নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 5 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • মৃত কালপুরুষ
  • মাইকেল অপু মন্ডল
  • ড. লজিক্যাল বাঙালি
  • সুবর্ণ জলের মাছ
  • দ্বিতীয়নাম

নতুন যাত্রী

  • অনুপম অমি
  • নভো নীল
  • মুমিন
  • মোঃ সোহেল রানা
  • উথোয়াই মারমা জয়
  • শাহনেওয়াজ রহমানী
  • জিহাতুল
  • আজহারুল ইসলাম
  • মোস্তাফিজুর রহম...
  • রিশাদ হাসান

আপনি এখানে

সভ্য মানুষদের শোষণ ও স্বার্থের আদর্শ শিকারঃ ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অফ কঙ্গো


ধরেন, কোনো একটা দেশের আয়তন বাংলাদেশের আয়তনের ১৫ গুণ বেশি, জনসংখ্যা অর্ধেকেরও কম। আবার সেইদেশের আবহাওয়া ভালো, মাটি উর্বর। বনজ সম্পদ, প্রবাহমান নদী এবং অঢেল খনিজ সম্পদে ভরপুর সেই দেশ। সেইদেশের মাথাপিছু আয় কি আমাদের দেশের তিনভাগের একভাগ হবার কথা? মাথাপিছু আয় দিয়ে কোনো অঞ্চলের মানুষের জীবনধারণের মান বোঝা যায়। তবে কোনো হিসেব নিকেশেই এত সম্পদ, অনুকূল পরিস্থিতি থাকবার পরেও সেইদেশের মানুষের জীবনযাত্রার মানের এমন অবস্থার ব্যাখ্যা মাথায় ঢুকবার কথা নয়।

দেশটার নাম কঙ্গো, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অফ কঙ্গো। আরেক কঙ্গো আছে রিপাবলিক অফ কঙ্গো নামে, সেটা ফ্রেঞ্চ কলোনী ছিল। এই কঙ্গো ছিল বেলজিয়ান কলোনী। খুব বেশিদিন বেলজিয়ান কলোনী ছিল না ভারত কিংবা অন্য অনেক ইউরোপিয়ান কলোনীর মত। তবে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে কলোনিয়াল প্রভূদের অত্যাচার, নির্যাতন, লুটপাটের যে মাত্রা তাদের ভাগ্যে লেখা হয়, তার তুলনা সম্ভবত আর একটাও দেয়া যাবে না বিশ্বব্যাপী ইউরোপিয়ান কলোনিয়াল পিরিয়ডের জানা ইতিহাসে।

১৮৮৪ থেকে ১৮৮৫ সালে জার্মান এম্পায়ারের বার্লিনে একটা অশুভ সম্মেলন হয়। এই সম্মেলনে ইউরোপিয়ান শক্তিগুলো আফ্রিকায় তাদের কলোনীগুলোর জন্য তখন পর্যন্ত প্রচলিত রীতিগুলো পালটে ফেলে। এর পূর্বে সম্পদ আহরণ হতো স্থানীয় গোত্রপতি ও শাসকদের সাথে চুক্তির মাধ্যমে, কলোনীর মানুষদের আইনত নিজদেশের নাগরিকের সমান মর্যাদাই থাকতো, বাস্তবে থাকুক আর নাই থাকুক। এই সম্মেলনে সভ্যতার ছায়ায় আনবার জন্য আফ্রিকান কলোনী ও অন্য অঞ্চলগুলোতে প্রচলিত স্বায়ত্বশাসন ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রায় পুরোপুরি রহিত করা হয়। এই কনফারেন্সের একটা মতৈক্য বা সিদ্ধান্তের একটি ছিল বর্তমান ডি আর কঙ্গোকে বেলজিয়ামের রাজা ২য় লিওপোল্ডের ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে মেনে নেয়া। বিশ লক্ষ কিলোমিটারের বিশাল সেই অঞ্চলের নতুন নাম হয় কঙ্গো ফ্রি স্টেট। এই স্টেট পরিচালনা কিংবা শোষণের জন্য গঠিত হয় ফোর্স পাবলিক নামের কলোনিয়াল সামরিক ইউনিট। ইংরেজ, ফরাসি কিংবা পর্তুগিজদের সম্পর্কে তাদের কলোনীগুলোতে চালানো শোষণ, নির্যাতন ও বর্বরতার অনেক কাহিনি জানা যায়। তবে ডাচ কিংবা এই বেলজিয়ানদের ছাড়িয়ে যাওয়া তাদের মধ্যে সবচেয়ে নৃশংসদের পক্ষেও কঠিন হবে। কপাল ভালো, ভারতীয় উপমহাদেশ ডাচ কিংবা বেলজিয়ান কলোনী ছিল না। ইংরেজরা এই উপমহাদেশে অন্তত শিক্ষিত কেরানি শ্রেণি রেখে গিয়েছিল, ছিল কিছু আইনকানুন, মোটামুটি একটা শাসনব্যবস্থা। কিন্তু
ডাচ ও বেলজিয়ান কলোনীগুলো ছিল নির্দয় শোষণনির্ভর, তাও প্রক্রিয়াটা ছিল দ্রুত। তারা যথাসম্ভব কম সময়ে একটা অঞ্চলের সবটুকু শুষে নিতে উদগ্রীব থাকতো।

১৮৮৫ থেকে ১৯০৮ সাল পর্যন্ত কঙ্গো কিং ২য় লিওপোল্ডের সম্পত্তি থাকে। এই সময়ে কঙ্গোর ২ কোটি মানুষের মধ্যে ১ কোটি মানুষ মারা যায়। তাদের মৃত্যুর প্রধান কারণ ছিল শারীরিক অত্যাচার ও মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়া রোগ। অধিক মৃত্যুহারের কারণও ছিল অপুষ্টি ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। গুটিবসন্ত ইউরোপিয়ানদের মাধ্যমে সেখানে পৌঁছায় এবং লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা যায়। কঙ্গো ফ্রি স্টেট থেকে অতিরিক্ত আয়ের জন্য সমগ্র অঞ্চলের মানুষকে বেলজিয়ানরা 'ফোর্স পাবলিকের' মাধ্যমে রাবার চাষে বাধ্য করে। এই রাবার শিল্পকারখানায় ব্যবহার করা হতো, আর ব্যবহৃত হতো গাড়ির টায়ার বানাতে। বেলজিয়ানরা প্রতিটি কঙ্গোলিজ পরিবারকে রাবার উৎপাদন বা সংগ্রহের একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা দিয়ে দিত। কেউ সেটা অর্জনে ব্যর্থ হলে তাদের উপর নেমে আসতো নির্যাতন। আর সেই নির্যাতনের সামান্য উদাহরণ ছিল প্রথমে সন্তানদের হাত পা কেটে ফেলা। নারীদের স্তন কেটে ফেলা হতো। আর লক্ষ লক্ষ কৃষকের সর্বশেষ পরিণতি হয় নিজের হাত পা হারানো, নাক ঠোঁট কর্তিত হওয়া এবং এরপর নির্মম নির্যাতনের মাধ্যমে মৃত্যু। বেলজিয়ান পার্লামেন্ট সম্ভবত ২০০১ সালের দিকে কঙ্গোলিজ নেতা প্যাট্রিক লুবুম্বাকে অনৈতিকভাবে হত্যায় বেলজিয়ামের দায় স্বীকার করে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চায়। তবে কোটি মানুষের জীবনের এমন পরিণতির দায় নিয়ে সামান্য ক্ষমা প্রার্থনা হয়েছে বলে জানা নেই, তাতেও কতটুকু কমতো আমি জানি না।


(এটা একটা বিখ্যাত (কুখ্যাত) ছবি। যেখানে এক কঙ্গোলিজ পিতা রাবার সংগ্রহের লক্ষমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হবার কারণে সন্তানদের কেটে নেয়া হাত পায়ের দিকে তাকিয়ে আছেন)

১৯০৮ সালে কংগোলিজদের এমন পরিণতির প্রমাণ পেয়ে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে কঙ্গোকে বেলজিয়ামের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসবার সিদ্ধান্ত নেয় বেলজিয়ান পার্লামেন্ট। তবে কঙ্গো ফ্রি স্টেট প্রশাসনের কর্মকর্তারাই মূলত থেকে যায়, তাদের আগের চর্চাও রাতারাত শেষ হয়ে যায়নি। কঙ্গোতে দুই ধরণের আইন ছিল, ইউরোপিয়ানদের জন্য একরকম, আদিবাসীদের জন্য অন্যরকম। তবে আদিবাসীদের আদালতের ক্ষমতা ছিল সীমিত। কিং লিওপোল্ডের শাসনের থেকে অবস্থার কিছু উন্নতি হয়। শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যক্ষেত্রে অল্প উন্নতি হয়। এর আগে কঙ্গোর অবকাঠামোগত উন্নতি বলতে ছিল কলোনীর প্রধান শহরে কিছু ঘরবাড়ি আর দেশজুড়ে কংগোলিজদের রক্তে দশকজুড়ে বানানো রেলনেটওয়ার্ক। সেই রেল নেটওয়ার্ক জনস্বার্থে বানানো হয়নি, বানানো হয়েছিল যাতে কঙ্গোর সম্পদ খুব সহজে বেলজিয়াম পাঠানো যায়।

১৯৬০ সালে মুভমেন্ট ন্যাশনাল কংগোলিজ পার্টির নেতা প্যাট্রিক লুবুম্বা পার্লামেন্ট নির্বাচনে জেতেন, উনি কঙ্গোর প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন। পার্লামেন্ট জোসেফ কাসাভুবুকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করে। অনেক আঞ্চলিক দল নানা প্রদেশে প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হয়। এরিমাঝে ৩০ জুন ১৯৬০ সালে বেলজিয়ান কঙ্গো স্বাধীনতা লাভ করে, নাম হয় রিপাবলিক অফ কঙ্গো। কিন্তু স্বাধীনতার পরপরই ফোর্স রিপাবলিক বিদ্রোহ করে বসে কারণ স্বাধীন কঙ্গোতে তাদের প্রভাব থাকতো না তেমন। তারা ছিল কলোনিয়াল শাসনের সরাসরি সুবিধাভোগী। এই ফোর্স রিপাবলিকের সদস্যরা ছিল প্রধানত কংগোলিজ, মূলত তাদের অফিসারেরাই কেবল ছিল বেলজিয়ান। কাতাঙ্গা ও দক্ষিণ কাসাই প্রদেশ আলাদা হয়ে যাবার প্রচেষ্টা নেয়। সহিংসতা বেড়ে গেলে ইউরোপিয়ানরা কঙ্গো ত্যাগ করতে থাকে। তাদের পরিবর্তে প্রশাসন ও সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ নিতে থাকে কঙ্গোলিজরা। কিন্তু তাদের কেউই এ ব্যাপারে তেমন দক্ষ ও শিক্ষিত ছিলেন না। অদক্ষ ও অশিক্ষিত মানুষের দ্বারা চালিত প্রশাসন হয় চরম বিশৃংখল ও দূর্নীতিপরায়ণ। স্বাধীনতালাভের পরপরই তাই এমন সকল সমস্যা পরবর্তীতে কঙ্গোতে চেপে বসে।

স্বাধীনতা লাভের মাসখানেক পরেই প্রেসিডেন্ট কাসাভুবু জাতীয়তাবাদী নেতা লুবুম্বাকে অপসারিত করেন। লুবুম্বাও এই অপসারণকে অসাংবিধানিক আখ্যা দিয়ে মুখোমুখি অবস্থান নেন। ধারণা করা হয় এবং সম্ভবত এটাই সত্য যে নানা প্রদেশে বিচ্ছিন্নতাবাদী সহিংসতা আমেরিকা ও বেলজিয়ামের পূর্ব-পরিকল্পিত ছিল। এ সময় লুবুম্বাকে সেনাপ্রধান জোসেফ মবুতু গ্রেফতার করেন। এই মবুতু পরে কঙ্গোর ক্ষমতা দখল করে প্রেসিডেন্ট বনে যাবেন, নাম বদলে রাখবেন মবুতু সেসে সেকো। এমনকি দেশের নামও বদলে ফেলে রাখবেন, জায়ারে। মবুতু পরে প্যাট্রিক লুবুম্বাকে কাতাঙ্গান বাহিনীর হাতে তুলে দেন যারা তখনও বেলজিয়ানদের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছিল। কাতাঙ্গান বাহিনীর বিদ্রোহ জাতিসংঘের সহায়তায় দমন করা হয় পরবর্তীতে।

যেই মবুতুকে কে প্যাট্রিক লুবুম্বা সেনাপ্রধান করেছিলেন, তিনিই প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর বিরোধের সুযোগে সেনা সমর্থনে বিদ্রোহ করে বসেন। কঙ্গোর অঢেল সম্পদের লোভ তখনও সকল পরাশক্তির মাঝে বর্তমান ছিল। মবুতুকে আর্থিক সহায়তা দিয়ে সাধারণ সেনাদের কিনে ফেলতে সাহায্য করে আমেরিকা ও বেলজিয়াম। প্যাট্রিক লুবুম্বার অপসারণ ও হত্যা কোল্ড ওয়ারের নোংরা রাজনীতির একটা অংশ। বাম ধরানার লুবুম্বার চেয়ে সেনা কর্মকর্তা মবুতুকে পশ্চিমারা আদর্শ রিপ্লেসমেন্ট ভেবে নিয়েছিল নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারে। সংবিধান পরিবর্তনের লক্ষে নির্বাচন দিয়ে ১৯৬৫ সালে রিপাবলিক অফ কঙ্গোর নাম বদলে করা হয় ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অফ কঙ্গো এবং আবার ১৯৭১ সালে রিপাবলিক অফ জায়ারে। মবুতুর অপসারণের পর আবারও এই নাম বদলে ডি আর কঙ্গো হয়ে যাবে। আধুনিক ইতিহাসে কোনো স্বাধীন রাষ্ট্রের নামই এতবার পরিবর্তিত হয়নি।

মবুতুর জায়ারে সরকার দীর্ঘদিন মার্কিন মদত পায়, মবুতু হয়ে উঠেন শক্তিশালী একনায়ক। অশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর অসচেতনতার সুযোগ নেন তিনি ও তার প্রশাসন। দূর্নীতি এমনমাত্রায় পৌঁছায় যে দূর্নীতির অপর নামকরণ হয় জায়ারিয়ান সিকনেস। বৈদেশিক সাহায্য ও দেশের সম্পদে পকেট ভারী হয় মবুতু ও তার অনুসারীদের। দেশ স্নায়ুযুদ্ধের সময়ে শান্ত থাকলেও তা ছিল বিরোধীপক্ষের উপর চরম নির্যাতন চালিয়ে অর্জন করা। প্রেসিডেন্ট মবুতু একদলীয় সরকার ব্যবস্থা চালু করেন, তিনি একাই নির্বাচনে দাঁড়াতেন ও বিপুল ভোটে জয়লাভ করতেন। কিন্তু স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর আমেরিকার আর মবুতুকে দরকার ছিল না, মবুতুকে পরিত্যাগ করে আমেরিকা। মবুতু নিজের গদি রক্ষায় রাজনৈতিক পূনর্গঠনের ঘোষণা দেন, কিন্তু তা কাজে দেয়নি। ক্ষমতায় উনার লাগাম হতে থাকে দূর্বল থেকে দুর্বলতর। উনি তাঁর শাসনামলে একটিমাত্র ভাল কাজ করেন, সেটা হচ্ছে রাজধানীর নাম লিওপোল্ডভিল থেকে কিনসাসায় পরিবর্তন, অন্যকিছু খুঁজে বের করা দুস্কর।

কঙ্গোও অনেক জাতি গোত্রে বিভক্ত। ১৯৯৬ সালের রুয়ান্ডান গৃহযুদ্ধে হুতুদের পরাজয়ের পর হুতু বিদ্রোহীরা জায়ারের দক্ষিণে পালিয়ে যায় ও রিফিউজি ক্যাম্প থেকে রুয়ান্ডান টুটসি ও জায়ারের টুটসিদের উপর আক্রমণ পরিচালনা করতে থাকে। প্রেসিডেন্ট মবুতুর সরকার তাদের সমর্থন দিত। এ সময় রুয়ান্ডা ও উগান্ডার সেনারা মবুতু সরকারকে উৎখাতের জন্য অভিযান চালায়, নানা বিদ্রোহী গ্রুপ তাদের সাথে যুক্ত হয়। মবুতু রুয়ান্ডা ও উগান্ডার সেনাদের বাইরেও নিজ সেনাদের বিদ্রোহের মুখে জায়ারে ছেড়ে পালান অঢেল সম্পদ সহ। রুয়ান্ডা ও উগান্ডা লরেন্ট কাবিলাকে ক্ষমতায় বসায়। লরেন্ট কাবিলাও অদক্ষ ও দূর্নীতি পরায়ন হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেন। ক্ষমতা গ্রহণের পর লরেন্ট কাবিলার সাথে রুয়ান্ডার টুটসি সেনাদের দ্বন্দের শুরু হয়। কঙ্গোর টুটসি সেনারা সরাসরি জেনারেল পল কাগামের নির্দেশ মানতো। রুয়ান্ডান টুটসিরা তার সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারে ভেবে লরেন্ট কাবিলা সকল বিদেশী সেনাকে নিজদেশে ফেরত যাবার নির্দেশ দেন। টুটসিরা পশ্চাদপসরণ করে, কিন্তু শুরু হয় নতুন বিদ্রোহের। উগান্ডাও নিজেদের স্বার্থে নতুন বিদ্রোহী গ্রুপকে সমর্থন দেয়া শুরু করে। কাবিলার পক্ষে এসে দাঁড়ায় জিম্বাবুয়ে, এঙ্গোলা, নামিবিয়া আর বিরোধীপক্ষে রুয়ান্ডা ও উগান্ডা। উভয়পক্ষের সমর্থনেই নানা জাতিগত গ্রুপ যোগ দেয়।

লরেন্ট কাবিলাকে হত্যা করা হয় কয়েকবছর পর, ২০০১ সালে। হত্যার পর ক্ষমতায় আসেন লরেন্ট কাবিলার ছেলে জোসেফ কাবিলা। এসময় জাতিসংঘ সেখানে শান্তিরক্ষা মিশন শুরু করে। জাতিসংঘের মধ্যস্ততায় শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার ফলে জোসেফ কাবিলা বিরোধীদের সাথে ক্ষমতা ভাগাভাগিতে রাজী হন। ২০০৬ সালে প্রথম বহুদলীয় নির্বাচন হয়। এই নির্বাচনের ফলাফলের পর জোসেফ কাবিলা ও বিরোধী জিন পিয়েরে বাম্বার সমর্থক ও সেনারা রাজধানী কিনসাসার রাস্তায় রাস্তা রক্তক্ষয়ী সংঘাতে লিপ্ত হয়। জাতিসংঘের সেনারা রাজধানীর নিয়ন্ত্রণ নেয় ও সেবছরই আব্র নির্বাচন হয়। নির্বাচনে জসেফ কাবিলা জয়লাভ করে প্রেসিডেন্ট হন।

সমস্যার শেষ হয়না তবুও। গত একদশকেও নানা গ্রুপ, নানা গোত্র ও দল সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে, দেশের নানা অংশের নিয়ন্ত্রণ এখন তাদের হাতে। রুয়ান্ডা, উগান্ডা, এঙ্গোলা, নামিবিয়া সহ নানা আফ্রিকান দেশ কঙ্গোর ভেতরে নিজেদের স্বার্থে প্রক্সি ওয়ারে নানা গ্রুপকে মদত দেয়। জোসেফ কাবিলা নিজেও পিতার মত নৃশংস হয়ে উঠেছেন দিনে দিনে, যদিও নৃশংসতার বাইরে সাংবিধানিক বৈধতা থাকবার পরেও সরকারপ্রধান হিসেবে জনগণের জন্য কিছুই করতে পারেননি।

কঙ্গো খনিতে খনিতে ভরা। কিন্তু খনিগুলো পশ্চিমাদের নিয়ন্ত্রণে। কঙ্গোলিজরা তাদের দেশের সম্পদের ভাগ পায় না। বিরোধী গ্রুপ, এমনকি সরকারও সম্পদ ব্যবহার করে অস্ত্র কিনতে ও মিলিশিয়া পালতে। যে দেশের মাটিতে বীজ ফেললেই শস্য হয়্‌ সেইদেশের মানুষ কৃষিকাজ প্রায় জানেই না। যেদেশের প্রমাণিত খনিজ সম্পদের মূল্য ২০-৩০ ট্রিলিয়ন ডলার। যেদেশের নদীগুলো পুরো আফ্রিকা মহাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে সক্ষম হাইড্রোইলেক্ট্রিক প্লান্ট তৈরি করা হলে। যে দেশের মানুষের খনিজ তেল বিদেশ থেকে আমদানীর প্রয়োজন নেই, সেইদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ৫০০ ডলারেরও কম। পরিসংখ্যান বলে তাদের দেশে শিক্ষিতের হার ৮০%। কিন্তু বর্ণপরিচয় মানে শিক্ষিত হওয়া নয়। গোত্রগত পরিচয়ের বাইরে নিজেদের এক ভাবতে শেখেনি কংগোলিজরা। আদিম সমাজের আচার আচরণ ও প্রকৃতি নির্ভরশীলতা থেকে বেশিরভাগ মানুষই বের হতে পারেনি। বুনো আলু, কন্দ কিংবা বুশমিট এখনও বেশিরভাগের খাদ্যের যোগান দেয়। তারা জানেই না কিভাবে চাষাবাদ করা যায়, আগ্রহও নেই। তাদের সম্পর্কে প্রথম অভিজ্ঞতার কথা শুনি বেশ অনেকবছর আগে। এক কলিগ, যে কঙ্গোতে ছিল, অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে বলেছিল, "ওরা এক প্যাকেট বিস্কুটের অন্য সারাদিন দাঁড়ায় থাকবে, হাত পা টিপে দিবে, কিন্তু কাজ করবে না। ওরা জানেও না যে কিভাবে কী করা লাগে।"

বর্তমানে আরও ভয়াবহ খবর হচ্ছে কঙ্গো সরকারের সাথে চুক্তি করে চীন খনিজ সম্পদ আহরণ করছে। কঙ্গোতে বর্তমানে অর্ধেকের বেশি খনিজ চীন তুলে নিয়ে যায়। চাইনিজদের ব্যাপারে আরেক বন্ধুর মন্তব্য হচ্ছে, "ইউরোপিয়ানগুলা তো তবু স্কুল বানায়, হাসপাতাল বানায়, দুই পয়সা হইলেও দেয়। এই চাইনিজগুলা মাটি সুদ্ধা তুইলা নিতে আসছে।"

কঙ্গোর এই অবস্থা আরও বহুবছর থাকবে। কঙ্গো স্থিতিশীল হলে হীরা, তামা, কোবাল্ট, কাঠ, আইভরি সহ নানা সম্পদ বাধাহীনভাবে পাচার হবে কী করে? গত এক দশকে কঙ্গোতে ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি মানুষ মারা গেছে সংঘাত ও রোগেশোকে। পৃথিবীর সবচেয়ে সম্পদশালী একটা দেশের মানুষের এই অবস্থার জন্য নিজেদের সভ্য দাবী করা, বিশ্ববিবেক বনে যাওয়া রাষ্ট্রগুলো কম দায়ী নয়। কঙ্গোর খনিগুলোর কখনো জাতীয়করণ হবে না, বিদেশীদের হাতেই থাকবে সেগুলোর নিয়ন্ত্রণ। এমন নিয়ন্ত্রণ যে সেই খনিগুলোর ধারেকাছ দিয়ে সাধারণ কেউ যেতে পারবে না, এখন যেমন পারে না। আফ্রিকার কালোকালো মানুষগুলো সত্যিই এখনও পশুর জীবনযাপন করে, পশ্চিমারাও তাদের জীবনকে মানুষের জীবন বলে মনে করে না। এই ভেকধারী রাষ্ট্রগুলো যদি আসলেই দ্বিরাচারী না হতো, কঙ্গোর রাজধানী কিনসাসার রাস্তায় মার্সিডিজ কিংবা বিএমডব্লিউ কেবল নেতা, ব্যবসায়ী কিংবা সরকারী এলিটরা চালাতো না, সাধারণ মানুষও সেগুলো দাপিয়ে বেড়াতো।

Comments

ড. লজিক্যাল বাঙালি এর ছবি
 

বাহ

===============================================================
জানার ইচ্ছে নিজেকে, সমাজ, দেশ, পৃথিবি, মহাবিশ্ব, ধর্ম আর মানুষকে! এর জন্য অনন্তর চেষ্টা!!

 
আসিফ ইমতিয়াজ এর ছবি
 

দারুণ লিখেছেন। একই অবস্থা লাইবেরিয়ার, আইভরি কোস্টের।পশ্চিমাদের শোষণের করুণ পরিণতি এরা।

 

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

আমি অথবা অন্য কেউ
আমি অথবা অন্য কেউ এর ছবি
Offline
Last seen: 19 ঘন্টা 45 min ago
Joined: শুক্রবার, জুন 17, 2016 - 12:11অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

কু ঝিক ঝিক

ফেসবুকে ইস্টিশন

SSL Certificate
কপিরাইট © ইস্টিশন.কম ® ২০১৬ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর