নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 6 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • লিটমাইসোলজিক
  • সাইয়িদ রফিকুল হক
  • কাঠমোল্লা
  • রাজর্ষি ব্যনার্জী
  • জহিরুল ইসলাম
  • নুর নবী দুলাল

নতুন যাত্রী

  • আদি মানব
  • নগরবালক
  • মানিকুজ্জামান
  • একরামুল হক
  • আব্দুর রহমান ইমন
  • ইমরান হোসেন মনা
  • আবু উষা
  • জনৈক জুম্ম
  • ফরিদ আলম
  • নিহত নক্ষত্র

আপনি এখানে

রুহিতপুর গায়ের কবরস্থান ও চারটে শিশুর মুখ!


সরকারি একটা কাজে রাজশাহি শহরে ভিজিটে গিয়ে কর্ষিত জীবনঘামের ক্লেদময় স্বেদবিন্দুর কষ্ট দমাতে ঘুরতে গিয়েছিলাম পাশের একটা গ্রামে। ফেরার পথে গাড়ি না ধরে গাঁয়ের একটা কাঁচা সড়ক ধরে হাঁটছিলাম এক বিকেলে। পথে আকস্মিক একটা কবরস্থানের পাশে দাঁড়াতে হলো আমায়। নতুন দুটো কবরের পাশেই চারটে কিশোর ছেলেমেয়ে রান্না করছে মাটির চুলোয়। সাধারণত গ্রামের ছেলেমেয়েরা 'পিকনিক' করলেও, কবরের পাশে কখনো করেনা। তাই কিছুটা ঔৎসুক্য নিয়ে জানতে চাইলাম তাদের রান্নার কাহিনি। প্রথমে কিছুটা বিব্রত হলেও, আমার পীড়াপিড়িতে বলতে শুরু করলো ১৫/১৬ বছরের বড় ভাইটি। পাশে কষ্টসহিষ্ণু মুখে দাবদাহে পোড়া ফসলের খাঁ-খাঁ মাঠের মত দলিত চেহারা নিয়ে বসে রইলো ১২/১৩ বছরের বোনটি ও ৬/৭ বছরের অপর ছোট দুবোন।
:
এ গাঁয়ের নাম রুহিতপুর। এ গ্রামেই আমাদের বাড়ি। কিন্তু গ্রামের মেম্বার চেয়ারম্যান আর ফতোয়াবাজদের সিদ্ধান্তে ঘরে ছেড়ে এ কবরস্থানে থাকতে বাধ্য হচ্ছি আমরা চার ভাইবোন।
কেন মা বাবা নেই তোমাদের?
আঙুল দিয়ে দুটো কবর দেখিয়ে বললো ভাইটি। বাবা মারা গেছেন প্রায় ৪-মাস। আর মা এই গত মাসে।
কিন্তু তোমরা ঘর ছেড়ে এ কবরস্থানে কেন? রাতে ভয় করেনা তোমাদের কবরের কাছে থাকতে?
খুব করে! কখনো ৪-জনে ভয়ে জড়াজড়ি করে জেগে থাকি আমরা সারারাত!
কিন্তু তোমরা ঘরে যেতে পারছোনা কেন? মা বাবা মারা গেলেন কিভাবে মাত্র ৩/৪ মাসের মধ্যে?
ভাইটি আবার বলা শুরু করলো যূথভ্রষ্ট ব্যাঙাচির বিশৃংখলাময় একাকিত্বে মৃত্যুর মত চোখের জল মুছে!
:
বাবা চাকুরি করতেন দুবাইয়ে। কিন্তু ফিরে এলেন কঠিন রোগ নিয়ে। সব কাগজপত্র দেখে ডাক্তার বললেন, 'এইডস হয়েছে তার'। কদিন পরই মারা গেলেন বাবা। এইডসের কথা শুনে দুচারজন ছাড়া কেউই দাফন করতে এলোনা বাবাকে। গোসল করাতেও মানুষ পেলাম না আমরা। বাবা মরার পর মহাসড়কের পাশে একটা খাবারের দোকান খুললেন মা আমাদের সংসার চালাতে। আমরাও মাকে সাহায্য করতাম ঐ দোকানে। একদিন খুব ঘাম-জ্বরে অসুস্থ্য হয়ে পড়লো মা। ডাক্তার পরীক্ষা করে বললেন, মারও এইডস হয়েছে বাবার মত। কদিন পর মাও মারা গেলেন ঐ রোগে। শুনে আত্মীয়-স্বজন কেউই এলোনা তাকে দাফন করতে। অনেক কষ্টে আমরা চার ভাইবোন মিলে কবরে নামালাম মাকে। দাফনের পরদিন গ্রামের মাতবর, ইমাম, চেয়ারম্যান, মেম্বার মিলে মিটিং বসালেন স্কুলের মাঠে। সবাই মত দিলেন, ওদের মা-বাবা যেহেতু এইডস রোগে মারা গেছে, তাই এ ৪-জনের শরীরেও অবশ্যই ঐ রোগ আছে। তাই এ গ্রামে ওরা থাকলে অন্যরাও আক্রান্ত হবে এ রোগে। ইমাম সাব বললেন, "এইডা আল্লাহর গজব গুণাহের কারণে। ওগো মা বাবা কি নমাজ পড়তো নিয়মিত? তাই এ পাপকে রাখা যাবে না এ গ্রামে"। কিছু সুরা কেরাত আওড়ালেন তিনি। কলেজ পড়ুয়া শফিক ও নির্মলেন্দু বললো, "এইডস কোন ছোঁয়াচে রোগ না। মা-বাবার হয়েছে বলে ওদের হবে এমন কোন কথা নেই"। কিন্তু মেহেদি রঙা দাঁড়ির চেয়ারম্যান সাব বললেন, "চুপ কর নাস্তিকের দল। তোরা কি জানস? তোদের কথায় আল্লাহর গজব নামামু এই গ্রামে"?
:
পরদিন দয়া করে তারা এখানে থাকতে দিলেন আমাদের। এখন গ্রামে ঢুকতে পারিনা এ ৪ জনে। আমরা স্কুলে যেতে পারিনা বা কোন কাজেও নেয়না কেউ আমাদের। মাঝে-মাঝে গ্রাম থেকে কেউবা দয়া করে কিছু খাবার রেখে যায় দুরে আমাদের স্পর্শ এড়িয়ে। তাই খেয়ে কোন রকমে বেঁচে আছি আমরা। গ্রামের সবাই চায় আমরা যেন তাড়াতাড়ি মারা যাই। তাহলে আপদ যায় তাদের!
:
চারটি অনাথ শিশুর এমন করুণ কাহিনি শুনে অনেকক্ষণ ফসলশীল পোড়া মাঠের দিকে তাকিয়ে থাকি আমি ক্লেদাক্ত মনটা হালকা করতে। গাঁয়ের কিষাণের কর্ষিত চৈত্রের জমির শস্যদানার মত কষ্ট শুষ্কতা মুছে অদূরের দোকান থেকে কটা রুটি কিনে ওদের দিয়ে, ঢুকলাম গ্রামের ভেতরে একদম। গ্রামের মাতবর, চেয়ারম্যান, ইমাম সাহেবকে খুঁজে বের করে কথা বলতে চাইলাম তাদের সাথে। কিন্তু অপরিচিত এক শহুরে লোকের ঐ চার শিশুর পক্ষে 'ওকালতি'কে অগ্রাহ্য করলেন তারা উপহাস্যে। পরদিন দেখা করলাম 'ডিসি' সাহেবের সাথে। তিনি ব্যাপারটা দেখবেন বলে আশ্বাস দিলেও, ৩/৪ দিনেও ওনার কোন তৎপরতা চোখে পড়লো না আমার। ঢাকা ফিরে পরিচিত কটা টিভি চ্যানেলে 'ই-মেল' করলাম ঘটনাটা জানিয়ে। ৪/৫-টা চ্যানেল যোগাযোগ করলো আমার সাথে তড়িৎ। লোকেশান নিয়ে সরাসরি ওরা চলে গেলো রাজশাহির প্রত্যন্ত রুহিতপুর গ্রামে। পাকা সড়কের পাশে স্যাটেলাইট ভ্যান রেখে ৫-টা চ্যানেল সরাসরি প্রচার করলো ঐ ৪- ভাইবোনের কবরময় একাকি জীবনের নিঃসঙ্গ বিষাদের ইতিকথা।
:
এবার টনক নড়লো কেন্দ্রের। নড়েচড়ে উঠলো জেলা প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা। সবাই একসাথে উপস্থিত হলো রুহিতপুর কবরস্থানে। টেস্ট করানো হলো ৪ ভাইবোনকে। কিন্তু তাদের রক্তে HIV'র কোন আলামতই খুঁজে পেলোনা কেউ। পুরো গ্রাম ভরে গেলো RAB-পুলিশে। যে স্কুলের মাঠে মিটিং করে ওদের তাড়ানো হয়েছিল গ্রাম থেকে, সে স্কুলেই এবার বসলো প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের বিশাল সভা। প্রশাসন কড়া কথা শোনালেন মাতবর,ইমাম আর শালিসদারদের। ভুল স্বীকার করলো সবাই। ক্ষমা চাইলো তাদের কৃতকর্মের জন্যে প্রকাশ্যে। সার্বিক সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিলো প্রত্যেকে। সরকারের পক্ষে জেলা প্রশাসন ঘোষণা করলো ঐ ৪-ভাইবোনের বিনে পয়সায় লেখাপড়া, সরকারি খাস জমি বন্টণ ও এককালীন নগদ অনুদানের। ৪-জনকে ৪টা 'ভিজিএফ' কার্ডও প্রদান করা হলো সমাজকল্যাণ দফতর থেকে। ঢাকা বসে সব খবর দেখলাম টিভিতে সরাসরি।
:
কিন্তু বোহেমিয়ান এই আমি ক্ষীয়মান আকাশে ধ্রুব নক্ষত্রের নীলভো আলোতে প্রায়ই দেখি ঐ চারটি গ্রামীণ অবুঝ মুখ। যারা একটা কবরস্থানে মৃত্তিকার গভীরে প্রথিত মায়ের শবাধারের মত কষ্টকে আঁকড়ে বেঁচে থাকে এ বিশ্বে! এসব দুখাতুর মানুষের মুখ চিন্তনে চলার পথের অমিত প্রগলভতায় ভিজে যায় পুরো আনন্দ পথ আমার। পথকাঁটার নির্বাসনের সুখ আকাশে ভেসে-ভেসে আমি কতদিন খুঁজে ফিরেছি ঐ চারটে মুখ! এবং সত্যিই একদিন চিন্তনের ঋজুতার মাঝে এক সংহত প্রজ্ঞাময়তার গল্পমালা তৈরি করতে করতে, নিজের অজান্তে এক ছুটির দিনে ঘুম ভেঙে দেখি, রুহিতপুরের সেই করবস্থানে আমি। নিটোল প্রেমের সপ্তপদি দুখদের বহ্নিমান মৃত্যুর মত দুটো ভাঙা কবরের পাশে ঐ চারটে শিশু। মাঘের শীতময় শুষ্ক নদীর দাক্ষিণ্যের পৌঢ়ত্বে ভরা আনন্দ বাতাসে ওরা দৌঁড়ে আশে আমার পাশে। এবং চরজাগা পলিবাহিত প্রবহমানতার মাঝে ধুঁ-ধুঁ ফসলের মাঠে দৃঢ়তায় দাঁড়িয়ে আমি ওতের হাত ধরে!

[ভারতীয় একটি সত্যি ঘটনার ছায়া অবলম্বনে গল্পটি রচিত]

বিভাগ: 

Comments

ড. লজিক্যাল বাঙালি এর ছবি
 

!

===============================================================
জানার ইচ্ছে নিজেকে, সমাজ, দেশ, পৃথিবি, মহাবিশ্ব, ধর্ম আর মানুষকে! এর জন্য অনন্তর চেষ্টা!!

 
সাইয়িদ রফিকুল হক এর ছবি
 

ভালো লাগলো।

আমি মানুষ। আমি বাঙালি। আমি সত্যপথের সৈনিক। আমি মানুষ আর মানবতার সৈনিক। আর আমি ত্বরীকতপন্থী-মুসলমান। আমি মানুষকে ভালোবাসি। আর আমি বাংলাদেশ-রাষ্ট্রকে ভালোবাসি। জয়-বাংলা। জয়-বাংলা। জয়-বাংলা।...
সাইয়িদ রফিকুল হক

 
ড. লজিক্যাল বাঙালি এর ছবি
 

ধন্যবাদ

===============================================================
জানার ইচ্ছে নিজেকে, সমাজ, দেশ, পৃথিবি, মহাবিশ্ব, ধর্ম আর মানুষকে! এর জন্য অনন্তর চেষ্টা!!

 

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

ড. লজিক্যাল বাঙালি
ড. লজিক্যাল বাঙালি এর ছবি
Offline
Last seen: 3 ঘন্টা 52 min ago
Joined: সোমবার, ডিসেম্বর 30, 2013 - 1:53অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

কু ঝিক ঝিক

ফেসবুকে ইস্টিশন

SSL Certificate
কপিরাইট © ইস্টিশন.কম ® ২০১৬ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর