নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 4 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • সাইয়িদ রফিকুল হক
  • শ্মশান বাসী
  • আহমেদ শামীম
  • গোলাপ মাহমুদ

নতুন যাত্রী

  • নীল মুহাম্মদ জা...
  • ইতাম পরদেশী
  • মুহম্মদ ইকরামুল হক
  • রাজন আলী
  • প্রশান্ত ভৌমিক
  • শঙ্খচূড় ইমাম
  • ডার্ক টু লাইট
  • সৌম্যজিৎ দত্ত
  • হিমু মিয়া
  • এস এম শাওন

আপনি এখানে

গরিবের ঈদ ও উচ্চবিত্তের 'ত্যাগ'!



আমি থাকি ঢাকার তেজগাঁওয়ের নাখালপাড়া নামে একটা এলাকায়। এখানে একটা বড় জায়গাজুড়ে শ্রমজীবী নিম্নবিত্ত মানুষরা বাস করে। একটা ঘরে পরিবারের ৬-৭ জন সদস্য নিয়ে গাদাগাদি করে থাকে এরা। ভদ্রলোকেরা সেখানে একদিনও টিকতে পারতেন না। এই গরিব মানুষদের ঈদ উদযাপন দেখার অভিজ্ঞতাগুলো বলতে চাই।

গরিবের ঈদ- ১

আমাদের ‘শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতি পাঠাগার’ নামে একটা পাঠাগার আছে এলাকায়। সেই পাঠাগারের সদস্যদের একটা বড় অংশই ওই দরিদ্র পরিবারগুলো থেকে আসে। ঈদের আগেরদিন ওদের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে খোঁজ নিচ্ছিলাম আমরা। জানলাম, এই পরিবারগুলো কোরবানি দেবে না। সেটাই স্বাভাবিক অবশ্য, ওই সামর্থ্য তাদের নেই।

৭-৮ বছরের এক ছোট সদস্যকে জিজ্ঞেস করলাম, “তুই ঈদের দিন কী করবি?”

সে বললো, “কী আর করমু? আব্বায় যদি কাজ-কাম কিছু পায়, তাইলে হের লগে কামে যামু।”

আমি বললাম, “কী কাজ?”

সে বললো, “এই যদি গরু কাটার অডার (অর্ডার)-মডার পায়, তাইলে আব্বারে সাহাইয্য করুম। একটু গোস্ত লইয়া আসুম।”

এখানে প্রায় সব বাচ্চাদেরই ঈদে সকাল থেকে নানা কাজ। বড়লোকদের বাড়িতে কামলা খেটে কিছু টাকা আর কয়েক টুকরা মাংস, সেজন্য আনন্দকে বিসর্জন দিতে শিখেছে এই শিশুরা। অথচ ওদের হাতে মাংসের পুটলিটা খুলে দেখুন, ওখানে বেশিরভাগ মাংসই হাড়-গোড়, চর্বি ইত্যাদি।

অধিকাংশ উচ্চবিত্তরা গরিবদের না হয়ে একটু মাংস দেয়, দিতে মন চায় না তবুও। তাই ভালো মাংসগুলো রেখে অপেক্ষাকৃত খারাপগুলো দিয়ে কোনোরকমে দায়িত্ব পালন করে। এই এতোটুকু পেয়ে শিশুরা খুশি হয়, উচ্চবিত্তদের দোয়া দেয় যেন তারা আরও উঁচুতে ওঠে আর তাদের মতো গরিবদের আরও হাড়-চর্বি দেয়।

এই হলো ত্যাগের মহিমায় মহিমান্বিত হয়ে মনের পশুকে কোরবানি দেওয়ার নমুনা!

গরিবের ঈদ- ২

ঈদের দিন বিকালে এলাকায় হাঁটতে বেরিয়েছি। দেখি নাখালপাড়া রেলগেটে মানুষের ভিড়। পোশাক দেখে বুঝলাম, এরা গরিব। জটলা দেখে বোঝার চেষ্টা করলাম ঘটনা কী? পাশে পাঠাগারের এক ক্ষুদে সদস্যকে জিজ্ঞেস করলাম, কী হচ্ছে রে ওখানে?

সে বললো, ওইখানে মাংস বেচতাছে।

কে বেচতেছে, কেনো বেচতেছে, কি বিষয় ইত্যাদি বিস্তরিত জানার চেষ্টা করলাম। জানলাম, এখানে লোকজন কম দামে মাংস কেনে। ২০০ থেকে ৩০০ টাকা কেজি। সন্ধ্যা হওয়ার আগে সবাই মাংস কিনে বাসায় ফিরতে চায়।

সারাদিন এই গরিব মানুষগুলো কোথাও না কোথাও গরু-খাসি কাটার কাজ করে কিছু আয় করেছে। কাজ শেষে পাওয়া মজুরির টাকায় এখন এই কম দামের মাংস কিনতে পারলে বাড়ির বাচ্চাকাচ্চা ভালো খেতে পারবে। দর কষাকষি চলছে, চলছে হৈ-হল্লা। এক অদ্ভূত গম গম আওয়াজ।

আবার এই অস্থায়ী হাটেই আরেকদল গরিব মানুষ এসেছে যারা মাংস কিনতে না, বরং সারাদিন দ্বারে দ্বারে ঘুরে বা নানা উপায়ে সংগৃহীত মাংস বিক্রি করতে এসেছে। তারাও দাম হাকাচ্ছে ভালো আয়ের আশায়। যা পাবে, পুরোটাই লাভ। তাদের দরকার নগদ টাকা।

যে শ্রমিক বাপটা হয়তো ঈদের আগে বেতন-বোনাস কিছুই পায়নি, সেও শিশু সন্তানের হাত ধরে ভিড়ে মাংসের দাম করছে। যতো অভাবই থাকুক, ঈদে সন্তানের মুখে এক টুকরা মাংস পড়বে না, এটা গরিব বাপ হলেও মনে সইবে না। তাই বাপের হাত ধরে মাংসের দিকে চেয়ে আছে অবুঝ শিশুরা। কখন বাবা মাংস কিনে ঘরে ফিরবে আর সে মাংস খাবে- সেই অপেক্ষা চোখে-মুখে। মুখে আনন্দের ছাপ।

এই আনন্দ আমাকে পীড়া দিয়েছে, আপনাকে দিতো কিনা জানি না।


গরিবের ঈদ- ৩

ঈদের পরের দিনের ঘটনা। অনেকেই ঈদের দ্বিতীয় দিন কোরবানি দেন। অফিস থেকে ফেরার পথে গলিতে এক বিরাট বাড়ির মালিকের বাসায় খুব ভিড়। অনেক গরিব মানুষ হাউ-কাউ করছে। বাড়ির দারোয়ান ও চাকর-বাকররা গেটের সামনে বালতিতে মাংস রেখে দাঁড়িয়ে আছে। বাইরে দাঁড়ানো দরিদ্র মানুষগুলো দুই হাত বাড়িয়ে আছে, আর তাদের প্রত্যেককে ৩-৪ টুকরা মাংস দেওয়া হচ্ছে। কেউই মাংস পেয়ে খুশি হচ্ছে না। এতো অল্প মাংস দেওয়ায় তারা বড়লোকদের কিপটামোকে শাপ-শাপান্ত করছে আর আমি দাঁড়িয়ে শুনছিলাম সেগুলো।

আচমকা খেয়াল করলাম, আমার সামনে এক মহিলা খুব কষ্ট করে হেঁটে যাচ্ছেন ওই বাসার দিকে। বেশ অসুস্থ বোঝা যাচ্ছে, তাই দ্রুত হেঁটে ভিড় ঠেলে সামনে যেতে পারবেন না বলেই মনে হচ্ছিলো। সাথে ৫-৬ বছরের একটা ছেলে। উনি দ্রুত হাঁটতে পারছেন না। বাচ্চাটাকে ধাক্কা দিয়ে বলছেন, “তাড়াতাড়ি যা রে বাপ, নাইলে পরে মাংস পামু না। গেট লাগায় দিবো।”

বাচ্চাটা হাতে কী একটা নিয়ে খেলছিলো। তাই তাড়াহুড়োর গুরুত্ব সে বুঝলো না। দরিদ্র মা অস্থির হয়ে উঠেছিলো। অসুস্থ হওয়া সত্ত্বেও সে বেরিয়েছে, হয়তো সারাদিন সে এলাকায় ঘুরে ঘুরে মাংস খুঁজবে। সুস্থ হওয়া অবধি তার জন্য মাংস কেউ রাখবে না। অভাবের সংসারে সন্তানকে দুটো মাংস খেতে দেবে, বিত্তবানদের কাছে এরচেয়ে বেশি তো ওই অসুস্থ গরিব মা চায়নি!

গরিবের ঈদ-৪

ঢাকা শহরে অসংখ্য শ্রমজীবী নিম্নবিত্ত মানুষের বাস। এমনই কয়েকটি নিম্নবিত্ত পরিবারে আমার যাতায়াত আছে। তাদের সন্তানরা আমাদের পাঠাগারে আসে। ঈদে এই বাচ্চারা কী করেছে জানতে চাইলাম।

দ্বিতীয় শেণিতে পড়া একজন সদস্য জানালো, সে তার বাবার সাথে দুটো গরু কাটার কাজে গিয়েছিলো। এক হাজার টাকা পেয়েছে। এর মধ্যে বাবা তাকে অর্ধেক টাকা দিয়েছে। সেই টাকা সে তার মায়ের কাছে জমা রেখেছে। মা তার ব্যাংক।

আরেকজন পড়ে পঞ্চম শ্রেণিতে। সে সারাদিন একটা গরু কাটার কাজে বাপের সাথে গিয়েছিলো। ৭০০ টাকা পেয়েছে। সেই টাকা নিয়ে পাঠাগারে এসে দেখিয়েছিলো। এই টাকা দিয়ে মা তাকে নতুন প্যান্ট কিনে দেবে বলেছে, সেই উচ্ছ্বাস তার চোখে-মুখে।

আরও অনেকের গল্প একই। এরা সবাই ঈদের দিন কাজ করেছে। অনেকেই সকালে একটু নাস্তা করে বাপের হাত ধরে কাজে গিয়েছিলো। আর প্রচণ্ড ক্ষুধা নিয়ে বিকালে ঘরে ফিরেছে। এরপর রক্তমাখা জামা নিয়েই বন্ধুদের সাথে ঘুরতে বেরিয়েছে, কে কতো টাকা পেলো- তা নিয়ে আনন্দ-উচ্ছ্বাস করছে, এটা-সেটা কিনে খাচ্ছে। শিশুরা অল্পেই আনন্দিত হয়, তা সে যতো গরিবই হোক না কেন!

Comments

ড. লজিক্যাল বাঙালি এর ছবি
 

বাহ, সুন্দর !

===============================================================
জানার ইচ্ছে নিজেকে, সমাজ, দেশ, পৃথিবি, মহাবিশ্ব, ধর্ম আর মানুষকে! এর জন্য অনন্তর চেষ্টা!!

 

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

ফাহিমা কানিজ লাভা
ফাহিমা কানিজ লাভা এর ছবি
Offline
Last seen: 2 দিন 7 ঘন্টা ago
Joined: বৃহস্পতিবার, জানুয়ারী 16, 2014 - 2:55অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

ফেসবুকে ইস্টিশন

কপিরাইট © ইস্টিশন ব্লগ ® ২০১৮ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর