নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 7 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • নুর নবী দুলাল
  • হাসান নাজমুল
  • শ্রীঅভিজিৎ দাস
  • মুফতি বিশ্বাস মন্ডল
  • নিরব
  • সুব্রত শুভ
  • কুমকুম কুল

নতুন যাত্রী

  • নিনজা
  • মোঃ মোফাজ্জল হোসেন
  • আমজনতা আমজনতা
  • কুমকুম কুল
  • কথা নীল
  • নীল পত্র
  • দুর্জয় দাশ গুপ্ত
  • ফিরোজ মাহমুদ
  • মানিরুজ্জামান
  • সুবর্না ব্যানার্জী

আপনি এখানে

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র এবং স্মৃতিতে "আগুনের পরশমণি"


সকালে গান খুঁজতেছিলাম, "নিশা লাগিলো রে"। ইউটিউবে দিতেই প্রথমে আসলো "আগুনের পরশমণি" সিনেমা থেকে কেটে নেয়া কনকচাঁপার গাওয়া গানটা। আমি এই গানটা প্রথম শুনি একদম ছোট থাকতে, সিনেমা হলে। গানটা ছাড়বার পর ফ্ল্যাশব্যাকের মত অনেক স্মৃতি সামনে আসলো।

আমি তখনও অনেক ছোট, ৯৪ কিংবা ৯৫ সাল হবে, খালেদা জিয়ার বিএনপির শাসনামল। ওই আমলের আবছা হয়ে যাওয়া স্মৃতির মধ্যে মনে পড়ে নিয়মিত বিরতিতে হরতালের কথা। হরতাল মানেই ছিল আনন্দের কিছু। স্কুলে যাইতে হইত না। আমি মনে প্রাণে চাইতাম রেগুলার হরতাল হোক। একসময় মনে হয় লাগাতার হরতাল দিত বিরোধীদল। লম্বা সময় স্কুলে যাওয়া লাগেনাই দেখে আমাদের সময় সারাদিন মাঠেই কাটতো, আনন্দের সময় ছিল। ওইসময় বাসায় দুইটা পেপার রাখা হইতো। একটা ইনকিলাব, আরেকটা জনকন্ঠ গোছের কিছু, ঠিক মনে নাই। তখন দেশের খবর পাওয়ার উপায়ই ছিল এই সংবাদপত্র। তাই দুইপক্ষের ভাষ্যই যাতে পাওয়া যায় তাই দুইটা পেপার রাখতো বাসায়। একবার পেপারে দেখছিলাম এক সরকারী কর্মচারীকে দিগম্বর করে দিছে বিরোধীদল। দেখে খারাপ লাগছিলো, ওই বয়সেই মনে হইতেছিল বেচারা কি লজ্জাটাই না পাইছে। পেট্রোল বোমার যুগ শুরু তো কেবল সেইদিন...

যাইহোক, ওই সময়েই একদিন স্কুল খোলা থাকবার দিন স্কুলে গিয়া স্কুলে ঢোকার আগমূহুর্তে আব্বুর গাড়ি দেখে অবাক হই। স্কুলে নরমালি পদব্রজে যাইতাম। স্কুল ছিল বাসা থেকে প্রায় ২ কিলোমিটার দূরে, আরও বেশিও হইতে পারে। মিরপুর রুপনগর থেকে মনিপুর স্কুল। তখন রিক্সাভাড়া ছিল ৫ টাকা, এখন মনে হয় ৩০-৪০ টাকা হইছে। গাড়ি দিয়া বছরে দুই একবার ড্রপ করতো আব্বু, যদি কপাল অনেক ভাল থাকতো। সেইদিন নিজেরে বড়লোক মনে হইতো। আরও বড় ব্যাপার ছিল যেহেতু আব্বু সাথে থাকতো, আব্বু স্কুলে নামাইলে ৫ টাকা দিত। আম্মু জীবনেও স্কুলের টিফিনের জন্য চারআনাও দেয়নাই। সেইসাথে আমার মারে দেখি শাড়ি পরে সাজুগুজু অবস্থায়, সাথে স্কুল ড্রেসেই আমার বড় ভাই। মানে তারেও স্কুল থেকে তুলে আনছিল মনে হয় আব্বু আসবার সময়। কাহিনি হইছিল যে আমি স্কুলে চইলা আসছি হাঁটতে হাঁটতে, এতে আধঘন্টার বেশি টাইম লাগছে। এরমধ্যে আব্বু আমার ভাইরে ওর স্কুল থেকে তুলে আনছে আগে, এরপর আম্মুরে বলছে তাড়াতাড়ি রেডি হও। এরপর আমারে তুলতে আনছে। উপলক্ষ্য হইল একটা সিনেমা দেখা। সিনেমার নাম "আগুনের পরশমণি", হুমায়ুন আহমেদের সিনেমা। তখন দেশে হুমায়ুন আহমেদের সবকিছুর তুমুল জনপ্রিয়তা, এখনও অবশ্য একই আছে।

যাইহোক, জীবনে আগে সিনেমাহলে ঢুকিনাই। ব্যাপক উত্তেজনায় পাইয়া বসলো। কার্টুন দেখার বয়সও তখন যায়নাই। তখনও শুক্রবারের টিভিতে বাংলা সিনেমায় মারামারির দৃশ্য আসলে আব্বুর পিঠের পিছনে গিয়া মুখ লুকাইতাম। নায়ক নায়িকার কষ্ট দেইখা বুক ফাইটা কান্না আসতো। এখনও আমি মুভি দেইখা মাঝে মাঝে আনন্দেও কান্দি, কষ্টেও কান্দি, তবে ওই বয়সের মত এত না। অন্ততঃ ভয়ে মুখ লুকাই না। আব্বু আমাদের সবাইরে নিয়া গাড়িতে চাপাচাপি কইরা বসাইয়া সিনেমা হলে নিয়া গেল, মিরপুরের সনি সিনেমা হলে। দুপুর ১২ টা কিংবা ১ টার দিকের শো ছিল মনে হয়। ঢুকার আগে আমারে চিপস আর টপসি নামের একটা পোলাপানের হট ফেভারিট ড্রিংক কিনে দিছিলো এইটাও মনে আছে। সিনেমা হলের টিকিট সেইবারই প্রথম হাতে দেখি। নীল রঙের পাতলা কাগজ ছাড়া আর কিছুই না। আমি ভাবতাম সিনেমার টিকিটও ওই আমলের ট্রেনের টিকিটের মত শক্ত হলুদ কিংবা গোলাপি টুকরা কাগজের মত হবে। টিকিট বলতে তখন মাঝে মাঝে ট্রেনের টিকিটই চোখে দেখতাম, এই আমলে ট্রেনের টিকিট দেখতে অন্যরকম।

সিনেমাহলে ঢুকার পর অবাক হই। দেখি যে সিট নাই। আমি প্রথমে বুঝিনাই বসবো কিভাবে। এরপর আব্বু একটা সিট টাইনা নীচে নামাইলো, এরপর বসলো। মানে সিটের পশ্চাদদেশ রাখার অংশটা ফোল্ড করা থাকে নরমালি, ওইটা নামায় নিয়া বসতে হয়। বসার পরে দেখলাম ওইটায় দোলনার মত মুভও করা যায়। একদম সামনের সারিতে বসছিলাম, ওই জায়গারে মনে হয় ডিসি বলে।

যাইহোক, সিনেমা ছাড়ার আগে হুট করা দেখি পতাকা উড়া শুরু হইলো সামনে আর সাথে জাতীয় সংগীতের ইন্সট্রুমেন্টাল। আব্বু বললো, "দাঁড়াও"! দেখাদেখি আরও অনেকে দাঁড়াইলো, এরপর পুরা সিনেমা হলই দাঁড়ায় গেলো। জাতীয় সংগীত শেষ হইলে সবাই আবার বসলাম। সেইদিন থেকে আমি জানি জাতীয় সংগীত বাঁজলে দাঁড়াইতে হয়। আমার ব্যাপারটা ভাল্লাগছিল।

সিনেমা শুরু হইল। সিনেমার শুরুতেই, "হাতে তাদের মারণাস্ত্র চোখে অঙ্গীকার, সূর্যকে তারা বন্দী করেছে এমন অহংকার, ওরা কারা, ওরা কারা..." এই গানটা ছিল। বুকের মধ্যে গিয়ে লাগছিল। গানটা কার লেখা আমি জানিনা, আমার মতে এইটাও মুক্তিযোদ্ধাদের মহিমাণ্বিত করা অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটা বাংলা গান। আমি আবছা স্মৃতি থাইকা লিখতে বসছিলাম। লিখবার মাঝে আমি আবার আগুনের পরশমণি ছাইড়া ঘন্টা খানেক দেখে ফেলছি। অনেককিছু মনে পড়তেছে আবার। মনে পড়তেছে শুনছিলাম, "আই মেজর জিয়াউর রহমান..." এইভাবে দেয়া মেজর জিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণা। ওই আমলে জিয়ার পার্ট থাকবেনা এমন হবারই কথা না। আমি এখনও নিশ্চিত যে ছিল সেইটা, আমি শুনছি। যদিও ইউটিউবে এখন দেখা ভার্সনে নাই। আবার জয় বাংলা স্লোগানও ছিল। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু ওই আমলে ৭-ই মার্চ আর ১৫-ই আগষ্ট কেবল মাইকে শোনা যাইতো। আর মাঝেমাঝে শুনতাম হরতালের মিছিলে।

হুমায়ুন আহমেদকে নিয়া অনেকেই অনেক কথা বলেন। সস্তা লিখতেন, জনপ্রিয় ধারায় লিখতেন, হেনতেন হেনতেন। কিন্তু আমার মতে এই লোকটা যেইভাবে নির্মোহ সত্যি বলতেন, যতটা সাহস রাখতেন নিজে যা বিশ্বাস করেন, সত্য জানেন তা বলে যাবার, তা অনেক বিপ্লবী নেতাও করেন নাই। উনার ভাই ডঃ মুঃ জাফর ইকবালকে আওয়ামীপন্থী বলা যায় সহজে। কিন্তু হুমায়ুন আহমেদের ব্যাপারে কোন একদলের সমর্থক ছিলেন এইটা বলা টাফ। আমার যতটুকু মনে হয় উনি ছিলেন ঈশ্বরে সংশয়বাদী, ধর্ম হয়তো মানতেন না। রাজনীতি নিয়া হয়তো মোহগ্রস্থ্যও ছিলেন না। উনি নিজের মর্জিমাফিক চলছেন, নিজের মর্জিমত বলছেন।

এই সিনেমাটার প্লটও উনার সবকিছুর মতই সহজবোধ্য, সাধারণ মানুষের চিন্তার সাথে যায়। আবার এইখানেও খুব সামান্যকিছু মানবিক দৃশ্য ছিল যা দেখলে অনেকের অপ্রয়োজনীয় মনে হইতে পারে, কিন্তু ওই সময়ের অবস্থা বোঝানোর জন্য সেইগুলার চেয়ে সরল এবং আদর্শ অন্যকিছু মাথায় আসতেছেনা। যেমন কয়টা উদাহরণ দেইঃ

- এক জায়গায় আবুল হায়াত ওরফে সরকারী চাকুরে মতিন উদ্দিন সাহেবের রিক্সা পাকিস্তানী সেনারা আটকায়। উর্দু না বুইঝা উত্তর দিতে না পারার কারণে রিক্সাওয়ালারে ব্যাপক মাইরা রাস্তায় ফালাইয়া রাখে। মতিন সাহেব ডান্ডি কার্ড দেখাইয়া রক্ষা পান। সেনারা চইলা যাইতে নিলে উনি রিক্সাওয়ালার কাছে যান, কিন্তু পাকি সেনারা পিছনে ফিরা চাইলে উনি আবার তারে ছাইড়া সামনে চইলা যাইতে নেন। কিন্তু যাওয়ার আগে রিক্সা থাইকা উনার ছাতা আর বাসার জন্য কিনে আনা কলা তুইলা নিয়া কলার কাদিটা রিক্সাওয়ালার মাথার কাছে ফালাইয়া যান। ওই সময়ে অনেক মানুষ জীবনের ভয়ে অনেককিছু করতে পারেনাই, তাও নিজের যতটুকু সামর্থ্য ছিল তা করছে। ওই সময়ে মতিন সাহেবের করবার মত ছিল ওই কলাগুলা রাইখা যাওয়া।

- গণকবর দিতে আসবার সময় খবর খুঁড়ে যেই কুলিরা, তারা নির্বিকার কাজ করছে। কিন্তু লাশগুলা ফেলবার সময় তাদের চোখ ছিল করুণ। সেনারা চইলা গেলে তারা গণকবরের লাশগুলার জন্য হাত তুইলা মুনাজাত করছে। তাদেরও সামর্থ্যে ছিল কেবল অতটুকুই।

- এক দোকানদার নিজেরে রক্ষা করবার জন্য দোকানে ইয়াহিয়ার ছবি রাখছিল, কিন্তু সে ওই ছবি থুথু দিয়া মুছত। ক্ষোভ কমানোর উপায়। ঠিক যেইভাবে মতিন সাহেব উনার পাকিস্তানপন্থী কলিগরে সরাসরি গালি না দিয়া কাগজে গালি লিখতেন।

- রাস্তায় দাঁড় করাইয়া বাঙালিদের দিগম্বর করানো এবং দিগম্বর অবস্থায় কান ধইরা উঠাবসা করাইয়া মজা নেওয়ার দৃশ্য দেইখা তাৎক্ষণিক রাগ উঠা গেরিলা আসাদুজ্জামান নূর ওরফে বদির গাড়িতে সাংগপাঙ্গ নিয়া আইসা হঠাৎ ব্রাশফায়ারে ওই পাকিস্তানী সেনাদের খুন করবার দৃশ্য বলে যে কেউ আবেগের উর্ধ্বে না। স্বজাতির সদস্যদের অপমানে নিজের আত্মসম্মানবোধও আহত হয়। মানুষ অসম্ভব ঝুঁকিও নেয়। এই সেনা মাইরা ফেলা পরবর্তী কার্যকলাপে পাকিস্তানীরা কি করে তাও দেখাইছেন উনি। সবকিছুই স্বাভাবিক দৃশ্য, একটাও অতি নাটকীয় ছিল না।

এইসব গেল সাধারণ দৃষ্টিতে সাধারণ মনে হইলেও আমার কাছে অসাধারণ উপস্থাপন। এর বাইরে অরিজিনাল সিনেমায় যা ছিল তা হইছে দিগম্বর করবার দৃশ্য। আবছা বোঝানো না। ভালোমত দেখানো ন্যাংটা পুরুষেরাই ছিলেন। পশ্চাদদেশ দেখানো দৃশ্য না কেবল, পুরুষাঙ্গ ঝুলতে দেখা যাওয়া দৃশ্য। পরে জানছি সেন্সরবোর্ড নাকি এই দৃশ্য সহ আরও কিছু দৃশ্য আটকাইছিলো। উনি বলছিলেন যদি সিনেমা হলে যায় তাইলে পুরাটাই যাবে, নাইলে যাবে না। যেইসব কাজ পাকিস্তানীরা স্বাভাবিকভাবে কইরা গেছে, তা চলচ্চিত্রে আসাও খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। ছোট ছিলাম, তাই হুট কইরা ন্যাংটা মানুশষ বাপ মায়ের সাথে বইসা দেখতে খুব বিব্রত হইছিলাম, কিন্তু আমার বাপ মা আমারে চোখ বন্ধ করতে বলে নাই।

এই সিনেমার আরও ভালোকিছু ব্যাপার হইল হালকার উপ্রে ঝাপসা মধ্যবিত্ত টাইপ রোমান্স, জায়গায় জায়গায় হিউমার, বেশি নাটকের মধ্যে না গিয়া নরমাল সাসপেন্সে দর্শকদের ওই সময়ের মানসিক উত্তেজনার মধ্যে দিয়া যাওয়ার অনুভূতি দেয়া। একটা অবরুদ্ধ ও দখলীকৃত শহর যেমন ছিল, তেমনই দেখাইছিলেন উনি। সিনেমার জন্য সিনেমার উপযোগী সিনেম্যাটিক কোনো সিন যোগ করেন নাই।

শেষের দিকে গেরিলাদের একশনের দৃশ্যটা একটু ছেলেমানুষী লাগছে, এইজন্য উনারে মাফ করা যায়। উনি যোদ্ধা ছিলেন না, নিজে গেরিলাও ছিলেন না। অস্ত্র চালনার বেসিকস কিংবা যুদ্ধের সময় যোদ্ধাদের পজিশন নেয়ার বেসিকসগুলা উনার জানার কথা না। ঠিকঠাকই বলা যায় ওইভাবে নিলে। সেইসাথে বদির গ্রুপের পাকিদের হাতে ধৃত সদস্য রাশেদের আঙুল কাটার দৃশ্য। কিংবা বদির মামাকে হত্যা করবার দৃশ্য, একটাও অতিরঞ্জিত কিছু না। বরং উনি কমই দেখিয়েছেন। অন্য মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সিনেমাগুলোতে পাকিস্তানী সেনাদের দিয়ে বাঙালি নারী ধর্ষণের দৃশ্য সাধারণত থাকেই, এখানে ছিল না। দরকারও ছিল না। তবে বদির বোন কিংবা বিপাশা হায়াতের বন্দীজীবন, বাইরের কিছু দৃশ্য দিয়ে তাদেরও প্রকৃত অবস্থার আভাস দিয়েছিলেন উনি।

সিনেমার শেষদৃশ্যে রক্তক্ষরণের কারণে যখন বদির অবস্থা করুণ, তখন পুরো পরিবারের বদির জন্য আবেগ, এমনকি ডলি জহুরের সব বিপদ উপেক্ষা করে প্রকৃত মাতৃহৃদয় জেগে ওঠার যে দৃশ্য, তা মন ভারী করবার মত। শেষপর্যন্ত আমি বুঝিনি বদি বাঁচবে নাকি বাঁচবে না, কিন্তু সেইদিনের শিশু আমির মত সিনেমাহলের সকল দর্শকই মনে হয় চাইছিল বদি স্বাধীন দেশ দেখবে, বেঁচে উঠবে। আমি নিজেও সিনেমা শেষ হবার পর হাঁটতে হাঁটতে বাসায় ফিরবার পথে আব্বুকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, "আব্বু, বদি কি বাঁচবে না?"

স্বাধীন বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক অনেক চলচ্চিত্র হয়েছে। কিন্তু একটা সিনেমা আমার মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ব্যক্তিগত উপলব্ধির ভীত গড়ে দিয়েছিল, শিশুমনে সেই সিনেমার প্রভাব ছিল অনেক। সেটা আগুনের পরশমণি। যারা বলে হুমায়ুন আহমেদ বাংলা সাহিত্যকে শেষপর্যন্ত কি দিলেন, অনেক অনেক উন্নতবোধের সন্ধান করেন, তারা কেবল সমাজের ১% উচ্চশিক্ষিতের কথা চিন্তা করেন। হুমায়ুন ছিলেন সেই মানুষ যিনি তাদেরকেও ছুঁয়ে গেছেন যারা নিজের নামটা লিখতেও শেখেনি। উন্নত সাহিত্যকর্ম গঙ্গার পানিতে গুলে তারা নিয়মিত পান করতে পারেন। জনপ্রিয়তা, সকল স্তরের মানুষের কাছে পৌছাতে পারাকে যদি সাহিত্যে সফলতার মানদন্ড হিসেবে ধরি, তবে উনার মত সফল সাহিত্যিক দেশে আর কেউ নেই, নতুন কাউকে সামনে পাচ্ছিনা।

উনি এই আগুনের পরশমণি নির্মান করেছিলেন সরকারী অনুদানে, কিন্তু যা বলতে চেয়েছিলেন যা থেকে সরে আসেননি। অবশ্য জামাতের প্রভাব সেই সময়ের চেয়ে বেশি ছিল ২০০১ পরবর্তী আমলে। জিয়ার আমলে তাও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ২-৩ টা সিনেমা হয়েছিল। এরমধ্যে একটা হালকা দেখলাম, যেখানে স্বাধীন হবার পর স্লোগান হিসেবে দেখানো হয়েছে "তোমার দেশ আমার দেশ, বাংলাদেশ বাংলাদেশ, তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা।" "জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু" নাই। কিন্তু এই স্লোগানই ছিল আসল। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আসা উচিত যেমন ছিল ঠিক সেভাবেই, তখন যার যা ভূমিকা ছিল তাই দেখাতে হবে। আমাদের দেশে সেভাবে কেউ দেখায় না। সব দল ক্ষমতায় এলে নিজ দলের কাজে লাগে, নিজ দল যা প্রচার করে তাই তুলে আনে, বাকী সব বাদ। মুক্তিযুদ্ধে যেমন বঙ্গবন্ধুর ব্যাপক প্রভাব ছিল, মেজর জিয়াও অবদান রেখেছেন, সেভাবে মতিন উদ্দিন সাহেবরাও রেখেছেন। স্বাধীনতা কোটি মানুষের ছোট বড় আত্মত্যাগের ফসল। এরপরে কে কি করেছে তা পরের ব্যাপার। পরের সময় নিয়ে কেউ কিছু লিখলে বা সিনেমা বানালে সেখানে তা সেভাবেই আসা উচিত, তবে আসেনা।

শ্যামলছায়াতে হুমায়ুন যেভাবে রাজাকারদের দিয়েও মুক্তিযোদ্ধাদের জীবনরক্ষার দৃশ্য দেখিয়েছেন, সেটা অনেকে সাহস করবেনা। কিন্তু এসবও সত্যি ঘটনা। আমার বাবা মুক্তিযুদ্ধে যাবার পর তার পরিবারকে পাকিস্তানী সেনাদের হাত থেকে বাঁচিয়েছিল এক লোকাল রাজাকার। সেই রাজাকারকে পরে হত্যা করা হয় স্বাধীনতার পর। যুদ্ধ একটা অদ্ভুত ব্যাপার, আমাদের মুক্তিযুদ্ধও এমন অনেক ঘটনার সাক্ষী। হুমায়ুন আহমেদকে নিয়ে যখন ভাবছিলাম, তখন মনে হচ্ছিলো উনার মত এত নির্মোহভাবে কেউ হয়তো মুক্তিযুদ্ধের কথা লিখে যাননি। এরশাদের আমলে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক একটা চলচ্চিত্রও হয়নি। নামকরা রাজাকাররা দেশ দাপিয়ে বেড়াচ্ছিল। তখন "তুই রাজাকার" কে স্লোগান বানিয়ে ফেলেছিলেন এই হুমায়ুনই। শাহবাগ আন্দোলনের সময়ো বহুল ব্যবহৃত ছিল।

একদম কাছাকাছি সময়ে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে দেখা আরেকটা ভাল সিনেমা ছিল গেরিলা, যদিও আমি সবগুলো দেখিনাই সাম্প্রতিক সময়ের। এর বাইরে সংগ্রাম, ওরা ১১ জন, অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী, আলোর মিছিল এইসব অনেক পুরোনো নাম ছাড়া আর কিছু মনে পড়েনা।

ইউটিউব লিংক এখানেঃ
আগুনের পরশমণি

Comments

ড. লজিক্যাল বাঙালি এর ছবি
 

অনেক পুরনো ছবি তারপরো ভাল লাগলো লেখাটা

==============================================
আমার ফেসবুকের মূল ID হ্যাক হয়েছিল ২ মাস আগে। নানা চেষ্টা তদবিরের পর গতকাল আকস্মিক তা ফিরে পেলাম। আমার এ মুল আইডিতে আমার ইস্টিশন বন্ধুদের Add করার ও আমার ইস্টিশনে আমার পোস্ট পড়ার অনুরোধ করছি। লিংক : https://web.facebook.com/JahangirHossainDDMoEduGoB

===============================================================
জানার ইচ্ছে নিজেকে, সমাজ, দেশ, পৃথিবি, মহাবিশ্ব, ধর্ম আর মানুষকে! এর জন্য অনন্তর চেষ্টা!!

 

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

আমি অথবা অন্য কেউ
আমি অথবা অন্য কেউ এর ছবি
Offline
Last seen: 1 week 20 ঘন্টা ago
Joined: শুক্রবার, জুন 17, 2016 - 12:11অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

ফেসবুকে ইস্টিশন

SSL Certificate
কপিরাইট © ইস্টিশন.কম ® ২০১৬ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর