নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 4 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • মৃত কালপুরুষ
  • দ্বিতীয়নাম
  • রাজর্ষি ব্যনার্জী
  • অনিমেষ অধিকারী

নতুন যাত্রী

  • এম এম এইচ ভূঁইয়া
  • খাঁচা বন্দি পাখি
  • প্রসেনজিৎ কোনার
  • পৃথিবীর নাগরিক
  • এস এম এইচ রহমান
  • শুভম সরকার
  • আব্রাহাম তামিম
  • মোঃ মনজুরুল ইসলাম
  • এলিজা আকবর
  • বাপ্পার কাব্য

আপনি এখানে

বরফের অশ্রু আগুনের অশ্রু !


ঢাকা থেকে বর্ধমানের কালনা যাচ্ছি "সাবিত্রী ধোপী"কে খুঁজতে ট্রেনে চেপে। সাবিত্রী ধোপী হচ্ছেন কামিনী শীলের স্ত্রী, যারা ১৯৭১-র পূর্ব পর্যন্ত বাংলাদেশে আমাদের প্রতিবেশি ছিলেন। বিশেষ কারণে এ পরিবারটির সাথে দেখা করবো বলে এসেছি প্লান করে আমি। নানা উপায়ে খবর সংগ্রহ করেছি যে, সাবিত্রী ধোপী অম্বিকা-কালনার "ধাত্রীগ্রাম" গাঁয়ে থাকে অনেকদিন থেকে। সাবিত্রীর মেয়ে বাংলা টিচার এখন কালনার হিন্দু বালিকা বিদ্যালয়ের। ট্রেন থেকে নেমেই সাবিত্রীর কন্যা শিক্ষক "নিলাঞ্জনা শীলে"র সহায়তা নিয়ে প্রথমে "টোটো" পরবর্তীতে গ্রামীণ ভ্যানে এবং শেষে হেঁটে পৌঁছলাম "ধাত্রীগ্রাম" গাঁয়ে। পথচারীর সহায়তা নিয়ে অবশেষে খুঁজে বের করলাম "সাবিত্রী-কামিনী" পরিবারের বাড়ি "ধাত্রীগ্রামে"র কাঁচা সড়কের ধারে!
:
বয়সের ভারে ন্যুজতা ম্লান করেনি "সাবিত্রী-কামিনী" পরিবারকে। পৌঢ়ত্ব ছুঁলেও, এখনো তারা রক্ষাবন্ধনী ও বিন্দি তৈরি করে ধাত্রীগ্রামের নিজেদের ছোট কুটীরে। তাই দুজনকেই ঘরে পেলাম একসাথে। আমার মুসলিম নাম, মা-বাবা আর বাংলাদেশের দ্বীপগাঁয়ের পরিচয় শুনে বিস্ময়ে আকাশ থেকে পড়লো যেন। দুজনেই জড়িয়ে ধরলো আমায় পূর্ববঙ্গীয় প্রাক্তন মাতৃভূমির লোকজ ঘ্রাণতায়। বললো, "এ গাঁয়ে এতো দুরে এভাবে কি মনে করে বাবা"? বললাম, "মায়ের নির্দেশ। তাই বিদ্যাসাগর যেমন 'দামোদর' সাঁতরেছিল মায়ের জন্যে, আমিও আমার মৃত মায়ের নির্দেশে হুগলি নদী পার হয়ে এলাম এ "ধাত্রীগ্রামে"। জলপান করতে দিলো আমায়। চাপকলের শীতল জল শেষ করে বললাম, "তোমরা কি একাত্তরে এদেশে চলে আসার সময় কিছু জিনিস রেখে এসেছিলে আমার মায়ের কাছে"? স্বামী কামিনি শীল মনে করতো পারলো না তেমন কিছু কিন্তু একটু চিন্তা করে সত্তরোর্থ সাবিত্রী বললো, "হা বাবা, তোমার মায়ের কাছে ১০-মন ধান, আমার ঘরের কাসা-তামার কিছু জিনিসপত্র রেখে এসেছিলাম যুদ্ধের সময়"। বললাম, "আমার মা মৃত্যুর আগে বেশ কবার আমায় বলেছিল, আমি যেন খুঁজে তোমাদের ১০-মন ধানের দাম, কাসার চারটে থালা, দুটো বাটি, ১২-টা বিভিন্ন সাইজের পাতিল, দুটো পিতলের কলসের মূল্য পরিশোধ করি"।
:
একাত্তরে যুদ্ধের সময় তরুণ বয়সে এ দম্পতি পালিয়ে এসেছিল ভারতে জীবন বাঁচাতে । কথা ছিল আবার ফিরে যাবে তারা নিজ ভূমে। তাই গচ্ছিত রেখে এসেছিল ঐসব জিনিসপত্র আমার মায়ের কাছে কিন্ত আর ফেরা হয়নি তাদের পুরণো মাতৃভূমিতে। না ফেরার কারণে তাদের বাড়ি আর ধানী জমি পরবর্তীতে সরকার "অর্পিত সম্পত্তি" হিসেবে খাস করে নেয়। কিন্তু মানবিক আমার মায়ের একটা গ্লানি ছিল, এ হিন্দু পরিবারটির রেখে যাওয়া জিনিসপত্রের দামে যেন দিয়ে দেই আমি যে কোন ভাবে তাদের। যদিও যুদ্ধের সময় ঐ ধান পুড়ে গিয়েছিল, তবে জিনিসপত্রগুলো পোড়া ঘরে ছিল শেষ পর্যন্ত।
:
আমার মানবিক মাকে চিনতো তারা। প্রায় ৪৫-বছর পর মায়ের সন্তানের এ বিশুদ্ধতার প্রেমজ জ্যোৎস্নার শুদ্ধতম আলো দেখে সত্যি কাঁদলো দুজনে ওরা। তেপান্তরের বুনো মাঠের ঘাসময় ভালবাসার কুঁড়েঘরে বসে ওরা বললো, "এতো বছর পর তুমি এসেছো ঐ ধান দিতে আমাদের"? মৃত মায়ের জন্যে গর্বিত ভালবাসার আগুনে রঙের চিরুণিতে চুল আঁচড়িয়ে বলি, "হ্যা আমি তো সেই মায়ের সন্তান, যিনি একাত্তরে আগলে রেখেছিল তোমাদের ন'টি কন্যাকে নিজ সন্তানের মতই"! এ ঘটনাও জানতো তারা, তাই মননের কন্ঠমূলে জমে থাকা গহণ ব্যথার সুরে বললো, "বাবা তোমাদের পরিবার এতো মানবিক কিন্তু বাংলাদেশ অনেকেই ছেড়েছে নানাভাবে অত্যাচারিত হয়ে! কোন সম্পদও আনতে পারেনি তারা এদেশে"। বললাম, "পৃথিবীটা জটিল। স্বার্থের সপ্তরঙা দ্বন্দ্বে পৃথিবীটা ঘুরছে। এটা এদেেশেও আছে, বাংলাদেশেও। এক জাতি কিনা? হয়তো ধর্মীয় দ্বান্দ্বিকতার জট কিছুটা কমবেশি হয়েছে এপার-ওপার"।
:
রক্ষাবন্ধনী আর বিন্দি তৈরি করে চলা এ দরিদ্র পরিজায়ী পরিবারটিকে যখন আজকের ভারতীয় বাজার দরে ১০-মন ধানের দাম, আর তাদের ফেলে আসা বিভিন্ন তৈজসপত্রের মূল্য হিসেবে ১০-হাজার টাকা দিলাম, সত্যিই পুরণো গাঁয়ের ফেলে আসা স্মৃতির মাঝে আমার মায়ের জন্যে দু:খাতুরভাবে কাঁদলো তারা দুজনেই। এবং মায়ের নির্দেশে বিদ্যাসাগররূপী আমি এ ধাত্রীগ্রামের 'স্বাপ্নিক দামোদর' সত্যি পাড়ি দিয়ে যখন ফিরছি আমার মায়ের দেশে, তখন দুই বুড়োবুড়ি আমার সাথে সাথে কাঁচা পথ ধরে হেঁটে আসলো অনেক দূর! ফেলে আসা তাদের গাঁ, ধান আর জীবন গৃহস্থালির তৈজসের কথা মনে করে হয়তো বোধের সুখ কল্পনায় উড়ে উড়ে জীবনের বহতা বাতাস বইতে দেখেছিল তারা দুজনে ক্ষণকালের জন্যে।
:
এবার রূপোলি বোধের নিসঙ্গতায় সপ্তরঙা দুঃখের সমাবেশ ঘেটে ঘেটে এগিয়ে যাই আমি একাকি ধাত্রীগ্রামের মেঠো পথে। মৃত জোনাকির ক্ষীয়মান আলোতে বাবুই-রা যেমন বাসা বাঁধে, তেমনি নিজের গাঁ ছেড়ে ধাত্রীগ্রামের এক ক্ষয়িষ্ণু নিভৃতে ঠাঁই নিয়েছে আমার গাঁয়ের "সাবিত্রী-কামিনী" পরিবারটি। ধর্মীয় কারণে বিভাজিত পুরণো গাঁয়ের এ মানুষগুলোকে বিছিয়ে রাখি ভালবাসার শিশুগাছের ডালপালায় আমি। সত্যি এরা পরিজায়ী হয়েছে অন্য মাটিতে, তা ভাবতে নিস্প্রেম অপরাহ্নের অসুখে ঝুলে থাকি আমি ধাত্রীগ্রামের তপ্ত রোদদুপুরে। ঐ পথে একাকি হাঁটতে হাঁটতে জীবন ভালবাসার মধ্য কিংবা অন্তমিল খুঁজে খুঁজে মরি আমি, মরে যেতে থাকে আমার স্বপ্নালু হেঁটে আসা পথের সুখবাতাসরা। তারপরো স্বপ্নপথের হাঁটুভাঙা নোনাঝিলে জলেদের চাঁদনি পেরিয়ে এগুতে থাকি আমি, আলো-আঁধারি মাঝে ভালবাসার কবিতার জলরোদে স্নান করে জীবনের কষ্টপথে অচেনা এ ধাত্রীগ্রামে!

Comments

সুবর্ণ জলের মাছ এর ছবি
 

বাহ, চমৎকার গল্প

 
ড. লজিক্যাল বাঙালি এর ছবি
 

পড়ার জন্যে ধন্যবাদ

===============================================================
জানার ইচ্ছে নিজেকে, সমাজ, দেশ, পৃথিবি, মহাবিশ্ব, ধর্ম আর মানুষকে! এর জন্য অনন্তর চেষ্টা!!

 
সুবর্ণ জলের মাছ এর ছবি
 

অনেক সুন্দর লেখা ! ধন্যবাদ

 
সুবর্ণ জলের মাছ এর ছবি
 

good

 

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

ড. লজিক্যাল বাঙালি
ড. লজিক্যাল বাঙালি এর ছবি
Offline
Last seen: 3 দিন 2 ঘন্টা ago
Joined: সোমবার, ডিসেম্বর 30, 2013 - 1:53অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

ফেসবুকে ইস্টিশন

SSL Certificate
কপিরাইট © ইস্টিশন.কম ® ২০১৬ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর