নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 5 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • নুর নবী দুলাল
  • হাসান নাজমুল
  • শ্রীঅভিজিৎ দাস
  • মুফতি বিশ্বাস মন্ডল
  • নিরব

নতুন যাত্রী

  • নিনজা
  • মোঃ মোফাজ্জল হোসেন
  • আমজনতা আমজনতা
  • কুমকুম কুল
  • কথা নীল
  • নীল পত্র
  • দুর্জয় দাশ গুপ্ত
  • ফিরোজ মাহমুদ
  • মানিরুজ্জামান
  • সুবর্না ব্যানার্জী

আপনি এখানে

১৯৭১ সালের যুদ্ধ শুরুর মহূর্তে, শেখ মুজিবের আত্মসমর্পণ | আহমেদ মহিউদ্দিন


[১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ এর যুদ্ধ শুরু পর্যন্ত বাংলাদেশের সামগ্রিক ইতিহাস নিয়ে নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ সামান্যই পাওয়া যায়। এর মধ্যে বদরুদ্দীন উমর এর The Emergence of Bangladesh সব চাইতে উল্লেখযোগ্য। উল্লেখযোগ্য হলেও অল্প লোকেই এই গ্রন্থ সম্পর্কে জানেন। এটি প্রকাশ করেছে করাচীর অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস। দুই খন্ডে ২০০৪ সালে প্রকাশিত গ্রন্থটির প্রথম খন্ডের উপশিরোনাম ছিল Class Struggles in East Pakistan (1947-1958)। এই খন্ডে ৪০টি অধ্যায় রয়েছে যাতে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে ১৯৫৮ সালে সামরিক ক্যুদেতা পর্যন্ত ঘটনাবলী তুলে ধরা হয়েছে।

গ্রন্থটির দ্বিতীয় খন্ডটি প্রকাশিত হয় ২০০৬ সালে Rise of Bengali Nationalism (1958-1971) এই উপশিরোনামে। যেখানে মোট ৪৯টি অধ্যায়ে ১৯৫৮ থেকে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা পর্যন্ত ঘটনাবলী আলোচিত হয়েছে। প্রথম খন্ডটি প্রকাশিত হবার পর দ্রুতই তার প্রথম সংস্করণটি নিঃশেষ হলে প্রকাশক দ্বিতীয় মুদ্রণ প্রকাশ করে। কিন্তু দ্বিতীয় খন্ডটি প্রকাশের পর প্রকাশক পাকিস্তান সরকার ও সামরিক মহলের চাপে পড়েন এবং গ্রন্থটির প্রকাশনা চালিয়ে যেতে অস্বীকৃতি জানান। সম্ভবত অপারেশন সার্চ লাইটের মাধ্যমে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী কিভাবে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করেছিল এর বিস্তারিত বিবরণই ছিল এই চাপের কারণ। সেই থেকে গ্রন্থটি আউট অব প্রিন্ট।

বাংলাদেশে গ্রন্থটির অল্প কয়েকটি কপি এসেছে। সম্প্রতি এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) এ. কে. খন্দকার এর গ্রন্থ ‘১৯৭১: ভেতরে বাইরে’ প্রকাশিত হবার পর ১৯৭১ এর ঘটনাবলী সম্পর্কে আগ্রহ, বিশেষ করে সত্য জানার আগ্রহ, সমাজে আমরা লক্ষ্য করছি। এই পরিপ্রেক্ষিতে বদরুদ্দীন উমরের The Emergence of Bangladesh: Rise of Bengali Nationalism (1958-1971) এর শেষ তিনটি অধ্যায় অনুবাদ করে প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমরা। এই সংখ্যায় Surrender of Sheikh Mujib অধ্যায়ের অনুবাদ প্রকাশ করা হলো।- নির্বাহী সম্পাদক]

১৯৭১ সালের ২৫ ও ২৬শে মার্চ রাতের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ছিল পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর কাছে শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মসমর্পণ।
সকল প্রাপ্ত সূত্র এবং আওয়ামী লীগের উর্ধ্বতন নেতৃত্বের লেখা থেকে এটা বোঝা যায় যে জনগণের উপর পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর আসন্ন সর্বাত্মক হামলা সম্পর্কে শেখ মুজিব ভাল মতই অবহিত ছিলেন। আমিরুল ইসলাম, আব্দুল মালেক উকিল এবং অন্যদের ভাষ্য অনুযায়ী ২৪শে মার্চ মুজিব জরুরীভাবে তাঁর রাজনৈতিক সহকর্মী ও পার্টি নেতাদেরকে ঢাকা ত্যাগের আহ্বান জানাতে শুরু করেন।[১]

২৪শে মার্চ বিকেলে তিনি বহু আওয়ামী লীগ নেতার সাথে পৃথকভাবে ও সংক্ষেপে, একেক জনের সাথে এক মিনিটের মত সময় নিয়ে কথা বলেন, আর তাঁদেরকে অবিলম্বে ঢাকা ত্যাগের নির্দেশ দেন।[২] এটা ছিল সেই দিন যখন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার প্রতিনিধি ও আওয়ামী লীগ নেতা তাজউদ্দীন আহমদ, কামাল হোসেন প্রমুখের মধ্যে একটি খসড়া ঘোষণা চূড়ান্ত করা নিয়ে প্রেসিডেন্ট হাউসে সংলাপ চলছিল।[৩]

এটা খুবই বিস্ময়কর ছিল যে শেখ মুজিব এমন এক মুহূর্তে তাঁর পার্টির শীর্ষ ব্যক্তিদের ঢাকা ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন যখন ইয়াহিয়া খান এবং শেখ মুজিব উভয়েই ঘোষণাটিতে সাক্ষর দান করবেন এবং দু-একদিনের মধ্যে তা ঘোষিত হবে এই প্রত্যাশায় আওয়ামী লীগের আলোচনাকারী দল খসড়ার সকল ধারা ও তফসিল পাঠে ব্যস্ত ছিলেন।[৪]

২৪শে মার্চ সন্ধ্যায় আওয়ামী লীগ দলের আশাবাদ এবং তাঁর সহকর্মীদেরকে অবিলম্বে শেখ মুজিব কর্ত্তৃক ঢাকা ত্যাগের নির্দেশ থেকে বোঝা যায় যে কী ঘটতে যাচ্ছে সেটা সম্পর্কে ভেতরকার ধারণা এবং তথ্য শেখ মুজিবের ছিল। কথা বলার সময় অন্যদেরকে তিনি বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করেছেন কিন্তু কোন সুনির্দিষ্ট তথ্য তাদের সাথে ভাগাভাগি করেননি।

পরের দিন পরিস্থিতি খারাপের দিকে মোড় নেয়। জেনারেল পীরজাদার কথা ছিল হয় তাজউদ্দীন আহমদ না হয় কামাল হোসেনকে ২৫শে মার্চ আলোচনাকারী পক্ষদ্বয়ের একটি যুক্ত অধিবেশনে বসার জন্য টেলিফোন করার, কিন্তু তাঁরা কেউই তাঁর কাছ থেকে কোন টেলিফোন কল পাননি। কামাল হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী;

২৫শে মার্চের পুরোটা সময় আমি একটা টেলিফোন কলের জন্য অপেক্ষা করেছিলাম। এই ফোন কল আর আসে নি। প্রকৃতপক্ষে ২৫শে মার্চ রাত ১০.৩০ মিনিটে যখন আমি শেখ মুজিবের কাছ থেকে বিদায় নিলাম তখন শেখ মুজিব আমাকে জিজ্ঞেস করলেন আমি এমন কোন টেলিফোন কল পেয়েছিলাম কি না। আমি তাঁকে বলেছিলাম যে আমি পাইনি।[৫]

এর মধ্যে সংলাপের ব্যর্থতা এবং তার যৌক্তিক পরিণতি অর্থাৎ পাকিস্তান সরকার কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের উপর হামলার ইঙ্গিত ছিল।

২৫শে মার্চের ঘটনা প্রবাহকে স্মরণ করতে যেয়ে গ্রুপ ক্যাপ্টেন (অবসরপ্রাপ্ত) এ. কে. খন্দকার (পরবর্তীতে এয়ার ভাইস মার্শাল) লেখেন যে ২৫শে মার্চ সন্ধ্যায় তিনি ঢাকা বিমান বন্দরে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি দেখেন জেনারেল ইয়াহিয়া খানকে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থায় একজন কী দুজন যাত্রীর সাথে একটি বিমানে করে ঢাকা ছেড়ে যেতে। তিনি সাথে সাথেই সেই তথ্য আওয়ামী লীগ অফিসে সরবরাহ করেন।[৬] অফিস নিশ্চয়ই ইয়াহিয়া খানের চলে যাবার খবর শেখ মুজিবকে সাথে সাথে জানিয়েছিল।

কামাল হোসেন এবং আমিরুল ইসলাম ২৫শে মার্চ রাত ১০টার দিকে শেষ বারের মত মুজিবের সাথে দেখা করেন যখন তিনি তাঁর রাতের খাবার শেষ করেন। আমিরুল ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, মুজিব তাঁদের বলেন, ‘আমার কাছে সব তথ্য আছে। ইয়াহিয়া খানের ঢাকা ত্যাগের ঠিক পরপরই আক্রমণ শুরু হবে।[৭] এ থেকে মনে হয় যে সেই সময় ইয়াহিয়া খানের প্রকৃতপক্ষে চলে যাওয়ার খবর তাঁর কাছে ছিল না, অথবা ইয়াহিয়া খানের চলে যাবার খবরটা তিনি অন্যদের জানাতে চাননি। যেহেতু সন্ধ্যার সময় এ. কে. খন্দকার আওয়ামী লীগ অফিসে ইয়াহিয়া খানের চলে যাওয়ার খবরটা জানিয়ে দিয়েছিলেন, তাতে এটা খুবই অপ্রত্যাশিত যে তথ্যটি সাথে সাথে মুজিবের কাছে পরিবেশন করা হয়নি।

২৫শে মার্চ সন্ধ্যা ৫টা-৬টার দিকে রেহমান সোবহান লাহোর থেকে প্রকাশিত পাকিস্তান টাইমস এর এক সময়কার সম্পাদক মাজহার আলী খানকে সঙ্গে নিয়ে শেখ মুজিবের সাথে দেখা করতে যান। রেহমানের ভাষ্য অনুযায়ী;

সেই সময় বাড়ীটি সাংবাদিকদের দ্বারা ঘেরাও হয়েছিল, যাঁরা মনে হয় আঁচ করতে পারছিলেন যে পাক সেনাবাহিনীর সাথে চূড়ান্ত ফয়সালা খুবই নিকটে। তিনি আমাদেরকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন এবং ঘর খালি করে দিয়েছিলেন যাতে আমরা দুজনই শুধু তাঁর সাথে থাকি। বঙ্গবন্ধু আমাদের বলেছিলেন যে সেনাবাহিনী আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।[৮]

কাজেই রেহমান সোবহানের এই বিবৃতি থেকে এটা মনে হয় যে, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আক্রমণের বিষয়ে শেখ মুজিবের পূর্ব ধারণা ছিল, যে তথ্য ২৫শে মার্চ সন্ধ্যা পর্যন্ত তাজউদ্দীন আহমদ কিংবা কামাল হোসেন কারোরই জানা ছিল না; নইলে তাঁরা ঘোষণার খসড়া চূড়ান্ত করার জন্য জেনারেল পীরজাদার ফোনের অপেক্ষা করতেন না।

২৫শে মার্চের আবহাওয়া, বিশেষ করে সন্ধ্যায়, এই আশংকায় আচ্ছন্ন হয়েছিল যে একটি সামরিক অভিযান আসন্ন। আওয়ামী লীগের কিছুসংখ্যক নেতা গা ঢাকা দেওয়ার কথা গুরুতরভাবে চিন্তা করছিলেন এবং তাঁরা চাচ্ছিলেন যে, শেখ মুজিব যেন তাঁর বাড়ী ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান। আশ্চর্যের ব্যাপার, শেখ মুজিব জেদের সাথে সেটা প্রত্যাখ্যান করেন যদিও তিনি অন্যদের ঢাকা ত্যাগ করতে ও গা ঢাকা দিতে পরামর্শ দেন। আমিরুল ইসলামের ভাষ্য মতে, তিনি এবং তাজউদ্দীন আহমদ শেখ মুজিবকে আত্মগোপন করার জন্য চাপ দেন এবং বারংবার তাঁকে বাড়ী ত্যাগ করতে বলেন। আরও অনেকে তাঁকে বোঝাতে চেষ্টা করেন, কিন্তু তিনি বাড়ী ত্যাগ না করার সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। শেখ মুজিবের যুক্তি ছিল যে এমন কোন জায়গা নেই যেখানে তিনি লুকাতে পারেন, আর তদুপরি, তিনি যদি তাঁর বাড়ী ছেড়ে যান তাহলে সেনাবাহিনী তাঁকে খুঁজতে বাড়ী বাড়ী তল্লাশী চালাতে যেয়ে জনগণের উপর আক্রমণ চালাবে আর তার ফলে তাঁর কারণে বহুসংখ্যক লোক মারা পড়বে![৯]

এই উভয় যুক্তিই ছিল অদ্ভূত প্রকৃতির, কারণ গোপন আশ্রয় যথেষ্ট যত্ন এবং নিরাপত্তার সাথে করা হয়, এবং যথাযথ ব্যবস্থা সহকারে। কারও পক্ষে দীর্ঘ সময় নিরাপদে লুকিয়ে থাকা সম্ভব, এমন কি যদি সেই ব্যক্তি সুপরিচিতও হন। বিশেষ করে শেখ মুজিবুর রহমান যদি তাঁর বাড়ী ছেড়ে যেতে এবং গা ঢাকা দিতে চাইতেন তা হলে তাঁর জন্য সম্ভাব্য সবচেয়ে সুব্যবস্থা করা যেত। এটা ঠিক যে আওয়ামী লীগ ছিল একটি সাংবিধানিক দল এবং এর কোন গোপন রাজনীতির অভিজ্ঞতা ছিল না, কিন্তু গোপন আস্তানা তৈরীর জন্য গোপন রাজনীতির অভিজ্ঞতার কোন প্রয়োজন ছিল না।

অন্য বিষয়টি হল, যদি শেখ মুজিব তাঁর বাড়ী ছেড়ে চলে যেতেন তাহলে সেনাবাহিনী তাঁর খোঁজে জনগণের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ত, এটাও ছিল এক অদ্ভূত যুক্তি, কারণ মুজিব নিজেই বলেছিলেন যে সেনাবাহিনী একটি সর্বাত্মক অভিযানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটা এমন কোন অভিযান ছিল না যার মাধ্যমে পুলিশ রাজনৈতিক নেতা এবং নেতৃস্থানীয় কর্মীদের গ্রেপ্তারের জন্য হামলা করে থাকে। এটা একটা সাধারণ আক্রমণ যার মাধ্যমে সব ধরনের লোককে হত্যা ও নির্বিচারে আহত করা হয় এবং সাধারণ জনতার বিরুদ্ধে এটা একটা যুদ্ধ। মুজিব নিশ্চিতভাবেই সেটা জানতেন। আর তিনি যেভাবে বলেছিলেন, সেনাবাহিনী হামলার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়েছে আর তার অর্থ দাঁড়ায় যে তাঁর বাড়ীতে থাকা কিংবা অন্য কোথাও চলে যাওয়া ব্যতিরেকেই এটা ঘটবে। প্রকৃতপক্ষে এর ঠিক পরবর্তী পর্যায় যা ঘটেছিল তার মধ্য দিয়ে এটা পরিষ্কার হয়েছিল যে আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দসহ রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেপ্তার কিংবা হত্যা করা তাদের লক্ষ্য ছিল না, বরং তা ছিল জনগণ ও সেই সাথে সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মীদের ভীতি প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে জনগণের উপর একটি সর্বাত্মক, নির্বিচার সশস্ত্র আক্রমণ। তারা যদি আগেই আওয়ামী লীগের নেতাদের গ্রেপ্তার করতে চাইত তাহলে সেটা তারা সহজেই করতে পারত। আওয়ামী লীগ নেতাদের অবাধ চলাচল থেকে এটা প্রতিয়মান হয় যে ২৪ ও ২৫শে মার্চ তারিখে সম্ভাব্য গ্রেপ্তারের ব্যাপারে তাঁরা কোন সাবধানতা অবলম্বন করেন নি।

আওয়ামী লীগের সকল নেতা শেখ মুজিবের কাছে বাড়ী ছেড়ে আত্মগোপন করার জন্য আকুল আবেদন করেন। কিন্তু মুজিব তাঁর সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। এই প্রসঙ্গে তিনি এও বলেছিলেন যে সেনাবাহিনীর গণহত্যা থেকে তাঁর দেশবাসীকে রক্ষার জন্য নিজ বাড়ীতে তাঁর থাকা দরকার যদি তাতে সেনাবাহিনীর হাতে তাঁর মৃত্যু হয় তাহলেও।[১০]

এই কথা ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়েছে কারণ তাঁর সিদ্ধান্ত সেনাবাহিনীর ভয়ঙ্কর আক্রমণ থেকে জনগণকে রক্ষা করে নি। তিনি যা বলেছেন তা যদি সত্যিই বুঝিয়ে থাকেন, তাহলে এর সম্ভাবনা উপলব্ধি করতে না পারা তাঁর দিক থেকে ছিল বোকামী কারণ তাঁর দলের লোকজন এবং অন্যান্যরাও জানতেন যে এমন একটা আক্রমণ আসন্ন।

শেখ মুজিবের গৃহ ত্যাগ না করার সিদ্ধান্ত থেকে উদ্ভূত ২৫শে মার্চের পরিস্থিতি বর্ণনা করতে যেয়ে আমিরুল ইসলাম লেখেন;

সময় খুব দ্রুত চলে যাচ্ছিলো, সম্ভবতঃ খুব অল্প কালের মধ্যে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী এলাকায় চলে আসবে। আগেই সিদ্ধান্ত নেওয়া ছিল যে সবাই পুরনো ঢাকার একটি বাড়ীতে জড়ো হবেন। কিন্তু বাড়ী থেকে বেরিয়ে আসার প্রস্তাব বঙ্গবন্ধু কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় সে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে হয়। বঙ্গবন্ধুর বাড়ী না ছাড়ার সিদ্ধান্তে নেতৃবৃন্দ মর্মাহত হয়েছিলেন। তাজউদ্দীন তাঁর বাড়ীতে হতাশা নিয়ে বসেছিলেন। একভাবে বলতে গেলে তিনি নিজেকে তাঁর ভাগ্যের হাতে সমর্পণ করেছিলেন।[১১]

প্রকৃতপক্ষে শেখ মুজিবের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আওয়ামী লীগের নেতাদের কোন ধারণা ছিল না!

তিনি ২৫ ও ২৬শে মার্চের মধ্যবর্তী রাতে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী কর্তৃক গ্রেপ্তার হন। আগেই, ইয়াহিয়া খান ঢাকায় থাকা অবস্থায় তাঁকে গ্রেপ্তারের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ২৩শে মার্চ সারাদিন তিনি ঢাকা সেনানিবাসে অবস্থান করেন, জেনারেলদের সাথে বৈঠকে মিলিত হন, যেখানে সম্ভবতঃ শেখ মুজিবকে গ্রেপ্তারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং অপারেশন সার্চলাইট এর পরিকল্পনাসমূহ চূড়ান্ত করা হয়।[১২]

ঢাকায় আর্মি হেড কোয়ার্টার ২৩শে মার্চ শেখ মুজিবকে গ্রেপ্তারের প্রথম পদক্ষেপ গ্রহণ করে। মেজর জেনারেল এ.ও. মিঠার কমান্ডো ইউনিটের একজন সেনা অফিসার, তখন যিনি কুমিল্লা সেনানিবাসে কর্মরত ছিলেন, সেই মেজর জেড. এ. খানকে জরুরী ভিত্তিতে ২৩শে মার্চ ঢাকায় তলব করা হয় এবং ২৫শে মার্চ গ্রেপ্তারের ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিস্তারিত পরিকল্পনা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়।[১৩]

মেজর জেড. এ. খান, পরবর্তীতে ব্রিগেডিয়ার, The Way it Was শীর্ষক একটি গ্রন্থ রচনা করেন যেখানে তিনি ১৯৭১ সালের ঘটনাসমূহ বর্ণনা করেন। ২৩শে মার্চ কুমিল্লা থেকে একটি সি-১৩০ বিমানযোগে ঢাকা সেনানিবাসের দিকে যাত্রা দিয়ে তাঁর কাহিনী শুরু হয়।
ঢাকা বিমান বন্দরে আগমনের ঠিক পরপর কী ঘটেছিল তিনি তার একটি বর্ণনা দেন: মেজর বিলালকে জানিয়ে রাখা হয়েছিল যে আমি সি-১৩০-এ করে আসছি আর আমাকে অভ্যর্থনা জানাবার জন্য তিনি বিমান বন্দরে উপস্থিত ছিলেন। বিমান বন্দর থেকে অফিসার্স মেসে যাবার সময় পথে তিনি আমাকে বলেন যে তাঁর উপর নির্দেশ আছে আমাকে মার্শাল ল হেড কোয়ার্টারের কর্ণেল এস. ডি. আহমদের কাছে নিয়ে যাওয়ার। যেহেতু তখন বেলা পড়ে এসেছে তাই আমরা অফিসার্স মেসে কর্ণেলের কক্ষে যাই। সেখানে কর্ণেল আমাকে বলেন যে পরের দিন কিংবা তার পরের দিন আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করতে হবে এবং আমাকে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

(তারপর) শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তারের আনুষ্ঠানিক নির্দেশের জন্য আমাকে নির্দেশ দেওয়া হল ২৪শে মার্চ ১১টার সময় মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীর সাথে দেখা করতে। আমি জেনারেল সাহেবের অফিসে যাই এবং তিনি আমাকে বলেন যে পরের দিন রাতে মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করতে হবে। আমি তাঁর কথা শুনলাম, তাঁকে স্যালিউট করে যখন প্রস্থান করতে উদ্যত হয়েছি এমন সময় তিনি আমাকে থামালেন এবং জিজ্ঞেস করলেন তুমি শুনবে না এ কাজ কীভাবে করতে হবে? আমি তাঁকে বললাম যে নির্দেশ কীভাবে পালন করতে হয় তা বলে দেওয়ার কোন নিয়ম নাই, কিন্তু যেহেতু তাঁর মনে কিছু চিন্তা ভাবনা আছে সেটা তাই তিনি আমাকে বলতে পারেন। তারপর তিনি বললেন যে, একটি বেসামরিক গাড়ীতে আমার সাথে একজন অফিসারকে নিতে হবে এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করতে হবে। আমি বললাম বাড়ীর চার পাশে জনতার ভীড়ের পরিপ্রেক্ষিতে এক কোম্পানীর কম লোকবল নিয়ে এ কাজ করা যাবে না। তিনি বললেন যে তিনি একটি নির্দেশ দিচ্ছেন এবং তিনি যেভাবে নির্দেশ দিয়েছেন সেভাবেই করতে হবে। আমি তাঁকে বললাম যে এই নির্দেশ আমি গ্রহণ করছি না এবং তিনি এ কাজ করার জন্য অন্য কাউকে খুঁজে নিতে পারেন, এবং তিনি কিছু বলার আগেই আমি তাঁকে স্যালিউট করে তাঁর অফিস ত্যাগ করলাম।

আমি জানতাম আমি সমস্যার মধ্যে আছি। দিনের বাকি সময় আমি এমন কোথাও যাই নি যেখানে আমার সাথে যোগাযোগ করা যেত। আমাকে বলা হয়েছিল যে মেজর জেনারেল এ. ও. মিঠা পিআইএ-র একটি ফ্লাইটে আসছেন যেটা বিকেল ৫টায় পৌঁছবার কথা। যখন বিমানটি পৌঁছাল তখন আমি বিমান বন্দরে অপেক্ষা করছিলাম, জেনারেলের সাথে দেখা করলাম এবং যে নির্দেশ আমি পেয়েছি সে বিষয়টি, এবং বাড়ীর চার পাশে জনতার ভীড়ের মধ্যে বাড়ী পর্যন্ত গাড়ী চালিয়ে যেয়ে শেখ মুজিবকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব নয় সেটা তাঁকে বললাম। জেনারেল আমাকে বললেন তাঁর সাথে ৯টায় ইস্টার্ণ কমান্ড হেড কোয়ার্টারে দেখা করতে।

ইস্টার্ণ কমান্ডের কর্ণেল জি. এস. এর অফিস থেকে মেজর খানকে মেজর জেনারেল মিঠা জেনারেল হামিদের বাসায় নিয়ে গেলেন। মেজর জেড. এ. খান বলেন;

জেনারেল হামিদের বাসায় একটি ওয়েটিং রুমে আমি অপেক্ষা করছিলাম। প্রায় এক ঘন্টা পর আমাকে ডাকা হল এবং মেজর জেনারেল মিঠা আমাকে বললেন আমি তাঁকে যা যা বলেছি সেটা জেনারেল হামিদকে বলতে। জেনারেল হামিদ আমার কথা শুনলেন এবং তারপর মেজর জেনারেল রাও ফরমানকে টেলিফোন করলেন এবং বললেন তিনি আমাকে তাঁর কাছে পাঠাচ্ছেন এবং তিনি যেন আমার সকল প্রয়োজন মেটান। জেনারেল হামিদ তখন আমাকে বললেন যে আমাকেই শেখ মুজিবুব রহমানকে গ্রেপ্তার করতে হবে এবং তাঁকে জীবিত অবস্থায় ধরতে হবে। যখন আমি রওয়ানা হয়ে দরজা পর্যন্ত পৌঁছেছি, জেনারেল হামিদ আমার নাম ধরে ডাকলেন আর আমি যখন ঘুরে দাঁড়ালাম তিনি আবারও বললেন, মনে রেখ তাঁকে জীবিত অবস্থায় ধরতে হবে এবং তিনি যদি মারা পড়েন তাহলে আমি তোমাকে ব্যক্তিগতভাবে দায়ী করবো।

এভাবে জেনারেল হামিদের কাছ থেকে নির্দেশ পাবার পর জেড. এ. খান গাড়ী চালিয়ে মেজর জেনারেল ফরমান আলীর অফিসে চলে যান। সেখানে ফরমান আলী তাঁকে জিজ্ঞেস করেন তাঁর কী কী প্রয়োজন। ‘আমি তাঁকে বললাম,’ জেড. এ. খান লেখেন;
যে আমার তিনটি সৈন্য পরিবহণকারী যান এবং বাড়ীর মানচিত্র প্রয়োজন। বাড়ীর মানচিত্র তাঁর কাছে ছিল এবং তিনি সেটা আমাকে দিলেন এবং বললেন যে গাড়ীগুলো পাওয়া যাবে। আমি তখন তাঁকে বললাম যে জাপানী কনসালের বাসা শেখ মুজিবুর রহমানের বাসার পেছনে আর শেখ মুজিব যদি রাষ্ট্রদূতের বাড়ীতে চলে যান তাহলে আমার জন্য কী নির্দেশ থাকবে, তখন জেনারেল আমার বিচারবোধ ব্যবহার করার জন্য বললেন।

দিনটি ছিল ২৫শে মার্চ।
রুট এবং শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ীর একটা মডেল তৈরী করা হয়েছিল, গোলা-বারুদ ইস্যু করা হয়েছিল এবং সন্ধ্যার খাবার পর মেজর জেড. এ. খান করণীয় সম্পর্কে কোম্পানীকে একটি সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন। কোম্পানীটিকে তিনটি ভাগে বিভক্ত করা হয়, একটির নেতৃত্বে ছিল ক্যাপ্টেন সাইদ, দ্বিতীয়টির ক্যাপ্টেন হুমায়ুন ও তৃতীয়টির নেতৃত্বে ছিল মেজর বিলাল।

দুজন লোকসহ ক্যাপ্টেন হুমায়ুনকে একটি বেসামরিক যানে ও সাধারণ পোষাকে শেখ মুজিবের বাড়ীটি প্রদক্ষিণ ও পর্যবেক্ষণ করতে পাঠান হয়েছিল। তিনটি গ্রুপের সম্মিলন বিন্দু ছিল বিমান বন্দর চত্তরের ফটক যেটি এমএনএ হোস্টেলের দিকে মুখ করা আর রুটটি ছিল বিমান বন্দর, জাতীয় সংসদ ভবন, মোহম্মদপুর, ধানমন্ডি।

৯টার দিকে জেড. এ. খান বিমান বন্দরে পৌঁছান। ১০টার দিকে ক্যাপ্টেন হুমায়ুন শেখ মুজিবের বাড়ীর এলাকার খোঁজ খবর নিয়ে আসেন এবং জানান যে মোহম্মদপুর-ধানমন্ডি সড়কে প্রতিবন্ধক তৈরী করা হচ্ছে। সড়ক প্রতিবন্ধক অপসারণের সময়কে হিসেবে নিয়ে মেজর খান মধ্যরাত থেকে অপারেশন শুরুকে ১১টায় নিয়ে আসেন। তাই তাঁরা রাত ১১টায় বিমান বন্দর থেকে মহম্মদপুরের দিকে রওয়ানা হন।
কাহিনী এগিয়ে চলে।

২৫ ও ২৬শে মার্চের মধ্যবর্তী রাতে আমরা বিমান বন্দর থেকে যে রাস্তা এমএনএ হোস্টেলের দিকে গেছে সেই রাস্তায় যেয়ে সেখান থেকে মোহম্মদপুর মুখী রাস্তা ধরে অগ্রসর হই। রাস্তার বাতিগুলো নেভান ছিল আর দালানগুলো অন্ধকার ছিল, আমার জীপের হেডলাইট পুরোপুরি জ্বালান ছিল আর সিগনাল কোরের সৈন্যবাহী যে গাড়ীগুলো ছিল সেগুলো বিনা বাতিতেই অনুসরণ করছিল। ঘন্টায় কুড়ি মাইলের মত গতিতে গাড়ী চালিয়ে গাড়ী বহর বাঁ দিকে মোহম্মদপুর-ধানমন্ডি সড়কে বাঁক নেয়। ধানমন্ডি থেকে সিকি মাইল দূরত্বে ট্রাক আর অন্যান্য গাড়ী দিয়ে আড়াআড়িভাবে রাস্তা বন্ধ করা ছিল… আমরা দুশো গজ যেতেই আরও একটি সড়ক প্রতিবন্ধক ছিল, এবারে ছিল দুই ফুট ব্যাসের কিছু সংখ্যক পাইপ, যেগুলোর দৈর্ঘ্য দুটি উঁচু দেওয়ালের মধ্যবর্তী রাস্তাকে পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়… আমরা আরও দুশো গজ গেলাম আর আরও একটা সড়ক প্রতিবন্ধক ছিল, এবারে চার ফুট গভীর ও তিন ফুট উঁচু ইটের স্তুপ। আমরা সৈন্য পরিবহণকারী গাড়ীর সাহায্যে ধাক্কা দিয়ে প্রতিবন্ধক সরাতে চেষ্টা করেছি কিন্তু গাড়ী যাবার জন্য পথ তৈরী করতে পারি নি। আমি তখন ক্যাপ্টেন সাইদের গ্রুপকে নির্দেশ দিলাম হাত লাগিয়ে একটা ফাঁক তৈরী করতে যাতে গাড়ীগুলো চলে যেতে পারে আর বাকি সব সৈন্যদের বললাম গাড়ী থেকে নেমে পায়ে হেঁটে অগ্রসর হতে।

আমরা মোহম্মদপুর-ধানমন্ডি সড়ক ধরে শেখ মুজিবের বাড়ী যে রাস্তায় সেই রাস্তায় উঠে ডান দিকের গলিতে মোড় নিলাম যেটা বাড়ী আর লেকের মধ্যে অবস্থিত। ক্যাপ্টেন হুমায়ুনের গ্রুপ শেখ মুজিবের বাড়ী সংলগ্ন বাড়ীটিতে প্রবেশ করে, বাড়ীর কম্পাউন্ডের মধ্য দিয়ে দৌড় দিয়ে দেওয়ালের উপর দিয়ে লাফ দিয়ে শেখ মুজিবের বাড়ীতে প্রবেশ করে। গুলি চালান হয়, বাড়ীর ভেতর থেকে কিছু লোক দৌঁড়ে ফটক দিয়ে পালায়, একজন লোক মারা যায়। বাড়ীর বাইরের পূর্ব পাকিস্তান পুলিশের প্রহরীরা তাদের ১৮০ পাউন্ড তাঁবুতে প্রবেশ করে, খুঁটিসহ তাঁবু তুলে নেয় এবং দৌঁড়ে লেকের মধ্যে গিয়ে পড়ে। শেখ মুজিবের বাড়ীর কম্পাউন্ড ছিল নিরাপদ, তা ছিল ঘন অন্ধকারাচ্ছন্ন, মুজিবের এবং সংলগ্ন বাড়ীগুলোতে কোন আলো ছিল না।

তারপর গৃহ তল্লাশী পার্টি বাড়ীতে প্রবেশ করে, শেখ মুজিবের একজন গার্ডকে পথ প্রদর্শন করে একজন সৈনিক তার পাশাপাশি হাঁটছিল। বাড়ীর দিকে কিছুটা পথ যাওয়ার পর সেই গার্ডটি একটি ‘দা’, একটি লম্বা ছোরা টেনে বের করে তার পথ প্রদর্শককে আক্রমণ করে বসে, সে জানত না যে তাকে পেছন থেকে কাভার দেওয়া হচ্ছে। তাকে গুলি করা হল, কিন্তু সে মারা যায় নি। নীচের তলায় সন্ধান চালান হল কিন্তু সেখানে কাউকে পাওয়া গেল না, তল্লাশী পার্টি উপর তলায় গেল, যে কক্ষগুলো খোলা ছিল সেগুলোয় কেউ ছিল না, একটা কক্ষে ভেতর থেকে ছিটকিনি লাগান ছিল। আমি যখন উপর তলায় গেলাম তখন কেউ একজন বলল যে বন্ধ কক্ষটি থেকে একটা শব্দ আসছে। আমি মেজর বিলালকে বললাম বন্ধ ঘরের দরজাটা ভেঙে ফেলতে এবং নীচ তলায় যেয়ে দেখতে ক্যাপ্টেন সাইদ পৌঁছেছে কি না এবং জনতার ভীড়ের কোন চিহ্ন আছে কিনা…

আমি যখন ক্যাপ্টেন সাইদকে নির্দেশ দিচ্ছিলাম কীভাবে গাড়ীগুলোর ব্যবস্থা করতে হবে, তখন একটা গুলি হল, তারপর হল একটা গ্রেনেড বিস্ফোরণের শব্দ, তারপর একটি সাব-মেশিন গানের বার্স্ট। আমার কাছে মনে হল কেউ শেখ মুজিবকে মেরে ফেরেছে। আমি দৌড়ে বাড়ীতে আর উপর তলায় গেলাম আর সেখানে যে কক্ষটি বন্ধ ছিল তার দরজার বাইরে একজন খুবই বিধ্বস্ত শেখ মুজিবকে দেখতে পেলাম।

এরপর তিনি এর ঠিক আগে কী ঘটেছিল তার বর্ণনা দেন;

পরে আমি জানতে পারলাম যে মেজর বিলালকে উপর তলায় বন্ধ দরজাটা ভাঙতে বলে আমি যখন গাড়ীগুলোর তদারকিতে গিয়েছিলাম, তখন কেউ একজন মেজর বিলালের লোকজন যে ঘরটায় জড়ো হয়েছিল সেই ঘরে একটা পিস্তলের গুলি চালায়, সৌভাগ্যক্রমে কেউ আঘাত পায় নি। কেউ তাকে থামাবার আগেই একজন সৈনিক যে বারান্দা থেকে পিস্তলের গুলি এসেছিল সেই বারান্দায় একটি গ্রেনেড ছোঁড়ে এবং তারপর তার সাব-মেশিন গান থেকে গুলি করে। গ্রেনেডের বিস্ফোরণ আর সাব-মেশিন গান থেকে ছোঁড়া গুলির প্রতিক্রিয়ায় শেখ মুজিব বন্ধ দরজার ভেতর থেকে বলেন যে তাঁকে হত্যা করা হবে না এমন আশ্বাস দেওয়া হলে তিনি বেরিয়ে আসবেন। তাঁকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল আর তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছেলিন। যখন তিনি বেরিয়ে আসেন তখন হাবিলদার মেজর খান ওয়াজির, পরবর্তীতে সুবেদার, তাঁর মুখে সজোরে এক থাপ্পড় মারে।

এরপর কী ঘটল তা মেজর খান বর্ণনা করেন;

আমি শেখ মুজিবকে বললাম আমার সাথে যেতে, তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন তাঁর পরিবারকে বিদায় জানিয়ে আসতে পারবেন কি না আর আমি তাঁকে সেটা করতে বললাম। তিনি ঘরে ঢুকলেন যেখানে পরিবারের লোকজন জড়ো হয়ে ছিল আর তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এলেন। যেখানে গাড়ীগুলো ছিল আমরা সেই দিকে হেঁটে গেলাম। আমি বেতার যন্ত্র মারফত পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডকে খবর দিলাম যে আমরা শেখ মুজিবকে ধরতে পেরেছি।

নিজের বর্ণনা অব্যাহত রেখে মেজর খান লেখেন;

শেখ মুজিব তারপর আমাকে বলেন যে তিনি তাঁর পাইপের কথা ভুলে গেছেন। আমি তাঁর সাথে হেঁটে ফিরে গেলাম আর তিনি তাঁর পাইপটা নিয়ে এলেন। এই সময়ের মধ্যে শেখ মুজিব নিশ্চিত হলেন যে আমরা তাঁর ক্ষতি করব না এবং আমাকে বললেন যে আমরা তাঁকে ডাকলে তিনি নিজেই চলে আসতেন।

শেখ মুজিবকে সৈনিক পরিবহনকারী গাড়ীগুলোর মধ্যেরটিতে উঠানো হল আর সেগুলো সেনানিবাসের দিকে রওয়ানা হল। সেই সময় মেজর জেড. এ. খান উপলব্ধি করলেন যে যদিও তাঁকে শেখ মুজিবকে গ্রেপ্তার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল কিন্তু বলা হয় নাই যে তাঁকে তিনি কোথায় নিয়ে যাবেন এবং কার কাছে তাঁকে হস্তান্তর করতে হবে। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন তাঁকে প্রথমে জাতীয় সংসদ ভবনে নিয়ে যাবেন আর সেখানে ধরে রাখবেন, আর নির্দেশের জন্য তিনি সেনানিবাসে ফিরে যাবেন। শেখ মুজিবকে জাতীয় সংসদ ভবনে নিয়ে যাওয়া হল এবং সিঁড়ি দিয়ে উঠিয়ে দুই ধাপ সিঁড়ির মধ্যে এক জায়গায় বসতে দেওয়া হল।

মেজর খান মার্শাল ল হেড কোয়ার্টারে গেলেন যেখানে লে. জেনারেল টিক্কা খান তাঁর হেড কোয়ার্টার স্থাপন করেছিলেন। সেখানে তাঁর সাথে ব্রিগেডিয়ার গুলাম জিলানী খানের সাথে দেখা হয় যিনি পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের চিফ অভ স্টাফের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন, এবং তাঁকে বলেন যে তিনি শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করেছেন। তিনি মেজর খানকে টিক্কা খানের অফিসে নিয়ে যান এবং তাঁর কাছে রিপোর্ট করতে বলেন।

শেখ মুজিবের গ্রেপ্তার সম্পর্কে টিক্কা খান আগেই নিশ্চয় জেনেছেন, কেন না তিনি বেশ হালকা মেজাজেই ছিলেন আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে অবহিত হবার প্রত্যাশায়। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় আটকের সময় তাঁকে যে ঘরটিতে রাখা হয়েছিল সেই ঘরটিতেই তাঁকে রাখার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এভাবে তাঁকে ১৪ ডিভিশনের অফিসার্স মেসে নিয়ে যাওয়া হয় এবং একটি পৃথক বর্ধিত এক-শয্যা বিশিষ্ট ঘরে রাখা হয় আর বাইরে একজন প্রহরী মোতায়েন করা হয়।

পরের দিন মেজর জেনারেল মিঠা মেজর জেড. এ. খানকে জিজ্ঞেস করেন শেখ মুজিবকে কোথায় আটক করে রাখা হয়েছে। জায়গাটা সম্পর্কে শুনতে পেয়ে তিনি খুবই বিরক্ত হন এবং বলেন যে, পরিস্থিতি বোঝার ব্যাপারে সম্পূর্ণ ভুল ধাণা রয়েছে এবং মেস থেকে তাঁকে উদ্ধার করার একটা পদক্ষেপ খুব সহজেই হতে পারে। তিনি শেখ মুজিবকে একটি স্কুল ভবনের চার তলায় সরিয়ে নেন।

আওয়ামী লীগের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করার মূল কারণ হল রাজনৈতিক অগ্রগতি একটা পর্যায়ে এসে দাঁড়ানোর সময় যখন সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য ও সংগ্রামের পরিকল্পনার প্রয়োজন ছিল তখন তিনি রাজনৈতিক নেতা হিসেবে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছিলেন।

শেখ মুজিব এবং তাঁর পার্টির উভয় সংকট ছিল। একদিকে স্বাধীনতার জন্য ছাত্রদের পক্ষ থেকে আপোষহীন দাবী, অন্যদিকে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে এমন এক দাবী উত্থাপন করলে সামরিক এ্যাকশনের ঝুঁকির মুখে পড়া। সেই অবস্থায় আওয়ামী লীগের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া বিকল হয়ে পড়ে ও তার নেতৃত্ব তাসের ঘরের মত ভেঙে পড়ে।

যেসব ছাত্রলীগ নেতা স্বাধীনতার জন্য উচ্চকণ্ঠ ধ্বনি তুলছিলেন সে দাবীর পূর্ণ অর্থ কী দাঁড়ায় সে বিষয়ে তাঁদের খুব সামান্য কিংবা একেবারেই কোন ধারণা ছিল না। তাঁদের এ বিষয়েও কোন ধারণা ছিল না যে কেন্দ্রীয় সরকার সে দাবী প্রত্যাখ্যান করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিল এবং তারা সেটা করলে তার পরিণতি কী হবে। শেখ মুজিব ৭ই মার্চ সম্ভাব্য স্বাধীনতার বিষয়ে তাঁর ধ্বনি সর্বস্ব ভাষণের মাধ্যমে একটি মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে চেয়েছিলেন এবং তারপর তাঁর অহিংস, অসহযোগ আন্দোলনের পথ অনুসরণ করেছিলেন। কিন্তু প্রতিটি অতিক্রান্ত দিনের সাথে সাথে ছাত্র, গোটা জনগণ, সেনাবাহিনীর বাঙালী অফিসার এবং সৈনিকদের মেজাজ উপরে উঠতে থাকে, এবং তার সাথে সংগতিপূর্ণভাবে জনগণের উপর একটি বড় রকম আঘাত হানার প্রস্তুতিও পাকিস্তানী সেনাবাহিনী চালাতে থাকে।

ঘটনা প্রবাহে শেখ মুজিব অথর্ব হয়ে পড়েন এবং তাঁর বাড়ীতে থাকার সিদ্ধান্তের ব্যাপারেই অটল থাকেন, যা এমন এক কর্ম যেটা নিজেকে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্তের থেকে কম কিছু ছিল না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হল বিকল্প প্রক্রিয়ার ভীতিই তাঁকে এভাবে কাজ করতে পরিচালিত করে।

তিনি আত্মগোপনে যেতে চান নি কারণ গ্রেপ্তার এড়াবার প্রচেষ্টা কালে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে কী করতে হবে তা তাঁর জানা ছিল না। একটি সশস্ত্র প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে একটি গেরিলা যুদ্ধ সংগঠিত করতে তিনি সক্ষম ছিলেন না এবং এমন একটি যুদ্ধ চালিয়ে যাবার মত তাঁর কোন সংগঠন ছিল না। যে ভারত সরকারের ব্যাপারে তিনি প্রচ- সন্দেহপ্রবণ ছিলেন, স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু করার জন্য সাহায্য নিতে সেই ভারতে তিনি যেতে চান নি। একটি স্বাধীনতা সংগ্রামে সহায়তার জন্য তাদের সাহায্য চাওয়া আর তাদের অধীনে এমন একটি সংগ্রামকে সংগঠিত করা ছিল দুটো ভিন্ন বিষয়। পরেরটির ব্যাপারে শেখ সাহেবের ছিল বড় ধরনের অনাগ্রহ।

এই পর্যায় পাকিস্তানে, বিশেষ করে পূর্ব পাকিস্তানে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে মাকিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের প্রতি দৃষ্টিপাত করা প্রয়োজন।

নিকট প্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার জন্য নিযুক্ত এনএসসি ইন্টার-ডিপার্টমেন্টাল গ্রুপের চেয়ারম্যান, জোসেফ জে. সিসকো-র পক্ষ থেকে ২রা মার্চ ওয়াশিংটনের স্টেট ডিপার্টমেন্টে পাঠানো একটি দীর্ঘ প্রতিবেদনে [১৪] বলা হয়;

সাম্প্রতিক নির্বাচনের সময় থেকে আওয়ামী লীগ একটি দৃঢ় রাজনৈতিক সংগঠনের চাইতে বেশী মাত্রায় একটি জাতীয়তাবাদী গণ-আন্দোলন হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সময়ের সাথে সাথে তার কর্মসূচী বাস্তবায়ন করা আর পূর্ব পাকিস্তানের হতদরিদ্র জনগণের আশা আকাঙ্খা পূরণ করা তার পক্ষে কঠিন হয়ে পড়বে। তার নিজের কমীদের পক্ষ থেকে দল ত্যাগের এবং সংগঠনবহির্ভূত চরম বামদের ক্রমবর্ধমান বিরোধিতার মুখোমুখী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সে কারণে পূর্ব পাকিস্তানে দূর ভবিষ্যতে বর্ধিত আকারে চরমপন্থা ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

বাস্তবতঃ তা-ই হয়েছিল।
একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে;

আমাদের অপরিবর্তনীয় অবস্থান হল যে দুটো স্বাধীন রাষ্ট্রের চাইতে ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তানে মার্কিন স্বার্থ উত্তমভাবে রক্ষিত হবে। পশ্চিম পাকিস্তানে ৬১ মিলিয়ন আর পূর্ব পাকিস্তানে ৭৬ মিলিয়ন জনসংখ্যা। আমরা সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে সংযুক্ত একটি পূর্ব পাকিস্তানের তুলনায় একটি স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান আভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক বন্ধ্যাত্ব এবং বহিরাগত আঘাতের মুখে অধিকতর নাজুক। আমরা আরও সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে ভারতের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানীদের বৈরিতার কিছুটা কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানীদের একটা প্রভাব আছে। চূড়ান্ত পর্যায় আমরা স্বীকার করে নিয়েছি যে ইসলামাবাদ সরকারের সাথে আমাদের একটি সন্তোষজনক সম্পর্ক বজায় রাখতে হলে পাকিস্তানের ঐক্যকে সমর্থন করা ছাড়া আমাদের আর কোন বিকল্প নেই।[১৫]

এটাই ছিল মূল মার্কিন অবস্থান, কিন্তু ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের প্রথম দিকেও পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাকে তারা পুরোপুরি উড়িয়ে দেয় নি। এ ধরনের একটি পরিণতির জন্য তাদের কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতি সাপেক্ষ পরিকল্পনা ছিল।

১৯৭১ সালের ১৫ই মার্চ জোসেফ জে. সিসকো ওয়াসিংটন ডিসি-র স্টেট ডিপার্টমেন্টে আরও একটি গোপন প্রতিবেদন পাঠান যাতে বলা হয়;

আজ দিনের প্রথম লগ্নে ঢাকায় শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করেন যে তাঁর পার্টি, আওয়ামী লীগ, প্রাদেশিক পরিষদে সংখ্যাগুরু (৩০০-র মধ্যে ২৮৮) হওয়ার সুবাদে পূর্ব পাকিস্তানের ক্ষমতা হাতে তুলে নিচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের মার্শাল ল প্রশাসন, যা পাকিস্তান সরকার হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে, তাকে অগ্রাহ্য করে মুজিব এক-পাক্ষিকভাবে কাজ করেন। বাস্তবতঃ মুজিবের ঘোষণায় প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণে ৩৫টি ‘নির্দেশ’ ছিল যা থেকে দেখা যায় যে এটা ছিল একটি স্বতঃপ্রণোদিত ও সতর্কভাবে পরিকল্পিত পদক্ষেপ।

এই পদক্ষেপ গ্রহণ করতে যেয়ে মুজিব সরাসরি ইয়াহিয়া সরকারের সাথে সংঘাতে লিপ্ত হন কিন্তু সতর্কতার সাথে পূর্ব পাকিস্তানের শর্তহীন স্বাধীনতা ঘোষণা করাকে এড়িয়ে যান এবং তাঁর কর্মকে জনগণের ‘গণতান্ত্রিক’ কণ্ঠস্বরের ভিত্তির উপর স্থাপন করেন, যা ডিসেম্বর নির্বাচনে ব্যক্ত হয়েছিল।

আর তারপর,
যদি ইয়াহিয়া কিংবা মিলিটারীর আর কেউ শক্তি দিয়ে মুজিবকে প্রতিরোধ করার সিদ্ধান্ত নেয় তাহলে মিলিটারী ও বাঙালী জাতীয়তাবাদীদের মধ্যে বেধে যাওয়া সংঘাতে পূর্ব পাকিস্তান নিমজ্জিত হয়ে যাবে, শেষ পর্যন্ত যার ফল হবে বাঙলার স্বাধীনতা আর পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে সকল বন্ধন ছিন্ন – যদি না, যা শেষ পর্যন্ত হবে বলে মনে হয় না, সেনাবাহিনী কৃতকার্যতার সাথে একটি বিদ্রোহ মোকাবেলা করতে পারে। জনগণের প্রতি মুজিবের বিবৃতিতে আহ্বান জানানো হয়েছিল তাদের বিরুদ্ধে যে কোন শক্তি প্রয়োগ করা হোক না কেন তারা যেন ‘সম্ভাব্য সকল উপায়ে’ তা প্রতিরোধ করেন।

দিনটি ছিল ১৫ই মার্চ। The American Papers: Secret and Confidential India-Pakistan-Bangladesh Papers, 1965-1973 (রোয়েদাদ খান কর্তৃক সম্পাদিত, ইউপিএল, ঢাকা, ১৯৯৯), যাতে ইসলামাবাদ, ঢাকা, নতুন দিল্লী, কলকাতা, এবং অন্যান্য জায়গা থেকে নিয়মিত পাঠানো বার্তার কথা আছে তাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় অর্থাৎ ১৫ থেকে ২৯শে মার্চের মধ্যবর্তী সময়ের কোন প্রতিবেদন নেই! পরিষ্কারভাবে এর অর্থ এই দাঁড়ায় যে এই সময়ের মধ্যে পাঠানো দলিলপত্র এমনকি আটাশ বছর পরও অপ্রকাশিত থেকে গেছে। মজার ব্যাপার হল ঠিক এই সময়টাতেই মার্কিন রাষ্ট্রদূত ফারল্যান্ড ও সেই সাথে ইয়াহিয়া খান ও অন্যান্য সরকারী ও সামরিক কর্মকর্তা এবং শেখ মুজিবুর রহমান নিজেও ঢাকায় অবস্থান করছিলেন। সে সময় শেখ মুজিবের সাথে ফারল্যান্ডের নিশ্চয় যোগাযোগ হয়েছিল।

মধ্য মার্চের পর পরিস্থিতি এমন এক অবস্থায় পৌঁছে যখন এটা অনেকের কাছে ও সেই সাথে মার্কিনীদের কাছেও পরিষ্কার হয়ে যায় যে রাজনৈতিক সংকট একটা না ফেরার বিন্দুতে পৌঁছে গেছে এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মধ্যে গৃহযুদ্ধ আর এড়ানো সম্ভব নয়। মার্কিন প্রতিনিধিরা এও উপলব্ধি করে যে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে একটি হামলা অত্যাসন্ন এবং এরকম পরিস্থিতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে একটা অবস্থান নিতে হবে এবং তারা সেটা নিয়েও ছিল। তারা ইয়াহিয়া খান ও তাঁর সরকারের পক্ষাবলম্বন করেছিল কিন্তু একই সময় তারা পাকিস্তানের ঐক্য সংরক্ষণে শেখ মুজিবুর রহমানকে একটি আগ্রহী অংশ হিসেবে পেতে চেয়েছিল।

তারা স্বাধীনতা সংক্রান্ত বিষয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের দোদুল্যমান অবস্থান, স্বাধীনতাপন্থী ছাত্রলীগ নেতাদের সাথে তাঁর মতপার্থক্য সম্পর্কে অবহিত ছিল। তাই এটা খুবই সম্ভব ছিল যে সেই সংকটপূর্ণ সন্ধিক্ষণে তারা পাকিস্তানের ঐক্য সংরক্ষণে মুজিবের সাহায্য গ্রহণ করতে চেয়েছিল।

শেখ মুজিব, যিনি স্বাধীনতার ব্যাপারে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন রাখতে চেয়েছিলেন এবং একই সময় একটি ফেডারেল কাঠামোর মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের সর্বোচ্চ স্বাধিকার চেয়েছিলেন, তাঁরও প্রয়োজন ছিল সাহায্য ও সমর্থনের।
এতে বিস্মিত হবার কিছু ছিল না যদি এই সাহায্য পাকিস্তানে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ফারল্যান্ডের কাছ থেকে এসে থাকে। ফারল্যান্ড একজন অনাগ্রহী দর্শক হিসেবে পূর্ব পাকিস্তানে আসেন নি। সেই সময় গণনাযোগ্য সকলের সাথেই তাঁর যোগাযোগ ছিল যার মধ্যে ছিলেন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান, শেখ মুজিবুর রহমান এবং সেনাবাহিনীর জেনারেলরা। তাঁর কাছেও এটা পরিষ্কার ছিল যে আওয়ামী লীগ ও সরকারের মধ্যে চলমান সংলাপ ভেঙে পড়তে যাচ্ছে এবং সেনাবাহিনী আওয়ামী লীগ ও জনগণের উপর একটি আক্রমণ চালাতে প্রস্তুত আছে।

পূর্ব বাঙলার পরিপূর্ণ স্বাধীনতা চাওয়ার ব্যাপারে শেখ মুজিবের দ্বিধা সম্পর্কে ফারল্যান্ড অবগত ছিলেন এবং এ কারণে শেখ মুজিবের উভয় সংকট সম্পর্কে জানতেন। অতএব এটা পরিষ্কার ছিল যে ফারল্যান্ড তাঁকে এমন একটা অবস্থান নিতে উৎসাহিত করবেন যা পাকিস্তানের ঐক্যকে নিশ্চিত করে এবং এভাবে একটি সশস্ত্র সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব থেকে তাঁকে অব্যাহতি দেয়।

এটা খুবই সম্ভব ছিল যে ফারল্যান্ড বলেছিলেন যদি পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে মোতায়েনও করা হয়, পরিস্থিতি দ্রুততার সাথে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনা হবে এবং আওয়ামী লীগ ও সরকারের মধ্যে সংলাপ পুনরায় শুরু হবে। তাই তিনি যদি তাঁর নিজ গৃহে অবস্থানের সিদ্ধান্ত নেন, সে ক্ষেত্রে ইয়াহিয়া খানের সাথে পরামর্শ করে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের পক্ষ থেকে তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।

এগুলো কোন ভিত্তিহীন অনুমান নয়। জেনারেল হামিদ বারবার মেজর জেড. এ. খানকে নির্দেশ দেন যেন শেখ মুজিবকে জীবিত অবস্থায় ধরা হয়। এটা মনে করা খুবই যুক্তি সংগত যে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ও পাকিস্তানী সেনাবাহিনী উভয়ই তাদের নিজ নিজ ভিন্ন ভিন্ন কারণে শেখ মুজিবকে পাকিস্তানের ঐক্য সংরক্ষণের অথবা অন্ততঃপক্ষে একটি ঢিলেঢালা ফেডারেশনের পরিকল্পনা কাজে লাগাবার ক্ষেত্রে মূল্যবান অবলম্বন হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন।

এ ব্যাপারে একটি মজার বিষয় হচ্ছে যে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী কর্তৃপক্ষ খুব ভালভাবেই জানত যে শেখ মুজিবুর রহমান অন্যান্যদের মত পালাবেন না এবং তিনি গ্রেপ্তার বরণের জন্য তাঁর সুবিধামত বাড়ীতে অবস্থান করবেন। তাঁর বাড়ীর চার ধারে তাঁর সমর্থকরা যতই অনিশ্চয়তা অনুভব করুন না কেন, যা নিশ্চিত ছিল তা হল ২৫শে মার্চ রাতে শেখ মুজিব তাঁর ধানমন্ডির বাড়ীতে অবস্থান করবেন।

তথ্যসূত্র
1.Abdul Malek Ukil, Bangladesh Freedom War Documents (BFWD) (Bangladesh Shadhinata Juddho Documents), vol, 15, p. 55; Amirul Islam, BFWD, vol. 15, p. 84.
2.Amirul Islam, ibid.
3.Kamal Hossain, BFWD, vol, 15, p. 287.
4.Ibid.
5.Ibid.
6.A.K. Khondkar, BFWD, vol. 15, p. 29.
7.Amirul Islam, BFWD, vol. 15, p. 87.
8.Rehman Sobhan, BFWD, vol. 15, p. 390.
9.Amirul Islam, BFWD, vol. 15, p. 85.
10.Ibid.
11. Kamal Hossain, BFWD, vol. 15, pp. 276-7.
13.Brigadier (Retd) Z.A. Khan, The Way it Was, Internet.
14.Roedad Khan, The American Papers: Secret and Confidential India-Pakistan-Bangladesh Documents 1965-73, p. 507.
15.Ibid., p. 506.
16.Ibid., p. 522.
17.Ibid, p. 87. মূল ইংরেজী থেকে বাংলায় অনুবাদ: মুঈনুদ্দীন আহ্‌মদ

লেখক : আহমেদ মহিউদ্দিন

Comments

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

মেইল ট্রেন
মেইল ট্রেন এর ছবি
Offline
Last seen: 6 months 4 weeks ago
Joined: শনিবার, এপ্রিল 26, 2014 - 5:56অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

ফেসবুকে ইস্টিশন

SSL Certificate
কপিরাইট © ইস্টিশন.কম ® ২০১৬ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর