নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 5 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • মৃত কালপুরুষ
  • মাইকেল অপু মন্ডল
  • ড. লজিক্যাল বাঙালি
  • সুবর্ণ জলের মাছ
  • দ্বিতীয়নাম

নতুন যাত্রী

  • অনুপম অমি
  • নভো নীল
  • মুমিন
  • মোঃ সোহেল রানা
  • উথোয়াই মারমা জয়
  • শাহনেওয়াজ রহমানী
  • জিহাতুল
  • আজহারুল ইসলাম
  • মোস্তাফিজুর রহম...
  • রিশাদ হাসান

আপনি এখানে

‘শূয়রের বাচ্চা কখনও মানুষ হয় না’ (পর্ব—২)


ধারাবাহিক উপন্যাস:
‘শূয়রের বাচ্চা কখনও মানুষ হয় না’
(পর্ব—২)
সাইয়িদ রফিকুল হক

গ্রামের অসাম্প্রদায়িক লোকজন এতোদিনে মতিনকে যেন শায়েস্তা করার একটা সুযোগ খুঁজে পেয়েছে। মতিন আর রাকিবের গলায় জুতার মালা দেখে তাদের মুখে এখন বিজয়ের হাসি। এই দুইটা ইদানীং তাদের খুব জ্বালাচ্ছিলো। কথায়-কথায় এরা ইসলামের নামে সবখানে পাকিস্তানের গুণগান গায়। আর পাকিস্তানের গুণকীর্তন করতে-করতে এদের মুখে ফেনা জমে যায়! বাংলাদেশটাকে এরা যেন চেনেই না! অথচ, এরা চিরদিন খায়-দায়-শোয়-ঘুমায়, আর বসত করে এই বাংলাদেশে!

মতিন মৌলোভীর গলায় বড়সড় একখান জুতার মালা দেখে বাজারের ভিড়ের মধ্যেও একপাশে থমকে দাঁড়ায় ইয়াকুব-মাঝি। সে মাঝির ছেলে মাঝি। কিন্তু জাতে দেশভক্ত। সে মতিনের এই দুরবস্থা দেখেও মুখে হাসি এনে তার দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। আর তার বাবার কথা মনে পড়ে: একাত্তরে নাকি ধৃত রাজাকারদের এইভাবে গলায় জুতার মালা পরিয়ে হাটবাজার কিংবা লোকালয় ঘুরিয়ে তারপর এদের কোনো এক স্কুলের মাঠে নিয়ে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে-খুঁচিয়ে কিংবা গুলি করে হত্যা করা হতো। দেশের শত্রুদের কোনোভাবেই বাঁচিয়ে রাখা হতো না। তবুও কিছুসংখ্যক রাজাকার সেই সময় পালিয়ে, আত্মগোপন করে কিংবা রাষ্ট্রবিরোধীপ্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায় বেঁচে গিয়েছিলো। তারাই এখন বংশবৃদ্ধি করছে। আর এদের ভাগ্য ভালো যে এখন সময়টা অন্যরকম। নইলে, এদেরও সেই শাস্তি দেওয়া হতো।
ইয়াকুব-মাঝির মতো অনেকেই মতিনের দিকে অবাক হয়ে চেয়ে থাকে। আর হয়তো ভাবে: ঠিকই হইছে। এর কথার কোনো ব্যালেন্স নাই।
বাজারের লোকজন মতিনকে শুধু দেখে আর হাসে।

গুলজারের স্যান্ডেলজোড়ার সঙ্গে লোকজন দুইখান-একখান করে স্যান্ডেল গেঁথে দিতে-দিতে মতিনের গলায় এখন বিরাট একটা মালা। সে এতে আরও বেশি অস্বস্তিবোধ করতে লাগলো। মতিন একবার তার গলা থেকে জুতার মালা খুলতে চেয়েছিলো। কিন্তু পারেনি। কিছুসংখ্যক যুবক ছেলে তার পিছনে হাঁটছে। আর ওদের সতর্কদৃষ্টিও রয়েছে। মতিন যেন পালাতে না পারে।
অবশ্য মতিন এখন পালানোর কোনো চেষ্টাও করছে না। ওর সঙ্গে থাকা রাকিব একবারও মাথা তুলে কারও দিকে তাকাচ্ছে না। সে নিচের দিকে চেয়ে হেঁটে চলছে। তাদের এখন পালাবার কোনো রাস্তা নাই। আর পালাতে গেলে আরও বিপদ—এতে লোকজনের হাতে গণপিটুনি খাওয়ার ভয় রয়েছে। তবুও এরমধ্যেও রাকিব একবার পালাতে চেয়েছিলো। কিন্তু সে পালাতে পারলো না। তার মতলব বুঝে একটি আঠারো-ঊনিশ-বছরের সুঠামদেহের যুবক তার কানে মোচড় দিয়ে তাকে কড়ামেজাজে খুব ভালোভাবে শাসিয়ে দিলো।
মাঝে-মাঝে বাজারের লোকজন জিজ্ঞাসা করছে—ব্যাপার কী?
ছেলেগুলো এতে একজন-দু’জন করে আবার কখনও সমস্বরে জবাব দেয়: এই দুইটা আমাগরে মুক্তিযোদ্ধাদের গালি দিছে। তাই, মুক্তিযোদ্ধা বড়চাচার হুকুমে এই শাস্তি।
লোকজন আর কিছু বলে না। ওরা নিজের গন্তব্যে হাঁটতে থাকে। এদের কেউ-কেউ মতিনের সমর্থক হলেও সামনে কিছু বলতে পারলো না। কিল খাওয়ার ভয়ে এরা গর্তে ঢুকে থাকে। কিন্তু একটু সুযোগ পেলে আবার গর্ত থেকে বেরিয়ে এসে মানুষকে ছোবল মারতে ওস্তাদ। এই দেশের রাজাকাররা ভয়ানক বর্ণচোরা। এদের চেনা সহজ নয়। এরা বর্ণচোরা আমের চেয়েও আরও বেশি জটিল ও কুটিল প্রকৃতির। সুযোগ পেয়েও বিষধর সাপ হয়তো কখনও-কাউকে ছোবল নাও মারতে পারে—কিন্তু রাজাকার সুযোগ পেলে সে তার শত্রুসহ যাকেতাকে ছোবল মারবেই।

বাজারের মসজিদের কাছ দিয়ে মতিনকে নিয়ে যাওয়ার সময় তা দেখে ফেলে নামাজের মোল্লা। সে তখন ছেলেদের উদ্দেশ্যে হাঁক দিয়ে কয়, “বাবারা, অনেক হইছে! এবার উনারে ছেড়ে দেন। উনি আলেম মানুষ! উনারে এমন করলে আপনাগরে গোনাহ হইতে পারে!”
মোল্লার কথা শুনে ছেলেগুলো হাসে। এরমধ্যে তোজাম্মেল আরও বেশি হাসে। সে মিয়াপাড়ার কাছে থাকে। আর লেখাপড়াও খানিকটা জানে। সে ইচ্ছাকৃতভাবে খ্যাক-খ্যাক করে হাসে আর বলে, “হুজুর বুঝি খুব গুনাহ মাপতে পারেন? তাইলে কন তো একাত্তর-সালে রাজাকারগরে কত গুনাহ হইছে?”
তোজাম্মেলের কথা শুনেও মোল্লা তা না-শোনার ভান করে দাঁড়িয়ে থাকে। সে জবাব দেওয়ার মতো কোনো কথা খুঁজে পায় না।
শেষমেশ মোল্লা আবার বলে, “বাবারা, উনি আলেম মানুষ! উনারে এতো অসম্মান করলি আল্লাহ নারাজ হবি!”
মোল্লার কথা শুনে তবুও ছেলেগুলো একটুও দমে না। ওরা, এর কথাটাকে একদম পাত্তা দিলো না। ওরা ওদের কাজ আগের মতো করতে থাকে। আর এর মুখ থেকে গোনাহের কথা শুনে ছেলেরা আরও বেশি হাসে। কেউ কোনো জবাব দেওয়ারও প্রয়োজন মনে করে না। তবুও একটা ছেলে হঠাৎ বললো, “ও হুজুর, আলেম কারে কয় আপনে তা জানেন? ও তো আলেম নয়—জালেম। এই মতিনচোরা দেশ মানে না, ভাষা মানে না, সংস্কৃতি মানে না, জাতি মানে না, মানবতা মানে না! ও তো মানুষই না। ও আবার আলেম হয় কীভাবে? আপনাগরে কিতাবে কি লেখা আছে যে, শূয়রের বাচ্চাও আলেম হতে পারবে?”
এবার মোল্লার মুখটা আরও কালো হয়ে যায়। কালোমানুষের কালোমুখে হঠাৎ যেন জমতে থাকে অকাল-কালবৈশাখের কালোমেঘ!
সবশেষে মোল্লার উদ্দেশ্যে ধমকের সুরে আরেকটা ছেলে বললো, “বড়চাচা কইছে, এইটা আসলেই শূয়রের বাচ্চা। এইবার আপনে চুপ থাকেন।”
মোল্লা চুপ করে। আর ভিতরে-ভিতরে নেকড়ের মতো ফুঁসতে থাকে। আর হয়তো ভাবতে থাকে: যদি আবার কোনোদিন দেশে পাকিস্তান কায়েম হয়—তাহলে এদের দিনদুপুরে খুন করবে। মোল্লার চোখেমুখে ক্রোধ ফুটে উঠার আগেই ছেলেগুলো মতিনদের নিয়ে বাজারের প্রায় শেষমাথায় চলে এলো। এখানেও লোকজন মতিনদের দেখছে আর হাসছে।

দিদার-মাস্টারকে দেখে বাজারের কিছুসংখ্যক লোকজন উৎসাহভরে তাঁর কাছে এগিয়ে এলো। তিনি তাদের অনুরোধে একটা পাইকারি-মালের দোকানে বসলেন। সবাই তাঁকে ধরে বসলো মোল্লা মতিনের বিষয়ে কিছু কথা বলার জন্য। এলাকার প্রায় সববয়সীলোকজন তাঁর কথা শুনতে ভালোবাসে। তিনি ধীরে-ধীরে তাদের উদ্দেশ্যে মতিনের বাপের রাজাকারির কথা বলা শেষ করে অন্যান্য কথাও বলতে লাগলেন। এলাকার লোকজন খুব মনোযোগ দিয়ে তাঁর কথা শুনতে লাগলো।

বাজারের মসজিদের এই মোল্লার নাম মোহাম্মদ সোলাইমান সেখ। গ্রামের লোকে বলে সোলেমান। এই সোলেমান-মোল্লা ইদানীং নামের আগে মাওলানা শব্দও লাগায়। তার জামাটা আগের চেয়ে আরও খানিকটা লম্বা করেছে। আর দাড়ি আগের মতো মাঝারিই রয়েছে। তবে সবচেয়ে উঁচু হয়েছে তার টুপিটা। এটা এখন অনেকদূর থেকে দেখা যায়।
পাবনা-শহরের কাছে পুষ্পপাড়া-আলিয়ামাদ্রাসা থেকে সে নাকি কয়েক বছর আগে আলিমপরীক্ষা দিয়েছিলো। ‘আলিম’ হলো সাধারণ শিক্ষার এইচএসসি-সমমান। এলাকার লোকে বলে, সে পরীক্ষায় পাস করতে পারেনি। আসল খবর হলো: সে আলিমপরীক্ষায় একবার ফেল করেছে আরেকবার বহিষ্কার হয়েছে। কিন্তু পরীক্ষায় পাস না করলে কী হবে—এরই মধ্যে সে বিরাট একখান আলেম হয়ে গেছে। এদেশে এখন আলেম হতে বেশি কিছু তো আর লাগে না। শুধু মুখে কয়েকগাছ দাড়ি, গায়ে একখান লম্বা জামা-কোর্তা বা আলখাল্লা, মাথায় বড়সড় একটা টুপি, আর কুরআনের কিছু আয়াত ও কয়েকখান হাদিস গুছিয়ে বলতে পারলেই সে আলেম! আর এতেই সে নামের আগে লাগিয়ে বসে: হজরত, হজরত মাওলানা, মাওলানা, আল্লামা, মুফতি, মুফাসসির, মুফাসসিরে কুরআন, মুহাদ্দিস, শায়খুল হাদিস ইত্যাদি। এই সোলাইমানও এখন নামের আগে মাওলানা ব্যবহার করা শুরু করেছে। কয়দিন পরে হয়তো সেও আল্লামা কিংবা মুফতি-মুহাদ্দিস লাগিয়ে বসবে! সামান্য একটা পড়ালেখার জোরে সে এখন বাজার-এলাকায় একটা মসজিদের ইমাম—আবার কারও কাছে হুজুর আবার কারও কাছে বড়সড় একখান আলেম! এই দেশের মানুষ আজও আলেমও চেনে না—আর জালেমও চেনে না। এরা চলে হুজুগে। এই হুজুগে-বাঙালিরাই এখন যাকেতাকে ইসলামের মোড়ল বলে স্বীকার করে নিজের দোজখের আগুন নেভাতে ব্যস্ত! তাই, পরীক্ষায় পাস-ফেল এদের কারও কাছে কোনো ব্যাপার নয়—প্রয়োজনে এরা নকল করে পাস করবে কিংবা কয়েকখানা সার্টিফিকেট বানিয়ে নিবে। এরা দুনিয়ালোভী-মৌলোভী! এরা চায় শুধু দুনিয়া। একমাত্র দুনিয়াই এদের জীবনের মূল্য লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও মনোযোগের বিষয়। কিন্তু সমাজে-রাষ্ট্রে এরা ধর্মব্যবসার স্বার্থে, টিকে থাকতে, এবং নিজেদের ধার্মিকপ্রমাণের ক্ষেত্রে লোকদেখানোর জন্য পরকাল তথা আখেরাতের কথা বলে কান্নাকাটি করে থাকে। কিন্তু এদের মকসুদ শুধু দুনিয়া আর দুনিয়া।

এলাকার প্রায় সবলোক জানে: ১৯৭১ সালে, সোলাইমানের বাপ আব্দুল বাসেত সরাসরি একটা বড়সড় ও কুখ্যাত রাজাকার ছিল। সে ছিল রাজাকারদের থানা-কমান্ডার। আর মতিনের বাপ আব্দুর রহিম ছিল রাজাকারের ইউনিয়ন-কমান্ডার। আর এই দুইটাই ছিল তৎকালীন ও আজকের রাজাকারদের আদিসংগঠন—জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানের সক্রিয় নেতা। এরা একাত্তরে পাকবাহিনীর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছিলো। পাকবাহিনীর সঙ্গে এরাও মেতে উঠেছিলো খুন, ধর্ষণ, গণধর্ষণ, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, আর গণহত্যায়। কিন্তু দেশস্বাধীনের পরে বাসেত একদিন মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে ধরা পড়ে। আর মারাও যায় মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে। কিন্তু তাকে বাঁচানোর জন্য আওয়ামীলীগের একনেতা অনেক চেষ্টা-তদ্বির করেছিলো। কিন্তু মাহমুদসাহেবরা তার কথা তো শোনেনি নাই—এমনকি তাকে পর্যন্ত হত্যার হুমকি দিয়েছিলেন। এরপর আওয়ামীলীগ-নামধারী সেই ধান্দাবাজ লোকটা বাসেত-রাজাকারের পক্ষে উকালতি করতে মাহমুদসাহেবদের সামনে আর আসেনি। শোনা যায়, আওয়ামীলীগের ওই নেতার সঙ্গে বাসেত-রাজাকারের নাকি ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল। তাই, নিজের লাভের হিসাব কষে সে বাসেতকে বাঁচাতে সেই সময় মরীয়া হয়ে উঠেছিলো। কিন্তু মাহমুদসাহেবদের দৃঢ়তায় এলাকার এই কুখ্যাত রাজাকার বাসেত আর বাঁচতে পারেনি। বাসেতের মৃত্যুর পরে তার পরিবার আবার হতদরিদ্র হয়ে পড়ে। আর বাসেতের যুবতীস্ত্রী তার সন্তান সোলাইমানকে নিয়ে আরেক জামায়াতনেতার দ্বিতীয় স্ত্রী হিসাবে জীবন শুরু করলে—বড় হয়ে সোলাইমান সেখানে বেশিদিন টিকতে না পেরে পুষ্পপাড়া-মাদ্রাসায় এসে আশ্রয়গ্রহণ করে। সেখানেই সোলাইমান নামকাওয়াস্তে একটু আরবি-উর্দু শিখেছে। এই মাদ্রাসাটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২৭ সালে। এটি পাবনার সর্বাপেক্ষা প্রাচীন মাদ্রাসা। এটি প্রতিষ্ঠার কিছুকাল পর থেকেই এখানে ওহাবী-জামায়াতীদের রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে। পাকিস্তানআমলে এটি পাকিস্তানের দালালদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। আর ১৯৭১ সালে, এটি ছিল উত্তরবঙ্গে পাকবাহিনীর অন্যতম বড়সড় একটা ঘাঁটি। এখানে, নিয়মিত আসতো একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী রাজাকার নিজামী, রাজাকার আব্দুস সোবহান, রাজাকার মাহতাব বিশ্বাস, রাজাকার শিমুল বিশ্বাস, রাজাকার ইসহাক মৌলোভী, রাজাকার ওমর মৌলোভী, রাজাকার ফজলাল ফকির, রাজাকার জয়নাল ফকির, রাজাকার ঠাণ্ডু ইত্যাদি। পাবনা-জেলার ভিতরে এই মাদ্রাসা ছিল রাজাকারদের অন্যতম প্রধান ঘাঁটি। এছাড়া, তাদের সাঁথিয়া ছিল আরেকটি বড়সড় ঘাঁটি। এটি নিয়ন্ত্রণ করতো একাত্তরের শীর্ষস্থানীয় যুদ্ধাপরাধী মতিউর রহমান নিজামীগং।

সূর্য ডোবার আগমুহূর্ত পর্যন্ত ছেলেগুলো মতিন আর রাকিবকে নিয়ে বাজারের আশেপাশের এলাকায়ও আরও কয়েকটা চক্কর দিলো। তারপর দুইটাকে বলদের মতো ছেড়ে দিলো। ওরা ছাড়া পেয়ে পূর্বপাড়ার দিকে একদৌড়ে ছুটে পালালো।

শোভন একসময় বাজারের আড্ডাখানায় মিশে গেল। এখানে, বেশ কয়েকটি চায়ের দোকান রয়েছে। এগুলোকে ঘিরেই মূলত এখানকার আড্ডাখানাটি গড়ে উঠেছে। এরই শেষপ্রান্তে রয়েছে গুলজারের চায়ের দোকান। আজ বিকালে মতিনের ঘটনার পর মাহমুদসাহেব আড্ডাখানায় বসে সবার সঙ্গে শোভনের পরিচয় করিয়ে দিলেন। এখানে, আগে থেকেই এসে বসেছিলেন মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হামিদ ওরফে হামিদ-কমান্ডার। তিনি মাহমুদসাহেবের অধীনে একজন সহকারী-কমান্ডার ছিলেন। তাঁর সাহসিকতায় এলাকাবাসী আজও মুগ্ধ আর গর্বিত। তিনি একাত্তরে পাকবাহিনীনিধনের পাশাপাশি রাজাকারনিধনে বেশি পারদর্শী ছিলেন। আর তিনি সবসময় বলতেন, “পাকি-শূয়রগুলার চেয়ে আমাগরে দেশীশূয়রগুলা বেশি হারামজাদা। তাই, এগুলার কোনো ক্ষমা নাই।”
আরও-একজন বীর-মুক্তিযোদ্ধা এলেন একটু পরে। তাঁর নাম দিদার-মাস্টার। লোকটা খুবই সাহসী। তিনি দেশের বাকী রাজাকারদের নিধনের জন্য এখনও আবার মুক্তিযুদ্ধ করতে চান। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ করে তাঁর তৃষ্ণা এখনও পরিপূর্ণভাবে মেটেনি।
আড্ডাখানায় সবশেষে এলেন অধ্যাপক লিটুমিয়া। তিনি মিয়াবাড়ির ছেলে। বেশিরভাগ সময় তিনি ঢাকায় থাকেন। তবে ইদানীং তিনি নিয়মিত গ্রামের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। তাঁর বয়স চল্লিশের কোঠায়। তবে তাঁর চেহারা তারুণ্যে ভরপুর। দেখলে মনে হয়: চব্বিশ-পঁচিশ বছরের যুবক। তিনি আরও প্রতিবাদী আর ভয়ানক দেশপ্রেমিক। রাজাকার দেখামাত্র এখনও তিনি গুলি করার পক্ষে। আর এতে বিচারের নামে দীর্ঘদিনের নাটক-প্রহসন করার পক্ষপাতী নন তিনি।
শোভনের সঙ্গে অধ্যাপকসাহেব করমর্দন করে ওর পাশে ঘনিষ্ঠ হয়ে বসলেন। এতে শোভন ভীষণ খুশি হলো। তার এখন ভালোই লাগছে। গ্রামটাকে তার এখন আরও বেশি আপন মনে হচ্ছে।

অধ্যাপক লিটু মিয়ার সঙ্গে শোভনের এখনও পর্যন্ত খুব একটা পরিচয় হয় নাই। তবে সে তার বড়চাচার মুখে অধ্যাপকসাহেবের অনেক নামডাক শুনেছে। তিনি যে বেশিরভাগ সময় ঢাকায় থাকেন তা অবশ্য শোভন জানে।
অধ্যাপকসাহেব আজই ঢাকা থেকে গ্রামে এসেছেন। আর উঠেছেনও তাঁদের মিয়াবাড়িতে। তবে তিনি গ্রামে এলে বেশির ভাগ সময় তরফদারবাড়িতেই থাকেন। এখানেই তিনি থাকা-খাওয়ার কাজটি সম্পন্ন করেন। তার কারণ, তাঁর নিজের বাড়িতে লোকজন কেউ থাকে না। তাঁরা সবাই ঢাকামুখী।
শোভন ভাবলো: রাতে তাঁর সঙ্গে আরও ভালোভাবে পরিচিত হওয়া যাবে। এই ভেবে সে এখন আড্ডাখানায় অধ্যাপকসাহেবের পাশে চুপচাপ বসে রইলো।
একটু পরে বিশেষ একটা কাজের কথা বলে মাহমুদসাহেবসহ কয়েকজন সেখান থেকে বেরিয়ে গেলেন।
আর অধ্যাপকসাহেবও তাঁদের সঙ্গে ঘুরতে গেলেন।

সন্ধ্যার পরে মিয়াপাড়া-মসজিদের কাছে এলো মতিন, রাকিব আর সিকান-কামারের ছেলে জুলহাস। ওরা মসজিদের ইমামের রুমে ঢোকার আগে শ্লোগান দিলো: নারায়ে তাকবীর—আল্লাহু আকবর। দ্বীন ইসলাম—জিন্দাবাদ-জিন্দাবাদ। ইসলামীহুকুমাত—জিন্দাবাদ-জিন্দাবাদ। পাকিস্তান—জিন্দাবাদ-জিন্দাবাদ। শেষের শ্লোগানটি দিয়ে ওরা তিনটাই একসঙ্গে এদিকওদিক বারবার তাকাতে লাগলো। আর দেখতে লাগলো—কেউ আবার এসব শুনে ফেলে কিনা! ওদের মনের ভিতরে ভয়ও আছে—এসব কেউ শুনে ফেললে কাল সকালে হয়তো ওদের গলায় আবার ঝুলবে জুতার মালা।
রাকিব ধূর্ত শিয়ালের মতো চারদিকটা সতর্কতার সঙ্গে আর ভালোভাবে দেখে বললো, “না, কেউ নাই। তয় শেষের শ্লোগানটা দেওয়া আমাগরে ঠিক হয় নাই, মতিনভাই। মুক্তিযোদ্ধারা শুনে ফেললে আবার সর্বনাশ হতো!”
আর জুলহাস কিছু না বুঝেই রাকিবের কথার সঙ্গে তালমিলিয়ে শুধু হ-হ করতে লাগলো।
ওদের দেখে ও শ্লোগান শুনে মসজিদের ছোকরা-ইমাম খুশিতে গদগদ হয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো। তার মুখে ঈদের চাঁদ দেখার মতো হাসি। তারপর সে অভ্যর্থনা জানানোর ভঙ্গিতে কোলাকুলি করে ওদের ভিতরে নিয়ে গেল।
এখন ওদের সবক’টার মনে বিরাট শান্তি। ওরা এখন এলাকার ছোট-লাদেনের গুহায় এসে পড়েছে। ওদের আর-কোনো ভয় নাই। ওরা যেন আপাততঃ বিপদমুক্ত।
মিয়াপাড়া-মসজিদে এই লোকটা নতুন ইমাম হয়ে এখানে এসেছে। এইটা জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানের একনিষ্ঠ সেবক। সে সবসময় আল্লাহ, রাসুল ও ইসলামের চেয়ে পাকিস্তানকে বেশি ভালোবাসে। তার মনে হয়: এই দুনিয়ার মধ্যে পাকিস্তানই একখানা বেহেশতো! আর পাকিস্তানকে ভালোবাসলেই সরাসরি বেহেশতে যাওয়া যাবে! এমন একটা বিশ্বাসের জোরে এই মসজিদের ইমাম পাকিস্তানপন্থীলোকগুলোকে খুব পেয়ারমহব্বত করে থাকে। এরা তার আসল ভাইবেরাদার—আর জানের জান। সাধারণ মুসলমানদের চেয়ে এরা তার কাছে বেশি প্রিয়—আর কলিজার টুকরার মতো। পাকিস্তানের নাম শুনলে এই ছোকরা-ইমাম খুশিতে-আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায়।
এই ইমামের নাম আব্দুর রশিদ ওরফে রশিদ-হুজুর। তবে এই গ্রামসহ আশেপাশের অধিকাংশ লোকই তাকে রশিদ-মোল্লা বলে ডাকে। সে মাদ্রাসায় বড়জোর এইট-নাইন পর্যন্ত পড়েছিলো। তারপর আর পড়তে পারেনি। শোনা যায়, সে নাকি ঢাকার একটা মাদ্রাসায় ভর্তিও হয়েছিলো। কিন্তু সেখানে বেশিদিন থাকতে-না-টিকতে পারেনি। এর আগে সে এতোদিন আতাইকুলার কাছে একটা মাদ্রাসায় ভর্তি হয়েছিলো। সেখানে, থাকা-খাওয়া ফ্রিতে কিছুদিন কুরআন-কিতাব নাড়াচাড়া করে বুঝে গেছে এসব সে পারবে না। তাই, সে খুব সহজে কয়েক গোছা লম্বা দাড়ি রেখে আর খুব সুর করে কুরআনতেলাওয়াত করে এলাকার গণ্ডমূর্খদের তাকলাগিয়ে দিয়েছিলো। তারপর সে একদিন এদের মনজয় করে এই মসজিদের ইমাম হয়ে আবার গ্রামেই ফিরে এসেছে। গ্রামের লোকগুলো এখনও শুধু সুর বোঝে। পড়া সহীশুদ্ধ হচ্ছে কিনা তা তারা দেখে না—আর এগুলো দেখার মতো যোগ্যতাও কারও নাই। এজন্য রশিদরা গ্রামের মোল্লা হতে কোনো বাধার সম্মুখীন হচ্ছে না। এর বাড়ি সোনাপদ্মার শেষসীমানায়। এটা মসজিদ থেকে খুব একটা দূরে নয়। তবুও সে ইচ্ছে করে মসজিদের এখানেই থাকে। মসজিদের পাশে তার জন্য একখানা দোচালা বড় ঘর বরাদ্দ করা রয়েছে। তা সত্ত্বেও সে মসজিদের বারান্দায় একখানা ছোট খুপরির মতো কক্ষও বানিয়ে নিয়েছে। এখানেও সে মাঝে-মাঝে বসত করে। তবে সে বিবির সোহবতে যাওয়ার সময় ঘরেই যায়। বয়স তার বড়জোর বাইশ কি তেইশ। তবুও এরই মধ্যে সে দুই ছেলে-মেয়ের বাপ হয়েছে। আরেকটি নাকি আসছে। লোকজন বলে, সে সদাসর্বদা প্রোডাকশনে ব্যস্ত। সে এখন নিয়মিত মুজাহিদ বানানোর কাজে নিয়োজিত।
আজও সে মসজিদের বারান্দায় ছোট্ট খুপরিতে বসে ছিল। তার তিনটা দ্বীনীভাইকে দেখে সে যারপরনাই আনন্দিত হয়েছে। সবার সঙ্গে জোশে সে কোলাকুলি করে দ্রুত তাদের ভিতরে নিয়ে গিয়ে রুমের দরজা আটকিয়ে দিলো।
সবাই তার চৌকির উপর বসে পড়লো।
রাকিব বসতে-বসতে বললো, “হুজুর, একজন আলেমের উপর এতোবড় অপমান আর তো মানা যায় না। শালারা মুক্তিযুদ্ধের নামে দেশটারে আবার শেষ কইরতে চায়। আমরা ভালোমানুষ চায়ের দোকানের সামনে বসে চা খাচ্ছিলাম—এমন সময় ওই মুক্তিযোদ্ধা-কমান্ডার, ইসলামের শত্রু মাহমুদ আমাগরে ধইরে গলায় জুতার মালা পরায়ে দিলো। এর কি কোনো বিচার হবে না, হুজুর?”
রশিদ-মোল্লা আফসোস করতে-করতে বলে, “হবে ভাই, হবে। এই সরকার আর কদ্দিন। আবার যদি আমাগরে জোট ক্ষমতায় আইসতে পারে—তাইলে ওদের একেবারে জানে মারবো। শালাগরে মুক্তিযুদ্ধ শেষ কইরে দেবো। ওদের সাহস কত? ওরা ইসলামের সৈনিকদের গায়ে হাত দেয়!”
মতিন এবার উত্তেজিত হয়ে বলে, “এর শোধ আমরা নেবই। আমি আলেমের ছাওয়াল আলেম। আর আমার গলায় দেয় জুতার মালা! দেশটা ইন্ডিয়া হয়ে গেছে। এইখানে এহন মালাউনের রাজত্ব আর মালাউনের রাজত্ব। দেশে এহন মালাউনের সরকার!”
জুলহাস লাফাতে-লাফাতে বলে, “হ, তা-ই। মালাউনরা আইজ মুসলমানের গায়ে হাত তোলে!”
রশিদ-মোল্লা এতে উত্তেজিত হয়ে বলে, “মালাউনের বাচ্চারাও ছিল নাকি ওদের সাথে?”
জুলহাস এবার গলার স্বর নামিয়ে আস্তে-আস্তে বলে, “না, মালাউন কাউরে এইসময় দেহি নাই। আর আমি ছিলাম ভিড়ের মধ্যে—যাতে আমারে কেউ চিনতে না পারে। চিনলে আমারেও রেহাই দিতো না শালারা। আর ওদের মালাউন কচ্ছিলাম কেন হুজুর, ওরা তো সবাই হয় আওয়ামীলীগ করে, আর নয়তো শালা বামপন্থী। তাই, ওরা তো মালাউনই!”
রশিদ-মোল্লা এবার খুশি হয়ে একগাল হেসে কয়, “তা একখান কতার মতো কতাই কইছো ভাই। তোমার দেহি বুদ্ধিও আছে!”
একটু পরে জুলহাস হাসিমুখে রশিদের দিকে তাকিয়ে বলে, “আচ্ছা হুজুর, আপনে তো বিরাট আলেম মানুষ। অনেককিছু জানেন। আর আমি তো কামারের ব্যাটা কামার—লেহাপড়াও জানি না। আমার বাপও তা-ই। কিন্তু আপনে তো কতকিছু জানেন। আমারে একখান কতা কন তো। আমরা আবার দেশটারে পাকিস্তান বানাতে পারি না? পাকিস্তান হইলে কত লাভ! দেশটা একেবারে সোনার বাংলা হয়ে যাবে!”
মতিন এবার খেঁকিয়ে ওঠে আর বলে, “শালার ব্যাটা, দেশটা যদি পাকিস্তানই হবি তাইলে আর সোনার বাংলার নাম নিচ্ছিস কেন? বল সোনার পাকিস্তান হবি।”
জুলহাস এবার নিজের ভুল বুঝতে পেরে জিভে ছোট্ট একটা কামড় দিয়ে বলে, “থুক্কু, মনের ভুলে একখান বেফাঁস কতা কইয়ে ফেলাইছি। মাফ করেন হুজুর। এমনে কি কই আমরা মূর্খমানুষ!”
রশিদ হেসে বলে, “কতায় কিছু আসে যায় না। তবে তোমার ঈমান সাচ্চা। আর তোমার ঈমান যে পাকিস্তানের প্রতি বিশ্বাসস্থাপনে একেবারে চিরস্থায়ী আর এতো মজবুত—তাতেই বোঝা যায়, তুমি একজন সাচ্চা মুসলমান।”
মতিন বলে, “হ, এইটা ঠিক কইছেন হুজুর। ওর ঈমান পাকা আর মজবুত। আমাগরে সবারই পাকিস্তানীঈমান। এইটা ঘুণেও খায় না আর বোম মারলেও বাংলাদেশ কিংবা ইন্ডিয়ার দিকে যাবে না। আমরা পাকিস্তানীঈমানদার।”

(চলবে)

সাইয়িদ রফিকুল হক
পূর্বরাজাবাজার, ঢাকা,
বাংলাদেশ।
৩০/০৯/২০১৭

বিভাগ: 

Comments

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

সাইয়িদ রফিকুল হক
সাইয়িদ রফিকুল হক এর ছবি
Offline
Last seen: 13 ঘন্টা 34 min ago
Joined: রবিবার, জানুয়ারী 3, 2016 - 7:20পূর্বাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

কু ঝিক ঝিক

ফেসবুকে ইস্টিশন

SSL Certificate
কপিরাইট © ইস্টিশন.কম ® ২০১৬ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর