নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

শিডিউল

ওয়েটিং রুম

There is currently 1 user online.

  • নুর নবী দুলাল

নতুন যাত্রী

  • আমি ফ্রিল্যান্স...
  • সোহেল বাপ্পি
  • হাসিন মাহতাব
  • কৃষ্ণ মহাম্মদ
  • মু.আরিফুল ইসলাম
  • রাজাবাবু
  • রক্স রাব্বি
  • আলমগীর আলম
  • সৌহার্দ্য দেওয়ান
  • নিলয় নীল অভি

আপনি এখানে

নগরনটী (উপন্যাস: পর্ব-চৌদ্দ)


জন্মনের হাটের ঘাটে রঘু নৌকা নোঙর করলো অপরাহ্ণে। হাটে ভরপুর মানুষ; কেউ যাচ্ছে, কেউ আসছে। গিরিকা প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী ক্রয় করার জন্য সুলোচনা, রঘু, বলাই আর ললিতকে সঙ্গে নিয়ে হাটে গেলেন। আজও দেবল আর সুকেতু রইলো নৌকার পাহাড়ায়। ঋষ্যশৃঙ্গ এখন অবুঝ বালকের ন্যায় ঘুমোচ্ছে। সেই মধ্যা‎হ্ন থেকে হাটে যাবার আগ পর্যন্ত গিরিকা এই কক্ষের মেঝেতে পশ্চাৎদেশ ঠেকিয়ে বকবক করছিলেন, তার বকবক শুনতে শুনতেই একসময় ঘুমিয়ে পড়েছে সে। শবরী ঋষ্যশৃঙ্গের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে আছে অপলক চোখে। বালকের ন্যায় কী সুন্দর নিষ্পাপ মুখশ্রী! মায়ামাখা মুখশ্রীর দিকে কেবল তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে তার। ঋষ্যশৃঙ্গের হাটা-চলা, কথা বলা, মৌনতা, চুম্বন-আলিঙ্গন সবকিছুতে এমন নিষ্পাপ-নিষ্কলুষতা বিদ্যমান যে সে কেবল মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে, তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে অনন্তকাল! অথচ অনন্তকাল নয়, কালকের পর থেকেই হয়তো সে আর কখনো দেখতে পাবে না ঋষ্যশৃঙ্গকে; আর দেখলেও দেখতে হবে দূর থেকে, নগরীর আর পাঁচজন মানুষের মতো! কথাটা মনে হতেই তার বুকের ভেতর দিয়ে যেন গঙ্গার বুক ছুঁয়ে আসা শীতল বাতাস বয়ে গেল, হাহাকার উঠলো বুকের ভেতর। দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্নানঘরে গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে এসে কেশ পরিচর্যা করলো, মুখে হালকা প্রসাধন মেখে চোখে কাজল পরলো। ঋষ্যশৃঙ্গ পাশ ফিরে শুলে উপাধান থেকে তার মাথাটা শয্যায় ঢলে পড়লে যাতে নিদ্রাভঙ্গ না হয় সে-জন্য খুব সতর্কভাবে মাথাটা পুনরায় উপাধানে তুলে দিলো। ঋষ্যশৃঙ্গের মুখের ওপর ঝুঁকে স্থির হয়ে রইলো। তার তপ্ত নিশ্বাস পড়লো ঋষ্যশৃঙ্গের মুখে। আলতোভাবে ডান হাতের আদুরে স্পর্শ বোলালো ঋষ্যশৃঙ্গের কপালে, কপোলে, ওষ্ঠে। কপালে ও ওষ্ঠে মৃদু চুম্বন করলো। তার জলভরা চোখ থেকে এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো ঋষ্যশৃঙ্গের কপোলে।

কক্ষের বাইরে বেরিয়ে নৌকার খোলা জায়গায় এসে দাঁড়ালো শবরী। সূর্য গঙ্গার বুক থেকে কমলা রঙের উত্তরীয় টেনে নিয়ে ক্রমশঃ যেন ডুবে যাচ্ছে গঙ্গার বুকেই! পলকে পলকে আরামদায়ক বাতাস এসে আড় ভাঙছে শরীরে। শবরী উমাকে ডাকলো, সে ভেবেছিল উমা হয়তো গিরিকার কক্ষে; কিন্তু কক্ষ থেকে উমার কোনো সাড়া পাওয়া গেল না। কোথায় গেল উমা!

নৌকার গলুইয়ে বসে থাকা দেবলের দিকে এগিয়ে গিয়ে বললো, ‘ও দাঁড়ি, আমার সখি উমা কোথায় গেল?’
‘ওরা তো একটু ঘুরতে গেল।’
‘ওরা মানে?’
‘আজ্ঞে, আপনার সখি আর সুকেতু।’
‘কোথায় ঘুরতে গিয়েছে?’
‘হাটের দিকে।’

আর কিছু বললো না শবরী, দেবলের উল্টোদিকের গুলুইয়ের কাছে গিয়ে বসে রইলো গঙ্গাবক্ষের দিকে তাকিয়ে। ত্রিযোজন পাহাড়ে আরোহণ করার দিনই সুকেতুর সঙ্গে উমার সখ্যতা তার চোখে পড়েছিল। দু’জনের মাঝে যে প্রণয়ের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে তা তার কাছে স্বীকারও করেছে উমা। ত্রিযোজন পর্বত থেকে ফিরে এসে রাতে আহারের পর দু’জন নৌকা থেকে নেমে অরণ্যের অন্ধকারে মিলিয়ে গিয়েছিল। সে-কথা দেবল আর সে ছাড়া নৌকার আর কেউ জানে না। তার কাছে কোনো কথাই গোপন করে না উমা, কেননা উমা জানে তার বিশ্বস্ত সখি সে। গিরিকার গর্ভজাত কন্যা হলেও উমার কোনো ক্ষতি হবে এমন কোনো কথা সে গিরিকাকে বলবে না। সুকেতু উমাকে বলেছে, সে যদি গণিকার জীবন পরিত্যাগ করে তবে তাকে বিয়ে করে সংসারী হবে সুকেতু, অঙ্গরাজ্য থেকে তাকে নিয়ে পালিয়ে চলে যাবে অন্য কোনো রাজ্যে। উমা সুকেতুর কাছে কিছুদিন সময় চেয়েছে।

শবরী মনে মনে হাসলো। সুকেতু আর উমার বিয়ে হলে ভালই হবে। এ ক’দিনে সুকেতুকে দেখে তার মনে হয়েছে যে কিছুটা ডাকাবুকো স্বভাবের হলেও মানুষ হিসেবে সে খুব ভাল। মুখে যা বলে তা করেই ছাড়ে। সুকেতুর সঙ্গে উমাকে মানাবেও বেশ। দু’জনের মনেও মিলবে, সুকেতু যেমনি ডাকাবুকো, তেমনি উমাও খোলতাই স্বভাবের।

অন্ধকার নেমে এসেছে। উলুপী কক্ষে প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখে গেছে। গিরিকা এবং অন্যরা হাট থেকে ফিরেছে। গিরিকা নিজের কক্ষে বসে প্রদীপের আলোয় হাট থেকে ক্রয় করা জিনিস দেখছেন আর খরচের হিসাব মিলাচ্ছেন, তাকে সঙ্গ দিচ্ছে সুলোচনা। শবরী আর উমা নৌকার খোলা জায়গায় বসে গল্প করতে করতে জাম খাচ্ছে; হাট থেকে অনেকগুলো জাম ক্রয় করে এনেছেন গিরিকা। গিরিকা হাট থেকে ফেরার আগেই উমা আর সুকেতু নৌকায় ফিরেছে। সুকেতু হাট থেকে উমাকে সুক্ষ্ম কারুকাজ করা মৃৎ-হার এবং চুড়ি কিনে দিয়েছে। আড়ালে নিয়ে গিয়ে ভালবেসে এক গণ্ডা চুম্বন দিতেও ভোলে নি। তা নিয়ে দু’জনে চুপি চুপি গল্প করছে আর হাসছে। একটু পর তাদের সঙ্গে যোগ দিলো সুলোচনা। কথায় কথায় রাক্ষসদের প্রসঙ্গ উঠতেই সুলোচনা বললো, ‘ভগবান বিষ্ণুর দিব্যি, আমি আর কোনোদিন পর্বতারোহণে যাচ্ছিনে।’
উমা বললো, ‘কেন লো, রাক্ষসরা কি তোকে কিছু করেছে?’
‘তা না করুক, যা ভয় পেয়েছিলাম!’
‘রাক্ষসদের সর্দারের সঙ্গে তোর বিবাহ দিয়ে এলে ভাল হতো, সর্দারনী হয়ে সকলের ওপর খবরদারি করতে পারতি।’
‘রক্ষে করো বাছা, দরকার নেই আমার অমন সর্দারনী হওয়ার!’

শবরী বললো, ‘যাই বলিস, পর্বতারোহণে দারুণ এক অভিজ্ঞতা হলো আমাদের। রাক্ষসদের সম্পর্কে কতো মন্দ কথাই না শুনেছি এতোদিন! অনার্য রাক্ষসরা অসভ্য, কদর্য ভক্ষণ করে; তারা প্রচণ্ড আর্য বিদ্বেষী, আর্যদের পেলেই তারা হত্যা করে, আর্যদের সম্পদ এবং নারী লুণ্ঠন করে, এরকম আরো কতো কথা। শৈশবে খেতে না চাইলে মা ভয় দেখিয়ে বলতো, “ওই যে রাক্ষস আসছে, রাক্ষস এসে সব কেড়ে খেয়ে ফেলবে কিন্তু!” আর আমি ভয় পেয়ে দৌড়ে মায়ের কাছে ছুটে এসে খেয়ে নিতাম। কিছু হলেই মা বলতো, “ওই যে রাক্ষস ধরলো!” ভয় পেয়ে ছুটে এসে মাকে জড়িয়ে ধরতাম।’

উমা বললো, ‘আমার ক্ষেত্রেও তাই হতো। আমার ঠাকুমা ভয় দেখাতো, মা-ও দেখাতো ভয়। বলতো রাক্ষসদের ইয়া বড় শরীর, বড় বড় দাঁত, বিশাল হাতের লম্বা-লম্বা নখ দিয়ে ওরা মানুষের পেট চিড়ে খায়; ওরা নরমাংস খাদক!’

‘অথচ ওরা আমাদেরই মতো মানুষ; পার্থক্য বলতে গাত্রবর্ণ আর মুখশ্রীর গড়ন। লোকে মন্দ আরচণ করলেই তার আচরণকে রাক্ষসাচার বলে আখ্যা দেয় সকলে। যেন যতো অন্যায়-অনাচার রাক্ষসেরাই করে, আমরা আর্যরা ধোয়া তুলসী পাতা! বড়দের মুখে দেবতাদের কতো অন্যায় আচরণের কথা শুনেছি, ইন্দ্রের অহল্যাকে ধর্ষণের কথাও শুনেছি, ঋষিদের তপস্যা নষ্ট করার জন্য দেবতারা ছলনা করে স্বর্গের বারাঙ্গনাদের মর্তে পাঠান সে-কথাও কারো অজানা নয়। আর আর্যাবর্তের পুরুষদের অপকর্ম তো নিত্যদিনই কানে আসে, চোখের সামনে দেখতে পাই আর্য পুরুষদের কদাকার আচরণ। অথচ যতো দোষ রাক্ষসদের!’

সে-দিন রাক্ষসরা ওদেরকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল তদের পল্লীতে, সর্দারের কাছে। রাক্ষসরা ধারণা করেছিল তারা হয়তো আর্যদের গুপ্তচর, রাক্ষসদের আবাস সম্পর্কে খোঁজ-খবর নিতে এসেছে। আর্যদের সম্পর্কে রাক্ষসদের এই সতর্কতা কিংবা ভয়ের কারণ হলো পূর্বে আর্যরা রাক্ষসদের বাস্তুচ্যূত করেছিল, রাক্ষসদের বসতি ছিল আর্যবর্তে। যুদ্ধ-নিপুণ আর্যরা অন্যায় যুদ্ধ করে সেখান থেকে ওদের পূর্বপুরুষদেরকে বিতাড়িত করেছিল। বাস্তুচ্যূত রাক্ষসরা তখন অপেক্ষাকৃত নিচু পাহাড় এবং আরো নিন্মভূমিতে অর্থাৎ সমতলে বসতি গড়েছিল। ওদের গোত্রের নিজস্ব নাম থাকলেও আর্যদের মাধ্যমে ওরা রাক্ষস হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল। এখনো কোথাও কোথাও আর্যদের আক্রমণের শিকার হচ্ছে যুদ্ধে অনিপুণ নিরীহ ভূমিপুত্র রাক্ষসরা।

কিন্তু শবরীরা যখন রাক্ষস সর্দারকে জানায় যে তারা আর্যদের গুপ্তচর নয়, নয় স্বর্গের বারাঙ্গনাও। তারা অঙ্গরাজ্যের অতি সাধারণ মানুষ। ভিন রাজ্যের আত্মীয়বাড়ি থেকে ফেরার পথে কন্যাদের পর্বতারোহণের সখ হওয়ায় এসেছে। তখন রাক্ষস সর্দার তাদের কথা বিশ্বাস করেছে। রাক্ষস নারীরা সুস্বাদু পাকা শ্রীফল, জল আর শ্রীফলের খোলায় এক প্রকার বুনো বৃক্ষের বাকল দিয়ে প্রস্তুত মদ্য দিয়ে তাদেরকে আপ্যায়ন করেছে। রাক্ষস নারী-পুরুষ উভয়ের শরীরেই কোনো বস্ত্র ছিল না; নিন্মাঙ্গে পশুচামড়ার পরিচ্ছদ থাকলেও উর্ধাঙ্গ সম্পূর্ণ অনাবৃত; তবু তারা বেশ স্বচ্ছন্দেই চলাফেরা করছিল সকলের সামনে। আর রাক্ষস শিশুরা ছিল সম্পূর্ণ উলঙ্গ। ইচ্ছে মতো তারা মাতার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে দুগ্ধ পান করছিল। পানাহারের পর রাক্ষস সর্দারের নির্দেশ অনুযায়ী অন্যান্য রাক্ষসরা ওদেরকে ফেরার পথে এগিয়ে দিয়েছে। রাক্ষসদের আন্তরিক আপ্যায়নে রীতিমতো মুগ্ধ শবরী।

এদিকে ঘুম ভাঙতেই যেন চমকে উঠলো ঋষ্যশৃঙ্গ! প্রথমেই তার দৃষ্টিতে পড়লো কক্ষের ছাদ। ধড়মর করে উঠে বসে দৃষ্টি ঘুরিয়ে দেখতে লাগলো কক্ষের চারপাশ। কক্ষের এককোনে দীপাধারের ওপর শিখায় মৃদু উল্লোল তুলে প্রদীপ জ্বলছে। সে তবে আশ্রমে নেই! অথচ স্বপ্ন দেখেছে আশ্রমে শুয়ে আছে সে। প্রচণ্ড ঝড় বইছে, ঝড়ে উড়িয়ে নিয়ে গেছে কুটীরের একটা চালা, আরেকটার নিচে চাপা পড়েছে সে। অন্যদিকে তার পিতাশ্রীও কুটীরে নেই, তিনি আহার সংগ্রহ করতে গিয়ে অরণ্যমাঝে ঝড়ের কবলে পড়ে চিৎকার করছেন সাহায্যের জন্য। পিতাশ্রী ওপরেও কি বৃক্ষশাখা ভেঙে পড়েছে! গৃহচাপা পড়ে সে পিতাশ্রীর আর্তচিৎকার শুনতে পারছিল কিন্তু কিছুতেই উঠতে পারছিল না।

এমন সময়েই ঘুম ভাঙলো ঋষ্যশৃঙ্গের। ক্ষণকাল পরেই তার মনে পড়লো যে সে তো আশ্রম ত্যাগ করে প্রেয়সীর সঙ্গে চলে এসেছে রতিব্রত পালন করার জন্য। এখন সে তার পিতাশ্রীর নিকট থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছে। পিতাশ্রী কি সত্যিই কোনো বিপদে পড়েছেন, নইলে এমন দুঃস্বপ্ন দেখলো কেন সে? পিতাশ্রীর জন্য বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠলো তার। তার মনে পড়লো পিতাশ্রীর ছায়াতলে বেড়ে ওঠা কুটীরের দিনগুলোর কথা, মনে পড়লো তার শৈশবের এক ঝড়ের কথা।

পিতাশ্রীর কাছে শাস্ত্রশিক্ষা এবং ধ্যান ব্যতিত বালক ঋষ্যশৃঙ্গ’র সময় কাটতো মায়ামৃগ এবং বানরশাবকের সাথে খেলা করে। তার মাতাশ্রী তাকে পিতাশ্রীর কাছে রেখে যাবার পর পিতাশ্রী ব্যতিত অন্য কোনো মানুষও সে দেখে নি। দেখেছে কেবল বনের পশু-পাখি, পোকামাকড়, অজস্র বৃক্ষ, বুকে শীতল জলধারা বয়ে চলা ঝিরি আর স্রোতস্বিনী নদী কৌশিকীকে। ফলে সে কোনো মনুষ্য খেলা খেলতে জানতো না। পিতা যখন আহারের সন্ধানে বাইরে যেতো, তখন সে পাখিদের উড়তে দেখে নিজের দুই হাত দু-দিকে প্রসারিত করে একা একাই দৌড়ে ‘পাখি ওড়া’ খেলতো। মায়ামৃগরা লাফিয়ে উঠে যেভাবে দাড়িম্ব কিংবা অন্যান্য বৃক্ষের পাতা ভক্ষণ করতো, সেও সেভাবে লাফিয়ে বৃক্ষের পাতা ছিঁড়ে মুখে পুরে চিবোনোর ভঙ্গি করে ফেলে দিতো। আর সে মজা পেতো বানর খেলা খেলে। বানরেরা যেভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে এক গাছ থেকে আরেক গাছে গিয়ে ফল ছিঁড়ে খেতো, সেও আঙিনা আর দেহলীতে আমলক কিংবা করমচা ছড়িয়ে রেখে বানদের অনুকরণ করে লাফিয়ে লাফিয়ে সেগুলো খুঁটে খুঁটে খেতো। বানরেরা যে রকম একে অন্যের সঙ্গে খুঁনসুটি করতো, সেও সেভাবে খুঁনসুটি করার চেষ্টা করতো বানরশাবকদের সাথে! বেশ কয়েকবার বানরের আঁচড়ে তার হাত ছড়ে গেছে। দু-একদিন আশ্রমে ফিরে বিভাণ্ডক আড়ালে দাঁড়িয়ে পুত্রের এই খেলা দেখে পুলকিত হতেন, মনে মনে হাসতেন। পুত্রের সহজাত খেয়াল আর খেলা তিনি ভঙ্গ করতে চাইতেন না, পুত্রকে বিব্রত না করে তিনি কখনো কখনো অনেকক্ষণ আড়ালেই দাঁড়িয়ে থাকতেন।

মায়ামৃগদের সঙ্গেও তার দারুণ ভাব ছিল। সে তো বেড়ে উঠেছে মৃগদুগ্ধ পান করে আর মৃগশাবকের সঙ্গে খেলা করতে করতেই। উর্বশী তাকে রেখে যাবার পর বিভাণ্ডক তার পোষ্যতুল্য মায়ামৃগীর দুগ্ধ দোহন করে মৃৎপাত্রে জ্বালিয়ে ঋষ্যশৃঙ্গকে খাওয়াতেন।
ঋষ্যশৃঙ্গ মৃগ’র গলা জড়িয়ে ধরে, নিজের হাত লেহন করাতো, কখনো কখনো আশ্রমের পথের পাশ থেকে ঘাস ছিঁড়ে এসে মৃগশাবকদের খাওয়াতো।

ঋষ্যশৃঙ্গ শুধু যে খেলা আর আপন খেয়ালেই মেতে থাকতো তা নয়, শাস্ত্রশিক্ষায়ও সে খুব মনোযোগী ছিল। বালক বয়সেই অনেক শ্লোক সে মুখস্ত করে ফেলেছিল। ধ্যানে বসলে কোথায় যেন হারিয়ে যেতো! আশ্রমের আঙিনার ঝরাপাতা পরিষ্কার করে আশ্রম গুছিয়ে রাখতো। হিংস্র জীব-জন্তুর সাথে সাক্ষাৎ হতে পারে বলে পিতাশ্রী তাকে একা ঝিরিতে যেতে নিষেধ করেছিলেন, তাই সে একা একা ঝিরিতে যেতো না কখনো, পিতাশ্রীর সঙ্গে ঝিরিতে যেতো স্নান এবং পানীয় জল সংগ্রহ করতে। তবে দশ-এগারো বছর বয়স থেকে সে একাই যেতো ঝিরিতে।

শৈশব-বাল্যকালে পিতাশ্রীর সঙ্গে ঝিরিতে নেমে শীতল জলের সাথে খেলায় মেতে উঠতো সে। পিতাশ্রী তার গাত্র মার্জন করে ঘড়ায় জল ভরে মাথায় ঢালতেন, তারপর নিজে গাত্র মার্জন করে স্নান শেষে পুত্রের গাত্র মুছিয়ে দিতেন। পিতাপুত্র কুটীরে ফিরে কিছুক্ষণ ধ্যান করার পর প্রথমে আশ্রমের পশুপাখিদের আহার করাতেন, তারপর নিজেরা আহার করতেন।

ঋষ্যশৃঙ্গ মাঝে মাঝেই তার পিতাশ্রীর সঙ্গে দুষ্টুমি করতো; আসলে লুকোচুরি খেলতো, যদিও খেলার নাম সে জানতো না। এমনকি তার পিতাশ্রীও তাকে লুকোচুরি খেলা শেখায়ও নি। পিতাশ্রীকে বাইরে থেকে আশ্রমে ফিরতে দেখলেই সে কোনো বৃক্ষের আড়ালে অথবা অন্য কোথাও লুকিয়ে থাকতো, পিতাশ্রী এসে তাকে ডেকে সাড়া পেতেন না। চিন্তিত হয়ে তার নাম ধরে ডাকতেন আর এদিক-সেদিক খুঁজতেন। আচমকা সে হুঙ্কার ছেড়ে আড়াল থেকে বেরিয়ে পিতাশ্রীর সামনে আসতো। তখন পিতা-পুত্র দু’জনেই একে-অপরকে জড়িয়ে ধরে হেসে উঠতেন। প্রথমদিন পুত্রকে হারানোর ভয় পেলেও পরবর্তীতে পুত্রের সঙ্গে এই লুকোচুরি খেলা বেশ উপভোগ করতেন বিভাণ্ডক। ইচ্ছে করে বেশি সময় ধরে খুঁজতেন পুত্রকে, দেখলেও না দেখার ভান করতেন পুত্রের আনন্দটুকু দেখার জন্য। তারপর পুত্র যখন হুঙ্কার ছেড়ে বেরিয়ে আসতো, তখন তিনি ভয় পাবার ভান করতেন। মিথ্যে ভীতসন্ত্রস্ত পিতাশ্রীকে দেখে বালক ঋষ্যশৃঙ্গ হেসে কুটিকুটি হতো। পুত্রের মুখের হাসি সুখের বাতাস হয়ে যেতো বিভাণ্ডকের হৃদয়ে। তিনি পুত্রের এইসব খেলা দেখতেন আর ভাবতেন, মানুষ যতো জন-বিচ্ছিন্নই থাকুক না কেন, যা কিছু মানুষের সহজাত স্বভাবের অংশ, কোনো না কোনোভাবে তা প্রকাশ পাবেই।

একদিন গ্রীষ্মের অপরাহ্ণে বালক ঋষ্যশৃঙ্গ দেহলীতে কুশাসনের ওপর গভীর ঘুমে অচেতন। মাথার লম্বা কেশ চূড়ো করে বাঁধা। পরনে চীর, উন্মুক্ত গৌড়বর্ণ শরীরের ঊর্ধ্বাংশে কেবল উপবীত। শরীর একেবারে স্থুল নয়, আবার শীর্ণও নয়। হঠাৎ আবির্ভুত হওয়া প্রবল বাতাসের শন শন শব্দ আর শরীরে উড়ে আসা ছিন্নপত্রের মৃদু আঘাতে ঘুম ভেঙে গেল তার। উঠে ব্যস্ত হাতে কুশাসনটা গুছিয়ে ঘরে রেখে এসে দেহলীতে দাঁড়ালো, অতঃপর আঙিনায় নেমে বাতাসের তোড়ে অবনত বৃক্ষরাজি আর আকাশের দিকে দৃষ্টি মেললো। কিছুতেই সে ঠাহর করতে পারলো না এখন অপরা‎হ্ণ, সন্ধ্যা নাকি রাত্রি? এমনিতেই আশ্রমের চারপাশের ঘন বৃক্ষরাজির কারণে অপরা‎হ্ণেই হুট করে সন্ধ্যা নেমে আসে। আর শীতের দিনে তো বেশিরভাগ দিন সূর্যের মুখ দেখাই যায় না! অন্যান্য ঋতুর চেয়ে সন্ধ্যাও নেমে আসে অনেক আগে।

ঋষ্যশৃঙ্গ’র মনে পড়লো মধ্যা‎হ্ন আহার শেষে সে শাস্ত্র আওড়াচ্ছিল। কখন যে সে ঘুমিয়ে পড়েছে তা তার মনে নেই, কতোক্ষণ ঘুমিয়েছে তাও সে বুঝতে পারছে না। তাই এখন ঘোর সন্ধ্যা নাকি রাত্রি ঠাহর করতে পারছে না কিছুতেই। কিন্তু সন্ধ্যা কিংবা রাত্রি যদি হয় তবে পিতাশ্রী কোথায়? পিতাশ্রী এখনো ফেরেন নি কেন? যেখানেই থাকুন পিতাশ্রী তো সন্ধ্যার আগেই ফেরেন। তবে কি পিতাশ্রীকে বাঘ কিংবা ভাল্লুকে ধরলো? তার ছোট্ট মনে নানান রকম দূর্ভাবনা উঁকি দিলেও সে ভেঙে পড়লো না বা কাঁদলো না, কেননা পিতাশ্রী তাকে শিখিয়েছেন শত বিপদের মাঝেও চিত্তের দুর্বলতা প্রকাশ না করতে, অস্থির না হয়ে স্থির থাকতে, ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে। তাই শান্ত চিত্তে ও দৃষ্টিতে সে বনের মাঝখান দিয়ে বয়ে চলা আশ্রমে ফেরার সরু পথের দিকে তাকিয়ে রইলো। কিন্তু অন্ধকার নেমে আসায় বেশিদূর পর্যন্ত ঠাহর করা যায় না। তবু সে দেখার চেষ্টা করলো কিন্তু পিতাশ্রীকে দেখতে পেল না। চিৎকার করে ‘পিতাশ্রী...পিতাশ্রী...’ বলে কয়েকবার ডাকলেও তার ডাকের বিপরীতে কোনো সাড়া মিললো না। আঙিনায় বেশিক্ষণ দাঁড়াতেও পারলো না সে, বাতাস আরো আগ্রাসী আর বৃষ্টি শুরু হওয়ায় দেহলীতে উঠে পিতাশ্রীর মঙ্গল কামনায় ইষ্টমন্ত্র জপ এবং বরুণদেবকে স্মরণ করতে লাগলো, যাতে তার পিতাশ্রী আশ্রমে না ফেরা পর্যন্ত বরুণদেব বর্ষণ বন্ধ রাখেন।

কিন্তু বরুণদেবের বুঝি আর তর সইলো না অথবা ক্ষুদ্র বালকের আকুতি তার কানে পৌঁছুলো না! শুরু হলো প্রবল বৃষ্টি আর আর বজ্রনাদ। বিদ্যৃৎ চমকের তীব্র আলোয় ক্ষণে ক্ষণে আলোকিত হয়ে উঠলো আশ্রম। বাতাসের দাপটে আনত বৃক্ষরাজি যেন ভেঙে পড়বে কুটীরের ওপর! দেহলীতে বৃষ্টির ছাঁট আর বাতাসে তীরের বেগে ছিন্ন পত্র ছুটে আসায় সে কুটীরে প্রবেশ করে কপাট ধরে দাঁড়ালো।

আঙিনার পাশের দাড়িম্ববৃক্ষটি বাতাসে আছাড়ি-পিছাড়ি করছে আর বিদ্যুৎ চমকের আলোয় চকচক করে উঠছে পাতা এবং দাড়িম্ব ফলগুলো। গ্রীষ্মে বেশি দাড়িম্ব ফলে না, খুব বেশি হলে দশ-বারোটি। কিন্তু বর্ষায় গাছভর্তি দাড়িম্ব ফুল আসে আর আশ্বিন-কার্তিকের দিকে দাড়িম্ব’র ভারে নুয়ে পড়ে গাছটি। আজ প্রায় মাটিতে নুয়ে পড়ছে বাতাসের দাপটে।

না, পিতাশ্রীর দেখা নেই। কুটীরের ভেতরে ঘুটঘুটে অন্ধকার, কেবল ক্ষণে ক্ষণে বিদ্যুৎ চমকের আলোয় আলোকিত হয়ে উঠছে। এখন যদি সন্ধ্যা হয় তবে তো ঘরে প্রদীপ জ্বালতে হবে, সান্ধ্য আ‎‎হ্নিক করতে হবে। কিন্তু অগ্নি সে জ্বালবে কী করে? অরণি এবং মন্থ ব্যবহার করে সে তো আগ্নি জ্বালতে পারে না, পিতাশ্রী পারেন। তবু একবার চেষ্টা করে দেখতে চাইলো সে, বিদ্যুৎপ্রভায় খুঁটিতে ঝোলানো অরণি আর মন্থ হাতে নিলো, এরপর মাটির প্রদীপ আর গাছের বাঁকলের অতি সুক্ষ্ম আঁশ নেবার পর কুটীরের কপাট বন্ধ করে বসলো মেঝেতে। অতঃপর হাতরে হাতরে বালুর পাত্র থেকে এক চিমটি শুষ্ক বালু অরণির ছিদ্রে রেখে মন্থ ঢুকিয়ে তুলতুলে হাতে মন্থন করতে লাগলো। অল্পক্ষণের মধ্যেই তার দু-হাতের তালু গরম হলেও অরণি-মন্থ আশানুরূপ তপ্ত হলো না। তবু আশাহত না হয়ে আবার দু-হাতে মন্থন করতে লাগলো। ওদিকে বাইরে তুমুল কামুক ঝড় শংকরনৃত্যের তাণ্ডব চালাতে শুরু করলো!

ঋষ্যশৃঙ্গ অরণি-মন্থ’র সাথে যুঝতে লাগলো। তার অশক্ত হাতের মন্থ বারবার অরণিচ্যূত হলো, আর সে অন্ধকারে হাতরে পুনরায় অরণির ছিদ্রে মন্থ প্রবেশ করিয়ে ঘুরাতে লাগলো। অরণি-মন্থ কিছুটা গরম হলো বটে কিন্তু কিছুতেই অগ্নি জ্বালাবার মতো তপ্ত হলো না। হাতের তালু গরম হলো, ব্যথা করতে শুরু করলো কোমল হাত, তবু সে হাল ছাড়তে রাজি নয়। পিতাশ্রী তাকে বলেছেন, ‘বৎস, সবকিছুতে তোমাকে পারদর্শী হতে হবে, এমনভাবে নিজেকে তৈরি করো যেন আমি না থাকলেও তুমি চলতে পারো।’ অতএব পিতাশ্রীকে আজ দেখিয়ে দিতে হবে যে সে অরণি-মন্থ ঘর্ষণ করে অগ্নি প্রজ্জ্বলন করতে পারে। ওদিকে ঝড়ের দাপট ক্রমান্বয়ে যেন বাড়ছে, কপাটের ওপর আছড়ে পড়ছে বাউণ্ডুলে বাতাস। এমন সময়ে কপাটে করাঘাতের শব্দ হলো, ‘বৎস ঋষ্যশৃঙ্গ, দ্বার খোলো, দ্বার খোলো বৎস...!’

অরণি-মন্থ ফেলে দ্রুত উঠে দ্বার খুলে দিলো ঋষ্যশৃঙ্গ। বিদ্যুৎ চমকের আলোয় ঝড়ে বিধ্বস্ত পিতাশ্রীর মুখের কিয়দংশ দেখতে পেলো সে। বিভাণ্ডক দ্রুত ভেতরে প্রবেশ করে ফল-মূলের কাপড়ের পুটলিটা মেঝেতে নামিয়ে রেখে দ্বার বন্ধ করে দিলেন। তারপর বললেন, ‘বৎস, তুমি কি ভয় পেয়েছিলে?’

‘না পিতাশ্রী, আমি ভয় পাই নি। আমার দুশ্চিন্তা হচ্ছিল আপনার জন্য।’
অন্ধকারে পিতা-পুত্র কেউ কাউকে দেখতে পেলো না, কেবল একজন আরেকজনের কথা শুনতে পেলো।
‘আমার জন্য কখনো দুশ্চিন্তা করবে না বৎস, যদি আমি ফিরে না আসি তবে যেনো আমি ঈশ্বরের কাছে চলে গেছি। তুমি তোমার মতো করে চ’লো।’

বিভাণ্ডক একখণ্ড শুষ্ক বস্ত্র দিয়ে শরীর এবং মাথার জল মুছে পরিধেয় ভেজা চীর বদলে শুষ্ক চীর পরিধান করলেন। বাইরে ঝড়ের দাপট আরো বেড়েছে। শো শো শব্দে বৃক্ষরাজি যেন ভেঙে পড়তে চাইছে কুটীরের ওপর। পিতা-পুত্র শয্যায় পাশাপাশি বসে ঝড় থামার অপেক্ষা করতে লাগলো।

আরো কিছুক্ষণ তাণ্ডব চালানোর পর ঝড় থামলো, বৃষ্টিও বন্ধ হলো। পিতাপুত্র দু’জনই বাইরে বেরিয়ে এলো। পরিষ্কার আকাশ আর চারিদিকে আলো দেখে ঋষ্যশৃঙ্গ অবাক হয়ে বললো, ‘পিতাশ্রী আমি তো ভেবেছিলাম রাত্রি হয়ে গেছে।’
‘এখন অপরা‎হ্ণ বৎস, আকাশ অত্যাধিক মেঘাবৃত থাকায় অন্ধকার ঘনীভূত হয়েছিল, রাত্রি হতে এখনো ঢের বাকি।’

প্রকৃতি সবকিছু যেন একেবারে লণ্ডভণ্ড ক’রে দিয়ে গেছে। আঙিনায় রাজ্যের ঝরাপাতা আর ছোট ছোট ফল ছড়িয়ে আছে, বৃক্ষের শাখা ভেঙে পড়ে আছে যত্রতত্র। দুটি পাখি আহত হয়ে নড়া-চড়া করছে কিন্তু উড়তে পারছে না, একটি পাখির প্রাণবায়ু চিরতরে বেরিয়ে গেছে। কয়েকটি মৃগ দেহলীতে আশ্রয় নিয়েছে ঝড়ের সময়। ওরাও এখন আঙিনায় নেমে গা ঝাড়া দিচ্ছে। আঙিনার পাশের দাড়িম্ববৃক্ষটি প্রায় ভূমিতে নুয়ে পড়েছে। পিতা-পুত্র সব ফেলে আহত পাখি দুটির শুশ্রূষায় মন দিলো।

ঝড়ের দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে উঠার পর ঋষ্যশৃঙ্গের মনে পড়লো বাল্যকালের সেই ঝড়ের কথা। পিতাশ্রী, আশ্রম, আশ্রমবানর এবং মায়ামৃগদের কথা মনে পড়তেই হৃদয়ে পীড়া অনুভব করলো সে, তার কেবলই মনে হতে লাগলো যে পিতাশ্রী সারা অরণ্য তন্ন তন্ন করে তাকে খুঁজছেন আর উচ্চস্বরে ডাকছেন। তাকে না পেয়ে পিতাশ্রী যেমনি পীড়া অনুভব করছেন তেমনি আশ্রমমৃগ আর বানরশাবকেরাও দীর্ঘক্ষণ তাকে না দেখে পীড়া অনুভব করছে। পিতাশ্রী, আশ্রম, আশ্রমমৃগ আর বানরদের প্রতি প্রবল মায়ায় হুহু করে উঠলো তার বুকের ভেতর, যেনবা এক ঝাপটা শীতল বাতাস বয়ে যাচ্ছে বুকের ভেতর দিয়ে। অশ্রু গড়িয়ে নামলো তার অধর বেয়ে। আর তখনই কানে ভেসে এলো শবরী, উমা আর সুলোচনার হাস্যধ্বনি। শয্যা থেকে নেমে কক্ষের বাইরে গিয়ে সে শবরীকে ডাকতে লাগলো, ‘প্রেয়সী, প্রেয়সী, তুমি কোথায়? শীঘ্র এসো।’

তৎক্ষণাৎ ঋষ্যশৃঙ্গের সম্মুখে এলো শবরী। রাত্রি হলেও ফুটফুটে জ্যোৎস্নায় শবরীর মুখ প্রায় স্পষ্ট দেখতে পেলো ঋষ্যশৃঙ্গ। এগিয়ে গিয়ে শবরীর হাত ধরে মিনতির সুরে বললো, ‘প্রেয়সী, আমি আশ্রমে ফিরে যেতে চাই।’

শবরী অবাক হয়ে তাকালো ঋষ্যশৃঙ্গের দিকে। ঋষ্যশৃঙ্গের অধরের জলের ধারাটি অবশ্য দেখতে পেল না সে।
শবরী বললো, ‘কেন তপোধন, আমরা কি না জেনে তোমাকে কোনো পীড়া দিয়েছি?’

ঋষ্যশৃঙ্গ দু-দিকে মাথা নাড়লো, ‘না প্রেয়সী, তোমরা আমাকে প্রয়োজনের অধিক সমাদর করেছ, কোনো পীড়া দাও নি আমাকে। কিন্তু আমি পিতাশ্রীর জন্য হৃদয়ে ভীষণ পীড়া অনুভব করছি। পিতাশ্রীও নিশ্চয় আমার জন্য দুশ্চিন্তা করছেন।’

অসম্ভব জেনেও শবরী ছলনার আশ্রয় নিলো, ‘তোমার পিতাশ্রী সুবিখ্যাত ঋষি, তপশ্চর্যায় সিদ্ধিলাভ করেছেন। তিনি নিশ্চয় যোগবলে তোমাকে দেখছেন, তাই তিনি কোনো দুশ্চিন্তা করছেন না। তুমিও তাঁর জন্য কোনো পীড়িত হ’য়ো না, তিনি নিশ্চয় মঙ্গলময় আছেন।’

‘তবু আমি ফিরে যেতে চাই প্রেয়সী। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। তুমি নৌকা আশ্রমে ফিরিয়ে নিতে বলো।’
‘এই রাতেরবেলা নৌযাত্রায় বিপদের আশঙ্কা থাকে, ডুবে যেতে পারে নৌকা। তাছাড়া তোমার ব্রত সম্পন্ন হয় নি। ব্রত সম্পন্ন না করে ফিরে গেলে তোমার অকল্যাণ হবে, অকল্যাণ হবে মানবজাতির।’
‘আমরা আশ্রমে ফিরে ব্রত পালন করবো।’

‘তা হয় না তপোধন। আশ্রম রতিব্রত পালনের উত্তম স্থান নয়। তুমি আমাদের আশ্রমে চলো, তারপর নৌকা পাঠিয়ে তোমার পিতাশ্রীকেও আমাদের আশ্রমে আনার ব্যবস্থা করবো।’

দু’জনের কথোপকথন শুনে উমা আর সুলোচনা কাছে এলো, গিরিকাও ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন, ঋষ্যশৃঙ্গকে কক্ষে এনে শয্যায় বসিয়ে সকলে মিলে নানা কথার ছলনায় তাকে ভোলানোর চেষ্টা করলেন, কিন্তু কিছুতেই ভোলানো গেল না তাকে। শেষে রঘুকে ডেকে আনা হলে সে রাত্রিবেলা নৌযাত্রার বিপদাশঙ্কা শতগুণ বাড়িয়ে বললো, কিন্তু তাতেও ঋষ্যশৃঙ্গ আশ্রমে ফিরে যাবার সিদ্ধান্তে অনড় থেকে অবুঝ বালকের মতো জেদ ধরলো।

উপায়ান্তর না দেখে শবরী সকলের উদ্দেশে বললো, ‘তোমরা সবাই বাইরে যাও।’
কৌতুহলী চোখে সকলেই তাকালো শবরীর মুখের দিকে। শবরী তার মায়ের চোখে দৃষ্টি রেখে বললো, ‘যাও তোমরা, আমি দেখছি।’

সকলে ঘর থেকে বেরোলে শবরী কপাট বন্ধ করে দিলো। কপাট বন্ধ করার শব্দে সকলেই ঘুরে দাঁড়ালো, জ্যোৎস্নাজ্বলা বন্ধ কপাট ক্ষণকালের জন্য অবস্থান করলো সকলের নির্নিমেষ কৌতুহলী দৃষ্টির কেন্দ্রে।

আর দুই ক্রোশ পথ পাড়ি দিলেই চম্পা-নগরী। রঘুর নির্দেশে এরই মধ্যে মাস্তুলে অঙ্গরাজ্যের ধ্বজার নিচে আরও একটি বর্ণিল ধ্বজা উড়িয়েছে সুকেতু। গণিকারা সফলভাবে ঋষ্যশৃঙ্গকে হরণ করতে পারলে নগরী থেকে কয়েক ক্রোশ দূরে থাকতেই মাস্তুলে অঙ্গরাজ্যের ধ্বজার নিচে বর্ণিল ধ্বজাটি উড়ানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন অন্নদামঙ্গল, যাতে নৌকা দূরে থাকতেই ধ্বজা দেখে নগরীর ঘাটের সংবাদ-বাহক ঋষ্যশৃঙ্গের আগমন সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে চটজলদি সুসংবাদ পৌঁছে দিতে পারে রাজবাড়ীতে। দুটো ধ্বজাই এখন বাতাসে পতপত করে উড়ছে।

নৌকা যতো চম্পা-নগরীর দিকে ধাবিত হচ্ছে, শবরীর বুকের ভেতরটা ততো তোলপাড় করছে। এখনো ঋষ্যশৃঙ্গের ওপর তার পূর্ণ অধিকার বিরাজমান, কিন্তু নৌকা চম্পা-নগরীর ঘাটে নোঙর করলেই তার আর কোনো অধিকার থাকবে না ঋষ্যশৃঙ্গের ওপর। জীবন সম্পর্কে অনভিজ্ঞ মুনিকুমারকে হয়তো বিপুল অভ্যর্থনায় ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে রাজবাড়ীতে, মহাসমারোহে রাজকন্যার সঙ্গে তার বিবাহ হবে। আর সে ফিরে যাবে গণিকালয়ে, অভ্যস্ত হয়ে পড়বে পূর্বের জীবনে। হয়তো আর কোনোদিন ঋষ্যশৃঙ্গের সঙ্গে তার দেখাই হবে না। রাজজামাতা হবার পর রাজকুমারী শান্তার মতো রূপবতী পত্নী পেয়ে সে কি আর মনে রাখবে এক সামান্য গণিকাকে! তবে একথা সত্য যে ঋষ্যশৃঙ্গ তাকেই প্রথম ভালবেসেছে, এটুকু প্রাপ্তিই জমা হয়ে থাকবে তার জীবনাভিজ্ঞতার ঝুলিতে।

শবরীর কপোল বেয়ে একফোঁটা অশ্রু ঝরে পড়লো ঋষ্যশৃঙ্গের কপালে। মধ্যাহ্নভোজের পর ঋষ্যশৃঙ্গ তার কোলে মাথা রেখে গল্প করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছে। গিরিকা একবার এসে শবরীকে বলে গেছেন ঋষ্যশৃঙ্গকে ঘুম থেকে জাগিয়ে রাজপরিচ্ছদ পরিয়ে সাজানোর জন্য। মাত্র দুই ক্রোশ পথ দেখতে দেখতে পেরিয়ে যাবে। কিন্তু ঋষ্যশৃঙ্গকে জাগাতে ইচ্ছে করছে না, তার ঊরুতে মাথা রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমানো ঋষ্যশৃঙ্গের নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে ভীষণ ভাল লাগছে। মনে হচ্ছে এই ঘুমন্ত মুখ তো আর কখনো দেখতে পাবে না সে। চোরের মতো চুপি চুপি ঘুমন্ত প্রিয়জনের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকায় যে অবর্ণনীয় দারুণ সুখ অনুভূত হয় চিত্তে তা এই প্রথম অনুভব করলো সে। কিন্তু পরমুহূর্তে যখনই মনে হলো তার এই সুখ ক্ষণকালের, আর কোনোদিন সে এই সুখ অনুভব করতে পারবে না, তখনই বিষাদে ভরে গেল তার চিত্ত। আবার ক্ষণকাল পরই কাল রাতের কথা মনে পড়তেই বিষাদের মেঘের মাঝেও এক চিলতে রোদের মতো হাসি ঔজ্জ্বল্য ছড়ালো তার ওষ্ঠে! ওষ্ঠে ওষ্ঠ চেপে অশ্রুসিক্ত চোখে হাত বুলাতে লাগলো ঋষ্যশৃঙ্গের জটায়। কালরাতে আশ্রমে ফিরে যাবার জন্য একগুঁয়ে বালকের মতো জেদ ধরেছিল, আর আজ অনেক বেলায় ঘুম থেকে উঠে আশ্রমে ফিরে যাবার কথা মুখেও আনে নি; উল্টো বলেছে, ‘প্রেয়সী, তোমাদের এই আশ্রমটি আমাদের আশ্রম অপেক্ষা অধিক উত্তম, চলমান হওয়ায় নদীপারের অনেক কিছু দৃষ্টিগোচর হয়!’

শবরী ঋষ্যশৃঙ্গের কপালে আলতো চুম্বন করলো। ক্ষণকাল পর আপনা-আপনিই ঋষ্যশৃঙ্গের ঘুম ভাঙলো। ঋষ্যশৃঙ্গ কিছু বুঝে ওঠার আগেই শবরী দ্রুত চোখের জল মুছে ফেললো। ঋষ্যশৃঙ্গ উঠে বসে শবরীর মুখে দৃষ্টি রেখে বললো, ‘প্রেয়সী, আমি তোমার সঙ্গে গল্প করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম বুঝি?’
‘হ্যাঁ প্রিয়, তুমি ঘুমিয়ে পড়েছিলে।’
‘আহারের পর আমার খুব ক্লান্ত লাগছিল।’

হঠাৎ বাতায়ন ভেদ করে নদীপারের দিকে দৃষ্টি পড়তেই ঋষ্যশৃঙ্গ বিস্ময়াবিভূত চোখে তাকিয়ে রইলো ডুলিতে আরোহণ করা এক বৃদ্ধ এবং দু-জন ডুলিবাহকের দিকে। কৌতুহলী বালকের মতো প্রশ্ন করলো শবরীকে, ‘ওটা কি?’
‘ওটাকে ডুলি বলে। বৃদ্ধ কিংবা অসুস্থ মানুষকে ডুলিতে বহন করা হয়।’

বৃদ্ধ এবং ডুলিবাহক দু’জন চোখের আড়ালে চলে গেলেও ঋষ্যশৃঙ্গ তাকিয়ে রইলো নদীপারের দিকে। আলাপনা আঁকা সুন্দর সুন্দর মাটির ঘর, মাটির উনুনে নারীদের রুটি সেঁকা কিংবা অন্য ব্যঞ্জন রন্ধন করা, নদীতে স্নানরত নারী-পুরুষ এবং শিশুদের হুটোপুটি, নদী থেকে জল সংগ্রহ করে কাঁখে কলসি কিংবা মাথায় ঘড়া বয়ে নিয়ে নারী-পুরুষের গৃহে ফেরা, নদীর জলে ভাসতে থাকা মৃত গবাদীপশুর পাঁজরের ওপর বসে খুবলে খুবলে মাংসাহার রত শকুন প্রভৃতি দেখে ঋষ্যশৃঙ্গ একের পর এক বালকের ন্যায় প্রশ্ন করলো আর শবরীও যত্নের সঙ্গে স্নেহবাক্যে তার সকল প্রশ্নের উত্তর দিলো। শবরী প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে ভাবলো, ঋষ্যশৃঙ্গের শাস্ত্রজ্ঞান হয়তো অগাধ, কিন্তু তার বাস্তবজ্ঞান বড়ই কম। তার অগাধ শাস্ত্রজ্ঞানের সঙ্গে যখন বাস্তবজ্ঞানের সমন্বয় ঘটবে তখনই হয়তো সে হয়ে উঠবে দারুণ এক পুরুষ, যদি না পুরুষের প্রচলিত দোষগুলো তাকে স্পর্শ করে।

গিরিকা এসে আবার তাড়া দিলেন, ‘কি লো, তুই এখনো বসে আছিস? যা তপোধনকে সাজিয়ে-গুছিয়ে দে।’

মধ্যাহ্নভোজের পূর্বেই শবরী ঋষ্যশৃঙ্গকে স্নানাগারে নিয়ে গিয়ে শরীর মার্জন করে স্নান করিয়েছে। এখন পুনরায় স্নানাগারে নিয়ে গিয়ে হাত-মুখ ধুইয়ে দিলো।

শবরী, উমা আর সুলোচনার সাহায্যে ঋষ্যশৃঙ্গকে পরিধান করালো স্বর্ণ এবং রৌপের কারুকাজ করা মহামূল্যবান রাজকীয় পরিচ্ছদ। গিরিকা গহনার পুটলি খুলে ওদের হাতে দিলো বিভিন্ন ধরনের নয়টি মহামূল্যবান সুবর্ণমাল্য এবং অমূল্য রত্নখচিত ছয়টি অঙ্গুরীয়। শবরী হৃদয়ের কান্না গোপন করে একে একে নয়টি মহামূল্যবান সুবর্ণমাল্য পরিয়ে দিলো ঋষ্যশৃঙ্গের কণ্ঠে, দুই হাতের আঙুলে পরিয়ে দিলো ছয়টি অঙ্গুরীয়। তারপর চন্দনের পাত্র হাতে নিয়ে ঋষ্যশৃঙ্গকে সাজাতে বসলো সে। ঋষ্যশৃঙ্গ তাকে নিয়ে সকলের এতো আগ্রহ এবং আড়ম্বড়পূর্ণ সাজসজ্জা দেখে নানা প্রশ্ন করতে লাগলো আর তার সকল প্রশ্নের চৌকস উত্তর দিতে লাগলেন গিরিকা।

হঠাৎ বাদ্যযন্ত্রের শব্দ কানে আসতেই কেঁপে উঠলো শবরী, যেনবা বাদ্যযন্ত্রের ধ্বনির প্রতিধ্বনি শুরু হলো তার বুকের ভেতর! হাত কাঁপার ফলে ঋষ্যশৃঙ্গের কপালে চন্দন লেপটে গেল, লেপটানো চন্দন মুছে সে পুনরায় নিখুঁতভাবে চন্দন পরানোর চেষ্টা করলো, কিন্তু পারলো না। ক্রমাগত বাদ্যযন্ত্র বাজছে আর সেই সঙ্গে কাঁপছে তার বুক। চেষ্টা করেও সে তার বুকের এই অস্বাভাবিক স্পন্দন ছন্দে আনতে পারলো না, ফলে তার হাত কাঁপতে লাগলো আর এর প্রভাব পড়তে লাগলো চন্দনের নকশায়। তাই চন্দনপাত্র সুলোচনার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো, ‘তুই চন্দন পরা সখি, আমার ভাল হচ্ছে না।’

সুলোচনা অবিশ্বাসের সুরে বললো, ‘আমাদের মধ্যে তুই সবচেয়ে ভাল চন্দন পরাতে পারিস, আর তুই কি-না বলছিস ভাল হচ্ছে না!’
‘সত্যিই আমার ভাল হচ্ছে না, তুই নে সখি।’

উমা আড়চোখে তাকালো শবরীর দিকে। সুলোচনা আর কথা না বাড়িয়ে শবরীর হাত থেকে চন্দনপাত্র নিয়ে নিখুঁতভাবে পরিয়ে দিলো। বাদ্যযন্ত্রের ধ্বনি ক্রমশ জোরে বাজছে কানে। ঋষ্যশৃঙ্গ জানতে চাইলো, ‘কিসের শব্দ প্রেয়সী।’
‘বাদ্যযন্ত্র বাজছে তপোধন।’

রাজকীয় পরিচ্ছদে সুসজ্জিত ঋষ্যশৃঙ্গকে রাজপুত্রের মতোই লাগছে! তার সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছে শবরীর। সে কক্ষ থেকে বেরিয়ে স্নানাগারে গেল। আপন মনে কিছুক্ষণ কাঁদলো একা একা। তাকে না দেখে স্নানাগারে খুঁজতে এসে থমকে দাঁড়ালো উমা। আস্তে করে হাত রাখলো শবরীর ঘাড়ে, ‘সখি...।’

শবরী কাঁদতে কাঁদতে জড়িয়ে ধরলো উমাকে। উমা শবরীর মাথায় হাত বুলিয়ে বললো, ‘তুই না বললেও আমি তোর মুখ দেখে আগেই বুঝেছি সখি, যে তুই তপোধনের ভালবাসার বন্ধনে জড়িয়ে পড়েছিস। তোর দোষ নয় সখি, দোষ অদৃষ্টের; নইলে নগরে এতো এতো গণিকা থাকতে তপোধনকে হরণ করার জন্য আমাদেরকেই কেন যেতে হলো, আর নগরে এতো এতো মানুষ থাকতে একজন মুনিকুমারই বা কেন তোকে আকর্ষণ করলো। তুই মনটাকে শান্ত কর। তপোধন এখন হবু রাজজামাতা। তুই মনকে প্রবোধ দিয়ে তাকে ভুলে থাকার চেষ্টা কর সখি।’

‘আমি ওই চাঁদমুখ কী করে ভুলে থাকবো সখি! ও আমার থেকে দূরে চলে যাবে ভাবতেই আমার হৃদয়ে ঝড় বইছে।’
‘এই ঝড় তোকে শান্ত করতেই হবে সখি। লক্ষ্মী সখি আমার, চোখ-মুখ ধুয়ে নে, ঘাটের কাছে চলে এসেছি, এখন চল।’

উমা শবরীকে ছেড়ে দিয়ে জলের বড় মুটকি থেকে ছোট ঘড়ায় জল তুলে ঢেলে দিলো শবরীর হাতের আঁজলায়, মুখ-হাত ধুয়ে ফেললো শবরী। তারপর উত্তরীয় দিয়ে হাত-মুখ মুছে স্নানাগার থেকে বেরিয়ে কক্ষে প্রবেশ করলো।

ঘাটের কাছাকাছি চলে এসেছে নৌকা। অসংখ্য মানুষের কোলাহল আর শঙ্খ-ভেরী-মৃদঙ্গ প্রভৃতি বাদ্যযন্ত্রে মুখর নদীর ঘাট। সারা নগরীর মানুষ যেন ভেঙে পড়েছে ঘাটে; রাজজামাতাকে দেখতে আর বহুকাল পরে নগরীতে যে বৃষ্টি নামবে তাতে ভিজতে! উলুপী এসে কপাটের বাইরে দাঁড়ালে তার উদ্দেশে গিরিকা বললেন, ‘দেখো মা, সবকিছু ঠিক মতো গুছিয়ে নিও। কিছু ফেলে যেওনা যেন।’
ঘাড় নাড়লো উলুপী।

নৌকা ঘাটে নোঙর করতেই হালকা একটা ঝাঁকুনিতে সামান্য টললো সকলেই। টাল সামলে গিরিকা শয্যার ওপর রাখা স্বর্ণ এবং রত্নখচিত মুকুট হাতে নিয়ে পরিয়ে দিলেন ঋষ্যশৃঙ্গের মাথায়। অল্পক্ষণের মধ্যেই অমাত্য অন্নদামঙ্গল এবং রাজবাড়ীর সুঠাম দেহের সুসজ্জিত দু’জন ডুলিবাহক ডুলি নিয়ে উঠে এলো নৌকায়। ডুলিবাহকেরা কপাটের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকলেও অন্নদামঙ্গল কক্ষে প্রবেশ করলেন। ঋষ্যশৃঙ্গের সম্মুখ থেকে পাশে সরে দাঁড়ালো সকলে। অন্নদামঙ্গল ঋষ্যশৃঙ্গের উদ্দেশে বললেন, ‘অভিবাদন আপনাকে রাজজামাতা! আপনার পবিত্র চরণের স্পর্শে অঙ্গরাজ্যের ভূমি পবিত্র হোক। অঙ্গরাজ্যে বারিবর্ষিত হোক, ধুয়ে যাক সকল পাপ আর জরা-ব্যধি। আবার শান্তি বর্ষিত হোক অঙ্গরাজ্যে।’

ঋষ্যশৃঙ্গ হয়তো এসব কথার কোনো অর্থ বুঝলো না, সে তার বাঁ-পাশে দাঁড়ানো শবরীর মুখের দিকে তাকালো। অন্নদামঙ্গল গিরিকা এবং তার তিনকন্যার উদ্দেশে বললেন, ‘অসাধ্য সাধন করার জন্য তোমাদেরকেও অভিবাদন! তোমাদের নামে জয়ধ্বনি পড়ে গেছে নগরে। জয় হোক তোমাদের। রাজজামাতাকে দ্বারের বাইরে নিয়ে এসো।’
বলেই কক্ষের বাইরে চলে গেলেন অন্নদামঙ্গল।

শবরীর কাঁধে হাত রেখে ঋষ্যশৃঙ্গ বললো, ‘প্রেয়সী, এরা কারা?’
‘এরা তোমাকে অভ্যর্থনা জানাতে এসেছেন তপোধন।’
‘আমি তোমার সঙ্গে যাব, তোমার সঙ্গে ব্রত পালন করবো।’
‘এখন এরা যা বলবেন এখন সেটা পালন করাই তোমার কর্তব্য। এটাই এখানকার রীতি। চলো।’

শবরীর কাঁধে হাত রেখেই কক্ষের বাইরে এলো ঋষ্যশৃঙ্গ। ডুলিবাহকেরা ঋষ্যশৃঙ্গকে অভিবাদন জানিয়ে ডুলিতে আরোহণ করার অনুরোধ জানালে সে শবরীর দিকে তাকালো। শবরীর অনুরোধে ঋষ্যশৃঙ্গ ডুলিতে চড়ে বসামাত্র বাহকেরা ডুলি তুলে যাত্রা শুরু করলো। ঋষ্যশৃঙ্গ পিছনে ঘাড় ফিরিয়ে বললো, ‘এরা আমায় কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? প্রেয়সী, তুমি আমার সঙ্গে এসো।’

শবরীর মুখ থেকে আর কোনো শব্দ বের হলো না, কান্নায় তার কণ্ঠ রোধ হয়ে গেছে। নিথর চোখে তাকিয়ে রইলো ঋষ্যশৃঙ্গের দিকে। ডুলিবাহকেরা ঋষ্যশৃঙ্গকে নিয়ে গিয়ে বালুচরের পথে অপেক্ষমান সুসজ্জিত রথের কাছে নামালো। রাজপুরোহিত এবং রাজবাড়ীর সুসজ্জিত নারীগণ বরণডালায় সাজানো অগ্নি, পুষ্প, মাল্য, বিল্বপত্র, ধান্য-তিল-তুলসী প্রভৃতি দিয়ে হবু রাজজামাতাকে বরণ করছে। তাদের পিছনে তিনজোড়া শিবিকা, বাদকদল, গায়ক-গায়িকাবৃন্দ, দাস-দাসী, মাহুতসহ কয়েকটি অতিকায় হস্তী। বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যেন জনতা উল্লাস করছে, জনস্রোতের সামনে বাঁধের মতো দাঁড়িয়ে আছে অশ্বারোহী এবং পদাতিক সৈন্য। নগরের মানুষের এতোদিনের রোগার্ত, শোকার্ত, মুমূর্ষু, ব্যথাতুর, বিপর্যস্ত হৃদয়-নদীতে হঠাৎ যেন নতুন জীবনের স্পন্দন ফিরে এসেছে! বিচলিত এবং ক্রমশঃ ম্রিয়মাণ প্রাণ হঠাৎ অধিক চঞ্চল হয়ে উঠেছে। নগরের শিশু থেকে বয়োবৃদ্ধ, নারী-পুরুষ যে যেখানে যে অবস্থায় ছিল সংবাদ শোনামাত্র যেন তারা আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে ছুটে এসেছে, একে অন্যকে ঠেলেঠুলে মুখ বাড়িয়ে দেখার চেষ্টা করছে রাজজামাতাকে। অশ্বারোহী এবং পদাতিক সৈন্যবাহিনী জনতার ভিড় সামলাতে গলদঘর্ম হয়ে উঠছে।

এতো যে বাঁধভাঙা আনন্দ, এতো যে উচ্ছ্বাস; অথচ এসবের কিছুই যেন স্পর্শ করছে না শবরীকে। জনতা তাদের নামে, বিশেষত তার নামে জয়ধ্বনি করছে, সে-সবও তার কানে পৌঁছচ্ছে না। নৌকার ওপর স্থাণুবৎ দাঁড়িয়ে নির্নিমেষ ঝাপসা চোখে তাকিয়ে আছে, কিন্তু মানুষের ভিড়ের মাঝে তার দৃষ্টি এখন ঋষ্যশৃঙ্গকেও খুঁজে পাচ্ছে না।

বরণ করার পর ঋষ্যশৃঙ্গকে খালি পায়ে কয়েক পা হাঁটিয়ে তোলা হলো রথে। ক্ষণকাল পরেই হবু রাজজামাতাকে নিয়ে রাজবাড়ীর উদ্দেশ্যে ছুটে চললো রথ। রথের পিছু পিছু ছুটছে উৎসাহী জনতা, কেউবা অলৌকিক মেঘ আর বৃষ্টিার আশায় তাকিয়ে আছে আকাশপানে; আর লৌকিক মেঘ জমেছে শবরীর হৃদয়াকাশে, অঝোর ধারায় বৃষ্টি ঝরছে তার নয়নাকাশ থেকে!

(চলবে)

নগরনটী (উপন্যাস: পর্ব-এক)
নগরনটী (উপন্যাস: পর্ব-তেরো)

বিভাগ: 

Comments

ড. লজিক্যাল বাঙালি এর ছবি
 

ধাবাবাহিকতায় ভাল লাগছে। চালিয়ে যান দাদা।
==============================================
আমার ফেসবুকের মূল ID হ্যাক হয়েছিল ২ মাস আগে। নানা চেষ্টা তদবিরের পর গতকাল আকস্মিক তা ফিরে পেলাম। আমার এ মুল আইডিতে আমার ইস্টিশন বন্ধুদের Add করার ও আমার ইস্টিশনে আমার পোস্ট পড়ার অনুরোধ করছি। লিংক : https://web.facebook.com/JahangirHossainDDMoEduGoB

===============================================================
জানার ইচ্ছে নিজেকে, সমাজ, দেশ, পৃথিবি, মহাবিশ্ব, ধর্ম আর মানুষকে! এর জন্য অনন্তর চেষ্টা!!

 
মিশু মিলন এর ছবি
 

অনেক ধন্যবাদ। শুভেচ্ছা.....

 

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

মিশু মিলন
মিশু মিলন এর ছবি
Offline
Last seen: 1 দিন 3 ঘন্টা ago
Joined: সোমবার, ফেব্রুয়ারী 20, 2017 - 9:06অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

কু ঝিক ঝিক

ফেসবুকে ইস্টিশন

SSL Certificate
কপিরাইট © ইস্টিশন.কম ® ২০১৬ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর