নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 6 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • নুর নবী দুলাল
  • হাসান নাজমুল
  • শ্রীঅভিজিৎ দাস
  • মুফতি বিশ্বাস মন্ডল
  • নিরব
  • সুব্রত শুভ

নতুন যাত্রী

  • নিনজা
  • মোঃ মোফাজ্জল হোসেন
  • আমজনতা আমজনতা
  • কুমকুম কুল
  • কথা নীল
  • নীল পত্র
  • দুর্জয় দাশ গুপ্ত
  • ফিরোজ মাহমুদ
  • মানিরুজ্জামান
  • সুবর্না ব্যানার্জী

আপনি এখানে

মাদ্রাসার অভ্যন্তরে



সেই দিনটির কথা এখনো আমার স্পষ্ট মনে আছে। মাদ্রাসার উদ্দেশ্যে যাওয়ার সময় ভাইয়া প্রতিবেশী গুরুজনদের সবাইকে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে বলেছিল, ‘নানা/দাদা, আমার জন্য দোয়া করবেন, আমি যেন মানুষের মতো মানুষ হতে পারি’। তার বলার ভঙ্গি এতোটা হাস্যকর ছিল যে, কেউ কেউ ফিক করে হেসে ফেলেছিলো। ভাইয়াকে এই কথা মনে করিয়ে দিলে এখনো খুব লজ্জা পায়।

বেশ কয়েক বছর আগে আমার ভাইয়া শহরে অবস্থিত একটি বিখ্যাত ক্বওমি মাদ্রাসায় ভর্তি হয়েছিল। এখানে সে পড়াশোনা করেছিল মোট পাঁচ বছর। ছুটির সময় সে যখন বাড়ীতে আসতো, তার কাছে মাদ্রাসার গল্প শুনতাম। শুনে শুনে মনে হতো, মানের দিক দিয়ে সেটি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে কোন অংশে কম নয়। তবে চাঁদেরও নাকি খানিকটা কলঙ্ক থাকে! এই হার্ভার্ড মাদ্রাসারও কিছুটা আছে, যা ভাইয়ার সাথে কথা বলে ধীরে ধীরে বুঝতে পেরেছি।

ভাইয়ার মাদ্রাসায় সুন্নতি কায়দায় পড়াশোনা করানো হতো। খাটপালঙ্ক ছিল না, সবাই ফ্লোরিং করে ঘুমাতো। চেয়ার ছিল না, টেবিলও ছিল না। মেঝেতে এক হাটু বিছিয়ে অপর হাটুতে থুতনি রেখে সবাই দুলেদুলে কোরান মুখস্ত করতো। হাফেজি বাদে বা হাফেজি পাশ করে যারা মাওলানা লাইনে পড়তো, তাদের পাঠ্যসূচি ছিল চরম মান্ধাতার আমলের। বহু দশক ধরে তাদের একই বইপত্র পড়ানো হচ্ছে। এখানে তাদের কাউকে বিজ্ঞানের কোন কিছু পড়ানো হতো না। আর অঙ্ক/ইংলিশ ছিল পুরোপুরি অস্পৃশ্য। শুরুর দিকে সামান্য বাংলা পড়ানো হতো। এরপর বাংলাও তাদের পাঠ্যসূচি থেকে উধাও হয়ে যেতো। জ্ঞানবিজ্ঞানের ছোয়া থেকে দূরে থাকতো বলে এরা এমন অবিশ্বাস্য কথা বিশ্বাস করতো যে, শুনলে আশ্চর্য হয়ে যেতে হয়।

মাদ্রাসায় ছাত্রদেরকে পশুর মতো মারধোর করা হতো। ভাইয়া বাড়ী আসলে প্রায়ই দেখা যেতো, সারা শরীরে বেতের আঘাতের লম্বা লম্বা দাগ। এমন মারধোর সহ্য করতে না পেরে অনেক ছেলে পালিয়ে যেতো। পড়াশোনার পাশাপাশি আমি বেকারিতে কাজ করতাম। পালিয়ে যেতে ইচ্ছুক, এমন কয়েকটি ছেলেকে ভাইয়া এই বেকারির ঠিকানা দিয়ে দিয়েছিলো। তারা এখানে এসে চাকুরি করতো। বেকারিতে অসম্ভব পরিশ্রম করতে হয়। তবু কেউ ফিরে যেতে চাইতো না।

মাদ্রাসার হুজুরেরা শৌচালয় থেকে এসে অজু না করে কোরান পড়তো, নামাজ পড়তো, রোজার মাসে লুকিয়ে খাওয়া-দাওয়া করতো। সাধারণ ছাত্ররা প্রথম দিকে এতে খুবই অবাক হতো। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে তারা নিজেরাও অজু ছাড়া কোরান পড়তে আরম্ভ করতো। তবে কোন ছাত্রই হুজুরদের মতো অপরিচ্ছন্ন শরীরে নামাজ পড়ার মতো সাহস সঞ্চয় করে উঠতে পারতো না কিংবা লুকিয়ে লুকিয়ে খেতো না।

মারধোর ছাড়াও মাদ্রাসা থেকে ছাত্রদের পালিয়ে যাওয়ার আরেকটি উল্লেখযোগ্য কারন ছিল। সেটা হচ্ছে রেপ। প্রায় সব হুজুরই ছাত্রদেরকে জোর করে রেপ করতো। এমনকি সিনিয়র ছাত্ররাও মাঝে মাঝে জুনিয়রদের রেপ করতো। মাদ্রাসায় এটা ছিল ওপেন সিক্রেট। সবাই জানতো, কিন্তু কেউ কাউকে কিছু বলতো না। ভাইয়ার পালিয়ে আসা প্রতিটি বন্ধুর কাছে আমি এই কথা শুনেছি।

মাদ্রাসার হুজুরেরা দরিদ্র-ধনী ভেদাভেদ করতো। দরিদ্র পরিবার থেকে আসা ছাত্রদের সাথে এক রকম, ধনী পরিবার থেকে আসা ছাত্রদের সাথে আরেক রকম আচরণ করা হতো। ভাইয়া অবশ্য এর একটা কারন আমাকে দেখিয়েছিল। তার মতে, হুজুর এরকম করতো, এর রহস্য হচ্ছে ধনী পরিবারের ছাত্রের অভিভাবকের কাছ থেকে মাদ্রাসার জন্য বড়ো ধরনের অনুদান পাওয়ার সম্ভাবনা থাকতো। মাদ্রাসা তো চলে অনুদান দিয়েই। বছরের একটা সময়ে ছাত্রদের দিয়ে বিভিন্ন জায়গায় চাঁদা তোলা হতো। এসবের দ্বারা প্রাপ্ত অর্থের নয়-ছয় করাও ছিল ওপেন সিক্রেট। ছাত্ররা ঠিকই বুঝতো, কোন কোন হুজুর দুই নম্বরি করতো।

২০০৫ সালে সারা দেশে জেএমবি’র বোমা হামলার কথা মনে আছে? এই ঘটনার পর সরকারের প্রচণ্ড ধরপাকড় শুরু হয়। এর আগে ভাইয়ার মাদ্রাসাটি ছিল হরকাতুল জিহাদের বড়ো একটি ঘাঁটি। ভাইয়া বলেছিল, বিশেষ করে ইরাক যুদ্ধের পর হরকাতুল জিহাদের কর্মকাণ্ড এখানে চরম মাত্রায় পৌছায়। তারেক মাসুদের ‘রানওয়ে’ ছবিটি দূর্দান্ত। এই ছবিতে জঙ্গিদের কর্মকাণ্ড দারুনভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ভাইয়াদেরও ‘রানওয়ে’ ছবির মতো লাঠি খেলার প্রশিক্ষণ দেয়া হতো। এর পরবর্তী ধাপে তখন নাকি কাউকে কাউকে বন্দুক চালাতে ও গ্রেনেড বানাতে শেখানো হতো! তবে এ ধরনের কর্মকাণ্ড চলতো মাদ্রাসার বাইরে। কিছু কিছু হুজুর এর তীব্র বিরোধীতা করতেন।

বাড়ীতে আসার সময় ভাইয়া মাঝে মাঝে কিছু ধর্মীয় ম্যাগাজিন নিয়ে আসতো। এদের একটি ছিল ‘মাসিক রহমত’। এখানে মূলত জিহাদের গুরুত্ব বোঝানো হতো। ভারতসহ অন্যান্য দেশগুলো আমাদের দেশকে নিয়ে কী কী ষড়যন্ত্র করছে, তার বিস্তারিত বিবরণ দেয়া থাকতো। একটি বিবরণে এমন দাবীও করা হয়েছিল যে, আমাদের সেনাবাহিনীর অর্ধেকের বেশী হচ্ছে ভারতের লোকজন! পাশাপাশি ইরাক ও আফগানিস্থানের যুদ্ধে প্রতিদিন যে শতশত মার্কিন সেনা মারা পড়ছে, সেই কথাও জোর দিয়ে বলা হতো। আগাগোড়া মিথ্যায় ভরপুর এরকম ম্যাগাজিন আমি আর কোথাও দেখিনি। অথচ এটি ছিল মাদ্রাসার ছাত্রদের মাঝে সবচেয়ে জনপ্রিয় ম্যাগাজিন! আমার ভাইয়াও এসব কথা প্রাণপণে বিশ্বাস করতো।

তাদের মাদ্রাসায় ছাত্রশিবিরের কোন অস্তিত্ব ছিল না। এই একটি ভালো দিক তাদের মধ্যে ছিল। হয়তো এখনো আছে। বস্তুত আমাদের দেশের ক্বওমি মাদ্রাসাগুলোতে ছাত্রশিবির এখনো ঘাঁটি গাড়তে পারেনি। এসব মাদ্রাসার হুজুরগন জামাত-শিবিরকে মোটেও সহ্য করেন না। আলিয়া মাদ্রাসায় শিবির আছে প্রচুর। ক্বওমিদের কাছে আলিয়া মাদ্রাসার লোকজন অপছন্দের। অথচ জামাতের ইশারায় হুট করে হেফাজতে ইসলামের মতো ক্বওমিদের এতো বড়ো একটা প্লাটফর্ম কীভাবে সক্রিয় হয়ে উঠলো, আমি কিছুতেই বুঝতে পারি না।

সবশেষে কিছু কথা। ক্বওমি মাদ্রাসায় লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রী পড়াশোনা করে। এখানে তাদের মেধার অবিশ্বাস্য অপচয় ঘটে। যে শিক্ষার্থী বড়ো হয়ে খুব ভালো একজন বিজ্ঞানী কিংবা সাহিত্যিক হতে পারতো, সে হয়তো এখন দুলে দুলে কোরান মুখস্ত করছে। আর এসব শিক্ষার্থীর বেশীরভাগ এতিম কিংবা দরিদ্র পরিবার থেকে আসা। অর্থাৎ, তাদের কোন পিছুটান নেই; থাকলেও সামান্য। সরকার যদি এদের প্রতি দায়িত্বশীল না হয়, নিশ্চিতভাবে তারা একেকজন হাইভোল্টেজ জঙ্গি হিশেবে বেড়ে উঠবে। আলিয়া মাদ্রাসা সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী পরিচালিত হয়। এখন এসব ক্বওমি মাদ্রাসার ব্যপারেও একটা সুস্পষ্ট নীতিমালা ও পাঠ্যসূচি গ্রহণ করার সময় এসেছে।

বিভাগ: 

Comments

ড. লজিক্যাল বাঙালি এর ছবি
 

বাহ সুন্দর
==============================================
আমার ফেসবুকের মূল ID হ্যাক হয়েছিল ২ মাস আগে। নানা চেষ্টা তদবিরের পর গতকাল আকস্মিক তা ফিরে পেলাম। আমার এ মুল আইডিতে আমার ইস্টিশন বন্ধুদের Add করার ও আমার ইস্টিশনে আমার পোস্ট পড়ার অনুরোধ করছি। লিংক : https://web.facebook.com/JahangirHossainDDMoEduGoB

===============================================================
জানার ইচ্ছে নিজেকে, সমাজ, দেশ, পৃথিবি, মহাবিশ্ব, ধর্ম আর মানুষকে! এর জন্য অনন্তর চেষ্টা!!

 
সত্যর সাথে সর্বদা এর ছবি
 

চরম সত্যেকে তুলে ধরেছেন। আমি মাদ্রাসার ছাত্র ছিলাম, এ সকল অবস্থার প্রত্যাক্ষ সাক্ষী আমি

 

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

শাহিনুর রহমান শাহিন
শাহিনুর রহমান শাহিন এর ছবি
Offline
Last seen: 1 year 5 months ago
Joined: বৃহস্পতিবার, মার্চ 3, 2016 - 12:13অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

ফেসবুকে ইস্টিশন

SSL Certificate
কপিরাইট © ইস্টিশন.কম ® ২০১৬ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর