নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 5 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • মৃত কালপুরুষ
  • মাইকেল অপু মন্ডল
  • ড. লজিক্যাল বাঙালি
  • সুবর্ণ জলের মাছ
  • দ্বিতীয়নাম

নতুন যাত্রী

  • অনুপম অমি
  • নভো নীল
  • মুমিন
  • মোঃ সোহেল রানা
  • উথোয়াই মারমা জয়
  • শাহনেওয়াজ রহমানী
  • জিহাতুল
  • আজহারুল ইসলাম
  • মোস্তাফিজুর রহম...
  • রিশাদ হাসান

আপনি এখানে

মনোবিজ্ঞানঃ সমীহ করার ভয়ংকর দিক (Authority Bias)


জগৎবিখ্যাত ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক স্ট্যানলি মিলগ্রাম ১৯৬৩ সালে যুগান্তকারী একটা মনোবৈজ্ঞানিক পরীক্ষা করেছিলেন। পরীক্ষাটা খুব একটা জটিল কিছু নয়। বিজ্ঞাপন দিয়ে ‘শেখা’ বিষয়ক একটা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য বেশ কয়েকজন প্রাপ্তবয়ষ্ক পুরুষদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষাগারে নিয়ে আসেন মিলগ্রাম। তারপর দুইজন করে তাদের নিয়ে একটা পরীক্ষা করেন। আসলে ওই দুইজনের মধ্যে একজন ছিল আগে থেকে ঠিক করা একজন লোক। লটারি করে একজনকে বানানো হলো শিক্ষক, আরেকজনকে বানানো হলো ছাত্র। আসলে ছাত্রটি ছিল মিলগ্রামের ঠিক করা লোক, সে আগে থেকেই জানত যে সে ছাত্র হবে। শুধু লটারিটা এমনভাবে করা হলো যাতে অন্য লোকটি মনে করে যে নিতান্ত ভাগ্যক্রমে সে শিক্ষকের ভূমিকা পেয়েছে। তারপর ছাত্রটিকে বলা হল পেছনের রুমে যেতে আর তাকে বসিয়ে দেওয়া হলো একটা ‘বৈদ্যুতিক চেয়ারে’; শিক্ষককে বলা হল সামনের রুমে বসে পেছনের রুমে বসে থাকা ছাত্রটিকে একটার পর একটা প্রশ্ন করতে। ‘শিক্ষক’টিকে সাদা কোট পরা গম্ভীরদর্শন একজন ‘বিজ্ঞানী’ বললেন শেখার একটা উপায় হিসাবে প্রতিটি ভুল উত্তরের জন্য ‘ছাত্র’টিকে বৈদ্যুতিক শক দিতে হবে, আর যত বেশী ভুল হবে, শকের মাত্রা তত বেশি বাড়িয়ে দিতে হবে, আর এই শেখার পদ্ধতিটি কতটুকু কাজ করে সেটা দেখাই এই পরীক্ষার উদ্দ্যেশ্য।

শিক্ষকের সামনে একটা শক উৎপাদক যন্ত্র রাখা ছিল যেখানে ১৫ থেকে ৪৫০ ভোল্ট পর্যন্ত শক দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল, সেখানে পরিষ্কারভাবে লেখা ছিল ৩৭৫ ভোল্টের ওপরে গেলেই শকের মাত্রা হবে ভয়াবহ। শিক্ষক কোনো এক পর্যায়ে যদি শক দিতে অনিচ্ছা প্রকাশ করত, তখন তাদেরকে পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করা হতো। বলা হতো যে এই পরীক্ষা সফল করতে সামনে এগিয়ে যাওয়া খুব জরুরী।

ছাত্রটি বেশিরভাগ উত্তর ভুল দিতে থাকল, অবশ্যই পূর্বপরিকল্পনানুযায়ী। শকের মাত্রা বাড়িয়ে দেওয়ার সাথে সাথে ছাত্রটি চিৎকার করার মাত্রাও বাড়িয়ে দিতে শুরু করল। এমনকি এক পর্যায়ে ছাত্রটি অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মত ভানও করতে থাকল।
আশ্চর্যজনকভাবে, এই নিষ্ঠুর পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী সব শিক্ষকই ৩০০ ভোল্ট পর্যন্ত শক দিয়েছিলো আর ৪৫০ ভোল্ট পর্যন্ত, মানে অতি উচ্চমাত্রার শক দিয়েছলো ৬৫% অংশগ্রহণকারী! কিন্তু কেন? মিলগ্রামের তত্ব অনুযায়, এর কারণ হচ্ছে authority bias বা সমীহা করা বা অন্ধ আনুগত্য থেকে উৎপন্ন ধারণা। এই তত্ব প্রমাণ করার জন্যই মিলগ্রাম পরীক্ষাটি করেছিলেন, এটা কোনো ‘শেখা’র পরীক্ষা ছিলনা। যেহেতু ইয়েলের মত নামী বিশ্ববিদ্যাল্যের বিজ্ঞানী শক দিতে বলছেন, তাঁরা নিশ্চই জেনেশুনেই বলছেন, তাদের কথায় নিশ্চই কোনো ভুল থাকতে পারনা, এরকম ধারাণা থেকেই অংশগ্রহণকারীরা শক দেওয়া চালিয়ে গিয়েছিলো।

মিলগ্রাম পরীক্ষায় ব্যবহৃত বৈদ্যুতিক শক যন্ত্র

মিলগ্রাম পরপর এই পরীক্ষা ভিন্নভিন্নভাবে চালিয়ে তাঁর তত্বের যথার্থতা আরো দৃঢ়ভাবে প্রমাণ করেছিলেন। যেমন একই পরীক্ষা সাদা কোট পরা ‘বিজ্ঞানী’র পরিবর্তে একজন সাধারণ মানুষের মাধ্যমে চালানো হলো, বাধ্যতার মাত্রা (মানে ৪৫০ ভোল্ট পর্যন্ত শক দেওয়া) ৬৫% থেকে মাত্র ২০% এ নেমে এলো। একই রকম ফল পাওয়া গেলো যখন তাদের সরাসরি নির্দেশনা না দিয়ে টেলিফোনের মাধ্যমে দেওয়া হলো। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের ঝকঝকে পরীক্ষাগারে না করে যখন এই পরীক্ষাটা একটা জরাজীর্ণ অফিস ঘরে করা হলো, তখন সেটা ৪৭.৫% এ নেমে এলো, তার মানে হলো সমীহা জাগানোর পেছনে যায়গারও একটা ভূমিকা আছে।

আসলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ নৃশংসতা মিলগ্রামকে খুব ভাবিয়েছিলো। জার্মানির জনগণের বিশাল একটা অংশ কি করে সমর্থন করেছিলো এরকম ঘৃণ্য একটা মহাযুদ্ধ, কি করে জার্মান নাৎসি গাস্টাপো (হিটালারের নাৎজি দলের অনুগত পুলিশ) ইহুদীদের ওপরে চালিয়েছিলো ইতিহাসের নৃশংসতম অত্যাচার? মিলগ্রামের ধারণা ছিল, হিটালার এবং নাৎসি মতবাদের প্রতি অন্ধ আনুগত্য এবং সমীহ তৎকালীন জার্মানদের ভাবিয়েছিলো যে হিটালার যা করছে ঠিকই করছে, এবং হিটলার যা হুকুম করে তাদের তাই করা উচিৎ। সেখান থেকেই তাঁর মাথায় এই পরীক্ষাটি করার ধারণা আসে।

আসলে যেকোনো যুদ্ধে মানবতার ভয়াবহ বিপর্যয় দেখে আমাদের মনে বারংবার একই প্রশ্ন জাগে। যারা এধরণের নৃশংসতা করে তারা কি আমাদের মত রক্তমাংসের মানুষ নয়? কি করে একজন সাধরণ সংবেদনশীল যুবক যুদ্ধের ময়দানে দানব হয়ে ওঠে? এখানে দুটো বিষয় কাজ করে। ১) অন্ধ আনুগত্য বা সমীহা সেটা হতে পারে যে কারো প্রতি – উর্ধতন কতৃপক্ষ, শিক্ষক, বাবামা, ধর্মগুরু, বিজ্ঞানী, বিশেষজ্ঞ, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, এমনকি বন্ধুও। এধরণের ব্যক্তিদের জ্ঞান, বিচক্ষণতা বা দক্ষতার প্রতি বিশ্বাস থেকে মানুষ ভাবতে শুরু করে তারা যা বলে সেটাতে ভুল থাকতে পারেনা, তাই তাদের কথা মেনে নেওয়া উচিৎ। ২) যেহেতু অন্যের কথা অনুযায়ী কাজ করা হচ্ছে, বিশেষত একজন ‘নির্ভরযোগ্য’ ব্যক্তির কথায়, সেখানে সেই কাজের দায়ভার থেকে মানুষ নিজেকে অনেকেটাই মুক্ত মনে করে।

এই দুই কারণে মানুষ প্রায়ই নিজে থেকে ভালোমন্দ বিচার করতে ভুলে যায়। শিক্ষক যখন বলে এটা ভালো, ওটা মন্দ তখন মানুষ প্রায়ই বিনা প্রশ্নে সেটা মেনে নেয়। ধর্মগুরু যখন বলে এটা করা পাপ, ওটা করলে পূণ্য হবে তখন মানুষ ভাবেনা যে কেন এটা করলে পাপ বা ওটা করলে পূন্য হবে। একজন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী যখন নতুন কোনো আবিষ্কার উপস্থাপন করেন, আমরা প্রশ্ন করিনা আসলে এর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি কতটা শক্ত।

ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে এর ফলাফল তো আরো মারাত্মক। শিশুদের কাছে বাবামা হল ভগবানের মত। তাই বাবামা যা বলে শিশুরা সেটাই বিশ্বাস করে। এটাও একধরনের authority bias। বাবামার কথাবার্তা, আচার আচরণ তাই শিশুর মনোজাগতিক বিকাশে বিরাট ভূমিকা পালন করে। বাবামার প্রভাবে শিশু হয়ে উঠতে পারে কৌতুহলী, মানবিক গুনসম্পন্ন একজন ভালো মানুষ, তেমনি সে হয়ে উঠতে পারে কূপমন্ডুক, সাম্প্রদায়িক একজন মানুষ। সেনাবাহিনীতে উর্ধতন কর্মকর্তার প্রতি আনুগত্য বাধ্যতামূলক। সৈনিকদের প্রশিক্ষণের একটা বড় অংশই ব্যয় হয় আনুগত্য শেখাতে। আর তাই যুদ্ধুক্ষেত্রে বা প্রায়শ স্বাভাবিক সময়ও এধরণের পেশায় থাকা সাধারাণ লোকজন দানব হয়ে উঠতে পারে। ধার্মিক লোকেরা ধর্মগুরুর কথায় অন্য ধর্মের লোকদের ঘৃণা করতে শিখতে পারে। এভাবে অন্ধ আনুগত্য পৃথিবীর ইতিহাসের শুরু থেকেই জন্ম দিয়েছে একের পর এক ভয়াবহ অন্যায়ের। মিলগ্রাম অন্ধ আনুগত্যের এই ভয়ংকর দিকটিই তুলে ধরেছেন তার পরীক্ষার মাধ্যমে।

যোগ্য ব্যক্তিকে সমীহ করা যেতেই পারে, সেটা যদি তার প্রাপ্য হয়। কিন্তু তাই বলে সমীহ বা আনুগত্যের পাত্রের ওপর অন্ধভাবে বিশ্বাস করা মোটেই ঠিক নয়। আসলে কাওকেই অন্ধভাবে বিশ্বাস বা অনুসরণ করা ঠিক নয়। সবসময় নিজের জ্ঞানবুদ্ধি, বিচার বিবেচনা দিয়ে প্রতিটি বিষয় বিচার করা উচিৎ।

Comments

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

নুসরাত_জাহান
নুসরাত_জাহান এর ছবি
Offline
Last seen: 3 দিন 21 ঘন্টা ago
Joined: মঙ্গলবার, নভেম্বর 8, 2016 - 6:53অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

কু ঝিক ঝিক

ফেসবুকে ইস্টিশন

SSL Certificate
কপিরাইট © ইস্টিশন.কম ® ২০১৬ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর