নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 6 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • সৈকত সমুদ্র
  • জিসান রাহমান
  • নরসুন্দর মানুষ
  • সাইয়িদ রফিকুল হক
  • আকিব মেহেদী
  • নুর নবী দুলাল

নতুন যাত্রী

  • আদি মানব
  • নগরবালক
  • মানিকুজ্জামান
  • একরামুল হক
  • আব্দুর রহমান ইমন
  • ইমরান হোসেন মনা
  • আবু উষা
  • জনৈক জুম্ম
  • ফরিদ আলম
  • নিহত নক্ষত্র

আপনি এখানে

পশ্চিমা সন্ত্রাসবাদ প্রসঙ্গেঃ হিরোশিমা থেকে ড্রোনযুদ্ধ! | পর্ব-২


(আজকের সময়ে, এই ২০১৭ সালে, সন্ত্রাসবাদ বলতেই আমরা বুঝি ইসলামী সন্ত্রাসবাদ এবং মূলত মধ্যপ্রাচ্যের মুসলমানদের দ্বারা সংগঠিত সন্ত্রাসবাদ। এর বাস্তবতা রয়েছে সন্দেহাতীত ভাবে। কিন্তু সন্ত্রাসবাদের ইতিহাস এটাই নয়। এমন কি এই ২০১৭ সালেও কেবল ইসলামী সন্ত্রাসবাদই একমাত্র বা মূল ধারার সন্ত্রাসবাদ নয়। সন্ত্রাসবাদের আরো নানান ধারা, ধারণা আমাদের চারপাশেই রয়েছে। এই অনুবাদ কর্মটি সন্ত্রাসবাদের ভিন্ন আলোচনা উপস্থাপন করবে।

নোয়াম চমস্কির চিন্তা বিষয়ে অনেক দ্বিমত রয়েছে। বিশেষত মার্কিন জাতিয়তাবাদী ও সাদা আভিজাত্যবাদীদের চোখে নোয়াম চমস্কি এক মূর্তিমান “ইবলিশ”। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে মূলধারার মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী নীতির কঠোর সমালোচক এই এমআইটি অধ্যাপকের রয়েছে লক্ষ লক্ষ পাঠক। গভীর অভিনিবেশ সহ জ্ঞানচর্চার এক দারুন উদাহরণ নোয়াম চমস্কি। আমাদের এই সভ্যতা ধ্বংসে পশ্চিমা সন্ত্রাসবাদের ইতিহাস এখন আর কেউ বলছেন না। লিখছেন না। এখন বরং সন্ত্রাসবাদের সংজ্ঞাটিও পালটে গেছে, সন্ত্রাসবাদের ধারণাটিও এখন পশ্চিমের চোখ দিয়ে দেখা, পশ্চিমের কলম দিয়ে লেখা। এর বিপরীতে নোয়াম চমস্কি নিরসল ভাবে লিখে চলেছেন, মানব ইতিহাসের সবচাইতে বড় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সন্ত্রাসবাদের ইতিহাস।

এই লেখাটি নোয়াম চমস্কি ও আন্দ্রে ভিচেক এর লেখা “on western terrorism from hiroshima to drone warfare” পুস্তকের বাংলা অনুবাদ প্রচেষ্টা। পুস্তকটি এই দুই লেখকের মাঝে কথোপকথন হিসাবে লেখা হয়েছে। অনুবাদ বিষয়ে সকল মতামত, সমালোচনা স্বাদরে গ্রহন করবো। কিন্তু পুস্তকের মূল বিষয়ে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের দায় অনুবাদকের নয়, তবে সেই প্রসঙ্গে আলোচনাও স্বাগত জানাই।)

আগের পর্ব পড়তে হলে এখানে ক্লিক করুন

প্রথম অধ্যায়ঃ উপনিবেশিকতার খুনে ঐতিহ্য - ২

নোয়াম চমস্কি - দুনিয়ার ইতিহাসের সবচাইতে জঘন্য কিছু ধ্বংসলীলা চালানো হয়েছে গত কয়েক বছরে পূর্ব কঙ্গো তে। তিরিশ থেকে পঞ্চাশ লাখ মানুষের প্রানহানি ঘটেছে সেখানে। কিন্তু এই বিপুল ভয়াবহ হত্যাকান্ডের জন্যে কাকে দায়ী করা হবে? এই ব্যাপক সংখ্যক মানুষ নিহত হয়েছেন মিলিশিয়া বাহিনীর হাতে। কিন্তু মিলিশিয়া বাহিনীর পেছনে রয়েছে সরকার আর বহুজাতিক সংস্থা গুলো এবং যথারীতি তারা দৃশ্যমান নন।

আন্দ্রে ভিচেক - এই মুহূর্তে আমি একটা দীর্ঘ ডকুমেন্টারীর কাজ শেষ করছি, ছবিটির নাম রোয়ান্ডা গ্যামবিট। এই ছবিটি শেষ করতে প্রায় তিন বছর সময় লেগেছে। কঙ্গোতে নিহত মানুষের সংখ্যার যে হিসাব আমরা শুরু দিকে জানতাম তা এখন আরো অনেক বেশী। আপনি বলছিলেন ষাট লাখ থেকে প্রায় এক কোটি মানুষ নিহত হয়েছে ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক কঙ্গোতে যা প্রায় সমান সংখ্যক মানুষ যারা নিহত হয়েছিলেন বিংশ শতকের গোড়ার দিকে বেলজিয়ামের রাজা লিওপোল্ড – ২ এর হাতে। আর হ্যাঁ, যদিও এটা উপর থেকে দেখা যাবে রোয়ান্ডা বা উগান্ডার শাসকেরা হত্যা করছে, কিন্তু ভেতরের খবর বলছে এই সকল হত্যাকান্ডের পেছনে রয়েছে পশ্চিমের ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ।

নোয়াম চমস্কি - হ্যাঁ, সাদামাটা ভাবে দেখা যাবেনা কিভাবে বহুজাতিক সংস্থা গুলো কিভাবে মিলিশিয়াদের ব্যবহার করছে মানুষের বিরুদ্ধে যেনো তারা “কোলটান” সহ দেশের অন্যান্য খনিজ সম্পদের উপরে অবাধ অধিকার লাভ করে। “কোলটান” হচ্ছে সেই মূল্যবান খনিজ যা সেল ফোন ও অন্যান্য অভিজাত ইলেকট্রনিক শিল্পে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। পশ্চিমা বহুজাতিক সংস্থার এই ধরনের নিপীড়ন, গনহত্যা খানিকটা পরোক্ষ উদাহরণ, কিন্তু বহু উদাহরণ আছে যেখানে পশ্চিম ও তার কর্পোরেশন গুলো সরাসরি গনহত্যার সাথে যুক্ত হয়েছে। ধরা যাক ভিয়েতনাম যুদ্ধের কথা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে এর চাইতে ভয়াবহতম গনহত্যার ঘটনা আজ পর্যন্ত আর ঘটেনি। এইতো ২০১১ সাল ছিলো প্রেসিডেন্ট কেনেডির নেতৃত্বে ভিয়েতনাম যুদ্ধ শুরুর পঞ্চাশ বছর পূর্তি। সাধারণত যুদ্ধের পঞ্চাশ বছর পূর্তি নিয়ে যথেষ্ট আড়ম্বর, আলোচনা, সমালোচনা হয়ে থাকে। বিশেষত যদি সেই যুদ্ধের সাথে বিরাট ধ্বংসযজ্ঞ আর গনহত্যার সংযোগ থাকে। কিন্তু না, এই প্রসঙ্গে কোনও কথা হয়নি, আলোচনা, সমালোচনা কিছুই হয়নি। প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি ১৯৬১ সালে দক্ষিন ভিয়েতনামে বোমা ফেলার মধ্য দিয়ে অনুমোদন করেন ভিয়েতনামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। তিনি এই যুদ্ধে ভিয়েতনামের বিরুদ্ধে রাসায়নিক যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহারের অনুমোদন দেন। নামাপ নামের যে রাসায়নিক অস্ত্রটি তিনি অনুমোদন করেন তার প্রধান উদ্দেশ্য ছিলো কৃষি প্রধান ভিয়েতনামের সকল শস্য ও ফসল ধ্বংস করা এবং ফস্লি জমির মাটিতে স্থায়ী পরিবর্তন নিয়ে আসা। এই নাপাম বোমার ব্যবহারের ফলে ভীত সন্ত্রস্থ গ্রামের মানুষেরা জড়ো হতে থাকে শহরের বস্তিতে আর কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প গুলোতে।

এই নাপাম নামের রাসায়নিক বোমার প্রতিক্রিয়া আজও দেখা যাচ্ছে। যদি আমরা এই সময়েও সায়গন হাসপাতালে যাই, ভয়াবহ সব বিকলাঙ্গ মানুষ দেখা যাবে যারা যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে সেই সকল খতিগ্রস্থ এলাকায় জন্মেছে। হাত পা সহ শরীরের নানান অঙ্গের ভয়াবহ বিকলাঙ্গ রুপ যা হচ্ছে সেই বিষাক্ত রাসায়নিক যা প্রায় মহামারীর মতো ঢেলে দেয়া হয়েছে দক্ষিন ভিয়েতনামের গ্রামগুলোতে। কয়েক প্রজন্ম পর, এখন এসকল প্রসঙ্গ নিয়ে কেউ আর কথা বলেনা। সবাই ভুলে গেছেন সেই ভয়াবহতার কথা।

একই ঘটনা ঘটেছে লাওস আর কম্বোডিয়াতে। কম্বোডিয়াতে পলপট এর ভয়াবহ শাসন নিয়ে বহু আলোচনা আছে আমাদের মাঝে। কিন্তু আক্ষরিক অর্থে কোনও আলোচনা নেই কিভাবে পলপট এর শাসন ব্যবস্থা কায়েম হয়েছিলো। ১৯৭০ এর প্রথম দিকে আমেরিকান বিমান বাহিনী কম্বোডিয়ার গ্রামগুলোতে বোমা ফেলতে শুরু করে। এই বোমাবাজির পরিমান ছিলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্র বাহিনী প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যে ব্যাপক বোমাবাজি করেছিলো প্রায় তার সমান। হেনরি কিসিনজার এর নির্দেশ ছিলো ব্যাপক বোমাবাজির। তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন “বাতাসে যা কিছু উড়ছে আর ভুমিতে যা কিছু নড়ছে” তার সবকিছু ধ্বংস হওয়া পর্যন্ত বোমাবাজি চালিয়ে যাবার। অর্থাৎ এটা ছিলো সরাসরি একধরনের গনহত্যা বা জেনোসাইডের নির্দেশ যা আমাদের ভাবতে হবে। যদিও কিসিনজার এর এই নির্দেশ আরকাইভের কাগজ গুলোতে পাওয়া যাবেনা। এটা নিউ ইয়র্ক টাইমস এ একবার উল্লেখ করা হয়েছিলো, তারপরে এই বোমাবাজির ভয়াবহতা নিয়ে আর কোথাও আলোচনা হয়নি, কেবল কিছু গবেষণা প্রবন্ধ ছাড়া। অথচ এই বোমাবাজিতে কয়েক লক্ষ মানুষ নিহত হয়েছেন, ধ্বংস হয়েছে চারটি দেশ যারা আর কখনই খুব শক্ত ভাবে দাঁড়াতে পারেনি। সেখানকার মানুষ জানে এই ইতিহাস কিন্তু জানেনা এই ইতিহাসের প্রেক্ষিতে তাদের কি করা উচিৎ।

আন্দ্রে ভিচেক - আমি ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয়ে ছিলাম কয়েক বছর। লাওস এর উপরে আমেরিকা ও তার মিত্রদের বিমান বাহিনী যে “কারপেট বোমাবাজি” করেছিলো, যাকে এরা নাম দিয়েছিলো “গোপন যুদ্ধ”, আমি সেই যুদ্ধ নিয়ে লিখেছি, পরবর্তীতে সেই যুদ্ধের পরিনতি নিয়ে লিখেছি। আমি কম্বোডিয়া নিয়েও বেশ কিছু লেখা লিখেছি। আমার গবেষণা থেকে যে উপসংহার তা খুব আতংকজনক। পশ্চিমা শক্তি দুনিয়ার বিভিন্ন স্থানে যে ভয়াবহ আক্রমন নিপীড়ন চালিয়েছে বিভিন্ন সময়, সমাজ ও রাষ্ট্র কে অস্থিতিশীল করেছে, ধ্বংস করেছে এবং পরবর্তীতে সেই সকল স্থানে ব্যাপক প্রচার প্রোপ্যাগান্ডা চালিয়ে সেই সকল জনপদের মানুষ কে ভুলিয়ে দেয়া হয়েছে পশ্চিমাদের এই সব ভয়াবহ নিপীড়নের কথা। কম্বোডিয়াতেও একই ঘটনা ঘটেছে। কম্বোডিয়ায় মার্কিন ও তার মিত্রদের আক্রমনের ভয়াবহ স্মৃতি ভুলিয়ে দেবার এক বিশাল প্রচারযজ্ঞ চালানো হয় পশ্চিমা মিডিয়ার নেতৃত্বে। পলপটের কমিউনিস্ট শাসনকে এক ভয়াবহ দুসশাসন হিসাবে প্রচার করা হয়েছে লক্ষ কোটিবার। বাস্তব সত্যি হচ্ছে পলপটের এই ভয়াবহ দুসশাসনের প্রচারনার নীচে চাপা পড়ে গেছে লাওস, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনামের উপরে মার্কিন ও তার পশ্চিমা মিত্রদের হত্যাযজ্ঞের ইতিহাস। দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় পশ্চিমা শক্তি যে গনহত্যা চালিয়েছে তার স্মৃতিকে মুছে দেয়া হয়েছে, মুছে দেয়া হয়েছে সেই ইতিহাসকে।

লাওস ও কম্বোডিয়ার প্রত্যন্ত গ্রামে সাধারণ মানুষের বসতি তে মার্কিন বোমা হামলার প্রধান কারণ ছিলো যেনো লাওস ও কম্বোডিয়ার জনগন ভিয়েতনামের মুক্তি সংগ্রামে অংশ নিতে না পারে। শুধুমাত্র এই উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যে লক্ষ লক্ষ নিরীহ মানুষ কে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে। এমন কি এখনও মাঝে মাঝে সেই সকল অবিস্ফোরিত বোমা বা বোমার অংশ বিশেষ বিস্ফোরিত হয়ে গরু ও অন্যান্য গবাদী পশুর মৃত্যু ঘটে। এটা বলাই বাহুল্য একই ঘটনা ঘটছে সাধারণ মানুষ, নারী ও শিশুদের ক্ষেত্রেও।

বছর পাচ-ছয়েক আগে, আমি একটা বড় ব্রিটিশ মাইন নিস্ক্রিয়করণ সংগঠনের সাথে কাজ করছিলাম। মাইন এডভাইসরী গ্রুপ বা এম-এ-জি নামের এই সংগঠনটি অভিযোগ করেছে, যে সকল অস্ত্র কোম্পানী গুলো এশিয়ার এই অঞ্চলের যুদ্ধ গুলোতে মারাত্মক যুদ্ধাস্ত্র’র চালান সরবরাহ করেছিলো, তারা এখনও সেই সকল যুদ্ধাস্ত্রের টেকনিক্যাল তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। ফলে এম-এ-জি’র মতো সংগঠনগুলোর পক্ষে মাইন ও বোমা নিস্ক্রিয়করনের কাজ করাআ সম্ভব হয়ে উঠছেনা। বোমা ও মাইন নিস্ক্রিয়করনের কাজে দুটি বিষয় জানা জরুরী, তা হচ্ছে কোনও একটি বোমা বা মাইন কত বছর পর্যন্ত সক্রিয় থাকতে পারে আর কিভাবে এই বোমা বা তার বিশেষ অংশকে নিস্ক্রিয় করে ফেলা যায়। পশ্চিমা এই অস্ত্র ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর অসহযোগিতার কারণে অবিস্ফোরিত বোমার আক্রমে আজও বহু মানুষ নিহত হচ্ছে এই সকল দেশে।

কম্বোডিয়াতে এই সবকিছুর শুরুটা হয় যখন মার্কিন প্রশাসন একটা চরম দুর্নীতিগ্রস্থ ও অবৈধ সরকারকে রাজধানী নমপেন এ বসিয়ে দেয় দেশ চালানোর জন্যে। আমরা যখন খেমার রুজ এর তথাকথিত কমিউনিস্ট শাসনের কথা বলি তখন একটা বিষয়ে আমি খুবই অবাক হয়ে যাই, প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যাই। পলপট ফ্রান্স থেকে কমিউনিজমে দিক্ষীত হয়ে আসার পরেও অশিক্ষিত এবং দুনিয়ার অন্য অংশ থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন একটা বিরাট গ্রামীন জনগোষ্ঠীর কমিউনিজম সম্পর্কে কোনও ধারনাই ছিলোনা। কম্বোডিয়ার সাধারণ মানুষের কাছ থেকে যা শুনেছি তা হলো খেমার রুজ শাসনের অত্যাচার গুলো মূলত ছিলো মফঃস্বল আর গ্রামের মানুষদের উপরে যারা শহরের মানুষদের সাথে বোঝাপড়া সংগ্রাম করছিলো।

ঐতিহাসিক ভাবে নমপেন শহর আর তার বাসিন্দারা ছিলো সম্পূর্ণ ভাবে মার্কিন দালাল। মার্কিন বাহিনী যখন কম্বোডিয়ার প্রত্যন্ত গ্রাম গুলোতে দিনের পর দিন বোমাবর্ষণ করে চলেছিলো, নমপেন বাসী নাগরিকেরা তখন মার্কিন বাহিনীর তল্পী বাহক হিসাবে কাজ করেছিলো। শহরবাসীর এই দালালীর ইতিহাস কম্বোডিয়ার গ্রামের মানুষের মাঝে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছিলো। গ্রামবাসী প্রবল ঘৃণা নিয়েই শহরবাসীর উপরে হাম্লে পড়েছিলো, কেননা তারা মনে করতেন কম্বোডিয়ার সকল দুর্ভাগ্যের কারণ হচ্ছে নমপেন বাসির মার্কিন দালালী। এই ঘৃণা, গৃহযুদ্ধের পেছনে কমিউনিজম বা মার্কসবাদের লেশমাত্র যুক্ত ছিলোনা। বরং বাস্তব সত্য হচ্ছে, খেমাররুজদের তিন বছরের শাসনে যত মানুষ নিহত হয়েছিলো তার চাইতে কয়েকগুন বেশী মানুষ নিহত হয়েছিলো লাগাতার মার্কিন বোমা হামলায়।

এরপর, যখন সব কিছু শেষ হয়ে এলো, থিতু হয়ে এলো, ভিয়েতনাম যখন কম্বোডিয়াকে স্বাধীন করে দিল, খেমাররুজদের ক্ষমতা থেকে হঠিয়ে দিলো, তখন জাতিসংঘে আমেরিকার রাষ্ট্রদূত দাবী জানিয়েছিলেন কম্বোডিয়ায় বৈধ সরকার অর্থাৎ খেমাররুজদের ফিরিয়ে আনার জন্যে। ভেবে দেখুন, আমেরিকা দাবী করছে খেমাররুজদের ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনার জন্যে। এরা এই দাবী করেছিলো কারণ এঁদের মূল যুদ্ধটা মাওবাদী খেমাররুজদের বিরুদ্ধে ছিলোনা, বরং মূল যুদ্ধটা ছিলো সোভিয়েতপন্থী ভিয়েতনামের বিরুদ্ধে।

পরবর্তীতে পশ্চিমা মিডিয়ার যে ইতিহাস বিরোধী প্রচারনা, তার উদ্দেশ্যটি ছিলো বেশ পরিস্কার। এদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিলো পলপট এর শাসন কে “কমিউনিজম” বলে প্রচার করে কমিউনিজমকে গনহত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত করা এবং কমিউনিস্ট আদর্শের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলা। কম্বোডিয়া বিষয়ক আমার একটি রিপোর্টে আমি উল্লেখ করেছিলাম যে কম্বোডিয়ায় গ্রাম ও শহরের মাঝে এতো তীব্র ঘৃণা বিদ্যমান ছিলো যে, পলপত যদি কোনও ফুটবল দলের নামেও ডাক দিতেন গ্রামের মানুষ কে শহরের উপর হামলা করতে, তাহলেও ঘটনাটি একই পরিনাম নিয়ে হাজির হতো। অর্থাৎ, গ্রাম ও শহরের মাঝে বিদ্যমান ঘৃণার বিষয়টিই প্রধান ছিলো, কমিউনিজম বা মাওবাদ বিষয়টি ছিলো অত্যন্ত গৌন একটি প্রভাব।

নোয়াম চমস্কি - গবেষকেরা উল্লেখ করেছেন যে সমগ্র কম্বোডিয়ার ইতিহাসে সবচাইতে বেশী গবেষণা করা হয়েছে যে সময়টি নিয়ে তা হচ্ছে খেমাররুজদের তিন বছরের শাসনকাল। দেশটির সমগ্র ইতিহাস সম্পর্কে যা জানা যায় তার চাইতেও অনেক বেশী তথ্য ও গবেষণা রয়েছে ঐ তিন বছরের শাসনকাল নিয়ে। কিন্তু মাত্র কয়েকবছরের আগের ইতিহাস সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করুন, কেউ কিচ্ছু জানেনা। খেমাররুজদের তিন বছরের শাসনকালের আগে কম্বোডিয়ার ইতিহাস কেমন ছিলো? জিজ্ঞাসা করুন, কোনও উত্তর পাবেন না। আমরা যে ইতিহাসটি জানি তাহচ্ছে – ১৯৭০ এর দিকে খেমাররুজরা ছিলো খুব ছোট একটি রাজনৈতিক শক্তি, মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে গ্রামের নিপিড়ীত, শহরের এলিটদের উপরে খুব্ধ একটা বিশাল কৃষি নির্ভর জনগোষ্ঠীকে জড়ো করতে সক্ষম হয়েছিলো কেবল একটি পয়েন্টে তা হচ্ছে এরা সবাই শহরের নাগরিকদের মার্কিন দালালীর উপরে দারুন ভাবে ক্ষুব্ধ ছিলো। এবং অবশ্যই এরা পরবর্তীতে চড়াও হয়েছিলো মার্কিনপন্থী শহরবাসীদের উপরে।

এরা দেখেনি নমপেনের শহুরে কম্বোডিয়ানদের পেছনে ওয়াশিংটনের হাত। এটা অনেকটাই পূর্ব কঙ্গো আর খনিজ “কোলটান” এর সম্পর্কের মতো, জনগন দেখবেনা কে তাদের খুন করছে। এটা আসলে পশ্চিমের জন্যেও সমান ভাবে প্রযোজ্য। একটা উদাহরণ দেয়া যেতে পারে, খুবই গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ যদিও সম্পর্ক টা খানিকটা দূরের হয়তোবা। আমেরিকার উইসকনসিন এ, রিপাবলিকান গভর্নর একবার শ্রমিকদের ইউনিয়নের বেতন-ভাতাদি নিয়ে দর কষাকষির অধিকার রদ করলেন। এর ফলে রাজ্য জুড়ে বিশাল প্রতিবাদ হলো, এমন কি গভর্নর পদে আবার নির্বাচন দাবী করা হল। সেই নির্বাচন হলোও এবং বিস্ময়কর হচ্ছে রিপাবলিকান প্রার্থীই আবার বিজয়ী হলো। কিন্তু কিভাবে? এতো ব্যাপক গণরোষের পরেও কিভাবে রিপাবলিকান প্রার্থীই নির্বাচিত হলো? এর কারণটা হচ্ছে – ফিরতি নির্বাচনে রিপাবলিকানরা একটা মহা-প্রচার কর্মসূচী গ্রহন করে এবং এরা ভোটারদের বোঝাতে সক্ষম হয় যে আসলে শ্রমিকদের অবস্থার অবনতির জন্যে যতনা ব্যাংক বীমা কর্পোরেশন গুলো দায়ী তার চাইতে অনেক বেশী দায়ী শ্রমিকদেরই কিছু প্রতিবেশী। কোনও পাড়ায় যার পেনশন ভাতা বেশী আর যার পেনশন ভাতা নেই, খুব সহজেই এই দুজন কে পরস্পরের শত্রু বানানো সম্ভব আর এটা বোঝানো সম্ভব যে আরেকজন কে পেনশন বেশী দেবার কারণেই তোমাকে দেয়া সম্ভব হচ্ছেনা। অর্থাৎ জনগন সব সময় তার নিকটের কল্পিত শত্রুকে দেখতে পায়, পেছনের মূল হোতাকে দেখতে পায়না। তাই সমস্ত রাগ ক্ষোভ বিদ্বেষ পতিত হয় নিকটের কল্পিত শত্রুর উপরে। মূল হোতা হয়তো নিউ ইয়র্কের কোনও আকাশচুম্বী ভবনে বসে আছে। জার্মানিতে নাৎসিরাও একই প্রচার কাজে লাগিয়েছিলো, তারা প্রমান করতে পেরেছিলো যে “ইহুদিরাই হচ্ছে জার্মান জাতির সকল দুর্ভাগ্যের মূল কারণ”।

আন্দ্রে ভিচেক - হ্যাঁ, এদিক থেকে হয়তো দক্ষিন এশিয়ায় যা হয়েছে তার সাথে রোয়ান্ডা, উগান্ডা ও কঙ্গোর বেদনাদায়ক নিপীড়নের ইতিহাসকে তুলনা করা যেতে পারে। রোয়ান্ডা বা কঙ্গোতে আমরা দেখি মিলিশিয়ারা হত্যা করছে সাধারণ জনগন কে, প্রায় লাখ লাখ মানুষকে। স্থানীয় মানুষদের বলা হচ্ছে বর্বর, তুলনা করা হচ্ছে ইতর প্রানীর সাথে। কিন্তু এঁদের পেছনে যাদের হাত সেই পশ্চিমা সরকারগুলো আর বড় কর্পোরেশন গুলো রয়ে যাচ্ছে বহুদুরে।
এই বিষয়গুলো নিয়ে ইউরোপ বা আমেরিকার মানুষের জ্ঞান খুবই সামান্য। আর ইউরোপ নিজেদেরকে দুনিয়ার শিক্ষিত ও অবগত মহাদেশ বলে দাবী করে। বেশীরভাগ আফ্রিকার মানুষেরা জানে এই সব কিন্তু ইউরোপীয়রা যাদের বড় বড় কর্পোরেশন আফ্রিকার এই সকল সংকটের সাথে জড়িত, তারা এসবের প্রায় কিছুই জানেনা।

সবকিছুই একে অপরের সাথে সম্পর্কিত। রবার্ট মুগাবে পশ্চিমের কাছে একটা শয়তান হয়ে উঠলো যখন সে পশ্চিমের পুতুল রোয়ান্ডার দ্বারা কঙ্গোর সরকার উৎখাতের পরিকল্পনায় বাগড়া দিয়ে বসলো। আফ্রিকায় অনেকেই রসিকতার ছলে বলে থাকে দক্ষিন সুদান হচ্ছে উগান্ডার প্রেসিডেন্ট ইউয়েরি মুসেভেনির প্রতি পশ্চিমের শুভেচ্ছা উপহার, তাঁর আনুগত্য ও পশ্চিমাদের হয়ে “ভালো কাজ” এর স্বীকৃতি স্বরূপ।

কঙ্গোতে এই সময়ে যা হচ্ছে তা সোজা কথায় অভাবনীয় নিপীড়ন, ভয়াবহ গনহত্যা। এই অত্যাচার গনহত্যাকে তুলনা করা যেতে পারে একশো বছর আগে রাজা লিওপোল্ড-২ যা করেছিলো কঙ্গোর উপরে।

আমার মনে হয় সংখ্যাগুলো আমার আরেকবার বলা উচিৎ।কেননা কঙ্গোতে যে সংখ্যক মানুষকে হত্যা করা হয়েছে তা শুধু অস্বাভাবিক রকমের বেশী নয়, রীতিমত ভয়াবহ, আতংকজনক। গত বছর আমি যখন ওয়াশিংটনে শুটিং করছিলাম, তখন কঙ্গো’র একজন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী বেন কালালা আমাকে বলেছিলেন যে আমরা সব সময় কঙ্গোর নিহতদের সংখ্যা ষাট থেকে আশি লাখের মতো হবে, কেউ কেউ বলেন এই সংখ্যাটি এক কোটি ছারিয়ে যেতে পারে। সে আমাকে বলেছিলো – “দেখো, রোয়ান্ডাতে প্রায় আট লক্ষ মানুষ মারা গিয়েছিলো। আমি তাদের জন্যে দুঃখবোধ হয়, কারণ তারা মানুষ। কিন্তু সারা বিশ্ব কেবল তাদেরকে নিয়েই কথা বলে, সবাই বলে ১৯৯৪ এর গনহত্যার কথা। কিন্তু কঙ্গোতে আমাদের প্রায় ষাট থেকে আশি লাখ মানুষ কে হত্যা করা হয়েছিলো”।

এটা হয়েছে শুধু শেষ কয়েক বছরে, আবারো বলছি, ঠিক লিওপোল্ড-২ এর আমলের মতোই, প্রায় এক কোটি মানুষকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছিলো। কোনও একজন যদি রাবার বাগানে ঠিক মতো কাজ করতে না পেরে থাকে তাহলে তার হাত কেটে নেয়া হয়েছে নয়তো বাড়ী শুদ্ধ জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছে। এই হত্যাকান্ডগুলো সেই সময় সারা দুনিয়ার জন্যেই এক রকমের হুমকি বা সতর্কবানীর মতো ছিলো। এই ঘটনাগুলো দেখিয়ে দিয়েছে পশ্চিমের সাংবিধানিক রাজতন্ত্র কিম্বা বহুদলীয় গনতন্ত্র কি করতে পারে। অবশ্য এই সকল রাজতন্ত্র কিম্বা পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশগুলো তাদের নিজেদের দেশে এই সকল খুন খারাবি করেনি। যেমন লিওপোল্ড-২ তার আমলের খুনখারাবি গুলো বেলজিয়ামের শহর আন্তরপ কিম্বা ব্রুশ এ করেনি। বেলজিয়ানরা তাদের দেশের মোট জনসংখ্যার চাইতেও বেশী মানুষ হত্যা করেছে, আফ্রিকাতে।

নোয়াম চমস্কি - একবার আমি আগ্রহবশত এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা’র একটা বিখ্যাত সংস্করনে চোখ বুলিয়েছিলাম। সময়কাল টা ছিলো রাজা লিওপোল্ড-২ এর সময় অর্থাৎ ১৯১০ বা এর কাছাকাছি সময়। সেই অংশ টুকুতে অবশ্যই কিছু আলোচনা ছিলো রাজা লিওপোল্ড -২ এর করা সব মহান কাজকর্মের ফিরিস্তি, কিভাবে তিনি বেলজিয়াম কে গড়ে তুলেছিলেন ইত্যাদি ইত্যাদি। লেখাটির শেষ দিকে এক লাইনে উল্লেখ করা হয়েছিলো যে – “তিনি কখনও কখনও তাঁর প্রজাদের উপরে অত্যাচার করতেন” – হ্যাঁ অত্যাচারই বটে, এক কোটি মানব সন্তান হত্যা করাতো খানিকটা “অত্যাচার”ই বটে।

আন্দ্রে ভিচেক - শেষবার ২০১১ সালে আমি যখন ব্রাসেলস এ গিয়েছিলাম, আমি সেখানে দেখেছি বিভিন্ন সড়কে – গলিতে রাজা লিওপোল্ড-২ এর মূর্তি। বেলজিয়ানরা কিম্বা ইউরোপীয়রা এখনও তাকে শ্রদ্ধা করে, সম্মান করে। অথচ আমরা জানি সে কি ভয়াবহ গনহত্যা চালিয়েছে কঙ্গোতে। কিন্তু ইউরোপীয় পর্যায়ে সে এখনও বেলজিয়ান নায়ক হিসাবে গন্য।

এক পর্যায়ে অবশ্য বেলজিয়াম তার রাষ্ট্র রাজা লিওপোল্ড-২ এর ব্যক্তিগত কলোনি কঙ্গোকে নিয়ে নেয় ও একে জাতীয়করণের মাধ্যমে বেলজিয়ামের কলোনীতে পরিনত করে। এটা এক ধরনের কৌতুকের মতো মনে হবে। একজন রাজা যিনি তাঁর ব্যক্তিগত কলোনীতে প্রায় এক কোটি মানুষ কে হত্যা করলেন, কোথায় এই গনহত্যার কারণে কলোনীটিকে মুক্ত করে দেয়ার কথা, তা না করে বেলিজিয়াম বরং রাজার ব্যক্তিগত সম্পত্তি থেকে সেটাকে বেলজিয়ামের জাতীয় সম্পত্তিতে পরিনত করলো। এবং আমি প্রায় নিশ্চিত যে বেলজিয়ানরা হয়তো কঙ্গোলিজ জনগন কে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলো যে কলোনী হিসাবে এই রকমের কিছু গনহত্যার অভিজ্ঞতা থাক্তেই পারে, এটা এমন কিছু নয়।

নোয়াম চমস্কি - এটা খুব মজার ও আগ্রহউদ্দীপক বাস্তবতা যা উপনিবেশিক কলোনীর জনগন প্রায়শই তাদের উপরে হওয়া অত্যাচারকে কে স্বাভাবিক বলেই মেনে নেয় এমন কি কখনও কখনও সেই সকল উপনিবেশিক ইতিহাসকে গর্বের বলে মনে করে। আমি একবার কোলকাতা গিয়েছিলাম, তখন ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল দেখতে গিয়েছিলাম। আশ্চর্য হলেও সত্যি যে সেখানে ঢোকার সাথে সাথেই যে মূর্তিটি আপনাকে স্বাগত জানাবে তা হচ্ছে ব্রিটিশ দখলদার রবার্ট ক্লাইভের মূর্তি। এই লোকটিই ভারতের দীর্ঘ উপনিবেশিক শাসনের গুরু ছিলেন, যার নেতৃত্বের ভারতের ধ্বংসের শুরুটা হয়েছিলো। আমার সাথে গাইড ছিলো, তিনি আমাকে একটা হল দেখালেন তারপর আরেকটা, তারপর আরেকটা হল, বস্তাপচা ব্রিটিশ পেইন্টিংস এ ভরা সেই সকল প্রদর্শনী। কোনও ছবিতে প্রদর্শিত হচ্ছে কিভাবে ইংরেজরা ভারতীয় জনগনের উপরে অত্যাচার চালিয়েছিলো, সেখানে ছবি আছে ব্রিটিশ প্রভুরা ভারতীয় জনগনকে পেটাচ্ছে ইত্যাদি ইত্যাদি। পরে রানী ভিক্টোরিয়ার চা খাওয়ার কক্ষে গেলাম, ঘরখানা সম্ভবত নতুন করে বানানো হয়েছে, বিশ্বাস করুন, ঘরখানা মনে হয় কোনও একটা দরগাহ বা মাজার শরীফের আদলে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। অথচ ওখানেই ভারতের ধ্বংসের নানান চিহ্ন প্রদর্শিত হচ্ছে। কে জানে কতজন ভারতীয় খুন হয়েছিলো এঁদের হাতে?

আন্দ্রে ভিচেক - আমিও বেশ কয়েকবার গেছি ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে। এটা দারুন অদ্ভুত এক যাদুঘর। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের মতো আমি আর কোনও যাদুঘরকে দেখিনি যেখানে এতো বিপুল সংখ্যক ভারতীয় দর্শনার্থী ভীড় জমায় প্রতিদিন। প্রতিদিন হাজার হাজার দর্শনার্থীর ভীড় জমে এখানে। এমন কি কোলকাতা ও ভারতবাসী এই যাদুঘরটিকে পরম যত্নের সাথে সংরক্ষণ করছে। হয়তো ব্রিটিশরা তাদের প্রভুত্বকে স্বীকার করে নেয়ার জন্যে লাখো ভারতবাসীকে এভাবেই দীক্ষিত করেছিলো। যেমন এখনকার মালয়েশিয়ান অভিজাত শ্রেনীর মানুষেরা, এমনিতে তারা ভালোই করছেম কিন্তু তাদের মধ্যে একটা তীব্র প্রতিযোগিতা আছে কে কতটা বেশী ব্রিটিশ কেতা বজায় রাখত পারে তাদের দৈনন্দিন জীবনাচরনের মাঝে। ব্রিটিশ আমল থেকেই সকল মনুমেন্টগুলো এখনও যত্নের সাথে রক্ষা করা হয়েছে এখানে। এমন কি সাবাহ বা বর্ণীও তে ব্রিটিশদের বড় বড় অভিজাত বাড়ী গুলোকে যাদুঘরে পরিনত করা হয়েছে। এমনকি এখনও মায়লেশিয়ান তরুনদের একটা বড় অংশের স্বপ্ন হচ্ছে তাদের শিক্ষাজীবনের কোনও একটা অংশে ইংল্যান্ডের কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করা। তরুন সমাজের একটা অংশ এখনও সম্ভবপর সবকিছু করে তাদের মালয়েশিয়ান বেশভূষা-চর্চা বা সাংস্কৃতিক বিশিষ্টতার কিছু কিছু ত্যাগ করে যতটা কাছাকাছি যাওয়া যায়, প্রাক্তন উপনিবেশিক প্রভুদের। একই চল দেখা যাবে কেনিয়াতে, যেখানে স্থানীয় অভিজাত সমাজ, যারা এখন তাদের পশ্চিমা প্রভুদের পক্ষে দেশ পরিচালনা করছে। এরাও ব্রিটিশদের কায়দায় পোশাক আশাক পরিধান করে। কেনিয়ার আদালতের বিচারকেরা এখনও ব্রিটিশ আদালতের বিচারকদের মতো করে মাথায় সাদা পরচুলা বা উইগ পরে থাকে। এমন কি এঁদের অনেকেই ইংরাজী ভাষায় তোতা পাখির মতো ব্রিটিশ একসেন্ট আয়ত্ব করে।

দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় অনেক মানুষই মনে করেন উপনিবেশিক শাসকেরা খুব একটা খারাপ ছিলোনা। এই অঞ্চলে একটা অদ্ভুত ও হাস্যকর আলোচনা চালু আছে – মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া আর সিঙ্গাপুরের মাঝে। যেমন এই তিনটি দেশের অনেকেই মনে করে মালয়েশিয়া ইন্দোনেশিয়া থেকে অনেক বেশী অগ্রসর কারণ তাদের ব্রিটিশ উপনিবেশিক প্রভুরা তাদের অনেক উন্নতি করে দিয়ে গেছেন ইন্দোনেশিয়ার ডাচ উপনিবেশিক প্রভুদের তুলনায়। অর্থাৎ উপনিবেশিক প্রতিনিধি হিসাবে ব্রিটিশরা ইন্ডনেশিয়ার ডাচ প্রভুদের চাইতে ভালো ছিলো।

খুব সাম্প্রতিক কালে একই ঘটনা দেখা যাবে পেরুতে। লিমা ছিলো পেরুর উপনিবেশিক কর্তাব্যক্তিদের সদর দফতর যেখানে স্প্যানিশ উপনিবেশিক প্রভুদের দ্বারা ভয়াবহ মানবতা বিরোধী অপরাধ সংঘঠিত হয়েছিলো। কিছুকাল আগে পর্যন্তও তাদের রাষ্ট্রপতির বাসভবনের সম্মুখের চত্বরে ভয়ংকর উপনিবেশিক শাসক ফ্রান্সিসকো পিঁজারও’র একটি বিরাট মূর্তি স্থাপিত ছিলো। পেরুতে এখন বামপন্থিদের সরকার। এরা এই উপনিবেশিক শাসকটির মূর্তিটি ধ্বংস করেনি, বরং রাষ্ট্রপতির বাসভবনের সম্মুখের চত্বর থেকে সরিয়ে খানিকটা দূরে একটা পার্কে পুনস্থাপন করেছে। সমগ্র লাতিন আমেরিকায় পায়ের ছাপের মতো সর্বত্র রয়েছে উপনিবেশিক শাসকদের বিজয় ও তাদের দ্বারা সংঘটিত নিপীড়নের চিহ্ন। এটা এমন যে হয়তো এই সমাজগুলোর কিছু অংশ এখনও সেই উপনিবেশিক শাসনামলের জন্যে নস্টালজিয়া বোধ করে।

নোয়াম চমস্কি - ইদানিং খানিকটা প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। যেমন ধরা যাক ডমিনিকান রিপাবলিকের অভিজ্ঞতা। ডমিনিকান সরকার ১৯৯২ সালে কলম্বাসের অবতরন উপলক্ষ্যে একটা বিরাট উদযাপনের আয়োজন করেছিলো। এই উপলক্ষ্যে এরা বেশ কিছু বড় বড় মূর্তি স্থাপন করেছিলো যা পরবর্তীতে জনগনের দ্বারা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।

উপনিবেশিকতা যেমন রাজনীতি ও অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব তৈরী করে তেমনি নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের ক্ষেত্রেও এক দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব জারি রাখে। নারীর কথাই ধরুন। শত শত বছর ধরে এটা এক রকমের মেনেই নেয়া হয় যে নারীরা হচ্ছে বাবা নয়তো স্বামীর অধীন। এটাকেই প্রকৃতির নিয়ম বলে মনে করেছে নারীরা বহু বহু বছর ধরে। ধরুন, আমেরিকাতেই ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় বিচার বিচার ব্যবস্থায় (ফেডারেল জুডিশিয়ারী) বিচারক হিসাবে নারীদের নিয়োগের কোনও নিশ্চয়তা ছিলোনা। আপনি যদি আমার দাদীমা’কে জিজ্ঞাসা করেন তিনি কি বঞ্চিত? তিনি হয়তো এই শব্দটাই বুঝবেন না। এটাই ছিলো নারীদের সামাজিক ভুমিকা আর তা গৃহীতও হয়েছিলো সমাজের মাঝে। এই সকল শাসক ও তাদের নিস্পেষনের মূল অর্জনটা হচ্ছে আমজনতা মনে এক সময় এই ধরনের নির্যাতন, বঞ্চনাকেই স্বাভাবিক বলে মেনে নেয়।

ইউরোপীয়দের মাঝে কি তাদের এই উপনিবেশিক ইতিহাস সম্পর্কে সচেতনতা আছে?

আন্দ্রে ভিচেক - না, বরং তাদের আছে এক অভুত রকমের কুয়োর ব্যাঙের মতো সচতনতা। আমি সচেতনতার স্তরটি দেখেছি আমার স্প্যানিশ বন্ধুদের মাঝে। বলে রাখা ভালো, আমার এই বন্ধুরা যে খুব সাধারণ আমজনতা তা নয়, বরং এরা সবাই উচ্চ শিক্ষিত এবং পেশাদার মানুষ। এমন কি এঁদের কেউ কেউ জাতিসংঘ সহ আরো বেশ কিছু সন্মানজনক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। ইতিহাস সম্পর্কে এঁদের অনেকরই একটা ভীষণ অপরিনত, ভাসা ভাসা জ্ঞান কিম্বা প্রায় অজ্ঞানতা। ফ্রান্সে আমার অনেক প্রগতিশীল বন্ধু যারা লেখালেখি ও মিডিয়ার সাথে যুক্ত, তাদের সাথেও আমার অনেকবার বিতর্ক – বিসম্বাদ হয়েছে ফরাসী উপনিবেশিকতা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে। ফরাসীদের মাঝে জেনারেল দ্যা গলের জন্যে রয়েছে প্রায় শর্তহীন ভালোবাসা, এমনকি মধ্যপন্থী ও মধ্য-বামপন্থীদের মাঝেও অনেকেই মনে করেন ফ্রান্স হয়তো অন্যদের মতো অতটা বাজে উপনিবেশিক শাসক ছিলোনা। যেনো আফ্রিকা, ইন্দোচীন ও ক্যারিবিয়ান দেশগুলো কোনোদিন ছিলোই না ইতিহাসে। আপনি নিশ্চয়ই জানেন, কিছু কিছু কলোনীতে ফরাসীরা গনহত্যার মাধ্যমে আদিবাসী বা ন্যাটিভ জনগোষ্ঠীর প্রায় সকলকে হত্যা করেছিলো, যেমন আইসল্যান্ড অফ গ্রানাডা । নেহায়েত যারা, বিভিন্ন পাহাড়ের গুহায়, খানা-খন্দে লুকিয়ে থাকতে পেরেছিলো, তারাই বেঁচে গিয়েছিলো এই হত্যালীলা থেকে। ইস্টার আইল্যান্ড, যেতা এখন চিলির মধ্যে পড়েছে, ওখানে ফরাসীরা গনহত্যায় প্রায় ১০০ ভাগ সফল হতে পেরেছিলো। ওখানে প্রায় সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিলো স্থানীয় অধিবাসীদের।

আমি ইন্দোনেশিয়াতে ডাচ বা নেদারল্যান্ডের উপনিবেশিক ইতিহাস নিয়ে ভাবি, ভয়াবহ আদিম, অসুস্থ সে সব ইতিহাস। একবার নমপেন শহরের একটি বারে এক ভদ্রলোকের সাথে দেখা হয়েছিলো, তিনি সদ্য ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তা ঘুরে এসেছেন, মাতাল অবস্থায় তিনি বার বার বকে চলেছিলেন – “আমাদের আসলে ওখান থেকে চলে আসা উচিৎ হয়”। এবং এই ভদ্রলোক একজন ইউরোপীয় ইউনিয়নের কর্মকর্তা।

জার্মানির কারো কাছ থেকে কখনই শোনা যায়না তাদের উপনিবেশিক শাসনের ইতিহাস। নামিবিয়া কে নিয়ে মিউনিখ বা স্টুটগারট শহরের কেউ কখনই আলোচনা করবেন না, হয়তো কখনও কখনও নামিবিয়া তাদের আলোচনায় উঠে আসে একটা দুর্দান্ত টুরিস্ট স্পট হিসাবে।

চিলিতে ডানপন্থীরা বোলবে সামরিক শাসক পিনোশে কিছু ভালো কাজ করেছেন আবার কিছু মন্দ কাজও করেছেন। ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসন নিয়ে ঠিক একই রকমের উত্তর পাওয়া যাবে ব্রিটিশদের কাছ থেকে। ভারতে তাদের ভয়াবহ শাসন – শোষন বিষয়ে ব্রিটিশদের কাছ থেকে কোনদিনও কোনও রকমের ন্যূনতম দুক্ষ প্রকাশ, বেদনাবোধ, অপরাধবোধ বা কোনও রকমের মুল্যবোধের সংকটের কথা শোনা যায়না। এমন কি ভারত – পাকিস্তান বিভাজনের সময় যে শতাব্দীর ভয়াবহতম গনহত্যা, রায়ট, ধ্বংসলীলা হয়েছিলো তা নিয়েও এঁদের কোনও দুঃখবোধ বা বেদনাবোধ নেই। অথচ ভারত – পাকিস্তান বিভাজনের সময় যে গনহত্যা ও ধ্বংসলীলা হয়েছিলো তাঁর সাথে কেবলমাত্র তুলনা করা যেতে পারে ১৯৬৫ সালে পশ্চিমাদের ইন্ধনে হওয়া ইন্দোনেশিয়ার সামরিক ক্যু কিম্বা আধুনিক কালের কঙ্গো গনহত্যার সাথে। ব্রিটিশদের উপনিবেশ মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার কথা না হয় বাদই দেয়া গেলো।

নোয়াম চমস্কি - আলজেরিয়ান প্রবাসীদের একটা দল, এরা সবাই ছিলো পদার্থবিদ, এঁদের একজন আমার প্রতিষ্ঠান এমআইটি’তে এসেছিলো, তাই আমি তাঁকে জানি। সে ছিলো এই দলটিতে। আলজেরিয়াতে ১৯৯০ সালে যে ভয়াবহ নিপীড়ন, হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছিলো তার একটা বিস্তারিত গবেষণা করেছে এই দলটি, সেই ঘটনার অনুপুঙ্খ বিবরণ তুলে এনেছেন এই দলটি। এদের মতে, সেই সময় আলজেরিয়াতে ইসলামী জঙ্গীদের দ্বারা সংঘটিত হয়েছে এমন অনেক সন্ত্রাসবাদের ঘটনা আসলে সরকারী উদ্যোগেই ঘটানো হয়েছে। ভুয়া ইসলামী জঙ্গীদের মাধ্যমে সরকারী এজেন্সী গুলোই এই সকল হামলার অনেক গুলো করিয়েছে। প্রতিটি ঘটনার আলাদা আলাদা বিশ্লেষণ করে দেখানো হয়েছে এর সত্যতা। এমনটা ঘটেছে, একটা বিশাল আর্মি ক্যাম্পের কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থিত একটি অপেক্ষাকৃত দরিদ্র মহল্লায় তিন ধরে হত্যাকান্ড চালানো হলো, কিন্তু কেউ তাতে বাঁধা দিলোনা, হস্তক্ষেপ করলো না সন্ত্রাসী ধংসযজ্ঞে। একজন জেনারেল এসে বুক ফুলিয়ে ঢুক্লেন সেই ধ্বংস হয়ে যাওয়া বিরান পাড়ায়, যখন কেউ আর বেঁচে নেই সেখানে। তারা এই ভাবে এক্টার পর একটা ঘটনা ধরে দেখিয়ে দিয়েছেন কিভাবে এই ধরনের সন্ত্রাসী ঘটনা গুলো রাষ্ট্রীয় মদতে ঘটানো হয়েছে। তাদের মতে এই সকল ঘটনা মূলত ঘটানো হয়েছিলো ফরাসী গোয়েন্দা সংস্থার মদতে এবং এই জন্যে তারা তাদের এই গবেষণার জন্যে একটি ভুমিকা লিখে দেবার জন্যে আমাকে অনুরোধ করে। আমি তাদের গবেষণাটি পড়েছি এবং প্রচুর তথ্য পেয়েছিলাম সেই কাজটি থেকে। পুরো কাজটি খুব উদ্দীপক ছিলো ফলে আমি এর একটি ভুমিকা লিখে দিয়েছিলাম, খুবই নরম সুরের সেই ভুমিকাটি, কিন্তু তবুও এর পরিনতি একই রকমের হয়েছে।

বইটি শেষমেষ প্রকাশিত হয়েছিলো। যথারীতি কোনও ফরাসী প্রকাশক পুস্তকটি ছাপতে রাজী হয়নি। বইটি প্রকাশিত হয় সুইটজারল্যান্ড থেকে। বইটি প্রকাশিত হবার পরে তারা চেষ্টা করেছিলেন প্যারিসে বইটির উপরে একটি সংবাদ সম্মেলন করতে, কিন্তু কোনও ফরাসী সাংবাদিক সেই সংবাদ সম্মেলনে যাননি। ফলে ফ্রান্সে বইটি সম্পূর্ণ অজানাই থেকে যায়। আমার এক বন্ধু আছে প্যারিসে যিনি সেখানে আমেরিকান লাইব্রেরীতে কাজ করেন, তাঁকে বইটির বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তিনি আমায় বলেছিলেন, তিনি একটি কপি সংগ্রহ করেছেন এবং তাঁর লাইব্রেরীতে রেখেছেন এবং সেটিই ফ্রান্সে ঐ বইটির একমাত্র কপি। অথচ এই বইটি সাম্প্রতিক সময়ের ঘটোনাবলীর উপরে লিখিত যার সাথে ফ্রান্সের যোগসাজস থাকার দাবী রয়েছে।

আমার মনে হয় এটা এক ধরনের হাটে হাড়ী ভেঙ্গে দেয়ার মতো। এটাও এক রকমের সমস্যা যে আমেরিকার বুদ্ধিবৃত্তিক মানুষেরা মনে করেন যে ইউরোপের মানুষেরা বোধ হয় বেশী খোঁজ খবর রাখেন, বেশী সচেতন চারপাশে কি হচ্ছে সেসব নিয়ে। কিন্তু আমি দেখেছি, ইউরোপের মানুষেরা খুব সচেতন প্রধানত সেই সকল বিষয় নিয়ে যেখানে আমেরিকা জড়িত বা সংশ্লিষ্ট। এছাড়া বৈশ্বিক অনেক বিষয়ে ইউরোপীয় জনগনের রয়েছে ভয়াবহ অজ্ঞানতা। আমার অভিজ্ঞতা বলে, সধারন ভাবে এশিয়া, লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকার শিক্ষিত মানুষেরা তাদের ইউরোপীয় সমগোত্রীয়দের তুলনায় অনেক বেশী জানাশোনা মানুষ। তারা সমকালীন নানান বিষয়, সমস্যা বা আলোচনা নিয়ে তাদের ইউরোপীয় বন্ধুদের চাইতে অনেক বেশী জানেন। আমার ধারণা, পশ্চিমারা, বিশেষত ইউরোপীয়রা তাদের নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব ও স্বকীয়তা বিষয়ে ভয়াবহ রকমের শুচিবায়ুগ্রস্থ। এঁদের অনেকেই মনে করেন তারাই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ, এমন কি অন্যান্য বিকল্প সূত্র বা উৎস সম্পর্কে না জেনেই অনেকে এই দাবী করেন।

যাইহোক, আপনার প্রশ্নে যদি ফিরে যাই, প্রশ্নটা ছিলো উপনিবেশিকতা সম্পর্কে ইউরোপীয়রা কতটা জানে? আমার অভিজ্ঞতা হচ্ছে, উপনিবেশিকতা সম্পর্কের, এর ইতিহাস সম্পর্কে ইউরোপীয়দের জ্ঞান গরিমা প্রায় শুন্যের কাছাকাছি। উপনিবেশিকতার ইতিহাস সম্পর্কে এই অজ্ঞানতা ও জানার অনাগ্রহ রীতিমত লজ্জাজনক এবং এই বিষয়টি প্রকাশ্য। ইউরোপীয়রা একটা বিষয় নিশ্চিত করতে পেরেছে যে, উপনিবেশিক আমলে তারা যে সকল ভয়াবহ গনহত্যা করেছে, এখনও যে সকল মানবতাবিরোধী অন্যায় অ অবিচারের সাথে তারা জড়িত, তার ইতিহাস তাদের জনগন জানবেনা। আর যদি প্রশ্ন করি যে ইউরোপীয়রা কতটুকু জানে কঙ্গোতে তাদের পূর্ব পুরুষের দ্বারা করা গনহত্যাগুলোর ইতিহাস কিম্বা তাদের বর্তমান সময়ের কর্পোরেশন গুলো সেখানে কি করেছে? আমি বলবো, এই সকল প্রশ্নের উত্তর তারা কিছুই জানেনা, এবং এর কারণ হচ্ছে, শ্রেফ তারা জানতে চাইনি এবং জানতে চায়না। এর চাইতে অনেক নিরাপদ, ইউরোপীয়দের দেয়া ত্রাণের টাকা নিয়ে গরীব দেশের দুর্নীতি বিষয়ে অভিযোগ করা, আলোচনা করা।

নোয়াম চমস্কি - আপনি যখন এসব নিয়ে কথা বলেন ইউরোপীয়দের সাথে, তাদের প্রতিক্রিয়া কেমন হয়?

আন্দ্রে ভিচেক - বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে তারা রক্ষণাত্মক হয়ে যায়। আমি এটা দেখেছি ফ্রান্সে, জার্মানিতে, স্পেইন এবং ইংল্যান্ডে। অবশ্য ইংল্যান্ডে একটা বড় সড় অংশ রয়েছে যারা অনেক বেশী বিশ্লেষণ ধর্মী, অন্যান্যদের চাইতে। সম্ভবত এর কারণ, ইংল্যান্ড এখন সত্যিকার অর্থেই একটি “মাল্টি কালচারাল সোসাইটি” বা বহু সংস্কৃতির মিলনমেলা। ইউরোপের অজ্ঞতা শুধু তাদের উপনিবেশিক ইতিহাস সম্পর্কে নয়, তাদের এই অজ্ঞতা এমন কি তাদের নিজেদের ইতিহাস নিয়েও।

নোয়াম চমস্কি - স্পেনে আমার আমার কিছু মজার অভিজ্ঞতা হয়েছিলো। সেবার ১৯৯০ সালে অর্থাৎ স্পেনের শাসক ফ্রাংকো’র বিদায়ের পনেরো বছর পরে, আমি স্পেন গিয়েছিলাম একটা সেমিনারে বক্তৃতা করতে। আমি ১৯৩৬ – ৩৭ সালে স্পেনের বারসেলোনায় ঘটে যাওয়া কিছু ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার রেফারেন্স উল্লেখ করেছিলাম। তরুন দর্শকদের কোনও ধারনাই নেই স্পেনের গৃহযুদ্ধ সম্পর্কে। কেবল আমার বয়সী অপেক্ষাকৃত বয়স্ক মানুষেরাই বুঝতে পারছিলেন, আমি কি বলছি। এরপরে আমি গিয়েছিলাম স্পেনের আরেকটি শহর অভিডিও তে বক্তৃতা করার জন্যে। এই শহরটিতে ১৯৩৪ সালে বামপন্থীদের উত্থান ঘটেছিলো, যার প্রতিক্রিয়ায় সামরিক কায়দায় তাদেরকে দমন করা হয়। যে টাউন হলটিতে নির্দয় ভাবে মানুষকে হত্যা করা হয় এবং টাউন হল্টি ধ্বংস করে দেয়া হয়, সেই টাউন হলেই আমার বক্তৃতা টি ছিলো, আমি সে প্রসঙ্গে কথা বলার সময় ভাবছিলাম শ্রোতারা হয়তো এই ইতিহাস তি জানবেন। কিন্তু না, কেবল আমার মতো বয়স্ক মানুষেরাই সেই ইতিহাস টি জানতেন, বাকী সবার কাছেই তা ছিলো একেবারেই অজ্ঞাত।

আন্দ্রে ভিচেক - হ্যাঁ, এধরনের অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায় স্প্যানিশরা ফ্র্যাংকো’র শাসনামল সম্পর্কে কিভাবে ভাবে, কতটা জানে। লাতিন আমেরিকায়, যেমন চিলি, আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে এই দেশগুলোতে মানুষ তাদের ইতিহাস, অতীত সম্পর্কে অনেক বেশী খোলামেলা, উদার। এই দেশগুলোর মানুষ অনেক বেশী সাহসীও বটে।

নোয়াম চমস্কি - হ্যাঁ এটা সত্যি। আমি একবার মেক্সিকোতে ছিলাম আমার মেয়ের সাথে, ও অবশ্য নিকারাগুয়াতে থাকে।সেই সময় সেখানকার স্থানীয় পত্রিকা “লা জরনাদা” পড়ছিলাম। এই পত্রিকাটি মেক্সিকোর একটা ভালো পত্রিকা বলেই জানি, সেখানে একটা রিপোর্ট পড়ছিলাম স্পেনের সদ্য প্রকাশিত “ন্যশনাল বায়োগ্রাফিক্যাল ডিকশনারী” বা জাতীয় বিখ্যাত মানুষদের জীবনী নিয়ে একটা প্রকাশনার উপর। স্পেনে এটা একটা সম্মানজনক প্রকাশনা কেননা এটা প্রকাশ করে স্প্যানিশ এয়াডেমি। তো এই প্রকাশনাতে সামরিক শাসক ফ্রাংকো’র জীবনীও অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলো যেখানে তাঁকে উল্লেখ করা হয়েছিলো একজন রক্ষনশীল জাতিয়তাবাদী নেতা হিসাবে এবং স্পেনের প্রতি তার অনেক ভালো অবদান আছে বলে।অথচ বাস্তব সত্যি হচ্ছে, সে একজন অপরাধি ছিল্‌ দাগী অপরাধি।

(চলবে)

বিভাগ: 

Comments

ড. লজিক্যাল বাঙালি এর ছবি
 

পড়লাম। ভাল লাগলো

আমার ফেসবুকের মূল ID হ্যাক হয়েছিল ২ মাস আগে। নানা চেষ্টা তদবিরের পর আকস্মিক তা ফিরে পেলাম। আমার এ মুল আইডিতে আমার ইস্টিশন বন্ধুদের Add করার ও আমার ইস্টিশনে আমার পোস্ট পড়ার অনুরোধ করছি। লিংক : https://web.facebook.com/JahangirHossainDDMoEduGoB

===============================================================
জানার ইচ্ছে নিজেকে, সমাজ, দেশ, পৃথিবি, মহাবিশ্ব, ধর্ম আর মানুষকে! এর জন্য অনন্তর চেষ্টা!!

 

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

গোলাম সারওয়ার
গোলাম সারওয়ার এর ছবি
Offline
Last seen: 4 দিন 20 ঘন্টা ago
Joined: শনিবার, মার্চ 23, 2013 - 4:42পূর্বাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

কু ঝিক ঝিক

ফেসবুকে ইস্টিশন

SSL Certificate
কপিরাইট © ইস্টিশন.কম ® ২০১৬ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর