নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 2 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • মিশু মিলন
  • নুর নবী দুলাল

নতুন যাত্রী

  • চয়ন অর্কিড
  • ফজলে রাব্বী খান
  • হূমায়ুন কবির
  • রকিব খান
  • সজল আল সানভী
  • শহীদ আহমেদ
  • মো ইকরামুজ্জামান
  • মিজান
  • সঞ্জয় চক্রবর্তী
  • ডাঃ নেইল আকাশ

আপনি এখানে

দ্যাশআলি ভাই এবং সাধনকুমারদের গণতন্ত্র


তখন আমার গলার স্বর হঠাৎ ভাঙতে শুরু করেছে, ঠোঁটের ওপরের লোমগুলো কালচে হতে শুরু করেছে, উঠতি যুবক কিংবা তরুণদের আড্ডা বা গোপন গল্পে আড়ি পাততে শুরু করেছি আর তারাও আমাকে একটু একটু লাই দিতে শুরু করেছে, আমি ভাবতে শুরু করেছি যে কিশোরীর মুখ কি ঈষৎ স্ফীত বুকের দিকে তাকিয়ে থাকা আমার গণতান্ত্রিক অধিকার! তখন বৈশাখ কি ভাদ্রের দুপুরে দ্যাশআলি ভাই আর সাধনকুমাররা কাজের ফাঁকে একটু জিরিয়ে নেবার জন্য আম কি বটতলায় যে আদি রসাত্মক গল্পের ভাণ্ডার খুলে বসতো তা শোনার গণতান্ত্রিক অধিকার আমি পেয়ে গেছি আর বেজায় সুড়সুড়ি অনুভব করে প্রায়ই প্যান্টের সামনের দিকটা ফুলে উঠেছে। দ্যাশআলি ভাই আর সাধনকুমাররা তখন তরুণ। দ্যাশআলি ভাই তখন বিয়ে করেছে, বাচ্চাও আছে। সাধনকুমাররা কেউ সদ্য বিয়ে করেছে, কেউবা আত্মরতির গল্প করেছে। মিটিমিটি হেসে মনোযোগ দিয়ে সে-সব শুনেছি আর.....!

দ্যাশআলি ভাই তখন তরুণ বটে, তবে তার বয়স পঁচিশ কি পঁয়ত্রিশ তা সহজে অনুমান করতে পরতাম না; কেননা তার মুখের গড়ন ছিল অনেকটা প্রিজোরিয়া আক্রান্ত রোগীর মতো। হাত-পা-মুখের চামড়া কিছুটা কুঁচকানো। হাত-পা শীর্ণ, মানুষটাও ছোটখাটো। অনেকদিন পর পর শেভ করাতো বাজারে সুনীল কি নিখিলের সেলুনে গিয়ে, মুখের অত্যাধিক পাতলা দাড়ি-গোঁফ গোনা যেতো।

ভোরবেলায় সকলের আগে রওনা হয়ে হেঁটে দেড়মাইল পথ পাড়ি দিয়ে প্রায় সকলের শেষে কামলার হাটে পৌঁছাতো দ্যাশ ভাই। কি শীত, কি গ্রীষ্ম, কি বর্ষা; বারোমাস তাকে এই পথ পাড়ি দিতে হতো। তবে শীত আর বর্ষায় এই পথের দৈর্ঘ্য যেন আরো বেড়ে যেতো! বেড়ে যেতো এ কারণে যে এক মাইল পথ মাটির রাস্তা, বাকি আধা মাইল বিরান মাঠ। বর্ষায় এই মাঠে হাঁটু অব্দি জল জমতো। শুধু কি জল? জলের বদান্যতায় ধেই ধেই করে বেড়ে উঠতো কলমিলতা, ধানের কর্মা; জল ফুঁড়ে মাথা তুলতো নানারকম জলজ উদ্ভিদ। সে-সবের ভেতর দিয়েই হাঁটতে হতো দ্যাশআলি ভাই এবং তার মতো আরো অনেক দবির আলি, আক্কাস আলি, হাসান আলি ভাই কি চাচাদের। কপাল মন্দ হলে পচা-ভাঙা শামুকে মাঝে মধ্যেই কারো না করো পা কাটতো, ফিনকি দিয়ে বের হতো রক্ত। কিন্তু রক্ত বের হলেও ফিরে যেতো না কেউ, কেননা ওরা সকলেই দিনমজুর। ওরা জানতো যে কামলার হাটে গিয়ে বিকোতে হবে, সারাদিন কাজ করে মজুরি আর আধাকেজি চাল গামছায় বেঁধে কাঁধে ফেলে বাড়ি ফিরতে হবে। যেহেতু ওদের বেশিরভাগেরই নিজস্ব কোনো জমিজমা ছিল না, সকলেরই ঘরে চাল বাড়ন্ত; তাই অনেকের পরিবার গামছায় বাঁধা ওই আধা কেজি চালের জন্য পথের দিকে চেয়ে থাকতো। ফলে পা শামুকে কাটুক আর ঢোঁড়া সাপের কামড়ে পায়ের পাতায় কিংবা আঙুলে গভীর ক্ষতই হোক, ওরা ওভাবেই কামলার হাটে হাজির হতো রক্তাক্ত পায়ে। পায়ের ক্ষতের রক্ত ঝরা বন্ধ করতে দূর্বাঘাসের ডগা চিবিয়ে কিংবা গাঁদা ফুলের পাতা হাতে পিষে রস আর থেতলানো পাতা ক্ষতস্থানে লাগাতো। খুব বড়জোর কোনো কোনো গৃহস্থবাড়িতে স্যাভলন থাকলে একটু স্যাভলন মেশানো জলে ধুয়ে এক টুকরো ছেঁড়া ন্যাতা চেয়ে নিয়ে পেচিয়ে রাখতো ক্ষতস্থান। ওভাবেই সারাদিন কাজ করে দিনশেষে আবার দেড় মাইল পথ পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরতো, আর পরদিন ভোরে পুনরায় ওভাবেই কাজে আসতো। এই ছিল বারোমাস ওদের নিত্যদিনের রুটিন।

এই কামলাদের মধ্যে দ্যাশআলি ভাই ছিল সবচেয়ে ধীরস্থির প্রকৃতির। তার বাজার দর ছিল অন্যদের চেয়ে কম। অন্য একজন পূর্ণবয়স্ক কামলা যদি পঞ্চাশ টাকায় বিকোতো তো দ্যাশআলি বিকোতো বড়জোড় পঁয়ত্রিশ টাকায়; ধান কিংবা পাট কাটার মৌসুমে কামলাদের মজুরি বেড়ে যেতো, তখন একজন পূর্ণবয়স্ক কামলার মজুরি বেড়ে আশি-নব্বই টাকা হলে তার দর পঞ্চান্ন ষাটেই থেমে যেতো; যে দরে বিক্রি হতো তার চেয়ে বয়সে অনেক ছোট কিশোর কামলারা।

তার এই দর পতনের কারণ তার শারীরিক গড়ন, শক্তির অভাব এবং ধীরস্থির প্রকৃতির স্বভাব ও বোকাসোকা চেহারা। অন্য কামলারা যে-সময়ে ত্রিশ আটি ধান কাটতো, একই সময়ে সে কাটতো বিশ আটি; অন্যরা পঁচিশ আটি ধান মাথায় বয়ে আনলে সে আঠারো আটিতেই হাঁপিয়ে উঠতো। রুদ্র বৈশাখের দুপুরে মাথার ধান উঠোনে ফেলে সে যখন আমগাছের নিচে শরীরের ঘাম শুকোতে বসতো, তখন অন্যদের ঘাম প্রায় শুকিয়ে গেছে! অন্যরা বলতে তারই মতো ভিনগ্রাম থেকে কাজে আসা কামলা দবির আলি-হাসান আলিরা অথবা আমাদের গ্রামের সাধন কুমার-সুরেন কুমাররা। আমাদের গ্রামে যাদের জমিজমা খুব কম, ধানকাটা কিংবা ধান লাগানোর মৌসুমে তারা নিজের কাজ শেষ করে আশপাশের প্রতিবেশির বাড়িতে কামলা দিতো। এই সাধনকুমার আর দবির আলিরা দ্যাশআলি ভাইকে নিয়ে হাসি-তামাশা করতো। নানা ধরনের ইঙ্গিতপূর্ণ বা চটুল কথা বলতো বা প্রশ্ন করতো। কিন্তু দ্যাশআলি ভাই কথা বলতো খুব কম। সম্ভবত ছেলেবেলা থেকেই সে অন্যদের হাসি-তামাশায় অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। ফলে সে কিছু মনে করতো না। মুখ বুজে শুনতো, কখনো নিমীলিত ঠোঁটে হাসতো, দশটা প্রশ্নের মধ্যে বড়জোর তিনটের উত্তর দিতো। তবে কখনো কখনো যে এর ব্যত্যয় ঘটতো না তা নয়, যখন তার আত্মসম্মানে ঘা লাগতো তখন সে স্বভাব বিরুদ্ধ হয়ে দু-চারটে বেশি বাক্য ব্যয় করতো। যেমন জিরোনোর ফাঁকে আমগাছে পিঠ ঠেকিয়ে সাধনকুমার যদি তাকে বলতো, ‘এই দ্যাশআলি তুই বলে তোর বউ’র সাথে পারিসনে?’

দ্যাশআলি ভাই যথারীতি নীরব। আবার সাধন কুমারের খোঁচা, ‘কিরে, কতা কইসনে ক্যা? তালি তো মানষির কতাই সত্যি, তুই তোর বউ’র সাথে পারিসনে!’

পাশ থেকে হয়তো দবির আলি বলে উঠলো, ‘কি চ্যাটের পুরষে মানুষ তুই যে এট্টা বউ, তাও ঠিক মতো করবার পারিসনে!’
নিজের পৌরুষে ঘা লাগতেই দ্যাশআলি ভাইয়ের আত্মসম্মান জাগ্রত হতো, ‘না পারিনে, উরে মা উরে করে!’

এই আদি রসাত্মক বিষয়ে দ্যাশআলি ভাইয়ের মুখ খোলাতে পেরে সবাই বেশ খুশি হতো, তাকে আরো চাগিয়ে দেবার চেষ্টা করতো, তার মুখ থেকে আরো রসের কথা শুনতে চাইতো আর আমি বা আমার বয়সীরা নিজেদের মধ্যে ইশারা বিনিময় করে বেশ আমোদ অনুভব করতাম! কিন্তু আমোদে ছাই দিয়ে দ্যাশআলি ভাই আবার চুপ। এদিকে সাধানকুমাররাও ছাড়বার পাত্র নয়, তার পৌরুষ প্রশ্নবিদ্ধ করে একের পর এক চটুল বাক্য নিক্ষেপ করতো। বাধ্য হয়েই আবার মুখ খুলতো সে, ‘তোর বউ’র কাছে একনাত্তির থাকপার দিস, দেকসেনে পারি কি না পারি!’

অস্ত্র মোক্ষম, কিন্তু বিপক্ষও তখন চুপ করে থাকতো না। ‘ধুর শালার বিটা’ বলেই দ্যাশআলি ভাইয়ের দিকে ঠাট্টার ছলে বেশ জোরেই চালাতো হাত কিংবা পা।

আবার হয়তো কোনোদিন পাট নিড়ানির ফাঁকে হাতাইলে বসে বিড়ি টানতে টানতে সুরেন কুমার বলতো, ‘ও দ্যাশআলি, তোর বউ বলে তোরে মারে?’

এটা তার মনঃকষ্টের জায়গা, আর সে জায়গাতেই সুরেন কুমারের খোঁচা। মুখে কিছুই বলতো না সে, চোখে হয়তো ভাসতো বউয়ের হাতে মার খাবার দৃশ্য। সত্যিই বউ তাকে প্রায়ই মারতো। সে আপ্রাণ চেষ্টা করতো বউয়ের মন রক্ষা করে চলার, তবু বউ তাকে চড়-থাপ্পড় মারতো, হাতা-খুন্তি ছুড়ে দিতো তার দিকে, মাঝরাতে ঘর থেকে বের করে দিতো। লোকের সামনে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করতো। তার যে-সব পড়শি হাসান আলি বা ইসাক আলিরা কামলা দিতে আসতো তারাই আমাদের গ্রামে ছড়িয়েছিল এসব কথা। আর ওই যে একবার মাঝরাতে বউ তাকে ঘর থেকে বের করে দিয়েছিল, তা থেকেই লোকের ধারণা দ্যাশআলি ভাই বউয়ের শারীরিক চাহিদা পূরণ করতে পারে না, তাই বউ তাকে ঘর থেকে বের করে দিয়েছিল।

দ্যাশআলি ভাই হয়তো মনে মনে ভাবতো যে দজ্জাল মাগির নাগি কামে আসেও শান্তি নাই! আর সুরেন কুমারদের পুনঃ পুনঃ প্রশ্নে সে মুখ খুলতো, ‘কিডা কোলো?’
‘কিডা আবার! তোগের গিরামেরতে যারা কামে আসে তারাই তো কয়।’
‘নাম ক।’
‘কতোজনই তো কয়, নাম মনে করে বসে আছি নাকি!’

দ্যাশআলি ভাই সুরেন কুমারের কথার আর কোনো উত্তর না দিয়ে একটা বিড়ি ধরিয়ে ধোঁয়া ছাড়তো আকাশের দিকে, যেনবা মনের দুঃখ উড়িয়ে দিতে চাইতো।

দ্যাশআলি ভাই একটু হাবাগোবা ধরনের বলে প্রায় সকলেই তাকে নাম ধরে ডাকতো। তার চেয়ে বয়সে অনেক ছোটরাও তাকে দ্যাশআলি এবং তুই সম্বোধন করতো। তাতে দ্যাশআলি ভাই কিছু মনে করতো না অথবা তার খারাপ লাগলেও কখনো প্রকাশ করতো না।

তবে দ্যাশআলি ভাইকে লোকে যতোই সহজ-সরল, হাবাগোবা কিংবা বোকা ভাবুক সে গণতন্ত্র বোঝতো! গ্রামের খেটে খাওয়া কামলা হলেও গণতন্ত্র বুঝতো সাধনকুমাররাও! জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় সাধনকুমাররা হাজার বুঝিয়েও দ্যাশআলি ভাইয়ের রাজনৈতিক আদর্শ থেকে তাকে টলাতে পারতো না। সাধনকুমাররা দ্যাশআলি ভাইকে বলতো, ‘এই দ্যাশআলি, ‘শালার বিটা, ধানের শিষে কিন্তু ভোট দিবিনে।’
বার কয়েক এরকম বলার পর বিড়ির ধোঁয়া নাক-মুখ দিয়ে ছেড়ে দ্যাশআলি ভাই বলতো, ‘তয় কিসি ভোট দেব?’
‘নৌকায়।’
‘ধানের তে চাইল অয়, সেই চালির ভাত খায়েই আমরা বাঁচি; আর নৌকায় তো আমাগের চড়াই নাগে না!’
‘ওরে বুহাচুদা, চাল খায়ে বাঁচপার চালি নৌকায় ভোট দিস, ধানের শিষি ভোট দিলি আর চাল কিনে খাওয়া লাগবেন না; যে কয় টাহা কামাই করিস, চাল কিনতিই ফুরো যাবেনে।’
‘তুরা ধানের শিষি ভোট দে, দেকসেনে চালির দাম কুমে যাবেনে।’
‘বাল কুমবেনে!’
‘নৌকায় ভোট দিলি এই দেশ ভারত অয়ে যাবেনে।’
‘ধুর বুগদাচুদা! বাংলাদেশ ভারত অবি কোন দুঃখি?’
‘হাসিনা এই দেশ ভারতের কাছে বেচে দিবেনে, বেচে দিলি তুমাগেরই তো বাহার। তহন তো হিন্দুগের দেশ অবেনে।’
‘বুদাই, এইসব বালের কতা তোরে কিডা শিহেইছে?’
‘শিহেন নাগবি ক্যা, আমি বুঝিনে!’

দ্যাশআলি ভাই বিজ্ঞের মতো বিড়ি টানতো। আজন্ম মুখচোরা দ্যাশআলি ভাই গণতন্ত্রের ব্যাপারে কোনো ছাড় দিতো না। তার শেখা বা জানা গণতান্ত্রিক বুলি আওড়াতো, ‘হাসিনার দাদী তো হিন্দু ছিল, এর নাগি-ই তো হিন্দুগের নাগি তার এতো দরদ।’
কাঁধে কি পাঁজরে খোঁচ মেরে মুখ ঝামটা মারতো সাধনকুমারা, ‘ধুর হাবলাচুদা, তোরে কিডা কইছে হাসিনার দাদী হিন্দু ছিল?’
‘আমাগের মসজিদের ইমাম।’
‘সেও তোর মতো বুহাচুদা।’
‘হ বুহাচুদা! ইমাম সাহেব এতো বড় বড় কুরান-হাদিস পড়ে। সে আমাগের মতো মুখ্খু না।’

সাধনকুমাররা নিজেদের গণতান্ত্রিক বুঝ দিয়ে দ্যাশআলিকে বোঝানোর শত চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হতো। তারপর বলতো, ‘তুই যে ধানের শিষি ভোট দিস, ম্যাডামের ধলা মুখ দেহে?’
‘হ ধলা মুখ দেহে ভোট দেই তাতে তোর কী! ম্যাডাম তো ধলাই, দেখতি কি সুন্দর সিনেমার নায়িকার নাহাল, আর হাসিনা তো কালা, কামের বিটির নাহাল।’

এরপর তাদের গণতান্ত্রিক আলোচনা পুনরায় আদিরসাত্মক পথে ফিরতো। দিনের পর দিন এভাবেই চলতো।

দুই

এখন দ্যাশআলি ভাইয়ের বয়স হয়েছে, তার মুখের কুঞ্চিত চর্ম আরো কুঞ্চিত হয়েছে। বয়স হয়েছে সাধনকুমারদেরও। সকলেরই চুলে পাক ধরেছে। সকলেরই স্ত্রী-ছেলে মেয়ে আছে। কিন্তু এতো বছর ক্ষেতের হাতাইলে কিংবা বট-আম কি বাবলা গাছের ছায়ায় বসে গণগন্ত্র চর্চার পরও তাদের জীবনযাপনের কোনো পরিবর্তন হয় নি। তাদের আর্থিক স্বচ্ছলতা ফেরেনি। সাধনকুমারদের যে সামান্য জমি ছিল এখনও তাই আছে, একটু বাড়ে নি, বরং কারো কারো কমেছে। এখনো সাধনকুমাররা নিজের ক্ষেতের কাজ শেষ হলে অন্যের জমিতে কামলা খাটে। সাধনকুমারদের কেউ কেউ জায়গা-জমি বেচে ভারতে চলে গেছে ভাগ্য বদলের আশায় আর নিপীড়নের হাত থেকে বাঁচতে। এই দেশে প্রায়ই সাধন কুমারদের জায়গা-জমি দখল করে প্রভাবশালী আবেদ কিংবা ছমেদরা। ফলে সাধনকুমাররা কেউ ভারতে চলে গেছে, আর যারা আছে তারাও আজ যাই কাল যাই করে মাথার চুল পাকিয়ে ফেলেছে, কিন্তু যাওয়া আর হয় নি। এদিকে দ্যাশআলি ভাইয়ের পরিবার বড় হয়েছে। গামছায় বাঁধা আধ সের চালে তার একবেলা হয় না। ঘুরপথে বাজারে গিয়ে তাকে আরো চল কিনতে হয়। তার ফেরার পথের দিকে তাকিয়ে থাকে তার রাগী স্ত্রী।

পরদিন ভোরবেলায় স্ত্রীর পাশ থেকে উঠে অশক্ত শরীরে আবার পথে বের হয় দ্যাশআলি ভাই। তার গতি আগের চেয়ে আরো মন্থর হয়েছে। এক মাইল মাটির রাস্তা, বাকি আধা মাইল বিরান মাঠ। দ্যাশআলি ভাইদের কষ্টের কথা চিন্তা করে এই আধামাইল বিরান মাঠে আজো একটা রাস্তা নির্মিত হয়নি। অথচ আজো কী বিপুল উৎসাহে পরিচ্ছন্ন পরিচ্ছদ পরে ভোট কেন্দ্র গিয়ে ব্যালট পেপারে ছাপ মারে সে এবং তার মতো অন্য কামলারা! অথচ ভোটের পরদিনই তাকে বা তাদেরকে আবার ছুটতে হয় বিরান মাঠের ভেতর দিয়ে, জল-কাদা ভেঙে। আজো দ্যাশআলি ভাইদের পা কাটে পচা শামুকে, ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হয়।
কিন্তু আজো দ্যাশআলি ভাই আর সাধনকুমাররা একইভাবে তর্কে লিপ্ত হয়ে গণতন্ত্রের চর্চা করে!

ঢাকা।
ফেব্রুয়ারি, ২০১৭।

বিভাগ: 

Comments

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

মিশু মিলন
মিশু মিলন এর ছবি
Online
Last seen: 34 min 33 sec ago
Joined: সোমবার, ফেব্রুয়ারী 20, 2017 - 9:06অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

ফেসবুকে ইস্টিশন

কপিরাইট © ইস্টিশন ব্লগ ® ২০১৮ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর