নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 7 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • সাহাবউদ্দিন মাহমুদ
  • মিশু মিলন
  • দ্বিতীয়নাম
  • রাজর্ষি ব্যনার্জী
  • নুর নবী দুলাল
  • পৃথু স্যন্যাল
  • সাইয়িদ রফিকুল হক

নতুন যাত্রী

  • জোসেফ হ্যারিসন
  • সাতাল
  • যাযাবর বুর্জোয়া
  • মিঠুন সিকদার শুভম
  • এম এম এইচ ভূঁইয়া
  • খাঁচা বন্দি পাখি
  • প্রসেনজিৎ কোনার
  • পৃথিবীর নাগরিক
  • এস এম এইচ রহমান
  • শুভম সরকার

আপনি এখানে

প্রসঙ্গ বিপ্লব পালঃ বুদ্ধিবৃত্তিক স্থূলতা, অসততা এবং সংস্কার যখন “মুক্তচিন্তা” নামে বাজারে বিকোয় !


আগের পর্ব পড়ুন এখানে

১.
গত পর্বে লিখেছি, আত্মদাবীকৃত “মুক্তমনা” বিপ্লব পাল লেখালেখির বেসিক নর্মস গুলো জানেন না কিম্বা জানলেও চর্চা করেন না। তার একটি বড় লক্ষণ হচ্ছে – তিনি যখন অন্যের লেখাকে উদ্ধৃত করেন, তখনও নিজের মনের মাধুরী মিশিয়ে উদ্ধৃত করেন। অথচ, এ বিষয়ে স্ট্যান্ডার্ড প্র্যাকটিস হচ্ছে – সমালোচনা বা বিরোধিতা করার জন্যে, কেউ ভিন্ন একজন মানুষের লেখাকে উদ্ধৃত করতে হলে তার মূল লেখা থেকে ‘কোট – আনকোট’ করে উপস্থাপন করতে হবে। অর্থাৎ সেই আলোচ্য লেখক মূল লেখায় বাস্তবত যা লিখেছেন তাকেই হুবহু তুলে দিতে হবে উদ্ধৃতি চিহ্নের ভেতরে। আমার মূল লেখাটি যারা পড়েছেন, তারা দেখবেন ব্লগ সিরিজটির প্রথম পর্বেই আমি বিপ্লব পালের লেখা থেকে কোট – আনকোট করে উল্লেখ করেছিলাম। বিপ্লব পালের বাঙলা বানান জ্ঞান ভয়াবহ (বহু উদাহরণ আছে, তিনি তাঁর বন্ধু ব্লগার অভিজিৎ রায়ের নামটিও ভুল বানানে লেখেন বহু স্থানে, একই ব্লগে অভিজিৎ আর অভিজিত বানান দুটি চালিয়ে গেছেন, লেনিন আর লেলিন তো হর-হামেশাই লিখছেন, কমিনিস্ট আর কমিউনিস্ট লিখছেন পাশাপাশি, তাঁর লেখার শিরোনামে তিনি আমার নামটিও লিখেছেন ভুল বানানে), তাই তাঁর লেখায় প্রচুর পরিমানে বানান ভুল থেকে যায়। আমি তাঁর লেখা থেকে সেই কোটেশন গুলোকে হুবুহু তুলে দেয়ার কারণে তার কিছু ভুল বানানও আমি সংশোধন করিনি। একেই বলে কোট-আনকোট করে কাউকে উল্লেখ করা। নইলে বিভ্রান্তি ছড়ানোর সুযোগ থাকে, misrepresentation বা ভুল ভাবে উপস্থাপনের ঝুঁকি থাকে। কিন্তু বিপ্লব পালের অভ্যাসই হচ্ছে মানুষের মূল লেখাকে ‘টুইস্ট’ করে তুলে ধরা। আসুন সেই রকমের দুই একটি উদাহরণ দেখা যাক। বিপ্লব পাল লিখেছেন এভাবেঃ

“গোলাম ভাই লিখেছেন সোভিয়েত ইউনিয়ান থেকে ১০০ জন বিজ্ঞানে নোবেল পেয়েছেন! বাস্তবে নাম্বারটা ৭”

(বোল্ড ও আন্ডারলাইন করাটা আমার, লেখাটি বিপ্লব পালের, হুবহু কোট করেছি।)

আমার সমগ্র লেখায় সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে কতজন নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন তার কোনও উল্লেখ নেই, এমন কি নেই কোনও ইঙ্গিতও। বিপ্লব পাল উপরের বোল্ড করা কোটেশন টিতে আমার নামে যা লিখেছেন তা আমার কথা বা লেখা নয়। আমার সারা লেখাটি থেকে বিপ্লব পাল বা যে কেউ যদি এই লাইনটি বের করে দিতে পারেন, তাহলে আমি নিজের কান ধরে, ক্ষমা চেয়ে আমার লেখাটি প্রত্যাহার করে নেবো। আমি কি লিখেছি হুবহু তুলে দিচ্ছি নীচেঃ

“যদি কমিউনিজম মানুষকে যন্ত্রনা আর দাসত্ব ছাড়া কিছুই দিয়ে না থাকে, তাহলে কমিউনিস্ট দেশগুলোতে সাহিত্য, শিল্প, দর্শন এবং বলাই বাহুল্য বিজ্ঞানের এই অভূতপূর্ব উন্নতির কারণটি কি? কিভাবে সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো পদার্থবিজ্ঞান, ইঞ্জিনিয়ারিং কিম্বা বায়োলজিক্যাল সায়েন্সের বিভিন্ন বিষয়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোর সাথে পাল্লা দিয়েছিলো? যদি কমিউনিস্ট দুনিয়া বিশ্বকে দাসত্ব ছাড়া আর কিছুই না দিয়ে থাকে তাহলে পুজিবাদী দুনিয়ার প্রবর্তিত পুরস্কার নোবেল বিজয়ীদের তালিকায় প্রায় একশোজন কি করে নোবেল পেয়েছিলেন কমিউনিস্ট দুনিয়া থেকে? এঁদের বেশীর ভাগই ছিলেন বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায়, তথাকথিত শান্তি পুরস্কার নয়”।

আমি লিখেছি “কমিউনিস্ট দুনিয়া” তিনি সেটাকে বানিয়েছেন ‘সোভিয়েত ইউনিয়ান’, আমি লিখেছি কমিউনিস্ট দুনিয়া থেকে “প্রায় একশো জন”, সেটাকে তিনি বানিয়েছেন ‘সোভিয়েত ইউনিয়ান থেকে ১০০ জন’, আমি লিখেছি এঁদের “বেশীর ভাগই” নোবেল পেয়েছিলেন বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায়, শান্তি পুরস্কার নয়, তিনি লিখলেন আমি নাকি সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকেই ১০০ জনের বিজ্ঞানে নোবেল প্রাইজ পাওয়ার দাবী করেছি। দেখুন এটা নাকি মুক্তচিন্তা আর মুক্তমনা বুদ্ধিবৃত্তির নমুনা।

আমি কোথাও দাবী করিনি এই সকল নোবেল পুরস্কার কমিউনিজমের অর্জন বা বিজয়, আমি বরং প্রশ্ন করেছি, জনাব পাল মহাশয় কে, কমিউনিজম যদি বিশ্বকে দাসত্ব ছাড়া আর কিছুই না দিয়ে থাকে, তাহলে এই অর্জন গুলোকে কিভাবে ব্যাখ্যা করা যাবে? কমিউনিজম মানে যদি শুধুই দাসত্ব হয়, তাহলে কমিউনিস্ট দুনিয়ার এই জ্ঞান বিজ্ঞানের অগ্রসর চর্চাকে কিভাবে ব্যাখ্যা করা যাবে? “কমিউনিস্ট দুনিয়া পৃথিবীকে যন্ত্রনা ও দাসত্ব ছাড়া আর কিছুই দেয়নি” এই দাবীটি ছিলো বিপ্লব পালের, সুতরাং ব্যাখ্যা তো তারই দেয়ার কথা তাই নয়? তিনি তা না করে, কেবল সংখ্যা নিয়ে মেতে উঠলেন।

বাই দা ওয়ে, কমিউনিস্ট দুনিয়াতে নোবেল পুরস্কার কয়টি গিয়েছিলো তার তালিকাটি উইকিপেডিয়া তে আছে। বর্তমান পৃথিবীর মানচিত্রে প্রায় তিরিশটি দেশ আছে যারা সাবেক কমিউনিস্ট কিম্বা সোসালিস্ট দেশ ছিলো, আগ্রহী পাঠকেরা দেখে নিতে পারেন কমিউনিস্ট দুনিয়াতে নোবেল পুরস্কারের সংখ্যা।

কিন্তু আমার মূল প্রশ্নটি নোবেল পুরস্কারের সংখ্যা ছিলোনা, বিপ্লব পাল কুট তর্ক করার জন্যে সংখ্যাটিকে বেছে নিয়েছেন, কারণ মূল প্রশ্নটির উত্তর দেবার মতো বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা তাঁর নেই। আমার প্রশ্নটি ছিলো, যদি কমিউনিজম এতোটাই অথর্ব একটি ব্যবস্থা হয়ে থাকে, তাহলে কমিউনিস্ট দেশগুলোতে জ্ঞান বিজ্ঞানের এই অর্জন গুলোকে আমরা কিভাবে ব্যাখ্যা করবো? তাহলে কি করে রাশিয়া সারা দুনিয়া ব্যাপী একটি পরাশক্তি হয়ে উঠেছিলো? কি করে মহাকাশ গবেষণায় সবার আগে আকাশ জয় করেছিলো? আর কমিউনিস্ট রাশিয়া যদি শুন্যের উপরেই দাঁড়িয়ে থাকতো তাহলে মাত্র বিশ-পচিশ বছরের মাথায় কেনো আবার সেই রাশিয়াই মার্কিন নির্বাচনের হিসাব নিকাশ ভন্ডুল করে দিতে পারলো? যদি রাশিয়ার ৭৪ বছরের কমিউনিজম কেবল দাসত্বই উৎপাদন করে থাকে, তাহলে মাত্র ২৫ বছরে সেই রাশিয়াই আবার কেনো আঙ্গুল তুলে ধমক দিতে পারছে বিপ্লব পালের সাধের আমেরিকা কে? এসবের উত্তর দেবার বুদ্ধিবৃত্তিক সামর্থ্য নেই বিপ্লব পালের। কিভাবে কমিউনিস্ট দুনিয়া এতোটা এগিয়ে গিয়েছিলো, সেটা বোঝার জন্যে প্রধান কমিউনিস্ট দেশগুলোর শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে যে আমুল পরিবর্তন এসেছিলো তা দেখতে হবে। এ বিষয়ে বিষদ রিসার্চ আছে। একটু খোঁজ করে দেখুন।

৫. কমিউনিজম ও বামপন্থিদের “বাঁশ” দেয়াটা বিপ্লব পালের একটি প্রধান হবি। সেটাতে আমার কোনও আপত্তি নেই। বোধ করি এই রকমের হবি এক ধরনের মর্ষকামীতার লক্ষণ। কিন্তু সেটা ব্যক্তিগত আড্ডার পরিসরে থাকলে কোনও সমস্যা হয়না, সমস্যা হয় যখন তা “মুক্তচিন্তা” নামে বাজারে বিক্রি হয়। কমিউনিজম বা বামপন্থাকে সমালোচনা করা আর স্থুল কায়দায় “বাঁশ” দেয়া এক কথা নয়। তাঁর একটা প্রমান দিচ্ছি।

বিপ্লব পাল লিখেছেন –

“ল্যান্ডাউএর লেখা থিওরিটিক্যাল ফিজিক্স পড়েই ছাত্র অবস্থায় বড় হয়েছি। উনি আমার প্রিয় বিজ্ঞানী। কিন্ত গোলাম ভাই কি জানেন এই অসামান্য প্রতিভাবান বিজ্ঞানীকে সাইবেরিয়াতে গাছ কাটটে পাঠিয়েছিল স্টালিন জমানা? নেহাত, লান্ডাউ এর বস কোন রকমে এক বছর বাদে, অর্ডার রভার্সাল করতে সক্ষম হন। এরকম কত শত ল্যান্ডাউ স্টালিনের পার্জে মারা গেছেন তা কি গোলাম ভাই জানেন?”

বাহ সোভিয়েত পদার্থ বিজ্ঞানী ল্যান্ডাউ বিপ্লব পালের প্রিয় বিজ্ঞানী। না আমি জানিনা ল্যান্ডাউ এর মতো কত শত পদার্থ বিজ্ঞানী স্তালিনের হাতে মারা গেছেন। বিপ্লব পাল নিশ্চয়ই জানেন, কিন্তু তিনি এই শত শত নিহত বিজ্ঞানীদের একজনের নামও দিলেন না তাঁর লেখায়? কারণ কি? যদি স্তালিন শত শত পদার্থবিজ্ঞানী বা বিজ্ঞানীকে হত্যা করে থাকেন, আপনার কাছে কি দুচার দশ জনের নামও নে্ই বিপ্লব পাল? বিপ্লব পাল তা দিতে পারবেন না, কারণ সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রসঙ্গে তিনি শ্রেফ পেন্টাগন আর সিআইএ’র প্রোপ্যাগান্ডা গুলোকেই বাঙলায় অনুবাদ করে ছেড়ে দেন। যদি আমার এই ধারণাটি মিথ্যা প্রমান করতে হয়, তাহলে লিখুন সেই শত শত বিজ্ঞানীর নাম সহ, কবে তাঁরা নিহত হলেন, কিভাবে তাঁরা নিহত হলেন। এবার আসুন ল্যান্ডাউ কাহিনীটা আরেকটু জানি, তাহলে বিপ্লব পালের মিথ্যাচারটি আরেকটু ভালো করে বোঝা যাবে।

পদার্থ বিজ্ঞানী ল্যান্ডাউ কে গ্রেফতার ও নির্বাসনে পাঠানোর সোভিয়েত প্রশাসনের বক্তব্যটি ছিলো এই রকমের – স্ট্যালিন প্রশাসনের বিরুদ্ধে সক্রিয় একটি গ্রুপের সাথে যুক্ত হয়ে একটি মেনিফেস্টো রচনার কাজে ল্যান্ডাউ এর সম্পৃক্ততা খুঁজে পেয়েছিলো সেই সময়কার কেজিবি নেতৃত্ব। ফলে ল্যান্ডাউকে গ্রেফতার করে নির্বাসনে পাঠানো হয়। কিন্তু এক বছরের মাথায় সরকারের সাথে এক ধরনের বোঝাপড়ার ভিত্তিতে স্ট্যালিনের সম্মতিতেই তাঁকে সপদে ফিরিয়ে আনা হয়।

যদি ধরেই নেই যে স্তালিন প্রশাসনের অভিযোগটি ভিত্তিহীন এবং এটা কেবলই বুদ্ধিজীবীদের উপরে, বিজ্ঞানীদের উপরে স্তালিন প্রশাসনের অত্যাচারের নমুনা, তাহলে পরের ইতিহাস টিকে কিভাবে ব্যাখ্যা করবো? পদার্থ বিজ্ঞানী ল্যান্ডাউ ১৯৪৯ ও ১৯৫৩ সালে পর পর দুবার সোভিয়েত ইউনিয়নের শীর্ষ জাতীয় পুরস্কার “স্তালিন এওয়ার্ড” এ ভুষিত হন। এই দুটি পুরস্কারই তিনি লাভ করেন স্তালিন শাসনামলে।এমন কি ১৯৫৪ সালে তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের শীর্ষতম পুরস্কার “হিরো অফ সোস্যালিস্ট লেবার” লাভ করেন। এখন বলুন তো যদি স্তালিন কিম্বা সোভিয়েত প্রশাসন ল্যান্ডাউ যদি কে হত্যাই করতে চাইতো তাহলে রাষ্ট্রের সবচেয়ে সম্মানজনক এই তিনটি পুরস্কার দিয়ে তাঁকে সন্মাননা জানানোর কারণ টি কি?

আগ্রহীরা ল্যান্ডাউ বিষয়ক তথ্যগুলো যাচাই করে নিতে পারেন এখান থেকে

ল্যান্ডাউ পড়ে পড়ে বড় হওয়া বিপ্লব পাল অবশ্য ল্যান্ডাউ এর এই ইতিহাস টি চেপে গেছেন। তিনি ল্যান্ডাউ এর নির্বাসনের ইতিহাসটি ফলাও করে বর্ণনা করলেন কিন্তু চেপে গেছেন ল্যান্ডাউ কে সোভিয়েত প্রসাশন কিভাবে সন্মানিত করেছেন সেই ইতিহাসটি। কেনো চেপে গেছেন তা আমরা ধারণা করতে পারি – কারণ টি হচ্ছে বিপ্লব পালের চাপা “কমিউনিজম ঘৃণা”।

ভ্রাতা বিপ্লব পাল, সত্য বললে পুরোটুকুই বলুন, পেন্টাগন বা সিআইএর ভাষায় সত্য বলবেন না প্লিজ! সেটা মুক্তচিন্তা নয়, শ্রেফ প্রোপাগান্ডা।

৩.
এবারে বুদ্ধিবৃত্তিক স্থূলতা ও অসততার শেষ উদাহরণ টি দেই। প্রসঙ্গটি ছিলো, প্রাক-বিপ্লব সোভিয়েত ইউনিয়নের অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে । বিপ্লব পূর্ব সোভিয়েত ইউনিয়নের অর্থনৈতিক অবস্থা আমেরিকার তুলনায় অনেক পসচাদপদ ছিলো, এটাই ছিলো আমার বক্তব্য। তাঁর প্রেক্ষিতে বিপ্লব পাল লিখেছেন এই সবঃ

"আরেকটু পড়াশোনা করুন। ১৮৬৫ সাল থেকে কিভাবে আস্তে আস্তে সংস্কারের মাধ্যমে ১৯০৫ সালের মধ্যেই রাশিয়া বৃটেন, জার্মানির সমকক্ষ শিল্প শক্তি হয়ে ওঠে সেসবের ইতিহাস ত কিছু জানেন না। শুধু লালমার্কা চটি বই ভিত্তি করে বিতর্ক হয়?"

"গোলাম ভাই কি জানেন ১৯১৭ সালের বিপ্লবের আগে রাশিয়া শিল্প উৎপাদনে ছিল বৃটিশ,জার্মানী এবং ফ্রান্সের পরেই? আর কি গল্প জানেন গোলাম ভাই? যাই হোক কমিনিউস্টরা যে রাশিয়ার ইতিহাস একদম পড়ে নি-সেটা আমি ভাল করেই জানি।"

রাশিয়া শিল্প শক্তি হিসাবে ১৯০৫ সালে ব্রিটেন ও জার্মানির সমকক্ষ হয়ে ওঠে এর কোনও রেফারেন্স আছে? না তিনি তা দেননাই। রেফারেন্স দেয়াটা বিপ্লব পালের অভ্যাসের বাইরে। তিনি শুরুতেই আমাকে আরো পড়াশুনার উপদেশ দিচ্ছেন এবং শেষে বলছেন আমি শুধু লাল মার্কা চটি বই পড়ে বিতর্ক করছি। দ্বিতীয় কোটেশনে অবশ্য তিনি আর সমকক্ষ বলছেন না, বলছেন শিল্প উৎপাদনে রাশিয়া ছিলো ব্রিটেন, জার্মানি ও ফ্রান্সের পরেই। এবং এখানেও যথারীতি কোনও রেফারেন্স নেই। কিন্তু আমেরিকা, ব্রিটেন, জার্মানি ও ফ্রান্স ছাড়া সেই সময় কি আর কোনও শিল্প উন্নত দেশ ছিলো? তাহলে পাঁচটি শিল্প উন্নত দেশের মাঝে সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিলো পঞ্চম তাই তো? কিন্তু আমাদের বিতর্ক কি এই সব নিয়ে ছিলো? আমাদের বিতর্ক ছিলো আমেরিকার তুলনায় অর্থনীতিতে কিম্বা শিল্পায়নে রাশিয়ার অবস্থা কেমন ছিলো, তাই নিয়ে। বিপ্লব পাল সেদিকে আলোচনা করেন নাই। কারণ অজ্ঞাত।

আমি সব সময়েই স্বীকার করি আমার আরো পড়া দরকার। এ বিষয়ে আমার নিজের কোনও লাজ লজ্জা নেই। কিন্তু বিপ্লব পালের অবস্থাটি দেখুন। তিনি ঘোষণা করছেন, আমি “লাল মার্কা চটি” বই পড়ে বিতর্ক করছি। তিনি ঘোষণা করছেন কমিউনিস্টরা রাশিয়ার ইতিহাস একদম পড়েন নি।

এবার আসুন আমি কি লিখেছিলাম সেই প্রসঙ্গে। আমার চার পর্বের ব্লগের কোথাও আমি কোনও মার্কসবাদী পুস্তকের বা গবেষনার কোনও রেফারেন্স দেইনি। এমন কি মার্কস – এঙ্গেলস বা মাও সেতুং এর কোনও কোটেশন ও ব্যবহার করিনি। তাহলে লাল চটি বই এর প্রসঙ্গটি আসছে কিভাবে? আমি জানিনা। বরং আসুন আমি বিপ্লব পূর্ব রাশিয়ার অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে লাল বইয়ের বদলে আমেরিকান যে একটি বিশেষ গবেষণা কর্মের রেফারেন্স দিয়েছিলাম, সেটি কি একটু দেখে নেই। আমার সেই ব্লগ থেকে সরাসরি তুলে দিচ্ছি।

"সমাজ-অর্থনীতি বিষয়ে আমেরিকার সবচাইতে বনেদী গবেষণা প্রতিষ্ঠান হচ্ছে “দি ন্যাশনাল ব্যুরো অফ ইকোনমিক রিসার্চ” (http://nber.org/) । প্রায় একশো বছরের পুরোনো এই প্রতিষ্ঠানটির ২৬ জন গবেষক নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। এ পর্যন্ত এ প্রতিষ্ঠানের ১৩ জন গবেষক আমেরিকার রাস্ট্রপতির অর্থনৈতিক উপদেষ্টার ভুমিকা পালন করেছেন। এই এনবিইআর কমিউনিস্ট দুনিয়ার উপরে অসংখ্য গবেষণা আরটিকেল, রিপোর্ট আর পুস্তক প্রকাশ করেছে। সেসবের অনেক গুলোই এখন বিনামুল্যে সুলভ। সেই সকল রিপোর্টে কমিউনিজমের প্রশংসা করা হয়নি, বরং বৈজ্ঞানিক ভাবেই কমিউনিজম নিয়ে গবেষণা করা হয়েছে, তাঁর ব্যর্থতা – সাফল্যের তালাশ করা হয়েছে। মার্কিন এই প্রতিষ্ঠানের এই ধরনের গবেষণা বা লেখালেখি গুলো আমি পছন্দ করি বা না করি, এই লেখা গুলোতে তথ্য থাকে, তত্ত্ব থাকে, পরিসংখ্যান থাকে, যুক্তি থাকে, পদ্ধতি থাকে। একজন দায়িত্তবান লেখকের লেখার প্রধান অংশ হওয়া উচিৎ এই ধরনের কন্টেন্ট । এনবিইআর এর একটি রিপোর্ট (লিংক) বলছে – ১৯১৩ সালে, আমেরিকার জিডিপি ছিলো তিন হাজার সাতশো ডলার, ইংল্যান্ডের জিডিপি ছিলো তিন হাজার ডলার আর সোভিয়েত রাশিয়ার জিডিপি ছিলো নয়শো সত্তুর ডলার। বলুন তো আমেরিকা বা ইংল্যান্ডের তুলনায় রাশিয়া কোথায় ছিলো? আর জিডিপির বিপরীতে যদি জনসংখ্যা বলি, তাহলে – ১৯১৩ সালে আমেরিকার জনসংখ্যা ছিলো ১০ কোটী, ইংল্যান্ডের চার কোটি আর রাশিয়ার ষোল কোটি। এই অবস্থা থেকে ১৯৬০ – ৭০ এর দশকে রাশিয়া হয়ে উঠলো আমেরিকার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী, কিভাবে হলো?"

প্রাক বিপ্লব সোভিয়েত রাশিয়ার অর্থনীতির তথ্য দিতে আমি কোনও লাল বই নয়, বরং উল্লেখ করেছিলাম আমেরিকার সবচাইতে প্রেস্টিজিয়াস অর্থনীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এনবিইআর এর একটি গবেষণা কর্ম। শুধু তাইই নয়, এনবিইআর এর ওয়েবসাইটের লিংক দিয়েছিলাম এমন কি মূল গবেষণা আর্টিকেলটির লিংকও দিয়ে দিয়েছিলাম। এমন কি এনবিইআর এর একটা বিশাল লোগো সাঁটিয়ে দিয়েছিলাম লেখার মাঝখানে। কিন্তু বিপ্লব পাল এসবের কোনকিছুই চোখ বুলিয়ে দেখেন নি। সেটা অসুবিধা নয়, সমস্যা হচ্ছে, কিছুই না দেখে, না পড়ে, তিনি আমাকে “লালমার্কা চটি” বই পাঠ করে বিতর্ক করার অভিযোগে অভিযুক্ত করছেন, কিন্তু কেনো? তাহলে কি আজকাল আমেরিকার সরকারের সবচাইতে বিশ্বাসভাজন গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি “লাল মার্কা চটি” বই লিখছে?

(এনবিইআর এর এই লোগটি আমি সেঁটে দিয়েছিলাম আমার আগের লেখায়)

আরেকটু খোলাসা করে বলি, আমি যে গবেষণাপত্রটিকে রেফারেন্স হিসাবে ব্যবহার করেছিলাম, তা্র গবেষক/লেখক ছিলেন – প্রফেসর স্ট্যানলি ফিশার। তিনি কে? তিনি আমেরিকার একটি প্রধান বিশ্ববিদ্যালয় এমআইটি’র অর্থনীতির অধ্যাপক ছিলেন, তিনি ছিলেন বিশ্বব্যাংকের চিফ ইকোনমিস্ট, তিনি ছিলেন ইসরাইলের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান এবং সবশেষে তিনি ছিলেন আমেরিকার ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান এবং এখনও তিনি সেই পদে বহাল আছেন। তাহলে এই রকমের প্রোফাইলের একজন মানুষ কি কমিউনিস্ট ভাবধারার “লালমার্কা চটি” বই লেখেন? মানে আমেরিকার ফেডারেল রিজার্ভ এর ভাইস চেয়ারম্যানের লেখা একটি গবেষনাকে কি "লাল চটি বই" বলা যেতে পারে? বিপ্লব পাল কি জবাব দেবেন?

(অধ্যাপক স্ট্যানলী ফিশার এর এক খানা ছবিও দিয়ে দিলাম এই সুযোগে, কথিত "লালমার্কা চটি" বইয়ের লেখক হিসাবে যদি উনাকে চোখে পড়ে বিপ্লব পালের মতো মুক্তচিন্তকদের)

তাহলে আমেরিকার একজন প্রধান অর্থনীতি গবেষকের লেখা থেকে রেফারেন্স দেবার পরেও বিপ্লব পাল আমাকে “লালমার্কা চটি” বই পড়ে বিতর্ক করার অভিযোগে অভিযুক্ত করছেন, কেনো? কারণ হচ্ছে তাঁর মাথায় গিজগিজ করতে থাকা কমিউনিজম ঘৃণা। বামপন্থিদের প্রতি ঘৃণা, প্রি-কনসিভড আইডিয়াস।

বিপ্লবপূর্ব সোভিয়েত ইউনিয়ন যে শিল্পায়নে আমেরিকার তুলনায় নিছক একটা গন্ড-গ্রাম ছিলো এটা জানার জন্যে বিপ্লব পালের মতো পন্ডিত হতে হয়না, সোভিয়েত ইউনিয়নের ইতিহাসের অ-আ-ক-খ পড়াটাই যথেষ্ট। লাল বই পড়ার দরকার নেই, আমেরিকান একাডেমিক গবেষনাগুলোই বলছে সেসব তথ্য, শুধু একটু গুগোল করে দেখুন। না পেলে মন্তব্যের ঘরে লিখে জানান, আমিই সরবরাহ করে দেবো আপনাকে।

৪.
সাম্রাজ্যবাদ ও বিজ্ঞানের প্রসার নিয়ে বিপ্লবের পালের লেখাগুলো করুণ ভাবে শিশুতোষ, তাই সেসব নিয়ে আলোচনা করে সময় অপচয় করছি না। একই ভাবে, বেশ্যাবৃত্তি নিয়ে তাঁর মস্তিস্কটি নিরেট পুঁজিবাদী সমাজের “সিস্টেম জাস্টিফিকেশন” প্রবনতা দ্বারা আক্রান্ত। সেটা নিয়েও আলোচনা করতে চাইনা। বিশ্ব যখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো সেক্সিস্ট রাজনৈতিক নেতাকে মেনে নিতে পেরেছে, আমি বা আমরাও বিপ্লব পালের মতো সেক্সিস্ট “মুক্তমনা” কে মেনে নিতে পারবো। শুধু মাঝে মাঝে এই ভাবে তরুন পাঠকদের সচেতন করে দেবো, মুক্ত চিন্তার নামে কত বর্জ্য পদার্থ আছে চারপাশে।

যে সকল পাঠক এই ব্লগ প্রসঙ্গে মূল ব্লগ সিরিজটি পড়তে আগ্রহী তাঁরা এখান থেকে আগের লেখা গুলো পড়তে পারেন।

পর্ব এক এখানে
পর্ব দুই এখানে
পর্ব তিন এখানে
শেষ পর্ব এখানে

Comments

অাব্দুল ফাত্তাহ এর ছবি
 

বিপ্লব পালের জবাবের অপেক্ষায় রইলাম।

অাব্দুল ফাত্তাহ

 
বিপ্লব রহমান  এর ছবি
 

আত্মশুদ্ধি বিবেচনায় এই লেখাটির জন্য প্রথমেই সারওয়ার ভাইকে ধন্যবাদ দেই।

বিপ্লব পালকে বরাবরই বটতলার লেখক মনে হয়েছে,গা জোয়ারি, একপেশে ঢালাও বক্তৃতায় খুব ঝানু, তার যুক্তিহীন কমিউনিজম খেদ অনেকটাই বিকারগ্রস্ত। এ জন্য মুক্তমনায় তার লেখা পড়া ছেড়েই দিয়েছি।

আগেও বলেছি, আবারো বলছি,প্রসংগ যখন পাল ও মুক্তমনা, তখন এইসব লেখা মুক্তমনাতেই প্রকাশ যৌক্তিক বেশী, এটিই ব্লগ দেশ্চার।

তাছাড়া এতে পাল বাবুর আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগের পাশাপাশি মুক্তমনার পাঠকদেরও বিভ্রান্তি কাটিয়ে ওঠা সহজ হতো।

দেরিতে হলেও সংক্ষিপ্ত পরিসরে দু-একটি লেখা এখনো মুক্তমনায় দেওয়া যায়। অনুরোধ রইলো।

 
গোলাম সারওয়ার এর ছবি
 

বিপ্লব ভাই, আপনি আগ্রহ নিয়ে আমার লেখাগুলো পড়ছেন এবং মন্তব্য করেছেন সেই জন্যে ধন্যবাদ। আপনার যুক্তি অকাট্য, লেখাটি মুক্তমনায় দেয়াটাই শ্রেয় ছিলো। এই পর্বটি লিখতে গিয়ে মনে হয়েছে, এটা খানিকটা নিরর্থক পরিশ্রম হচ্ছে। কেননা, বিপ্লব পালের মতো মানুষেরা ব্যক্তিগত বুদ্ধিবৃত্তিক স্তরে সৎ নন। এঁদের মস্তিস্ক আমেরিকার কর্পোরেট তন্ত্রের দাসত্বের সংস্কৃতিতে পূর্ণ। আমি নিজেকে কমিউনিস্ট বা বামপন্থী বলিনা, কিন্তু মানুষের কল্যাণের জন্যে পুঁজিবাদের ভুমিকা সম্পর্কে জানি। কমিউনিজমের ত্রুটি গুলো নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে আমার কোনও বাধা নেই। কিন্তু এরা যা করে তা কদর্য স্থূলতা। এই নিয়ে খুব বেশী আর লিখতে ইচ্ছা করছেনা।

আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

 
ড. লজিক্যাল বাঙালি এর ছবি
 

বাহ। চমৎকার

===============================================================
জানার ইচ্ছে নিজেকে, সমাজ, দেশ, পৃথিবি, মহাবিশ্ব, ধর্ম আর মানুষকে! এর জন্য অনন্তর চেষ্টা!!

 

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

গোলাম সারওয়ার
গোলাম সারওয়ার এর ছবি
Offline
Last seen: 1 দিন 11 ঘন্টা ago
Joined: শনিবার, মার্চ 23, 2013 - 4:42পূর্বাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

ফেসবুকে ইস্টিশন

SSL Certificate
কপিরাইট © ইস্টিশন.কম ® ২০১৬ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর