নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 8 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • অভিজিৎ
  • ড. লজিক্যাল বাঙালি
  • মাইকেল অপু মন্ডল
  • সজীব সাখাওয়াত
  • নরসুন্দর মানুষ
  • সুবর্ণ জলের মাছ
  • নুর নবী দুলাল
  • সাইয়িদ রফিকুল হক

নতুন যাত্রী

  • হুসাইন মাহমুদ
  • অচিন-পাখী
  • শুভ্র আহমেদ বিপ্লব
  • রোহিত
  • আকাশ লীনা
  • আশরাফ হোসেন
  • হিলম্যান
  • সরদার জিয়াউদ্দিন
  • অনুপম অমি
  • নভো নীল

আপনি এখানে

রূপচাঁদা কঙ্কাল’ : অন্যরকম পাঠোদ্ধার


বাংলাদেশ কবি ও কবিতার দেশ। এ দেশের নান্দনিক নৈসর্গই কবি-লেখক হওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করে। সাগর, পাহাড়, নদী, ঝর্না শোভিত কক্সবাজারের শেকড় সন্ধানী কবি সিরাজুল হক সিরাজের প্রথম কাব্য গ্রন্থ ‘‘রূপচাঁদা কঙ্কাল”। ২০০৯ সালের একুশে বই মেলায় চট্টগ্রামের বলাকা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়। সাগরপাড়ের এ কবি কাব্যগ্রন্থে অলংকার, কাব্যরীতি, আঞ্চলিক শব্দের প্রয়োগ,মাত্রা প্রভৃতি ব্যাকরণিক সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। কবি সিরাজুল হক সিরাজ আশির দশকের শেষ ভাগ হতে কবিতা লিখে আসছেন। গ্রন্থিত হয়েছেন ২০০৯ সালের একুশে বই মেলায়। পেশায় কলেজ শিক্ষক এই কবি আজীবন একটি সুর বিভিন্ন ব্যাঞ্জনায় গাইতে চেয়েছেন বলে মনে হয়,কবি সিরাজ মূলতঃ উচ্ছ্বাসের মধ্য দিয়ে হতাশার কবিতা লিখে চলেছেন। তাঁর কবিতায় উপমা উৎপেক্ষা রূপক শিল্পের অভাব না থাকলেও শব্দ ব্যবহারে আদৌ সংযত নন। যদিও কারো কারো মতে ‘শব্দই কবিতা’ এবং ‘উপমাই কবিত্ব’ হয়। তবে শব্দের ব্যবহারের ক্ষেত্রে তিনি সংযত নন। শুধু পাঁজর কিংবা রূপচাঁদা শব্দ দুটির বহু ব্যবহার আমার কাছে বৈচিত্র্যহীন মনে হয়েছে। বিচ্ছেদ কিংবা বিরহের বিষয়টি কবিতার পর কবিতায় এভাবে লিখা স্বাভাবিক। সব চেয়ে উপলব্ধি করার বিষয়টি হচ্ছে পাঠক যেন ক্লান্তিবোধ না করেন। তবু আমরা কবি সিরাজের কবিতায় খুঁজে পাই উজ্জ্বল উজ্জ্বল পংক্তি-
”কবিরা তো পৃথিবীর অরণ্যে দ্যুতিময় অবুঝ পাথর/কোনদিন কোনো বনকুড়ানি দেখবে না-/কানা রাজার সুড়ঙ্গে/জোছনা কাফনে মোড়া জলন্ত পালক।
তাঁর এ কবিতাটি পাঠককে আশ্চর্যভাবে সম্মোহিত করে। বনকুড়ানীর শিল্প বুঝেনা বলে তাদের কোচড়ে থাকে-ঝারা পাতার মর্মর ধ্বনির বদলে কাঠ,আদা,মাঙ্গুনি(থানকুনি), তারা, সবজি,বাক্কুম গোলা,বেতফল ইত্যাদি। কিন্তু পাখির গান কিংবা ঝিঁঝিঁর ক্রন্দন মুখষ্ট না করলেও সৃষ্টির মাথায় মানকচুর পাতা দেয়। বৃষ্টিতে ছাতার বদলে মানকচুর পাতার চিত্রকল্পটি অসাধারণ।

নব্বইয়ের মাটি গন্ধা শব্দ সংসারী এ কবি। ইনানীর রেতবলি ও পাহাড়ের পাদদেশে হাজার পালং এর দেশে(অঞ্চলে)’র বালুখালীতে জন্ম নেয়া এ কবি বেড়ে উঠে অন্য দশজন গ্রাম্য বালকের মতো সহজ সরলভাবে। নাফ-রেজুর মোহনায় ঘুড়ি উড়ানো রোসাঙ্গ কুমারীদের লীলায়িত পথ চলা তাঁকে অনিয়ন্ত্রিক আবেগের স্বপ্নবান করে তুলেছে। তাঁর কবিতায় মাটির সোদা স্বাদ গন্ধ পাওয়া। অল্প বিস্তর আধ্যাত্ম চর্চাও কবিতায় প্রতিফলিত হয়। সময়ের তীব্র গতিতে পথা চলা কবি সিরাজের ধাতে নেই। তাঁর কাব্যগীতি তাঁকে ক্ষেত্রবিশেষে দুর্বল করে। কিন্তু কবি সিরাজের কবিতার ছন্দ সচেতনতা,লোকজ শব্দ চিত্রকল্পের মাধ্যমে অনায়াস ব্যবহার,আঞ্চলিক শব্দের বাহুল্যতা ও আঞ্চলিক প্রবাদ প্রবচনের ব্যবহার সমকাল থেকে পৃথক একটি ধ্রুপদী জগতে নিয়ে চলে। তিনি আঞ্চলিক শব্দ তাঁর প্রতিটি কবিতায় এমনভাবে প্রয়োগ করেছেন যাতে আঞ্চলিক কি চলিত শব্দ সেটা চেনা দায়ী। তথাপি শব্দ চয়নগত দূর্বলতা উল্লেখ করা নিশ্চয় কবির সহ্য শক্তিকে খাটো করেনা। অন্ত্যমিল দেবার মত রয়েছে প্রয়াস।
‘গহীন আধারে মেঘের পাড়া গোঙায় দেখেনা চাঁদের শরীর/গেরুয়া বসনে নিষিদ্ধ বাউল হৃদয় ছুড়েছে বেগানা নারীর/হারিয়ে ফেলেছি নকশি রুমাল, গলার হাঁসুলি, নাকের বোলক/বুকের মাজারে কষ্টের গিলাব আত্মায় শিশির পরে কোটি লাখ/হুতোম যুবক ঘুমিয়ে পড়েছে জেগে ওঠে আরাকান শহরে/জলপাই বনে চিতল হরিণ ছিউলা চাবুক বুকের নহরে।
এ উদ্বৃতির ৩য় লাইনের চমৎকার একটি শব্দ ব্যবহার করেছেন বোলক,যার চলতি শব্দ-নোলক উল্লেখ করার মতো হলেও পরের লাইনে কবিতাটিকে গলাটিপে হত্যা করেছে ‘গিলাব’ শব্দের মাধ্যমে। তারপর কোটি লাখ অন্ত্যমিল প্রচেষ্টা দুর্বলতার দ্বিতীয় দফা হত্যা। কারণ ‘কোটি লাখ’ লাখের মতো গুণনযোগ্য সংখ্যায় শিশির পতন।
এছাড়া তাঁর কবিতা ‘মরণ জোয়ার’ কবিতাটি ভারগম্ভীর্য অপূর্ব। চিত্রকল্প তৈরীতে কবি সিরাজ নিপূণ শিল্পীর মত শব্দের পরিবর্তে যেন রংতুলি ব্যবহার করেছেন-
‘উড়ে গেছে গাঙচিল ছিড়ে গেছে পাল/ধসে গেছে আাদিনাথ মরে গেছে খাল’ (মরণ জোয়ার,পৃ-২৬)
তবে তাঁর এ কবিতাটি পরের লাইন দুটি আমার কাছে বেমানান বলে মনে হয়।
স্মৃতির তোতাদিয়ায় মরণ জোয়ার/ঈশ্বরের শিশ্ন খুঁজে পতিতা ছোয়ার।

তোতাদিয়া বলতে কবি নাফ নদীর বুক জেগে ওঠা নতুন দ্বীপকে বুঝিয়েছেন। যেখানে ঝাঁকে ঝাঁকে তোতা পাখির বাস।
‘‘মরণ জোয়ার’’ কবিতাটি অন্ত্যমিল সর্বস্ব হলেও সেখানে ঈশ্বরের শিশ্ন বলে একটি সংবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তাঁর ঐ প্রচেষ্টায় অনেকটাই অষ্পষ্ট রইল। বরং আরোপিত ভাবের অভিযোগ পাঠকমাত্র কবিকে নাস্তিক্যবাদী ভাবতে পারেন। মার্কসবাদী হওয়া প্রয়োজন কিন্তু নাসিস্তক্যবাদী দুষণীয় তাঁর বেলায় কারণ তিনি মাদরাসায় পড়ার সময় শিবির করতো।
কবিতায় শুদ্ধতা ও সঙ্গতি বজায় রাখার মধ্যে নিহিত রয়েছে জীবনের অর্জনের মূল শক্তি। কবিতাকে কোন গড়বাঁধা নিয়মে আবদ্ধ করা যায়না। কবিদের শিক্ষক বুদ্ধদেব বসু বলেছিলেন “কবিতা লেখা ব্যাপারটা আসলে জড়ের সঙ্গে চৈতন্যের সংগ্রাম” ভাবনার সঙ্গে ভাবার ও ভাষার সঙ্গে ছন্দ, মিল, ধ্বনি মাধুর্যের এক বিরামহীন মল্লযুদ্ধ।’’ কবি সিরাজ তাঁর সমুহ শক্তি নিয়ে ক্ষত-বিক্ষত হতে হতে সেই বিরামহীন যুদ্ধতাই আন্তরিক ভাবে চালিয়ে গিয়েছেন একা। দিনেমার দার্শনিক সোরেন কিয়োকেগার্ড (ঝড়ৎবহ করবৎশবমধধৎফ) তাঁর Either/or গ্রন্থে বলেছেন-A poet is an unhappy being whose heart is torn by secret suffering, but whose lips are so strangely formed that when they sights and cries escape tham, they sound like beautiful music..... the cries would only frighten us, but the music is delicious. সিরাজুল হক সিরাজ শেকড় সন্ধানী কবি। আবহবান বাংলার ইতিহাস, ঐতিহ্য, খাঁটি লোকজ শব্দের প্রয়োগ তাঁর কবিতার প্রধান প্রার্থিত বিয়ষ-
‘ইনানির ধুলোমাখা ঝাউবনে অসংখ্য পাখির পালক /প্রখর দুপুরে কার মুখ (পড়ে) অন্ধ হলে সমুদ্র বালক /বিষন্ন বিকেলে মনখালীর সুজানে ফিরাফিরি যায় নাইয়রি/ বোঝেনা বাউল মন ঘো’ড়ায় কেনো চোখ মোছে জলপরী।’ (স্মৃতির জোয়াল- ১০)

‘স্মৃতির জোয়াল’ কবিতায় মুখ পড়া (কুদৃষ্টি), ফিরাফিরি (ফিরতি), ঘো’ড়ায় (ঘোমটা), নাইয়রি (নব বধূ বাপের বাড়ী গমন) শব্দের চিত্রকল্পের ব্যবহার খুবই স্বচ্ছন্দ। খাঁটি লোকজ বাকভঙ্গির এক নিরলস কাব্যচাষীর পুষ্ট ফসল। কবি হারিয়ে যাওয়া গ্রামীণ ঐতিহ্যকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন যাতে গ্রামীণ ঐতিহ্য এখনো দোদুল্যমান আছে বলে মনে হয়।
‘‘তোমাকে অনুবাদ করতে গিয়ে /অজান্তেই অনুদিত হই নিজে ’’
সিরাজের সবচেয়ে সার্থক পংক্তি,যদিও গতানুগতিক। নারী মনের রহস্য নিয়ে খেলা করে কবিদের অপ্রশাম্য বেগ কিন্তু কবি এক্ষেত্রে দূর্দান্তভাবে উৎরে গেছেন।
১৯৯১ সালের প্রবল ঘূর্ণিঝড়কে কবিকে দারুন ভাবে আঘাত করে। এ পোড়া মাটির যা কিছু ছিল সবই কেড়ে নিয়ে গেল ঘূর্ণিঝড়। কবির ভাষায়-
‘ঘূর্ণিঝড় উড়িয়েছে ছনপাতার ঘর / খডকুটো যা ছিলো নিয়েছে জলোচ্ছাসে/বিরান প্রান্তর জুড়ে চমকায়/ইশ্বরের মানচিত্র (মুখের হরফ- পৃঃ- ৩৮)
সমুদ্র পাড়ের কবি ঘূর্ণিঝড়কে ভয় পায়না। আমিন মাঝি স্বরূপ বিশ্লেষণ কারী জোয়ারের উল্টো দিকে তার যাত্রা হলেও সাতার কেটে যায়।
কনে কড়ে যাইবা আইয়ো /মহেশখালী, মাতারবাড়ী, বাতিঘর জিঞ্জিরা/ কু্যঁ-কু-রু-দ, ক্যঁ-কু-রু-দ’ (স্বপ্নদ্বীপ, পৃঃ- ২০)
এই কবিতাটির মাধ্যমে আঞ্চলিক শব্দে এমন প্রয়োগ করেছেন যাতে এটা আঞ্চলিক না চলতি তা বুঝা দায়ি।
কবি সিরাজের এই কাব্যগ্রন্থে দু মহান ব্যক্তিকে উৎসর্গকৃত দুটি কবিতা রয়েছে-একটি এ এলাকার প্রয়াত কবি সেলিম রাহগীরকে নিবেদিত ‘জোছনা কুসুম’ যার কাছে কবি সিরাজ শিখিছেন কেমন করে হৃদয় নিতে-দিতে হয়। কবির ভাষায়
প্রিয় কবি সেলিম দাদা শিখিয়ে গেলে এমন দিনে/ কেমন করে হয় গো নিতে হৃদয় দিয়ে হৃদয় কিনে (জোছনাকুসুম, পৃঃ- ৪৩)
অপরটি অকাল প্রয়াত গবেষক মালিক সোবহানকে নিবেদিত ‘বুকের কেশর’ কবিতাটি।
কবি সিরাজের অধিকাংশ কবিতা চোখের তৃপ্তি মেটালেও কী বোঝাতে চেয়েছেন সেটা বুঝাতে পারেননি। যেমন ‘নগর তীরন্দাজ’ কবিতাটির মাধ্যমে বোঝাতে চেয়ে নগর কেন্দ্রিক কবিতা। কিন্তু পুরো কবিতার শরীর গ্রামীণ আবহে।
মন মানে না, শুধুই তোমাকে দেখতে ইচ্ছে করে /শামসুর রাহমান- কবিতার নগর তীরন্দাজ /দূর গায়ে হারিয়ে যাওয়া বাংলার কাশবন (নগর তীরন্দনাজ,পৃঃ- ১৫)
কবি সিরাজের কবিতায় তাঁর পারিপার্শ্বিক পরিবেশ পরিস্থিতির উপস্থিতি খুবই নগন্য। একমাত্র কবিতা ‘চিঠি’তেই তিনি লৌকিক সমাজ সংসারের কথা বলেছেন। তাও দুরস্থিত ভৌগলিক পরিবেশ নির্দেশক। অপরাপর কবিতায় শুধু নিসর্গই নায়ক। তাঁর ‘তসবিহ্দানা’ কবিতাটির প্রথম স্তবক
এই হাত তোমাকে দিলাম। /ইচ্ছে হলে দিয়ে দিয়ো বাজারে নীলাম/শুধু এইটুকু মনে রেখো/তোমারই থাকবো তোমারই ছিলাম।
এই কবতিাটি হেলাল হাফিজের ‘‘এই জ্বলে আগুন জলে কাব্যগ্রন্থের ‘এই বাম হাত তোমাকে দিলাম/ একটু আদর করে রেখো চৈত্রে বৈশাখে’ লাইনগুলোকে স্মরণ করিয়ে দেয়। তাঁর এ কাব্যগ্রন্থের কয়েকটি কবিতায় কবি হাফিজ রশিদ খান, কবি মাহবুব সাদিক, কবি শামীম রেজা ও জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নুরুল হুদার যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। এমনকি হুবহু লাইনও বসিয়ে দিয়ে কবিতা সাজিয়েছেন। মাঝে মাঝে শব্দ পরিবর্তন করেও কবিতা সাজিয়েছেন।
এ কাব্যগ্রন্থে পাদটীকা ব্যবহার করে কবির এ কাব্য গ্রন্থকে গলাটিপে হত্যা করেছেন বলে আমার মনে হয়। ‘পরানজুডি’ কবিতার ভাদাম্যা শব্দটির তিনি পাদটীকা দিয়েছেন স্ত্রৈন (স্ত্রীর বশীভুত- আঞ্চলিক ভাষায় বেডি মাওংগ্যা), নিষ্কর্ম (যার কোন কর্ম নেই), নিবীর্য পুরুষ (যার কোন পুরুষত্ব নেই এক কথায় নুফুংসক)। তিনি শব্দগুলো ব্যবহার করেছেন তাঁর একটাও ঠিক নেই। তিনি কোন অর্থে ব্যবহার করেছেন সেটা হয়ত তিনি জানেন না। তবে এ শব্দ গুলো ব্যবহার করে চট্টগ্রামের বাইরে লেখকের মাঝে ভাদাম্যা শব্দটির অপব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাদের মধ্যে এ শব্দটি অর্থ সম্পর্কে ভুল ধারণা সৃষ্টি হবে। যা একজন কবির পক্ষে কোন ভাবে সাজায় না। নিজ কবিতায় যেমন তেমন শব্দ বা বাক্য করানো যায় কিন্তু ভাষা পরিবর্তন করার কোন অধিকার নেই কবি সিরাজের। আসলে তার সহজ অর্থ হবে যে নিজের খেয়ে পরের কাজ করে। চট্ট্রগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় একটি প্রবাদ আছে-ঘরের খাই মউ’র মুইষ চরায়’। আর ‘স্বপ্নদ্বীপ’-এ ‘জিঞ্জিরা’শব্দটির পাদটীকা দিয়েছেন সেন্টমার্টিন দ্বীপের আঞ্চলিক নাম। আসলে হবে এর সঠিক পাদটীকা হবে সেন্টমার্টিন দ্বীপের আদিনাম।
‘‘গোধুলির ছাই মেখে সন্ধ্যা নামে অবুঝ রেজুর মোহনায় /নীল জোনাকির মেলা, নীড়হীন শালিকের বুকের ঘোনায়’
কবি এখানে বুকের ঘোনায় বলতে কি বোঝাতে চেয়েছেন কবি হয়ত নিজে জানেন। তবে কবিতার নিচে পাদটীকার মাধ্যমে যে অর্থটি বোঝাতে চেয়েছেন তা কখনও বোধগম্য নয়। ‘ঘোনায়’ বলতে কবি সিরাজ বুঝিয়েছেন লবণ ও মাছ চাষের জন্য বাধ দেয়া জলাভূমি। এটি দ্বারা একটি নির্দিষ্ট গন্ডির মধ্যে আবদ্ধ করেছেন। তা আসলে সঠিক কিনা তা পাঠক বোঝে নেবেন। তবে পাহাড়ের মাঝখানে উপত্যকা বা টলি যেখানে চাষাবাদ করা হয় সেগুলোতো ঘোনা’। আবার গ্রামাঞ্চলে মুক্ত সমতল জায়গাকেও ঘোনা বলে। যেখানে বর্ষাকালে চাষাবাদ করা হয়।

কবি সিরাজুল হক সিরাজের কবিতায় বিস্তর রূপকের ব্যবহার লক্ষ্য করা গেছে। যেমন কবিতার নবি, বুকের ঘোনায়, রূহের কাছারি, হৃদয় কুড়ি, দুঃখ ঘুঙুর,মাটির পাঁজা, নাকের বোলক, চাঁদের শরীর,কষ্টের গিলাব,হৃদয় ভেলা, বুকের মাজারে, হুতোস যুবক, বুকের নহরে, ছ্্িউলা চাবুক, পাজরের হাড়, বুকের কেশর, হৃদয়ের দেবী, দ্বিতীয় ঈশ্বর, ঝিনুক সংসার, জলপাই বনে, মেঘের ফোয়ার, বাউলের একতারা, বুকের কুম্ভালায়, মানকচু পাতা ইত্যাদি।
কবি সিরাজের কবিতায় কিছু কিছু অনুপ্রাসের ব্যবহারও লক্ষনীয়। যেমনÑ দেব নয় দেবী নয়, চুর্ণ-বিচুর্ণ, কুড়াতে-কুড়াতে, মাঝে-মাঝে ইত্যাদি।
আঞ্চলিকতা দোষে দোষ্ট কবি সিরাজ এ কাব্যগ্রন্থে আঞ্চলিক শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে চিত্রকল্পের বিস্তর ব্যবহার করে কাব্যগ্রন্থকে সুষমায় মন্ডিত করে তুলেছেন-ফোঁয়ার, ছিউলা, ফিরাফিরি,নাইয়রি, ঘো’ড়ায়, ভাদ্যামা, কুম্বলা, ডলইন, গজি, কোরালফুল, ছোঁয়াফিরা, গোয়ার,গোঙায় ইত্যাদি।
শব্দচয়ন বা ছন্দ নয় বরং চেতনার বৈচিত্র্যপূর্ণ বিস্তৃতি এ কাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। চেতনার বিচিত্র মুখিতার কারণে কবিতাগুচ্ছ নতুন উপলব্ধির সামনে দাঁড় করায় পাঠককে যা আগে ছিল অনাস্বাদিত। কবিতার নবি, দুঃখ ঘুঙুর, পরানজুড়ি, জ্বলন্ত পালক, স্মৃতির জোয়াল, মরন জোয়ার, চিঠি, জলের ঝুমঝুমি, পালংপুরি, জোছনা কুসুম, বুকে কেশর, মুখের হরফ, নগর তিরন্দনাজ, তসবিহদানা, পুড়ে যায় মাটির পাজর ইত্যাদি কবিতায় আমরা সেই অনাস্বাদীয় কাব্যবোধ ও কাব্যসাধ খুঁজে পাই। এই কবিতাগুলো যেন একই কাব্যের বিভিন্ন স্বর্গ। প্রত্যেক কবির কিছু শব্দের প্রতি মোহ বা অনুরাগ থাকে বেশী যে গুলিকে কবির চাবিশব্দ ধরা হয়।
আলোচ্য গ্রন্থে দেখা যায় ‘পাজর’ শব্দটি বিভিন্ন কবিতায় প্রায় ৯ বার ব্যবহৃত হয়- অন্যান্য শব্দের মধ্যে রূপচাঁদা ৬ বার, বুক- ৮বার, ‘কবি’ শব্দটি ৮ বার এবং সমুদ্র,দুঃখ ও ঈশ্বর শব্দগুলি ৫ বার করে ব্যবহৃত হয়েছে। এ কাব্য গ্রন্থে কিছু কিছু শব্দের ভুল বানান ছাপানো হয়েছে যেগুলো পরে সংশোধনযোগ্য।
পরিশেষে বলা যায়, কক্সবাজারের শেকড় সন্ধানী কবি সিরাজুল হক সিরাজ উজ্জ্বল উজ্জ্বল পঙক্তি দ্বারা তার কাব্যরসকে এ কাব্যগ্রন্থে একত্রিত করেছেন। দার্শনিক আভায় পরিষ্ফুট এ গ্রন্থকে কবির সত্তার শৈল্পিক নোটবুক বললেও অত্যুক্তি হবে না এবং সর্বশেষ ভিন্নধর্মী কাগজ ও সুশোভিত প্রকাশনামানের জন্য বলাকা প্রকাশন, চট্টগ্রামকে অজস্র ধন্যবাদ। বইটির বহুল প্রচার ও পাঠক প্রিয়তা কাম্য।

‘রূপচাঁদা কঙ্কালঃ- সিরাজুল হক সিরাজ, প্রচ্ছদঃ-মনসুর উল করীম’র চিত্র অবলম্বনে, প্রকাশক- বলাকা,চট্টগ্রাম। প্রকাশ- একুশে বইমেলা ২০০৯, পৃ- ৪৮, দাম- ৭০ টাকা।

বিভাগ: 

Comments

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

কালাম আজাদ
কালাম আজাদ এর ছবি
Offline
Last seen: 2 weeks 2 দিন ago
Joined: বৃহস্পতিবার, আগস্ট 3, 2017 - 2:15পূর্বাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

ফেসবুকে ইস্টিশন

SSL Certificate
কপিরাইট © ইস্টিশন.কম ® ২০১৬ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর