নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 3 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • কিন্তু
  • নুর নবী দুলাল
  • মিশু মিলন

নতুন যাত্রী

  • ফারজানা কাজী
  • আমি ফ্রিল্যান্স...
  • সোহেল বাপ্পি
  • হাসিন মাহতাব
  • কৃষ্ণ মহাম্মদ
  • মু.আরিফুল ইসলাম
  • রাজাবাবু
  • রক্স রাব্বি
  • আলমগীর আলম
  • সৌহার্দ্য দেওয়ান

আপনি এখানে

জহির রায়হান আদ্যোপান্ত



“আসছে ফাল্গুনে আমরা কিন্তু দ্বিগুণ হব”
না কোনো উপন্যাসের রোমান্টিক লাইন নয় এটি।আরেক ফাল্গুন উপন্যাসের শেষ লাইন। আরেক ফাল্গুন। ভাষা আন্দোলন পরবর্তী সময় নিয়ে রচিত প্রথম কোনো লেখনী। লেখক জহির রায়হান।কে এই জহির রায়হান? শুধুই একজন ঔপন্যাসিক? কি তাঁর পরিচয় ? ফেনী জেলায় জন্মগ্রহণ করেন জহির রায়হান ১৯৩৫ সালের ১৯ শে আগস্ট। পিতৃপ্রদত্ত নাম ছিল জহিরুল্লাহ। কমিউনিস্ট পার্টি করতেন, আর তখন কমিউনিস্ট পার্টি করা ছিল নিষিদ্ধ ।একটা ছদ্মনামের দরকার ছিল। সেই ছদ্মনাম দিলেন কমরেড মণি সিংহ ।জহিরুল্লাহ হয়ে গেলেন জহির রায়হান।
জহির রায়হান।ভাষা আন্দোলনে ১৪৪ ধারা ভঙ্গকারীদের প্রথম ১০ জনের একজন জহির রায়হান। বিপ্লবী ছিলেন। ভাষার দাবীতে লড়তে নেমেছিলেন তাই। হুমায়ুন আজাদের একটি উক্তি দিয়ে শুরু করি,

“জহির রায়হান সম্ভবত বাংলাদেশের একমাত্র কথাসাহিত্যিক যার উদ্ভবের পেছনে আছে ভাষা আন্দোলন। যদি বায়ান্নর একুশ না ঘটত তবে জহির রায়হান হয়ত কথাশিল্পী হতেন না। “

আবার ফিরে যাই আরেক ফাল্গুনে। ১৯৫৫ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারী পালন করা নিয়ে এই উপন্যাস।। ১৯৬৯ সালে রচিত হয় এই উপন্যাস। এই উপন্যাস ১৯৫২ এর ২১ এ ফেব্রুয়ারীর বদলে ১৯৫৫ সালের একুশে ফেব্রুয়ারীকে তুলে আনে। ভাষা আন্দোলন যে তখনো প্রাসঙ্গিক তার দলিল এই উপন্যাস। শহিদ মিনার স্থাপনা নিয়ে প্রশাসনের বিরুদ্ধে তরুণদের যে বিক্ষোভ তা কিন্তু অন্যান্য লেখায় বা সাহিত্যে ফুটে উঠে নি।
জহির রায়হান কেন অন্যদের চেয়ে আলাদা ও স্বতন্ত্র ছিলেন সাহিত্যের দিকে তা এই উপন্যাস থেকেই বোঝা যাবে।। যেখানে ভাষা আন্দোলনকে আমরা বায়ান্নতে আবদ্ধ করে ফেলি সেখানে তিনি ভাষা আন্দোলনকে ’৫৫ পর্যন্ত এক্সপ্যান্ড করেছেন। এই উপন্যাসের সার্থকতার দিক থেকে যদি আলোচনা করি তাহলে বলা যায় এই উপন্যাসটি আসলে পরবর্তীতে স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রেরণাদায়ক উপন্যাসে পরিণত হয়েছিলেন। একজন জহির রায়হানের চেয়ে ভাষা আন্দোলনের দিকটি ভালোভাবে কে তুলে আনতে পারবে? জহির রায়হানের পরিচয় বলে শেষ করা যাবে না। জহির রায়হান একজন ভাষাসৈনিক , জহির রায়হান রাজনীতি করেছেন,জহির রায়হান একজন কথাসাহিত্যিক,জহির রায়হান একজন সিনেমা-নির্দেশক। সহজ বাংলায় সংক্ষেপে বলি, জহির রায়হান একজন পুরোদস্তুর বাঙালি। তাঁর লিখার কথা যদি বলতে যাই তাহলে সেই “আরেক ফাল্গুন” এর ভাষা আন্দোলনের পরবর্তী সময় থেকে ধরে “হাজার বছর ধরে” এর আবহমান বাঙালি ইতিহাসের ও অভ্যাসের কথা উঠে আসে তাঁর লেখনীতে। তেমনিভাবে উঠে আসে সেই আবহমান বাঙালির সমস্যা,কুসংস্কার এমনকি সাংস্কৃতিক চর্চাগুলোও উঠে এসেছে এই উপন্যাসে।
জহির রায়হানকে নিয়ে লিখতে গেলে জহির রায়হান আজো কেন প্রাসঙ্গিক এই প্রশ্নটি চলে আসে।এই প্রশ্নে যাওয়ার আগে জহির রায়হানের কাজগুলো নিয়ে আরেকটু বিশ্লেষণে যাওয়া উচিৎ বলে আমি মনে করি।। আরেক ফাল্গুন নিয়ে আলোচনা করেছি পূর্বেই। আর্থিক সমস্যার কারণে যখন তাঁকে বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র তৈরী করছিলেন তখন তাঁর মনের মধ্যে আরো ভালো কিছু করার আক্ষেপ জন্মায়।সেই আক্ষেপটি পূরণ করার জন্য লিখেন “হাজার বছর ধরে”। জহির রায়হানের লেখনী অন্য যেকোনো লেখক থেকে আলাদা ছিল।তিনি লেখাকে,চরিত্রগুলোকে জীবন্ত করে তুলতে পারতেন। তাই তো যখন কেউ “হাজার বছর ধরে” পড়ে তখন সে মন্টু,টুনি,আম্বিয়ার মধ্যে মিশে যায়।কখনো বা মকবুলের মধ্যে । মিশে যায় হাজার বছরের বাঙালিয়ানার সাথে। জহির রায়হান এখানেই সার্থক। জহির রায়হানের লেখার কথা উল্লেখ করতে গেলে “শেষ বিকেলের মেয়ে” আর “বরফ গলা নদী” র কথাও উঠে আসে।তবে আমি এই উপন্যাসগুলোর বিশ্লেষণে আপাতত না গিয়ে একটি ছোটোগল্পের কথা উল্লেখ করি বরং।সেই ছোটোগল্পের নাম “সময়ের প্রয়োজনে”। একটি মুক্তিযুদ্ধ ক্যাম্পের ঘটনাবলী নিয়ে এই লিখাটি লিখা হয়েছে, সেখানে প্রকাশ পেয়েছে ক্যাম্পের মুক্তিযোদ্ধাদের দিনলিপি। জহির রায়হান খুব সুন্দর ও সাবলীলভাবে সেই ঘটনা তুলে ধরেছেন । কখনো কখনো এই লিখা পড়ে অবচেতনভাবেই মনে হয় আমি যেন আসলেই সেই ক্যাম্পে আছি। কষ্ট লাগে যখন কোনো এক যোদ্ধার মৃত্যুসংবাদ এসে পৌছায় তখন। দেয়ালে দাগ কেটে তাদের কতজন মারা গিয়েছে আমাদের কতজন মারা গিয়েছে এই হিসাব করতে গিয়ে যোদ্ধারা একসময় দেখে দেয়ালটাই শেষ হয়ে আসছে। জহির রায়হানের সার্থকতা এখানেই বোধ হয়। তবে এই লিখাটিকে আমি এইজন্য হয়তবা অন্যতম লেখা হিসেবে বলব না,এই লিখার মধ্যে আরো বিশেষ এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক আছে। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন,যেটি তিনি গল্পের মধ্যেই আসলে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশ্ন করেন। প্রশ্নটি হলো কেন আমরা যুদ্ধ করছি।কেউ বলে স্বাধীনতার জন্য,কেউ বলে সার্বভৌমত্বের জন্য,আবার কেউ বলে যে আসলে বাবা মা ভাই বোনকে চোখের সামনে খুন হতে দেখে আসলে যুদ্ধ করছে। কিন্তু এসবকেই তিনি ঠুনকো কারণ হিসেবে দেখিয়েছিলেন। একটা পর্যায়ে যখন বিশ্লেষণে গেলেন তখন বলেন ,আসলে আমরা সময়ের প্রয়োজনে যুদ্ধ করেছি। তখনের সময়ের প্রয়োজনটা ছিল আমরা পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াই। তাই আমরা আসলে যুদ্ধটা করেছিলাম। একজন জহির রায়হান মনে করতেন এই সময়ের দাবী মেটানোই তখন আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

১৯৫৫ সালে “সূর্যগ্রহণ” গল্পের মাধ্যমে লেখালেখিতে হাতেখড়ি হয়। এরপর লেখালেখি আর থেমে থাকে নি।সাথে শুরু হয় চলচ্চিত্র নির্মাণের কাজ। ১৯৬১ সালে “কখনো আসে নি” চলচ্চিত্রের মাধ্যমে পরিচালক হিসেবে প্রথম আত্মপ্রকাশ করেন। একে একে মুক্তি পায় সোনার কাজল (১৯৬২), কাঁচের দেয়াল (১৯৬৩), সঙ্গম (১৯৬৪), বাহানা (১৯৬৫), বেহুলা (১৯৬৬) ও আনোয়ারা (১৯৬৭)।শিল্পোত্তীর্ণ হলে ও বাণিজ্যিক ছবি তৈরী না করার জন্য একটা সময় প্রযোজকেরা তাঁকে দিয়ে আর ছবি তৈরি করাতে চাচ্ছিল না।কিন্তু তিনি থেমে থাকেন নি তখনো।।

জহির রায়হানকে নিয়ে কথা বলতে গেলে যে বিষয়টি না আনলেই নয় তা হলো “স্টপ জেনোসাইড”।স্টপ জেনোসাইড কি? এটা আমরা সবাইই কম বেশি জানি।তবুও যারা জানে না তাদের জন্য,স্টপ জেনোসাইড একটি প্রামাণ্যচিত্র।এই প্রামাণ্যচিত্রটিতে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের উপর পশ্চিম পাকিস্তানীরা যে গনহত্যা চালিয়েছিল সেটি এবং এই গণহত্যার প্রভাব উঠে এসেছে। যুদ্ধের সময় তিনি ক্যামেরা হাতে নেমে পড়েন তথ্য সংগ্রহের জন্য,আর এই বিভীষিকাময় সময়কে ধারণ করার জন্য।স্টপ জেনোসাইড। বাংলাদেশের উপর হয়ে যাওয়া পাকিস্তানিদের গনহত্যার একটি অকাট্য দলিল।এই দলিল তৈরীর জন্যই পাকিস্তান সরকারের চক্ষুশূলে পরিণত হয়েছিলেন তিনি। স্টপ জেনোসাইড যখন প্রকাশ পায় তখন পৃথিবীর মানুষ বুঝতে পারে আসলে বাংলাদেশে কি হচ্ছে।কি অত্যাচার করছে পাকিস্তানিরা।এখানে মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং এর উল্লেখ আছে।। কিভাবে তাঁরা ট্রেনিং নিচ্ছিলেন সে অংশ ধারণ করেছেন জহির।তেমনি সাধারণ মানুষের হাহাকার আছে । কিভাবে তাঁরা জীবন যাপন করছিল তা আছে এই প্রামাণ্যচিত্রে। এটি গেল একটি দিক।আরেকটি দিক আছে এই প্রামাণ্যচিত্রের ।সেটি হলো শরনার্থী শিবিরের দিকটি।সাধারণ মানুষ যুদ্ধের বিভীষিকাতে ভীত হয়ে যে শরণার্থী শিবিরগুলোতে চলে যাচ্ছিল সে রূপটি আমরা পাই এ প্রামাণ্যচিত্রে।। অর্থাৎ এই প্রামাণ্যচিত্র মুক্তিযুদ্ধের সম্পূর্ণ দিকটিকে ধারণ করতে পেরেছিল। তাই পৃথিবী জানতে পেরেছিল ইতিহাসের নৃশংসতম গণহত্যা নিয়ে।


জহির রায়হানকে নিয়ে কথা বললে দ্বিতীয় যে বিষয়টি আসবেই সেটি হলো “জীবন থেকে নেয়া” ।জহির রায়হান ছিলেন পুরোদস্তুর চলচ্চিত্রের লোক। চলচ্চিত্রের চরিত্রের মুখে কথা বলতেন তিনি। জহির রায়হানের অনবদ্য একটি সৃষ্টি হলো “জীবন থেকে নেয়া” চলচ্চিত্রটি। জীবন থেকে নেয়া চলচ্চিত্রটি ১৯৭০ সালে মুক্তি পায়। সাধারণভাবে দেখলে মনে হয় চলচ্চিত্রটি আটপৌরে জীবনের গল্প। গল্পটি অতি সাধারণ এক পরিবারের। নিরীহ প্রকৃতির ভাইয়ের বউদের উপর প্রতাপশালী ননদের সাংসারিক কূটচালের গল্প। এ গল্প তো চলতে থাকে,এ গল্পের পিছনে আরেকটি গল্প বলা হয়ে যায়।সেই গল্পটি বলে একটি জাতিকে দমন করে রাখার ইতিহাস এবং নিপীড়িত জনতার জেগে ওঠার কথা।জীবন থেকে নেয়া মূলত ভাষা আন্দলন ও ’৬৯ এর গণ অভ্যুত্থানের প্রেক্ষিতে নির্মিত একটি চলচ্চিত্র। এই ছবিটির মূল কেন্দ্র একটি পরিবার,যাকে কেন্দ্র করে ঘটনাবলী আবর্তিত হয়। এখানে দেখা যায় একজন মহিলা বিয়ের পর বাবার বাড়িতে থেকে স্বামী আর নিজ দুই ভাইয়ের উপর দমন নিপীড়ন চালায়। আচলে তাঁর চাবির গোছা। রূপক এই চরিত্রটি যে আসলে স্বৈরশাসকের রূপকে তুলে ধরে তা আমরা চলচ্চিত্রের মাধ্যমেই বুঝতে পারি। আবার দেখতে পারি নিপীড়িত স্বামী কিভাবে শেষ মুহুর্তে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ায় জেগে উঠে।। সে কথায় পরে আসব।।এখানে যে নারীর কথা উল্লেখ করেছি,তিনি তাঁর ভাইদের বিয়ে দিতে চান না পাছে চাবির গোছা তাঁর হাত থেকে চলে যায়।একটু গভীরভাবে খেয়াল করলে দেখা যাবে যে এটি আসলে স্বৈরশাসকের ক্ষমতা হস্তান্তর না করার বিষয়টিকেই ফুটিয়ে তুলে। এরপর ঘটনাপ্রবাহ চলতে থাকে ,দেখা যায় দুই ভাই আনিস আর ফারুক শেষপর্যন্ত বিয়ে করে। এবং আসলেই সংসারের চাবির গোছা তাদের স্ত্রীদের হাতে চলে যায়।। এই চলচ্চিত্রের অসাধারণ দিকুটি হলো এখানে বিভিন্ন ধরণের চরিত্রকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। নিরীহ গোছের মানুষ থেকে ধরে,প্রতিবাদী মানুষ সবাইকেই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এই চলচ্চিত্রে। ফারুক চরিত্রটি করেছিলেন রাজ্জাক।তিনি গণ অভ্যুত্থানের কর্মী ও আন্দোলনকারী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। আনোয়ার হোসেন ছিলেন প্রগতিশীল রাজনৈতিক আন্দোলনের কর্মী। তাঁর নেতৃত্বেই রাজ্জাক আন্দোলনে অংশ নেয়। ফারুক(রাজ্জাক) ,আনিসের বড় বোন এক সময় কতৃত্ব আবার ফিরে পাওয়ার জন্য তাদের একজনের স্ত্রীকে বিষ খাইয়ে অন্য বোনকে দোষী করার চেষ্টা করে। কিন্তু এসময়ে জেগে উঠে তাঁর স্বামী ,যিনি একজন নিরীহ ও মুখ বুজে সয়ে যাওয়া মানুষ ।অর্থাৎ দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার পর নিরীহ বাঙালি ক্ষেপে উঠার দৃষ্টান্ত আমরা পাই এখানে। চলচ্চিত্রটির অসাধারণ কিছু দিক আছে। সেগুলো একটু একটু করে আলাপ করি। ছবিটির শুরুতেই আমরা দেখতে পাই যে “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী” গানটি । ভাষা আন্দোলনের সৈনিক ও শহিদদের স্মৃতিকে ধারণ করে শুরুর এই অংশটি। আরো চমৎকার অংশ হলো প্রভাতফেরীর অংশটি।। তারপর আসি এই চলচ্চিত্রের অন্য দুইটি গুরুত্বপুর্ণ গান নিয়ে।একটি হচ্ছে “আমার সোনার বাংলা”। এই গানটি সর্বপ্রথম চলচ্চিত্রে ব্যবহার করেন জহির রায়হান।তখনো এই গানটি বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে স্বীকৃতি পায় নি। এই গানটি দিয়ে আমাদের বাংলা যে কত সুন্দর তা তুলে ধরা হয়েছিল। আরেকটি গান হলো , “কারার ঐ লোহ কপাট”। ছবিতে দেখা যায় যে গণ অভ্যুত্থানের আন্দোলনের কর্মীদের যখন গ্রেপ্তার করা হয় তখন এই গানটি গেয়েছিল জেলের মধ্যে। এবং এই সিনেমার আরো একটি অসাধারণ দিক হলো সিনেমার শেষদিকে যখন বিথির সন্তান হয় তখন তার নাম রাখা হয় “মুক্তি”। জহির রায়হান,একজন ক্লাসিকাল মাস্টারমাইন্ড।এই মানুষটি চলচ্চিত্র দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন তাঁর দাবীগুলো।পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর রোষানলে পড়েছেন।কিন্তু কোনো কিছুই তাঁকে দমিয়ে রাখতে পারে নি।। ১৯৭১ এ কলকাতা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে নিজের এই চলচ্চিত্রের প্রদর্শনীর মাধ্যমে যে অর্থ আয় করেছিলেন তার সম্পূর্ণটাই তিনি দিয়ে দেন মহান মুক্তিযুদ্ধে।।


জহির রায়হানের অন্যতম অসমাপ্ত একটি কাজের কথা এক্ষেত্রে উল্লেখ করতেই হয়।সে কাজটি হচ্ছে “একুশে ফেব্রুয়ারী”। একুশে ফেব্রুয়ারী মূলত চলচ্চিত্রের কন্সেপ্ট। ১৯৬৬ সালেই তিনি এই কাজটি করতে চেয়েছিলেন।কিন্তু তৎকালীন সরকার থেকে অনুমোদন পান নি চলচ্চিত্রটি করার। তিনি ভেবেছিলেন এই কাজটি তিনি সুযোগ পেলেই করে ফেলবেন।কিন্তু শেষ পর্যন্ত অনুমোদন আর পাওয়া যায় নি পাকিস্তান সরকার থেকে।জহির রায়হানকে হারানোর পর আমাদের আসলে কি বিশাল পরিমাণ ক্ষতি হয়ে গেছে তা আমরা এই একটি স্ক্রিপ্টের ঘটনা থেকেই বুঝতে পারি। এই স্ক্রিপ্টটি চলচ্চিত্রায়িত হতে না পারার ফলে আমরা চলচ্চিত্রের দিকে আমাদের বায়ান্নর ইতিহাসকে একদম বাদ দিয়ে দিয়েছি বললেই চলে। স্বাধীনতার পর স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়ে আমাদের অনেক চলচ্চিত্র হয়েছে কিন্তু বায়ান্ন নিয়ে আমাদের আর কোনো উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রই হয় নি।এটি আমাদের জন্য বিশাল একটি আফসোস। এই চলচ্চিত্রের স্ক্রিপ্টটি পরবর্তীতে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির শাহরিয়ার কবির (জহিরের চাচাতো ভাই) এর চাপাচাপিতে মাসিক “সমীপেষু” তে “একুশে ফেব্রুয়ারী”র স্ক্রিপ্টটি প্রকাশিত হয়।আমরা আজকে একুশে ফেব্রুয়ারীর যে গল্প পাই সেতি আসলে চলচ্চিত্রের সেই স্ক্রিপ্টটিই।। এই স্ক্রিপ্টটি যদি চলচ্চিত্রে পরিণত হত নিঃসন্দেহে বলা যায় বায়ান্নর একটি দলিল হয়ে থাকত এই একুশে ফেব্রুয়ারী। আরো একটি অসমাপ্ত কাজ ছিল।যেটি হলো “লেট দেয়ার বি লাইট”। এই সম্পর্কে প্রথম আলো পত্রিকায় শাহরিয়ার কবিরের একটি প্রতিবেদনের কিছু অংশ তুলে দিলাম,

“জহির রায়হানের প্রথম প্রকাশিত লেখা ছিল ‘ওদের জানিয়ে দাও’ শিরোনামের একটি কবিতা। কলকাতার সম্ভ্রান্ত সাময়িকী নতুন সাহিত্য-এ যখন এই কবিতা প্রকাশিত হয়, তখনো জহির রায়হান স্কুলের গণ্ডি অতিক্রম করেননি। এই কবিতার বিষয় ছিল গণহত্যার প্রতিবাদ। জহির রায়হানের শেষ সাহিত্যকর্ম ‘আর কতদিন’ এবং অসমাপ্ত চলচ্চিত্র লেট দেয়ার বি লাইট-এর বিষয়বস্তুও ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে আরম্ভ করে প্যালেস্টাইন, কঙ্গো ও ভিয়েতনাম পর্যন্ত বিস্তৃত গণহত্যা। ধর্ম, বর্ণ ও জাতিসত্তার নামে চলমান এই গণহত্যার প্রতিবাদে বাংলাদেশের গণহত্যা ও মুক্তিযুদ্ধ আরম্ভের ছয় মাস আগে জহির রায়হান লেট দেয়ার বি লাইট-এর চিত্রগ্রহণ আরম্ভ করেছিলেন। এটি ছিল তাঁর স্বপ্নের ছবি। “

এইসব কাজের জন্য জহির রায়হান অনেকেরই চক্ষুশূলে পরিণত হন। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহন করেন তিনি। জহির রায়হানের মৃত্যু বলি আর অন্তর্ধান বলি ,সেটি এক বিশাল রহস্য। ১৯৭২ সালের ৩০ শে জানুয়ারী তিনি শহিদ হন। জহির রায়হানের বড় ভাই ছিলেন শহীদুল্লাহ কায়সার।জহির ১৯৭১ সালের ১৭ ই ডিসেম্বর বাংলাদেশে ফিরে আসেন। জহির ফিরে আসার পর শহীদ্দুল্লাহ কায়সারের নিখোঁজ হওয়ার সংবাদ পান এবং বিভিন্ন জায়গায় ছোটাছুটি করেন।শেষে ১৯৭২ এর জানুয়ারী মাসের শেষদিকে তিনি তথ্য পান যে তাঁর বড় ভাই শহীদুল্লাহ কায়সার আর মুনীর চৌধুরী মিরপুরে আটক আছেন।তিনি তাদের উদ্ধার করতে গিয়ে নিজেই নিখোঁজ হোন এবং শহীদ হোন।এ নিয়ে বেশ কিছু বিস্তারিত লিখা বিভিন্ন পত্রিকাতে উঠে এসেছে।আশা করছি পাঠক সময় পেলে সেগুলো পড়ে দেখবেন।।

শেষ করব জহির রায়হান কেন এখনো প্রাসঙ্গিক এই আলোচনাটির মাধ্যমে।জহির রায়হান ছিলেন রাজপথের আন্দোলনের অন্যতম কর্মী।। তিনি ছিলেন রাজনীতির মঞ্চের একজন কর্মী।তিনি ছিলেন চলচ্চিত্রের একজন কর্মী,এবং অবশ্যই সাহিত্যের লোক। এত এত পরিচয় তাঁর। কিন্তু সব পরিচয়ের ঊর্ধ্বে তিনি একজন জহির রায়হান। তিনি একজন আপাদমস্তক বাঙালি ও বাংলাদেশী। আজকে যখন আমরা আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে ভুগি তখন জহির রায়হান প্রাসঙ্গিক।আজকে যখন আমরা অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারি না তখন জহির রায়হান প্রাসঙ্গিক।আজকে যখন আমরা নির্মোহভাবে ইতিহাস রচনা করতে পারি না তখন জহির রায়হান প্রাসঙ্গিক।আজকে যখন আমরা সিনেমার দুর্দশায় আছি তখনো জহির রায়হান প্রাসঙ্গিক।তার চেয়ে বড় বিষয় হলো আজকে যখন আমরা সত্য বলতে ও স্বীকার করে গেছি তখন জহির রায়হান প্রাসঙ্গিক।এই জহির রায়হানকে পূর্বসূরী বিবেচনা করে তাঁর আদর্শ ধারণ করতে পারলে কেবল এবং কেবল তবেই আমরা সুন্দর বাংলাদেশের যে স্বপ্ন দেখি ,সে স্বপ্ন সফল করতে পারব। একজন জহির রায়হান হারিয়ে যাওয়ার বেদনা আমরা কখনোই ভুলতে পারব না। শুধু এইটাই কামনা এই জহির রায়হানকে আমরা ধারণ করি , জহির রায়হান বেঁচে থাকুক আমাদের মধ্যে। জহির রায়হানরা হারিয়ে গেলে যে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না!

(জহির রায়হানের সমাপ্ত ও অসমাপ্ত সকল গুরুত্বপূর্ণ কাজ, মৃত্যুরহস্য ,রাজনীতি,এবং তাঁর বিশ্লেষণ নিয়ে পরবর্তীতে আরো কিছু লিখা লিখার ইচ্ছা আছে।এই লিখাটি কেবলই সারসংক্ষেপ ধরণের লিখা।)

বিভাগ: 

Comments

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

সজীব সাখাওয়াত
সজীব সাখাওয়াত এর ছবি
Offline
Last seen: 1 week 1 দিন ago
Joined: মঙ্গলবার, জুন 20, 2017 - 9:06অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

ফেসবুকে ইস্টিশন

SSL Certificate
কপিরাইট © ইস্টিশন.কম ® ২০১৬ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর