নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 5 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • মাইকেল অপু মন্ডল
  • মৃত কালপুরুষ
  • ড. লজিক্যাল বাঙালি
  • সুবর্ণ জলের মাছ
  • দ্বিতীয়নাম

নতুন যাত্রী

  • অনুপম অমি
  • নভো নীল
  • মুমিন
  • মোঃ সোহেল রানা
  • উথোয়াই মারমা জয়
  • শাহনেওয়াজ রহমানী
  • জিহাতুল
  • আজহারুল ইসলাম
  • মোস্তাফিজুর রহম...
  • রিশাদ হাসান

আপনি এখানে

প্রিয় অাব্বা - ২


অাপনি জীবনে অনেক কষ্ট করেছেন অামাদেরকে মানুষ করতে গিয়ে। প্রথমবার যখন মাদরাসা হতে পালিয়েছিলাম তখন মা এবং অাপনি অনেক টেনশন করেছিলেন, অাপনার মসজিদের মাইকেও ঘোষণা করা হয়েছিল। মা তো কাঁদতে কাঁদতে নাওয়াখাওয়া ছেড়েই দিয়েছিলেন। নয় বছরের ছেলেটি ঢাকা হতে সোজা গ্রামের বাড়িতে চলে যাবে তা হয়তো অাপনি কল্পনাও করতে পারেননি! ছোটমামা সংবাদ দেয়ার পর অাপনি অামাকে নিতে ঢাকা থেকে গ্রামে চলে এলেন।

.....অাবারো মাদরাসা, অাবারো শাস্তি। জবরদস্তি করে, পিটিয়ে রক্তাক্ত করে, বেহেশতের লোভ দেখিয়ে, দোজখের ভয় দেখিয়ে কোরঅান মুখস্ত করানো। এক হুজুর রফিককে থাপ্পড় দিয়ে কান ফাটিয়ে দিয়েছিলেন, রাসেলের মাথা ফেটে গিয়েছিল বেতের অাঘাতে, জুয়েলের পিঠ রক্তাক্ত করেছিলেন পিটিয়ে; জুয়েলের ঢাকাইয়া মামারা মাদ্রাসায় এসে চিৎকার-চেঁচামেচি করেছিলেন এজন্য। অামার ঘুম ছিল বেশি, এবং কড়া ঘুম। একদিন টেবিলের নিচে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম বিকেলবেলা, মাহবুব হুজুর এসে এত জোরে লাঠি দিয়ে বাড়ি দিয়েছিলেন যে পা কেটে রক্ত বের হয়েছিল, ঘুমও ভেঙ্গেছিল অামার !
হুজুরদেরকে ভয় পেতাম খুব, সারাক্ষণ কোরঅান-হাদিস নিয়ে পড়ে থাকতেন হুজুররা। সচরাচর হাসি দেখা যেত না হুজুরদের মুখে। শুধু পান দেখা যেত গালভর্তি। গান শোনা হারাম, তাই কেউ গান শুনলে তাকে বেধড়ক পেটানো হত। মনকে কতক্ষণ বেড়ি পরিয়ে রাখা যায়?..... হুজুররা ঠিকই গান শুনতেন নিরিবিলি, কেউ বুঝতো কিনা জানিনা, অামি বারো বছর বয়সে একদিন অাবিষ্কার করলাম - হুজুর শুয়ে শুয়ে ছোট্ট রেডিও বালিশের নিচে রেখে গান শুনছেন!
গান শোনার অপরাধে হাফেজ মাওলানা ফয়জুল্লাহকে (অামার ক্লাস টিচার) চাকুরিচ্যুত করলো কমিটি। এরপর হাফেজ অাবদুল্লাহ এলেন শিক্ষক হিসেবে। লুতিকর্মের অভিযোগে অাবদুল্লাহ সাহেবকেও চাকুরিচ্যুত করা হলো।
হাফেজ অাবুল কাশেম হুজুর ছিলেন অামার অাব্বার বন্ধু, খুব কড়া ছিলেন। পেটানো শুরু করলে 'মাগো, বাবাগো, অামি মইরা গেলাম, হুজুর অাপনে অামার অাব্বা লাগেন' ইত্যাদি বাক্যের সাথে গগনবিদারী কান্না চলতো!
কাউকে বেশি পেটানোর প্রয়োজন হলে তখন মাদ্রাসার দরজা-জানালা বন্ধ করা হতো, তারপর তাঁকে পিছমোড়া করে বাঁধা হতো অথবা অন্য দুজনকে দিয়ে তাঁর হাত-পা টেনে ধরে উপুড় করে শোয়ানো হতো। এরপর চলতো নিতম্ব এবং পিঠের উপর বেতের বাড়ি, কখনো কখনো জোড়া বেত বা ট্রিপল বেত দিয়েও শায়েস্তা করা হতো। হার্ডওয়ারের দোকানে প্রচুর বেত বিক্রি হতো, মাদ্রাসার পক্ষ হতে সপ্তাহে বিশ/পঁচিশটা বেত কেনা হতো। মাদ্রাসার ভাউচারে বেত কেনার হিসাব থাকতো, কমিটি সেগুলো অডিট করতো।

প্রিয় বাবা, কম্পিউটার সেকালে অামি দেখিনি, শুধু নাম শুনেছি। অাপনাকে সবাই বলতো, অাপনার ছেলের মাথা নাকি কম্পিউটার! অাপনি মাদ্রাসায় অাসতেন, বিস্কুট, চানাচুর, মুড়ি ইত্যাদি খাবার নিয়ে অাসতেন, প্রতিদিন অামাকে দেখতে অাসতেন।
সীমিত রোজগার, তা দিয়েও অাপনি অামাকে ভালো রাখার চেষ্টার ত্রুটি করেননি। উত্তরায় পড়াকালীন প্রায়ই মোগলাই খেতে স্বাদ রেস্টুরেন্ট ও অায়োজন রেস্টুরেন্টে যেতাম।
মোগলাই সবসময়ই অামার পছন্দ। বাটার, পনির, ঘি এসব খেতাম। অামি তখন বুঝিনি, কিন্তু পরে বুঝেছি - কত কষ্ট করে টাকা রোজগার করেছিলেন অাপনি! ১৯৯৮ সালে অামি ছাত্রশিবিরের কলেজ-পড়ুয়াদের ব্যবহারে মুগ্ধ হলাম, নাম লেখালাম ছাত্রশিবিরে। ছয়মাসের মধ্যেই সাথী হিসেবে শপথ নিয়েছিলাম, কিন্তু এরপর অার এগোনো যায়নি। জামাত-শিবিরের লোকজন দাড়ি কাটে, টিভি দেখে, টাই পরে এ কারণে কওমির ছাত্রদের জন্য শিবির পুরোপুরি নিষিদ্ধ। শায়খুল হাদিসের খেলাফত মজলিস নামক রাজনৈতিক দলে যোগ দিলাম ২০০০ সালে, তখন অামার দাড়ি-মোচ কিছুই হয়নি। অচেনা অনেক হুজুররা অামাদের মাদ্রাসায় এসে মুজাহিদ (জিহাদি) রিক্রুট করতো, অামিও জেহাদি চেতনায় উদ্বুদ্ধ হলাম। উত্তরার অাজমপুরের পশ্চিমের বিস্তৃত শনের বনে চলতো জিহাদি ট্রেনিং, এখন সেটা বর্ধিত উত্তরা। এক জায়গায় দীর্ঘদিন ট্রেনিং দেয়া হয়না, ঘনঘন স্থান পরিবর্তন করা হতো। অবশ্য খালি হাতে লড়াইয়ের প্রশিক্ষণ ছিল, অস্ত্র হাতে নয়। মুফতি অাবদুর রউফ, মুফতি ইজহার (চট্টগ্রামের, বর্তমানে কারাবন্দী), মুফতি হান্নান ছিল মুজাহিদ নেতা। ট্রেইনার মুজাহিদরা কখনো নিজেদের নাম বলতোনা, শুধু জেহাদ এবং ট্রেনিং নিয়েই থাকতো তারা। সকল মুজাহিদের প্রিয় নেতা ছিল পাকিস্তানের মাসুদ অাজহার ও ককেশাশের ইমাম শামিল। পরবর্তীতে ওসামা বিন লাদেন হয়ে ওঠে সবার অাইডল, অামারও অাইডল ছিলো সে। মুজাহিদ নেতারা জেহাদি উদ্দীপক গল্প অামাদের শোনাতো, অামরা প্রচন্ডভাবে উদ্বুদ্ধ হতাম। মনে হতো - কয়েকটি মেশিনগান এবং কালাশনিকভ হলেই অামরা পৃথিবীতে কাফের মেরে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে পারবো!
নড়াইলের মুফতি শহিদুল ইসলাম সৌদি থেকে প্রচুর টাকা অানতেন ইসলামের খেদমতের জন্যে, এর বড় একটি অংশ ব্যয় হতো মুজাহিদ ট্রেনিং এর জন্য।
২০০০ সালে একদিন বড় বড় চুলওয়ালা একজন সিনিয়র মুজাহিদ অামি সহ অারো প্রায় ১৫/১৬ জনকে নিয়ে যাচ্ছিলেন অাশকোনার কাছাকাছি একটি
নির্জন স্থানে, জেহাদি ট্রেনিংয়ের জন্য। পথিমধ্যে কসাইবাড়ির একটি রেস্টুরেন্টে ঢুকেছিলাম সবাই, খাওয়ার জন্য। রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার হিন্দু, এটা বুঝতে পেরে তাৎক্ষণিক সবাই রেস্টুরেন্ট ত্যাগ করলাম কিছু না খেয়েই! বড় চুলওয়ালা ট্রেইনারদেরকে 'মুজাহিদ হুজুর' ডাকতাম। মুজাহিদ হুজুর সবাইকে এস্তেগফার পড়তে বললেন, মালাউনের হোটেলে ঢুকেছি, অারেকটু হলে তো খাবার খেয়েই ফেলতাম! অাল্লাহর শুকরিয়া অাদায় করা হলো - মালাউনের তৈরিকৃত খাবার পেটে যায়নি!
অামার বাবা জানতেন না, তার ছেলে ধীরে ধীরে মুজাহিদ হয়ে যাচ্ছে! বড় চুলওয়ালা (যারা সবাই চট্টগ্রামের অান্চলিক ভাষায় কথা বলতো) মুজাহিদ হুজুররা অামাদেরকে 'হিকমত' শেখাতো। জিহাদি ট্রেনিংয়ের ব্যাপারে অামরা যেন কাউকে না জানাই, এমনকি অামাদের বাবা-মা, শিক্ষককেও না।

প্রিয় অাব্বা, অাপনি অাজ পৃথিবীতে নেই। অাপনাকে অনুভব করি খুব। অল্প বয়সে অতি ধার্মিক পীর বংশের কন্যার সাথে অাপনি অামার বিয়ে দিয়েছিলেন।
শেষরক্ষা হয়নি, ঈমানটা হারিয়েই ফেললাম!

(ধারাবাহিকভাবে চলবে)

Comments

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

মুফতি মাসুদ
মুফতি মাসুদ এর ছবি
Offline
Last seen: 21 ঘন্টা 20 min ago
Joined: সোমবার, আগস্ট 14, 2017 - 6:00অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

কু ঝিক ঝিক

ফেসবুকে ইস্টিশন

SSL Certificate
কপিরাইট © ইস্টিশন.কম ® ২০১৬ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর