নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

There is currently 1 user online.

  • উদয় খান

নতুন যাত্রী

  • চয়ন অর্কিড
  • ফজলে রাব্বী খান
  • হূমায়ুন কবির
  • রকিব খান
  • সজল আল সানভী
  • শহীদ আহমেদ
  • মো ইকরামুজ্জামান
  • মিজান
  • সঞ্জয় চক্রবর্তী
  • ডাঃ নেইল আকাশ

আপনি এখানে

অপারেশন জ্যাকপটঃ এক দুর্ধর্ষ নৌ-কমান্ডো অভিযান (চট্টগ্রাম)


১৩ আগস্ট, ১৯৭১ । ট্রানজিস্টার অল ইন্ডিয়া রেডিওর কলকাতা কেন্দ্রের ফ্রিকুয়েন্সিতে সেট করে উদগ্রীব হয়ে কান পেতে আছেন কজন নৌ-কমান্ডো । রেডিওতে ভেসে এল-“আমি তোমায় যত শুনিয়েছিলাম গান, তার বদলে চাইনি কোন দান ।” শুরু হয়ে গেল প্রস্তুতির তোড়জোড় । এখন শুধু পরের সিগন্যালের অপেক্ষা । নির্দিষ্ট দিনের একদিন পর পাওয়া গেল দ্বিতীয় সিগন্যাল । ১৫ আগস্ট, সকাল ৭টা ৩০ মিনিট ।অল ইন্ডিয়া রেডিও থেকে ভেসে এল-“আমার পুতুল আজকে প্রথম যাবে শ্বশুর বাড়ি ।” এবার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আঘাত হানতে হবে ।১৫ আগস্ট রাত ২টায় কেঁপে উঠলো বন্দর নগরী চট্টগ্রাম । ভোরে কেঁপে উঠলো মংলা, নারায়ণগঞ্জ ও চাঁদপুর । সফল হল এক বিশ্বখ্যাত দুর্ধর্ষ সুইসাইডাল মিশন- অপারেশন জ্যাকপট ।

মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করার উদ্দেশ্যে ’৭১ এর ১১ জুলাই জনাব তাজউদ্দীন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে নৌ-কমান্ডোদের ১০ নম্বর সেক্টরে রাখা হয় । এই সেক্টরের কর্মকাণ্ডের কোন নির্দিষ্ট সীমানা ছিল না। যেই অঞ্চলে অপারেশন চালাত সেই অঞ্চলের সেক্টরের অধীনে এরা কাজ করত; জবাবদিহিতাও থাকত ঐ সেক্টর প্রধানের । অধিবেশনে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শুরু হয়ে গেল নৌ-কমান্ডো গঠনের কাজ । ভারতীয় নৌবাহিনীর অফিসারেরা বিভিন্ন যুব ক্যাম্প ঘুরে রিক্রুট করতে থাকেন সুঠামদেহী দক্ষ সাঁতারুদের । C2P সাংকেতিক নাম নিয়ে প্রথম ক্যাম্প স্থাপন করা হয় পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার ভাগীরথী নদীর তীরে ঐতিহাসিক পলাশীর প্রান্তরে । ১৩মে ১৫০ জন প্রশিক্ষণার্থীদের নিয়ে C2P ক্যাম্পটির যাত্রা শুরু হয় । মুক্তিবাহিনীর ফ্রগম্যান কোর প্রাথমিকভাবে গঠিত হয়েছিল ১৬ জন দক্ষ নাবিক নিয়ে । যাদের ৮ জন ছিলেন ফ্রান্সের “তুলঁ” পোতাশ্রয়ে নোঙ্গর করা পাকিস্তানি সাবমেরিন “ম্যানগ্রো” থেকে পালিয়ে আসা, বাকি ৮ জন ছিলেন দেশের বিভিন্ন বন্দরে কর্মরত বাঙালি নাবিক । উল্লেখ্য- ১৬ই মে ভারতীয় সেনাবাহিনী বিএসএফ-এর কাছ থেকে বাংলাদেশ সম্পরকিত ঘটনাবলীর দায়িত্ব বুঝে নেয়।
ততদিনে প্রতিরোধমূলক যুদ্ধ থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে গেছে । জুলাইয়ের আগ পর্যন্ত বিচ্ছিন্নভাবে দেশের ভিন্ন স্থানে খণ্ডযুদ্ধ সংগঠিত হয়ে আসছিল । গেরিলাদের ছোটখাটো আক্রমন এবং বর্ডার অঞ্চলে ছোট সংঘর্ষের প্যাটার্ন ততদিনে পাকিস্তানিদের কাছে পরিচিত হয়ে উঠেছে । কোন গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে তখনও কোন ধরণের হামলা পরিচালিত হয়নি । জলপথে পাকিস্তানিদের বৈদেশিক বাণিজ্য ও যুদ্ধ সরঞ্জাম আনা-নেওয়া সম্পূর্ণ স্বাভাবিক । ক্রমশঃ আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ স্তিমিত হয়ে আসছিল । সামরিক জান্তা বিশ্বব্যাপী জোর প্রোপ্যাগান্ডা চালাচ্ছে- বর্ডার অঞ্চলে কিছু বিচ্ছিন্নতাবাদীদের তৎপরতা ছাড়া দেশের আভ্যন্তরীণ অবস্থা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ।এ অবস্থায় দরকার ছিল বড় কিছু করা যা বিশ্ববাসীর নজর আমাদের দিকে ফেরাবে । একই সাথে দরকার ছিল পাকিস্তানিদের একটা ভয়াবহ নাড়া দেওয়া । সিদ্ধান্ত হল অপারেশন জ্যাকপটের ।
গুরুত্ব উপলব্ধি করে ২টি সমুদ্রবন্দর(চট্টগ্রাম এবং মংলা) ও ২টি নদীবন্দর(নারায়ণগঞ্জ ও চাঁদপুর) প্রাথমিকভাবে এই অপারেশনের আওতায় আনা হয় ।অপারেশন জ্যাকপটের আওতায় চট্টগ্রাম বন্দর অভিযানের জন্য প্রস্তুত কমান্ডো দলের দায়িত্ব বুঝে দেওয়া হয় ফ্রান্স থেকে ডিফেক্ট করে আসা সাবমেরিনার আব্দুল ওয়াহেদ চৌধুরীকে ।
চট্টগ্রাম বন্দর অভিযানের পরিকল্পনা করেন ১নং সেক্টরের কমান্ডার, ২৫শে মার্চের প্রথম প্রতিরোধের নায়ক ক্যাপ্টেন রফিকুল ইসলাম বীরোত্তম এবং মিত্র বাহিনীর
পূর্ব অঞ্চলের ডেল্টা সেক্টরের কমান্ডার, ভারতীয় সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার সাবেগ সিং । যাচাই বাছাই করা হয় নদীর সম্ভাব্য গতিপথ, আশ্রয়স্থল, মানচিত্র,
টাইডাল চার্ট । নির্ধারণ করা হয় বিশেষ সাংকেতিক নির্দেশনা । কমান্ডোদের চেনার কোড ওয়ার্ড ছিল “গোলাপফুল”। সংকেত দেওয়া হত বিড়ি জালিয়ে বা হাঁচি-
কাশি দিয়ে । পাশাপাশি ঠিক করে রাখা হয় কমান্ডোদের নিরাপদ প্রত্যাগমনের পথ আর নিয়োগ দেওয়া হয় সাহায্যকারী পথ প্রদর্শক ও অঞ্চলভিত্তিক গেরিলা দল।

ওদিকে আগস্ট মাসের আগেই লে. সুবীর কুমার দাস চট্টগ্রাম ও মংলা পোর্ট এলাকা রেকি করে আসেন । এই সকল ঘটনা ঘটে অতি গোপনে । যুদ্ধকে কেন্দ্র করে এসপিওনাজ জগতে র, আইএসআই, সিআইএ, কেজিবি-র মধ্যে জমে উঠেছে আরেক গোপন খেলা । উপমাহদেশ জুড়ে তো বটেই এমনকি চূড়ান্ত গোপনীয়তার মাঝেও খোদ পলাশীর প্রান্তরে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয় । এক হতভাগা তো জলজ্যান্ত ক্যামেরাসহ ধরা পড়েছিল কমান্ডোদের সাঁতারের ট্রেনিঙের সময়! অপারেশনের ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে ট্রেনিঙের সময় গ্রুপ লিডার বাদে কমান্ডোদের পর্যন্ত জানানো হয়নি কী ঘটতে যাচ্ছে; হাই কমান্ডের কড়া নির্দেশ ।২আগস্ট কমান্ডরা পলাশী ত্যাগ করে ডাকোটা বিমানযোগে পৌঁছান ত্রিপুরার আগরতলায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নির্মিত গোপন বিমানঘাঁটিতে । সেখান থেকে হরিণা ক্যাম্প ।
৮আগস্ট । শুরু হল অভিযানের আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতি । ৬০ জনের দলকে ২০ জন করে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয় । টার্গেট- চরলাক্ষা ।১নং ও ২নং গ্রুপ যাবে স্থলপথে । মিরেশ্বরাই, সীতাকুণ্ডু ও চট্টগ্রাম শহর হয়ে কর্ণফুলীর পূর্বপাড়-চরলাক্ষায় । ৩নং দল যাবে নৌকাযোগে । পথে বিরতির জন্য তাদের দেওয়া হয় কিছু গেরিলা বেস ক্যাম্পের ঠিকানা এবং পথপ্রদর্শক ।

হামলার দিন ঠিক করা হয়েছিল পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস- ১৪ই আগস্ট । কিন্তু এসপিওনাজ জগতে বাতাস পর্যন্ত ঘুষ খেয়ে খবর পাস করে । গুজব ছড়াল- মুক্তিবাহিনী এদিন দখলদারদের উপর প্রচণ্ড হামলা চালাবে। সতর্ক হয়ে উঠলো দখলদারেরা । চট্টগ্রাম শহরের মোড়ে মোড়ে চেকপোস্ট বসানো হল। শুরু হল বাড়ি বাড়ি তল্লাশি । এদিকে আবার আরেক দুশ্চিন্তা দেখা দেয় । ১৩ তারিখে ৩ নং দলের চরলাক্ষার পূর্ববর্তী ঘাঁটিতে পৌঁছানোর কথা থাকলেও সময়মত পৌছুতে পারেনি । ওদিকে আঘাত হানার সময় ঘনিয়ে আসছে ।১ আর ২ নং দল আপাতত যাত্রার প্রস্তুতি নেয় । প্রথমত অস্ত্রশস্ত্র চরলাক্ষাতে নিয়ে যেতে হবে । ওদিকে কাকলীতে অবস্থানকালে ১৩ তারিখে পাওয়া যায় প্রথম সিগন্যাল- অল ইন্ডিয়া রেডিওতে পঙ্কজ মল্লিকের গাওয়া “আমি তোমায় যত শুনিয়েছিলাম গান” । শত্রুরা রেডিও সিগন্যাল ইন্টারসেপ্ট করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। একারণেই সরাসরি কমান্ডের বদলে গানের মাধ্যমে সিগন্যাল ট্রান্সফার করা হয় । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি বাহিনীর বিরুদ্ধে মিত্রবাহিনী একই পদ্ধতির আশ্রয় নিয়েছিল ।
নগরে অবস্থানরত মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা অস্ত্র চরলাক্ষাতে নিতে এক অভিনব পদ্ধতির আশ্রয় নেয় । অস্ত্রগুল শহরের ভেতর দিয়ে নিয়ে আসা হয় এম্বুলেন্স আর বিদ্যুৎ বিভাগের গাড়িতে করে । সেগুলো আবার কর্ণফুলী পার করাতে আরেক পদ্ধতির আশ্রয় নিতে হয়। কমান্ডরা হাটুরের বেশে আলু-পটলের ঝুড়ির নিচে অস্ত্রশস্ত্রসহ পাকিদের নাকের ডগা দিয়ে নৌকাযোগে কর্ণফুলী পার হয়ে যায় । অস্ত্রের মধ্যে ছিল ৮০টি লিমপেট মাইন, ৪০ জোড়া ফিন, ৮০টি গ্রেনেড এবং বেশকিছু ড্যাগার এবং সুইমিং কস্টিউম । মাইনগুলো অনেকটা “লিমপেট” শামুকের মত দেখতে । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুগস্লোভিয়াতে তৈরি এই অব্যবহৃত মাইনগুলি ভারত বাংলাদেশে নৌ-কমান্ডোদের ব্যবহারের জন্য সংগ্রহ করে । এক্সপ্লোসিভ এক্সপার্টেরা কিছু কাঠামোগত পরিবর্তন এনে এগুোলকে ব্যবহার উপযোগী করে ।

লিমপেট মাইন

১৪ই আগস্ট ২টি দল চরলাক্ষাতে অবস্থান করছে । ওদিকে তৃতীয় দল এসে পৌঁছেনি । কমান্ডারেরা কান পেতে আছেন অল ইন্ডিয়া রেডিওতে ।কিন্তু না, দ্বিতীয় সিগন্যাল এল না । প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাবের কারণে দলগুলোর ভেতরকার কমিউনিকেশন গ্যাপ আর পাকিস্তানিদের অতি সতর্ক অবস্থার কারণে অপারেশনের সময় একদিন পিছিয়ে যায় ।১৫ই আগস্ট সকাল ৭টা ৩০ মিনিট । পাওয়া গেল সেই কাঙ্ক্ষিত সংকেত- সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া “আমার পুতুল আজকে প্রথম যাবে শ্বশুর বাড়ি” । ১৫ তারিখের সূর্য বিদায় নেওয়ার সাথে সাথে শুরু হয়ে গেল অপারেশনের প্রস্তুতি । শেষ পর্যন্ত অভিযানে অংশ নেওয়া কমান্ডোদের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩১ জন। তাঁরা ৩জন করে দশটি গ্রুপে ভাগ হয়ে যান ।
রাত ১টা । জোয়ার-ভাটার সন্ধিক্ষণ । একটু পরেই শুরু হবে ভাটার টান । তার আগেই কাজ সারতে হবে । নইলে ভাটার টানে সাগরে ভেসে যেতে হবে। কর্ণফুলীর তীর থেকে কমান্ডোরা নেমে পড়লেন পানিতে । তাঁরা জানতেন- কেউ কেউ হয়তো ফিরবেন না; অথবা সবাই । কিন্তু তাঁরা তো পলাশীর ময়দান থেকেই মাথায় কাফনের কাপড় জড়িয়ে এসেছেন । ভয় কিসের! প্রত্যেকের বুকে গামছা দিয়ে একটি করে লিমপেট মাইন বাধা, কোমরে ড্যাগার । পায়ের ফিন নেড়ে সাঁতরে চললেন লক্ষ্যবস্তুর দিকে। তিন জনের প্রতিটি গ্রুপ হাতে হাত বেধে সাঁতরে চলেছেন । তীরে গেরিলারা ভারি মেশিনগান নিয়ে কাভারিং ফায়ার দেওয়ার জন্য প্রস্তুত। নদীতে টহল দিচ্ছে এক ডজনের বেশি; ৪টি গানবোটসহ বেশকিছু টহল নৌযান ।
১৪ই আগস্ট বড় কিছু ঘটতে যাচ্ছে এমন সংবাদে ১৪ই আগস্ট পাকিস্তানিরা ছিল সর্বচ্চো সতর্ক অবস্থায় ।কিন্তু ঐদিন কিছুই ঘটে নি ।তার উপর ছিল স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের চাপ । দ্বিমুখী চাপ সামলাতে গিয়ে পাকিস্তানীদের নাকে-মুখে অবস্থা । ফলে দীর্ঘ ২৪ ঘণ্টা টান টান স্নায়ুচাপের উপর থাকায় ২৫ তারিখ রাতে একটু স্বস্তির বাতাসে সান্ত্রীরা গা এলিয়ে থাকে । তার উপর ঝুম বৃষ্টির রাত, সার্চ লাইটের আলো বেশিদুর কাভার দিতে পারছে না । সকলের চোখ ঘুমে ঢুলু ঢুলু ।
আসল ঘটনা ঘটে চলেছে কর্ণফুলীর কালো পানির নিচে । জোয়ার-ভাটার সন্ধিক্ষণে স্রোতের টান কম । কমান্ডোরা ততক্ষণে সহজেই পৌঁছে গেছেন লক্ষ্যবস্তুর কাছে । কোমর থেকে ড্যাগার বের করে চেঁছে পরিষ্কার করে ফেললেন জাহাজের খোলে জমে যাওয়া শেওলা । জাহাজের পরিষ্কার খোলে আটকে গেল লিমপেট মাইনের শক্তিশালি চুম্বক । ১০,৪১০ টন সামরিক সরঞ্জাম বহনকারী এমভি আল-আব্বাস, ৯,৯১০ টন সমরসম্ভার বহনকারী এমভি হরমুজ, ২৭৬ টন গোলাবারুদ বহনকারী ৬নং ওরিয়েন্টাল বার্জ- সবকটির নিচে তখন যমদুতের ভৌতিক ছায়া । কমান্ডোরা মাইনের ডেটোনেটর ও স্ট্রাইকারের মধ্যকার রাবার ক্যাপ ও সেফটি পিন টান দিয়ে বের করে নিলেন । কাজ শেষ । হাতে সময় ৪০-৪৫ মিনিট । এবার ভাটার টানে ভেসে যেতে হবে, যতদুর সম্ভব ।
রাত সোয়া ২টা ।প্রথম বিস্ফরনে বিকট শব্দে থরথরিয়ে কেঁপে উঠলো বন্দর নগরী চট্টগ্রাম। পরক্ষণেই আরেকটি । পর পর আরও কয়েকটি বিস্ফোরণ । বিস্ফোরণের তীব্রতায় মূর্তিমান আতঙ্কের মত পোর্টে সাইক্লোন শুরু হয়ে গেল, পানির স্তম্ভ লাফিয়ে উঠতে থাকল ৩০-৪০ ফুট উচ্চতায় । ৬নং ওরিয়েন্টাল বার্জ দেখতে দেখতে তলিয়ে যায় । ধীরে ধীরে দুবতে থাকে হরমুজ ও আল-আব্বাস । পাকিস্তানিরা ততক্ষণে তাৎস্বরে বাপ-মাকে ডেকে চলেছে । শুরু হয়ে গেল চারদিকে এলোপাতাড়ি মেশিনগানের গুলিবর্ষণ । ওদিকে ভয়ে কেউ ডুবতে থাকা জাহাজের কাছে ভিড়ছে না । পানির নিচে ভৌতিক আতংক বিরাজ করছে । অসহায় চোখে দেখতে থাকল কয়েকশো মিলিয়ন ডলারের যুদ্ধসম্ভার নিয়ে ডুবতে থাকা জাহাজগুলোকে ।ওদিকে মুখে স্বস্তির হাসি টেনে স্রোতের টানে ভেসে চলেছেন সুইসাইডাল মিশনে আসা আমাদের ৩১জন দুর্ধর্ষ নৌ-কমান্ডোরা!

ফলাফলঃ বিস্ফোরণে বন্দরের থেকেও সবথেকে বড় ঝাঁকিটা খেয়েছিলেন স্বয়ং টিক্কা খান । ঐদিনই সকাল ১১টায় বিমানে করে চট্টগ্রাম পৌছান । ততক্ষণে ৩০ মিনিটের নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞে বন্দর লণ্ডভণ্ড ।১৫ই আগস্ট চট্টগ্রাম বন্দরের ১০টি টার্গেট সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয় । তিনটি বড় বড় যুদ্ধ সরঞ্জামবাহী জাহাজ দুবে গিয়ে সর্বচ্চো পরিমাণ ক্ষতি সাধিত হয়ঃ
1. এম ভি হরমুজ- ৯,৯১০ টন অস্ত্রসম্ভারবাহী এই জাহাজটি ১৩ নং জেটিতে নোঙর করা ছিল।
2. এম ভি আল-আব্বাস - এটি ১০,৪১ টন সামরিক সরঞ্জাম নিয়ে ৯ আগস্ট ১২ নং জেটিতে অবস্থান নেয়।
3. ওরিয়েন্ট বার্জ নং ৬ - এটি ২৭৬ টন অস্ত্র, গোলাবারুদ নিয়ে “ ফিস হারবার” জেটির সামনে অবস্থান করছিল।
ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে পাকিস্তান নেভীর দুটি গানবোটও ছিল ।
ভোর ৫টার দিকে খবর পৌছুল ঢাকাস্থ ইস্টার্ন কমান্ডের হেডকোয়ার্টারের অপারেশন রুমে । খবর শুনে স্টাফ অফিসারদের তিন পুরুষের পিলে চমকে উঠলো ।বিস্তারিত খবর সংগ্রহ না করেই তারা ব্যাপারটা কোর কমান্ডারের হাতে ছেড়ে দেয় । সূর্যোদয়ের সাথে সাথে মুক্তিবাহিনীর খোজে হেলিকপ্টার আকাশে উঠে । সমগ্র এলাকায় কারফিউ জারি করা হয় । কিন্তু ততক্ষণে কমান্ডোরা কর্ণফুলী পাড়ি দিয়ে শহরে ঢুঁকে পড়েছেন । হেলিকপ্টারের মাধ্যমে ট্রেসিঙয়ে ব্যর্থ হয়ে রাজাকারদের সাথে নিয়ে গ্রামের পর গ্রামে কম্বিং অপারেশন চালায়। মুক্তিবাহিনীর খোঁজ না পেয়ে গ্রামগুলোর উপর আন্দাজে শেলিং শুরু করে, গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেয় । শেষমেশ কিছু না পেয়ে গ্রামবাসীদের নদীর পাড়ে দাঁড় করিয়ে নির্বিচারে গুলি করে মারে । রক্তাক্ত লাশগুলো স্রোতের টানে ভেসে চলে সমুদ্রের দিকে । মেনে নিতে হয় বৃহত্তর সামষ্টিক স্বার্থের বিনিময়ে কিছু চরম ক্ষতি স্বীকার করে নেওয়ার সেই নিষ্ঠুর নীতি ।
দেশব্যাপী এরকম একটা দুর্ধর্ষ কমান্ডো অভিযান মুক্তিবাহিনী চালাতে পারে- এটা ছিল পাকিস্তানিদের চিন্তার বাইরে । আগের রণকৌশল বিশ্লেষণে বড়জোর নদীর তীর থেকে, অথবা ছোট নৌকার মাধ্যমে হালকা মেশিনগানের ফায়ারিং আশা করছিল । এরকম ভয়ংকর সুপরিকল্পিত আন্ডারওয়াটার কমান্ডো অপারেশন মুক্তিবাহিনী চালাতে পারে এটা শত্রুদের সুদূর কল্পনাতেও ছিল না । “আভ্যন্তরীণ অবস্থা স্বাভাবিক”-চিৎকার করতে থাকা পাকিস্তানিদের বড় গলা ছোট হয়ে আসে । বিশ্ববাসীর দৃষ্টি বাংলাদেশের দিকে ঘুরে যায় । পাকিস্তানিরা প্রথম প্রথম ভারতীয় নেভীর ফ্রগম্যানদের দায়ী করলেও সত্য উৎঘাটনে সময় লাগেনি ।ততদিনে দুবে যাওয়া জাহাজে পলি জমে বন্দরে প্রবেশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে । বিদেশী বাণিজ্যিক জাহাজ বন্দরে প্রবেশে অস্বীকৃতি জানিয়েছে ।

তথ্য বিভ্রান্তিঃ অপারেশন জ্যাকপট দিন-তারিখ এবং সিগন্যাল নিয়ে কিছু বিভ্রান্তি থেকে গেছে । প্রথমে ১৪ই আগস্ট অপারেশনের তারিখ নির্ধারণ করা হয় । চূড়ান্ত সিগন্যাল পাওয়ার দিবাগত রাত ১২টা ১মিনিট ছিল “জিরো আওয়ার” । ১৩-১৫ই আগস্টের মধ্যে দুটি সিগন্যাল পাওয়ার কথা ছিল । ১৩ তারিখে প্রথম সিগন্যাল পাওয়া গেলেও ১৪ই আগস্ট দ্বিতীয় সিগন্যাল পাওয়া যায়নি । ১নং সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন রফিকুল ইসলাম বীরত্তোম তাঁর “লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে” গ্রন্থে ১৪তারিখ সিগন্যাল না পাওয়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য গঠিত দলের ৩নং গ্রুপের চরলাক্ষাতে না পৌঁছুতে পারার ঘটনাকে । একই কারণের উল্লেখ পাওয়া যায় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক সম্পাদিত “বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র”-এর নবম খণ্ডে । কিন্তু তথ্যটি যথাযথ নয় । প্রথমত এটি ছিল একটি অতি গোপনীয় কম্বাইন্ড অপারেশন । একটি সিগনালের মাধ্যমেই ৪টি বন্দরে একসাথে অপারেশন পরিচালিত হবে । প্রতিটা গ্রুপকে অতিমাত্রায় সতর্কতা অবলম্বন করে হিট করার আগ পর্যন্ত আত্মগোপণে থাকতে হয়েছে । সেক্ষেত্রে ৩নং দল চট্টগ্রামের সলিমপুর জেলে পাড়ায় আটকা পড়েছে এটা জানার কোন পথ পরিচালকবৃন্দের ছিল না । অথবা ১০ জনের একটি ছোট গ্রুপের জন্য পুরো কম্বাইন্ড মিশন বাতিল করলেও বড় দুর্ঘটনার আশংকা থাকে । সুতরাং ৩নং গ্রুপের জন্য অপারেশন পিছিয়ে গেছে- এই ধারণাটি ত্রুটিপূর্ণ। কারণটা আজও অজানা থাকলেও ধারনা করা হয় ১৪ই আগস্ট আগাম খবর পাওয়ায় পাকিস্তানিদের অতি সতর্কতা অবলম্বনই ছিল অপারেশন পিছিয়ে দেওয়ার কারণ।কিন্তু “অ্যাকশন সিগন্যালের” সময় ১৪ই আগস্ট থেকে একেবারে ১৫তারিখ সকাল সাড়ে সাতটায় কেন পিছিয়ে নেওয়া হয়েছিল তা এখন অজানা । ১৫ তারিখ ভোরে অ্যাকশন সিগন্যাল পাওয়াতে আগের নির্দেশ অনুযায়ী “জিরো আওয়ার” বদলে গেল ইংরেজি ক্যালেন্ডারের হিসেবে ১৬ তারিখ প্রথম প্রহরে ।
অন্যদিকে দলিলপত্রের নবম খণ্ডে ও ক্যাপ্টেন রফিকুলের বইয়ে উল্লেখ আছে যে “ওয়ার্নিং সিগন্যাল” ছিল সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া “আমার পুতুল আজকে প্রথম যাবে শ্বশুর বাড়ি” এবং “অ্যাকশন সিগন্যাল” ছিল পঙ্কজ মল্লিকের গাওয়া “আমি তোমায় যত শুনিয়েছিলাম গান”। কিন্তু কমান্ডো মোঃ খলিলুর রহমান, কমান্ডো জি.এম.এ গফফার, মেজর আবদুল জলিল, সেজান মাহমুদ, কর্নেল শফিকউল্লাহসহ আরও অনেক নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় যে ওয়ার্নিং সিগন্যাল ছিল পঙ্কজ মল্লিকের “আমি তোমায় যত শুনিয়েছিলাম গান”। আর অ্যাকশন সিগন্যাল ছিল সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া “আমার পুতুল আজকে প্রথম যাবে শ্বশুর বাড়ি”

শেষকথাঃ “অপারেশন জ্যাকপট” মূলত ছিল একটি কম্বাইন্ড সুইসাইডাল কমান্ডো মিশন । এই ধরণের অপারেশন করানো হয় হাইলি ট্রেইন্ড “নেভী সীল”-দের দ্বারা । ভারতীয় নেভির হাই কমান্ড ভাবতেই পারেনি যে নিজেদের কোন লোকক্ষয় না করে অন্তত চট্টগ্রাম ও মংলা অপারেশন সফল হবে! কিন্তু অসীম সাহসী আমাদের কমান্ডোরা সপ্তাহখানেকের ট্রেনিঙয়ে এই মিশন সম্পন্ন করে শুধুমাত্র একজোড়া পায়ের ফিন-এর সাহায্যে । “অপারেশন জ্যাকপট” সফল হয় পুরোপুরিভাবে!

চট্টগ্রাম পোর্টে বিস্ফোরণে বিধ্বস্ত জাহাজ

Comments

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

নাঈম ইকবাল
নাঈম ইকবাল এর ছবি
Offline
Last seen: 1 দিন 14 ঘন্টা ago
Joined: বুধবার, এপ্রিল 13, 2016 - 9:36অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

ফেসবুকে ইস্টিশন

কপিরাইট © ইস্টিশন ব্লগ ® ২০১৮ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর