নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 7 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • নকল ভুত
  • মিশু মিলন
  • দ্বিতীয়নাম
  • আব্দুর রহিম রানা
  • সৈকত সমুদ্র
  • অর্বাচীন স্বজন
  • রাজর্ষি ব্যনার্জী

নতুন যাত্রী

  • সুমন মুরমু
  • জোসেফ হ্যারিসন
  • সাতাল
  • যাযাবর বুর্জোয়া
  • মিঠুন সিকদার শুভম
  • এম এম এইচ ভূঁইয়া
  • খাঁচা বন্দি পাখি
  • প্রসেনজিৎ কোনার
  • পৃথিবীর নাগরিক
  • এস এম এইচ রহমান

আপনি এখানে

সিকি শতাব্দী পেরিয়ে ৯০'র গণআন্দোলন, প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি, নিখাদ সন্ধ্যা ছাড়া আর কি?


তারুণ্যের একটা ভাষা আছে। আছে আলাদা একটা মাত্রা। কিন্তু সেই ভাষা ও মাত্রাও সব তারুণ্য ধারন করে না। অনেকে করে। আমাকে-আমাদের করেছিল। সেই তারুণ্য সন্ধি ও আত্মসমর্পনের ছিল না, ছিল আপোষহীন ও বেপরোয়া। ছিল দারুণ দূর্বার, তুমুল তুখোর! ছিল চোখে আগুন, বুকে বারুদ আর মুঠে প্রচন্ড ঘৃনা ও প্রতিবাদ। যে স্পর্দ্ধিত তারুণ্য লড়েছিল নিরস্ত্র এক বিশ্ব ব্যহায়া সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে! সে এক রক্ত হিম করা গল্প! সিকি শতাব্দী পার হয় যে গল্পের! সেকি কেবলি গল্প নাকি এক দুস্বপ্নের রুপকথা?

ভূমিকা
আজ থেকে ২৬ বছর আগে তৎকালীন স্বৈরাচারী সামরিকজান্তা এরশাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সারে ৯ বছর আন্দোলনের পর তার পতন ও বিজয় অর্জন সম্ভব হয়েছিল। সেই গণআন্দোলনে প্রায় ৩৭০ জন মানুষ নিহত হয়েছিল, পঙ্গু ও গুম হয়েছিল অসংখ্য মানুষ। জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায় মিলে হরতাল হলেছিল ৩২৮ দিন, প্রায় ১ বছর! অবরোধ হয়েছিল প্রায় ৭০ দিন। জাতীয় সম্পদ বিনষ্ট ও আর্থিক ক্ষতিও হয়েছিল অনেক। যে ক্ষতির পরিমান প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার উপরে। সেই দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে আমরা কি অর্জন করলাম? সব আন্দোলনের একটি চেতনা ও অঙ্গীকারের দিক থাকে, ৯০'র গণআন্দোলনেরও ছিল। যেমন, আইনের শাসন, শাসনতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা, প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্র ও আর্থ-সামাজিক পরিবর্তন ইত্যাদি। আন্দোলনের বিভিন্ন পক্ষের সম্মতিতে যেমন সর্বদলীয় ছাত্রঐক্যের ১০ দফা ৩ জোটের রুপরেখা ব্যাপকভাবে পরিচিতি পায় ও গণদাবীতে পরিণত হয়। স্বাধীনতার সংগ্রামের ৬ ও ১১ দফার মতই বিষয়টি কাজ করে। সেই আকাঙ্খার কতটুকু অর্জিত হলো, সে প্রশ্নই ঘুরেফিরে আসে বারবার।

ক্ষমতা দখলের খেলা
১৯৮২ সালের ২৪ শে মার্চ তৎকালীন সামরিক বাহিনীর প্রধান হোসাইন মোহাম্মাদ এরশাদ কোন রক্তপাত ছাড়াই বন্দুকের নলে সেই সময়ের রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তারকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। ক্ষমতা দখল করেই সামরিক ফরমান "এমএলআর ৮২" জারি করেন। এতে যে কোন ভাবে সামরিক শাসনের বিরোধিতা করলে ৭ বছরের সশ্রম কারাদন্ডের বিধান রাখা হয়। আর এই তথাকথিত কালো আইনের অধীনে হাজার-হাজার নেতাকর্মী ও সাধারন মানুষকে গ্রেফতার হয়। ক্ষমতা দখল করেই সাধারনত সামরিক শাসকরা যা বলে তিনিও তাই বলেছিলেন, কিন্তু তিনিও তার কথা রাখেন নি। শুরু হলো ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার বেসামরিকীকরন প্রক্রিয়া। দল গঠন, নির্বাচন, প্রতিশ্রুতি আর উন্নয়নের ফুলঝুরি'র আড়ালে চলতে থাকে দূর্ণীতি, লুটপাট আর গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে একে একে রাবার স্ট্যামে পরিণত করা হয়। এই প্রক্রিয়া ও অপশাসনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের প্রতিবাদ অব্যাহত রাখতে শুরু করে। জনগন ও বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষও এই প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ সংগ্রামে অংশ নিতে থাকে।

স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের প্রক্রিয়া
স্বৈরাচারকে ঐক্যবদ্ধ ভাবে মোকাবেলা করতে রাজনৈতিকগুলোর মধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ে বোঝাপড়া ও সমঝোতার উদ্যোগ তৈরী হয়। এবং নানা প্রাক্রিয়ার তাদের মধ্যে বিভিন্ন ইস্যুতে জোট ও ঐক্য গড়ে ওঠে। রাজনৈতিক দলগুলো প্রধানত তিনটি জোটে ৮ দল, ৭ দল ও ৫ দল ভুক্ত হয়ে জোট গঠন করে। আন্দোলন-সংগ্রামকে এবং জোটগুলোর মধ্যে যোগাযোগ গতিশীল করতে তৈরী করা হয় ৩ জোটের লিয়াজো কমিটি। ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যেও ২ টি জোট গড়ে ওঠে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ও সংগ্রামী ছাত্র সমাজ (?) এবং পরিবর্তিতে এই সংগ্রামকে আরও জোড়দার করতে এই ঐক্য রুপ নেই সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য। (সম্ভব হলে এগুলোর সময়টা উল্লেখ করা)।

জোট-ঐক্যে বোঝাপড়ার ক্ষেত্র
আন্দোলন চলাকালীন সময় জনগন ও রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে থেকে এক ধরনের চাপ আসতে থাকে যে, এরাশাদ পতনের মাধ্যমে আমরা কি অর্জন করতে চাই সে প্রশ্নটির। দল ও জোটগুলোও আন্দোলনকে শক্তিশালী করতে সেই তাগিদ উপলব্ধি করতে পারে। বাংলাদেশে ক্ষমতা দখল ও রক্ষার নেতিবাচক রাজনীতি ইতিমধ্যে মানুষের আস্থার শেষ সীমায় অবস্থান করছিল। রাজনীতির কথা আসতেই মানুষ লঙ্কা ও রাবণের গল্প বলে আমাদের অপ্রস্তত করে দিত। কারন সে সময় আন্দোলনের চড়াই-উৎরাই পরিস্থিতিতে অনেক বাঘা-বাঘা রাজনীতিকের সকাল-বিকাল চরিত্র পরিবর্তনের ঘটনা মানুষের মধ্যে ব্যাপক অবিশ্বাসের জন্ম দিলেছিল। সেই পরিস্থিতিতেই প্রয়োজন হয়ে পরেছিল জনগনকে আস্থায় নেয়ার আর সেই কারনেই তৈরী হয়েছিল ৩ জোটের রুপরেখা ও সর্বদলীয় ছাত্রঐক্যের ১০ দফা।

৩ জোটের রুপরেখা কি ও কেন
তিনজোটের রুপরেখা হচ্ছে স্বৈরাচার হটানো ও ক্ষমতা হস্তান্তরের একটি রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক পদ্ধতি ও প্রক্রিয়ার একটি দলিল। এই দলিলকে দুই ভাগে ভাগ করা যায় প্রথম পর্ব হচ্ছে এর মূল ঘোষণা এবং দ্বিতীয় পর্বে আচরণ বিধি। এটি ৪টি ধারা ও ৮টি উপধারার ছোট একটি দলিল। কিন্তু অল্প পরিসরে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা উত্তরণ ও ধারাবাহিকতার একটি পরিষ্কার নির্দেশনা এতে ছিল। যে ধারাবাহিকতা অনুসরন করলে বাংলাদেশের রাজনীতি, উন্নয়ন গনতন্ত্রের অনেক সমস্যার সমাধান হতো। তিনজোটের রুপরেখার

তিন জোটের রুপরেখা বিশ্লেষন করলে বাংলাদেশের রাজনীতি, গণতন্ত্র ও শাসনতান্ত্রিক পদ্ধতির- প্রধানত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষ্য করা যায়ঃ

প্রথমত, নির্বাচনকালীন একটি নিরপেক্ষ অন্তবর্তীকালীন সরকার প্রতিষ্ঠার দাবি, যে সরকার তিন মাসের মধ্যে একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের আয়োজন করবে, রুটিন দায়িত্ব পালন করবে, নির্বাচন কমিশনকে পুনর্গঠন করবে এবং সবার জন্য একটি সমতল ক্ষেত্র প্রস্তত করবে।

দ্বিতীয়ত, একট আচরণবিধি, যাতে অবাধ সুষ্ঠ, নিরপেক্ষ ও প্রভাবমুক্ত নির্বাচনের লক্ষ্য দলগুলোর করণীয় অনেকগুলো অঙ্গীকার ছিল, যার মধ্যে অন্তর্ভূক্ত ছিল "এরশাদ স্বৈরাচারী সরকাররের চিহ্নিত ও অবৈধ অস্ত্রধারীদের নিজেদের দলে স্থান না দেয়ার।

তৃতীয়ত, নির্বাচন পরবর্তি সরকারের কিছু করণীয়, যার মধ্যে অন্তর্ভূক্ত ছিল সংসদকে কার্যকর করে সরকারের স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, আইনের শাসন প্রত্ষ্ঠিা করা, বিচারবিভাগের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা এবং জনগনের অধিকার হরণকারী সকল কালো আইন বাতিল করা। তিন জোটের রুপরেখার সবচেয়ে প্রনিধানযোগ্য অঙ্গীকার ছিল নির্বাচনে প্রদত্ত জনরায় মেনে চলা, অসাংবিধানিক পহ্নায় ক্ষমতা দখলের সকল প্রচেষ্টা প্রতিরোধ করা এবং নির্বাচন ব্যতীত সংবিধান বহির্ভূত পন্থায় তথা কোন অজুহাতেই নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত থেকে বিরত থাকা।

সর্বদলীয় ছাত্রঐক্যের ১০ দফা
ঐক্যবদ্ধ ছাত্র আন্দোলনের এক পর্যায়ে ছাত্রদের মধ্য থেকে দাবী উঠতে থাকে জাতীয় রাজনীতির সাথে ছাত্রদের স্বার্থের বিষয়টি যুক্ত করতে হবে। সেই আকাঙ্খাকে ধারন করে ১৯৯০ সালের মাসে/তারিখে সর্বদলীয় ছাত্রঐক্যের পক্ষ থেকে ১০ দফার ঘোষণা দেয়া হয়। যেই সরকারই ক্ষমতায় যাক না কেন ছাত্রদের এই যৌক্তিক দাবী মেনে নেবে এবং তা কার্যকর করতে পদক্ষেপ নেবে। কিন্তু নির্মম সত্য হলো সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের প্রধান দুটি শরীক সংগঠন ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের অভিভাবক সংগঠন একাধিকবার করে ক্ষমতায় গেলেও ছাত্রসমাজের রক্তেভেজা সেই প্রানের দাবী বাস্তবায়িত হয় নি, গুরুত্বও পায় নি।

কি ছিল সেই ১০ দফায়?
৫ পৃষ্ঠার এই দাবীনামাকে বলা যায় দেশের সামগ্রিক জাতীয় উন্নয়নের একটি সুনির্দিষ্ট লিখিত নির্দেশনা। যেখানে দেশ ও সকল শ্রেণী-পেশার মানুষের স্বার্থের বিষয়গুলোই মুলত গুরুত্ব পেয়েছে। ভূমিহীন ক্ষেতমজুর-শ্রমিক-কর্মচারী, ব্যবসায়ী-আমলা, নারীসহ সমাজের নানা স্বার্থের মানুষদের বিষয়ে বক্তব্য আছে সেখানে। রাজনৈতিক দল, সরকার পদ্ধতি ও পরিবর্তন, বিচার-আইন-শাসন বিভাগের ক্ষমতা, সংবাদপত্র, বাকস্বাধীনতা, নাগরিক অধিকার, কৃষি-শিল্প-স্বাস্থ্য-পরিবেশ-সমাজ-অর্থনীতি প্রভৃতি বিষয় ছিল এর অন্তর্ভূক্ত। যাকে অনুসরন করা গেলে বাংলাদেশ প্রকৃতই হতে পারত এক উন্নত গণতান্ত্রিক দেশের কাতারবন্ধি।

১০ দফার ১ এর ক, খ ও গ'তে মধ্য ফেব্রুয়ারী হত্যাকান্ডের বিচার ও ক্ষতিপুরন, সকল ছাত্রনেতাদের হুলিয়া-মামলা প্রত্যাহার, সামরিক শাসকদের হস্তক্ষেপ ও দমননীতি বন্ধ করা, ১৯৭৩ সালের বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাদেশ অক্ষুন্ন রাখা। ২ এর ক থেকে জ পর্যন্ত গণবিরোধী শিক্ষানীতি বাতিল, একটি বিজ্ঞানভিত্তিক, অসাম্প্রদায়িক ও একমুখী শিক্ষাব্যবস্থা চালুকরা, ৮ম শ্রেনী পর্যন্ত শিক্ষাকে অবৈতনিক-বাধ্যতামুলক ও জাতীয়করন করা, শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বাড়ানো, সঠিক ইতিহাস সম্বলিত উপযুক্ত পাঠ্যসূচী প্রনয়ন, শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি, শিক্ষা শেষে কাজের নিশ্চয়তা। ৩ এর ক থেকে চ তে বলা হয়েছে ছাত্র কনসেশন, ন্যায্য মূল্যে শিক্ষাপোকরণ সংগ্রহ করা, আমদানীকৃত শিক্ষাপণ্যের উপর থেকে ট্যাক্স প্রত্যাহার করা, হল-হোস্টেল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃ্দ্ধি করা, শিক্ষার মান বৃদ্ধি ও যুগোপযোগী করা, কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব ও ছাত্রবৃত্তি বাড়ানো ইত্যাদি।

১০ দফা কি ছাত্রদেরই দাবী ছিল?
১৯৮৩ সালের ২৬ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকা সত্ত্বেও অপরাজেয় বাংলায় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন জোড়দার করতে ১০ দফা দাবীর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করা হয়। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের পুরো সময় আমরা স্লোগান দিয়েছি ছাত্র সমাজের ১০ দফা মানতে হবে, গ্রামে-গঞ্জে ছড়িয়ে দাও ইত্যাদি। এই ১০ দফার ৩৫টি উপধারা ছিল? আগ্রহোদ্দীপক বিষয় হচ্ছে ছাত্র সমাজের এই ১০ দফার মাত্র ৩টি দাবী ১, ২ ও ৩ সরাসরি ছাত্র সমস্যা ভিত্তিক ও শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বাকী ৭ দফা দাবী হচ্ছে শ্রেনী-পেশা ও আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক ও সংস্কৃতিক, জাতীয়, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়াবলি।

কি হলো সেই ১০ দফার?
৯০,র গনআন্দোলনের অনেক ছাত্রনেতা পরবর্তিতে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, মন্ত্রীও হয়েছেন কিন্তু ৯০'র চেতনার কথা কেউ স্মরন করেন নি মনে রাখেন নি। কেউ কেউ সেই পরিচয় কাজে লাগিয়ে পদ-পদবি অর্জন করেছেন, অর্থ-বিত্তের মালিক হয়েছেন। আমার বিশ্বাস তাদের অনেকে সেই ১০ দফায় কি লেখা আছে তা পরেও দেখেন নি। কিন্তু তাদের সবাই নিজেদের ৯০'র গনঅভ্যুত্থানের বিশাল/মহান নেতা হিসেবে পরিচয় দিতে গর্ব করেন। খবর রাখেন নি সেইসব তরুণ-যুবক যারা সেই সময় জীবন বাজি রেখে সংগ্রাম করেছিল। তাদের জীবন ও পরিবারের বিপর্যয়ের কথা কে মনে রাখে। অনেকে শারিরিকভাবে পঙ্গু ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। মেলিটারী-পুলিশের নির্মম নির্যাতনে ক্ষত-বেদনা নিয়ে অনেক সহযোদ্ধা পিঠ ধনুকের মত বাঁকা করে ধুকেধুকে বেঁচে আছেন। কে রাখে খবর সিরাজগঞ্জের জেহাদের কথা যার লাশ আমরা ট্রাকে করে ঢাকা থেকে সিরাজগঞ্জ হয়ে উল্লাপাড়া নিয়ে গিয়েছিলাম। সেদিন সেই শহরের ছোট শহীদ মিনারে সকল ছাত্র সংগঠন মিলে শপথ নিয়েছিলাম তাঁর হত্যার প্রতিশোধ/বদলা নেব। তাঁর স্বপ্নের বাস্তবায়ন করব কিন্তু তা হয় নি।

কেমন ছিল সেই সংগ্রামের দিনগুলি
কেমন ছিল সেই সময়ের আন্দোলন-সংগ্রামের পরিবেশ ও পরিস্থিতি? এক কথায় সেই পরিস্থিতি ছিল খুবই ভয়ঙ্কর ও বিপদজনক। সামরিক সরকার ক্ষমতায় এসেই সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকান্ডের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। সভা-সমাবেশ, মিছিল-মিটিং, মত প্রকাশসহ সব ধরনের নাগরিক অধিকার রদ করে। তারপর শুরু হলো রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের উপর দমন-পীড়ন, হামলা-মামলা, হত্যা-গুম, নির্যাতন ইত্যাদি। যত রকমের জুলুম আছে তার সবটাই অব্যাহত থাকলো, সেই বদ্ধ-অন্ধকার পরিস্থিতি থেকে মুক্ত হতে আমরাও সেইদিন সামরিক জান্তার চ্যালেঞ্জ গ্রহন করেছিলাম। প্রতি পদে পদে আমরা তার বাঁধার কারন সৃষ্টি করেছি। এর মধ্যো কেন্দ্র থেকে নির্দেশ আসতো আমাদের জন্য তা যেন শিরোধার্য। বিবিসি'র সান্ধ্য অধিবেশনে মার্ক টালির ভাষ্যের জন্য আমরা উৎকণ্ঠিত থাকতাম, কখন কি খবর-নিদ্দেশ আসে সেই আশায়। সেই সব নিশেধাজ্ঞা অমান্য করে হরতার-বিক্ষোভের কাজ চলতো। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে বিভক্ত হয়ে শহরের বিভিন্ন অলিগলির সংক্ষিপ্ত পথগুলোর মধ্যে ঝটিকা বিক্ষোভ ও মশাল মিছিল করতাম। মুহুত্বের মধ্যেই সামরিক বুটের শব্দ খট্‌ খট্ শব্দ, সাইরেন আর বাঁশি হৈচৈ এক মহাআতঙ্কের পরিস্থিতি। এভাবেই চলছিল সপ্তাহ, মাস, বছর।

সামরিক বাহিনী ক্ষমতায়, সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ, কাফ্যু, সান্ধ্যআইন বলবৎ, দেখামাত্র গুলির নির্দেশ, দুইজনের অধিক এক সাথে চলাফেরা নিষেধ। সেই পরিস্থিতি মধ্যে আমাদের আন্দোলন সংগ্রাম করতে হয়েছে। শহরে জলপাই রঙের আর্মির ট্রাক-ভ্যানের ঘনঘন টহল। জেলা শহরে আমরা কয়েক জন করে গ্রুপ করে করে আমরা মিছিল করেছি। এক গোলি দিয়ে মিছিল শুরু করে দৌড় দিয়ে আরেক গোলি। দুই চারটি ককটেল আর পেট্রল বোমা ফাটিয়ে/ছুড়ে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী গ্রুপ করে যে যার নকশায় দ্রুতই মিলিয়ে যেয়ে ফের নির্দিষ্ট একটি স্থানে মিলিত হওয়া। পরবর্তি অপারেশনের নিশানা ও ছক্‌ কষে বেড়িয়ে পরা। রাতে দলবেধে হরতাল-অবোরোধের কার্যক্রমে বের হওয়া কুকুরের অশনি চিৎকার মনের ভিতরে কেমন মোচড় দিয়ে ওঠে কোন অজানা অশঙ্কায়। তারপর ঝোপঝাড়, বাড়ীর পিছনের পুকুর আর খালের ভিতর দিয়ে, এরওর বাড়ীর ছাদ, টিনের চাল খুব সতর্কে কোন শব্দ না করে পা টিপে টিপে নিরাপদে যাওয়া। এরওর বাসায় খাবারই ছিল আমাদের আহারের প্রধান সংস্থান। কি পরম তৃপ্তিতে মুড়ি-মুরকি-ভাত-ডাল-তরকারী ভাগ করে খাওয়া। আমার বিশ্বাস এই লেখা/স্মৃতি অনেক বন্ধুর দারুণ নষ্টালজির কারন হবে। কেমন শ্বাসরুদ্ধকর দিন ছিল সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে সংগ্রামের।

কি অর্জন করলাম?
ছাত্র গনআন্দোলনের কর্মী ও সংগঠন হিসেবে, সংগ্রামের নিখাদ সন্ধ্যাগুলো ছাড়া আর কি? হুলিয়া, কারাগার, আত্মগোপন আর আন্দোলন ছিল, আমাদের পায়ে পায়ে। প্রতিপক্ষের হামলা ও পুলিশের নির্যাতনের অনিবার্য নিশানা ছিল আমাদের শরীর! সামরিক পুলিশের সে কি নির্দয় নিপীড়ন ও অত্যাচর..! এতটা ব্যাথা তখন বোধ করিনি! অধিক যন্ত্রনা ভোগ করছি এখন, প্রতিদিন। শীতপ্রধান দেশে বাস করি, ব্যাথা-যন্ত্রনা সহজেই নিরাপদ করেছে তার আবাস, আমার শরীরে। প্রতিদিন-প্রতিরাত চলে তাদের উৎসব পীঠে ও কোমরে..! প্রচন্ড যন্ত্রনায়, আক্ষেপ ও বেদনার বলি মনে বলি, এইতো জীবন, অনেক পেলাম! অনেক রাতই কাটে নির্ঘুম। ঘুমের ভিতরে শুনি চিৎকার, কোলাহল, গোলাগুলি, বুটের খট্‌খট্‌ শব্দ, গাড়ীর সাইরেন! ফিরে যাই সেই তারুণ্যে, মনে বলি, থাক না আমার কথা, প্রশ্ন করি, কি পেল স্বদেশ..?

শেষ কথা-
জাতীয় মুক্তি ও স্বাধীনতার তীব্র আকাঙ্খাই ছিল মুক্তিযুদ্ধের কারণ। অনেক মূল্যে ভূখন্ড পেলেও গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও আর্থ-সামাজিক মুক্তির প্রশ্নটি আজও অধরা। শেখ মুজিবকে হত্যার পর ক্ষমতা মুশতাক-সায়েম-জিয়া-সাত্তার নানা হাত হয়ে ক্ষমতা এসে পরে এক বিশ্বব্যাহায়ার কাছে। তার বিরুদ্ধেও স্লোগান ছিল, সংগ্রাম ছিল গণতন্ত্র ও মুক্তির! সারে ৯ বছরব্যাপী, সেই সংগ্রামের সিকি শতাব্দী পরও ভাবনায় আসে এত প্রাণ, এত ত্যাগ, কি অর্জন করেছি আমরা? সেই বেদনা, ক্ষোভ, বঞ্চনা, দুর্ভাগ্য, দুঃস্বপ্ন আজও তারা করে প্রতিদিন।

স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে তর্জনী তাক করেই সেদিন আমার ছাত্রআন্দোলনে অভিষেক ঘটেছিল। সময়টি ছিল ১৯৮৩'র মধ্য ফেব্রুয়ারী। শীতের স্নিগ্ধ আলোয় কিছু অগ্রজ তাদের সবটুকু উত্তাপ ঢেলে দিয়েছিল তারুণ্যের অহঙ্কারে। কবরের নীরবতা ভেঙ্গে জেগে ওঠে কোলাহল কালো সমুদ্রে গর্জন। সে কাহিনী ৯ মাসের নয়, তা ছিল ৯ বছরের। ৯ মাস আর ৯ বছর যেন আমাদের সমানই দুঃখ, গ্লানি ও অপরাধ। ৯০ বছরেও কি মিলবে আমাদের স্বপ্ন ও বিশ্বাস। না হয় ৯শ বছর তবু না মিলাক স্বপ্ন, বেঁচে থাক্ বিশ্বাস ও সংগ্রাম, সুন্দর আগামীর
------------------------------------------------------
ড. মঞ্জুরে খোদা, প্রাবন্ধিক, গবেষক, ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়, কানাডা। সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন

বিভাগ: 

Comments

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

মঞ্জুরে খোদা টরিক
মঞ্জুরে খোদা টরিক এর ছবি
Offline
Last seen: 2 দিন 4 ঘন্টা ago
Joined: বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারী 4, 2016 - 11:59পূর্বাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

কু ঝিক ঝিক

ফেসবুকে ইস্টিশন

SSL Certificate
কপিরাইট © ইস্টিশন.কম ® ২০১৬ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর