নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 8 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • অভিজিৎ
  • ড. লজিক্যাল বাঙালি
  • মাইকেল অপু মন্ডল
  • সজীব সাখাওয়াত
  • নরসুন্দর মানুষ
  • সুবর্ণ জলের মাছ
  • নুর নবী দুলাল
  • সাইয়িদ রফিকুল হক

নতুন যাত্রী

  • হুসাইন মাহমুদ
  • অচিন-পাখী
  • শুভ্র আহমেদ বিপ্লব
  • রোহিত
  • আকাশ লীনা
  • আশরাফ হোসেন
  • হিলম্যান
  • সরদার জিয়াউদ্দিন
  • অনুপম অমি
  • নভো নীল

আপনি এখানে

নুরপাড়ার দেলোয়ার এবঙ জাল ভোট


বাকঁখালী নদীর উপর দেয়া ভেড়ী বাঁেধর দক্ষিণপ্রান্তের নুরপাড়ায় ভোটের ক্যাম্প পড়েছে। কোন পার্টির সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা একটা চমক। না খেয়ে থাকা মানুষগুলো একটু নুতনত্বের স্বাধ পাচ্ছে- ভোটের গান গুনছে। পোষ্টার লাইটিং, মাইকিং, হৈ-হুল্লোড়। বিশেষ করে ছেলে পিলেদের আনন্দের সীমা নেই। সারাদিন ঘরঘুর ঘুরঘুর করে ক্যাম্পটির আশেপাশে।এই পিচ্চী সিগ্রেট আন! ঐ পিচ্চী পানি আন! ঐ ছেমড়া চা লইয়া আয়!

ফুট ফরমান খাটার মধ্যে আনন্দ। ভাগ্য ভাল থাকলে ভোটের কাগজ (লিফলেট) বিলি করার দায়িত্বও পেয়ে যায় পিচ্চীগুলো মাঝে মধ্যে। অথবা চিকা মারে বস্তি-বস্তির ঘরে ঘরে। সেলিমের দিনমান কাটে ভোটের ক্যাম্পে। গত পরশু দিন চড় খেয়েছিল আমিন ভাইয়ের হাতে। ভেবেছিল আর আসবে না কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই চোখটা মুছে আবার বান্দা হাজির। ভোটের গানগুলো ওর মুখষ্ঠ- ঠোটস্থ। সারাদিন বিড়বিড় করে গেয়ে যায়। মাঝে মাঝে ভাষণ দেয়- এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম গরীবরে মারি হাইবার সংগ্রাম...

আর এই দিকে ওর বোনগুলো ডেকে ডেকে সারা হয়।
-ও সেলিম, গুসুল ন গরিবি। তাড়াতাড়ি আয়- মা বকিব।
আধ খাওয়া সেলিম একটু করো বন-রুটি পেয়ে গিয়েছিল। ময়লা দাঁত বের করে হাত উচিয়ে বোনকে দেখাল রুটিটা। রিমিও হাসল। ভাগ্যবান তার ভাইটা। ভাইকে নেবার ছলে ক্যাম্পের খুঁটি ধরে দাঁড়ায় সে। পাশে দাড়িঁয়ে অনবরত ওকে চিমটি দিচ্ছে রুমি।

-রিমি উইক্কা চা- তরেইক্কা চাই থাইক্কে!
রিমি চোখ বড় বড় করে তাকায় ও দিকে। ক্যাসেট প্লেয়ারের সামনে বসে যে ছেলেটা ক্যাসেট উল্টে পাল্টে দিচ্ছিল সে খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছে রিমিকে। বয়স তের পেরোয়নি মেয়ের কিন্তু বাড়ন্তির কমতি নেই। আধ পেট খেয়ে যে দিন কাটায় দেখে তা বোঝা যায় না। তার ঐ তাকানোটা ভাল লাগছে। ভিতরে ভিতরে শিহরিত হচ্ছে রিমি। ভেনচি কেটে সে মুখ ফেরাল। ভাইকে ডাকতে গিয়ে অযথা হৈ চৈ করে উঠল।

-এ্যাই ছেঁড়া তাড়াতাড়ি আয়, কতক্কন ধইরি ত্য়িাই তাক্কি খবর নাই।

হাতে একগাদা ভোটের কাগজ নিয়ে সেলিম বোনের কাছে এল। মুখখানা ওর ভরে গেছে হাসিতে। অনেকগুলো মার্কা তার কালেকশানে। নৌকা, ধানের শীষ, দাড়িঁপাল্লা, জাহাজ, আনারস, মাছ, গোলাপফুল, খেজুরগাছ-বিভিন্ন রকম বিভিন্ন সাইজের- বিভিন্ন রংয়ের। আজ আবার এই এতগুলো। মামুন্যারে টেক্কা দেবে এই বার। সন্ধ্যায় নামল ঝুম বৃষ্টি। বাঁেধর ওপর মাটির পথ। কাদায় একসার চারিদিক। ছেলেরা বস্তিতে ঢুকেছে ভোট চাইতে। ঘরে ঘরে ঢুকে মা, বোনদের তোয়াজ করছে। ওদের দূর্গন্ধ বিছানায় বসছে, নোংরা, গু-মুত মেশানো কাদায় দিব্যি আসা যাওয়া করছে।

আবছা অন্ধকারে মুখোমুখি হয়ে গেল রিমির সেই ক্যাসেট ওয়াল ছেলেটির সাথে। ছেলেটি হাসিমুখ করে বলল-
-কি রে ভোট ন দিবি?
-কইত ন পারি। মা কইয়ে আর ভুটের বয়স অয় নাই।
-ভোটের আবার বয়স লাগে না কি? যাবি আর দিয়েনে আই যাবি গৈ।
রিমি ঠাট্টা করে বলল-
-ন পাইজ্যম। ভুট দিয়া আ’র কি কাম?
-তর কি নাম? হইদ্দে।”
ছেলেটা আচমকা খামচে ধরল ওর কাঁধ। রিমি রেগে গিয়ে কাঁধ ছাড়াল এবং বলল-
-লুচ্চা হদিয়ার-এই বলে রিমি তার বাসায় চলে আসে। নুরপাড়ার মালিক্যার সন্ত্রাসী পুত্র দেলোয়ার ভবিষ্যতে দেখে নেবে বলে ঐ স্থান ত্যাগ করে। দেলোয়ারের কাজ হচ্ছে মানুষ মারা আর চাদাঁ দাবী করা। আর দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে তাকে দুনিয়া থেকে বিদায় করে দেওয়া। সে নাকি আবার মহেশখালীর জিয়া গ্র“পের সদস্য এবং কুখ্যাত সোনার পাড়ার সন্তান। সে নুরপাড়ায় আসে তার বাবার কর্মসুত্রে। আসার পর থেকে সে এ অপরাধ করে আসছে। এদিন তাকে মারে,এই দিন অমুখের দাঁত ভাঙে। আর এ দিকে আমিন্যা চোরা তাদের প্রশ্রয় দিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লুপে নেয়।

সেলিমেরা নুতন কাজ পেয়েছে। আশে-পাশে অন্য পার্টির পোষ্টার পড়া মাত্র ছিঁেড় ফেলা। এজন্য চড় থাপ্পর খেতে হয়েছে প্রচুর এবং প্রতিনিয়ত হচ্ছে। ক্যাম্পের ছেলেরা বলে দিয়েছে, কোন আ’লায় মারে দেইখ্যা রাখবি। রাইতের আন্ধারে ফিনিশ করি দিয়ুম’ সন্ত্রাসীদের পোলা পোয়ানের এই উদ্বত্যপূর্ণ কথায় সাহস পেয়ে পাড়ার গরীবের ছেলেরা পোষ্টার ছেঁড়ে মনের আনন্দে। সন্ধ্যা নামলেই মিছিল, শ্লোগান। মারামারি, ঢিলাঢিলি। আজ এর মাথা পাটে, কাল ওর। সেলিমেরা চকলেট পায়, বিস্কুট পায়, ঢিল খেলে একশ টাকা পায়। এটুকুনই লাভ। ভোটের আগের রাতে ভোটার স্লীপ দিতে আসে ছেলেগুলো। বড় ছোট প্রত্যেককে ধরিয়ে দেয় একটা করে। “এই মার্কায় সীল মারবা-এ ই নাম বলবা-বয়স এত ভুল যেন না হয়। লেকচার দিতে দিতে রগফুলে যায় ওদের। সেই ক্যাসেটওয়ালা ছেলেটা মানে দেলোয়ার খুজে বের করল রিমিকে।

-এ্যাই ছেমড়ী নে ধর। তর নাম কুট্টি বিবি। বয়স কুড়ি। খবরদার ভুল যেন না হয়।
-ছেমড়া ছেমড়া গরেন ক্যান? ভুট দিতাম ন যাইয়ুম ।’
রিমির মান-সম্মানে লেগেছে খুব। রিমির এই অবস্থা দেখে দেলোয়ার হাসল-বলল,

-আচ্ছা আচ্ছা, ছেমড়া ছেমড়া ন কইয়ুম, বিবি সাব কইয়ুম। ভোট না পাইলে কিন্তু খবর অইব। তুরার হোন অসুবিধা নাই। সকালে নাস্তা পাবি দু’রে বিরানী আর যদি টিপ খাডাইয়া বেশী ভোট দিতে পারস তইলে একশ টাকা বেশী পাবি, খাওন-আসন আরার।

একশ টাকা! ছুকড়ীগুলোর চোখ মাথায় ওঠে। একদিনের আয় একশ টাকা! ছুড়ি, ফিতা, ক্লিপ, জর্জেটের ওড়না কত কি পাওয়া যায় একশ টাকায়।

রিমি নাসরিনেরা ছোটাছুটি করে সারাদিন। এ কেন্দ্র থেকে ও কেন্দ্রে। ভোটার স্লীপ নেয় আর জাল ভোট দেয়। দুপুরে খায় ভরপেট বিরানী। একটু পর পর কেক, বিস্কুট। রিমির ঝোলা ভরে আর ভরে। সন্ধ্যায় ফিরতি পথে ওরা উকি দেয় ক্যাম্পে।
জাল ভুট দিয়া আসছি। ট্যাকা দেন অহন”

দলবেধে দাবী জানায়। ওদের গা থেকে ছুটে আসে পাউডারের গন্ধ, তেলের গন্ধ, সর্বোপরি উৎকট গন্ধ। পেট মোটা এক লোক বসে বসে কি যেন হিসাব নিকাশ করছে। সে ঘাড় ফিরিয়ে বলল-
-কিয়ের টাকা?”
-ক্যা! জাল ভুট দিলে একশ টাকা করে দিবার কথা কই আসসিলা?”
-অ। পরে পাবি। অহন যা।
-পরে কুন সময়? মেয়েগুলো অধৈর্য হয়ে প্রশ্ন তোলে।
-আইস কাইল এক সময়।
-অহন যা। ন দেখর কাম গরিদদে।”লোকটা বিরক্তির সাথে জবাব দিল,

মেয়েগুলো মেজাজ খারাপ করে ফিরে আসে। কি ক্লান্তি, শ্রান্তি, কি পরিশ্রমটা গেছে সারাদিন। যে যার ঘরে চলে যায়।
রিমি ঘরে ঢুকে দেখল ঘুর ঘুট্টি অন্ধকার। কেউ নেই। মা কখন ফিরবে কে জানে। কোন কিছু না ভেবে সারাদিনের ক্লান্তি দূর করার জন্য বিছানায় এলিয়ে পড়ে। এলিয়ে পড়া মাত্রই চোখে ঘুম এসে যায় তার। পরে সেলিমের ডাকাডাকিতে ঘুম ভাঙ্গে রিমির। কাঁচা ঘুম। ধরফর করে ওঠে বুক। চোখ মেলে চেয়ে দেখে তাদের ওপর লস্ফ জ্বলছে।

-মা কই?
-কি জানি। মনে হয় বিবিসাবগো বাড়ী।
-আরে কিইল্যাই ডাইকছস?”
তোরে ট্যায়া নিতে যাইবারলাই কইয়ে।
ট্যাকার কথা শুনে লাফ দিয়ে ওঠে রিমি।
-কে? ত হদে যাইবার লাই হয়ে
-হুই,ঐ দেলোয়ার। ক্যাম্ফে।
রিমি উঠে ভাইয়ের হাত ধরে হাটা দেয়।
-ল-যাই
-না। তুরে একলা যাবারলাই কইয়ে। আরে মেলাডি বাদাম ভাজা দিয়ে। মা আইলে যাইয়ুম। অহন যা তাড়াতাড়ি বাড়ি আইস।

রিমি দ্বিরুক্তি না করে পথে নামল। ঐ দিকে রাত কত বোঝা যাচ্ছে না। চারদিকে চিল্লাচিলি হৈ চৈই। ক্যাম্পের ভেতর টিভি চলছে। প্রচন্ড ভীড় জমিয়ে লোকেরা দেখছে। ক্ষণে ক্ষণে চিৎকার করে উঠছে। দেলোয়ারই বা কে? রিমি মনে করতে পারল না। ক্যাম্পের কাছাকাছি আসতে ওপাশ থেকে কে ডাকল ওকে। রিমি এগিয়ে গেল। দেখল সেই ছেলেটা।

-আইছস টিইয়া নিতে?
-অনর নাম দেলোয়ার?
-হু চল আগে বাড়ী।
দেলেয়ার ওকে নিয়ে চলে গেল অনেকটা পথ। ভাঙ্গা-চোরা একটা ঝুপড়ীর সামনে নিয়ে দাঁড়াল। রিমির এবার ভয় করতে থাকে। সে ভারী উদ্বিগ্ন, গলায় বলল,
-কই আনলেন আরে। টিইয়া দেন চইলা যাই গৈ।”
-টিইয়া নিবি? আয়।”

দেলোয়ার ওর হাত ধরে টেনে ঢোকায় ঘরে। ওর বুক থেকে ওড়না টেনে মুখ বাঁধে শক্ত করে। অনেক চেষ্টা করেও তার হাত থেকে মুক্ত হতে চায়। দেলোয়ার খুবই শক্তিশালী। আর আধ পেট্ েখাওয়া ওর সাথে এটে রিমি বাধা দিতে পারে না। রিমি সব শক্তি নিঃশেষিত। কত সময় যায়- রাত কত গভীর হয় ও বুঝতে পারে না। দুর থেকে ও যেন শুনতে পায় ওর মা ডাকছে রিমি-ও রিমি!

সেলিমের কচি গলা ভাসে বাতাসে, বুজি!

রিমির চেতন ফেরে খরার রোদের তাপে। হন্ত-দন্ত হয়ে উঠে বসে ও। গা ভরা কষ্ট টের পায়। দেলোয়ার নেই। ওর পাশে পড়ে আছে একশ টাকার নোট। একটা নয়- দুটো। হাউ মাউ করে কেঁদে ওঠে রিমি। বিলাপ করে আপন মনে,
এতো বড় সর্বেনাশ গরলি আ’র। মারে কি কইয়ুম আই- বস্তীতে কেন গরি দেখাইয়ুম এই মুখ।

রিমির বিলাপ শোনার কেউ নেই এখানে। সবাই হৈ-হুল্লা করছে ঐ দুরে-ক্যাম্পের কাছে। টলোমলো পায়ে এগোয় সে। চারদিক কি উজ্জল, ছেলেরা উল্লাস করছে, আনন্দে নাচছে। মিষ্টি বিলোচ্ছে দু’হাতে।

বিভাগ: 

Comments

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

কালাম আজাদ
কালাম আজাদ এর ছবি
Offline
Last seen: 2 weeks 2 দিন ago
Joined: বৃহস্পতিবার, আগস্ট 3, 2017 - 2:15পূর্বাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

ফেসবুকে ইস্টিশন

SSL Certificate
কপিরাইট © ইস্টিশন.কম ® ২০১৬ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর