূপ ধর্ষণ, যাতে পুরুষ নারীর সম্মতি ছাড়া তার সাথে সঙ্গমে লিপ্ত হয়। ; ধর্ষণ একান্ত পুরুষের কর্ম; নারীর পক্ষে পুরুষকে খুন করা সম্ভব, কিন্তু ধর্ষণ করা সম্ভব নয়। পুরুষের দেহসংগঠন এমন যে পুরুষ সম্মত আর শক্ত না হলে নারী তার সাথে শারীরিক সম্পর্ক পাতাতে পারে না; কিন্তু উত্তেজিত পুরুষ যেকোনো সময় নারীকে তার শিকারে পরিণত করতে পারে"। এখানে ধর্ষণের সংজ্ঞায় যেমন জানানো হয়েছে, “নারীর সম্মতি ছাড়া তার সাথে পুরুষের বলপূর্বক যৌন সঙ্গম হচ্ছে ধর্ষণ” (অর্থাৎ- নারী ধর্ষিত, পুরুষ ধর্ষক), তেমনি আলাদাভাবে উল্লেখও করা হয়েছে, নারীর পক্ষে ধর্ষণ করা সম্ভব নয়- এটি একান্তই পুরুষের কাজ (অনেক পুরুষ মনে করেন- পুরুষালী), কেননা পুরুষ সম্মত না হওয়া পর্যন্ত তথা তার যৌনাঙ্গ শক্ত না হওয়া পর্যন্ত নারীর পক্ষে এই যৌন সঙ্গম সংঘটন সম্ভবই না। অর্থাৎ ধর্ষকের রূপে কেবল পুরুষকে আমরা পাচ্ছি, নারীকে নই। যদিও এই শারীরবৃত্তীয় ব্যাখ্যায় এটা বলা যাবে না যে, কেবল নারীই ধর্ষিত হতে পারে, কিন্তু পুরুষকে কখনোই ধর্ষণ করা সম্ভব নয়। কেননা, একজন উত্তেজিত পুরুষ যে প্রকারে অসম্মত নারীকে বলপ্রয়োগ করতে পারে, তেমনি অসম্মত পুরুষের উপরেও বলপ্রয়োগ করতে পারে বৈকি।

আরেকটি বিষয় এখানে গুরুত্বপূর্ণ- আমাদের সমাজে ধর্ষণ বিষয়টি ভয়ানক, কেননা সেটি ধর্ষিতকে কলংকিত করে, প্রচলিত ভাষায় ধর্ষিতের "সম্ভমহানি" ঘটে। এবং এই কলংকিত হওয়ার বা সম্ভমহানির ব্যাপারটি কেবলমাত্র নারীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য সুতরাং নারীর ক্ষেত্রেও এই বাঁধাটি ভাঙ্গা খুবই জরুরি যে, ধর্ষণ আদতে ধর্ষিত’র জন্যে কলংকজনক কিছু নয়, তার সম্ভ্রমহানি বা সম্মানহানির এখানে কিছু নেই- এখানে যা কলংক বা সম্মানহানি-সম্ভ্রমহানি সব ধর্ষকের জন্যে প্রযোজ্য। ধর্ষণকে কেন্দ্র করে নারীর সম্মান নষ্ট হওয়ার ধারণার সাথে কেবল ধর্ষণ নয়, বিবাহ বহির্ভূত যৌনক্রিয়ায় অংশ নেয়া যুক্ত। আমাদের দেশে সে কারণে দেখবেন- বিবাহিত স্ত্রীকে স্বামী ধর্ষণ করলে স্ত্রী'র সম্মান যায় না, কিংবা ধর্ষণের পরে যেকোন ধর্ষিত'র সম্মান ফিরে পাওয়ার উপায় হয়ে দাঁড়ায় ধর্ষণকারীকে বিয়ে করা। বিবাহিত স্ত্রীর অসম্মতিতে জোর করে যৌন সঙ্গম অবশ্য আমাদের দেশের আইনে ধর্ষণ হিসেবেই বিবেচিত নয়, তবে ১৬ বছরের (‘দণ্ডবিধি’ অনুযায়ী ১৩ বছরের) নিচের বিবাহিত শিশুর সাথে যৌন সম্পর্ক ধর্ষণ বলে গণ্য হবে। এরকম ক্ষেত্রেও ধর্ষক স্বামিকে অনেক সময় পাষণ্ড বলা হতে পারে, কিন্তু শিশুর মান-সম্মান-সম্ভ্রম এসব হারানো কোন ভয় নেই- কেননা ঐ কর্মটি তো তার "স্বামি"দেবতাই করেছে। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে- নারীর সম্ভ্রমহানির সাথে মূল যোগাযোগ বিবাহ নামক সম্পর্কের, বিবাহের মাধ্যমে পুরুষের "কুমারি" বা "ভার্জিন" নারীকে পাওয়ার আকাঙ্খার, নিজ স্ত্রীকে পরপুরুষের স্পর্শহীন অবস্থায় পাওয়ার আকাঙ্খার (অসূর্যস্পশ্যা নারীকে পাওয়ার আকাঙ্খা থেকে নারীকে অন্তঃপুরে বন্দী করা, পর্দায় আবদ্ধ করা এসব চলের শুরু)। সুতরাং ধর্ষণকেন্দ্রিক সম্ভ্রমহানির ধারণা ভাঙ্গতে গেলে এসব ধারণাও ভাঙ্গা খুব জরুরি এবং সে জায়গা থেকে নারীর যৌন আকাঙ্খা, নারীর যৌন অভিজ্ঞতা, নারীর যৌন চাহিদা- এসবের আলোচনাও প্রকাশ্যে আসা জরুরি।

বাংলাদেশের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ এর ৯ নম্বর ধারা অনুযায়ী ধর্ষণের সংজ্ঞা/ ব্যাখ্যা থেকে দেখা যায়, কেবলমাত্র পুরুষ ধর্ষণ করতে পারে এবং কেবলমাত্র নারীর সাথে এই অপরাধটি সংঘটিত হতে পারে। একইভাবে ‘দণ্ডবিধি’র ৩৭৫ ধারা অনুযায়ী "A man is said to commit "rape" who except in the case hereinafter excepted, has sexual intercourse with a woman under circumstances falling under any of the five following descriptions"- এখানেও man বা পুরুষই ধর্ষণ অপরাধটি সংঘটন করে এবং woman বা নারীর সাথে এটি ঘটতে পারে। ফলে, আমাদের আইন অনুযায়ী উপরে উল্লিখিত তিনটি প্রশ্নের জবাবই হচ্ছে না বোধক। অর্থাৎ পুরুষ পুরুষকে, নারী নারীকে কিংবা নারী পুরুষকে ধর্ষণ করতে পারে না। সে জায়গা থেকে বিভিন্ন সময়ে বাচ্চা ছেলেদের উপরে নানারকম নির্যাতনের যে ঘটনাগুলো ঘটে, সেসবও আইনত ধর্ষণ হিসেবে গণ্য হচ্ছে না। তখন প্রশ্নটি আসে, তাহলে সেটি কি যৌন নিপীড়নের অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে? সেটি দেখতে গেলে প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন তিনটি হচ্ছেঃ

১/ একজন পুরুষ কি আরেক পুরুষকে যৌন নিপীড়ন করতে পারে?
২/ একজন নারী কি আরেক নারীকে যৌন নিপীড়ন করতে পারে?
৩/ একজন নারী কি কোন পুরুষকে যৌন নিপীড়ন করতে পারে?

এ প্রশ্ন তিনটির ব্যাপারে আমাদের প্রচলিত আইন কি বলে? বিভিন্ন ক্ষেত্রে কিশোর-বালকরা যে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়, তাদের সুরক্ষার জন্যে কোন আইন প্রযোজ্য? শুনতে যেমনই লাগুক, এ সম্পর্কিত সুনির্দিষ্ট আইন খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন। নারীর উপর যৌন নির্যাতন সংক্রান্ত বিধান ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০’ এ অন্তর্ভূক্ত, কিন্তু পুরুষের উপর যৌন নির্যাতন বিষয়ক আলাদা কোন আইন নেই। ধর্ষণের সংজ্ঞায় "ষোল বৎসরের কম বয়সের কোন নারী" এর স্থলে "ষোল বৎসরের কম বয়সের কোন শিশু" উল্লেখ করলেও কিন্তু অন্তত ছেলে শিশুদের উপরে সংঘটিত যৌন সঙ্গম ধর্ষণের অপরাধ হিসেবে গণ্য হত, যেমনটি ১০ নম্বর ধারায় কেবল নারী না উল্লেখ করে ‘নারী বা শিশু’র কথা উল্লেখ থাকায় ছেলে শিশুর উপর সংঘটিত যৌন নিপীড়নও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। ফলে, বিষয়টি দাঁড়াচ্ছে, ছেলে শিশুর সাথে বল পূর্বক বা সম্মতি ছাড়া যৌন সঙ্গম করলেও সেটি যৌন নিপীড়ন হিসেবে গণ্য হবে, যার শাস্তি সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাভোগ।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে যৌন নিপীড়ন সংক্রান্ত ধারাটি হচ্ছে ১০ নম্বর ধারাঃ “যদি কোন ব্যক্তি অবৈধভাবে তাহার যৌন কামনা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে তাহার শরীরের যে কোন অঙ্গ বা কোন বস্তু দ্বারা কোন নারী বা শিশুর যৌন অঙ্গ বা অন্য কোন অঙ্গ স্পর্শ করেন বা কোন নারীর শ্লীলতাহানি করেন তাহা হইলে তাহার এই কাজ হইবে যৌন পীড়ন এবং তজ্জন্য উক্ত ব্যক্তি অনধিক দশ বত্সর কিন্তু অন্যুন তিন বত্সর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হইবেন”। এই ধারা অনুযায়ী আমরা দেখতে পারছি যে, যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন- নারী বা শিশু, কিন্তু যৌন নিপীড়কের লিঙ্গ এখানে বলা নেই, বলা হয়েছে “কোন ব্যক্তি”। অর্থাৎ যৌন নিপীড়ক যেমন হতে পারে একজন পুরুষ, তেমনি হতে পারে একজন নারী। আবার ২ (ট) নম্বর ধারার “শিশু”র সংজ্ঞায় আমরা দেখিঃ “শিশু অর্থ অনধিক ষোল বৎসর বয়সের কোন ব্যক্তি”। ফলে, এ পর্যন্ত আলোচনায় আমরা দেখতে পারি যে, আমাদের আইনানুযায়ীঃ

১/ পুরুষ ১৬ বছরের কম বয়সের পুরুষকে যৌন নিপীড়ন করতে পারে।
২/ নারী নারীকে যৌন নিপীড়ন করতে পারে।
৩/ নারী ১৬ বছরের কম বয়সের পুরুষকে (শিশুকে) যৌন নিপীড়ন করতে পারে।

এখন তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে,১৬ বছরের উপরের কোন পুরুষকে কি যৌন নিপীড়ন করা সম্ভব? অপর কোন পুরুষ, কিংবা নারীর দ্বারা? দুঃখের বিষয় হচ্ছে আমাদের আইনে এমন কোন বিধান খুঁজে পাইনি। কেবল ‘দণ্ডবিধি’র ৩৭৭ ধারায় প্রকৃতি বিরুদ্ধ যৌন সঙ্গমকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলা হয়েছে, যেখানে জোর করে বা সম্মতি ছাড়া এমন কোন বিষয়ের উল্লেখ নেই। ৩৭৭ নম্বর ধারাটি দেখিঃ “ যে ব্যক্তি স্বেচ্ছাকৃতভাবে কোন পুরুষ, নারী বা জন্তুর সহিত প্রাকৃতিক নিয়মের বিরুদ্ধে যৌন সহবাস করে, সে ব্যক্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে বা যেকোন বর্ণনার কারাদণ্ডে, যাহার মেয়াদ দশ বৎসর পর্যন্ত হইতে পারে, দণ্ডিত হইবে এবং অদুপরি জরিমানা দণ্ডেও দণ্ডনীয় হইবে” (“Whoever voluntarily has carnal intercourse against the order of nature with any man, woman or animal, shall be punished with imprisonment for life, or with imprisonment of either description for a term which may extend to ten years, and shall also be liable to fine. Explanation. Penetration is sufficient to constitute the carnal intercourse necessary to the offence described in this section”)। এ বিধানটি হচ্ছে আমাদের ‘দণ্ডবিধি’র সেই কুখ্যাত ধারা যার মাধ্যমে সমকামিতাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে দেখানো হয়েছে। এখানে উল্লেখ্য যে, এই ধারা মোতাবেক পুরুষের সাথে পুরুষের বা নারীর সাথে নারীর যৌন সঙ্গম (যদিও যৌন সঙ্গম হওয়ার জন্যে যে পেনিট্রেশন দরকার,সেটি নারী দ্বারা সংঘটিত হবে কিভাবে তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা এখানে নেই) শাস্তিযোগ্য অপরাধ,যার সাজা যাবজ্জীবন কিংবা দশ বছরের কারাভোগ। তার মানে দাঁড়াচ্ছে,আমাদের দেশের আইনে ধর্ষণ যে মাপের অপরাধ,সমকামিতাও একই মাপের শাস্তিযোগ্য অপরাধ! কোন পুরুষের সাথে বল পূর্বক, সম্মতি ছাড়া যৌন সঙ্গম করা হলে,যেহেতু আর কোন আইন নেই- সেহেতু এই ৩৭৭ ধারা মোতাবেক মামলা করা যায়। তবে, এখানে একটি বিপদ আছে। আসামীপক্ষ যদি প্রমাণ করতে পারে যে,এই যৌন ক্রিয়ায় ভিকটিমেরও সম্মতি ছিল (যেটি যেকোন ধর্ষণের মামলায় আসামীপক্ষ প্রমাণ করার চেষ্টা করে), তবে উভয়েই সাজা পেয়ে যেতে পারে। আরেকটি ব্যাপার এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে। আমাদের কোন আইনেই হিজড়াদের ব্যাপারে কোন সুরক্ষা নেই, অথচ হিজড়ারাও ভয়ানকভাবে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের শিকার।

অতএব,যৌন অপরাধ সংক্রান্ত আমাদের আইন সমূহের একটা বড় ত্রুটি হচ্ছে- এখানে সব ধরণের অপরাধকে আমলে নেয়া হয়নি,লিঙ্গ নির্বিশেষ সকলের সমান সুরক্ষার ব্যবস্থা রাখা হয়নি। আমি মনে করি,যৌন অপরাধসমূহের জন্যে সম্পূর্ণ আলাদা একটি আইন দরকার। ‘দণ্ডবিধি’র এ সংক্রান্ত যাবতীয় ধারাগুলোকে বাতিল করে এবং ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০’ এর যৌন অপরাধ সংক্রান্ত ধারাগুলোকে সেখান থেকে বের করে নিয়ে এসে এই স্বতন্ত্র আইনে যুক্ত করেই “যৌন অপরাধ দমন আইন” করা উচিৎ। উদাহরণ হিসেবে যুক্তরাজ্যের ২০০৩ সালের একটি আইনের (Sexual Offences Act 2003) দিকে দৃষ্টি দেয়া যেতে পারে। এই আইনের সূচির দিকে তাকালেও বোঝা যাবে, যৌন অপরাধের যাবতীয় প্রকরণকে এই আইনে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। Rape (১ টি ধারা), Assault (দুটি ধারাঃ Assault by penetration এবং Sexual assault), Causing sexual activity without consent (১ টি ধারা), Rape and other offences against children under 13 (৪টি ধারা), Child sex offences (৭ টি ধারা), Abuse of position of trust (৯ টি ধারা), milial child sex offences (৫ টি ধারা), Offences against persons with a mental disorder impeding choice (৪ টি ধারা), Inducements etc. to persons with a mental disorder (৪ টি ধারা), Care workers for persons with a mental disorder (৭ টি ধারা), Indecent photographs of children (২ টি ধারা), Abuse of children through prostitution and pornography (৫ টি ধারা), Exploitation of prostitution (৫ টি ধারা), Trafficking (৭ টি ধারা), Sex with an adult relative (২ টি ধারা), Other offences (৬ টি ধারা, যার মধ্যে আছে- Exposure, Voyeurism, Voyeurism: interpretation, Intercourse with an animal, Sexual penetration of a corpse, Sexual activity in a public lavatory)। একই সাথে আরেকটি ব্যাপার খুব গুরুত্বপূর্ণ, এই আইনে ধারাগুলোর বর্ণনায় অপরাধী কিংবা ভিকটিম কারোরই কোন লিঙ্গ কিংবা বৈবাহিক অবস্থার সরাসরি কোন বিবরণ নেই। অর্থাৎ যৌন অপরাধ নারী-পুরুষ যেকেউই যেমন করতে পারে, এই অপরাধ নারী ও পুরুষ কিংবা তৃতীয় লিঙ্গ- যে কারোর উপরেই সংঘটিত হতে পারে। বর্তমান প্রবন্ধে এই আইনটির ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ কম, সংক্ষেপে ধর্ষণ এবং নিপীড়ন সংক্রান্ত তিনটি ধারা নিয়ে আলোচনা করছি।

ধর্ষণের সংজ্ঞায় বলা হচ্ছেঃ
“A person ( A ) commits an offence if—
a) he intentionally penetrates the vagina, anus or mouth of another person (B) with his penis,
b) B does not consent to the penetration, and
c) A does not reasonably believe that B consents.”

এখানে দেখাই যাচ্ছে, ধর্ষক হওয়ার জন্যে পুরুষাঙ্গ থাকতে হবে। সে হিসেবে এই আইনে নারীর পক্ষে ধর্ষক হওয়া সম্ভব নয়, তবে সম্মতি ছাড়া পুরুষাঙ্গ অন্য কারো যোনী,পায়ু কিংবা মুখে প্রবেশ করালে যেহেতু ধর্ষণ হবে এবং পায়ু ও মুখ নারী ও পুরুষ উভয়েরই আছে, সেহেতু নারী বা পুরুষ, কিংবা তৃতীয় লিঙ্গও এই আইনে সুরক্ষা পাচ্ছে। এই অপরাধের সাজা হচ্ছে যাবজ্জীবন কারাভোগ, অর্থাৎ এই আইনানুসারে ধর্ষণ সর্বোচ্চ অপরাধ হিসেবে গণ্য। এখানে একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য, সংজ্ঞা অনুযায়ী ধর্ষণ অপরাধটি কেবল পুরুষ করতে পারলেও সংজ্ঞার কোথাও পুরুষ উল্লেখ না করে একজন ব্যক্তি (A person) উল্লেখ করা হয়েছে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই আইনে কেবল পুরুষ ধর্ষক হচ্ছে, কিন্তু নারীও কি অনুরূপ কোন অপরাধ সংঘটিত করতে পারে না? সেটি বুঝতে গেলে ২ ও ৩ নাম্বার ধারা দুটোর দিকে দৃষ্টি দেয়া যেতে পারে।
“2 Assault by penetration
(1) A person ( A ) commits an offence if—
a) he intentionally penetrates the vagina or anus of another person (B) with a part of his body or anything else,
b) the penetration is sexual,
c) B does not consent to the penetration, and
d) A does not reasonably believe that B consents. ;

3 Sexual assault
(1) A person ( A ) commits an offence if—
a) he intentionally touches another person (B),
b) the touching is sexual,
c) B does not consent to the touching, and
d) A does not reasonably believe that B consents.;”

অর্থাৎ এই আইনে নিপীড়ন দুই প্রকার। পেনিট্রেশন সংক্রান্ত নিপীড়ন এবং যৌন নিপীড়ন। কারো যোনী, পায়ু বা মুখে সম্মতি ছাড়া পুরুষাঙ্গ প্রবেশ করালে সেটি ধর্ষণ, আর কারো যোনী বা পায়ুপথে যৌন উদ্দেশ্যে (ডাক্তারি কিংবা অন্য উদ্দেশ্যে নয়) সম্মতি ছাড়া শরীরের অন্য অঙ্গ (যেমন হাত বা পায়ের আঙ্গুল, জিহবা) কিংবা অন্য কিছু (যেমন সেক্স টয় বা কলম, কাঠি বা অন্য কিছু) প্রবেশ করালে, সেটি ধর্ষণ হবে না ঠিকই, কিন্তু সেটিও “Assault by penetration” অপরাধ হবে। এই অপরাধের সাজাও হচ্ছে যাবজ্জীবন কারাভোগ, অর্থাৎ এটিও ধর্ষণের সম পর্যায়ের অপরাধ। বোঝাই যাচ্ছে, এই অপরাধের ক্ষেত্রে যেহেতু অপরাধীর ‘পুরুষাঙ্গ’ থাকা আবশ্যক নয় সেহেতু নারী ও পুরুষ নির্বিশেষেই এই অপরাধটি ঘটাতে পারবে। ৩ নাম্বার ধারায় যৌন নিপীড়ন সম্পর্কে বলা হয়েছে, যৌন উদ্দেশ্যে এক ব্যক্তি আরের ব্যক্তির শরীরে সম্মতি ছাড়া স্পর্শ করলেই সেটি যৌন নিপীড়ন হবে। এর সাজার ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক সাজার একটি ব্যবস্থা আছে, যেখানে ছোট অপরাধের ক্ষেত্রে ম্যাজেস্ট্রিট তাৎক্ষণিকভাবে সাজা দিতে পারবেন, যার পরিমাণ সর্বোচ্চ ৬ মাসের কারাভোগ ও জরিমানা। বড় অপরাধের ক্ষেত্রে (সেটি আদালতে সাক্ষী, প্রমান ও বিচার সাপেক্ষ) সর্বোচ্চ সাজা হচ্ছে দশ বছর। বলাই বাহুল্য, এই অপরাধ পুরুষ নারীর উপরে, পুরুষ পুরুষের উপরে, নারী পুরুষের উপরে কিংবা নারী নারীর উপরে সংঘটিত করতে পারে।

এইজ অব কনসেন্ট (Age of consent) ও ধর্ষণ
ধর্ষণ কিংবা যৌন নির্যাতন বিষয়ক আইনে এইজ অব কনসেন্ট (Age of consent) একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যেহেতু ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়নের সংজ্ঞায় অসম্মতিতে তথা জোরপূর্বক যৌন সঙ্গম, যৌন স্পর্শ প্রভৃতি ক্রিয়া সংঘটিত করার বিষয়টি রয়েছে, সেহেতু উল্টোদিক দিয়ে বলা যায়, কারো সাথে তার সম্মতিতে তথা স্বেচ্ছায় যৌন সম্পর্ক স্থাপন করলে সেটি ধর্ষণ/ যৌন নিপীড়ন হবে না। এরকম ক্ষেত্রেই সম্মতি প্রদানের সক্ষমতা বা সামর্থ্যের প্রসঙ্গটি চলে আসে এবং ব্যতিক্রম হিসেবে কিংবা সম্মতি’র ব্যাখ্যায় বিভিন্ন দেশের আইনে সম্মতি’র সীমারেখা বিবৃত হয়েছে। যেমন আমাদের আইনে “প্রতারণা” পূর্বক সম্মতি আদায় করে যৌন সঙ্গম করলেও সেটি ধর্ষণ হবে, এ অনুযায়ী বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে যৌন সম্পর্ক করার পরে সম্পর্ক ভেঙ্গে গেলেও অনেকে ধর্ষণের মামলা করে বসে। বিভিন্ন দেশের আইনে, অপ্রকৃতিস্থ ব্যক্তি, ঘুমে থাকা, অচেতন, ড্রাগ দেয়া ব্যক্তিকে, সামাজিক দেখভালের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির সাথেও যৌন সম্পর্ক স্থাপনকে “অসম্মতি” হিসেবে বলা হয়েছে। একইভাবে, সমস্ত আইনেই একটি নির্দিষ্ট বয়সের নিচের শিশুদের সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে সম্মতিকে অসম্মতি হিসেবে ধরা হয়। এই বয়সটিই হচ্ছে এইজ অব কনসেন্ট।

Age of consent এর সরাসরি বাংলা 'সম্মতি দেয়ার বয়স' হলেও আসলে কিন্তু সেটি দিয়ে যেকোন কিছুতে সম্মতি দেয়ার বয়স বোঝায় না। এটি একটি আইনি ভাষা যার অর্থ হচ্ছেঃ “এইজ অব কনসেন্ট বলতে কোন ব্যক্তির সেই ন্যূনতম বয়স যার ফলে সেই ব্যক্তির সাথে অন্য ব্যক্তি সুনির্দিষ্ট যৌনকর্মে লিপ্ত হওয়ার অনুমতি লাভ করে। যদিও অনেক সময় একে এভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয় যে, এইজ অব কনসেন্ট বলতে সেই ন্যূনতম বয়স বোঝায় যখন কোন ব্যক্তি অন্য কারো সাথে যৌনকর্মে অংশগ্রহণ করার ব্যাপারে সম্মতি প্রদানে সক্ষম বলে ধরা হয়। এইজ অব কনসেন্ট সম্পর্কিত আইনের উল্লেখযোগ্য অংশ হচ্ছেঃ এই ন্যূনতম বয়সের চাইতে কম যার তাকে তাকে আক্রান্ত এবং তার সাথে যৌনকর্মে অংশ নেয়া ব্যক্তিকে অপরাধী হিসেবে গণ্য করা হবে”। (“The age of consent is the minimum age of a person with whom another person is permitted to engage in certain sexual activities, though it sometimes is defined as the age at which a person is considered to be legally competent to consent to sexual acts, and is thus the minimum age of a person with whom another person is legally permitted to engage in sexual activity. The distinguishing aspect of the age of consent laws is that the person below the minimum age is regarded as the victim, and their sex partner as the offender”: Sexuality Now, Embracing Diversity by Janell L Carroll)। ফলে আইনে সরাসরি Age of consent লেখা থাকুক আর না থাকুক, যে জায়গাটিতে নির্দিষ্ট বয়সের নিচে যৌনসম্পর্কের সম্মতি দিলেও সেটাকে ধর্ষণ হিসেবে গণ্য করা হবে. সেই জায়গাটিকেই “এইজ অব কনসেন্ট” নির্দেশ করার আইন বলা হয় এবং যে বয়সের নিচে যৌন সম্পর্কের সম্মতি দিলেও ধর্ষণ হিসেবে গণ্য করা হয়- সেই বয়সকে Age of consent বলা হয়। একেক দেশের আইনে এইজ অব কনসেন্ট একেকরকম। আমাদের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ এর ৯ নম্বর ধারার ধর্ষণের সংজ্ঞায় বলা হয়ঃ "ষোল বৎসরের কম বয়সের কোন নারীর সহিত তাহার সম্মতিসহ বা সম্মতি ব্যতিরেকে যৌন সঙ্গম করেন"- সেটার মানেই হচ্ছে- এই আইন অনুসারে বাংলাদেশে Age of consent হচ্ছে ১৬ বছর। যুক্তরাজ্যের Sexual Offences Act 2003 এর ১ ও ৫ নম্বর ধারায় যথাক্রমে ‘ধর্ষণ’ (Rape) এবং ‘১৩ বছরের কম বয়সী শিশুর ধর্ষণ’ (Rape of a child under 13) এর সংজ্ঞায় সব কিছু হুবহু একই, কেবল ১ নম্বর ধারার সংজ্ঞায় উল্লেখিত "B (আক্রান্ত) does not consent to the penetration” লাইনটি ৫ নম্বর ধারায় নেই; অর্থাৎ সেখানে এইজ অব কনসেন্ট হচ্ছে ১৩ বছর। ভূটানের আইনে এইজ অব কনসেন্ট ১২ বছর, নেদারল্যাণ্ডের আইনে এটি ১৬ বছর, কানাডার আইনে কিছু ব্যতিক্রম সহ এটি ১৬ বছর।

এইজ অব কনসেন্টের সাথে আরো কয়েকটি বয়সসীমা সংক্রান্ত বেশ গুরুত্বপূর্ণ। যেমনঃ
শিশুর সংজ্ঞায় শিশুর বয়স
বিয়ের ন্যুনতম বয়স
এইজ অব ক্রিমিনাল রেস্পন্সিবিলিটি

শিশুর সংজ্ঞায় শিশুর বয়সঃ
আমাদের অধিকাংশ আইনেই শিশু’র সংজ্ঞায় ১৮ বছরের কম বয়সের ব্যক্তির কথা বলা হলেও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ এর ২ (ট) ধারায় শিশুর সংজ্ঞায় বলা হয়েছেঃ (ট) ““শিশু” অর্থ অনধিক ষোল (১৬) বৎসর বয়সের কোন ব্যক্তি”। অবশ্য বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭ এ “শিশু” শব্দটির বদলে “অপ্রাপ্তবয়স্ক” শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে এবং সংজ্ঞায় জানানো হয়েছেঃ “অপ্রাপ্তবয়স্ক” অর্থ বিবাহের ক্ষেত্রে ২১ (একুশ) বৎসর পূর্ণ করেননি এমন কোনো পুরুষ এবং ১৮ (আঠারো) বৎসর পূর্ণ করেননি এমন কোনো নারী এবং “প্রাপ্ত বয়স্ক” অর্থ বিবাহের ক্ষেত্রে ২১ (একুশ) বৎসর পূর্ণ করেছেন এমন কোনো পুরুষ এবং ১৮ (আঠারো) বৎসর পূর্ণ করেছেন এমন কোনো নারী। অন্যদিকে শিশু আইন ২০১৩ এর ৪ নম্বর ধারা অনুযায়ী “অনুর্ধ্ব ১৮ (আঠার) বৎসর বয়স পর্যন্ত সকল ব্যক্তি শিশু হিসাবে গণ্য হইবে”।

বিয়ের ন্যুনতম বয়সঃ
বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭ অনুযায়ীঃ “বাল্যবিবাহ” অর্থ এইরূপ বিবাহ যাহার কোন এক পক্ষ বা উভয় পক্ষ অপ্রাপ্ত বয়স্ক। অর্থাৎ সাধারণভাবে বিয়ের ন্যুনতম বয়স- পুরুষের ক্ষেত্রে ২১ বছর এবং নারীর ক্ষেত্রে ১৮ বছর। কিন্তু নতুন এই আইনটিতে বিশেষ বিধান নামে একটি ধারা (ধারা ১৯) যুক্ত করে আরো কমবয়সী শিশুদের বিয়ের অনুমোদনও দেয়া হয়েছে। ধারা ১৯ অনুযায়ীঃ “এই আইনের অন্যান্য বিধানে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, বিধি দ্বারা নির্ধারিত কোন বিশেষ প্রেক্ষাপটে অপ্রাপ্ত বয়স্কের সর্বোত্তম স্বার্থে, আদালতের নির্দেশ এবং পিতা-মাতা বা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে অভিভাবকের সম্মতিক্রমে, বিধি দ্বারা নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণক্রমে, বিবাহ সম্পাদিত হইলে উহা এই আইনের অধীন অপরাধ বলিয়া গণ্য হইবে না”।

এইজ অব ক্রিমিনাল রেসপন্সিবিলিটিঃ
এর অর্থ অপরাধ করার ন্যুনতম বয়স। কথায় আছে, শিশুরা ফুলের মত নিষ্পাপ। অন্য কথায় – শিশুরা পাপ করতে পারে না, বা পাপ শিশুদের ছুতে পারেনা। প্রচলিত এই কথাগুলোর কিছুটা প্রতিফলন ঘটে- এই সংক্রান্ত ধারাসমূহে। অর্থাৎ, আইনের দৃষ্টিতে একটা নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত শিশুদের যেকোন অপরাধকে অপরাধ হিসেবেই ধরা হয় না, ঐ বয়সে কারো কোন কর্মই অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে না এবং ৯ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুর ক্ষেত্রে – কোন কর্ম অপরাধ হবে না যদি সেই কর্মটির প্রকৃতি ও তার ফলাফল সম্পর্কে বোঝার মত পরিপক্কতা ঐ শিশুটির না থাকে। দণ্ডবিধি ৮২: “নয় বৎসরের কম বয়স্ক শিশু কর্তৃক কৃত কোন কিছুই অপরাধ নহে” ( “Nothing is an offence which is done by a child under nine years of age”)। দণ্ডবিধি ৮৩: “নয় বৎসরের অধিক ও বার বৎসরের কম বয়স্ক এমন শিশু কর্তৃক কৃত কোন কিছুই অপরাধ নহে, উক্ত অপরাধের ব্যাপারে যে শিশুর বোধশক্তি এতদূর পরিপক্কতা লাভ করে নাই যে, সে স্বীয় আচরণের প্রকৃতি ও পরিণতি বিচার করিতে পারে” (“Nothing is an offence which is done by a child above nine years of age and under twelve, who has not attained sufficient maturity of understanding to judge of the nature and consequences of his conduct on that occasion”)। উল্টোদিক দিয়ে বলা যায় যে, ৯ বছরের উপরের কিংবা মানসিক পরিপক্কতাহীনতার ক্ষেত্রে ১২ বছরের উপরের কোন শিশু অপরাধ করতে সক্ষম হিসেবে ধরা হয়। আমাদের আইনে এইজ অব কনসেন্ট (১৬ বছর) ও এইজ অব ক্রিমিনাল রেসপনসিবিলিটি (৯ বছর) এর পার্থক্য হচ্ছে ৭ বছর। অনেক সময়ে মনে করা হয় যে, ধারা ৯০ অনুযায়ী যেহেতু শিশুর সম্মতির বয়স ১২ বছর বলা হয়েছে (Unless the contrary appears from the context, if the consent is given by a person who is under twelve years of age), সেহেতু এইজ অব ক্রিমিনাল রেসপনসিবিলিটি হচ্ছে ১২ বছর। বাস্তবে ৯০ ধারাটির “Unless the contrary appears from the context”- নির্দেশ করে যে, এটিতে ব্যতিক্রম ক্ষেত্রে শিশুদের সম্মতির কথা বলা হয়েছে। এইজ অব ক্রিমিনাল রেসপনসিবিলিটি সম্পর্কিত ধারা ‘দণ্ডবিধি’র ৮২ ও ৮২ এবং শিশু আইন ২০১৩। সে অনুযায়ী এটি সাধারণভাবে ৯ বছর এবং বিশেষ ক্ষেত্রে ১২ বছর।

এইজ অব কনসেন্টের সাথে এই ধারাগুলোর সম্পর্ক রয়েছে। যদিও বলা হয়: এইজ অব কনসেন্ট এর সাথে সংখ্যাগরিষ্ঠের বয়স, অপরাধ করার বয়স (এইজ অব ক্রিমিনাল রেসপন্সিবিলিটি), বিয়ের ন্যূনতম বয়স, ভোট প্রদানের বয়স, পান করার বয়স প্রভৃতিকে মিলিয়ে বিভ্রান্ত হওয়া উচিৎ নয় (“Age of consent should not be confused with the age of majority, age of criminal responsibility, the marriageable age, the voting age, the drinking age, or other purposes”), তদুপরি বিভিন্নভাবেই এগুলো ধর্ষণের মামলাকে প্রভাবিত করে থাকে। বিয়ের ন্যুনতম বয়স আর এইজ অব কনসেন্টের পার্থক্য নির্দেশ করে যে, যৌন সম্মতি দেয়ার বয়স হওয়ার পরেও একজন বিয়ে করার উপযোগী নাও হতে পারে। আমাদের দেশে যৌন সম্মতির ন্যুনতম বয়স ১৬ আর বিয়ের ন্যুনতম বয়স ১৮ বছরকে দেখিয়ে অনেক সময়ে এই যুক্তি করা হয় যে- ১৬ বছরে একজন যৌনভাবে সক্ষম হতে পারলে কেন সে বিয়ে করতে পারবে না। এ যুক্তিতে বিয়ের ন্যুনতম বয়স কমিয়ে ১৬ বছর করার পক্ষে তারা যুক্তি দেন। তারা ভুলে যান, স্রেফ যৌনতা আর বিয়ে করা এক বিষয় নয়, বিয়ের সাথে সাথে একটি সংসারের দায়িত্ব ঘাড়ে চলে আসে, নারীদের সন্তানধারণের বিষয় চলে আসে এবং এর ফলে স্বাভাবিক শিক্ষাজীবন শেষে কর্মক্ষম হওয়ার সুযোগ নষ্ট হওয়ার ব্যাপারও জড়িত। উল্টোদিকে-অনেক নারীবাদী সংগঠন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন- ২০০০ এর এইজ অব কনসেন্ট বাড়িয়ে ১৮ বছর করার দাবি তুলেন এই যুক্তিতে যে, এতে ধর্ষণের মামলার ভয়েও বাল্যবিবাহ অনেকাংশ কমে যাবে। এমন যুক্তির বাস্তব ভিত্তিও আছে, কেননা আমাদের দেশে ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সী নারীর মধ্যে বাল্যবিবাহের হার সর্বাধিক। একইসাথে এই বয়সী নারীর মাঝে শিশুমাতৃত্বের হারও আশংকাজনকভাবে বেশি। ইউনিসেফের তথ্যমতে ১৮ বছর বয়সের আগেই ৬৬% নারীশিশু বাল্যবিবাহ করতে বাধ্য হয়, যার দুই তৃতীয়াংশের বয়সই ১৫-১৮ বছরের মধ্যে (https://www.unicef.org/bangladesh/children_4866.html)। অবশ্য অন্য একটি বেসরকারি গবেষণার তথ্যমতে বিগত দশকে বাল্যবিবাহের হার কমে হয়েছে ৪৩%। এর বড় অংশই কমেছে ১৫ বছরের নিচে (“বাল্যবিবাহ কমলেও আশঙ্কা রয়েই গেছে”- ডিডাব্লিউ, বাংলা- ২৫ নভেম্বর, ২০১৬: www.dw.com/bn/a-36524807)। অবশ্য বাল্যবিবাহ নিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া এবং আইন অমান্যে সাজার পরিমাণ বাড়ানোর মধ্য দিয়েও বাল্যবিবাহের হার কমানোর দাবি প্রায় সকল নারীবাদী ও মানবাধিকার সংগঠনের। এবছর বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭ এ আগের তুলনায় সাজার পরিমাণ কিছুটা বাড়লেও, আইনে বিশেষ বিধানের মাধ্যমে বাল্যবিবাহের বিশেষ আইনী অনুমোদনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছ। তদুপরি, আইনের প্রয়োগের ব্যাপারে বিশেষ অভিযান চালানো, প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত ব্যাপক প্রচারণা চালিয়ে জনসচেতনতা তৈরি- প্রভৃতি পদক্ষেপও চোখে পড়ছে না।

বিয়ের ন্যুনতম বয়স এবং এইজ অব কনসেন্ট এর পারস্পরিক সম্পর্ক বোঝার জন্যে, সাম্প্রতিক একটি রায়ের দিকে দৃষ্টি দেয়া যায় (“'বিশেষ বিধান'এর বলে প্রথম বাল্যবিবাহ” - জাগরণীয়া, ২৩ মার্চ ২০১৭ : http://bangla.jagoroniya.com/bangladesh/6926/)। এই রায়ে ধর্ষণের অভিযোগ দিক থেকে এক ব্যক্তি কেবল মুক্তই হননি, ধর্ষিতার সাথে তার বিয়েও হয়। আমাদের ধর্ষণ সংক্রান্ত মামলাগুলোর একটা অংশ বিয়ের উদ্দেশ্যে করা হয়। অর্থাৎ কোন নারীর সাথে যৌন সম্পর্ক আবদ্ধ হওয়ার পরে, এমনকি তাকে সন্তানসম্ভবা করার পরে পুরুষটি যখন আর তাকে বিয়ে করতে চায় না, তখন নারীটি উপায়হীন হয়ে ধর্ষণের মামলা করে বসে। জেল- জরিমানা থেকে বাঁচতে পুরুষটি তখন বাধ্য হয় বিয়ে করতে। আলোচ্য ঐ মামলাটিতেও ধর্ষক পুরুষটি ১৩ বছরেরও কম বয়সী একটি মেয়ের সাথে যৌনসম্পর্ক করলে একটা সময়ে যখন মেয়েটি গর্ভবতী হয়ে পড়ে, তখন সে তাকে বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানায় (মামলার সময়কালে মেয়েটির বয়স ছিল ১৩ বছর ৮ মাস)। ফলে, মেয়েটির পরিবার ধর্ষণের মামলা করে বসে এবং গত তিনবছর ধর্ষণের দায়ে জেলখানায় ছিল ঐ পুরুষটি। এ বছর বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭ পাশ হওয়ার পরপরেই এই আইনের বিশেষ বিধান মোতাবেক ১৮ বছরেরও কম বয়সী নারীকে বিয়ে করার অনুমোদন মেলায়, ধর্ষণের মামলা তুলে নেয়া হয় এবং ঐ পুরুষটি ১৬ বছরের ঐ মেয়েটিকে বিয়ে করতে রাজি হয়। মেয়েটি ও তার পরিবারও খুশি মনে মেনে নেয়, কেননা বাচ্চামেয়েটির সন্তানের বয়সই এখন ১ বছরের বেশি, যে সন্তানটি এই সমাজের জন্যে আবশ্যকীয় পিতৃ পরিচয়টি এর মধ্য দিয়ে লাভ করছে। বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭ এর বিশেষ বিধানের সর্বপ্রথম প্রয়োগ এই মামলাটির রায়ে ঘটে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ এর ধারা ৯ অনুযায়ী (মেয়ের বয়স ১৬ বছরের কম) কিংবা ‘দণ্ডবিধি’ এর ধারা ৩৭৫ অনুযায়ী (মেয়েটির বয়স ১৪ বছরের কম এবং সে অবিবাহিত) আলোচ্য ঘটনাটিতে মেয়েটিকে ধর্ষণই করা হয়েছিল; অথচ আদালত ধর্ষণের বিচার না করে বিয়ে দেয়ার জন্যে অপেক্ষা করেছে এবং বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭ এর বিশেষ বিধান তাদের অপেক্ষা ২ বছর কমিয়ে দিয়েছে বলেই মনে হয়েছে (বিশেষ বিধানটি না থাকলে, সম্ভবত মেয়েটির বয়স ১৮ বছর হওয়া পর্যন্ত সেই অপরাধীকে কারাভোগ করতে হতো)!

এইজ অব কনসেন্ট বনাম এইজ অব ক্রিমিনাল রেসপনসিবিলিটি
এইজ অব কনসেন্টের কম বয়সী শিশু ধর্ষণের মামলায় অনেক সময় এইজ অব ক্রিমিনাল রেসপনসিবিলিটিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়, আক্রান্তের উপর দোষ (victim blaming) চাপিয়ে দেয়ার নিমিত্তে। যেকোন ধর্ষণের মামলাতেই আসামী পক্ষের আইনজীবীদের অন্যতম লক্ষ থাকে যৌন সঙ্গমের ঘটনাটি যে উভয়ের সম্মতিতেই হয়েছে, সেটি প্রমাণ করা এবং সে জায়গা থেকেই ধর্ষিতার “চরিত্রহানি”র প্রচেষ্টা থাকে। এইজ অব কনসেন্টের ক্ষেত্রে যেহেতু শিশুদের সম্মতি থাকলেও সেটি ধর্ষণ হিসেবে বিবেচিত হয়, সেহেতু এক্ষেত্রে অন্যভাবে যুক্তি হাজির করা হয়। যেমনঃ আক্রান্তের বয়স সম্পর্কে আসামী অজ্ঞাত ছিল, আক্রান্তই তার বয়স লুকিয়েছিল বা ভুলভাবে বাড়িয়ে উপস্থাপন করেছিল, আসামীর প্রতি শত্রুতা পূর্বক ফাঁদে ফেলার জন্যেই এমনটি করেছিল ইত্যাদি। এক্ষেত্রে এইজ অব ক্রিমিনাল রেসপনসিবিলিটি গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে, আইনী পরিভাষায় এর চেয়ে বেশি বয়সী ব্যক্তি শিশু হলেও (১৮ বছরের নীচে হলেও) সে অপরাধ করতে সক্ষম।

আমাদের আইনে সুনির্দিষ্টভাবেই বলা হয়েছে- ৯ বছরের কমে শিশুদের অপরাধ বোঝার মত বোধ বুদ্ধি হয় না বিধায় তারা কোন অপরাধ করে ফেললেও সাজা দেয়া যাবে না। আবার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন অনুযায়ী বলা হয়েছে- ১৬ বছরের শিশুর যৌনতার ক্ষেত্রে স্বাধীন সম্মতি দেয়ার মত অবস্থা হয়নি- ফলে এই বয়সী কারো সম্মতি থাকার পরেও যৌন সম্পর্ক করলে- সেটিকে সম্মতি হিসেবে না ধরে- প্রাপ্তবয়স্ক কারো প্রলুব্ধকরণ হিসেবে (খাটি বাংলায়- "ফুসলানো") ধরা হয় এবং সেটি ধর্ষণ হিসেবে বিবেচিত হবে। আমাদের আইনে যৌনতার ক্ষেত্রে সম্মতির ব্যাপারে বয়স সীমা ১৬ রাখা হয়েছে। ১৬ এর নীচে কেউ যদি সেই সম্মতি দেয়- তাহলে সে কিন্তু আইনের দৃষ্টিতে অপরাধ করছে না। ১৬ বছরের নীচের কেউ এইরকম সম্মতি দেয়ার মত পরিপক্ক অবস্থানে নাও থাকতে পারে - তাকে একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি- তার অবস্থান- অভিজ্ঞতা- অর্থবিত্ত- খেলার সামগ্রী বা চকলেটের লোভ দেখিয়ে বা ইফতারের দাওয়াত দিয়ে, গল্প শোনানোর কথা বলে, একসাথে খেলার কথা বলে, কিংবা আদর করার ছলে ইত্যাদি নানা কায়দায় প্রলুব্ধ করে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত করতে পারে! ফলে এই আইনটি সেইসব ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের রক্ষা করতে এবং ঐসব লোক যারা এমন নারী শিশুকে প্রলুব্ধ করতে পারে তাদের বাঁধা দিতেই এই এইজ অব কনসেন্টের প্রয়োজন। সেটি বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন রকম। শিশুর যৌন পরিবর্তনের বয়স,সামাজিক পরিমণ্ডলে যৌনতা কেন্দ্রিক ধারণা,অল্পবয়সে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হওয়ার সমস্যা সংকট সম্পর্কে সামাজিক গবেষণা- এমন অনেক বিষয়ই এখানে বিবেচ্য।

আগেই বলা হয়েছে, ধর্ষণের মামলায় আসামীপক্ষের আইনজীবীর চেষ্টা থাকে ধর্ষিতাকেই অভিযুক্ত বা দোষী হিসেবে দেখানোর। ফলে সেক্ষেত্রে তিনি দন্ডবিধির ৮২/৮৩/ ৯০ ধারা দেখান এই জায়গা থেকেই যে, যেহেতু ভিকটিমের বয়স ১২ এর বেশী সেহেতু সেও অপরাধ করার এবং কোন একটি অপরাধে সম্মতি দিতে সক্ষম। এখন অপরাধ কর্মটি কি? উভয়ের সম্মতিতে যৌন সম্পর্ক হয়েছে, কিন্তু যৌন সম্পর্ক তো আইনের চোখে অপরাধ নয়। আইনের ভাষায় ধর্ষণ অপরাধ, যার সংজ্ঞায় একটি নির্দিষ্ট বয়সের নিচের শিশুর সম্মতিতেও যৌন সম্পর্ক হচ্ছে ধর্ষণ। এই অপরাধটিকে গণনায় ধরলে সে তো ভিকটিম হয়ে যাচ্ছে, অপরাধী হছে না। ফলে অপরাধ করার ব্যাপারে সক্ষম হলেই তো কেবল হচ্ছে না, জানাতে হবে অপরাধটি কি? তখন তার আরো অপরাধ উপস্থিত করা হয় বা আসামীপক্ষের আইনজীবি নানারকম অপরাধ প্রমাণের চেষ্টা করে। যেমনঃ আসামীকে ফাঁসাতে চেয়েছে কিংবা অন্য কোন শত্রুতা থেকে, জীঘাংসা থেকে আসামীকে প্রলুব্ধ করে যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে বিপদে ফেলতে চেয়েছে, কিংবা ব্লাকমেইল করার উদ্দেশ্যে এমন করছে; অর্থাৎ কোন না কোন অপরাধের ‘গল্প’ হাজির করতে হবে। সেদিক থেকে দেখলে, Age of Consent আর Age of Criminal Responsibility এক হলে ভালো, এতে করে আসামীপক্ষ থেকে এরকম প্রচেষ্টা কমে এবং মামলাকালিন সময়ে আক্রান্ত ব্যক্তির উপর অহেতুক মানসিক নির্যাতনও কমে। দুনিয়ার বিভিন্ন দেশের আইনে এইজ অব কনসেন্ট ও এইজ অব ক্রিমিনাল রেসপনসিবিলিটির পার্থক্য বেশ কম। ইউরোপের অনেক দেশেই এদুটি একই (যেমনঃ সুইডেন- ১৫ বছর, অস্ট্রিয়া- ১৪ বছর, বেলজিয়াম- ১৬ বছর, চেক রিপাবলিক- ১৫ বছর, ইতালি- ১৪ বছর)। ইউরোপে গড়পরতায় এইজ অব কনসেন্ট ১৫ বছর এবং এইজ অব ক্রিমিনাল রেসপনসিবিলিটি হচ্ছে ১৪ বছর। অর্থাৎ গড়পরতায় পার্থক্য মাত্র এক বছর। কিছু দেশে তো এইজ অব কনসেন্ট এর চাইতে এইজ অব ক্রিমিনাল রেসপনসিবিলিটি বেশি (যেমনঃ স্পেন- ১৩ বছর ও ১৪ বছর, লুক্সেমবার্গ- ১৬ বছর ও ১৮ বছর, পর্তুগাল- ১৪ ও ১৬ বছর)। অর্থাৎ, লুক্সেমবার্গ মনে করে- ১৮ বছরের নীচের কোন শিশুই আদতে অপরাধ করতে পারে না, যদিও ১৪ বছর পার হলেই সে নিজ ইচ্ছায় বা সম্মতিতে যৌন সম্পর্ক করার মত পরিপক্কতা অর্জন করে। একমাত্র মালটায় বাংলাদেশের মত এইজ ক্রিমিনাল রেসপনসিবিলিটি ৯ বছর, উপরন্তু সে দেশে এইজ অব কনসেন্ট ১৮ বছর হওয়ায় এই দুই বয়সের পার্থক্য সেখানে ৯ বছর! (https://danbunting.wordpress.com/2013/08/09/age-of-consent-vs-age-of-cri...)

১২ বছর থেকে বা ১৩ বছর থেকেই একজন নারীশিশুর মধ্যে যৌন আকাঙ্খা, যৌন চাহিদা তৈরি হতে পারে, প্রেম ভালোবাসার সাথে সাথে যৌন আনন্দ উপভোগের ব্যাপারটাও চলে আসতে পারে, ফলে এই বয়সেই সে স্বেচ্ছায় যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হতে পারে। সেক্ষেত্রে এই প্রশ্নটি খুব স্বাভাবিকঃ যে সম্পর্ক সে নিজে থেকে ও নিজ উদ্যোগে করেছে, সেটির জন্যে আরেকজনকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় কি না, দোষী সাব্যস্ত করা হলেও, তার জন্যে তার শাস্তি অন্য আরেকজন, যে সম্মতি ছাড়াই বলপূর্বক ধর্ষণ করছে তার সমান হতে পারে কি না- এসব প্রশ্নও বেশ গুরুত্বের সাথে বিবেচনার দাবি রাখে। উদাহরণ স্বরূপ ১৯/২০ বছর বয়সের ছেলের সাথে ১৪/১৫ বছরের একটি মেয়ের প্রেমের সম্পর্কের পরে যৌনসঙ্গমের পরে কোন কারণে মেয়েটি বা মেয়েটির পরিবার যদি মামলা করে, আমাদের আইনানুযায়ী অপরাধ প্রমাণ সাপেক্ষে ঐ ছেলেটির সাজার পরিমাণ হওয়ার কথা যাবজ্জীবন কারাভোগ! এটি কি তার জন্যে অতিরিক্ত শাস্তিই মনে হয়; যদিও একই কর্ম যদি ৪০-৫০ বছরের কোন ব্যক্তি করে, সে অপরাধে কঠোর সাজা হওয়াই দরকার। ইউরোপ কানাডা অস্ট্রেলিয়া সহ বিভিন্ন দেশের আইনে এইজ অব কনসেন্টের ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড়ের ব্যাপারও আছে। যেমন- কানাডার আইনে এইজ অব কনসেন্ট ১৬ বছর হলেও, ১২ বছর বয়সের নীচের শিশুর সাথে যৌনসম্পর্ক করার ক্ষেত্রে কোন ছাড় নেই, কিন্তু ১২ ও ১৩ বছর বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে অনধিক ২ বছর আর ১৪ ও ১৫ বছর বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে অনধিক ৫ বছর বয়স পার্থক্যের ব্যক্তির সাথে প্রেমের সম্পর্ক হিসেবে ছাড়ের আওতায় পড়বে, অর্থাৎ এটি ধর্ষণ হিসেবে বিবেচিত হবে না।

এইজ অব কনসেন্ট আর বৈধ বিবাহের ন্যুনতম বয়স সংক্রান্ত আইন দুটো পাশাপাশি রাখলে একটি ব্যাপার সামনে আসে। আমাদের রাষ্ট্র জানাচ্ছে, ১৬ বছরের কম বয়সের নারীর সাথে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হলে ধর্ষণ হবে, আবার একই সাথে জানাচ্ছে নারীর বৈধ বিবাহের ন্যুনতম বয়স ১৮। অর্থাৎ ১৬ থেকে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত নারীর বিয়ে করার অনুমতি নেই, কিন্তু যৌনসম্পর্ক করার ক্ষেত্রে আইনগত কোন বাঁধাও নেই। কেননা আমাদের কোন আইনেই বিবাহ বহির্ভূত যৌন সম্পর্কের বিরুদ্ধে কোন বিধান নেই। কেবল, ‘দণ্ডবিধি’র ৪৯৭ ধারা অনুযায়ী ব্যাভিচার বা এডাল্টেরি'র উল্লেখ আছে, কিন্তু সেটি যেকোন বিবাহ বহির্ভুত সম্পর্কের জন্যে প্রযোজ্য নয়। এটি হচ্ছে, আমাদের প্রচলিত ভাষায় যেটা পরকীয়া, তার জন্যে। সেটিও কেবল, পরস্ত্রীর সাথে ঐ স্ত্রীর স্বামীর সম্মতি ব্যতিরেকে যৌন সম্পর্ক (পরস্বামীর সাথে সম্পর্কের ব্যাপারে কোন বিধান নেই) এবং এই অপরাধ কেবল যে পুরুষ পরস্ত্রীর সাথে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হচ্ছে তার। এর জন্য ঐ পুরুষের শাস্তি হবে সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাভোগ, কিন্তু সেই পরস্ত্রী যিনিও এরকম যৌন সম্পর্কে স্বেচ্ছায় লিপ্ত হচ্ছেন, তিনি কিন্তু আইনের চোখে নিরপরাধ। এর বাইরে আর কোন যৌন সম্পর্ক, যেটি ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়ন না, সেটি অপরাধ নয়। বিয়ে হোক বা না হোক। সমাজে একে ব্যভিচার, লাম্পাট্য বা অসামাজিক কার্যকলাপ- যা কিছুই বলা হোক না কেন, আইনের চোখে এসব যৌন সম্পর্কের জন্যে কারোর কোন শাস্তি হবে না (অপ্রাকৃতিক যৌন সম্পর্কের জন্যে অবশ্য দণ্ডবিধির ৩৭৭ নাম্বার ধারা অনুযায়ী শাস্তি পেতে হবে। পশুকাম ও সমকাম এই ধারার অধীনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ)। ফলে এটি স্পষ্ট যে, এক্ষেত্রে আমাদের রাষ্ট্র এতখানি মানবিক যে, বিবাহ বহির্ভূত যৌনসম্পর্কের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র কোন রকম খবরদারি করে না। আবার একই সাথে এটাও বলা যায় যে, রাষ্ট্র ঠিক ততোখানিই অমানবিক যে, বিবাহ বহির্ভুত যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে যে সন্তান জন্ম নিচ্ছে, তার জন্যে ও তার মায়ের জন্যে পদে পদে বাঁধা তৈরি করে রেখেছে। বিশেষ করে, সন্তানের পিতৃপরিচয়ের আবশ্যকয়ীতা তৈরি করে রাখার মধ্যে। ‘সিঙ্গেল’ মায়ের স্বীকৃতি রাষ্ট্রের কাছে নেই। রাষ্ট্রীয় সমস্ত কাগজপত্রে পিতার নাম আবশ্যক। আর আইনের সীমা বাদ দিয়ে যদি সামাজিক-অর্থনৈতিক-ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক এসব দিক দিয়ে বিবেচনা করি, এ সমাজে এখনো ধর্ষণের চাইতে প্রেমের সম্পর্ক বড় অপরাধ, এখানে ধর্ষকের চাইতে ধর্ষিতা সামাজিকভাবে ঘৃণিত।

ধর্ষণ মামলার দীর্ঘসূত্রিতাঃ
আমাদের দেশে ধর্ষণের ঘটনা যতখানি ঘটে, তার খুব অল্প অংশই প্রকাশ্যে আসে বা ধর্ষকের বিচার চেয়ে মামলা করা হয়। আবার, যতগুলো মামলা হয় সেসবের একটি বড় অংশই বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। যথাসময়ে মামলার নিষ্পত্তি হয় বা মামলার রায় হয়, বেশ কম। আর, সেই রায়ে অপরাধীর সাজা পাওয়ার হার আরো কম। নারীপক্ষের এক গবেষণায় দেখা যায়, ২০১১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত দেশের ছয়টি জেলায় ধর্ষণ ও ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগে করা তিন হাজার ৬৭১টি মামলায় মাত্র চারজনের সাজা হয়েছে। ধর্ষণের শিকার মেয়েদের সারাদেশে ৮টি ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের মাধ্যমে কাউন্সেলিং, পুলিশি ও আইনি সহায়তা দেওয়া হয়, তাদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য থেকে দেখা যায়, ২০০১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হয়ে চিকিৎসা সহায়তা নিতে আসেন ২২ হাজার ৩৮৬ জন নারী, তার মধ্যে মামলা হয় পাঁচ হাজার তিনটি ঘটনায়। এর মধ্যে মাত্র ৮০২টি ঘটনায় রায় দেওয়া হয়েছে। আর শাস্তি পেয়েছে মাত্র ১০১ জন! রায় ঘোষণার হার ৩ দশমিক ৬৬ ভাগ। আর সাজার হার ০ দশমিক ৪৫ ভাগ। মানবাধিকার নেত্রী অ্যাডভোকেট এলিনা খান এ প্রসঙ্গে বলেন, “বিচারহীনতার কারণে ধর্ষণের সংখ্যা আরও বাড়ছে। আইনে আছে ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করতে হবে। বিশেষ ক্ষেত্রে কারণ দেখিয়ে বাড়তি সময় নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে মামলা শেষ হতে ১০-২০ বছরও লেগে যাচ্ছে”। (সূত্রঃ ধর্ষণ মামলায় হাজারে সাজা মাত্র ৪ জনের ২৮ মে, ২০১৭, সমকাল : http://bangla.samakal.net/2017/05/28/296327)

সুপ্রিম কোর্টের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ঢাকার ৫ টিসহ সারা দেশে ৫৪টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল এবং ১৮টি জেলা আদালতে ২০১৫ সালের মার্চ পর্যন্ত মোট ১ লাখ ৪৯ হাজার ২৬৫টি মামলা বিচারাধীন ছিল। তার মধ্যে ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ১১ হাজার ৮৯৫টি মামলা। এর আগে ২০১২ সালে সারা দেশে বিচারাধীন ছিল ১ লাখ ২২ হাজার ৬৭৬টি মামলা, একই সময়ে নিষ্পত্তি হয়েছে ৩৪ হাজার ৯৩১টি মামলা। আর ২০১৩ সালে বিচারাধীন ছিল ১ লাখ ৩৩ হাজার ৮৩০টি এবং নিষ্পত্তি হয়েছে ৩৮ হাজার ৯২টি মামলা। ২০১৪ সালে সারা দেশে বিচারাধীন ছিল ১ লাখ ৪৪ হাজার ৭৯৬টি এবং নিষ্পত্তি হয়েছে ৪০ হাজার ২৯২টি মামলা। (সূত্রঃ ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন মামলা : সাজা হয় হাজারে সাড়ে ৪ জনের- ভোরের কাগজ, ২৯ জুন, ২০১৫: http://www.bhorerkagoj.net/print-edition/2015/06/29/39589.php)। উল্লেখ্য যে, কথিত নিষ্পত্তি হওয়া বা রায় হওয়া মামলাগুলোতে আসামীর সাজা পাওয়ার হার একেবারেই কম, যার অন্যতম কারণ মামলার এহেন দীর্ঘসূত্রিতা। দীর্ঘসূত্রতার কারণে বেশির ভাগ মামলা শেষ পর্যন্ত টেকে না। দীর্ঘদিন অতিবাহিত হওয়ার পর সাক্ষীদেরও পাওয়া যায় না। ধর্ষণের মামলা এত দীর্ঘ সময় ধরে চালিয়ে দিনের পর দিন বারেবারে অপমানিত, মানসিকভাবে লাঞ্ছিত নির্যাতিত হওয়ার মত ধৈর্য ও মানসিক শক্তি ধর্ষণের শিকার নারীর অনেক সময়ই থাকে না। তাছাড়া আসামীরা প্রভাবশালী হলে তাদের পক্ষ থেকে নানারকম ভয়ভীতি প্রদর্শন সহ বাদীর নিরাপত্তাহানির মত ঘটনাও আছে। ধর্ষণের মামলার অপরাধে ধর্ষিত ও তার পরিবারকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা, এমনকি জানে মেরে ফেলা ও পুনরায় ধর্ষণ করার মত ঘটনাও ঘটেছে। ফলে, অনেক সময়ই ভয়ে নির্যাতিতরা আদালতে এসে সাক্ষ্য দিতেও অনীহা প্রকাশ করে। ধর্ষণের শিকার নারী-শিশুর পরিবার গরিব হলে অনেক সময় টাকা-পয়সা দিয়ে বা নানারকম চাপ প্রয়োগ করে আপোস করে ফেলা হয়। এভাবে ধর্ষকরা পার পেয়ে যায়। সে জায়গা থেকেই নারী আন্দোলনের নেত্রীরা ও মানবাধিকার কর্মীরা দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির দাবি তুলে এসেছেন। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন- ২০০০ এর ২০ নম্বর ধারার ১, ২ ও ৩ নম্বর উপধারায় এ সংক্রান্ত মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষে বেশকিছু ইতিবাচক বিধান যুক্ত হয়েছেঃ

“২০৷ (১) এই আইনের অধীন কোন অপরাধের বিচার কেবলমাত্র ধারা ২৫ এর অধীন গঠিত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বিচারযোগ্য হইবে।
(২) ট্রাইব্যুনালে মামলার শুনানী শুরু হইলে উহা শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতি কর্মদিবসে একটানা চলিবে।
(৩) বিচারের জন্য মামলা প্রাপ্তির তারিখ হইতে একশত আশি দিনের মধ্যে ট্রাইব্যুনাল বিচারকার্য সমাপ্ত করিবে”।

এ হিসেবে মামলাগুলো ৬ মাসের মধ্যেই নিষ্পত্তি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ বিধান তিনটি উপধারা-৪ এর প্রতিবিধানের মাধ্যমে একেবারেই গুরুত্বহীন করে ফেলা হয়েছেঃ
“(৪) উপ-ধারা (৩) এর অধীন সময়সীমার মধ্যে মামলার বিচারকার্য সমাপ্ত না হইলে, ট্রাইব্যুনাল মামলার আসামীকে জামিনে মুক্তি দিতে পারিবে এবং আসামীকে জামিনে মুক্তি দেওয়া না হইলে ট্রাইব্যুনাল উহার কারণ লিপিবদ্ধ করিবে”। ১৮০ দিন তথা ৬ মাসের মধ্যে বিচারকার্য সমাপ্ত করার যে নির্দেশনা সেটি একতরফাভাবে ট্রাইবুনালের প্রতি, কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তা তথা নির্বাহী দায়িত্বে থাকা রতদের প্রতি পরিপূরক কোন নির্দেশনা নেই। ফলে, অধিকাংশ তদন্ত কর্মকর্তার গাফিলতি, তদন্ত প্রতিবেদন পেশ করার ক্ষেত্রে দুর্বলতা, দীর্ঘসূত্রিতা, সাক্ষীদের হাজির করার দুর্বলতা- এরকম নানাকারণ দেখিয়ে ট্রাইবুনাল মামলা ঝুলিয়ে রাখে। ৬ মাস ঝুলিয়ে রাখতে পারলে আসামীর জামিন পাওয়ার সুযোগও অনেক সময় আসামীপক্ষ কাজে লাগাতে চায়। আর, ৫ নম্বর উপধারা মোতাবেক মামলার দীর্ঘসূত্রিতার কারণে বিচারক বদলী হলে, তিনি অপরিহার্য মনে করলে একই সাক্ষীকে পুনরায় তলব করতে পারবেন, যা প্রকারান্তরে মামলাকে আরো অনেক বেশি ঝুলিয়ে দেয়!

মামলার দীর্ঘসূত্রিতার এমন শুরু হয় বাস্তবে একেবারে মামলার প্রাথমিক পর্যায়েই, যখন আক্রান্ত নারী থানায় মামলা করতে যায়। থানাগুলোতে ধর্ষণের মামলা করতে গিয়ে হয়রানির শিকার হওয়ার ঘটনা খুবই নৈমত্তিক ব্যাপার। মামলা করতে আসা আক্রান্ত নারীকে ফিরিয়ে দেয়া, বিভিন্নভাবে অপমান-অপদস্থ করা, এক থানা থেকে অন্য থানায় ঘুরানো, অন্যদিন অন্য সময়ের মামলা করতে আসার কথা বলে ঘুরানো, এমনকি মামলা করার জন্যে চাঁদা দাবি করা বা শারীরিকভাবে লঞ্ছিত করার ঘটনাও ঘটেছে। ধর্ষণের শিকার এক গার্মেন্ট কর্মী ঢাকা মেডিকেল কলেজের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে ৮ দিন চিকিৎসা সেবা নিয়ে বনানী থানায় ধর্ষণের মামলা করার জন্যে গেলে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বি এম ফরমান আলী ১২ মার্চ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত ১৭ দিন ভুক্তভোগীকে নানা অজুহাতে ঘুরাতে থাকেন বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী। তিনি বলেন, “ওসি সাহেব আমার সঙ্গে অনেক খারাপ আচরণ করেছেন। আমাকে একের পর এক মানহানিকর প্রশ্ন করতেন। একদিন আমাদের গলাধাক্কা দিয়ে থানা থেকে বের করার জন্য নির্দেশ দেন অন্য পুলিশ সদস্যদের। বাধ্য হয়ে ঢাকার আদালতে গিয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা করি”। (সূত্রঃ “ধর্ষিতাকে থানা থেকে বের করে দিয়েছিলেন ওসি ফরমান” - বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১৪ মে ২০১৭: http://www.bd-pratidin.com/first-page/2017/05/14/231397)। রেইনট্রি হোটেলে দুই ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনাতেও মামলা নিতে গড়িমসির অভিযোগ উঠেছে একই ওসি’র বিরুদ্ধে। ফলে আমাদের দেশে ধর্ষণ মামলার চক্রটা অনেকটা এরকম হয়ে দাঁড়িয়েছেঃ ধর্ষণের ঘটনায় বেশিরভাগ আক্রান্ত নারী মামলাই করতে যায় না, যারাও যায় তাদের মামলা নিতে চায় না বা গড়িমসি করেন বা নানাভাবে হয়রানি করে থানা পুলিশ, এসবের মধ্য দিয়ে যেসব মামলাও হয় সেসবের তদন্ত প্রতিবেদনের কাজটি যথাযথভাবে ও যথাসময়ে করা হয় না- তার সাথে অনেক সময়ই যুক্ত হয় প্রভাবশালী ধর্ষকদের সাথে পুলিশ কর্মকর্তার যোগসাজশ, এরপরেও তদন্ত প্রতিবেদন- সাক্ষী- সাবুদ মিলিয়ে যে মামলা চলে সেটায় যুক্ত অনির্দিষ্টকালের দীর্ঘসূত্রিতা, যার কারণে অনেক সময়ে মামলার ব্যাপারটাই আক্রান্তের উপর বোঝার মত চেপে বসে- এর থেকে বাঁচতে কিংবা প্রভাবশালী ধর্ষকগোষ্ঠীর চাপে বা টাকাপয়সার লেনদেন প্রভৃতি মাধ্যমে আপোসরফা করে মামলা তুলে নেয় আক্রান্ত। এসবের মধ্য দিয়ে পার হয়ে খুব অল্প কিছু মামলাতেই আসল অপরাধীর সাজা মেলে।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ এ ধর্ষকের জন্যে যাবজ্জীবন সাজার বিধান থাকলেও, অর্থাৎ ধর্ষণকে প্রথম সারির অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হলেও- আমাদের দেশে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়ন বিষয়ক আইনগুলোর বিভিন্ন ধারার আলোচনায় দেখা যায়, সমস্তক্ষেত্রেই আক্রান্ত ব্যক্তির সুরক্ষা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা নেই, বরং অপরাধী দমনের চাইতে নানারকম ফাঁক গলে পালনের আয়োজনই আছে বিভিন্ন ধারায়। এরকম অবস্থায় এরকম আইন পাল্টানো কিংবা সমস্ত যৌন অপরাধ দমনের জন্যে স্বতন্ত্র একটি নতুন আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। যদিও কেবল আইন পরিবর্তন বা নতুন আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশে যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণের মত ঘটনার প্রকোপ যেভাবে বেড়েই চলেছে, সেখান থেকে উত্তরণের জন্যে আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন দরকার, দরকার শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যাপক সংস্কার। সবকিছুর মূলে দরকার একটি তীব্র সামাজিক- সাংষ্কৃতিক আন্দোলন, দরকার রাজনৈতিক আন্দোলন।

তথ্যসূত্রঃ
১। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০ : http://bdlaws.minlaw.gov.bd/bangla_all_sections.php?id=835
২। দণ্ডবিধি : http://bdlaws.minlaw.gov.bd/print_sections_all.php?id=11
৩। বাংলাদেশ দণ্ডবিধিঃ এটিএম কামরুল ইসলাম (প্রকাশকঃ খোশরোজ কিতাব মহল, বাংলা বাজার)
৪। ধর্ষণ মামলায় হাজারে সাজা মাত্র ৪ জনের - ২৮ মে, ২০১৭, সমকাল
৫। sexual offences act 2003 : http://www.legislation.gov.uk/ukpga/2003/42/pdfs/ukpga_20030042_en.pdf
৬। 'বিশেষ বিধান'এর বলে প্রথম বাল্যবিবাহ - জাগরণীয়া, ২৩ মার্চ ২০১৭

Comments

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

অনুপম সৈকত শান্ত
অনুপম সৈকত শান্ত এর ছবি
Offline
Last seen: 1 week 3 দিন ago
Joined: রবিবার, অক্টোবর 5, 2014 - 4:02অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

ফেসবুকে ইস্টিশন

SSL Certificate
কপিরাইট © ইস্টিশন.কম ® ২০১৬ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর