নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 8 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • সাইয়িদ রফিকুল হক
  • কাঠমোল্লা
  • নুর নবী দুলাল
  • বিকাশ দাস বাপ্পী
  • চিত্রগুপ্ত
  • মৃত কালপুরুষ
  • অ্যাডল্ফ বিচ্ছু
  • নরসুন্দর মানুষ

নতুন যাত্রী

  • আদি মানব
  • নগরবালক
  • মানিকুজ্জামান
  • একরামুল হক
  • আব্দুর রহমান ইমন
  • ইমরান হোসেন মনা
  • আবু উষা
  • জনৈক জুম্ম
  • ফরিদ আলম
  • নিহত নক্ষত্র

আপনি এখানে

প্রবাসের অখ্যাত গল্প-১০



যথারীতি সকালের ঘুম ভাঙতে তাড়াহুড়া নেই, আর থাকবেই বা কেন সূর্য সেই কবেই উত্তর মেরু থেকে বিদায় নিয়েছে দেখা দেবে শীত পার হবার পর, কবি মদনমোহন তর্কালঙ্কার যদি একবার এই উত্তরের হাড় কাঁপানো শীতে একটা রাত থেকে যেতেন তবে কবি
‘পাখি সব করে রব রাতি পোহাইল।
কাননে কুসুমকলি সকলি ফুটিল।।
কবিতাটি রচনা করার আগে অন্তত আর একবার ভেবে দেখতেন।
বড়দিনের ছুটিতে এমনিতেই ঘুম থেকে তাড়াতাড়ি জেগে ওঠার কারুরই তেমন তাড়াহুড়া নেই । বাইরে তখনও ঘন অন্ধকার, নির্ধারিত হল আজ সবাই বাসে চেপেই লুলিও শহরে যাবো, বরফের তৈরি ভাস্কর্যটি দেখে কিছুক্ষণ এদিক সেদিক ঘোরাঘুরি সেরে সন্ধেবেলা শহরের একটি হোটেলের নাচ ঘরে বড়দিন উপলক্ষে এক বিশেষ আয়োজন তাই সবাই মিলে সেখানেই যাবার পরিকল্পনা। এমনিতেই আমার মত শ্যামবর্ণ মানুষ এ অঞ্চলে খুব একটা দেখা যায় না বাসে উঠেই বুঝতে পারলাম সবাই একটু আড় চোখে আমাকে আর একবার দেখে নিচ্ছে, অবশ্য এ দেখা সে দেখা নয় এ দেখার মাঝে একটা আনন্দঘন কৌতূহল আছে যা কিনা আমি খুব সহজেই আঁচ করতে পারছিলাম, একটু শিহরণ অনুভূতি ক্ষণে ক্ষণে মনটাকে খানিক আন্দোলিত করছিল। বিশেষ করে একজন স্বর্ণকেশী শেতাঙ্গিনী বাসের এক প্রান্তে আমাকে দেখে খানিক মুচকি হেসে মাথাটা একটু দুলিয়ে এই শহরে নতুন এক ভিন দেশী শ্যামবর্ণাকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছিল, এটাই ইউরোপে এক ধরনের অলিখিত ভদ্রতা, কারণ খুব সহজেই বোঝা যাচ্ছে আমি তাদের জাতের কেউ না বরং আমি এই এলাকাতে নতুন এসেছি। কিন্তু তাদের এই মুচকি হাসি আমার হৃদয়কে যে কি ভাবে আন্দোলিত করছিল তা হয়তো কোনদিনই ওদের কাছে প্রকাশ করা যাবে না, এত কাছে থেকে দুধে আলতা মেশানো ধব ধবে সুন্দরী রমণীদের সাথে এক সাথে বাসে চেপে বসবো সেটা কি আমি এই ইহ কালেও চিন্তা করেছি, মানের মাঝে কত শত স্মৃতি, হঠাত করেই অশান্ত মনটা মুহূর্তের মাঝেই কত ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, কৈশোর বেলাটা ভাল কি মন্দ সেটা বিচার করার জ্ঞান তখনও হয়ে উঠেনি তবুও কাউকে সেই কথাটা বলার উদ্দাম ইচ্ছেটা আর ধামা চাপা দেয়া যাচ্ছে না , সমাজ, জাত, পাত সব কিছুই বলছে কাউকে তোমার সেই না বলা কথাটা বলা যাবে না, কিছু বলতে গিয়ে খুব কাছে চলে আসা যাবে না, জাত, ধর্ম, কৃষ্টি, সমাজ চোখ রাঙিয়ে হুমকি দিচ্ছে, বছরের একটি দিনও কাউকে সেই কথাটি বলার উপায় ছিলনা, সমাজ বলেছে কাছে পাওয়ার অধিকার তোমাকে দেয়া যাবে না। তখন হয়তো কলেজে পড়ি, খুব শখ করে বাবা মার'র কাছে একটা স্পোর্টস সাইকেলের আবদার করে বসলাম, টাইট ফিট গা চাপা শার্ট আর বেল বটম পেন্ট, নিজেকে দেখতে যে কমলা সার্কাসের চিড়িয়ার মত লাগতো সেটা আজ বুঝতে পেরেছিলাম অনেক বছর পর , শার্ট এর বুকের উপরের বোতাম দুটো খোলা ছিল কিনা মনে নেই তবে, তাকে তো আমার কিছু বলার ছিল। যেই না তাকে একটু দেখতে যাবো আর ঠিক সেই মুহূর্তে সাইকেল নিয়ে ভর দুপুরে জাম্বুরী মাঠের পাশের রাস্তার নর্দমায় পরে যাই, এতদিন লজ্জায় কথাটা কাউকে বলা হয়নি, কারণটাই তো ছিল সেই কথাটি তাকে জানানো, সাইকেল নিয়ে একটি মেয়েকে দেখতে যাবার কারণে নর্দমায় পরে যাওয়া বিষয়টা খুব গর্ব করে বলার মত একটা ঘটনা হতে পারে কি ? আপনারাই বলুন ? সেই দিনও তাকে কিছু বলা গেল না, কোনদিনই ভাবিনি সেই কথাটা আর কোনদিনই বলা হবে না। আর আজ কিনা এই ইউরোপের স্বাধীন সমাজে এসেও বাসের ঠিক পাশের সিটে জানালার ধারে বসা মেয়েটিকে সেই কথাটাই বলতে পারছি না, আসলে বুঝতে পারছি আমার দ্বারা এ জগতে হয়তো কাউকেই কোনদিন ঠিক ভালবাসা জানানো হবে না, নিজের উপর বেশ রাগ হচ্ছিল। বাসটা পরের স্টপেজে থামতেই একজন তরুণ যাত্রী হুট করে বাসে উঠেই মেয়েটির পাশে বসে পড়লো, বসে পড়লো তো বটেই কিন্তু কোনদিকে ভ্রূক্ষেপ না করেই মেয়েটিকে জড়িয়ে ধরে গভীর আলিঙ্গনে ঠোটের উপর ঠোট রেখে দীর্ঘ একটা সময় চুমু খেলো, বিষয়টি ইউরোপে খুবই স্বাভাবিক একটি ঘটনা যা নিয়ে বাসের একটি যাত্রীও কৌতূহল প্রকাশ করছে না যে যার কাজে মনোনিবেশ করেছে, আমি দেখেও না দেখার ভান করে কলেজ জীবনের সেই কল্পনার সাগরে গা ভাসিয়ে দিলাম, কতবার যে তাকে বলার চেষ্টা করেছি আর হয়তো বলতে চাইলেও কোনদিন বলা হবে না, ধর্ম, জাতী, বর্ণ, গোত্র ও এসবের ঊর্ধ্বে এসে তাকে বলতে চেয়েছিলাম , নিবিড় ভাবেই ঠোটে ঠোট রেখেই বলতে চেয়েছিলাম, সমাজের কড়া শাসনের অন্তরালে সে সুযোগটা হাত ছাড়া হয়ে গেল, আজও পৃথিবীর পথে পথে ঘুরে বেড়াই, কিন্তু হারিয়ে যাওয়া সে তো আর ফিরে আসবে না। দিন কেটে যায় আশায় আশায়, আবারও চির জনমের সেই আশা যে আর পূরণ হবার নয়, সেই বয়সে তো জাত, ধর্ম, বর্ণ কৃষ্টি, সংস্কৃতি সব কিছুকেই জয় করার জন্যেই তো আমার জন্ম, কিন্তু এমনও ঘন বর বরিষায় আর কিছুই বলা হয়ে ওঠে না। বাস আরও দু স্টপেজ পার হতেই মেয়েটি ছেলেটিকে নিয়ে কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে একটি ইনডোর সুইমিং পুলের সামনে নেমে পড়লো, বিষয়টি বুজতে চেষ্টা করছি, তারা কি একসাথে সাতার কাটবে! এর নামই হয়তো ব্যক্তি স্বাধীনতা, তাই প্রাপ্ত বয়স্ক ছেলেমেয়েদের প্রাণ খুলে মুক্ত বিহঙ্গের মত চলা ফেরাতে এখানকার সমাজ রীতি, নীতি কিছুই বাধার সৃষ্টি করেনা, খুব গভীর ভাবে চিন্তা করে বুঝতে পারছি জীবনকে সুন্দর করে সাজাতে ব্যক্তি স্বাধীনতার প্রয়োজনীয়তা কতটুকু।

খেলাধুলা আর পড়ালেখার চাপ ক্রমশই বাড়তে থাকে আমি ফাস্ট ইয়ার থেকে সেকেন্ড ইয়ারে উঠে পরি। মা'র কড়া আদেশ এইচ এস সি পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বছর আর ঢাকা লীগ খেলা হচ্ছে না আর আমিও তা চাইছি না , যদিও বাবা প্রতিদিন সকালে আমাকে প্র্যাকটিসের জন্যে মাঠে নিয়ে যাচ্ছেন, প্র্যাকটিসের পরেই আবার কলেজে যেতে হয় কিন্তু কলেজে যাওয়ার পথে সেই আগের মত তার সাথে দেখা হচ্ছে না , সেও মনে মনে হয়তো এতদিনে আমার মনের অবস্থাটা জেনে গেছে। কিন্তু সত্যিকার অর্থে প্রেম বলতে যেটা বোঝায় সেটা কি এখনো হয়ে ওঠেনি? দূর থেকে দেখে মুচকি একটু হাসা এই যাহ। মান্নানকে সাথে নিয়ে বিকেল বেলা জাম্বুরী মাঠে প্র্যাকটিসে চলে যাই তবে একটু উল্টো পথে ঘুরে যাই , মানে ওদের বাসার সামনে দিয়ে উল্টো পথে হেটে মাঠের দিকে রওনা হই। মান্নান আমার ছোটবেলার বন্ধু একই সাথে খেলা ধুলা শুরু করেছি, মান্নান দেখি নিজেই আমার কাণ্ড দেখে মুচকি মুচকি হাসে, রাগে দুঃখে একদিন মান্নানকে ধরেই বসি , "শালা এত হাসা হাসি করলে তোমার প্রেমের বারোটা বাজিয়ে দেব" মান্নানের প্রেম বেশ গতি পেয়েছে বলেই তো মনে হচ্ছে কারণ তারাবির নামাজের বাহানায় পুরো সময়টা মান্নান বেশ আনন্দেই কাটায়, নার্গিসদের বাসার পেছন দিকে হাসপাতালের দেয়ালের উপর বসেই সন্ধ্যে বেলা আমাদের আড্ডা আর পুরো সময়টা বেশ ভালই কেটে যায়। নার্গিস আমার ছোট বেলার খেলার সাথী তবে মান্নান যে নার্গিসকেই কিছু একটা বলতে চায় বা বলেই ফেলেছে সেটা বুঝতে আমার আর বাকী থাকলো না শুধু আমারই তাকে আজ পর্যন্ত সেই কথাটি বলা হল না। ঢাকা লীগ খেলতে হবে সেই কারণে আমাকে ঢাকা চলে আসতে হল, একদিন হঠাৎ বুঝতে পারছি আমার খিদে লাগছে খেতে পারছি না, ঘুম পাচ্ছে ঘুমাতে পারি না, বাংলা গান শুনি মনে হয় ভজন শুনছি , তার মানে কোনও কিছুতেই মন বসাতে পারছি না, তার চাইতে বরং আমার ঢাকা না আসাটাই ভালো ছিল। আমার একটা ধারণা ছিল, যে সব ছেলেরা দুপুরের রোদে গাছের নীচে দাড়িয়ে থাকে, বাহারি কাপড় পরে মেয়েদের বাসার সামনে ঘুর ঘুর করে তার খুবই বখাটে আর এই বখাটে ছেলেদের কেইবা পছন্দ করবে। নিজেকে বখাটে শ্রেণীর পর্যায়ে নিতে খুব বিবেকে লাগতো কিন্তু এখন দেখছি ঠিক তার উল্টো বরং বখাটেদেরকেই মেয়েরা পাত্তা দেয় বেশী, আসলেই কি বখাটেরা প্রেমে ভাগ্যবান হয়? কি সব এলোমেলো প্রশ্ন মাথার ভেতর শুধুই ঘুরপাক খাচ্ছে। ইচ্ছে হচ্ছিল চিৎকার করে তাদের বাসার সামনে দাড়িয়ে তাকে জানিয়ে দেই "আমি কোন ছোকরা প্রকারের বখাটে না , আমার ভালো লাগাটা তুমি কি দেখতে পাওনি নাকি দেখতে চাওনি।" মাঝে মাঝেই ভাবি, আমি যদি ফুল টাইম বখাটে হবার প্র্যাকটিস করতাম তা হলে হয়তো আমার পারফরমেন্স আরও ভালো হতো । খেলাধুলাতে মন বসাতে পারছি না, পড়াশোনা কি আর বলতে, কোনরকম কলেজটা পার করেছি মাত্র। কিছুতেই দেশে থাকতে মন চাইছে না, সব কিছুতেই কেমন যেন ভাল্লাগেনা ভাল্লাগেনা দিন কাল চলছে আমার, কিন্তু দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলে তো আমার সেই তাকে আর খুঁজে পাব না, আর হলও ঠিক তাই, আজ আমি বাসে চেপে উত্তর মেরুর লুলিও শহরে ঘুরে বেড়াচ্ছি সে হয়তো অন্য কারুর সোহাগে তৃপ্ত হয়ে ডানোর গুড়ো দুধের জন্যে দোকানের লাইনে দাড়িয়ে আছে, আর আমারই মত একটি ছেলে আর একটি মেয়ে দুজন দুজনার সোহাগে তৃপ্ত হয়ে ইউরোপের লুলিও শহরের একটি ইনডোর সুইমিং পুলে সাতার কেটে বেড়াচ্ছে, এটাই হয়তো জীবন, সমাজে জাত পাতের দুটি ধারা আমাদের অনুভূতিকে দুই মেরুতে দাড় করিয়ে রেখেছে। আসলে প্রেম বিষয়টি সব মানুষে সব জাতে দেখতে একই রকম শুধু মাত্র সমাজে ব্যক্তি স্বাধীনতার কারণেই প্রেমের প্রকাশটা ভিন্নতর। একটি মেয়ে ও ছেলে একে অপরকে ভালবাসবে, প্রেমে পড়বে, এটাই তো স্বাভাবিক কিন্তু এর প্রকাশটা নির্ভর করে কোন সমাজটা কতটা কুসংস্কার মুক্ত।

লুলিও শহরটি খুব একটা বড় না হলেও দেখার আছে অনেক কিছুই , শহরের ঠিক মাঝ খানটায় একটি চত্বরে লেক থেকে কেটে আনা বরফের টুকরো জোড়া দিয়ে দিয়ে প্রায় ১৫ ফুট উঁচু আকৃতির একটি বলগা হরিণের প্রতিকৃতি তৈরি করে চতুর দিক থেকে আলো জ্বলিয়ে সুসজ্জিত করে রাখা হয়েছে, প্রতি বছরই বড়দিন উপলক্ষে এ ধরনের প্রতিকৃতি বানিয়ে রাখা হয় , দূর দূরান্ত থেকে পর্যটকরা তা দেখতে আসে আর শহরে ঘুরে ঘুরে বড়দিনের বিশেষ ছাড়ের জিনিসপত্র কেনাকাটা করে বেড়ায়, এটাই এক ধরনের আকর্ষণ। সুইডেনের মানুষগুলো খুবই শান্ত স্বভাবের, কৌতূহল থাকলেও তা উচ্ছ্বাস করে প্রকাশ করেনা যদি পাছে লোকে আবার বিরক্ত বোধ করে, সত্যি অসাধারণ সুন্দর চরিত্র এ মানুষগুলোর, বিনা কারণে একটি গাড়িও রাস্তায় হর্ন বাজাবে না, পরে জানতে পেরেছি ভেঁপু বাজানো ইউরোপে এক ধরনের অভদ্রতা। সব জায়গাতেই ঘুরছি ফিরছি বটে তবে উপলব্ধি করতে পারছে আমি এ শহরে সম্পূর্ণ নতুন একজন অতিথি তা সবাই বুঝতে পারছে তাঁর একটাই মাত্র কারণ আমার গায়ের রং ও চেহারা, সচরাচর এই ছোট্ট শহরে একরকম সবাই প্রায় সব্বাইকে মুখে চেনে, বিশেষ করে আশি দশকে খুব একটা বিদেশী এদিকটায় আসেনি। আমিও বেশ আনন্দ পাচ্ছি বটে, বিশেষ করে স্বর্ণকেশী শেতাঙ্গিনীরা যখন আড় চোখে আমাকে আর একবার দেখে নিচ্ছে। গায়ে মোটা মোটা ফারের জুব্বা জড়িয়ে নেবার পরও প্রচণ্ড শীতের কারণে বাইরে খুব বেশীক্ষণ থাকাও যাচ্ছে না তাই সুযোগ পেলেই আমারা বিভিন্ন দোকানে ঢুকে পরছি, একবার একটি খাবারের দোকানে ঢুকতেই দুই আদুরে বুড়ি ঠিক আমার মুখোমুখি দাড়িয়ে আমার দিকে হা করে তাকিয়ে রইলো, অস্বস্থি নয় তবে বেশ কৌতূহল হল আমার নিজের, খুব বেশী বয়স্করা আবার ইংরেজি বোঝে না আর আমার সুইডিশ ভাষা বলতে গেলে হযবরল, রক্ষা পেলাম, আমাদের সাথে আসা এক বান্ধবী আমাকে উদ্ধার করলো, বুড়ি দুজন খুব আহ্লাদ করে আমার সাথে একটা ছবি তুলতে চাইলো . ক্যামেরা তাদের এক জনার সাথেই ছিল, আমিও খুব বিনয়ের সাথে রাজী হওয়াতে বুড়ি দু’জন এতটা খুশী হল যে আমাদেরকে তাদের বাড়িতে ডিনারের দাওয়াত দিয়ে বসলো, এই অসাধারণ ভদ্রতা ও আতিথীয়তা দেখে বুঝতে পারলাম আসলে নিজেদের আমরা যতটাই ভদ্র আর সভ্য ভাবি না কেন আমাদের একে অপরের কাছে অনেক কিছুই শেখার আছে।

সারাদিন ঘোরাঘুরির পর পেটের ভেতরটা কেমন চৌ চৌ করছে, ইউরোপে গরীবের খাবার বলতে যা বোঝায় ম্যাক্ডোনাল্ড থেকে একটা বিগ ম্যাক পেটে চালান করে দেয়া, সাথের বন্ধুদের যখনি জিজ্ঞাস করলাম চলো কোন ম্যাক্ডোনাল্ডস এ ঢুকে পরি আমি ছাড়া প্রায় সবাই এক সাথে হো হো হেসে দিল, বেশ রাগান্বিত হয়ে বললাম “এতে হাসার কি হলো”, পরে বন্ধুরা বুঝিয়ে দিল সুইডেনের এই একটাই মাত্র শহর যেখানে আমেরিকানরা শত চেষ্টা করেও এই শহরে ম্যাক্ডোনাল্ড রেস্তোরা খুলতে পারেনি এই শহরের মানুষরা ম্যাক্ডোনাল্ড পছন্দ করেনি। এই প্রথম বুঝতে পারলাম ইউরোপে কোন শহরে আমেরিকান কোন কোম্পানি এখনো খুঁটি গাড়তে পারেনি। ১৬২১ খির্ষ্টাব্দে গাম্মেলস্তাদ মধ্যযুগীয় গির্জা শহর ঘিরেই এই লুলিও শহর সম্প্রসারিত হয়, মৎস্যজীবীদের সাথে দক্ষিণের শহরগুলোর সাথে বাণিজ্যিক ব্যবসা গড়ে ওঠে তখন থেকেই, সম্ভবত প্রায় ৭০০০ বছর আগে মানুষ প্রথম এখানে বসবাস শুরু করে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০০ মিটার উঁচু বর্তমান লুলিও পৌরসভা, উত্তর মেরুর প্রায় শেষ প্রান্তে এই শহরের অবস্থান, প্রচণ্ড শীতে তাপ মাত্র ৪০ থকে ৫০ ডিগ্রী সেলসিয়াস নীচে নেমে যেতে পারে।
দুপুর সন্ধ্যে ও রাতের পার্থক্য বোঝার একমাত্র উপায় হচ্ছে ঘড়ির কাটা, আর ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলাম রাতের খাবারের আয়োজন করতে হবে কারণ রাতের অনুষ্ঠান নাচ ঘর মানে ডিস্কতে যাবার সুযোগটা কোনও ভাবেই হাত ছাড়া করতে চাইনা, সবার চাইতে আমার উত্সাহটা যেন একটু বেশী, যাই যাচ্ছি করতে করতে প্রায় সন্ধ্যে ৭টা বেজে গেল। রাতের খাবার বলতে যা বোঝায় এলির (এক ধরনের হরিণ বিশেষ-Moose) মাংস ক্রিম ও গোলমরিচের মিশিয়ে রান্না করে সাথে আলু সেদ্ধ গলোধাকরণ করতে আমার প্রাণের অবস্থা প্রায় ত্রাহি ত্রাহি, আর এটাই নাকি উত্তর মেরুর খুবই সুস্বাদু খাবার। ঢাকার কোন রেস্তরাতে এ ধরনের খাবার রান্না করা মাত্রই পৌরসভা রেস্তরার মালিককে আজীবনের জন্যে দেশত্যাগ করতে বাধ্য করতো, সে এক ভয়াবহ খাবার। এই স্মৃতিটা শুধু মাত্র জীবনের একটি অংশের, হয়তো এই স্মৃতিটা আমাকে সুখের সাগরে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারে না, তারপরও তো এটা একটা স্মৃতি, হোক সেটা দুঃখ মিশ্রিত সুখের।

সন্ধ্যাবেলা আমার যেন তর সইছে না, এই ছুটিতে ইউরোপে এসে ডিস্কতে যাবো না তা কি হয়, এবার আর বাস নয় বন্ধুর বাসা থকে আমাদের জন্যে গাড়ির ব্যবস্থা করা হল, রাতের অন্ধকার কেটে কেটে আমরা লুলিও স্তাদ্স হোটেলের দিকে ছুটে চলেছি, মনের গভীরে এক অজানা শিহরণ আমাকে বার বার জানিয়ে দিয়ে যাচ্ছে বাসের ভেতরে বসে থাকা সেই তরুণ তরুণীর ভালবাসার অভিব্যক্তি, কত নিশ্চিন্তে কত না স্বাভাবিক ভাবেই একে অপরের নিবির সান্নিধ্যে চলে এলো, দীর্ঘ চুম্বনরত এই যুগলকে দেখে কেউই কোনও কৌতূহল প্রকাশ করলো না , মনে হল এর চাইতে স্বাভাবিক ঘটনা এ জগতে আর কিছুই হতে পারে না। ইউরোপে বাংলাদেশ থেকে সদ্য আগত এক তরুণ নিজেকে সেই যুবকের জায়গাতে ভাবতে কতটা শিহরিত বোধ করছে তা একটিবার ভেবে দেখুন তো! গাড়ি ঠিক হোটেলের লবির সামনে দাড়িয়ে গেল, যথারীতি ডিস্কোটেকের ভেতর থেকে গানের শব্দ বাইরের ছড়িয়ে পড়ছে, নীলাভ আলোতে একটি বিশাল কক্ষে অগণিত মানুষের ভিড়ে ভেতরে ঢুকেই বুঝতে পারলাম আমি হয়তো একটি আনন্দ উল্লাসের মহাসাগরে ভেসে যাচ্ছি, কিন্তু কি আশ্চর্য এমন একটি অপূর্ব জগতের সন্ধানে তো আমার আরও দশটি বছর আগেই খুঁজে পাবার কথা ছিলো, প্রতিটি তরুণ তরুণীরা যেন বিনা কারণেই হেসে যাচ্ছে, এ যে এক আনন্দের ফোয়ারার নীচে আমি হারিয়ে যাচ্ছি , আড় চোখে ওয়াই ক্লিভের কাপড় পরিহিত রমণীদের হয়তো কদাচিৎ আগেও দেখেছি কিন্তু এতটা ক্লিভ আর গভীরতা আমি জীবনেও দেখতে পাবো বলে মনে করিনি, নিজের গায়ে একটু চিমটি কেটে পরখ করে নিলাম স্বপ্নের ভেতর আবার অবল তাবোল ভাবছি না তো, আসলে স্বপ্ন পুরী বলতে কিছুই নেই, বলতে গেলে এই পৃথিবীটাই এক অপরূপ স্বপ্ন পুরী, খুঁজে পাওয়াটাই হচ্ছে সার্থকতা।
“একটা রয়্যাল গুলি কিনতে পারিনি কখনো
লাঠি লজেন্স
দেখিয়ে দেখিয়ে চুসতো লস্কর বাড়ির ছেলেরা।
বিখিরির মত চৌধুরীর গেটে দাড়িয়ে দেখেছি।
ভেতরে হ্রাস উৎসব
অবিরাম রঙের ধারার মত সুবর্ণ কংকন পড়া
ফর্সা রমণীরা কত রকম আমোদে ভেসেছে।
আমার দিকে তারা ফিরেও তাকায়নি"
সুনিল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতার পংতিটি অন্তত এ ক্ষত্রে আমার জন্যে প্রযোজ্য হতে পারে না, প্রতিটি রমণীর শরীরের প্রতিটি ভাজে ভাজে এক সম্মোহনের অনুভূতি, এ অনুভূতি নিয়ে হয়তো আমার পক্ষে এ ভাবেই বেঁচে থাকাটাই দায়, রমণীদের পরিধানে বস্ত্রের এতটাই স্বল্পতা যেন বাকিটা পরার বিশেষ কোন প্রয়োজন ছিলো না ? এ এক ভিন্ন জগতের মানুষ, এরা যে এতটা বাকপটু, হাস্য উচ্ছল, সব্বাই একে অপরের সাথে এতটাই নিবির ভাবে কথা বলছে যেন একে অপরের কতকালের চেনা, বাইরে থকে চেনার কোন উপায় নাই। দুরে এক কোনায় বাসে থাকা মেয়েটি বার বার ঘুরে ফিরে আমার দিকে কেমন যেন দেখছে আর মুচকি হাসছে কাছে আসতেই খানিক অবাক দৃষ্টিতে চয়ে রইলাম, মেয়েটি নিজেই আমাকে তার পরিচয় দিয়ে বলতে শুরু করলো “ আজ তোমাকে বাসের ভেতর দেখেই বুঝতে পেরেছি তুমি এ শহরে নতুন এসেছ” আলাপ চারিতার মাঝে আমি তার বেশভূষা আর মেধার প্রশংসা না করে পারছি না অসাধারণ সুন্দর মনের মানুষ কিন্তু মনে তো ভয় একটাই মেয়েটিকে তো তার বন্ধুর সাথে খুব নিবির ভাবেই দেখেছি, তা আমি এখন কি করে বলি তাকে আমার ভালো লেগেছে, আমার দৃষ্টি বার বার তাঁর শরীরের বিভিন্ন ভাজের মাঝে হারিয়ে যাচ্ছে। খানিক পর মেয়েটি আমাকে ভালো থেকো বলেই আমার কাছ থেকে সটকে পড়লো, কিঞ্চিত আহত হলাম বৈকি, অনেকেই বেশ আগ্রহ নিয়ে ভিনদেশী এই আমার সাথে গল্প করতে এগিয়ে আসছে বটে তবে কিছুক্ষণ পর সটকে পড়ছে, কেউ কারুর দিকে যৌনতার দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে নেই একমাত্র আমি ছাড়া। আমার যেন তারপরও ক্লান্তি নেই, আগ্রহ নিয়ে একটু পর পর ফ্লোরে নাচাতে যাচ্ছি, এ বিষয়ে অবশ্য দক্ষতা বেশ আগে থেকেই ছিল।

ফেল ফেল করে পুরো ডিস্ক টেকের ভেতরের পরিবেশ দেখে বুঝতে পারলাম আসলে আমার মত গর্দভ এই ইহ জগতে আর একটাও নেই, একজন মানুষও খুঁজে পেলাম না যে কিনা আমার মত যৌনতার দৃষ্টি নিয়ে তাদের শরীরের ভাজের দিকে তাকিয়ে আছে। এদেশে ছেলে মেয়েদের মাঝে মেলামেশা এতটাই সহজ ও পরিছন্ন যে কেউ কারুর দিকে যৌনতার দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে দেখাটাকে অভদ্রতা বলেই মনে করে আর তার প্রয়োজনটা এই সমাজে ফুরিয়ে এসেছে শত বছর আগেই, আমাকে অপছন্দ করার কারণ ঐ একটাই, মুখে হয়তো কেউ আমাকে সে কথাটা জানান দিয়ে যায়নি।

--- মাহবুব আরিফ কিন্তু

Comments

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

কিন্তু
কিন্তু এর ছবি
Offline
Last seen: 1 week 17 ঘন্টা ago
Joined: শুক্রবার, এপ্রিল 8, 2016 - 5:41অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

কু ঝিক ঝিক

ফেসবুকে ইস্টিশন

SSL Certificate
কপিরাইট © ইস্টিশন.কম ® ২০১৬ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর