নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 4 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • রাজর্ষি ব্যনার্জী
  • বিকাশ দাস বাপ্পী
  • রসিক বাঙাল
  • এলিজা আকবর

নতুন যাত্রী

  • সাতাল
  • যাযাবর বুর্জোয়া
  • মিঠুন সিকদার শুভম
  • এম এম এইচ ভূঁইয়া
  • খাঁচা বন্দি পাখি
  • প্রসেনজিৎ কোনার
  • পৃথিবীর নাগরিক
  • এস এম এইচ রহমান
  • শুভম সরকার
  • আব্রাহাম তামিম

আপনি এখানে

সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় ও প্রতিক্রিয়াসমূহ


সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে আদালতের রায় নিয়ে নানারকম আলাপ-আলোচনা, সমালোচনা, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া এবং জনসমর্থন, উচ্ছ্বাস ইত্যাদি দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে আওয়ামীলীগের প্রতিক্রিয়াগুলো দেখার মতো। খেপা ষাড়ের মতোই তারা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছে। ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে বাস্তবে হাইকোর্টের রায় এসেছিলো ২০১৬ সালের মে মাসেই। রাষ্ট্রপক্ষ সেই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করলে আপিল বিভাগ সর্বসম্মতিক্রমে হাইকোর্টের রায় বহাল রাখে। সেই হিসেবে আওয়ামীলীগের যাবতীয় প্রতিক্রিয়ার ভারকেন্দ্র কেবল প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা হওয়া উচিৎ ছিল না, বরং সমগ্র উচ্চ আদালতের প্রতিই এই রাগ-ক্ষোভ-বিক্ষুব্ধতা প্রকাশ করা উচিৎ ছিল; কিংবা বলা যায় প্রধান বিচারপতির প্রতি তাদের রাগ-ক্ষোভ বাস্তবে সমগ্র বিচার ব্যবস্থার প্রতিই যায়। যাহোক, আদালত অবমাননার প্রসঙ্গটি পাশে সরিয়ে আলাপটি করছি, কেননা যেকোন কিছুর অবমাননা- কটুক্তিতে আমার কোন আপত্তি থাকে না (আদালতের সমস্ত রায়, সমস্ত বিচার- সবকিছুই যে সবার মনোপুত হবে এমন কোন কথা নেই- আর বিপরীত রায় পাওয়ার পরেও কোন সমালোচনা করা যাবে না, কেবল প্রশংসাই করতে হবে- এমনটাও মনে করি না) ...

আওয়ামীলীগের প্রতিক্রিয়া নিয়ে কথা বলছিলাম। প্রধান বিচারপতির প্রতি এমন খেপ্পার কারণ আসলে কি হতে পারে? দুইটি কারণ থাকতে পারে- প্রথমত, এতদিন পর্যন্ত সংবিধান সংশোধনী সংক্রান্ত বড় বড় রায়গুলোর সবই বিএনপি'র বিরুদ্ধে গিয়েছে তথা আওয়ামীলীগের পক্ষে গিয়েছে কিংবা আওয়ামীলীগ সেগুলো থেকে সুবিধে আদায় করে নিয়েছে, যদিও সেই রায়গুলো এসেছে অনেক সময় পার হওয়ার পরে। অর্থাৎ কোন সরকারের আমলে করা সংশোধনী- সেই সরকারের মেয়াদকালেই আদালত এভাবে চ্যালেঞ্জ করেনি। অবশ্য সংবিধান নিয়ে আদালতে যাওয়া শুরুই হয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশের ২৫ বছর পরে ১৯৯৬ সালে, যখন আওয়ামীলীগ সংসদের সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে ইমডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করে, সংসদের এহেন কার্যক্রমের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আদালতে দুটি রিট করা হয়েছিল। আদালতের রায়ে জানানো হয়- ইমডেমনিটি অধ্যাদেশ সংবিধানের কোন অংশ নয় যেহেতু, মোশতাকের করা অধ্যাদেশ জিয়ার হাত ধরে পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে আইনে রূপান্তরিত হলেও- অন্যান্য সংবিধান স্বীকৃত আইনের মতই এটিও সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে বাতিল করা সম্ভব। এর পরেই অবশ্য একে একে ১৯৭৯ সালের পঞ্চম সংশোধনী, ১৯৮৬ সালের সপ্তম সংশোধনী এবং ১৯৯৬ সালের ত্রয়োদশ সংশোধনী আদালতের রায়ে বাতিল হয়। সে হিসেবে ২০১৪ সালে করা ষোড়শ সংশোধনীই একমাত্র সংশোধনী যেটি চলমান সরকার/ সংসদের মেয়াদকালেই বাতিলের রায় এলো। এমনটা হজম করার অভ্যস্ততা এখনো বাংলাদেশের রাজনীতিতে গড়ে উঠেনি।

দ্বিতীয়ত, বিচারপতি এসকে সিনহার প্রতি প্রত্যাশা। প্রধান বিচারপতির প্রতি যে আস্থার জায়গা ছিল, সেখানে আঘাত পেয়েছে। গতবছরও ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশ হয়েছিল- আওয়ামীলীগ পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে এসকে সিনহার কথা ভাবছে। আগামী সংসদ নির্বাচনের আগেই বর্তমান রাষ্ট্রপতির মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে, সেখানে স্বয়ং শেখ হাসিনার নাকি অন্যতম পছন্দ প্রধান বিচারপতি। আনন্দবাজারের খবর মোতাবেক- এমন সম্ভাবনার কথা নাকি প্রধান বিচারপতিকে জানানোও হয়েছিলো। এমন খবর যদি সত্যি হয়, তাহলে আওয়ামীলীগের জন্যে বড় একটা ধাক্কাই বলতে হবে।

তো, আওয়ামীলীগের প্রতিক্রিয়াগুলো যদি লক্ষ করি, তাহলে বলতে হবে- অর্থমন্ত্রী, শিল্পমন্ত্রী যে ভাষায় যেসব প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে, তাতে- তাদের আইন, সংসদও বিচারব্যবস্থা নিয়ে মূর্খামিই প্রকাশ পায় কেবল। পার্লামেন্ট অবৈধ হওয়া মানেই আর সকল সাংবিধানিক পদের নিয়োগ অবৈধ নয়, কিংবা আদালত কোন সংশোধনী বাতিল করলে- সংসদ বারেবারে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সেই সংশোধনী পাশ করিয়ে নিতে পারে না। ফলে, এসব কথা রাজনৈতিক ময়দানের গরম বক্তৃতাবাজির বেশি কিছু না, কিন্তু বর্তমান অগণতান্ত্রিক পন্থায় নির্বাচিত সরকারের ও সাংসদদের ফ্যাসিস্ট মনোভাব আমরা এসব কথার মধ্য দিয়ে বুঝতে পারছি। সেই তুলনায় আইনমন্ত্রী কিছুটা সংযত প্রতিক্রিয়া দিয়েছে। তবে, আওয়ামীলীগের পক্ষে সবচেয়ে যৌক্তিক বক্তব্য দিয়েছেন আরেক সাবেক প্রধান বিচারপতি, বর্তমান আইন কমিশনের চেয়ারম্যান খায়রুল হক। তার কিছু কিছু বক্তব্য - তিনি আলোচ্য রায়ের ব্যাপারে যে সমালোচনা করেছেন- সেই একই দোষে দুষ্ট। অর্থাৎ, এই রায়ের ব্যাপারে কিছু জাজমেন্টাল কমেন্ট- পলিটিকাল মোটিভেশনাল বলা যাবে, যে যুক্তিতে তিনি আলোচ্য রায়ের নানা বক্তব্যকে এরকম অভিযোগে অভিযুক্ত করেছেন। যে রায় প্রদানের সময়ে হাইকোর্টের বেঞ্চের রায় সামনে ছিল, পক্ষে বিপক্ষের আর্গুমেন্ট ছিল, এমিকাস কিউরির মতামত ছিল এবং সবকিছু ধর্তব্যে নিয়েই আপিল বিভাগের বেঞ্চ সর্বসম্মতিক্রমে যে রায়টি দিল- তাকে কি আর যাই হোক অগণতান্ত্রিক বলে দেয়া যায়? কিংবা এই রায়ের মাধ্যমে গণপ্রজাতন্ত্র থেকে বাংলাদেশকে বিচারিক প্রজাতন্ত্রের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে- মার্শাল ল' এর আমলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে- এইসব জাজমেন্টাল বক্তব্যগুলোও চটকদারি ফাঁপা রাজনৈতিক বক্তব্য ছাড়া কিছুই না।

যাহোক, খায়রুল হকের এমন কিছু মন্তব্য বাদ রাখলে এবং হুট করে তার ঘটা করে সংবাদ সম্মেলন করে একটা রায়ের বিরুদ্ধাচরণ করার মাঝে যে অভিনবত্ব তার উদ্দেশ্য-বিধেয় ইত্যকার প্রসঙ্গ পাশে সরিয়ে রাখলে- আলোচ্য রায়ের ব্যাপারে খায়রুল হকের বক্তব্যের বড় অংশের সাথেই আসলে দ্বিমত করি না। এমনকি অনেকে যে আলোচ্য রায়টির ব্যাপারে জনপ্রিয়তা ও জনসমর্থনের কথা বলছেন, সেটিকেই বরং আমি গৌন করে রাখতে চাই, কেননা আদালতকেও যদি এহেন জনপ্রিয়তা ও জনসমর্থন দিয়ে বিচার করতে হয় বা চলতে হয়- তাহলে রাজনৈতিক ময়দানের সাথে তার তফাৎ বেশি একটি থাকে না, তারচাইতেও বড় কথা - জনগণ তাৎক্ষণিক লাভ ক্ষতি যেভাবে দেখে ও যেভাবে তাড়িত হয়, আদালত তা পারে না। সে জায়গা থেকেই আলোচ্য রায়ে জাতীয় সংসদ, খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি সাংবিধান প্রতিষ্ঠান, নিয়ে যেভাবে অশোভন, মর্যাদাহানিকর মন্তব্য ছুড়া হয়েছে- সেগুলো জনগণের কাছে যতই প্রিয় হোক, সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক সাহেবের সাথে আমি সম্পূর্ণ একমত যে, একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান আরেকটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্যে এরকম মন্তব্য ছুড়তে পারে না।

এবার আলোচ্য রায়ের বিষয়ে আসি। রায়টিতে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীকে অবৈধ বলে ঘোষিত হয়েছে। ষোড়শ সংশোধনীতে ৯৬ অনুচ্ছেদ পুনঃস্থাপনের মাধ্যমে বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা জাতীয় সংসদের হাতে ন্যাস্ত করা হয়েছিলো। ১৯৭২ সালের প্রথম সংবিধানে বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা জাতীয় সংসদের হাতেই ছিল, যেটি ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবের হাত ধরে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যাস্ত হয়। এর পরে জিয়ার পঞ্চম সংশোধনীতে এই ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাত থেকে সরিয়ে জাতীয় সংসদের কাছে না ফিরিয়ে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের হাতে দেয়া হয়। ২০১৪ সালের ষোড়শ সংশোধনীর আগ পর্যন্ত সংবিধান অনুযায়ী এই ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের হাতেই ছিল, ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে সেটি আবার জাতীয় সংসদের হাতে ফেরানো হয়, কিন্তু বর্তমান রায়ের কারণে ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষিত হওয়ায়, সেটি আবার সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের কাছেই যাওয়ার কথা। যারা জানেন না, সংক্ষেপে জানিয়ে রাখি। বিচারকরা যদি সংবিধান লংঘন বা গুরুতর অসদাচরণের দায়ে অভিযুক্ত হন, তবে তদন্ত করা ও তাদের অপসারণের জন্যে এই সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল ক্রিয়াশীল থাকবে। এটি গঠিত হবে প্রধান বিচারপতি ও এবং সর্বোচ্চ আদালতের পরবর্তী দুজন জ্যেষ্ঠ বিচারকের সমন্বয়ে। নিশ্চয়ই সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল অভিযুক্ত বিচারককে নিয়ে গঠিত হবে না, অর্থাৎ কোন জ্যেষ্ঠ বিচারকই যদি অভিযুক্ত হয়ে থাকেন, তবে তাকে বাদ দিয়ে পরবর্তী জ্যেষ্ঠ বিচারককে নিয়ে এই কাউন্সিল গঠিত হবে।।

আবার, আদালতের রায়ের প্রসঙ্গে ফেরা যাক। রায়টি এত বড় এবং এত সব অপ্রয়োজনীয় কথা দিয়ে ভর্তি (খায়রুল হকের মত অপ্রাসঙ্গিক বলছি না, খুজলে কোন না কোন প্রাসঙ্গিকতা পাওয়া যেতেই পারে, কিন্তু প্রাসঙ্গিক কথাবার্তার ভিড়ে যখন আসল প্রসঙ্গ খুঁজে পেতে হিমশিম খেতে হয়- তখন সেটাকে আমার অপ্রয়োজনীয়ই মনে হয়) যে, পুরা রায় পড়া সম্ভব হয়নি, সময় ও ধৈর্য দুটোতেই কুলায়নি। ফলে- রায়ের সম্পর্কে পত্র পত্রিকার প্রতিবেদন ও খায়রুল হক, আলী রিয়াজ প্রমুখ বিভিন্ন ব্যক্তির পর্যালোচনার উপরেই নির্ভর করতে হয়েছে বেশি। সেখান থেকেই আমার মনে হয়েছে, এই রায়টি বেশ দুর্বল।

সংবিধানের বিধান সংশোধন করার এখতিয়ার কেবলমাত্র জাতীয় সংসদের। কেবল সংবিধান সংশোধন নয়, অন্য যেকোন আইন রদ, বদল বা নতুন আইন প্রণয়নেরও এখতিয়ার সংসদের। সে কারণেই সাংসদদের বলা হয় আইন প্রণেতা। সংবিধানের ১৪২ নম্বর অনুচ্ছেদে সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা সাংসদদের হাতে ন্যস্ত করা হয়েছে। জাতীয় সংসদের দুই তৃতীয়াংশের ভোটে সংবিধানের বিধান পাল্টানো যায়, পুরান বিধান রদ বা বাতিল, পরিবর্তন, পরিবর্ধন করা যায়, আবার সম্পূর্ণ নতুন বিধানও প্রণয়ন করা যায়। তবে, সংবিধান সংশোধনের এই ক্ষমতা নিরঙ্কুশ নয়। সংবিধানেরই আরো কিছু ধারা দিয়ে সংবিধান সংশোধনের কিংবা যেকোন আইন প্রণয়নের সীমানা তৈরি করে দেয়া হয়েছে! অর্থাৎ সাংসদেরা কেবল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেই সংবিধান পরিবর্তন করতে পারবে না বা সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে চাইলেই নতুন যেকোন একটা আইন প্রণয়ন করতে পারবে না।

যেমনঃ ৭ (২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছেঃ

"জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিরূপে এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন এবং অন্য কোন আইন যদি এই সংবিধানের সহিত অসমঞ্জস্য হয়, তাহা হইলে সেই আইনের যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হইবে"।

অর্থাৎ সংসদ এমন কোন আইন প্রণয়ন করতে পারবে না, যা এই সংবিধানের কোন বিধানের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ, কিংবা এমন কোন আইন প্রণয়ন করে থাকলে- যতখানি অংশ সংবিধানের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হয়ে যাবে।

৭ (খ) নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছেঃ

"সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, সংবিধানের প্রস্তাবনা, প্রথম ভাগের সকল অনুচ্ছেদ, দ্বিতীয় ভাগের সকল অনুচ্ছেদ, নবম-ক ভাগে বর্ণিত অনুচ্ছেদসমূহের বিধানাবলী সাপেক্ষে তৃতীয় ভাগের সকল অনুচ্ছেদ এবং একাদশ ভাগের ১৫০ অনুচ্ছেদসহ সংবিধানের অন্যান্য মৌলিক কাঠামো সংক্রান্ত অনুচ্ছেদসমুহের বিধানাবলী সংযোজন, পরিবর্তন, প্রতিস্থাপন, রহিতকরণ কিংবা অন্য কোন পন্থায় সংশোধনের অযোগ্য হইবে"।

মূলত এই ধারার মাধ্যমেই এবং ২৬ নম্বর ধারায় পুনরুল্লেখপূর্বক ১৪২ নম্বর ধারায় প্রদত্ত সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতার রাশ টেনে ধরা হয়েছে।

তৃতীয় ভাগ ('মৌলিক অধিকার') এর ২৬ (২) নম্বর ধারায় বলা হয়েছেঃ

"রাষ্ট্র এই ভাগের কোন বিধানের (অর্থাৎ তৃতীয় ভাগের ২৬ অনুচ্ছেদ থেকে ৪৭ক অনুচ্ছেদ এর) সহিত অসমঞ্জস্য কোন আইন প্রণয়ন করিবেন না এবং অনুরূপ কোন আইন প্রণীত হইলে তাহা এই ভাগের কোন বিধানের সহিত যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হইয়া যাইবে"।

অর্থাৎ ৭ (খ) ও ২৬ নম্বর ধারা মোতাবেক আমরা দেখতে পাই যে, প্রথমত- দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও সংবিধানে ১ম, ২য় ও ৩য় ভাগের সকল অনুচ্ছেদ (অর্থাৎ ১ নম্বর থেকে ৪৭ক নম্বর অনুচ্ছেদ পর্যন্ত), এবং একাদশ ভাগের ১৫০ নম্বর অনুচ্ছেদ অ-সংশোধনযোগ্য হবে। দ্বিতীয়ত- উল্লেখিত অনুচ্ছেদসহ সংবিধানের অন্য সকল মৌলিক কাঠামো সংক্রান্ত অনুচ্ছেদসমূহের বিধানাবলী অ-সংশোধনযোগ্য হবে, এবং তৃতীয়ত- তৃতীয় ভাগে উল্লেখিত 'মৌলিক অধিকার' সম্পর্কিত অনুচ্ছেদসমূহের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কোন আইন বা বিধান প্রণয়ন করা যাবে না।

এছাড়া ৭ (ক) ধারায় বলা হয়েছেঃ

"কোন ব্যক্তি শক্তি প্রদর্শন বা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে বা অন্য কোন অসাংবিধানিক পন্থায় এই সংবিধান বা ইহার কোন অনুচ্ছেদ রদ, রহিত বা বাতিল বা স্থগিত করিলে কিংবা উহা করিবার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ বা ষড়যন্ত্র করিলে (কিংবা ...) তাহার এই কার্য রাষ্ট্রদ্রোহিতা হইবে এবং ঐ ব্যক্তি রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে দোষী হইবে"।

মূলত এই ধারার মাধ্যমে অবৈধ উপায়ে ক্ষমতা দখল করা হলেও (যেমন সামরিক শাসন) যাতে সংবিধানের কোন রকম রদবদল- সংশোধন করা না হয়, সেই সুরক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে (যদিও রাতারাতি বিএনপি কিংবা জাতীয় পার্টির মত রাজনৈতিক দল গঠন করে, সাজানো নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদ গঠন করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা যদি অর্জিত হয়, সেক্ষেত্রে সংবিধানের তদ্রুপ সংশোধনী বাতিলের কোন উপায় থাকছে না (সে কারণেই এই বিধান মোতাবেক স্বয়ংক্রিয়ভাবে পঞ্চম থেকে দশম সংশোধনী বাতিল হয়ে যায় না), শুধু সামরিক স্বৈরশাসক কেন, রাজনৈতিক দলও যদি অন্যায় ও অবৈধ নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদ গঠন করে, সেক্ষেত্রেও সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সংবিধানের সংশোধনের হাত থেকে সুরক্ষার কোন ব্যবস্থা আমাদের সংবিধানে দেয়া নেই।

যাহোক- আমাদের সংবিধানে আরো অনেক কিছুই নেই, অ-সংশোধনযোগ্য বলে কথিত বিধানের মাঝেই রয়েছে অনেক রকম অসামঞ্জস্যতা- যা এক ধারা মোতাবেক অন্য একটি ধারাকে অসাংবিধানিক করে তোলে- এমন সব বিধান এখানে আছে। সেসমস্ত বিষয় নিয়ে অন্যত্র কথা বলা যাবে; এই মুহুর্তে সংবিধানে প্রদত্ত বিধান মোতাবেক সংবিধান সংশোধনী বিষয়ক আলাপে ফেরা যাক। উপরের আলোচনায় দেখা যাচ্ছে, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেই যেকোন সংশোধনী সাংসদরা করতে পারেন না। যদি করেও ফেলেন, তবে তা বাতিলযোগ্য। এই বাতিল করার বিষয়টিই আদালতের মাধ্যমে হয়। ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়টি তেমনই একটি রায়। সংবিধানের কোন সংশোধনীকে বাতিল বলতে হলে, অবশ্যই সেই সংশোধনী তথা সেই ধারা/ অনুচ্ছেদের বিধানটিকে অসাংবিধানিক বলতে হবে, তথা ঐ বিধানটি যদি সংবিধানের অন্য কোন অনুচ্ছেদ বা ধারা কিংবা মৌলিক কোন কাঠামো সংক্রান্ত বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক হয়, কেবলমাত্র সেক্ষেত্রেই ঐ বিধানকে বাতিলযোগ্য বলা যাবে। এই পরিপ্রেক্ষিতেই তবে ষোড়শ সংশোধনীটি দেখা যাক।

ষোড়শ সংশোধনীতে সংবিধানের ষষ্ঠ ভাগ (বিচার বিভাগ) এর প্রথম পরিচ্ছেদ (সুপ্রিম কোর্ট) এর ৯৬ নম্বর অনুচ্ছেদের ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭ নম্বর ধারাকে প্রতিস্থাপিত করা হয়েছে নতুন ২, ৩ ও ৪ নম্বর ধারার মাধ্যমে। আগের ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭ ধারাসমূহে বিচারকের অপসারণে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের ব্যাপারে বলা ছিলো, সেখানে ষোড়শ সংশোধনীর ২,৩ ও ৪ নম্বর ধারায় জাতীয় সংসদের কমপক্ষে দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রস্তাবে রাষ্ট্রপতির আদেশের কথা বলা হয়েছে। ফলে, দেখাই যাচ্ছে যে- এই সংশোধনীটি ৭ (খ) এ উল্লেখিত অ-সংশোধনযোগ্য অনুচ্ছেদসমূহের সংশোধন নয়, কিংবা ২৬ ধারায় উল্লেখিত মৌলিক অধিকার সংক্রান্ত অনুচ্ছেদসমূহের সাথেও অসামঞ্জস্যপূর্ণও নয়। তাহলে দেখার বিষয় হচ্ছে- ৭(খ) এ উল্লেখিত সংবিধানের মৌলিক কাঠামো সংক্রান্ত কোন বিধানের সাথে এই সংশোধনীর ধারাসমূহ (২, ৩ ও ৪) সাংঘর্ষিক কি না?

হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়েছিলো- এটি সংবিধানের দুটি মূল কাঠামো ৯৪(৪) ও ১৪৭ (২) অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন। ফলে সংবিধানের ৭ (খ) অনুচ্ছেদকে আঘাত করে। ৯৪ (৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ীঃ

"এই সংবিধানের বিধানাবলী-সাপেক্ষে প্রধান বিচারপতি এবং অন্যান্য বিচারক বিচারকার্য পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকিবেন"।

এবং ১৪৭ (২) নম্বর ধারায় বলা হয়েছেঃ

"এই অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য হয়, এইরূপ কোন পদে অধিষ্ঠিত বা কর্মরত ব্যক্তির কার্যভারকালে তাঁহার পারিশ্রমিক, বিশেষ অধিকার ও কর্মের অন্যান্য শর্তের এমন তারতম্য করা যাইবে না, যাহা তাঁহার পক্ষে অসুবিধাজনক হইতে পারে"।

১৪৭ অনুচ্ছেদে উল্লেখিত পদসমূহ হচ্ছে- প্রধানমন্ত্রী, স্পীকার বা ডেপুটি স্পীকার, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা উপ-মন্ত্রী, সুপ্রীম কোর্টের বিচারক, মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, নির্বাচন কমিশনার এবং সরকারী কর্ম কমিশনের সদস্য। অভিযুক্ত বিচারকের তদন্ত অপসারণের দায়িত্ব সুপ্রিম জুডিশিয়ালের হাত থেকে সংসদ সদস্যদের হাতে ন্যস্ত হলে সেটি কি করে ১৪৭ (২) এর লঙ্ঘন হয়, সেটি বোধগম্য নয়, কেননা- উভয়ক্ষেত্রেই তো অভিযোগ প্রমাণিত হলে সুপ্রিম কোর্টের বিচারককে অপসারিত করার বিধান থাকছে।

তাহলে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে আপত্তিটি অবশিষ্ট থাকছেঃ ৯৪ (৪) এ উল্লেখিত বিচারকদের স্বাধীন বিচারকার্য, তথা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রসঙ্গ। অবশ্যই বিচার বিভাগের স্বাধীনতা আমাদের সংবিধানের একটি মৌলিক কাঠামো এবং যেকোন প্রকারে এই কাঠামো রক্ষা করা কর্তব্য। কিন্তু, কথা হচ্ছে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার অর্থ কি? সে কতখানি স্বাধীন? কার কাছ থেকে স্বাধীন? আর, তার দায়বদ্ধতার জায়গাটিই বা কোথায় বা কার কাছে? সর্বক্ষেত্রেই উল্লেখ করা হয়, নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা; এবং অতি উল্লেখ্য যে- নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ এবং আইনসভা- তিনটি আলাদা সত্ত্বা (থিওরিটিকালি)। আমাদের সংবিধানের দিকে তাকালেও দেখা যাবে- নির্বাহী বিভাগের শুরু রাষ্ট্রপতি দিয়ে- তারপরে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীসভা। সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ দিচ্ছেন নির্বাহী বিভাগের রাষ্ট্রপতি। আমার দৃষ্টিতে তো এই প্রধান বিচারপতি নিয়োগে ও প্রধান বিচারপতির পরামর্শে অন্যান্য বিচারক নিয়োগে রাষ্ট্রপতির ভূমিকার কথা উল্লেখ করা ৯৫ নম্বর অনুচ্ছেদকে বরং অধিক সাংঘর্ষিক মনে হয়। কেননা, এর মধ্য দিয়ে পছন্দসই, অনুগত ব্যক্তিকে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেয়ার মাধ্যমে বিচার ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি হয়। যেকারণেই দেখা যায়- প্রধান বিচারপতির প্রতি শাসকদলের অপরিসীম আস্থা ও প্রত্যাশা থাকে। এবারের রায়ে একইভাবে ১১৬ নম্বর অনুচ্ছেদ ( "বিচার-কর্মবিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিদের এবং বিচারবিভাগীয় দায়িত্বপালনে রত ম্যাজিষ্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ (কর্মস্থল- নির্ধারণ, পদোন্নতিদান ও ছুটি মঞ্জুরীসহ") ও শৃংখলাবিধান রাষ্ট্রপতির উপর ন্যস্ত থাকিবে এবং সুপ্রীম কোর্টের সহিত পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক তাহা প্রযুক্ত হইবে) কে ১০১ অনুচ্ছেদের ("হাইকোর্ট বিভাগের অধঃস্তন সকল আদালত ও ট্রাইব্যুনালের উপর উক্ত বিভাগের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ-ক্ষমতা থাকিবে") সাংঘর্ষিক বলা হয়েছে।

এখন কথা হতে পারে, নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা থাকা যেমন প্রশ্নবিদ্ধ, তেমনি অপসারণের ক্ষেত্রে সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভূমিকা থাকাও একইরকম প্রশ্নবিদ্ধ কি না। এর জবাবে, সাধারণভাবে সংসদের দুই তৃতীয়াংশের সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিধানকে আমি ইতিবাচকভাবেই দেখি। সংসদ সদস্যরা সাধারণভাবে জনগণ দ্বারা সরাসরি নির্বাচিত হওয়ার কথা, ফলে জাতীয় সংসদের কাছে দায়বদ্ধতার আরেক অর্থই হচ্ছে জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকা। এই আইনসভাই বাস্তবে দুই তৃতীয়াংশের সমর্থনের ভিত্তিতে সংবিধান পাল্টাতে পারে, এই আইনসভার দুই তৃতীয়াংশ রাষ্ট্রপতিকে অভিদংশিত করতে পারে, এমনকি একটা সরকারকে অনাস্থা প্রস্তাবের মাধ্যমে ফেলেও দিতে পারে। অর্থাৎ থিওরিটিকালি হলেও আইনসভা নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগ থেকে স্বতন্ত্র অবস্থানে থেকে জনগণের সরাসরি প্রতিনিধি হিসেবে সরাসরি নির্বাহীবিভাগের প্রধানের দায়বদ্ধতার জায়গায় আসীন। বিচার বিভাগের দায়বদ্ধতাও আইনসভার হাতে ন্যাস্ত করায় তাই আপত্তি দেখিনা। আইনসভার প্রতিটি কার্যক্রম যেহেতু সর্বসাধারণের জন্যে উন্মুক্ত (সরাসরি সম্পচারিতও হয়)- সেহেতু কোন বিচারপতির কোন গুরুতর অভিযোগ প্রমানিত হলে- সংসদে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে অপসারিত হওয়ার ব্যবস্থায় আমার তেমন আপত্তি নেই, এমনটা মনেও করি না যে- এহেন অপসারণের ভয় দেখিয়ে বিচারকার্যের উপরে প্রভাব বিস্তার করা সম্ভব হতে পারে।

তবে, এই আলোচনাটি থিওরিটিকালি সঠিক। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রাক্টিকাল উদাহরণ যদি দেখতে যাই, তাহলে এই রায়ের পর পরেই বিভিন্ন মন্ত্রী- সাংসদের হুংকার- হাম্বি তাম্বিতেই পরিষ্কার হয়ে যায় যে, আমাদের দেশে সাংসদ কারা হয়, তারা কতখানি আইন প্রণেতা বা জনগণের প্রতিনিধি- আর কতখানি লুটপাট-দুর্নীতি-আর-ক্ষমতার চক্রে থাকা ব্যবসায়ী শ্রেণী (নির্বাচন হচ্ছে একটা ব্যবসা এদের কাছে)। এরা একটা রায় মনোপুত না হলে কেবল অপসারণ নয়, পারলে পায়ের নিচে নিয়ে পিষে মারতে চায়। ফলে, এহেন সংসদের হাতে বিচারক অপসারণের ক্ষমতা দেয়া সংশোধনী বাতিলের রায়ে জনসমর্থন যথেষ্টই মিলেছে। কেননা জনগণ জানে- এইসব সংসদ সদস্যরা কারা, কেমন, কি এবং তামাশামূলক নির্বাচনের মাধ্যমেও কিরূপে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার সংসদ গড়া সম্ভব!

কিন্তু, মুশকিল হচ্ছে- আদালত যখন রায় দিবে, এরকম ভয়ানক পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে কি রায় দিতে পারে? তাহলে, সব রায় তো- কিংবা সংবিধানের সমস্ত বিধান বা আইনসমূহকে তো আপদকালীন অবস্থার ব্যবস্থা হিসেবে দাঁড় করাতে হয়! সে জায়গা থেকেই আমি মনে করি, সংবিধানের আইনসভা থেকে অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ও পদকে আদর্শ (ideal) জায়গা থেকেই দেখা দরকার, এবং এই আদর্শ অবস্থানে যাওয়ার ক্ষেত্রে যেসমস্ত আইনি বা সাংবিধানিক প্রতিবন্ধকতা আছে- সেসব দূরীকরণে মনোযোগী হওয়া দরকার। সে হিসেবে আমাদের সংবিধানের মৌলিক কাঠামো, মৌলিক অধিকার এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির সাথে সাংঘর্ষিক বিবেচনায় ৭০ নম্বর অনুচ্ছেদ ("কোন নির্বাচনে কোন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরুপে মনোনীত হইয়া কোন ব্যক্তি সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হইলে তিনি যদি- উক্ত দল হইতে পদত্যাগ করেন, অথবা সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান করেন, তাহা হইলে সংসদে তাঁহার আসন শূন্য হইবে, তবে তিনি সেই কারণে পরবর্তী কোন নির্বাচনে সংসদ-সদস্য হইবার অযোগ্য হইবেন না") বাতিল অনেক বেশি জরুরি। একই সাথে প্রজাতন্ত্রের সর্বময় ক্ষমতার আধার মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার রাশ টেনে ধরতে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণও অতি আবশ্যক। আলোচ্য রায়ে ৭০ অনুচ্ছেদের কথা ভালোভাবেই এসেছে, কিন্তু সেটি এসেছে ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের অযুহাত হিসেবে। আর, আমার মূল আপত্তি ঠিক এই জায়গাটিতেই। ৭০ অনুচ্ছেদকে মেনে নিয়েই যখন ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় আসে- তখন সেটি আমার কাছে দুর্বলই মনে হয়, এমন ব্যবস্থা আপদকালীন-স্বল্পকালীন হতে পারে, আপদকালীন হিসেবে উপস্থাপন না থাকলে এতে দুটো সমস্যা হয়- প্রথমত ৭০ অনুচ্ছেদ যেমনই হোক এটি ইনএভিটেবল বা অ-পরিবর্তনযোগ্য, এমন ধারণা চলে আসে এবং দ্বিতীয়ত, আপদকালীন একটা সমাধান পার্মানেন্ট হিসেবে উপস্থাপিত হয়। ৭০ অনুচ্ছেদকে অসাংবিধানিক বলে রায় দেয়া এবং ৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের আগ পর্যন্ত আপদকালীন ব্যবস্থানুযায়ী সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের হাতে বিচারক অপসারণের ক্ষমতা ন্যাস্ত রাখার রায় দেয়া হলে- আমি সম্পূর্ণ একমত হতে পারতাম।

পরিশিষ্টঃ
৭০ নম্বর অনুচ্ছেদ সম্পর্কে সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক সাহেবের ব্যাখ্যাটি আকর্ষণীয় ও চমকপ্রদ। তার ব্যাখানুসারেঃ

"সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বলা আছে, কোনো সংসদ সদস্য দলের বিরুদ্ধে ভোট দিতে পারবেন না। যদি দলের বিরুদ্ধে ভোট দেন তাহলে ওনার সদস্য পদ বাতিল হয়ে যাবে। কিন্তু সংসদে কী যায়? আইনের খসড়া বিল আকারে যায়। এই বিল দল নয়, এই বিলগুলো বিরোধী দল আনতে পারে, যেকোনো সংসদ সদস্য আনতে পারেন। ফলে ভোটাভুটিটা কিন্তু কোনো দলের পক্ষে-বিপক্ষে হয় না। হয় বিলের পক্ষে-বিপক্ষে। একবারই মাত্র দলের বিরুদ্ধে ভোটাভুটি হতে পারে যদি অনাস্থা সংক্রান্ত বিষয় থাকে। সে ক্ষেত্রেই সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ বলবত্ হবে। এখানে কোনো সাংসদ দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে তার সদস্য পদ বাতিল হবে। অন্য কোনো ক্ষেত্রে দলের পক্ষে-বিপক্ষে ভোট দেওয়ার কোনো সুযোগই নেই"।

আকর্ষণীয় বলছি এই কারণে যে, এই ব্যাখ্যাটি বলবৎ হলে অন্তত একটি ক্ষেত্র ব্যাতিত (অনাস্থা প্রস্তাব) আর সমস্ত বিলের ব্যাপারে দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দিতে বাঁধা থাকছে না। এর আগে নৌকা নিয়ে নির্বাচন করা নানা বামপন্থী নেতাদের দেখেছি সরকারী আওয়ামীলীগের উত্থাপিত প্রতিক্রিয়াশীল বিলেও হ্যাঁ ভোট দিয়ে- কারণ হিসেবে ৭০ অনুচ্ছেদের উল্লেখ করে হাতপা বাঁধা থাকার কথা বলতে। এই ব্যাখ্যাটি বলবত হলে অন্তত- বেচারিদের এমন বিপদে পড়তে হতো না ...

তবে, খায়রুল হক সাহেবের যুক্তি যদি দেখি- তাহলে কিন্তু বলা যায় অনাস্থা প্রস্তাবও বাস্তবে কোন দল থাকে না। একজন প্রধানমন্ত্রীর প্রতি সাংসদদের সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন আছে কি না- সেটিই নির্ধারণ করতেই যেহেতু এই অনাস্থা প্রস্তাব সংসদে আনা হয়। জবাবে যদি বলা হয়- প্রধানমন্ত্রী তো রাজনৈতিক দল থেকেই নির্বাচিত হয়, তাহলে একইভাবে তো এটাও বলা যায়- সংসদে আনা বিলগুলো তো কোন না কোন দল, সেই দলের সংসদীয় কমিটিই আনে!

Comments

আবু মমিন এর ছবি
 

Excellent written! রায়ের দূর্বল বিষয়টি যথার্থভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

আবু মোমিন

 
ড. লজিক্যাল বাঙালি এর ছবি
 

পড়লাম। ৫৭-ধারার কারণে কোন মন্তব্য করবো না।
==============================================
আমার ফেসবুকের মূল ID হ্যাক হয়েছিল ২ মাস আগে। নানা চেষ্টা তদবিরের পর আকস্মিক তা ফিরে পেলাম। আমার এ মুল আইডিতে আমার ইস্টিশন বন্ধুদের Add করার ও আমার ইস্টিশনে আমার পোস্ট পড়ার অনুরোধ করছি। লিংক : https://web.facebook.com/JahangirHossainDDMoEduGoB

===============================================================
জানার ইচ্ছে নিজেকে, সমাজ, দেশ, পৃথিবি, মহাবিশ্ব, ধর্ম আর মানুষকে! এর জন্য অনন্তর চেষ্টা!!

 

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

অনুপম সৈকত শান্ত
অনুপম সৈকত শান্ত এর ছবি
Offline
Last seen: 1 week 3 দিন ago
Joined: রবিবার, অক্টোবর 5, 2014 - 4:02অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

ফেসবুকে ইস্টিশন

SSL Certificate
কপিরাইট © ইস্টিশন.কম ® ২০১৬ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর