নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

শিডিউল

ওয়েটিং রুম

এখন 3 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • অভিজিৎ
  • মূর্খ চাষা
  • দ্বিতীয়নাম

নতুন যাত্রী

  • রোহিত
  • আকাশ লীনা
  • আশরাফ হোসেন
  • হিলম্যান
  • সরদার জিয়াউদ্দিন
  • অনুপম অমি
  • নভো নীল
  • মুমিন
  • মোঃ সোহেল রানা
  • উথোয়াই মারমা জয়

আপনি এখানে

অবিশ্বাসীর মনস্তত্ত্বঃ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ (২)


কিছু মানুষ কখনোই শেখে না।

অবিশ্বাসীর বিশ্বাসের সংজ্ঞা, বুদ্ধিমত্তা ও মুন্সিয়ানা

‘আমার অবিশ্বাস’ গ্রন্থের দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পড়লে হুমায়ুন আজাদ কেন বিখ্যাত হয়েছিলেন তা টের পাওয়া যায়। তাঁর মুন্সিয়ানা ও জ্ঞানের ধার বোঝা যায়। তবে আমার কাছে তাঁর মুন্সিয়ানা ও জ্ঞান পরীক্ষা-নিরীক্ষা সাপেক্ষ। কিন্তু যারা আজাদ স্যারের অন্ধ ভক্ত; আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা বলে, তারা এই পরিচ্ছেদটি পড়তে বসলে ইমোশনাল হয়ে পড়বে। তাদের চক্ষুদ্বয় শ্রদ্ধায় অর্ধনিমীলিত হবে, তাদের কর্ণদ্বয় বন্ধ হয়ে যাবে। মাথা শ্রদ্ধায় নুয়ে আসবে। তবে মস্তিষ্কের ভেতর তাদের ইমোশনাল করে তোলা limbic system [১] জাগ্রত ও সমুন্নত থেকে তাদের ভেতর একরকম ঘোর সৃষ্টি করবে। যে ঘোর তাদের চিন্তার চারপাশে এক প্রতিরক্ষা প্রাচীর গড়ে তুলবে। যে প্রাচীর যে কোনো সমালোচনা এবং হুমায়ুন আজাদের প্রত্যক্ষ ভুল-ভ্রান্তি সম্পর্কিত প্রমাণ-মন্তব্য পিংপং বলের মত ফিরিয়ে দেবে এবং সুরক্ষিত রাখবে হুমায়ুন আজাদের প্রতি প্রজ্ঞাহীন মমত্ববোধ।

সাধারণ, আমোদপ্রিয় পাঠক ‘আমার অবিশ্বাস’ এর দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে প্রথম পৃষ্ঠার শেষ ক’লাইন হতে টানা আট-নয় লাইন পড়লে হকচকিয়ে যাবেন প্রথমেই। কারো কারো মাথা ঘুরতেও শুরু করতে পারে। বাঙালি, বিশেষ করে সাধারণ বাঙালির কাছে বাংলা ব্যাকরণ একরকম এলার্জির মত ব্যাপার-স্যাপার। এড়িয়ে বাঁচতে পারলেই ভাগ্যকে ধন্যবাদ দেয়। আমিও প্রথমে হকচকিয়ে গিয়েছিলাম। ব্যাকরণ সংক্রান্ত দুর্বোধ্য জ্ঞান দানের পর তিনি ভাষার কারুকাজে এক লহমায় সিদ্ধান্ত ছুঁড়ে দিলেন পাঠককে এভাবে-

“বিশ্বাস নিশ্চয়তা বোঝায় না, সন্দেহই বেশি বোঝায়; তবে বিশ্বাসীদের স্বভাব ভাষার স্বভাবের বিপরীত;-ভাষা যেখানে বোঝায় অনিশ্চয়তা, বিশ্বাসীরা সেখানে বোঝেন নিশ্চয়তা।”

আপনি যখন একটানা মুগ্ধ হয়ে পড়ে যাবেন তখন বিচার করতে যাবেন না মোটেও যে, প্রথমে বাংলা ব্যাকরণ শিখিয়ে হঠাৎ করে উল্লেখ্য লাইনে বাংলা ভাষা উল্লেখ না করে কেবল ভাষা বলে সার্বজনীন সুর তুললেন কেন তিনি? এ-ও ভাববেন না যে, এমন ব্যাকরণ জানা পন্ডিত নিশ্চয় কোনরকম ধোঁকা দিচ্ছেন বা মন ভোলানো বাক্য বলছেন। আপনার সাইকোলজি আরো বোঝাবে যে, এমন পন্ডিত মানুষ নিশ্চয় ভাষা সংক্রান্ত ভুল-ভাল বকবেন না বা ব্রেইনওয়াশ/আইওয়াশ টাইপ কিছু একটা করবেন না। তবে বাংলার পাশাপাশি যদি কিঞ্চিত ইংরেজি জ্ঞান আপনার থাকে এবং লেখাটা বেশ কয়েকবার মনোযোগ দিয়ে পড়ার ধৈর্য আপনার থাকে, তাহলে আপনি বুঝবেন স্যারের চাতুর্য। আপনি এ-ও বুঝবেন বা স্বীকার করবেন যে, বাংলায় ‘বিশ্বাস’ শব্দটির বিকল্প নেই। কিন্তু ইংরেজিতে ব্যাপারটা তা নয়। আমরা সামান্য পড়াশুনা করলে দেখি যে, ‘বিশ্বাস করা’ কথাটা বোঝাতে আপনি বহুল ব্যবহৃত ইংরেজি শব্দ পাবেন Believe এবং Faith।

ক্যামব্রিজ ডিকশনারী, Believe এর অর্থ বলছে এরকম- to think that something is true or correct.

Faith এর অর্থ বলছে এরকম- a high degree of trust or confidence in something or someone.

উপরে প্রদত্ত ইংরেজি শব্দদুটোর অর্থ ভালো করে দেখুন, পছন্দমত বাক্যে বসিয়ে সুরগুলো ধরার চেষ্টা করুন। উপরোক্ত শব্দদ্বয়ের বাংলা অর্থ করতে গেলে আমরা পর্যায়ক্রমে ‘বিশ্বাস করা’ এবং ‘বিশ্বাস’ ব্যবহার করে থাকি। ‘আমি স্রষ্টায় বিশ্বাস করি’ কথাটা কথায় কথায় ব্যবহার করলেও আসলে আমরা বোঝাই- স্রষ্টায় আমার চূড়ান্ত/সর্বোচ্চ আস্থা/ভরসা আছে’। যা বোঝাতে ইংরেজিতে Faith ব্যবহৃত হয়, Believe নয়। আর এতে যদি আপনি একমত হন, এ-ও স্বীকার করবেন যে, স্রষ্টায় আস্থা/বিশ্বাস বোঝাতে আসলে শেষতক ইংরেজিতে আমরা Faith শব্দটিই বুঝি। ‘বিশ্বাস’ মানেই আমরা বুঝি স্থিরতা, নিশ্চয়তা ও ভাল কিছুর আশা। আর ভাষা কখনোই অনিশ্চয়তা বোঝায় না। এটা তাঁর উর্বর মস্তিষ্কপ্রসূত কল্পনা। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭-ই মার্চের ভাষণ থেকে একটি সহজ ও শক্তিশালী উদ্ধৃতি দিই-

‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

উল্লেখ্য বক্তব্যে ভাষা কী কোনোভাবে আমাদের অনিশ্চয়তায় ফেলে? মাত্র নয়টি শব্দ কী আমাদের নিশ্চিত করে দেয় না আমাদের ভবিষ্যত করণীয় সম্পর্কে? তাহলে হুমায়ুন আজাদ কী বিভ্রান্তি ছড়াতেই চেয়েছিলেন কেবল? আমার কিন্তু তা-ই মনে হয়। কেননা তিনি জানতেন অনিচ্শয়তা যদি কিছু থেকে থাকে তবে সেটা লেখকের ইচ্ছের প্রতিফলন, ভাষার নয়। সুতরাং, দুঃখের সাথে বলতে বাধ্য হচ্ছি- , ‘আমার অবিশ্বাস’ গ্রন্থে দ্বিতীয় পরিচ্ছেদের প্রথম পাতার শেষাংশ এবং দ্বিতীয় পাতার প্রথমাংশের অবতারণা স্রেফ অপ্রয়োজনীয় পান্ডিত্য প্রকাশ এবং বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা হিসেবে ধরে নিতে পারেন।

এছাড়াও হুমায়ুন আজাদ অবিশ্বাসের স্বপক্ষে দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কীট্স, টি.এস.এলিয়ট ও আরো অনেক কথাশিল্পীদের রচনা নিয়ে দুর্দান্ত আলাপ করেছেন। যা এককথায় চমৎকার। বাহবা পাবার দাবিদার। কিন্তু আমার মনে হয়েছে অবিশ্বাস সংক্রান্ত বিষয়ে হুমায়ুন আজাদের সাহিত্যের আলাপ অপ্রাসঙ্গিক। কেননা যুগে যুগে রচিত সাহিত্য-দর্শন দিয়ে আপনি স্রষ্টায় বিশ্বাসের বিষয়ে সিদ্ধান্তে আসতে পারেন না। কোনোভাবেই এটা যুক্তিযুক্ত না। আমি মনে করি, সাহিত্য আমাদের আনন্দ দেবার উৎস। সে উৎস কখনোই আমাদের স্থির এবং নিশ্চিত কিংবা একটিমাত্র ভাবসত্যে পৌঁছে দেয় না। বিভিন্নজনের রচিত মহৎ সাহিত্যকে কেবল বিশ্বাস কিংবা অবিশ্বাসের পাল্লায় মেপে হুমায়ুন আজাদ একে সীমিত করার চেষ্টা করে কিছু বিপদজনক অর্বাচীন পাঠকগোষ্ঠী তৈরী করেছেন যাদের বাংলা সাহিত্যের জন্যে আপদ বলেই মনে করি আমি। যেমনটা কেউ কেউ মনে করে হুমায়ুন আহমেদের পাঠকদের। রচিত সাহিত্যকে যে কত ব্যাপক আঙ্গিকে দেখা যায় তা সরল বাংলায় দেখিয়েছেন সৈয়দ শামসুল হক। তাঁর ‘মার্জিনে মন্তব্য’, ‘কথা সামান্যই’ পড়লে ব্যাপারটা বোঝা যায়। শামসুল হকের ‘মার্জিনে মন্তব্য’ আরো আট-ন’বছর পূর্বে প্রকাশিত হলে হয়তো সাহিত্যকে বিস্তৃত আঙ্গিকে দেখার মানসিকতা হুমায়ুন আজাদের মধ্যে জাগ্রত হলেও হতে পারতো। অথবা, কে জানে! কিছু মানুষ কখনোই শেখে না।

সাহিত্যকে অবশ্যই কেউ নিজস্ব মতবাদ বা বিশ্বাস দিয়ে একঘরে করতে পারে না। কারো বিশ্বাস অবিশ্বাস দিয়ে সাহিত্যের কাজও নেই। সাহিত্যে অবিশ্বাস-বিশ্বাস প্রকাশ বা এর প্রমাণ খোঁজ বা রাখা কিংবা মতবাদ প্রচারের ব্যাপারটা কেউ কেউ আধুনিক বলে বিবেচনা করেন। আমি দৃঢ় ভাবে মনে করি, সাহিত্যে আধুনিকতা বা নতুনত্ব বলে কিছু নেই। আপনার যুগে বা শতাব্দীতে যে সাহিত্য রচিত হচ্ছে তা স্রফ আপনার সমসাময়িক কালের সাহিত্য। একশো বা দুশো বছর পরে আপনার যুগ আর আধুনিক বা নতুন থাকছে না। এভাবে হাজার বছর পরে চিন্তা করলে আপনার কালের সাহিত্য প্রাচীন ও বাতিল বলে বিবেচিত হবে। যতই আধুনিক, উত্তরাধুনিক বলে চেঁচান না কেন, এতে করে আপনি কেবল নিজের যুগ/সময়কে অনর্থক মহীয়ান করার চেষ্টা করেন কেবল। আধুনিক-উত্তরাধুনিক সাহিত্য বলে কিছু নেই, যা আছে তাকে বড়জোর আপনার সমসাময়িক কালের সাহিত্য বলতে পারেন। আর সাহিত্য থেকে আপনি যদি পছন্দমত মতবাদের স্বপক্ষে সিদ্ধান্ত-বক্তব্য খুঁজে পেতে চান তবে আপনি যে মতাদর্শের আঙ্গিকে সাহিত্যকে দেখবেন কখনো কখনো সেটা তা-ই। এর জ্বলন্ত উদাহরণ হিসেবে দ্বিতীয় পরিচ্ছেদের প্রায় শেষাংশে গিয়ে সুধীন্দ্রনাথের ‘প্রশ্ন’ কবিতার যে লাইনগুলো হুমায়ুন আজাদ তুলে দিয়েছেন তা আমিও তুলে ধরলাম। সাথে বাড়তি হিসেবে কবিতাটির আরো কিছু লাইনসহ শেষ তিন লাইন তুলে ধরা গেল-

ভগবান, ভগবান, রিক্ত নাম তুমি কি কেবলই?
নেই তুমি যথার্থ কি নেই?
তুমি কি সত্যিই
আরণ্যিক নির্বোধের ভ্রান্ত দুঃস্বপন?
তপন্ত তপন
সাহারা-গোবির বক্ষে জ্বলে না কি তোমার আজ্ঞায়?
চোখের ইঙ্গিতে তব তমিস্ররা করাল
ভারাক্রান্ত গগনেরে করে না কি স্বচ্ছন্দে নিক্ষেপ
উন্মত্ত, উদ্বেল অতলান্তিকে?
স্তব্ধ গৌরীশংকরের বুকে
দিগম্বরী ঝঞ্ঝা, সে কি বাজায় না তোমার বিষাণ
তান্ডবের উন্মথ হিন্দোলে?

কবিতাটির শেষ লাইনগুলো এরকম-

আজিকে আর্তের কাছে পারিবে কি করিতে প্রমাণ
নও তুমি নামমাত্র
তুমি সত্য, তুমি ধ্রুব, ন্যায়নিষ্ঠ তুমি ভগবান?

হুমায়ুন আজাদ কবিতাটির কিয়দংশ তুলে দিয়ে বলেছেন, কবিতায় সুধীন্দ্রনাথ অবিশ্বাসের কথা বলছেন। কিন্তু কবিতার শেষ তিন লাইন কী বলে? আমার তো নিশ্চিত মনে হয় শেষ তিন লাইনে কবি তার স্রষ্টার কাছে করুণ আর্জি/প্রার্থনা করছেন। আর তাই হয়তো আজাদ স্যার পুরো কবিতাটা তুলে দিতে চান নি। তবে বর্তমানে সার্চ ইঞ্জিনের উৎকর্ষতার যুগে এসে আর যা-ই হোক, পাঠকের কাছে কোনো তথ্যই গোপন নয়। সে যুগ শেষ। আর প্রথম দিকের লাইনগুলো পড়ে আপনার কেবলই অবিশ্বাস মনে হল স্যার? লাইনগুলো কবির আত্মসমর্পণ, অভিমানে ভগবানকে দোষারোপ, সিদ্ধান্তহীনতা, ভগবানকে নিতান্ত কাছের ভেবে অভিযোগ শোনানো অথবা স্রষ্টাকে নির্লিপ্ত ক্ষমতাধর ধরে নিয়ে ব্যক্তিগত ক্ষোভ-রাগ প্রকাশও তো বোঝায়? কিন্তু অবিশ্বাস কোনোভাবেই বোঝায় না।
‘আমার অবিশ্বাস’ গ্রন্থের দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ এর এক জায়গায় হুমায়ুন আজাদ বিশ্বাসের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে লিখেছেন-

“বিশ্বাস কাকে বলে? আমরা কি বলি আমি পিঁপড়েয় বিশ্বাস করি, সাপে বিশ্বাস করি, জলে বিশ্বাস করি, বা বজ্রপাতে, বা পদ্মানদীতে বিশ্বাস করি? এসব এবং এমন বহু ব্যাপারে বিশ্বাসের কথা ওঠে না, কেননা এগুলো বাস্তব সত্য বা প্রমাণিত। যা সত্য, যা প্রমাণিত, যা সম্পর্কে কোনো সন্দেহ নেই, তাতে বিশ্বাস করতে হয় না; কেউ আমরা বলি না যে আমি বিদ্যুতে বিশ্বাস করি বা রোদে বিশ্বাস করি বা গাড়িতে বিশ্বাস করি, কেননা সত্য বা প্রমাণিত ব্যাপারে বিশ্বাস করতে হয় না, বিশ্বাস করতে হয় অসত্য, অপ্রমাণিত, সন্দেহজনক বিষয়ে। অসত্য, অপ্রমাণিত, কল্পিত ব্যাপারে আস্থা পোষণই হচ্ছে বিশ্বাস।”

উপরোক্ত অনুচ্ছেদ থেকে বিশ্বাসের সংজ্ঞা বিষয়ে হুমায়ুন আজাদের বক্তব্য সুস্পষ্ট। অনুচ্ছেদের মূলকথা- যা অপ্রমাণিত তা অসত্য এবং তাতে আস্থা রাখার নামই বিশ্বাস। এখন কথা হচ্ছে, আপনি অপ্রমাণিত বিষয়ে বিশ্বাস করেন কী না? যদি করেন তাহলে হুমায়ুন আজাদের সংজ্ঞা অনুযায়ী আপনি কিন্তু বিশ্বাসীদের কাতারে পড়ে যান! এই বিষয়ে হাতের কাছের উদাহরণ হিসেবে বলব- Dark Matter [২], Dark Energy [৩] ইত্যাদির কথা। বিজ্ঞান বলে এগুলো আছে, কিন্তু প্রমাণিত নয়। এসবের ক্রিয়া উপলব্দ, সরাসরি এরা নয়। ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জি উপলব্দ বস্তু নয়; এটা আপনি অবিশ্বাসী হলেও বিশ্বাস করতে বাধ্য। সমস্যা কেবল স্রষ্টার বেলায়? নাকি স্রষ্টার দেয়া নীতি-নৈতিকতায়? কোথায় সমস্যা?

যাই হোক, এই বিষয়ে সমাধানে আসতে আপনি অবিশ্বাসী হলে দুটো কাজ করতে পারেন। এক, হুমায়ুন আজাদের বিশ্বাসের সংজ্ঞাকে বাতিল/ভুল প্রমাণ করে বক্তব্য দিয়ে বলতে পারেন- হুমায়ুন আজাদ বাতিল; দুই, আন্তরিকভাবে স্বীকার করতে পারেন যে আপনিও বিভিন্ন অপ্রমাণিত-অদেখা বিষয়ে বিশ্বাস করেন; শুধু স্রষ্টার বেলায় আপনার এলার্জি।

বিশ্বাসের সাথে সম্পর্ক আমাদের বেঁচে থাকার সাথে, নিত্য দিন-যাপনের সাথে। বিশ্বাস ছাড়া দিনযাপন মুশকিলের ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে। আপনি দৈনন্দিন জীবনে বিশ্বাস করেন আপনার পিতাকে-মাতাকে, বিশ্বাস করেন স্ত্রীকে, সন্তানকে, বিশ্বাস করেন নিজের মেধায়, পাড়ার রেস্টুরেন্ট অথবা নামি দামি রেস্টুরেন্টকে। বিশ্বাস করেন মুদি দোকানদার, এলাকার নাপিত, মুচিকে। আপনার বিশ্বাস থাকে শিক্ষকের ওপর, কর্মস্থলে, মাসিক বেতন বা মুনাফার ওপর। বিশ্বাস ছাড়া আপনি বাঁচতে পারেন নি, পারেন না। চাই সে হোক ধর্ম বিশ্বাস বা কিছু একটা অদেখায় বিশ্বাস।

এখন যদি আপনি বলেন বিশ্বাসের সাথে বিজ্ঞানের সম্পর্ক নেই, বিশ্বাস বিজ্ঞান দ্বারা আলোকিত নয়; তবে আপনি মানুষকে অনর্থক সমস্যায় ফেলে দেন। বিশ্বাস/ধর্মবিশ্বাস এবং বিজ্ঞানকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেন। অথচ এরা প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। কোথাও কোথাও এরা একে অপরের পরিপূরক। বিজ্ঞান নৈতিকতা নির্ধারণ করে না, বিজ্ঞানের পক্ষে তা সম্ভবও নয়। প্রমাণ ছাড়া বিজ্ঞান স্থবির। প্রমাণিত/অপ্রমাণিত তত্ত্ব বিজ্ঞানের ভিত্তি। অপরদিকে, স্রষ্টায় বিশ্বাস প্রমাণ বা তত্ত্ব নির্ভর নয়। স্রষ্টায় বিশ্বাসই ধর্মের ভিত্তি এবং শক্তি। যে শক্তি এবং ভিত্তি মানুষের নৈতিক আচরণ নির্ধারণ করে, জীবনাচরণ শেখায়, মানবিক করে তোলে।

এই বিষয়েই আইনস্টাইন বলেছেন-

‘Science without religion is lame, religion without science is blind.’

আর আপনি বলছেন- ধর্ম বিশ্বাস আর বিজ্ঞান পাশাপাশি চলতে পারে না, একটি অপরটিকে বাতিল করে? আইনস্টাইনকে ছাপিয়ে? তার মানে কি আপনি নিজেকে প্রগতিশীল আর আইনস্টাইনকে মধ্যযুগীয় বলবেন? আইনস্টাইন কেন উল্লিখিত বক্তব্যটি করেছেন তা নিয়ে কিছু মতবিরোধ আছে। আইনস্টাইন প্রচলিত ধর্মবিশ্বাসে বিশ্বাসী ছিলেন না। তবে স্রষ্টা বা সবকিছুর পেছনে যে কোনো চূড়ান্ত বুদ্ধিমান সত্ত্বা নেই এটা বলতে তিনি নারাজ ছিলেন। সবকিছুর পেছনে যে একজন স্রষ্টা নেই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে স্টিফেন হকিংও দ্বিধা করেছেন, যা আমরা একদম শেষদিকে গিয়ে জানব। যাইহোক, আইনস্টাইন ছিলেন সর্বেশ্বরবাদী (Pantheistic)। এখন আপনি নিজেকে আইনস্টাইনের চেয়ে জ্ঞানী, ভাবতে পারেন। দেখুন, পড়ুন একটি ইন্টারভিউতে এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি কী বলেছেন-

“Your question is the most difficult in the world. It is not a question I can answer simply with yes or no. I am not an Atheist. I do not know if I can define myself as a Pantheist. The problem involved is too vast for our limited minds. May I not reply with a parable? The human mind, no matter how highly trained, cannot grasp the universe. We are in the position of a little child, entering a huge library whose walls are covered to the ceiling with books in many different tongues. The child knows that someone must have written those books. It does not know who or how. It does not understand the languages in which they are written. The child notes a definite plan in the arrangement of the books, a mysterious order, which it does not comprehend, but only dimly suspects. That, it seems to me, is the attitude of the human mind, even the greatest and most cultured, toward God. We see a universe marvelously arranged, obeying certain laws, but we understand the laws only dimly. Our limited minds cannot grasp the mysterious force that sways the constellations. I am fascinated by Spinoza's [4] Pantheism. I admire even more his contributions to modern thought. Spinoza is the greatest of modern philosophers, because he is the first philosopher who deals with the soul and the body as one, not as two separate things..”
- G. S. Viereck, Glimpses of the Great (Macauley, New York, 1930) p. 372-373.

পাদটীকাঃ

1. The limbic system supports a variety of functions including emotion, behavior, motivation, long-term memory, and olfaction. Emotional life is largely housed in the limbic system, and it has a great deal to do with the formation of memories.

2. Dark matter is an unidentified type of matter comprising approximately 27% of the mass and energy in the observable universe that is not accounted for by dark energy, baryonic matter (ordinary matter), and neutrinos. The name refers to the fact that it does not emit or interact with electromagnetic radiation, such as light, and is thus invisible to the entire electromagnetic spectrum. Although dark matter has not been directly observed, its existence and properties are inferred from its gravitational effects such as the motions of visible matter, gravitational lensing, its influence on the universe's large-scale structure, and its effects in the cosmic microwave background.

3. In physical cosmology and astronomy, dark energy is an unknown form of energy which is hypothesized to permeate all of space, tending to accelerate the expansion of the universe. Dark energy is the most accepted hypothesis to explain the observations since the 1990s indicating that the universe is expanding at an accelerating rate.

4. Baruch Spinoza was a Dutch philosopher. Spinoza argued that God exists and is abstract and impersonal. For Spinoza, our universe (cosmos) is a mode under two attributes of Thought and Extension. God has infinitely many other attributes which are not present in our world.

---------
চলবে
---------

পূর্ববর্তী পর্বের লিংক- মুখবন্ধ প্রথম পরিচ্ছেদ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ (১)

বিভাগ: 

Comments

ড. লজিক্যাল বাঙালি এর ছবি
 

পড়লাম। বাহ
==============================================
ফেসবুকে আমার ইস্টিশন বন্ধুদের Add করার ও আমার ইস্টিশনে আমার পোস্ট পড়ার অনুরোধ করছি। লিংক : https://web.facebook.com/JahangirHossainDDMoEduGoB

===============================================================
জানার ইচ্ছে নিজেকে, সমাজ, দেশ, পৃথিবি, মহাবিশ্ব, ধর্ম আর মানুষকে! এর জন্য অনন্তর চেষ্টা!!

 
তায়্যিব এর ছবি
 

আমি ভাষার এতটা বুঝি না।তবে কোনো একটা লিখলেই সেটা সমালোচনা হয়না। আপনি হুমায়ূন আজাদের সমালোচনা করতে যেয়ে খেই হারিয়ে ফেলছেন।লিখছেন ঠিকই কিন্তু বুঝছেন ভুল। কোটেশন তুলে দিলাম আবার পড়েন -
//ক্যামব্রিজ ডিকশনারী, Believe এর অর্থ বলছে এরকম- to think that something is true or correct.
Faith এর অর্থ বলছে এরকম- a high degree of trust or confidence in something or someone.//

believe আর faith এক জিনিস না।

যা অপ্রমানিত অসত্য তা মেনে নেওয়ার নামই বিশ্বাস।।

অপর পক্ষে dark matter আপনাকে বিশ্বাস করতে বলে নাই। বিজ্ঞান আমাদের এমন জায়গায় নিয়ে গেছে যে আমরা বিজ্ঞানের উপর আস্থাশীল।
আপনার আমার বিশ্বাস অবিশ্বাস যাই হোক, dark matter এর কিছুু যায় আসে না।

বিশ্বাস, আস্থা, believe, faith আরেকটু জানোন।

তায়্যিব

 
পথিক রাজপুত্র এর ছবি
 

* `বিজ্ঞান আমাদের এমন জায়গায় নিয়ে গেছে যে আমরা বিজ্ঞানের উপর আস্থাশীল।'- আপনার এই বক্তব্যটিই বলে দেয় বিশ্বাসকে আপনি আস্থাশীলতার মোড়কে পুরে নিয়েছেন! আস্থাশীলতা শব্দটি বিশ্বাসেরই আরেক অর্থ।

* ‘যা অপ্রমানিত অসত্য তা মেনে নেওয়ার নামই বিশ্বাস।’- এটা আমার বক্তব্য নয়, হুমায়ুন আজাদের।

* ‘believe আর faith এক জিনিস না।’- বলে কী বোঝাতে চেয়েছেন? আমিও তো সেই একই কথা বলেছি, তবে অবশ্যই সরাসরি নয়।

* ‘বিশ্বাস, আস্থা, believe, faith আরেকটু জানোন।’- আমি প্রতিনিয়ত জানতে এবং শিখতে আগ্রহী উল্লেখ্য বিষয়সমূহ আরো কী করে জানতে পারব সে বিষয়ে আপনার সদয় দিকনির্দেশনা কামনা করছি। Smile

পথিক রাজপুত্র

 
তায়্যিব এর ছবি
 

আমি ভাষার এতটা বুঝি না।তবে কোনো একটা লিখলেই সেটা সমালোচনা হয়না। আপনি হুমায়ূন আজাদের সমালোচনা করতে যেয়ে খেই হারিয়ে ফেলছেন।লিখছেন ঠিকই কিন্তু বুঝছেন ভুল। কোটেশন তুলে দিলাম আবার পড়েন -
//ক্যামব্রিজ ডিকশনারী, Believe এর অর্থ বলছে এরকম- to think that something is true or correct.
Faith এর অর্থ বলছে এরকম- a high degree of trust or confidence in something or someone.//

believe আর faith এক জিনিস না।

যা অপ্রমানিত অসত্য তা মেনে নেওয়ার নামই বিশ্বাস।।

অপর পক্ষে dark matter আপনাকে বিশ্বাস করতে বলে নাই। বিজ্ঞান আমাদের এমন জায়গায় নিয়ে গেছে যে আমরা বিজ্ঞানের উপর আস্থাশীল।
আপনার আমার বিশ্বাস অবিশ্বাস যাই হোক, dark matter এর কিছুু যায় আসে না।

বিশ্বাস, আস্থা, believe, faith আরেকটু জানোন।

তায়্যিব

 
পথচারী এর ছবি
 

সুধীন্দ্রনাথ এর কবিতার লাইন খানি জোরে জোরে পড়ুন তাইলে বুঝবেন।

 
পথিক রাজপুত্র এর ছবি
 

কোন লাইন জোরে পড়তে বলছেন দাদা?.....
আপনি কী শেষ তিন লাইন পড়েছেন? না-কি না পড়েই মন্তব্য করলেন?

পথিক রাজপুত্র

 

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

পথিক রাজপুত্র
পথিক রাজপুত্র এর ছবি
Offline
Last seen: 3 দিন 1 ঘন্টা ago
Joined: বৃহস্পতিবার, জুন 8, 2017 - 5:55অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

কু ঝিক ঝিক

ফেসবুকে ইস্টিশন

SSL Certificate
কপিরাইট © ইস্টিশন.কম ® ২০১৬ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর