নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 4 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • সাইয়িদ রফিকুল হক
  • শ্মশান বাসী
  • আহমেদ শামীম
  • গোলাপ মাহমুদ

নতুন যাত্রী

  • নীল মুহাম্মদ জা...
  • ইতাম পরদেশী
  • মুহম্মদ ইকরামুল হক
  • রাজন আলী
  • প্রশান্ত ভৌমিক
  • শঙ্খচূড় ইমাম
  • ডার্ক টু লাইট
  • সৌম্যজিৎ দত্ত
  • হিমু মিয়া
  • এস এম শাওন

আপনি এখানে

কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্রকে নিয়ে লিখেছেন জীবনানন্দ দাস 



কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে কবি জীবনানন্দ দাস লিখে গিয়েছিলেন তার পর্যালোচনা। হুবহু কবির লেখাটি পাঠকদের জন্য তুলে দিচ্ছি।

..................................................................

ইংরেজী সাহিত্য পড়তে পড়তে আমার অনেক সময় মনে হয়েছে যে ইংরেজী উপন্যাস সাহিত্যে ডিকেন্স-এর যদি কোনদিন আবির্ভাব না হত তাহলে কেমন হত; কিংবা ফরাসি কথাশিল্পে কোনদিন ব্যালজাক্‌-এর প্রতিভা যদি উপনীত না হত তাহলে ফরাসি উপন্যাসের অবস্থা কিরকম দাঁড়াত! জীবনের অন্য অন্য বিভাগের মত সাহিত্যে এমন এক এক জন মনীষী এমন এক এক সময়ে উপস্থিত হন যে মনে হয় যেন সময়পুরুষ নিজেই তাঁদের প্রেরণ করেন মানুষের জীবনের গভীর প্রয়োজনের জন্য।

আজ যখন ভেবে দেখি, উপলব্ধি করতে পারি যে ডিকেন্সকে ছেড়ে দিলে ইংরেজি গল্প সাহিত্য কতখানি খর্ব ও অসম্পূর্ণ -কিংবা ব্যালজাক্‌কে বাদ দিলে ফরাসি উপন্যাস গল্পের ধারা কিরকম গভীরভাবে ব্যাহত হয়। একথা আমাদের স্বীকার করতেই হবে যে ইংরেজি বা ফরাসি বা জার্মান সাহিত্যের চেয়ে বাংলা সাহিত্যের ঐশ্বর্য কম- হয়তো ঢের কম; কাজেই এ সাহিত্যে শরৎ চট্টোপাধ্যায়ের আবির্ভাব ও তাঁর দান যে কি প্রগাঢ় ও বিস্ময়কর, বাংলাদেশে শরৎবাবু যদি কোনদিন জন্মগ্রহণ না করতেন, তাহলে আমাদের দেশের কথাসাহিত্যের ধারা যে কি রকম অঙ্গহীন হয়ে থাকত তা বুঝতে পারা যায়।

আমার মনে আছে তখন আমরা স্কুলের ছাত্র কিন্তু সাহিত্যের অনুরাগী ছিলাম। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য তো নিশ্চয়ই- তা ছাড়া, বাংলা মাসিক পত্র ইত্যাদিতে অন্য যে সমস্ত লেখক আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন, তাঁদের রচনা আমি খুব উপযুক্ত শ্রদ্ধা ও আগ্রহের সঙ্গে পাঠ করতাম। কবি সত্যেন্দ্রনাথ একজন ছন্দকুশলী বলে মনে হল,- তাঁর কবি-প্রতিভার উপর আগের মত ততটা শ্রদ্ধা আমার রইল না।

তিন চারজন কথাসাহিত্যিক এই সময়ে আমাকে আকৃষ্ট করেছিলেন- এবং তাঁদের সাহিত্যিল ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে আমি খুব আশান্বিত ছিলাম; আমার মনে হত রবীন্দ্রোত্তর উপন্যাস এঁরাই গড়ে তুলবেন; এঁদের নাম আপনারা সকলেই জানেন- প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, চারু বন্দোপাধ্যায়,  মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায় ও সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায়। এঁরা সকলেই ‘প্রবাসী’ ও ‘ভারতী’ পত্রিকায় লিখতেন। আমার মনে কোন সন্দেহই ছিল না যে রবীন্দ্রনাথের পরে বাংলা কথাসাহিত্যের ভবিষ্যৎ এঁদের হাতে-অন্তত চারু মুখোপাধ্যায়ের হাতে তো নিশচয়ই। তখন আমি বালক মাত্র। মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায় ও চারু বন্দোপাধ্যায় মোপাসাঁ ও আন্তন শেখভের গল্পের যে সমস্ত অনুবাদ মাসের পর মাস পরিবেশন করতেন, সে সবের লিপিচাতুর্যে ও রচনারীতির নতুন ভঙ্গিতে আমি এতদূর বিমুগ্ধ হয়েছিলাম যে আমার মনে হত যে এঁরাই বাংলাদেশের মোপাসাঁ ও শেখভ-হয়তো টুর্গেনিভ, এবং ভবিষ্যতে এঁরাই টলস্টয় কিংবা ব্যালজাকের মতন হয়ে দাঁড়াবেন।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা তখন হয়তো-কিংবা তার কিছু পরে-অল্পস্বল্পভাবে কোনও অখ্যাতনামা পত্রিকায় বেরুত। সে পত্রিকা আমরা পেতাম না, কাজেই শরৎবাবুর গল্পের সঙ্গে কোনো পরিচয় তখনো হয়নি। কিন্তু কয়েক বছর পরে পরিচয় হল, অবিশ্রাম গল্প উপন্যাস বার হতে লাগল-সমস্ত বাংলাদেশ এই অসাধারণ শিল্পীর মনীষায় স্তম্ভিত হয়ে গেল-আমার আগেকার ঔপন্যাসিক রথীরা যেন সম্ভ্রমে সরে দাঁড়ালেন; বুঝতে পারলাম যিনি এসেছেন তিনি অদ্বিতীয়, তিনি বিদেশী গল্পের অনুব্দের ধার ধারেন না, বিদেশী সাহিত্যের প্রভা পর্যন্ত তাঁর উপন্যাসের উপর নেই বললেই চলে, উপলব্ধি করতে পারলাম শরৎচন্দ্র বাংলার মৃত্তিকার সন্তান।

অল্প কয়েক বৎসরের ভিতরেই তিনি আমাদের দেশের সবচেয়ে বিরূপ ও উন্নাসিক পাঠক ও সমালোচকমন্ডলীকে বুঝতে দিলেন যে বাংলাদেশ যেন কতদিন ধরে অপেক্ষা করছিল এই সমস্ত গল্প ও উপন্যাসের জন্য-এবং আজ অবশেষে লাভ করেছে।

বঙ্কিমচন্দ্রের পর রবীন্দ্রনাথ- রবীন্দ্রনাথের পর শরৎচন্দ্র; বাংলা কথা-সাহিত্যে এই তিনটি বড় বড় স্তম্ভ, আর সব স্তম্ভ ছোট হয়ে গেছে কেউ বা ধোঁয়ায় মিলিয়ে গেছে।

শরৎবাবুর সাহিত্যের আলোচনা আজ আমি করব না; আমার মনে হয় সে আলোচনার দিন আজ নয়। তাঁর আকস্মিক মৃত্যুর কুয়াশা এখনো বাংলাদেশকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। তবুও শরৎ চট্টোপাধ্যায়ের সম্বন্ধে মোটামুটি যে দু-চারটে কথা তাঁর মৃত্যুর পর আজ আমার মনে হচ্ছে খুব সংক্ষেপে তা বলে আজকের প্রবন্ধ আমি শেষ করব।

বঙ্কিমচন্দ্রের সঙ্গে শরৎ  চট্টোপাধ্যায়ের কোনো তুলনা আজ আমি করতে চাই না। এটুকু বলতে চাই শুধু যে আজকালকার দিনে একদল পাঠক ও সমালোচক বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস অসাহিত্যিকভাবে আলোচনা করে সে সবের জন্য গভীর সামাজিক, জাতীয় ও আধ্যাত্মিক মর্যাদার দাবি করছেন; বঙ্কিমচন্দ্রকে তাঁরা ঔপন্যাসিকের চেয়ে বড় ঋষি বলেন। তা যদি হন, তাহলে সমস্ত বড় শিল্পীরাই ঋষি। কিন্তু সম্প্রতি নেমে যদি পর্যালোচনা করি, তাহলে ধারণা করতে পারব যে শরৎচন্দ্র বাংলা উপন্যাসে এমন একটা নতুন আলোক নিয়ে এসেছেন যা আমরা বঙ্কিমচন্দ্রেও পাই না, রবীন্দ্রনাথেও পাই না।

বাঙ্গালী নরনারী-শুধু অভিজাত শ্রেণীর মানব মানবীই নয়, শুধু মধ্যবিত্ত বা বুর্জোয়া শ্রেণীর নরনারীই নয়-বাংলার নিতান্ত হেয় অবজ্ঞেয় নরনারী নিজেদের যে মূর্তি কোনদিন দেখতে পায়নি, কিংবা দেখলেও পরিষ্কাররূপে ধারণা করতে পারেনি, শরৎচন্দ্রের কবিদৃষ্টি ও অসীম মমতাবোধের ভিতর তারা যেন নতূন জন্ম পেয়ে আমাদের সম্মুখে এসে দাঁড়িয়েছে- আমাদের হৃদয়ে আঘাত করেছে এসে। শরৎচন্দ্রের উপন্যাস আলোচনা করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ যে ঘনিষ্ঠতার কথা বলছেন আমার মনে হয় এই প্রগাঢ় ঘনিষ্ঠতা আমরা বঙ্কিম বা রবীন্দ্রনাথের গল্প-উপন্যাসে এমন নিবিড়ভাবে পাই না। শরৎ-সাহিত্যে প্রেমের কথাই ধরুন। পন্ডিতেরা বলেন, অঙ্কস্য বামা গতি; শরৎচন্দ্রের উপন্যাসের ভিতরে দেখি প্রেমেরও কেমন এক বাম গতি যেন; কিন্তু বস্তুত গতি বাম নয়-গতি ঠিকই চলেছে-ঝর্ণা যেমন সূর্যের আলোর ভিতর জলস্ফুলিঙ্গের আবেগ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে- তারপর নদীর আকার ধারণ করে- তারপর এঁকে বেঁকে সুড়ঙ্গের ভিতর দিয়ে বালুর বিশুষ্কতার মধ্যে লুকিয়ে, অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে তবুও সমুদ্রের দিকেই যায়-এবং সমুদ্রকে পায়,- শরৎচন্দ্রের গল্পের ভিতর মানবী প্রেম যেন তেমনি করে প্রেমাস্পদকে চেয়েছে- এবং সাংসারিক উপায়ে না পেলেও চিত্তের চমৎকারিত্বের ভিতর যেন তাকে পেয়েছে-এবং এই প্রেমের থেকে এক গভীরতর প্রেমের জন্ম হয়েছে- যা শরৎ চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাসের একটা মস্ত বড় কথা।

এই সমস্ত উপন্যাসের আর একটা বড় জিনিস হচ্ছে এই যে, শরৎবাবু প্রতিষ্ঠিত সমাজের জরাজীর্ণ মাপকাঠি দিয়ে মানষকে পরিমাপ করেননি, করেছেন বিবেক দিয়ে, মমতাসিক্ত বিচক্ষণতা দিয়ে; কাজেই তিনি দেখাতে পেরেছেন যে যাদের আমরা অবজ্ঞেয় বলে ঘৃণা করি, তারা অনেকেই মহৎ এবং যারা সমাজে প্রচুর সম্মান পাচ্ছে, তারা কতদূর আত্মসম্মানহীন।

শরৎচন্দ্রের রচনায় আর একটা প্রধান লক্ষ্যের জিনিস হচ্ছে তাঁর গভীর হাস্যরসের স্বকীয়তা। ফরাসি মনীষী আনাতোল ফ্রান্স এক জায়গায় বলেছেন যে ঊনবিংশ শতকের ফরাসি ঔপন্যাসিকদের অন্তরাত্মার ভিতর আনন্দ জিনিসটা যেন শুকিয়ে গেছে; তাদের ক্রু কারু রচনায় মধুরতা আছে বটে, ক্ষমতা রয়েছে, প্রচন্ডতা আছে, কিন্তু সূক্ষ্ম ও মমতাময় হাস্যরস নেই; যেন ফরাসি বিপ্লবের সময় গিলোটিনে যেসব ধ্নগস হয়ে গেছে। আনাতোল ফ্রান্সের নিজের উপন্যাসে এ জিনিস রয়েছে। বাঙ্গালী কথাসাহিত্যিকেরা এ বিষয়ে গত যুগের ফরাসি গাল্পিকদের চেয়ে বেশি সৌভাগ্যবান; তাঁদের তুলনায় রবীন্দ্রনাথ ও প্রভাত মুখোপাধ্যায়ের গল্পে ঢের বেশি হাস্যরসের আন্তরিকতা পাই। শরৎ চট্টোপাধ্যায়ের সাহিত্যের ভিতর বেদনা রয়েছে, অন্ধকার রয়েছে, কিন্তু তবুও সে সাহিত্য যে হাসতে ভুলে গেছে এ কথা কোনো পাঠকেরই মনে হবে না; শরৎবাবুর যে কোনো উপন্যাসের ভিতরেই দেখা যাবে প্রথমেই না হোক, অন্তত খানিকটা অগ্রসর হলে, গ্রন্থকার পাঠককে হাসাচ্ছেন-কখনও কখনও এত সূক্ষ্মভাবে হাস্যের দেবতাকে বেদনার ঈশ্বরের সঙ্গে গভীর প্রতিভার যোগে এমন অন্তরঙ্গ করে যে, বিশিষ্ট সাহিত্যরসিক পাঠকের কাছে তা বাংলা সাহিত্যের অনন্যসাধারণ জিনিস বলে মনে হয়। মোপাসাঁ ও অন্য অনেক ফরাসি সাহিত্যিক এবং অনেক রুশ সাহিত্যিকও মানুষেরর ব্যঙ্গ সিদ্ধ নিদারুণ মুখের ছবি এঁকেছেন। সে সব গল্প পড়তে পড়তে মনে হয়, গ্রন্থকারেরা যেন ঘৃণা ও প্রেমকে বাদ দিয়ে, ক্রোধ ও মমতাকে বর্জন করে ছবি এঁকে চলেছেন-দরিদ্র চাষা, মাতাল, নাবিক, পতিতা নারী, শ্রমক্লান্ত কেরাণী জীবনের। মনে হয়, গ্রন্থকার যেন একজন নৈর্ব্যক্তিক পুরুষ; মানবচরিত্রের উপর না আছে তাঁর শ্রদ্ধা, না আছে তাঁর ঘৃণা-সমস্তই যেন যান্ত্রিক সৃষ্টি। এরকম নৈর্ব্যক্তিকভাবে মানুষের চরিত্র আঁকবার নিরেট নিষ্পলক প্রতিভা (অনেক আধুনিক সমালোচক যে জিনিসের খুব প্রশংসা করেন) শরৎচন্দ্রের ছিল না। তাঁর চরিত্র সৃষ্টি, তাঁর হাস্যরসও নিজের ব্যক্তিত্বের দরদে অভিষিক্ত।

শরৎচন্দ্রের উপন্যাসের ভিতর ঐতিহাসিক চরিত্র নেই- ঐতিহাসিক উপন্যাস লেখেননি তিনি। যাঁর ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখেছেন তাঁদের দৃষ্টি-ভঙ্গির উপর আমার উপযুক্ত শ্রদ্ধা রয়েছে; কিন্তু তবুও ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয় যে, যে-সমস্ত লেখন পৃথিবীর আবহমান মানবজীবনের রসে অনুপ্রাণিত, তাঁরা তাঁদের উপন্যাসে এমন সমস্ত চরিত্র নিয়ে কাজ করেন যারা ইতিহাসে অবজ্ঞাত, যারা কেউ নয় তবু তারাই প্রধান-এজন্যই ব্যালজাকের ‘কমেডি হিউমেন’-এ তিন চার বার মাত্র নেপোলিয়নের নামের উল্লেখ রয়েছে। নেপোলিয়ন বা মুসোলিনিকে নিয়ে ইতিহাস চলতে পারে, কিন্তু তুচ্ছ অবহেলিত এবং ইতিহাসের অজ্ঞাত মানব-মানবীর মুখে ভাষা দেওয়াই হচ্ছে কবি ও ঔপন্যাসিকের একটি শ্রেষ্ঠ কাজ। শরৎচন্দ্র তাঁর নিজের বিশেষ ক্ষেত্রটির ভিতর-এবং সে ক্ষেত্রটি নিতান্ত সংকীর্ণ নয়- এ কাজ যেমন প্রতিভা ও মমতার সঙ্গে সম্পন্ন করেছেন বাংলাদেশে অন্য কোনো লেখক তা প্রেননি।

কেই কেই বলেন, শরৎচন্দ্র ঘোরতর বস্তুতান্ত্রিক, শরৎ চট্টোপাধ্যায়ের কোনো কোনো উপন্যাসের কোনো কোনো জায়গায় তথাকথিত বস্তুতান্ত্রিকতা থাকলেও মোটের উপর তিনি বস্তিতান্ত্রিক গাল্পিক একেবারেই নন; জোরাল মতন তো ননই, বস্তুতন্ত্র বলতে সমালোচকেরা যা বোঝেন শরৎ চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাসের ভিতর সে সবের কোনো সমর্থন নেই। তাঁর রচনার ভিতর বরং কোথাও স্পষ্টভাবে, কোথাও প্রচ্ছন্নভাবে বরাবর আদর্শবাদ রয়ে গেছে। এবং এই আদর্শবাদের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে প্রেমের উপর।

বিখ্যাত ফরাসি মহিলা-ঔপন্যাসিক জর্জ স্যান্ড এক জায়গায় লিখেছেনঃ ‘আমার হাত তুলে মুখের কাছে নিতেই আমি এক দূর অরণ্যের লতার অপরূপ গন্ধ পেলাম-লতা আমি কয়েক ঘন্টা আগে স্পর্শ করেছিলাম। সেই ছোট পুষ্পিত লতাটি অনেক মাইল দূরে এক উঁচু পাহাড়ের কিনারায় রয়েছে, আমি তার ফুল ছিঁড়িনি, পাতা ছিঁড়িনি, শুধু সেই লতাটিকে ছুঁইয়ে তার ঘ্রাণরূপকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলাম। কি বিচিত্র;-মেদমাংসহীন সুঘ্রাণ কি ঐশ্বর্যময় জিনিস;- যে লতার ভিতর এর জন্ম তার একটুও ক্ষতি করে না করে, সে মানুষের সঙ্গে চলে এসেছে এবং তাকে ক্ষণে ক্ষণে মনে করিয়ে দিচ্ছে সেই সুদূর পর্বতের লতাটির কথা।’

বলছেন, ’স্মৃতিই হচ্ছে মানুষের আত্মার সুঘ্রাণ।’ জর্জ স্যান্ড-এর উপন্যাস আদর্শবাদের উপন্যাস, শরৎ  চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস পড়তে পড়তে মনে হয়, দুঃখ এবং দুঃখের ভিতর থেকে যে সহিষ্ণুতা ও প্রেম উত্থিত হয় এরাই হচ্ছে মানবাত্মার সুঘ্রাণ। শরৎচন্দ্রের ‘বিন্দুর ছেলে’ পড়ুন, ‘রামের সুমতি’ পড়ুন, ‘পল্লীসমাজ’ পড়ুন, ‘শ্রীকান্ত’, ‘পথের দাবি’, ‘শেষ প্রশ্ন’ পড়ুন, সে সবের ভিতর যে নিহিত সুর তা কি আদর্শবাদের সুর নয়? জোলা, জেমস জয়েস, ডি. এইচ. লরেন্স ইত্যাদি বাস্তববাদী ঔপন্যাসিকদের সুর সম্পূর্ণ অন্য রকম।

শরৎচন্দ্রকে বিদ্রোহী বলা হয়েছে। সে কথা সত্য। প্রত্যেক প্রকৃত সশিল্পীই বিদ্রোহী; বিদ্রোহ শুধু সাহিত্যের পুরোনো রচনারীতির সঙ্গে নয়, সমাজের ও জাতির অন্ধকার ও কলঙ্কের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। অনেক শিল্পী আছে- তাঁরা উঁচুদরের শিল্পী নন, যাঁরা বিদ্রোহের জন্যই বিদ্রোহ করেন শুধু। শরৎ চট্টোপাধ্যায় সে জাতের শিল্পী ছিলেন না। তিনি অনেক ভাঙ্গতে চেয়েছেন। যতদূর মনে হয়, তিনি মমতাসিক্ত বিচক্ষণতা, নিষ্ফল বিবেক এবং প্রেমকে করতে চেয়েছিলেন এই আদর্শের পথে পৌঁছিয়ে দেবার সেতু।

কিন্তু তবুও সামাজিক ও দার্শনিকভাবে শরৎচন্দ্রের উপন্যাস যদি আলোচনা করতে যাই তাহলে সে সবের ভিতর গভীর ও ব্যাপকভাবে কোনো সমাজ ও জাতি-সংগঠনী শক্তির বৈচিত্র্য ও প্রাচুর্য দেখতে পাই না-ওয়েলস্‌-এর কোনো কোনো গ্রন্থে আমরা যা পাই। কিন্তু আমার মনে হয় ওয়েলস্‌-এর সে সব গ্রন্থ চমৎকার প্রপ্যাগ্যান্ডা হয়েছে-শিল্প হতে পারেনি। শ্রদ্ধেয় সাহিত্যিক প্রমথ চৌধুরী একবার বলেছিলেন: শরৎবাবুর উপন্যাসের ভিতর ফিলজফি কোথায়? এ প্রশ্নের সরাসরি কোনও উত্তর না দিয়ে বলতে পারা যায়, প্রগাঢ় দার্শনিকতা নেই বলে শরৎচন্দ্রের শিল্পপ্রতিভার কোনো অমর্যাদা হয়েছে বলে আমার মনে হয় না। দার্শনিক অধ্যাপক ব্রজেন্দ্রনাথ শীল একটি কাব্য রচনা করলেন, তার নাম ‘দি ইন্টারন্যাল কোয়েস্ট’। কিন্তু তার ভিতর কাব্য ও দর্শনের অর্ধনারীশ্বর-রূপ আমি অন্তত অনুভব করতে পারলাম না। শুধু গভীর দার্শনিকতা থাকলে তো চলবে না, সে জিনিসকে সুন্দরের সঙ্গে, শিল্পএর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী করে নিতে হবে সাহিত্যিককে। গ্যেটের মতন কজন সাহিত্যিক তা পেরেছে? পারলে ভালো। তা না হলে, জটিক দার্শনিকতার অভাব শিল্পের পক্ষে এমন কিছু ক্ষতির জিনিস নয়। রবীন্দ্রনাথ যাকে বলেছেন ঘনিষ্ঠতার গভীরতা, শরৎচন্দ্রের গল্প উপন্যাসের ভিতর সেই হচ্ছে সবচেয়ে বড় জিনিস এবং গত কুড়ি পঁচিশ বছর ধরে বাঙ্গালী নরনারী বুঝেছে যে তা কত বড় জিনিস এবং তার স্রষ্টা বাঙ্গালীর কত গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার পাত্র।

বিভাগ: 

Comments

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

ফাহিমা কানিজ লাভা
ফাহিমা কানিজ লাভা এর ছবি
Offline
Last seen: 2 দিন 7 ঘন্টা ago
Joined: বৃহস্পতিবার, জানুয়ারী 16, 2014 - 2:55অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

ফেসবুকে ইস্টিশন

কপিরাইট © ইস্টিশন ব্লগ ® ২০১৮ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর