নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

শিডিউল

ওয়েটিং রুম

There is currently 1 user online.

  • নুর নবী দুলাল

নতুন যাত্রী

  • আমি ফ্রিল্যান্স...
  • সোহেল বাপ্পি
  • হাসিন মাহতাব
  • কৃষ্ণ মহাম্মদ
  • মু.আরিফুল ইসলাম
  • রাজাবাবু
  • রক্স রাব্বি
  • আলমগীর আলম
  • সৌহার্দ্য দেওয়ান
  • নিলয় নীল অভি

আপনি এখানে

নগরনটী (উপন্যাস: শেষ পর্ব)


চম্পা-নগরী এখন উৎসবমুখর, নিভু নিভু হয়ে জ্বলতে থাকা মানুষের আশার প্রদীপটি হঠাৎ দপ করে জ্বলে উঠে ঔজ্জ্বল্য ছড়াতে শুরু করেছে গণিকারা মুনিকুমার ঋষ্যশৃঙ্গকে হরণ করে নিয়ে আসায়; একে তো মুনিকুমার ঋষ্যশৃঙ্গের সঙ্গে মহারাজ লোমপাদের একমাত্র কন্যার বিবাহ, তার ওপর বহুদিন বাদে অঙ্গরাজ্যে বৃষ্টিপাত হতে চলেছে, বহু অপেক্ষার পর পূরণ হতে চলেছে অঙ্গরাজ্যের মানুষের প্রত্যাশা; ঘুচতে চলেছে অঙ্গরাজ্যের তৃষিত ভূমি, বৃক্ষ, লতা-পাতার তৃষ্ণা! যদিও কেউ কেউ মনে করেছিল মুনিকুমার ঋষ্যশৃঙ্গের পবিত্র চরণ চম্পা নগরীর ভূমি স্পর্শ করামাত্র বৃষ্টি হবে, তা অবশ্য হয় নি। এখন নগরীর রন্ধনশালা থেকে হাট-ঘাট সর্বত্র এই আলোচনা হচ্ছে যে মুনিকুমার ঋষ্যশৃঙ্গের সঙ্গে রাজকন্যার বিবাহের পর ফুলশয্যার রাতেই বৃষ্টি নামবে; তাই নগরীর মানুষ অধীর অপেক্ষায় আছে ফুলশয্যার রাতের জন্য! ফলে মহারাজ লোমপাদও কন্যার বিবাহের ব্যাপারে কালক্ষেপণ করতে চাইলেন না, যতো তাড়াতাড়ি রাজ্যে বৃষ্টি নামে ততোই মঙ্গল। তাছাড়া মহর্ষি বিভাণ্ডক যদি কোনোক্রমে লোকমুখে সংবাদ শুনে রাজবাড়ীতে উপস্থিত হন এবং বিবাহ পণ্ড করে তার পুত্রকে নিয়ে যান তখন তো আর রাজ্যে বৃষ্টিই নামবে না। তাই রাজপুরোহিত আর রাজজ্যোতিষীর বিধান অনুযায়ী শীঘ্রই তিনি ঋষ্যশৃঙ্গের সঙ্গে কন্যার বিবাহের দিন ধার্য করলেন। তড়িঘড়ি বিবাহের আয়োজন করায় দূরবর্তী অনেক বন্ধু-রাজ্যের রাজা এবং সুহৃদবর্গকে নিমন্ত্রণ করারও সময় পেলেন না। ঠিক করলেন আগে কন্যার বিবাহ সম্পন্ন হোক, ইন্দ্রদেবের সন্তুষ্টিতে রাজ্যে বৃষ্টি হোক, তারপর সুবিধা মতো সময়ে এক মহাভোজের আয়োজন করে বন্ধু-রাজ্যের রাজা এবং সুহৃদবর্গকে নিমন্ত্রণ করবেন। আপাতত রাজ্যের মানুষকে নিয়েই তিনি বিবাহ উৎসব পালন করতে চাইলেন।

ঘোষকেরা ঢেঁড়া পিটিয়ে চম্পা-নগরীর মানুষকে নিমন্ত্রণ করলো; রাজ্যের চৌদিকে দূত গিয়ে জনপতি, বিশ্পতি এবং জন্মন্পতিদের নিমন্ত্রণ করে এলো; নিমন্ত্রণ করা হলো ব্রা‏‏হ্মণদেরকে। বিবাহ উৎসবের ঢেঁড়ার সঙ্গে সমগ্র নগরীর মানুষের হৃদয়ের ঢেঁড়াও এখন বাজছে। কিন্তু যার বিবাহ, তার মনে সুখ নেই! গণিকাদের চম্পা-নগরীতে ফিরতে বিলম্ব হওয়ায় অন্য অনেকের মতো রাজকুমারী শান্তার মনেও এই বিশ্বাস দৃঢ় হয়েছিল যে মহর্ষি বিভাণ্ডকের রোষে গণিকারা নিহত হয়েছে, নয়তো প্রস্তরখণ্ড কিংবা বৃক্ষ হয়ে অরণ্যে পড়ে আছে। তাই বিষাদ কাটিয়ে একটু একটু করে পূর্বের ন্যায় আনন্দমুখর হয়ে উঠছিল সে। কিন্তু গণিকারা ঋষ্যশৃঙ্গকে হরণ করে ফিরে আসায় হঠাৎ-ই তার হৃদয়ের আনন্দকুঞ্জে বজ্রাঘাত হয়েছে। অভিমানে, রাগে, দুঃখে, ক্ষোভে, ঘৃণায়, বিষাদে যেন ঝলসে গেছে তার হৃদয়! সে কেবলই শয্যাশায়ী হয়ে কাঁদে। সখিরা তাকে অনেক বোঝায়, ঋষ্যশৃঙ্গ সম্পর্কে ভাল ভাল কথা বলে, তবু তার মন বুঝতে চায় না। সে ব্যতিত রাজবাড়ীর সকলেই ঋষ্যশৃঙ্গের মুখদর্শন করেছে, এমনকি রাজবাড়ীর যে অন্ধ ভৃত্য গো-দুগ্ধ দোহন করে সেও তার অন্তর চক্ষু দিয়ে দর্শন করেছে অন্যের মুখে ঋষ্যশৃঙ্গের শারীরিক বিবরণ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে শুনে।

বিবাহের ক্ষণ যতোই ঘনিয়ে আসছে, ততোই শান্তার মনে হচ্ছে সে যদি এক দৌড়ে এই রাজপ্রাসাদ ছেড়ে অন্য কোথাও হারিয়ে যেতে পারতো; কিংবা পারতো অদৃশ্য হয়ে যেতে! আবার কখনো তার মনে হচ্ছে, না এ হতে পারে না। সে রাজকুমারী, রাজকুমারীর সঙ্গে মুনিকুমারের বিয়ে হয় নাকি? এ তার দুঃস্বপ্ন, দীর্ঘমেয়াদী এক দুঃস্বপ্নের ভেতরে অবস্থান করছে সে। কিন্তু যখনই সে বাতায়নের বাইরে তাকিয়ে লক্ষ্য করছে ভৃত্যদের ব্যস্ত পদচারণা, বিবাহের আয়োজন; তখনই নিষ্ঠুর বাস্তবতা তাকে তীক্ষ্ণ প্রস্তরখণ্ডের ন্যায় আঘাত করছে।

বিবাহের দিন প্রভাতে নাপতিনি এসে তার হাত-পায়ের নখ কেটে আর কেশাগ্র ছেটে দিয়ে গেল। মেধা এবং অন্যান্য সখিরা তাকে স্নানাগারে নিয়ে গিয়ে তার সর্বাঙ্গে হলুদ মাখলো। কাঁচা হলুদের গন্ধ তার বরাবরই ভাল লাগে, কিন্তু আজ যেন হলুদে ইঁদুরপচা গন্ধ! হলুদে আগুনের আঁচ, যা তার সর্বাঙ্গে জ্বালা ধরাচ্ছে। তার অন্তর দগ্ধ হচ্ছে, আর সেই দগ্ধ আগুনে পুড়িয়ে মারতে ইচ্ছে করছে শবরী নামের সেই গণিকাকে, যাকে কখনো দেখে নি সে, কিন্তু তার মনে হচ্ছে শবরী এক মায়াবী ডাইনী! সেই লোভী ডাইনীটাই তার জীবনে অন্ধকার টেনে এনেছে! ডাইনীটা যদি ঋষ্যশৃঙ্গকে আনতে না যেতো তাহলে আজ তার জীবন এমন অন্ধকারময় হতো না। তার জীবনের সমস্ত আনন্দ-আহাদ কর্পূরের মতো উবে যেতো না।

সখিদের ঢেলে দেওয়া জলে তার শরীর শীতল হলেও অন্তর শীতল হলো না। সখিরা তার গাত্র মার্জন করলো, রিঠাফল ভেজানো জল দিয়ে তার কেশ ধুয়ে দিলো। অনেক যত্নে স্নান করিয়ে সখিরা তাকে কক্ষে নিয়ে গিয়ে বিবাহের সাজে সাজাতে লাগলো।

এদিকে সমগ্র চম্পা-নগরীতে শবরীর নামে হই-চই পড়ে গেছে, আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সকলের মুখে মুখে এখন শবরীর নাম। কপর্দকহীন ভবঘুরের দল গণিকালয়ের সদরদ্বারের সামনে ভিড় করে ভেতরে উঁকিঝুঁকি মারার চেষ্টা করে, তাদের ঠ্যাঙাতে দ্বাররক্ষীর আর বিরাম নেই! এই আবালের দিনেও গুড়ের মাছির মতো নগরীর বিলাসী পুরুষেরা টেঁক ভর্তি কড়ি নিয়ে ভিড় জমাচ্ছে গণিকালয়ে, সকলেই শবরীর সান্নিধ্য চায়। মুনিকুমার ঋষ্যশৃঙ্গকে হরণ করার মতো এমন অসাধ্য সাধন যে করেছে তাকে একবার চোখে দেখতে চায়, তার গন্ধ-স্পর্শ পেতে চায়, তার দেহঝর্ণায় সুখময় অবগাহন করতে চায়। ক’দিন ধরেই দিন-রাতের যেন কোনো ভেদ নেই, নাগর আসতেই থাকে। শুধু কি চম্পা-নগরীর মানুষ? ভিন রাজ্যের যে-সব বণিকেরা চম্পা-নগরীতে বাণিজ্য করতে আসে, লোকমুখে শবরীর কথাশুনে তারাও ছুটে আসে টেঁক ভারী করে। কিন্তু যার জন্য এতো কিছু সেই শবরী এখন জগত সংসার সম্পর্কে নির্লিপ্ত, ক্ষুধা-তৃষ্ণার প্রতি উদাসীন, কামনা-বাসনার প্রতি বীতশ্রদ্ধ! গণিকালয়ে পা দেবার পর থেকে একজন নাগরকেও সে তার শয্যায় গ্রহণ করে নি। শরীর খারাপের দোহাই দিয়ে গৃহের কপাট বন্ধ করে সে শুয়ে থাকে। কন্যাকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেছেন গিরিকা, কিন্তু মায়ের কোনো কথাই এখন আর তোয়াক্কা করছে না সে। ফলে গিরিকাকে প্রবঞ্চনার আশ্রয় নিতে হচ্ছে, এতো এতো বনেদী বাবু তো আর হাতছাড়া করা যায় না। নগরীতে শবরীকে নিয়ে একটা হুজুগ উঠেছে। দ্বাররক্ষী আর ভৃত্যদের মুখে তিনি শুনেছেন, নগরীর কবিগণ শবরীকে নিয়ে গীত লিখেছেন আর বাউণ্ডলে গায়কেরা শৌণ্ডিকালয়ে কিংবা মানুষের জটলায় গাইছে সেই গীত। গায়কবৃন্দের মাধ্যমে সেই গীত এখন পানশৌণ্ড আর নগরীর মানুষের মুখে মুখে ফিরছে। আর সেই গীত শুনেই নাকি শবরীর প্রতি মানুষের আগ্রহ তুঙ্গে উঠেছে। এই আকালের দিনেও সৌখিন পুরুষদের টেঁকের কড়ি বাইরে আসার জন্য খয়রা মাছের মতো খলবল করছে, এইতো সময় হুজুগ কাজে লাগিয়ে ধনভাণ্ডার সমৃদ্ধ করার! হুজুগ কখনো দীর্ঘস্থায়ী হয় না; তাই যতোক্ষণ হুজুগ, ততোক্ষণই সুযোগ! অথচ কন্যা তার বিষয়-বুদ্ধিহীন, আবেগী আর যোগিনী ধাঁচের। তাই বলে তাকেও তো কন্যার মতো নির্বোধ হলে চলবে না। তিনি ওই খয়রা মাছের মতো খলবল করতে থাকা কড়িগুলো তার ধনভাণ্ডারে ভরতে চান, সে কারণেই ছলনার আশ্রয়। এক শবরী বেঁকে বসেছে তো কী হয়েছে, তার তো আরো শবরী আছে! তিনি অচেনা-অজানা নাগরদের উমা-সুলোচনা-বিশাখাদের শয্যায় পাঠাচ্ছেন ওদের প্রকৃত পরিচয় গোপন করে, ওরা প্রত্যেকেই এখন শবরী। অতি উৎসাহী কোনো নাগর ঋষ্যশৃঙ্গকে হরণ করার গল্প শুনতে চাইলে ওরা শবরীর মুখে শোনা গল্প নিপুণভাবে উপস্থাপন করছে; নাগরেরা বিপুল উৎসাহে গল্পে, নখক্ষতে, দন্তদংশনে, চুম্বনে, আলিঙ্গনে, মুখমেহনে, লেহনে, মর্দনে, সঙ্গমে অথৈ দেহসুখ আহরণ করছে; আর গিরিকা অতল আনন্দে গৃহে বসে কড়ি গুনছেন তাম্বূল চিবোতে চিবোতে!

ঋষ্যশৃঙ্গের সঙ্গে অতিবাহিত সময়ের সুখস্মৃতিগুলো শবরীকে তাড়িত করছে প্রবলভাবে। পুনরায় ঋষ্যশৃঙ্গের ওই কিশোরসুলভ নিষ্পাপ রূপ দর্শনের জন্য তার চিত্ত ছটফট করছে, একটি বার আলিঙ্গনের জন্য উদগ্রীব হয়ে আছে তার শরীর, একটি বার চুম্বনের জন্য তৃষ্ণার্ত হয়ে আছে তার ওষ্ঠ! রাজপুত্রের সঙ্গে না হয়ে মুনিকুমারের সঙ্গে রাজকুমারীর বিবাহ হবে বলে আশ্রমে যাবার পথে উমা তাকে বলেছিল যে এতোদিন রাজকুমারীর সৌভাগ্যকে সে ঈর্ষা করতো, কিন্তু এখন আর করে না, বরং রাজকুমারীর জন্য ওর করুণা হচ্ছে; আর এখন শবরীর হচ্ছে ঠিক উল্টো অনুভূতি, রাজকুমারীর সৌভাগ্যকে সে ভীষণ ঈর্ষা করছে! তার হৃদয় জ্বলে যাচ্ছে!

মুনিকুমার ঋষ্যশৃঙ্গ আর রাজকুমারী শান্তার বিবাহ উৎসবের নিমন্ত্রণ রক্ষা এবং শোভাবর্ধন করতে গণিকালয়ের সকলেই আজ রাজবাড়ী গেছে, যায় নি কেবল শবরী। রাজবাড়ীর রথ এসে নিয়ে গেছে সকলকে, দ্বাররক্ষী এবং ভৃত্যরাও গেছে রথের পিছু পিছু হেঁটে। সবাই মিলে জোরাজুরি করেও নিতে পারে নি শবরীকে। এতো বড় বাড়িতে এখন সে একা, বুক ভরা ব্যথা নিয়ে হাঁটছে গৃহের ছাদে, মরে আসা অপরাহ্ণের সূর্যের লালচে আভা একবার তার ডান গালে হাসছে তো আরেকবার বাম গালে।
ছাদ থেকে গণিকালয়ের সামনের রাস্তা স্পষ্ট দেখা যায়। নগরীতে যে বহুদিন বাদে উৎসবের ধুম লেগেছে শবরী তা বেশ বুঝতে পারছে পথচারীদের আসা-যাওয়া, তাদের হাস্যজ্জ্বল মুখ আর পরিপাটী বেশভূষা দেখে। মানুষেরা পায়ে হেঁটে, ডুলি-শিবিকারোহণে, রথারোহণে কেউ রাজবাড়ীর দিকে যাচ্ছে; কেউবা ফিরে আসছে। তাদের সদরদ্বারের সম্মুখে কোনো কোনো পথচারী থমকে দাঁড়াচ্ছে, শিবিকা এসে থামছে; কিন্তু সদরদ্বার বন্ধ দেখে কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর মুখে একরাশ হতাশা নিয়ে ফিরে যাচ্ছে।

রাস্তা থেকে দৃষ্টি গুছিয়ে এনে শবরী কয়েক মুহূর্ত রাখলো ছাদের কোনে, তারপর পুনরায় দৃষ্টি ছড়িয়ে দিলো আকাশের দিকে। কোথায় মেঘ! শিমুল তুলোর মতো ছেঁড়া ছেঁড়া সাদা মেঘ বহু ওপর দিয়ে ভেসে যাচ্ছে দক্ষিণ থেকে উত্তরের দিকে। এই মেঘে কি বৃষ্টি হবে? যে বৃষ্টির জন্য এতো কৌশল খাটিয়ে ঋষ্যশৃঙ্গকে আনা হলো, রাজকুমারীর সাথে তার বিবাহের বন্দোবস্ত হলো, কিন্তু সেই আকাঙ্ক্ষিত বৃষ্টি সত্যিই নামবে তো! সারা রাজ্যের মানুষ বৃষ্টির প্রত্যাশা করে আছে। অথচ মেঘের রূপ মোটেও আশাব্যঞ্জক নয়। মেঘের মতই শবরীর বিশ্বাসও ছেঁড়া ছেঁড়া, জমাটবদ্ধ নয়! নাকি গভীররাত্রে ফুলশয্যায় রাজকুমারী শান্তার সঙ্গে ঋষ্যশৃঙ্গ মিলিত হলেই দক্ষিণের সমুদ্র থেকে রাশি রাশি মেঘ দক্ষিণের রাজ্যগুলোর ওপর দিয়ে হুড়মুড়িয়ে ভেসে এসে প্রবেশ করবে অঙ্গরাজ্যে! অদেখা রাজকুমারীর সঙ্গে ঋষ্যশৃঙ্গের মিলনের কথা ভাবতেই শবরীর চোখ ঝাপসা হয়ে হলো, দূর আকাশের মেঘ আরো দূরে সরে গেল আর তার চিত্তের মেঘ নয়নাকাশ থেকে বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়লো অধরে।

বহুক্ষণ যাবৎ কখনো আকাশের দিকে, কখনো দূরের সুউচ্চ বৃক্ষের দিকে, আবার কখনোবা শূন্যে নির্নিমেষ তাকিয়ে রইলো শবরী। তারপর তার উদাসীন দৃষ্টি একসময় সদরদ্বারের সামনের রাস্তায় পড়লো, দু’জন মানুষকে অতিক্রম করতে গিয়ে দৃষ্টি থমকালো তাদের মুখে। দেবল আর সুকেতু না! হ্যাঁ, তাইতো। ওরা এখানে কেন? দু’জনের গায়েই পরিচ্ছন্ন পরিচ্ছদ। নিশ্চয় ওরাও রাজবাড়ীর বিবাহভোজ থেকে ফিরলো। বেচারা সুকেতু! বড় আশা নিয়ে হয়তো এসেছে উমার সঙ্গে দেখা করার জন্য। কিন্তু উমা তো নেই, সদরদ্বার বন্ধ দেখে নিশ্চয় সুকেতু হৃদয়ে পীড়া অনুভব করছে উমার জন্য। প্রিয়জনের দেখার জন্য হৃদয় একবার উদগ্রীব হলে তাকে না দেখা পর্যন্ত যে হৃদয়ে শান্তি থাকে না, তা এ ক’দিন হাড়ে হাড়ে অনুভব করছে সে। প্রিয়জনের বিরহ যে কতোটা যাতনাময়, তা তার চেয়ে আর কে ভাল বোঝে! ওরা দাঁড়িয়েই আছে সদরদ্বারের সামনে। উমারাও হয়তো সন্ধ্যার মধ্যেই এসে পড়বে, কিন্তু ততোক্ষণ যদি ওরা না থাকে! তবে তো সুকেতু আর উমার সাক্ষাৎ হবে না। সে হাত নেড়ে ওদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করলো, ওরা তাকে দেখতে পেলে সে ওদেরকে অপেক্ষা করতে বলবে। কিন্তু ওরা ওপর দিকে তাকাচ্ছে না, নিজেদের মধ্যে কথা বলছে আর বারবার সদরদ্বারের দিকে তাকাচ্ছে। চিৎকার করে ওদের নাম ধরে ডাকবে নাকি? না, সেটা শোভনীয় হবে না। আশপাশের বাড়ির আর রাস্তার মানুুষ কি ভাববে! তার চেয়ে নিচে নেমে গিয়ে সদরদ্বারের এপাশ থেকে ওদের সঙ্গে কথা বলবে, উমারা না আসা পর্যন্ত ওদেরকে অপেক্ষা করতে বলবে।

দ্রুত সিঁড়ি নিচে নেমে গেল শবরী। আঙিনা পেরিয়ে সদরদ্বারের কাছে গিয়ে দেবল আর সুকেতুর নাম ধরে ডাকলো, কিন্তু কোনো সাড়া পেলো না। বারবার ডেকেও যখন কোনো সাড়া পেলো না, তখন সে পুনরায় ছাদে উঠলো। দেখলো সদরদ্বার পিছনে ফেলে দেবল আর সুকেতু রাস্তার বাঁকের একেবারে শেষপ্রান্তে চলে গেছে। সে তাকিয়েই রইলো ওদের দিকে, মুহূর্ত কয়েক পরেই ওরা পথের বাঁকে হারিয়ে গেল।

একজন তরুণ গায়ক মৃদু লয়ে নৃত্য আর গীত শেষ করতেই করতালি আর প্রশংসা বাক্যে মুখর হয়ে উঠলো শৌণ্ডিকালয়, প্রদীপের লালচে আভায় তরুণের মুখের তৃপ্তিমাখা হাসি কারো দৃষ্টিগোচর হলো, কারোবা হলো না। গায়ক মাথা নত করে সকলকে অভিবাদন জানিয়ে বললো, ‘বন্ধুগণ, সুললিত ভাষায় এই গীতখানা রচনা করেছেন আমার বন্ধু এবং পথপ্রদর্শক, মহান কবি, তিনি এখন আপনাদের মধ্যেই আছেন।’

কয়েকজন জড়ানো কণ্ঠে উল্লাস করে উঠলো, ‘সত্যিই! কে, কে সেই মহামান্য? তাকে দর্শন করে ধন্য হতে চাই!’

আসনে উপবিষ্ট মদ্যপানরত মধ্য চল্লিশের একজন লোকের হাত ধরে তাকে টেনে তুললো গায়ক। লোকটার গাত্রে সস্তা মলিন পরিচ্ছদ, মাথার পাগড়িও যথেচ্ছ মলিন, একই রকম মলিন উত্তরীয়। নেশার প্রভাবে ঠিকমতো সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছে না। ডানদিকে ধনুকের মতো বাঁকা শরীরটাকে নিজের চেষ্টা এবং বন্ধুর সাহায্যে কোনোমতে সোজা করে হাত তুলে এবং কিঞ্চিৎ মাথা নত করে সকলের অভিবাদন গ্রহণ করলো।

একজন তরুণ পানশৌণ্ড বললো, ‘অতি উত্তম গীত রচনা করেছেন মহামান্য কবি।’ তারপর গায়েকের উদ্দেশে বললো, ‘আর দরাজ গলায় আপনি গেয়েছেনও চমৎকার!’
মধ্যবয়সী এক পানশৌণ্ড রসিকতা করলো, ‘মশাই, এমন গীত কী করে রচনা করলেন, কখনো কি শবরীর কামসুধা পান করেছিলেন নাকি?’

বলেই কালো দাঁত বের করে হাসতে লাগলো মধ্যবয়সী, তার হাসিকে সঙ্গ দিলো আরো কয়েকজনের হাসি। তারপর মধ্যবয়সী পানশৌণ্ডের দিকে আঙুল তুলে তাকিয়ে সম্মিলিত হাসি ছাপিয়ে অট্টহাস্য করে উঠলো কবি। তার হাসি যেন থামতেই চায় না! কোনোক্রমে হাসির রাশ টেনে সকলের উদ্দেশে বক্তৃতার ঢঙে বললো, ‘ভ্রাতাগণ, দু-বার....মাত্র দু-বার আমি শবরীর দেহঝর্ণায় কামস্নান করেছিলাম! অবশ্য তখন আমার অবস্থা এখনকার মতো কপর্দকহীন নয়, বেশ সচ্ছল ছিল। আমি তখন অভিজাত শৌণ্ডিকালয়ে গিয়ে মদ্যপান করতাম, অভিজাত গণিকালয়ে যেতাম। তখন আমার নৌকা ঝড়ের কবলে পড়ে যমুনায় ডুবে যায় নি। আমারই চোখের সামনে স্ত্রী-পুত্র-কন্যা যমুনাগর্ভে বিলীন গেল। আমি অন্ধকারে কিছু করা তো দূরের কথা, তাদের দেখতেও পেলাম না। আমি কোনোরকমে সাঁতরে বেঁচে কূলে ফিরলাম, কিন্তু তারপর থেকে আজ অব্দি বেঁচে মরে আছি আমি।’

বলতে বলতে কেঁদে ফেললো কবি। প্রদীপের মৃদু আলোয় তার অশ্রু দৃষ্টিগোচর না হলেও উত্তরীয় হাতে নিয়ে ঘন ঘন চোখ মুছলো সে। মদ্যপানরত উপবিষ্ট পানশৌণ্ডরা কেউ মন খারাপ করে কবির দিকে নিঃশব্দে তাকিয়ে রইলো, কেউবা মুখে ‘আহা আহা’ করলো। কবি পুনরায় বলতে শুরু করলো, ‘আমার বাণিজ্যতরী...’
তাকে থামিয়ে দিয়ে একজন প্রৌঢ় পানশৌণ্ড বললো, ‘ভ্রাতা, এই নিয়ে অন্তত কুড়িবার আপনার নৌকা ডোবার কাহিনী শুনেছি।’
‘শুনেছেন?’
‘হ্যাঁ, শুনেছি তো। এখানকার সবাই শুনেছে। আপনি বরং শবরীর কথা যা বলছিলেন, তাই বলুন।’

‘ও হ্যাঁ হ্যাঁ, শবরী...আহা-হা! কী অপূর্ব তার সৌন্ধর্য! স্বয়ং ব্র‏হ্মা যেন নিজহাতে তাকে সৃষ্টি করেছেন! ভ্রাতাগণ, শবরীর সৌন্ধর্যের কাছে স্বর্গের উর্বশী-মেনকা-রম্ভার সৌন্ধর্য নিতান্তই তুচ্ছ! পারিজাত পুষ্পের পাপড়ির ন্যায় মসৃণ তার ত্বক, সদ্যতোলা মাখনের ন্যায় গাত্রবর্ণ! আর গ্রহণলাগা চন্দ্রের ন্যায় তার অধরে একটা আশ্চর্য সুন্দর তিল! আমার ঘোর লেগে যেতো মশাই, তার দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকালেই ওই চন্দ্রগ্রহণ সম্পূর্ণ গ্রাস করতো আমাকে! তবে আমি পেরেছিলাম...’

‘তার দীর্ঘ বিরতি দেখে একজন বললো, ‘কী পেরেছিলেন?’
‘আমি পেরেছিলাম... তাকে তুষ্ট করতে।’ মুখে গর্বিত হাসি ফুটে উঠলো।
অন্যরা বাহবা দিয়ে বললো, ‘বাহ্ বাহ্! এই না হলে পুরুষ!’
‘ভ্রাতাগণ, সে বলেছিল, আমার পৌরুষ নাকি ইন্দ্রদেবকেও হার মানায়!’
‘বাহ্ বাহ্...!’ রব উঠলো।

‘আপনারা বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না, তার অধরের ওই গ্রহণলাগা তিলের কথা আমি আজও ভুলতে পারি না। আমাকে আজও যেন ইঙ্গিতে ডাকে। কিন্তু আর্থিক অসচ্ছলতার দরুন আমি এখন সেই মোহনীয় ডাকে সাড়া দিতে পানি না, শুনেছি তার প্রতি মুহূর্তের মূল্য এখন অনেক। আহা, কী আশ্চর্য সুন্দর তিল!’

বলতে বলতে পুনরায় কেঁদে ফেললো কবি। দেবল আর সুকেতু শৌণ্ডিকালয়ের এককোনার দিকে বসে এতোক্ষণ পান করছিল আর গায়কের কণ্ঠে গীত অতঃপর কবির কথা শুনছিল। হঠাৎ দেবল উঠে গিয়ে কবির মুখোমুখি দাঁড়ালো। তার চোখে চোখ রেখে বললো, ‘শবরীর অধরে আশ্চর্য সুন্দর তিল?’

‘তবে আর বলছি কী ভ্রাতা! স্মরণ হলে আমার চিত্ত আজও চঞ্চল হয়ে ওঠে; আমাকে ইঙ্গিতে ডাকে! আহা, আর কি পাব সেই জ্যোৎস্নামাখা রূপ দেখতে!’
বলে গর্বিত ভঙ্গিতে হাসলো কবি।

দেবল আবার বললো, ‘গ্রহণলাগা চন্দ্রের ন্যায় আশ্চর্য সুন্দর তিল?’
‘নিশ্চয়।’
‘সেই গ্রহণলাগা চন্দ্রের ন্যায় আশ্চর্য তিল শবরীর মুখশ্রীর ডানদিকে না বাঁ-দিকে?’
কবি এবার নটশিল্পীর ন্যায় উচ্চকণ্ঠে বিলম্বিত স্বরে বললো, ‘সেই আশ্চর্য সুন্দর তিন, সেই আশ্চর্য সুন্দর তিল, সেই আশ্চর্য সুন্দর তিল শবরীর মুখশ্রীর ডানদিকে।’

বাক্য শেষ হওয়ামাত্র দেবল সজোরে বাঁ হাতের এক চড় কষলো কবির ডান গালে, সঙ্গে সঙ্গে প্রায় চেঁচিয়ে বললো ‘মিথ্যেবাদী কোথাকার!’

সঙ্গে সঙ্গে ককিয়ে উঠে কবি প্রথমে উপবিষ্ট এক পানশৌণ্ডের শরীরের ওপর পড়লো, তারপর সেখান থেকে গড়িয়ে পড়লো ভূমিতে। গায়ক দেবলের দিকে তেড়ে আসতেই পিছন থেকে সুকেতু এসে গায়ককে ধাক্কা মেরে ফেলে দিলো কবির শরীরের ওপর, আর ভূপাতিত কবি পুনর্বার ব্যথায় ককিয়ে উঠলো!

আকস্মিক এই ঘটনায় পানশৌণ্ড, শৌণ্ডিক এবং পরিচারক সকলেই হতভম্ব! কিন্তু দেবল আর সুকেতুর রক্তাভ চোখের দিকে তাকিয়ে কেউই সাহস করে এগিয়ে এলো না, সকলেই মৌন হয়ে বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়ে রইলো। সুকেতু কোমরের খুঁট থেকে তিনটে কড়ি বের করে শৌণ্ডিকের সামনে ফেলে দিয়ে দেবলের হাত ধরে শৌণ্ডিকালয় ত্যাগ করলো।

বাইরে এখন বেলে জ্যোৎস্না। নগরের পথ ধরে দেবল আর সুকেতু হাঁটছে শবরীদের গণিকালয়ের উদ্দেশ্যে। সুকেতু উমার সঙ্গে সাক্ষাৎ না করে নৌকায় ফিরতে চায় না। তার প্রেমিক হৃদয় আজ ভীষণ চঞ্চল হয়ে উঠেছে প্রেমিকাকে দেখার জন্য। কখন রাত নেমেছে দু’জনের কারোরই তা স্মরণে নেই। দুপুরে রাজবাড়ীর বিবাহভোজে গিয়েছিল তারা, পেট পুরে রাজকীয় আহার সেরে ফেরার পথে উমার সঙ্গে দেখা করার উদ্দেশ্যে পড়ন্ত অপরাহ্ণে গিয়েছিল গণিকালয়ে, কিন্তু দ্বার বন্ধ দেখে হাঁটতে হাঁটতে গণিকালয়ের কাছের এক সস্তা শৌণ্ডিকালয়ে ঢুকেছিল। মদ্যপান করতে করতে কখন রাত নেমেছে দু’জনের কেউই তা খেয়াল করে নি। এখন রাতের কোন প্রহর তাও তারা ঠাহর করতে পারছে না, হবে হয়তো প্রথম কি দ্বিতীয় প্রহর। তবে যে প্রহরই হোক না কেন মানুষ আজ ঘুমোতে যায় নি শয্যায়, মানুষ জেগে আছে বৃষ্টি অপেক্ষায়, বৃষ্টিতে ভেজার অপেক্ষায়। আজ বৃষ্টি যেন এক উৎসবের নাম! মৃদু টল-টলায়মান পায়ে গল্প করতে করতে হাঁটছে দু’জন।

‘তুমি হঠাৎ অমন ক্ষেপে উঠলে কেন দেবলদা?’ জানতে চাইলো সুকেতু।
‘ক্ষেপবো না, শবরীর নামে মিথ্যে কথা বললো যে! শালা বলে কিনা গ্রহণলাগা চাঁদের ন্যায় তিল, অথচ শবরীর মুখে তিলের ছিটেফোঁটাও নেই।’
‘আগে হয়তো ছিল।’
‘ঘোড়ার ডিম ছিল! ডাহা মিথ্যে কথা বলছিল, তোর বিশ্বাস হয় ও শবরীর শয্যায় উঠেছে, ওর মতো একটা উল্লুককে শবরী শয্যায় তুলবে?’
‘তবে গীতখানা ভালই রচনা করেছে, কি বলো?’
‘ভাল না ছাই! গীত লিখেছে, কে ওকে শবরীকে নিয়ে গীত লিখতে বলেছে! শালা, শবরীকে দেখেই নি, আবার গীত লিখেছে।’
‘তুমি ওর ওপর এখনো চটে আছো দেখছি।’
‘চটবো না, শালা মিথ্যেবাদী কোথাকার!’
‘এই দাঁড়াও, দাঁড়াও...।’
‘কেন?’

সুকেতু দেবলের হাত ধরে দাঁড় করালো। তারপর দেবলের দুই কাঁধে দুই হাত রেখে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বললো, ‘আমার চোখের দিকে তাকাও।’
‘এইতো তাকিয়েছি, বল।’
‘তুমি শবরীকে ভালবাস, না?’
দেবল কোনো কথা বললো না, কেবল নীরবে আকাশের দিকে মুখ তুলে চাইলো।

নগরীর মানুষ আজ কেউ বুঝি গৃহে নেই; কেউ গৃহের ছাদে উঠেছে, কেউবা রাস্তায় নেমে এসেছে। আজ রাজকুমারী শান্তা আর মুনিকুমার ঋষ্যশৃঙ্গের ফুলশয্যার রাত, তাদের মিলনের ফলেই আজ রাতের যে-কোনো প্রহরে বৃষ্টি নামবে। তৃষিত অঙ্গরাজ্য আজ তৃষ্ণা মিটিয়ে শীতল হবে। তাই চম্পা-নগরীর মানুষ আজ ঘুমুতে চায় না। বহুদিন তাদের শরীর বৃষ্টির স্পর্শবিহীন, আজ সকলেই ভিজতে চায় বৃষ্টিতে। বৃষ্টির শীতল জলধারায় ভূমির ন্যায় তারাও শীতল হতে চায়। আজ নগরীর নানা জায়গায় নৃত্যগীত হচ্ছে, গীতের ভাষায় কেবলই বৃষ্টি আর শবরীর বন্দনা। মানুষ দল বেঁধে সে-সব নৃত্যগীত উপভোগ করতে যাচ্ছে, নিজেরাও যোগ দিচ্ছে নৃত্যগীতে। চম্পা-নগরীর রাতে আজ দিনের কোলাহল।

দেবল আর শবরী গণিকালয়ের দ্বারের সম্মুখে এসে দেখলো বেতের মোড়ায় বসে দেয়ালে হেলান দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে বৃদ্ধ দ্বাররক্ষী। তাদের পায়ের শব্দেও দ্বাররক্ষীর কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই, সে একইভাবে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। ওরা বুঝতে পারছে না দ্বাররক্ষী জেগে আছে নাকি তাকিয়ে ঘুমানোই তার স্বভাব। সুকেতু কাছে গিয়ে বললো, ‘দাদু, দাদু...আমরা একটু ভেতরে যেতে চাই।’

দ্বাররক্ষী একবার তাদের দু’জনের দিকে দৃষ্টি মেলে পুনরায় আকাশের দিকে তাকিয়ে বললো, ‘কোন চুলো থেকে এলে হে তোমরা! নগরীর সকল মানুষ আজ গৃহ ছেড়ে খোলা আকাশের নিচে নেমে এসেছে বৃষ্টিতে স্নান করার জন্য, আর তোমরা গৃহে সিঁধোতে চাইছো কামবারিতে ভেজার জন্য! কোথাকার মদনদেব হে তোমরা?’

সুকেতু রসিকতা করে বললো, ‘আজ্ঞে, আমি স্বয়ং মদনদেব আর এ আমার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা!’

দ্বাররক্ষী আকাশের দিক থেকে দৃষ্টি ফেরালো সুকেতুর মুখে, ‘সে তোমরা মদনদেব হও আর মহাদেব, তাতে কোনো লাভ হবে না! আজ ভেতরে প্রবেশ নিষেধ। কাল এসো।’

দেবল বললো, ‘দাদু, এ আপনাদের উমার নাগর। ক’দিন পরই উমার সঙ্গে ওর বিয়ে হবে।’

‘দেখো বাছা, রোজই তোমাদের মতো কেউ না কেউ এসে বলে আমি শবরীর নাগর, আমি বিশাখার দেবর, আমি সুলোচনার স্বামী। সব তোমাদের মতো মাতালদের প্রলাপ বুঝলে। এখন যাও ঝামেলা ক’রো না, আমাকে মেঘ আসা দেখতে দাও।’

সুকেতু বললো, ‘দাদু, সত্যি বলছি, আমি উমাকে খুব ভালবাসি, উমাও আমাকে ভীষণ ভালবাসে। আমরা রাজবাড়ির নৌকার দাঁড়ি, আমরাই তো নৌকায় বয়ে ওদেরকে মহর্ষি বিভাণ্ডকের আশ্রমে নিয়ে গিয়েছিলাম। মুনিকুমার আমাদের নৌকাতেই চম্পা-নগরীতে এসেছে।’

‘মদনদেব আর তার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা থেকে এক ঠেলায় নৌকার দাঁড়ি, একটু পর নিশ্চয় বলবে যে আমি ঋষ্যশৃঙ্গ আর তার সখা! আর ঝামেলা ক’রো না, এখন যাও।’

দেবল বললো, ‘আপনার বিশ্বাস না হয়, আপনি ভেতরে গিয়ে উমাকে আমাদের নাম বলুন। আমার নাম দেবল আর ও সুকেতু।’
‘ভালয় ভালয় বলছি হে ছোকরারা, চলে যাও, নইলে লাঠি দিয়ে ঠেঙিয়ে মাথা গুড়িয়ে দেব। স্বয়ং মহারাজ লোমপাদ এলেও আজ ভেতরে প্রবেশ করতে দেব না। মায়ের কড়া আদেশ, আজ যেন কাউকেই ঢুকতে না দিই।’

অনেক অনুনয়-বিনয় করেও তারা দ্বাররক্ষীকে টলাতে পারলো না। শেষে সুকেতু বললো, ‘এতো আচ্ছা ঘাড়তেড়া বুড়ো! কী করবো দেবলদা?’

‘ঢুকতে না দিলে আর কী করবো। আজ আর নৌকায় ফিরতে ইচ্ছে করছে না, বুকের ভেতরটা খাঁ খাঁ করছে। চল, ওদিকের পরিত্যক্ত পান্থশালার সামনের চাতালে গিয়ে বসি। বৃষ্টি নামলে ভিজে ভোরবেলায় নৌকায় ফিরবো।’
‘বেশ, তবে তাই চলো।’

দ্বাররক্ষী এরই মধ্যে আবার আকাশে দৃষ্টি ফিরিয়েছে, দৃষ্টি না নামিয়েই সে বললো, ‘তাই যাও, হতভাগার দল!’
সুকেতু মুখ ঝামটা দিলো, ‘চোপ, শালা নচ্ছার বুড়ো!’

গালি খেয়ে বুড়ো তাদের উদ্দেশে বকবক করতে লাগলো। কিন্তু ওরা আর পিছন ফিরলো না। হাঁটতে লাগলো পরিত্যক্ত পান্থশালার চাতালের দিকে।

পান্থশালার চাতালের ঘাসের ওপর বসলো দু’জন, মাথাটা ভার ভার বোধ হওয়ায় ক্ষণকাল পরই ঘাসের ওপর পাশপাশি শুয়ে পড়লো চিৎ হয়ে। শুয়ে দেখার ফলে ওদের মনে হচ্ছে আকাশটা বেশি দূরে চলে গেছে। পরিষ্কার আকাশে জ্বলজ্বল করছে অসংখ্য নক্ষত্র, আর পূর্ণিমার পর চন্দ্রের ঔজ্জ্বল্য কিছুটা ম্রিয়মাণ হলেও আকাশে এখানো ফুলের মতো ফুটে আছে চন্দ্র। আকাশে মেঘ খুব সামান্য এবং তা বহু ওপরে। সুকেতু বললো, ‘দেবলদা...।’

শরীরটা ভূমিতে ছেড়ে দেওয়ায় বেশ আরাম অনুভব করছে দেবল। নেশার প্রভাবে-আরামে সে চক্ষু মুদে আছে। সুকেতুর ডাকে চোখ বুজেই সে সাড়া দিলো, ‘হুম!’

‘বৃষ্টি হবে তো? আকাশে তো বৃষ্টি নামার মতো মেঘ দেখছিনে। গণকের গণনা মিথ্যে হবে না তো?’
দেবল চোখ খুলে দূরে ভাসা মেঘে দৃষ্টি রেখে বললো, ‘অমন অলুক্ষণে কথা বলিসনে সুকেতু, সারা রাজ্যের মানুষ আকাশের দিকে চেয়ে আছে বৃষ্টির আশায়; নিশ্চয় বৃষ্টি হবে। দেখছিসনে বাতাসে জোর নেই, তাই বোধ হয় মেঘ ভেসে আসতে দেরি হচ্ছে।’
‘ইস, উমার সঙ্গে যদি বৃষ্টিতে ভিজতে পারতাম!’

কিছুক্ষণ দু’জনেই মৌন হয়ে রইলো। মৌনতা ভেঙে সুকেতু বরলো, ‘জানো দাদা, যখনই মনে হয়, উমা অন্য একজন পুরুষের সঙ্গে একই শয্যায় আছে, আর সেই পুরুষ উমার শরীরটা ভোগ করছে, তখন আমার মরে যেতে ইচ্ছে করে। মনে হয়, ধুর শালার এই জীবনের কোনো মূল্য নেই, গঙ্গায় ঝাপিয়ে মরি!’

অস্থিরভাবে উঠে বসলো সুকেতু। দেবল কোনো কথা বললো না, একইভাবে শুয়ে শূন্যে তাকিয়ে রইলো; আর তার চোখের কোনা দিয়ে জল গড়িয়ে নামতে লাগলো কানের পাশ দিয়ে চুলের ভেতর। কয়েক মুহূর্ত পর করার পর সুকেতু বললো, ‘ঘুমিয়ে পড়লে নাকি?’

ঘাড় ঘুরিয়ে দেবলের মুখের দিকে তাকালো সে, দেবল ঘুমোয় নি দেখে বললো, ‘তুমি একটা পাথরের মূর্তি। নিজেকে প্রকাশ করো না, কিন্তু ভেতরে ভেতরে গুমরে মরো। তুমি মুখে না বললেও আমি জানি, শবরীকে তুমি ভালবাসো। তোমার চোখ দেখে আমি আগেই বুঝেছি, উমাও আমাকে বলেছে সে-কথা।’

দেবলের বুকের ওপর রাখা একটা হাত ধরে সুকেতু পুনরায় বললো, ‘সত্যি করে বলো আমায়, বলো তুমি শবীরকে ভালবাসো না?’

‘আমার ভালবাসায় শবরীর কিছু আসে যায় না সুকেতু, শবরীর মতো সুশ্রী কন্যাকে অনেক মানুষ ভালবাসবে সেটাই স্বাভাবিক। তা বলে শবরী কি সকলকেই মন দেবে? তাছাড়া আমি একজন সামান্য কুশ্রী নিষাদপুত্র, রাজনৌকার দাঁড়ি। আমি মাটিতে শুয়ে কেন ওই আকাশের তারা ছুঁতে চাইবো?’
‘কেন উমা আমাকে ভালবাসে নি?’
‘বেসেছে, হয়তো উমা তোর মধ্যে এমন কিছু দেখেছে যা ওকে আকৃষ্ট করেছে। তাছাড়া আমি দেখেছি, শবরী মুনিকুমারকে মন দিয়েছে।’
‘ধুর! তা হয় নাকি?’
‘হয়, হয়েছে। মুনিকুমারকে নিয়ে ফেরার সময় আমার চিত্ত এবং চোখ কেবলই শবরীকে পর্যবেক্ষণ করেছে। আমি শবরীকে দেখেই বুঝেছি সে মুনিকুমারকে ভালবেসে ফেলেছে।’

‘তোমার কথা যদি সত্যিও হয়, তা ছিল ক্ষণিকের ভালবাসা। মুনিকুমার এখন রাজজামাতা, শবরীর কথা তার মনেই থাকবে না।’
‘শবরীরা আমাদের জন্য নয় সুকেতু, সমাজের উঁচুতলার কড়িওয়ালা মানুষের জন্য ওদের জন্ম। আমাকে অলীক স্বপ্ন দেখাসনে।’
‘তাহলে উমা?’
‘কে জানে, উমা সাময়িক মোহে পড়ে তোকে কাছে টেনেছিলো কিনা, যদি সত্যি সত্যিই উমা তোকে ভালবাসে তবে তা অঘটন! এমন সৌভাগ্যের অঘটন সবার জীবনে ঘটে না।’

সুকেতু আবার ঘাসের ওপর শুয়ে পড়লো। কখনো আকাশের দিকে তাকিয়ে আবার কখনো নিমীলিত চোখে বৃষ্টির অপেক্ষায় আর বিরহপীড়িত গল্প-কথায় দু’জনের সময় অতিবাহিত হতে লাগলো, তারপর একসময় অন্ধকার নেমে এলো চোখে, আর ঠোঁটে নৈঃশব্দ।

রোজকার মতোই সূর্য উঠেছে অগ্নিচক্ষু মেলে, বিছিয়েছে রৌদ্রজাল; তবে উত্তাপ এখনো বাড়ে নি। পান্থশালার চাতালের পূর্বপাশের বকুলবৃক্ষটি মাতৃস্নেহের মতো ছায়া দিয়ে রেখেছে দেবল আর সুকেতুকে। ওদের ঘুম এখনো ভাঙে নি। হঠাৎ কাছে-পিঠে কোথাও সম্মিলিত কোলাহল, আর্তচিৎকার আর কান্নার রোল উঠলো। ঘুম ভঙে গেল দেবলের। চোখ মেলতেই প্রথম দৃষ্টি পড়লো রৌদ্রজল আকাশে। ধড়মড় করে উঠে বসলো সে। আশপাশের বৃক্ষপত্রে, ঘাসে ডগায়, ভূমিতে, এমনকি নিজের পরিধেয় বস্ত্রে খুঁজলো বৃষ্টির জল। বৃষ্টি! বৃষ্টি কোথায়? বৃষ্টির জল কোথাও নেই। রোজকার মতোই তৃষ্ণার্ত বৃক্ষলতা, ঘাস, মৃত্তিকা। বৃষ্টি তবে নামে নি, তুষ্ট হন নি ইন্দ্রদেবতা? সত্যিই মিথ্যে হয়ে গেল গণকের গণনা আর পুরোহিতের বিধান? ওদিকে কোলাহল, আর্তচিৎকার আর কান্নাররোল আরো জোরালো হচ্ছে। সুকেতুর কাঁধে ধাক্কা মেরে ওকে জাগালো দেবল। মদ্যপানজনিত বিষাদ নিয়ে চোখ মুছতে মুছতে উঠে বসলো সুকেতু, তারপর চেতনায় কান্নার শব্দ প্রবেশ করতেই বললো, ‘ওদিকে কী হয়েছে দেবলদা?’
‘কী জানি!’
‘কেউ মরে গেল নাকি?’ রাতে যে বৃষ্টি নামার কথা তা স্মরণেই নেই সুকেতুর।
‘চলতো দেখি।’

দু’জনে রাস্তায় উঠে পূর্বদিকের কান্না আর কোলাহলের দিকে এগোতে লাগলো। কিছুদূর এগিয়ে রাস্তার বাঁকটা ঘুরতেই ওদের দৃষ্টিগোচর হলো শবরীদের গণিকালয়ের সামনে দণ্ডায়মান রথ, রাজার সৈন্য আর দূরে দাঁড়িয়ে থাকা কিছু মানুষ। দ্রুত পায়ে হেঁটে মানুষের ভিড়ে গিয়ে দাঁড়ালো ওরা। সদরদ্বার খোলা থাকলেও রথ আর সৈন্যরা দাঁড়িয়ে থাকায় গণিকালয়ের ভেতরটা দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না; কিন্তু গণিকাদের সম্মিলিত কান্না; গিরিকার আর্তনাদ ভেসে আসছে কানে। দেবল ভিড়ের একজন মানুষের কাছে জিজ্ঞাসা করলো, ‘কী হয়েছে?’

‘মহারাজ ওই নচ্ছার মাগিদের পাঠিয়েছিল মুনিকুমারকে আনার জন্য। পবিত্র দেহে মুনিকুমারকে নিয়ে আসার কথা থাকলেও মাগিরা মুনিকুমারের দেহ অপবিত্র করেছে। মুনিকুমারের সঙ্গে নাকি সঙ্গমে লিপ্ত হয়েছিল, এজন্যই তো রাতে রাজ্যে বৃষ্টি নামে নি। এখন রাজবাড়ীর সৈন্য এসেছে ওই মাগিদের ধরে নিতে, দণ্ড দেওয়া হবে ওদেরকে। মনে হয় ওদের শূলে চড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে।’

অন্য একজন বললো, ‘শবরী মাগিটাকে শূলে চড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়াই উচিত!’

আরো অনেকে অনেক রকম কথা বললো গণিকাদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে, বৃষ্টি না নামায় সকলেইগণিকাদের প্রতি ক্ষুব্ধ, বিশেষত শবরীর প্রতি। দেবলের কানে যেন কেউ ক্রমাগত চড় মারলো। কী অদ্ভুত মানুষ এরা, কাল রাত অব্দি নৃত্য করতে করতে শবরীর নামে জয়ধ্বনি দিয়েছে, শবরীকে নিয়ে লেখা গীত গেয়েছে, আর আজকে এরাই আবার শবরীকে শূলে চড়িয়ে মৃত্যুদ- দেওয়ার পক্ষে রায় দিচ্ছে! কাল পর্যন্ত শবরী এদের কাছে প্রায় দেবীতুল্য ছিল, নিজেদের আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ না হওয়ায় আজ এদের কাছেই শবরী যেন ডাইনী! ক্ষুব্ধ দেবলের দৃষ্টি ঘুরতে লাগলো জনতার মুখশ্রীতে আর সদরদ্বারে। আর তখনই ভেতর থেকে সদরদ্বারের বাইরে এলেন দেবলের পরিচিত একজন রাজকর্মকর্তা। তার পিছনে একজন কঠোর মুখের সৈন্য শবরীর চুলের মুঠি ধরে টেনে-হেঁচড়ে তাকে দ্বারের বাইরে নিয়ে এলো। তাদের পিছন পিছন তিনজন সৈন্য মেষের পালের মতো তাড়িয়ে নিয়ে এলো অন্য গণিকাদের, যারা সকলেই আর্তনাদ করছে। গিরিকা এবং উমা কাঁদতে কাঁদতে সৈন্যের হাত থেকে শবরীকে ছাড়াতে গেলে অন্য এক সৈন্য তাদের বাহু ধরে ছুড়ে ফেলে দিলো রথের অপেক্ষমাণ চাকার কাছের। কঠোর মুখের সৈন্য শবরীকে টেনে-হেঁচড়ে রথে তুলতে উদ্যত হলো, তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে এলো আরো দু’জন সৈন্য। ভূপাতিত গিরিকা পুনরায় দৌড়ে গিয়ে গিরিকাকে জড়িয়ে ধরলেন।

একবার সুকেতুর মুখের দিকে তাকালো দেবল। ভিড় ঠেলে মুহূর্তের মধ্যে দৌড়ে রথের কাছে গিয়ে প্রবল বিক্রমে একজন সৈন্যের হাত থেকে লাঠি কেড়ে নিলো, সৈন্যরা কিছু বুঝে উঠার আগেই লাঠির এলোপাথারি আঘাত পড়তে লাগলো সৈন্যদের ওপর। শবরীকে ছেড়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল সৈন্যরা, আকস্মিক এবং অপ্রত্যাশিত আঘাতে সৈন্যদের কারো হাতের লাঠি ছিটকে পড়লো ভূমিতে। কেউ পাল্টা আক্রমণে উদ্যত হলো।

সুকেতু কল্পনাও করে নি দেবল এমন দুঃসাহসী কাণ্ড করবে বা তার পক্ষে এটা করা সম্ভব! কিন্তু তার প্রিয় দেবলদা যখন দুঃসাহস করেই ফেলেছে তখন আর তার দাঁড়িয়ে থাকা চলে না। জীবন বিপন্ন হলেও ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। সে-ও দৌড়ে গিয়ে পড়ে থাকা একটা লাঠি হাতে তুলে নিয়ে চড়াও হলো সৈন্যদের ওপর। ছয়জন সৈন্যের মধ্যে দেবল শুরুতেই তিনজনের মাথা ফাটিয়ে ভূপাতিত করেছে। তাদের আর নড়বার শক্তি নেই। একজনের হাত থেকে লাঠি পড়ে যাওয়ায় দৌড়ে পালাতে গিয়ে রাজকর্মকর্তার ধমক খেয়ে পুনরায় ফিরে এসেছে। অন্য দু’জন লড়ছে দেবলের সঙ্গে। ততোক্ষণে সুকেতুও বিক্রম দেখাতে শুরু করেছে, লাঠির আঘাতে রথের সারথিকে ভূপাতিত করেছে। জোর লড়াই চলছে। রাজকর্মকর্তা দূর থেকে চিৎকার করে সৈন্যদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন দেবল আর সুকেতুকে ধরাশায়ী করার জন্য। কিন্তু যখন দেখলেন রাজসৈন্যরা কোনোভাবেই দেবল আর সুকেতুর সঙ্গে পেরে উঠছে না, ছয়জন সৈন্যের মধ্যে চারজনই ভূপাতিত আর বাকি দু’জনের লড়াইও সন্তোষজনক নয়, তখন তিনি রাজবাড়ীর উদ্দেশ্যে দৌড়তে লাগলেন আরো সৈন্য নিয়ে আসার জন্য।

এদিকে সর্বশেষ দু’জন রাজসৈন্যকেও ওরা ভূপাতিত করেছে। সৈন্যরা কেউ জ্ঞান হারিয়েছে, কেউ কাতরাচ্ছে। রাজকর্মকর্তা মাত্র ছয়জন সৈন্য নিয়ে এসেছেন, হয়তো ভেবেছিলেন অবলা গণিকাদের তুলে আনতে বেশি সৈন্যের আর কি প্রয়োজন!
সুকেতু এরই মধ্যে রথে উঠে রথ ঘুরিয়েছে গঙ্গার ঘাটে যাবার রাস্তার দিকে। সে চিৎকার করে বললো, ‘তাড়াতাড়ি রথে ওঠো সবাই।’

পর পর ঘটা ঘটনার আকস্মিতায় ভূপাতিত হতভম্ব শবরী প্রস্তরমূর্তির ন্যায় আধশোয়া হয়েই পড়েছিল ধুলোয়, দেবল তার বাহু ধরে তুলে দ্রুত রথের কাছে এনে বললো, ‘জলদি উঠুন।’

শবরীর পর প্রায় দৌড়ে এসে রথে উঠলেন গিরিকা, তারপর উমা। অন্য গণিকারা কেউ আগেই উঠেছিল, কেউ গিরিকাকে উঠতে দেখে দৌড়ে এসে উঠলো। চাপাচাপি করে কেউ কারো কোলে বসলো, কেউবা দাঁড়িয়ে রইলো কোনোরকমে। সবশেষে রথে উঠে সুকেতুর পাশে বসলো দেবল। সুকেতু ঘোড়াগুলোর পিঠে চাবুক মারতেই রথের চাকা ঘুরতে শুরু করলো। পিছনে পড়ে রইলো গিরিকার সাধের গণিকালয়, তার নিজের কক্ষে অমূল্য রত্ন আর স্বর্ণালংকারের পাত্র, এতোদিনের জমানো কড়ির ভাণ্ডার, আরো কতো মূল্যবান দরকারি দ্রব্যসামগ্রী!

সুকেতু’র হাতের ক্ষিপ্র চাবুক সপাৎ সপাৎ শব্দে পতিত হচ্ছে ঘোড়ার পৃষ্ঠদেশে আর ধুলো উড়িয়ে বিপুল বেগে গঙ্গার ঘাটের দিকে ছুটছে ঘোড়াগুলো। ইন্দ্রদেবের সন্তুষ্টিতে যে বারি বর্ষিত হবার কথা ছিল আকাশ থেকে, রাজরোষে পড়ে এবং নিশ্চিত রাজদণ্ডের হাত থেকে অপ্রত্যাশিতভাবে রক্ষা পাবার পরও এখন সে বারি ঝরছে গণিকাদের বেদনাতুর-আতঙ্কিত নয়নাকাশ থেকে!

সমাপ্ত

নগরনটী (উপন্যাস: পর্ব-এক)
নগরনটী (উপন্যাস: পর্ব-চৌদ্দ)

বিভাগ: 

Comments

সাইয়িদ রফিকুল হক এর ছবি
 

কিছু-কিছু পর্ব পড়তে পারিনি।
তবুও যা পড়েছি, তাতে ভীষণ ভালো লেগেছে।
বইটি ছাপা হলে জানাবেন।
আর এটি কি কোনো পৌরাণিক কাহিনী?
শুভকামনা রইলো।

আমি মানুষ। আমি বাঙালি। আমি সত্যপথের সৈনিক। আমি মানুষ আর মানবতার সৈনিক। আর আমি ত্বরীকতপন্থী-মুসলমান। আমি মানুষকে ভালোবাসি। আর আমি বাংলাদেশ-রাষ্ট্রকে ভালোবাসি। জয়-বাংলা। জয়-বাংলা। জয়-বাংলা।...
সাইয়িদ রফিকুল হক

 
মিশু মিলন এর ছবি
 

অনেক ধন্যবাদ। হ্যাঁ, এটা রামায়ণ ও মহাভারতের ঋষ্যশৃঙ্গের উপাখ্যান অবলম্বনে রচিত। কয়েক জায়গায় কথা বলেছি, টাকা ছাড়া কোনো প্রকাশক বই বের করতে চায় না। আর আমি একজন বিচ্ছিন্ন লেখক, কোনো গোষ্ঠীবদ্ধও নই। ফলে আপাতত বই বের হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তবে ই-বুক করতে পারি হয়তোবা। ভাল থাকবেন। শুভকামনা...........

 
ড. লজিক্যাল বাঙালি এর ছবি
 

চমৎকার লেখাটি শেষ হলো। ধন্যবাদ লেখককে। শুভতা !

==============================================
আমার ফেসবুকের মূল ID হ্যাক হয়েছিল ২ মাস আগে। নানা চেষ্টা তদবিরের পর গতকাল আকস্মিক তা ফিরে পেলাম। আমার এ মুল আইডিতে আমার ইস্টিশন বন্ধুদের Add করার ও আমার ইস্টিশনে আমার পোস্ট পড়ার অনুরোধ করছি। লিংক : https://web.facebook.com/JahangirHossainDDMoEduGoB

===============================================================
জানার ইচ্ছে নিজেকে, সমাজ, দেশ, পৃথিবি, মহাবিশ্ব, ধর্ম আর মানুষকে! এর জন্য অনন্তর চেষ্টা!!

 
মিশু মিলন এর ছবি
 

অনেক ধন্যবাদ। শুভকামনা.....

 

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

মিশু মিলন
মিশু মিলন এর ছবি
Offline
Last seen: 1 দিন 3 ঘন্টা ago
Joined: সোমবার, ফেব্রুয়ারী 20, 2017 - 9:06অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

কু ঝিক ঝিক

ফেসবুকে ইস্টিশন

SSL Certificate
কপিরাইট © ইস্টিশন.কম ® ২০১৬ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর