নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 5 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • রাজর্ষি ব্যনার্জী
  • দ্বিতীয়নাম
  • নিঃসঙ্গী
  • সাইয়িদ রফিকুল হক
  • মিঠুন বিশ্বাস

নতুন যাত্রী

  • চয়ন অর্কিড
  • ফজলে রাব্বী খান
  • হূমায়ুন কবির
  • রকিব খান
  • সজল আল সানভী
  • শহীদ আহমেদ
  • মো ইকরামুজ্জামান
  • মিজান
  • সঞ্জয় চক্রবর্তী
  • ডাঃ নেইল আকাশ

আপনি এখানে

যাপিত জীবনের পোড়া-ক্ষতে রঙ্গমঞ্চের জীবন!


(১)
উথালপাতাল মন খারাপ হলে পরে অকারণ হাঁটাহাঁটি করতাম। বিরামহীন হাটতাম। সিলেট উপশহর থাকাকালীন এই রাতবিরেত হাঁটার কারণে বার কয়েক পুলিশ-র‍্যাবের দৌড়ানিও খেয়েছি। আম্বরখানায়ও এরকম হয়েছে। উপশহর, শিবগঞ্জ বা আম্বরখানা থাকাকালীন সাধারণত রাতের খাবার খেয়ে হাঁটতে বেরুতাম। এদিকওদিক হয়ে কীভাবে জানি শেষ গন্তব্য হতো হয় কদমতলি বাসস্ট্যান্ড নয়তো সিলেট রেল স্টেশন। মাঝেমধ্যে কাজিরবাজারের দিকে যেতাম। ওদিকে কিছু ছোটোখাটো রেস্টুরেন্ট সারারাত খোলা থাকে। আর সারারাত-ই টিভিতে বাংলা সিনেমা চলে। এক কাপ চা নিয়ে ঘন্টা দেড়েক অনায়েসে বসা যায়। সাথে যদি দু'একটি সিগারেট ক্রয় করা হয় দোকানি সাধারণত আর কিছু বলার সাহস পেতো না। নদীর ওপাড়েও এইরকম বহু রেস্টুরেন্ট আছে তবে ঠিক এইরকম নয়। খাওয়াদাওয়াটাই মুখ্য লক্ষ্য তাদের। বন্দরবাজারের কিছু রেস্টুরেন্টও সেইরকম। কাজিরবাজারের নদীর পাড় দখল করে বাঁশের উপর তৈরি এসব রেস্টুরেন্টগুলিতে হরেক কিসিমের লোক থাকতো। বেশিরভাগ শ্রমজীবী। রিকশা-ভ্যানচালক থেকে পান-সুপারি বিক্রেতা, ধানের কারবারি, মাছ বিক্রেতা কিংবা মধ্যসত্ত্বভোগী কে নেই! রাজনীতি অর্থনীতি হয়ে ঘরসংসার থেকে নতুন নায়ক কাজী মারুফ সবই আলোচনা হতো। মোদ্দাকথা আমার এতটুকু হেঁটে আসার পেছনে এঁরাও আছেন। হাতে টাকাকড়ি থাকলে অবশ্য চুক্তি করে ঘন্টা হিসেবে রিকশা নিতাম।

(২)
তবে বৃহস্পতিবার আসলে আমি দরগার গান-বাজনা আর দূর-দূরান্তের মানুষ দেখেই রাত কাটাতাম। খুব কম বৃহস্পতিবারই আমি দরগার গানবাজনায় অনুপস্থিত থেকেছি। উরস অবশ্য এড়িয়ে চলতাম। ভয়ানক ভীড়ের কারণে উরসে মন চাইলেও যেতে পারতাম না। উরসের সময় আম্বরখানায় নিজেদের বাসা-বাড়িতেও টিকে থাকা দায় ছিলো। দরগায় যারা নিয়মিত গান করতো এঁদের কমবেশ আমি চিনি। আমার কিছু বন্ধু-বান্ধবও এঁদের চিনে। বিশেষ করে শিল্পী ফরিদার কন্ঠের গান শাহজালালের দরগায় যারা বৃহস্পতিবার রাত্রে গিয়েছেন, তারা শুনে থাকবেন। বোধকরি অনেকেই তাঁর গলার গান মনেও রাখবেন। মনে রাখার মতোই গান গান তিনি। যেদিন মন-মেজাজ ভালো থাকে সেদিন দর্শকদের তো নড়ার জো নেই!

(৩)
এমনি এক বৃহস্পতিবারে আসন্ন শীতের রাতে আমি গায়ে হালকা শীতের কাপড় জড়িয়ে দরগায় একেকটি গানের দলের পরিবেশনা ঘুরে ঘুরে দেখছি। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। থেমে থেমে ইলশেগুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। যার কারণে দর্শনার্থীর সংখ্যা কম। দরগার প্রফেশনাল ভিক্ষুক আর আমার মতো জনা পঞ্চাশেক অতি উৎসাহী ছাড়া আর কেউ খুব একটা নেই। ছাড়া ছাড়া গানবাজনা হচ্ছে। ঠিক জমছে না! কার্ত্তিকের রাত। আকাশ বেশ অন্ধকার। শিল্পী ফরিদা যে দলের হয়ে আসতেন আজ সে দল অনুপস্থিত। একই জায়গায় আরেকটি নতুন দল। একজন বয়স্ক মহিলা বসে বসে পান চিবুচ্ছেন আর আরেকজন মধ্য বয়সী লোক টানা গেয়ে যাচ্ছেন। আব্দুল করিম থেকে কারি আমির উদ্দিন আছেন তাঁর কন্ঠে। তবে আহামরি কিছু নন। চলে এই-ই।

(৪)
ভাবছি আজ আর রাত জাগার কোনো মানে নেই। ভিড়ও কমে আসতেছে। গানবাজনাও থেমে থেমে হচ্ছে। নাহ এবার বাসায় ফিরে ঘুম দেওয়া দরকার। এইরকম ভাবতে না ভাবতেই দেখি একটি ভরাট সুরেলা গলার প্রচলিত বিচ্ছেদী ধারার গান ভেসে ভেসে আহবান করছে! সত্যিই পা থমকে গেছে। এই গানটি প্রচলিত ধারার হলেও গলায় তোলা বেশ সাধনার ব্যাপার। উচ্চাঙ্গ ধাঁচের সুরেলা গলার গান। অগত্য এগিয়ে গেলাম। ফরিদার স্থলে সেই পান চিবুনো মহিলা। চোখমুখ বুজে বসে বসে আপনমনে গান গাইতেছেন। একদম গানের ভেতর ডুবে আছেন। প্রার্থনায়ও এমন নিবিড় একাগ্রতা থাকে কী না সন্দেহ আছে। মাঝেমধ্যে চোখ খুলছেন বটে তবে তা গানের কথাগুলি দেখার জন্য কিংবা অভ্যেসমতো কারণে।

(৫)
কাঁচাপাকা চুল। মুখে হালকা সস্তা গোছের প্রসাধন। কানে সোনার দোল, গলায়ও মনে হয় সোনার চেইন। মুখে বয়সের চাপ স্পষ্ট। আলো স্বল্পতার কারণে উজ্জ্বল শ্যামলা মনে হলেও ভদ্রমহিলা আসলে ফর্সা। এখনো যথেষ্ট সুন্দরী। এককালে ডাকসাইটে সুন্দরী ছিলেন বুঝা যায়। অবচেতন মনে বারবার সামনের চুল পেছন দিকে টেনে নেন। এটি অভ্যেস মনে হয়। এভাবে পরপর কয়েকটি গাইলেন। প্রায় সবগুলোই বিচ্ছেদী। এক পর্যায়ে দর্শকরা ভিড় হই-হট্টগোল শুরু করে দেয়। গান থামিয়ে বলেন, চা পান করে আবার হবে। এর মধ্যেই দেখি তাঁদের দলের আগের ওই শিল্পী তাঁকে রুবি'দি বলে সম্বোধন করলেন। কেমন যেনো স্মৃতিচাপা মরচেপড়া শৈশব উঁকি দিচ্ছে। মনে হচ্ছে তাঁকে আমি চিনি। মনে হচ্ছে এই সেই সেদিনের সেই রুবি মাসি। সেই রুবি মাসি কী!?

(৬)
আসলে ভেতরে ভেতরে অস্থিরতা কাজ করছে। বেশ উত্তেজনা কাজ করছে। কেনো জানি মনে হচ্ছে শৈশবের সেই যাত্রাপালার অভিনেত্রী রুবি মাসি-ই হবেন এই মহিলা। রাত প্রায় আড়াইটে বাজে। গান না হওয়াতে এই ফাঁকে দর্শক সংখ্যাও কমেছে। কিভাবে জানি না একটু এগিয়ে গিয়ে এঁদের দলের একজনকে বললাম এই শিল্পী কি একসময় যাত্রাপালা করতেন? রুবি আচমকা বললেন হ্যাঁ, তাতে কার বাপের কী শুনি!? কে বলছে, সামনে আসো দেখি! আমি আসলে ততক্ষণে ঘেমে-নেয়ে একাকার। আর ততক্ষণে কীভাবে জানি আসলে তাঁর সামনেই আমি চলে গেছি। একদম মুখোমুখি। আশেপাশের লোকজন এসব দেখে কেউ কেউ হাসছে। কেউকেউ হয়তো মিটিমিটি তাকিয়ে অন্য অনেক কিছু ভাবছে। আমি এরমধ্যে আমার পরিচয় দিয়ে ফেলেছি। রুবি মাসি অবাক হয়ে হাত ধরে আছে। বার কয়েক গালেও হাত দিয়েছেন। ছোট্টবেলায় কেউ গালে হাত দিলে ভীষণ রাগ হতো। তবে সব নয়। রুবি মাসি সহ অন্য অনেকের জন্য সেটি ছিলো নিয়মের বাইরে। বরং এঁরা গাললে হাত দিলে খুশি হতাম। তো তাঁর সাথে সে রাতে ভোর প্রায় ছ'টা অবধি ছিলাম আমি। এক ফাঁকে আমরা অনেক্ষণ ধরে আলাপ করলাম। ততক্ষণে বৃষ্টিও ধরে আসছিলো। অন্যদিকে সকালও প্রায় হতে চললো। পাশেই একটি রেস্টুরেন্টে সব আলাপ হলো। রুবিরা মা মেয়ে আর নানি এই তিনজন ছিলেন। নানি তখন আশি ছুঁই ছুঁই। কিন্তু দেখে বুঝার উপায় নেই। মাইলের পর মাইল হাঁটতে পারতেন। তাঁর মায়ের বয়স তখন তাঁর এখনকার বয়সের সমান বৈ কম হবে না। নানি এককালে বেশ দেখতে ছিলেন বুঝা যেতো। মা ছিলেন উজ্জ্বল শ্যামলা। এই তুলনায় রুবি ছিলেন যথার্থ সুন্দরী যাকে বলে। লম্বা ঘন কালো চুল। সামনের দিকে অবশ্য বব কাট মতো ছিলো। চোখ এখনো বড় বড় দেখতে। উজ্জ্বল ফর্সা ছিলেন। লম্বায় গড়পড়তা হলেও কেমন যেনো একটু লম্বা বেশিই লাগতো। সব মিলিয়ে পাড়াগাঁয়ে ব্যাটাছেলেদের মাথা খারাপ আর বুড়োহাবড়াদের অক্ষম খিস্তিখেউর কমবেশি সর্বত্রইই ছিলো।

(৭)
আমাদের অজপাড়া গাঁয় তখন এরকম ভাড়া করে থাকার প্রচলন খুব বেশি দিন হয় নি। এর মধ্যে এঁরা সবাই মেয়ে। তার ওপর যাত্রাপালা করেন। ঠিক বাজারও নয় আবার গ্রামেও নয় মাঝামাঝি একটি স্থানে ঘরভাড়া নিয়ে থাকেন। কথা হলো আশেপাশের চারগ্রামের লোকজনের যাতায়াত ওদিকেই বেশি। সুতরাং আলোচনা থেকে রাতবিরেত আনাগোনা বেশিই হতো। আমি আমরা তখন অনেকেই স্কুলে যাই নি, যাবো যাবো করছি। মক্তবে যাই। মক্তব ফেরত মাঝেমধ্যে ওদিকেও ঢুঁ মারি। এইরকম কোনো এক শীত সকালে রুবি আমাকে দেখে কাছে টেনে নেন। আদর করে চকলেট চা বিস্কুট খাওয়ান। যাত্রাশেষে হরেকরকম খেলনাও নিয়ে আসেন। মায়ের মারধর উপেক্ষা করে আমি ও বাল্যবন্ধু জাফর প্রায়ই নিয়মিতই যেতাম। টেপ রেকর্ডারে যাত্রাপালা শোনা আর ক্যাসেটে গান। এঁদের ডুয়াল টেপ রেকর্ডার ছিলো। এটাই মূল কারণ ছিলো। বারো ভল্টের বড় রিচার্জ ব্যাটারি দিয়ে লাউডলি শুনতাম। রুবির মণি কিশোর প্রিয় ছিলো।

(৮)
যাইহোক একদিন কোনো এক সকালে হইচই শুনে বাইরে বেড়িয়ে শুনি রুবিরা পালিয়েছে। নানি, মা ও রুবি। শুধু এই না বড়লোকের জওয়ান ছেলে হামিদকে নিয়ে পালিয়েছে। সবাই বলাবলি করছিলো যে, এরা এভাবেই শিকারকে খপ করে ধরে পালায়। এরা ডাইনি। এরা ছ্যানালিপনাতে এক নম্বর! এরা যাদু জানে। কামরুপ কামাক্ষ্যার নাগিন এরা। যাকে ধরে চিড়েচ্যাপটা করে খুবলে খুবলে খায়! এইসব কথা শোরগোল বেশ ক'মাস ছিলো। একদিন আমারও বিশ্বাস হয় যে, আসলেই, এঁরা এরকমই!

(৯)
সেই প্রেম-ভালোবাসায়ও একদিন ভাঁটা আসে। হামিদ নেশাভাং করে। অত্যাচার করে। জমানো টাকা একে একে খরচ করে করে প্রায় নিঃস্ব। রুবির কষ্টের টাকায় টান পড়ে। মায়ের হাড়ভাঙা কষ্টের টাকায় গিয়ে হাত পরে। না দিলে মারধোর চলে। এর মধ্যেই নানি বিগত হয়েছে। শরীর ভাঙে। আয়রোজগারও কমে। হামিদ একসময় মুখ ফিরিয়ে নেয়। যাত্রা থেকেও কালেভদ্রে ডাক আসে। হামিদ অন্য দলে ভীড়ে যায়। নতুন মেয়ে খুঁজে পায়। চোখের পানি মুছে বললেন, 'খুবলে খুবলে খেয়ে আমাকে নিঃস্ব করেছে সে। এখন সে নতুন দল করেছে।' এদিকে রুবির মাও ধুঁকে ধুঁকে গতো হয়েছেন। নিঃসন্তান, একাকী রুবি। যখন যেভাবে সুযোগ পান বেঁচে থাকার তাগিদে তাই করেন। গান হলে গান, যাত্রা হলে যাত্রা।

(১০)
রাতের কড়ানাড়া শেষ, ভোরের আলো ফুঁটে উঠেছে। প্রভাত রুবিদের স্পর্শ না করলেও নিয়ম মেনে আমাদের উঠতেই হয়। ততক্ষণে বিষাদ ছুঁয়ে গেছে সমস্ত অন্তরমন। সিএনজি পর্যন্ত এগিয়ে দেই রুবিদের। ক্লান্তশ্রান্ত শরীরে তিনি হাত নাড়েন। আমিও হয়ত হাত নাড়ি। তখন বিষাদগ্রস্থ মনে বাসার দিকে হাঁটতে হাঁটতে রুবির গাওয়া ওই গানটি-ই কানে বার বার বেজেই চলেছে, বেজেই চলেছে...

"বড়ো বিশ্বাস কইরা জায়গা দিলাম রে
ওরে আমার বুকেরও উপরে
আমি আপন কইয়া সব দিছি তোমারে
আমার বন্ধুরে আপন কইয়া সব দিছি তোমারে।

পিরিত যদি না করিতাম ওরে আমি না হইতাম দোষী
এখন কেনো সকল সময় চোখের জলে ভাসি
আমি হাসিতে কিনার হারাইলাম রে
এখন ওকুল জলে ভাসি।

বড়ো বিশ্বাস কইরা জায়গা দিলাম রে
ওরে আমার বুকেরও উপরে
আমি আপন কইয়া সব দিছি তোমারে
আমার বন্ধুরে আপন কইয়া সব দিছি তোমারে।।"

Comments

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

মনির হোসাইন
মনির হোসাইন এর ছবি
Offline
Last seen: 2 weeks 6 দিন ago
Joined: শনিবার, এপ্রিল 20, 2013 - 10:17অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

ফেসবুকে ইস্টিশন

কপিরাইট © ইস্টিশন ব্লগ ® ২০১৮ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর