নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 5 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • রাজর্ষি ব্যনার্জী
  • দ্বিতীয়নাম
  • নিঃসঙ্গী
  • সাইয়িদ রফিকুল হক
  • মিঠুন বিশ্বাস

নতুন যাত্রী

  • চয়ন অর্কিড
  • ফজলে রাব্বী খান
  • হূমায়ুন কবির
  • রকিব খান
  • সজল আল সানভী
  • শহীদ আহমেদ
  • মো ইকরামুজ্জামান
  • মিজান
  • সঞ্জয় চক্রবর্তী
  • ডাঃ নেইল আকাশ

আপনি এখানে

ফরহাদ মজহারের “এবাদতনামা”ই কি হতে পারে বাঙালী মুমিনের কুরআন? পর্ব - ১


এক.
ভারতের একজন সাবেক মুসলমান পন্ডিত, জনাব ইবনে ওয়ারাক্ক একখানা গ্রন্থ সম্পাদনা করেছেন যার নাম বাংলায় করা যেতে পারে এভাবে – “কুরআন আসলে কি বলে”, ইংরাজিতে লেখা মূল পুস্তকটির নাম - “What Quran Really Says”। পুস্তকটির গোড়াতেই ইবনে ওয়ারাক্ক ব্যাখ্যা করেছেন ভাষা হিসাবে কুরআনে যে আরবী ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে তার বিশেষত্বের দিকটি। সেখানে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন কুরআনে যে আরবী ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে, সারা আরব জাহানের লোকেরা আজকাল আর সেই ভাষায় কথা বলেনা, লেখালেখি করেনা, সে ভাষা বোঝেনা এমন কি রেডিও টেলিভিশনে কিম্বা ভদ্রলোকেদের সভায় বা আমজনতার সমাবেশেও সেই ভাষায় আদানপ্রদান ঘটেনা। সেই ভাষাটিকে বলা হয়েছে “ধ্রুপদী আরবী ভাষা” । ভারতে জন্ম নেয়া কোনও শিশু এখন আর তাঁর মাতৃভাষা হিসাবে সংস্কৃত শেখেনা, বরং হয়তো সংস্কৃত থেকে উদ্ভুত কোনও একটি আঞ্চলিক ভাষা শেখে। কিন্তু ভারতে হিন্দু ধর্মের শ্লোকগুলো আজও সংস্কৃত ভাষায় উচ্চারিত হয়। তবে ভাগ্য ভালো ভারতে সাধারণ মানুষ আজ আর সংস্কৃত শ্লোকের ধার ধারেনা। সংস্কৃত ভাষা এখন পেশাদার পুরোহিতদের ব্যবসা আর একাডেমিক গবেষনার বিষয়ে পরিনত হয়েছে। ভারতে এখন যেমন সংস্কৃত ভাষা কেবল একাডেমিক ভাবেই শেখা যায় এবং একাডেমিক গবেষণাতেই ব্যবহৃত হয়, ধ্রুপদী আরবী ভাষার অবস্থাও তাই। আরব জাহানের মানুষেরা আরবী ভাষার এই ফর্মটা বা ঢং টা না জানে, না বোঝে না চর্চা করে। আর এই ভাষাতেই সারা দুনিয়ার মুসলমানেরা পাঠ করে যাচ্ছে তাঁদের ধর্মগ্রন্থ কুরআন। যার মাতৃভাষা স্প্যানিশ কিম্বা সারবিয়ান কিম্বা মালয়ালাম সবাই কুরআন পড়ছেন আরবী ভাষায়। বাঙালী মুসলমান কুরআন পড়ছেন, সালাত পড়ছেন আরবী ভাষায়।

কুরআনের ভাষা আরবী – এটা এক ধরনের ভাষার সাম্রাজ্যবাদ। বোকা মুসলমানদের উপরে সেই সময়ের আরব ব্যবসায়ী কাম রাজনীতিবিদ মুহাম্মদ এই সাম্রাজ্যবাদী জাদু চাপিয়ে দিয়ে গেছেন জনম জনম বয়ে বেড়ানোর জন্যে। মুহাম্মদ কুরানেরই একটি আয়াতের নামে বলে গেছেন কুরআন আল্লাহতালা আরবীতে নাজেল করেছেন যেনো সেই অঞ্চলের মানুষজন তা বুঝতে পারে, যেনো তাঁর পেয়ারা হাবিব তা সহজে বুঝতে পারেন। কিন্তু আল্লাহ্‌তালা সেই সময় জানতেননা যে আরবের ভুমির বাইরেও কি বিশাল চীন আর ভারতবর্ষ রয়েছে যেখানে কোনও পয়গম্বর আবির্ভূত হননাই এবং সে ভুমির ভাষা আরবী নয়। পরবর্তীতে ইসলাম যখন ভারতবর্ষ জয় করলো তখন ইসলামের আরো বহু সাম্রাজ্যবাদী উপাদানের সাথে এলো ভাষার সাম্রাজ্যবাদ। মানুষ যে ভাষাতেই কথা বলুক না কেনও, মানুষের মাতৃভাষা যেটাই হোক না কেনও, মানুষকে কুরআন পড়তে হবে আরবীতে, মানুষকে সালাত আদায় করতে হবে আরবীতে।

পরবর্তীতে কিছু ইসলামী আলেম খুব ধীরু-ভীরু মনে বলতে শুরু করলেন, কুরআনকে মানুষের মাতৃভাষাতেও পড়া যাবে। এমন কি সালাতও আদায় করা যাবে নিজ মাতৃভাষাতে। যদিও এই মতামত ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তিক অংশে কোনোদিনও পাত্তা পায়নি, কিন্তু মানুষ সত্যি সত্যি কুরআন বাংলায় পড়া শুরু করে দিলো। আর বিপত্তিটা বাধলো সেখানেই। বাংলায় কুরআন পাঠ বাঙালীর জন্যে খুব একটা স্বস্তির অভিজ্ঞতা নয়। আমি যখন বাংলা কুরআন পড়েছি, মানুষ হিসাবে বার বার আহত হয়েছি। আমার মানবিক বোধ আহত হয়েছে। আমি স্বস্তি পাইনি। আমি ভেবেছি, এই রকমের ভাষা, যেখানে প্রেম নেই, ভালোবাসার কথা নেই, স্নেহের কথা নেই, মানুষে মানুষে সম্পর্কের কথা নেই, প্রকৃতির সাথে মানুষের সম্পর্কের কথা নেই, প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসার কথা নেই, ভিন্ন প্রানীর সাথে মানুষের সম্পর্কের কথা নেই, ভালোবাসার কথা নেই, সেই রকমের একটি গ্রন্থ কি করে ধর্মগ্রন্থ হয়ে ওঠে? আমি ভেবেছি, কুরআনের ভাষা কি আরো প্রেমময় হতে পারতো? আরো বিষদ ভালোবাসার ভাষা হয়ে উঠতে পারতো? কুরআনের ভাষা কি হিংসা বিহীন, প্রলোভন বিহীন, ভয়ভীতি বিহীন হতে পারতো?

দুই.
জি, আমি বলছি কবি ফরহাদ মজহার এর কাব্যগ্রন্থ “এবাদতনামা”র কথা। “এবাদতনামা” পড়েছিলাম প্রায় বারো তেরো বছর আগে। মুগ্ধ হয়েছিলাম এক দারুন অভিনব ভাষায়, অভিনব প্রকাশ, কাব্য এবং ছন্দে। এটা ঠিক এবাদতনামা প্রেমিকের ভাষা, ফরহাদ মজহার যাকে বলছেন “আশেক” এর ভাষা প্রেমের ভাষা ফরহাদ মজহার যাকে বলেছেন “এশক” এর ভাষা । সাম্প্রতিক সময়ে এবাদতনামা আবার পড়লাম। মনযোগ দিয়ে, আগেরবারের পাঠের তুলনায় এবারের পাঠ অনেক পরিনত, ধীর – স্থির। নিজের কাছেই অনেকখানি সময় নিয়েছি এবার এবাদতনামা পড়ার সময়। তাই এই আপাত অদ্ভুত জিজ্ঞাসাটি মাথায় এলো। “এবাদতনামা্র ভাষা কি হয়ে উঠতে পারে মুসলমানের ধর্ম গ্রন্থ কুরআনের ভাষা? কিম্বা আরো সরাসরি বললে, প্রশ্নটা হতে পারে – ‘এবাদতনামা”ই কি হয়ে উঠতে পারে বাঙালী ভাষাভাষী অঞ্চলে ইসলামের ধর্মগ্রন্থ? বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলে ফরহাদ মজহার রচিত “এবাদতনামা”ই কি হয়ে উঠতে পারেনা কুরআনের বিকল্প? না তা হতে পারেনা। কারণ, এবাদতনামা ফরহাদ মজহারের সৃষ্টি, এটা আকাশ থেকে নাজেল হয়নি। এর প্রতিটি অক্ষর, শব্দ, বাক্য, যতিচিহ্ন, ছন্দ সবকিছু কবি ফরহাদ মজহারের সৃষ্টি। এটা নাজেল হওয়া গ্রন্থ নয়। তাই এটা ইসলামের ধর্মগ্রন্থ হতে পারেনা। এবাদতনামা বাংলা ভাষায় রচিত, একজন আশেকের দিলখোলা প্রেমের ভাষায় রচিত। কিন্তু ইসলামের ধর্মগ্রন্থ হতে হলে তাকে হতে হবে আরবী ভাষায় রচিত আর তাকে নাজেল হতে হবে আরবের কোনও ভুখন্ডে। আরবেই আছে ইসলামী দৃষ্টিতে সারা জাহানের মালিক “আল্লাহ”র ঘর। সুতরাং ঘরের কাছাকাছিই কোথাও আল্লাহ তাঁর প্রিয় গ্রন্থটি নাজেল করবেন, এটাই তো স্বাভাবিক। ইসলামের ধর্মগ্রন্থ হতে হলে তাঁকে নাজেল হতে হবে মুহাম্মদের মতো একজন ব্যবসায়ী কাম রাজনীতিবিদের উপরে। ফরহাদ মজহার এই দুয়ের কোনোটাই নন। তিনি নিরেট কবি, মানুষ কে ভালোবাসা কবি, গাছ – লতা পাতা – শস্যের প্রতি ভালোবাসায় ভরা একজন রক্তমাংসের মানুষ, একজন শহুরে উচ্চশিক্ষিত কিন্তু বাউল মনের মানুষ। তাই ফরহাদ মজহারের “এবাদতনামা” হয়ে উঠতে পারেনা কুরআনের বিকল্প। এবাদতনামা পড়ে দেখুন, এতো অপূর্ব প্রেমময় ভাষায় স্রষ্টার কাছে নিবেদনের কোনও নমুনা বাংলা ভাষায় নেই। এতো অপূর্ব মমতায় নিজের আকুতি প্রকাশের নমুনা খুব বেশী নেই। স্রষ্টার প্রতি নিজের নিবেদনের কথা বলা অথচ দারুন কাব্যিক, মাপা ছন্দে বাঁধা পদ্য। যেকেউ স্বীকার করবেন এটাই হতে পারতো ইসলামের ধর্মগ্রন্থ, অন্তত বাঙালী মুসলমানের কুরআন।

তিন.
ইসলামের ধর্মগ্রন্থ কুরআনের সকল আয়াতকে যদি মোটাদাগে শ্রেনীবদ্ধ করা হয়, তাহলে মোট ছয় ধরনের আয়াত বা বয়ান পাওয়া যাবে (এই শ্রেনীবদ্ধকরণ টি আমার নিজের বোঝাপড়া, যেকোনো পাঠক এর সাথে দ্বিমত করতে পারেন।)। কুরআনের এই ছয় ধরনের বয়ান হচ্ছে এই রকমের –

১। আল্লাহর প্রশংসাসুচক – যেখানে আল্লাহ্‌ নিজেই নিজের প্রশংসা করে চলেছেন। তিনি সবজান্তা, তিনিই মালিক, তিনিই সবকিছু সৃষ্টি করেছেন, তিনিই সবকিছু সুন্দরের স্রষ্টা, তিনি সকল কে খেতে দেন, তিনিই এই দুনিয়া সকল শস্য ফলান, বৃষ্টি দেন ইত্যাদি ইত্যাদি।

২। আল্লাহর ক্ষমতার কথা – এই ধরনের আয়াতগুলোতে আল্লাহ্‌ নিজেই বিবরণ দিচ্ছেন তিনি কতটা ক্ষমতাধর, তিনি কিভাবে এই বিশাল আকাশকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে আমাদের মাথার উপরে ঝুলিয়ে রেখেছেন কোনও রকমের কলাম বা স্তম্ভ এর সাহায্য ছাড়াই।

৩। আল্লাহর বাধ্যগত থাকার পুরস্কারের প্রলোভন – কুরআনে আল্লাহ্‌তায়ালা বারবার পই পই করে বলছেন মানুষকে তাঁর বাধ্যগত প্রানী হিসাবে থাকার জন্যে। শুধু বলেই ক্ষান্ত হননাই তিনি, বরং মানুষকে নানান ধরনের প্রলোভন দেখাচ্ছেন, তিনি নিজেই বলছেন আল্লাহর বাধ্যগত থাকার পুরস্কার হিসাবে কি কি রয়েছে আমাদের সবার জন্যে।

৪। আল্লাহর অবাধ্যতার শাস্তি – এই ধরনের বয়ানে আল্লাহ্‌ (কিম্বা মতান্তরে তাঁর দোস্ত মুহাম্মদ) ব্যাখ্যা করছেন, দাবী করছেন, যারা আল্লাহর কথা শুনবেনা, তাঁর পরামর্শ মাফিক জীবন যাপন করবেনা, তাদের জন্যে তিনি কি কি শাস্তি রেখেছেন।

৫। আল্লাহর অবাধ্যতার উদাহরন হিসাবে পূর্ববর্তী জাতিসমূহের পরিনতির কথা - এই ধরনের আয়াতে খোদ আল্লাহ্‌তায়ালা মানব সমাজ কে ভয় দেখাচ্ছেন, তিনি অবাধ্য হবার জন্যে বিভিন্ন সময়ে মানব সম্প্রদায় কে কি কি ধরনের শাস্তি দিয়েছিলেন। কাউকে পানিতে ডুবিয়ে মেরেছিলেন আবার কোনও কোনও জাতিকে হয়তো আগুনে পুড়িয়ে।

৬। মানুষের সামাজিক জীবনের জন্যে প্রয়োজনীয় নিয়ম রীতির ইংগিত – যেমন কাকে কাকে বিয়ে করা যাবে, স্ত্রী তালাকের নিয়ম, অবাধ্য স্ত্রীকে কিভাবে শাসন করতে হবে কিম্বা জমি জমার ভাগবাটোয়ারা কিভাবে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি।

কিন্তু ফরহাদ মজহারের "এবাদতনামা"য় কোনও হুমকি ধমকি নেই, হত্যার হুমকি নেই, অনন্তকাল শাস্তির হুমকি নেই, অনন্তকাল তন্বী উদ্ভিন্ন-যৌবনা নারীর সাথে যৌনতার প্রলোভন নেই, আঙ্গুর বেদানা খোরমা খেজুর দিয়ে অনন্তকাল লাঞ্চ বা ডিনারের প্রলোভন নেই। এবাদতনামায় নেই কিভাবে দাসী সম্ভোগ করা যায়, কাকে বিয়ে করা যাবে আর কাকে করা যাবেনা। এবাদতনামায় নেই কিভাবে অসভ্য – অবাধ্য স্ত্রীকে পেটানো যাবে। এবাদতনামায় আছে ভক্তের নিবেদন, মিনতি, প্রেম, ভক্তি, অভিমান, প্রশ্ন। এই সকল অনুভুতির প্রকাশ ঘটেছে “মাবুদ” কে পরম স্বীকার করে নিয়েই। এবাদতনামা হচ্ছে মাবুদের সাথে তাঁর আশেকের প্রেম – বিরহ – অভিমান বিষয়ক গ্রন্থ, দিনশেষে আশেক যেখানে তাঁর মাবুদের কাছেই ফিরে যান, দিনশেষে প্রেমিক যেভাবে তাঁর প্রেমের কাছেই নিজেকে সমর্পণ করেন। কুরআন যারা বাংলায় পড়েছেন তাঁরা জানেন, কি কদর্য এর ভাষা, কি ভয়ংকর এর বক্তব্য। অদ্ভুত বিশাল কায়ার কেউ একজন সাত আসমানের উপরে একটি বিরাট তখত এর উপরে “বসে” রাজত্ব করছেন সারা দুনিয়ার তাবৎ মানুষের উপরে। পাতায় পাতায় মনে করিয়ে দিচ্ছেন, তিনিই সবচাইতে শক্তিমান, তিনিই সবচাইতে ক্ষমতাবান, তিনিই পারেন সারা দুনিয়াকে এক লহমায় লন্ডভন্ড করে দিতে। সেখানে দেখুন এবাদতনামায় ফরহাদ মজহার কি লিখেছেন –

ভালো লাগে, ভালোবাসি। শিশিরের শব্দে জেগে উঠি
ঘাসের ওপর দিয়ে ঘাস হয়ে ঘাসেরই ফড়িং
হেঁটে যাচ্ছি দৌড়ে যাচ্ছি সচ্চিদানন্দ দিচ্ছি ঝাঁপ
কিন্তু পড়ি তোমারি কোলের মধ্যে – সর্বত্রই তুমি।

(নামাতীত, এবাদতনামা ৯৮)

এখানে ভক্ত, প্রেমিক নিজের আকুতির কথা বলছেন। ভয়ে নয়, ভালোবাসায়। হুমকিতে নয় ভালোলাগা থেকে ভক্ত ঝাঁপ দিচ্ছেন সুন্দরের দিকে আর সেখানেই তিনি আবিষ্কার করছেন তাঁর পরম কে। এই রকমের একটি বাক্য সারা কুরআন জুড়ে দেখা যাবেনা। এর বিপরীতে কুরআন ভর্তি রয়েছে, কোনটা হারাম আর কোনটা হালাল সেই বিবরণে। এর বিপরীতে কুরআন ঠাসা আছে আল্লাহর অবাধ্য মানব সন্তানদের কি করুণ শাস্তি অপেক্ষা করছে পরকালে সেই বিবরণ দিয়ে। কুরআনে বর্ণিত হয়েছে আল্লাহই এই দুনিয়া চালান, মুসলিম মন জানেন, আল্লাহর ইশারা ইঙ্গিত ব্যতীত এই দুনিয়ার একটি গাছের পাতাও নড়েনা, একটি ধুলিকনাও একস্থান থেকে অন্যস্থানে স্থানান্তরিত হয়না। অথচ এই দুনিয়ায় করা বান্দার অপরাধের দায়টুকু কেবলই বান্দার, আল্লাহর নয়। তিনি নিজেই বান্দাকে চালান আবার তিনি নিজেই বান্দার উপরে অভিযোগ আনেন অপরাধের, অবাধ্যতার। তারপরে নিজেই আসীন হন বিচারকের ভুমিকায়। কঠিন সে বিচার, অনন্তকাল আগুনের পোড়ার শাস্তি প্রদান করেন তারই শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি আশরাফুল মখলুকাত মানুষকে। তাইতো ফরহাদ মজহার লিখেছেন “জন্মেই হাজতি আমি”। অর্থাৎ মানুষের জন্মই তাঁর পাপী জীবনের শুরু, যার জন্যে অপেক্ষা করছে বিচার আর শাস্তি। এই বিচারে নালিশকারী হচ্ছেন আল্লাহ্‌ আবার বিচারপতিও আল্লাহ্‌। নালিশকারী আর বিচারক যদি একই সত্ত্বা হন সেই বিচারটি যে ন্যায় বিচার নাও হতে পারে, সেই কুন্ঠা সেই যুক্তি সারা কুরআন ঘেঁটে একটি বাক্যতেও পাওয়া যাবেনা। এই ধরনের স্ববিরোধীতায় ভরপুর মুসলমানের ধর্ম গ্রন্থ কুরআন। এবাদতনামায় এই স্ববিরোধীতাঁর প্রতি প্রশ্ন আছে, কিন্তু তা আছে নিবেদনের ঢঙে, অবিশ্বাসীর স্বরে নয়। এবাদতনামা কবির লেখা তাই তাতে স্ববিরোধীতা নেই, আছে প্রশ্ন, কৌতুহল, আশকারা, অভিমান।

দয়াল নামটি ছাড়া অন্য নাম শিখিনাই। শুনি
তুমিই প্রভুর প্রভু। রোজ হাশরের ময়দানে
তুমিই সুপ্রিম কোর্ট। হতে পারে তুমি নিজে বাদি
নিজেই তো খেলাচ্ছলে বিবাদি সেজেছ পরক্ষনে?

তোমার মামলা দেখি নিজের বিরুদ্ধে নিজে, তুমি
নিজেই নালিশ করো, সালিশেও তুমি। রে নিষ্ঠুর
হও ফরিয়াদি কিন্তু বেশরম নিজেরই এজলাসে
কেন নিজে চিফ জাস্টিস হও ওগো আল্লা-হুজুর?

তোমার ইত্যাদি লীলা নয়া বঙ্গে নিরীক্ষন করে
কাকে দোষ দেব বলো? মানুষেরে কেন দোষী করো?
নিজের আনন্দে তুমি নিজে প্রভু খেলিতেছ খেলা
বেলা গেলো তথাপিও আদালতে ছুটি তো হোল না !

জন্মেই হাজতি আমি, আসামির কেমন বিচার?
দয়াল নামটি ছাড়া অন্য নামে পাবে না নিস্তার।

(জন্মেই হাজতি আমি, এবাদতনামা ৯৫)

চার.
সমগ্র কুরআন জুড়ে রয়েছে প্রলোভন আর ভীতি। আল্লাহর বাধ্যগত থাকার পুরস্কারের প্রলোভন আর আল্লাহর অবাধ্য হবার শাস্তির ভয়। কিন্তু আগ্রহউদ্দীপক হচ্ছে, এই প্রলোভন ও শাস্তির স্বরূপগুলো সবই পার্থিব। পৃথিবীতে (কিম্বা আরবভুমি গুলোতে) খাদ্য ও যৌনতা হচ্ছে মানুষের সবচাইতে কাম্য ব্যক্তিগত চাওয়া। পার্থিব ভোগবাদী মানুষের কাছে প্রকৃতির সবুজ সৌন্দর্য কিম্বা ঘাস ফড়িঙ্গের লাফিয়ে চলা জীবনের চাইতেও অধিক কাম্য সুস্বাদু খাবার, ফলফলারি, পানীয় আর সুন্দরী অনিঃশেষ যৌবনা নারীসম্ভোগ। কিন্তু কোনও প্রলোভন ছাড়াও মানুষ প্রেমিক হতে পারে। কোনও প্রতিশ্রুতি কিম্বা শাস্তির ভয় ছাড়াও মানুষ নিজেকে নিবেদিত করতে পারে, সম্পরপিত করতে পারে মুগ্ধ পতঙ্গের মতো, ইসলাম নামের ধর্মটিতে তাঁর কোনও ইঙ্গিত নেই। কুরআন ধরেই নেয়, মানুষকে বাধ্য রাখার কেবলই দুইটি পথ – এক. প্রলুব্ধ করা, খাদ্য দিয়ে, নারী দিয়ে, অনন্ত আরাম আয়েশের বিলাসের প্রতিশ্রুতি দিয়ে। তাতে কাজ না হলে, দুই. ভয় দেখিয়ে, প্রচন্ড গনগনে উত্তপ্ত সূর্যটাকে মাথার ঠিক উপরে স্থাপন করে মাথার ঘিলু সব বের করে দেবার ভয় দেখিয়ে। কিন্তু ফরহাদ মজহার ভিন্ন রকম আশেকের কথা বলেন। যে আশেক কোনও পাওয়ার আশায় তাঁর প্রেম নিবেদন করেন না। বরং কোনও হেতু, যুক্তির তোয়াক্কা না করেই তিনি নিবেদিত হন। দেখুন তিনি লিখছেন –

যে প্রেমের হেতু নাই, নাই কোনও কার্যকারণ
যে প্রেমে বেহেশত নাই, কিম্বা নাই নরক দোজখ
যে প্রেমে শরিয়া নাই, কিম্বা নাই গুপ্ত মারেফত
সেই প্রেম খুঁজিতেছি। সে এশেকে উন্মাদ হয়েছি।

রোজ হাশরের গল্প শুনিতেছি, শুনি কেয়ামত
আসিতেছে। সৃষ্টি আদ্যপান্ত নাকি ফানা হয়ে যাবে
যে প্রেমে ধ্বংস নাই, সৃষ্টি ও স্রষ্টা কিছু নাই
সে প্রেম সন্ধান করে আমি আজ পাগল হয়েছি।

(নিহেতু প্রেমের গল্প, এবাদতনামা ৯২)

কুরআনে যে রোজহাসরের উল্লেখ আছে তা কোনও “গল্প” নয়, তা নিয়তি, অবধারিত নিয়তি। কিয়ামত আসার বিষয়টি কোনও “শুনি” বা শোনার বিষয় নয়, এটাও অবধারিত এবং সেদিন সারা দুনিয়া ফানা হয়ে যাবে তাতেও “নাকি” শব্দের কোনও সুযোগ নেই। হ্যাঁ কুরআনের বয়ান অনুযায়ী রোজহাশর আর পৃথিবীর ধ্বংস নিয়ে কোনও সংশয়ের সুযোগ নেই । কিয়ামতের দিনকে নিয়ে সংশয় প্রকাশ করা কাফেরের লক্ষণ। এসব বিষয়ে কুরআন বড় একরোখা, স্বৈরশাসকের মতো আর আল্লাহ্‌ (কিম্বা মতান্তরে তাঁর দোস্ত মুহাম্মদ) হচ্ছেন সেই স্বৈরশাসনের উর্দি পড়া স্বৈরশাসক। তাই এই স্বৈরশাসক তাঁর প্রজাদের ধ্বংসের ভয় দেখিয়ে তাদের নিবেদন হাসিল করতে চান। আর এর বিপরীতে মজহার খুঁজে চলেছেন সেই প্রেম যে প্রেমে ধ্বংস নাই, সৃষ্টি নাই স্রষ্টা নাই। যে প্রেমে বেহেশতের প্রলোভন নেই দোজখের ভীতি নেই। আর যাই হোক, প্রবল নিরীক্ষক পাঠকও কুরআনের সকল পাতা ঘেঁটে ধ্বংস বিহীন প্রেমের, প্রলোভন বিহীন নিবেদনের একটি ইঙ্গিতও খুঁজে বের করতে পারবেন না। এখানেই কুরআনের উপরে এবাদতনামার শ্রেষ্ঠত্ব।

এই নিহেতু প্রেমের উপরেই আস্থা ফরহাদ মজহারের। অর্থাৎ প্রেমিক কোনও কিছুর বিনিময়ে প্রেমে পড়েন না, প্রেমিকে প্রেমে পড়বার জন্যে, নিজেকে সমর্পণের জন্যে কোনও কারণ দরকার পড়েনা। তাই মুসলমানের আল্লাহ্‌ (কিম্বা মতান্তরে তাঁর দোস্ত মুহাম্মদ) তাঁর বান্দাদের পরকালের যে নানান প্রলোভন ও ভীতি প্রদর্শন করেন, তাঁর সকলই অর্থহীন। প্রেমিকের কাছে না আছে প্রলোভনের কোনও ফায়দা, না আছে ভীতির। তাইতো মজহার বলছেন প্রেমিকের কাছে প্রেমটাই প্রধান, প্রেমিকের প্রেমবোধটাই প্রধান, তা এপারে কিম্বা ওপারে যেখানেই হোক না কেনো। দেখুন মজহার কি দারুন ভাবে লিখছেন –

এপারে ওপারে আমি নজর রেখেছি, কিছু নেই
এ-পিঠ ও-পিঠ আমি ভাজা মাছ উল্টিয়ে খেয়েছি,
সকলি সমান ভোজ্য। আখেরে সকলি হবে ফানা
দুনিয়া বা আখেরাতে কি ফায়দা আমার তবে প্রভু?

কেবলই এশেকে বাঁচি। নিহেতু এ প্রেমের তুলনা
কোথা পাবো? যদি পারো দাসীরে পোড়াও প্রেমাগুনে।

(নিহেতু প্রেম, এবাদতনামা ৮২)

পাঁচ.
এবাদতনামায় যে স্রষ্টার কথা উল্লেখ আছে তিনি সম্ভবত মুসলমানের আল্লাহ্‌ নন। তিনি হচ্ছে্ন আস্তিক মানুষের স্রষ্টা, যে স্রষ্টাকে আস্তিক মানুষ তাঁর মস্তিষ্কে কিম্বা তার প্রেমিক মস্তিষ্কে তৈরী করেন। অথবা আরো ভালো করে বলা যেতে পারে, এই স্রষ্টা প্রেমিক মানুষের হৃদপিণ্ডের সৃষ্টি। এই স্রষ্টার কোনও ধর্ম নেই, তাঁর প্রেরিত কোনও ধর্মগ্রন্থও নেই তাই। তাইতো, এই স্রষ্টা একই সাথে হিন্দু কিম্বা মুসলমানেরও সৃষ্টিকর্তা। দেখুন মজহার লিখছেন –

কী পার্থক্য মোমিনের? হিন্দু কিম্বা মুসলমান
যে তোমার প্রেমে পরে সাকারে কি নিরাকারে তার
কী ছাতুটি এসে যায় ! সর্বত্রই তুমি। ফুলে ফুলে
মেঘ জলে হিন্দু হও। আমি হিন্দু ঘোর পৌত্তলিক !

যদি তুমি প্রেম হও তবে ঠিক আমার বাগানে
জানি তুমি ফুটে আছো। আমি দেখো পূজায় বসেছি।

(পূজায় বসেছি, এবাদতনামা ৮৪)

মোমিন অর্থ হচ্ছে যিনি স্রষ্টার প্রতি একনিষ্ঠ। তাইতো ফরহাদ মজহারের কাছে একনিষ্ঠ মোমিনের মাঝে কোনও ভেদ নেই, সে হিন্দু হোক বা মুসলিম। সত্যিই তো, কি পার্থক্য রয়েছে দুজন আস্তিক ও ধার্মিক মানুষের মাঝে? কি পার্থক্য দুজন মানুষের মাঝে যারা দুজনেই তাদের স্রষ্টার প্রতি নিবেদিত, প্রেমে ও প্রানে? হোক সে ঈশ্বর হিন্দুর কাছে সাকার কিম্বা মুসলমানের নিরাকার আল্লাহ্‌ ! মজহার এখানে নিজেকে হিন্দু ঘোর পৌত্তলিক বলছেন আক্ষরিক অর্থে নয়, বরং তিনি ঘুচিয়ে দিচ্ছেন নিরাকার সাধক ও পৌত্তলিকের বিবাদ, যে বিবাদ কুরআনের বেশকিছু ছত্রে বর্ণিত আছে। প্রকৃত নিবেদিত প্রেমিকের কাছে প্রেমটাই প্রধান, তাঁর নিবেদনটাই প্রধান, সে ঘোর পৌত্তলিক বা মুসলমানের মতো নিরাকার সাধক যেই হোকনা কেনো। এখানেই কুরআনের ভাষার উপরে এবাদতনামার ভাষার শ্রেষ্ঠত্ব। কুরআন সারা মানবসমাজ কে দুইভাগে ভাগ করে, একদিকে যারা নিরাকার আল্লাহর বন্দেগী করে আর আরেকদিকে যা তা করেনা। আর মজহার জগতের সকল মানুষকে এক কাতারে নিয়ে আসছেন, শুধুমাত্র বন্দেগী করার ভিত্তিতে, কার বন্দেগী কে কিভাবে করছেন সেই সকল প্রশ্নকে হঠিয়ে দিয়ে। কুরআনে এই রকমের আপাত সমতার বানী প্রায় বিরল। কুরআন মানুষকে বিভক্ত করে মুমিন আরে কাফের এই দুই ভাগে। তারপরে এই মুমিন আর কাফেরের মাঝে ছড়িয়ে দেয় অনন্ত জিহাদ।যে জিহাদের শেষ হয় কেবলমাত্র কাফেরের পরাজয় বা মৃত্যুর মধ্য দিয়ে অথবা তওবা করার মধ্য দিয়ে। এবাদতনামায় এই রকমের অনন্ত জিহাদের কথা নেই, এবাদতনামায় কাফেরের হত্যার কথা নেই। এখানেই কুরআনের মতো একটি হিংসা বিদ্বেষ ভরা গ্রন্থের বিপরীতে ফরহাদ মজহারের "এবাদতনামা" দারুন প্রেমময় মানবিক দলিল ।

আগ্রহী হলে পরের পর্বটি পড়ে দেখতে পারেন

এখান থেকে

(চলবে)

Comments

রাজেশ পাল এর ছবি
 

পুরো সিরিজটাই পড়ে যাচ্ছি সারোয়ার ভাই। এভাবে আর কিছুদিন চললে আমার পরমপূজ্য দাদার গুরুমশাই লুঙ্গি ছেড়ে প্যান্ট পড়া শুরু করবেন কনফার্ম।
carry on. Best of luck............

 
পথচারী এর ছবি
 

পড়লাম।

 

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

গোলাম সারওয়ার
গোলাম সারওয়ার এর ছবি
Offline
Last seen: 1 week 2 দিন ago
Joined: শনিবার, মার্চ 23, 2013 - 4:42পূর্বাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

ফেসবুকে ইস্টিশন

কপিরাইট © ইস্টিশন ব্লগ ® ২০১৮ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর