নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 3 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • নুর নবী দুলাল
  • লিটমাইসোলজিক
  • কিন্তু

নতুন যাত্রী

  • আমজনতা আমজনতা
  • কুমকুম কুল
  • কথা নীল
  • নীল পত্র
  • দুর্জয় দাশ গুপ্ত
  • ফিরোজ মাহমুদ
  • মানিরুজ্জামান
  • সুবর্না ব্যানার্জী
  • রুম্মান তার্শফিক
  • মুফতি বিশ্বাস মন্ডল

আপনি এখানে

প্রবাসের অখ্যাত গল্প-৯


(গল্পের বাকী অংশ গুলো পড়তে ভুলবেন না যেন)

প্রচণ্ড শীতের সময়ে উত্তর মেরুতে এসে কেমন একটা ঘোরের মাঝে পড়ে যাই, কখন যে রাত আর কখন যে দুপুর ঘড়ি না থাকলে তার বোঝার কোনই উপায় নাই, দিনের আলো বলতে দুপুরের মাঝখানটায় সন্ধ্যের মত একটু আলো হয়তোবা দেখা যায় তাও আবার খুবই অল্প সময়ের জন্যে, রাত আর দিনের আলোর পার্থক্য বোঝার উপায় থাকে না।

সুইডেনের উত্তরের শহরে এসে পৌঁছেই একটা টানা ঘুম দিয়ে নিলাম দুপুর পর্যন্ত | ঘুম থেকে উঠেই আমাদের তৈরি হয়ে নিতে হচ্ছে, কিন্তু তার আগেই দোকানে যাবার জন্যে তৈরি হচ্ছি গরম কাপড় হাত মোজা আর টুপি পরার পর আয়নায় নিজেকে দেখে আমি যেন নিজেই একটু ভরকে গেলাম, মনে হচ্ছে মহাকাশ যানের নভোচারী মর্তে এসে একেবারেই ধরাশায়ী | যে বান্ধবীর বাসায় আমরা বেড়াতে এসেছি তাকে সাথে নিয়েই দোকানের পথে রওনা দিলাম, কিন্তু কি আশ্চর্য এখানে নাকি বরফের উপর দিয়ে পায়ে হেটে কেউই কদাচিৎ বাইরে যায় না, আমার সাথে করে টুল জাতিও এক অদ্ভুত যান যার পায়া গুলো নৌকার মত বাঁকানো লোহার দুটো পাতের উপর বসিয়ে দেয়া আছে টুলের একদিকে একটা হাতল লাগানো আছে যেটা ধরে এর নিয়ন্ত্রণ রক্ষা করে, এক পা থাকে বাঁকানো পাতের উপর, অন্য পা দিয়ে বরফ ঢাকা রাস্তার উপর ধাক্কা দিতেই টুল জাতিও যানটি তরতর করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে, আসে পাশে দু একজনকে দেখছি তারা সবাই এই অদ্ভুত যানের উপর ভোর করে বরফের রাস্তার উপর দিয়ে যে যার মত কাজে চলে যাচ্ছে, খুবই অবাক করার বিষয় হলেও, আসলে শীতকালে বরফ ঢাকা সুইডেনের উত্তর মেরুতে সবার ঘরে ঘরেই এই ধরনের বাহন দু তিনটা করেই রাখা থাকে, বাজার ঘাট বা কাছাকাছি যাওয়া আসার জন্যে | বেশ ভালই লাগছে তবে কিছুটা দূর যেতেই অনুভব করছি আমার নাকের ডগাটা হয়তো রাস্তায় কোথাও ফেলে এসেছি কারণ নাকে হাত দিয়েও নাকের অস্তিত্ব খুঁজে পাচ্ছি না, মিনিট দশেক পর কানের অস্তিত্ব অনুভব করতে পারছিনা, একটি ছোট দোকানের কাছে এসে সেই অদ্ভুত আকৃতির যান স্পার্কিং সাইকেলটি জায়গা মতো রেখে দোকানে ঢুকে গেলাম, দোকান থেকে ফিরেই সারাদিন বাইরে মাছ ধরে কাটাবো, তারপর কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেবার পর তিনটা স্নো স্কুটার নিয়ে সবাই তুষারে ঢাকা গহীন জঙ্গলের দিকে ঢুকে যাবো | দোকানে ঢুকেই কেমন যেন একটা শুটকি শুটকি গন্ধ পাচ্ছি, আহা লইট্টা শুটকি খাইনা আজ কতদিন, কড়া ঝালের লইট্টা শুটকির তরকারী এখনও মুখে লেগে আছে, খানিক পর আমার নাক আর কান দুটোই ফেরত পেলাম কারণ প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় নাক আর কানের লতিতে বোধ শক্তি কিছুই ছিলনা, দোকানের ভেতর একটু গরমে উপকার হলো | বান্ধবী টুকটাক এটা সেটা ঝুড়িতে ভরে নিচ্ছে আর আমিও তার পিছু পিছু হেটে যাচ্ছি একটা সেলফের কাছে আসতেই সেই শুটকি মাছের গন্ধটা একটু তীব্র ভাবেই নাকে আসতে থাকলো, কিন্তু একি এ যে মাছ না পুরো আস্ত একটা শুকনো কাঁচা মাংসের টুকার ঝুড়িতে উঠিয়ে নিতেই আমি প্রায় চীৎকার করেই বান্ধবীকে বললাম এই পচা মাংসের গন্ধ কি তোমার নাকে আসছে না, আমাদেরকে কি এই পচা মাংস খাইয়ে মেরে ফেলতে চাও নাকি ? বান্ধবী একটু মুচকি হেসে বুঝিয়ে দিল এটা অনেকদিনের পুরনো লবণাক্ত শুকনো হরিণের মাংস যা কিনা অত্র এলাকার মানুষের খুবই প্রিয় ও দামী খাবার, মাংস যতই পুরনো হবে তা ততই সুস্বাদু আর দামও বেশী | পশ্চিমা সভ্যতার সব কিছুই মেনে নেয়া যায়, নিচ্ছিও বটে কিন্তু তাই বলে এই কাঁচা মাংস খাওয়ার মত বর্বরতা অন্তত আমার দ্বারা পোষাবে না | বান্ধবীকে একটু বিরক্ত হয়েই জিজ্ঞাস করলাম- তা হঠাৎ করে এই কাঁচা মাংস কেনার পরিকল্পনা কেন , বান্ধবী হেসেই উত্তর দিল – “আমার যখন মাছ ধরতে যাবো তখন এই মাংস চাকু দিয়ে কুচিকুচি করে কেটে রুটির উপরে দিয়ে খাবো, সাথে ফ্লাক্সের কফি ও জুস তো থাকবেই” | মনে মনে স্থির করে ফেলেছি, আমাকে তোমরা যেমন খুশী তেমন সাজে সাজতে পারবো না, নাচতে হয় তোমারা নিজেরাই খেমটা নাচ দিয়ে মাছ ধরতে যেও, আমি তোমাদের সাথে নেই, আর এই বরফের রাজ্যে যেখানে পানির রেশ মাত্র নেই সেখানে কিনা তোমার মাছ ধরার প্ল্যান করেছ, নির্ঘাত এর পেছনে কোন রহস্য আছে, তোমরা এখন আমাকে বাংলাদেশী এক হাঁদারাম পেয়ে যা খুশী তাই বুঝিয়ে দিচ্ছো | মুখ ফুটে কথা গুলো বান্ধবীকে না বললেও সে কিন্তু মনে মনে ঠিকই বুঝতে পেরেছে যে এই কাঁচা মাংস বিষয়টা আমার মনে সন্দেহের উদ্রেক ঘটিয়েছে | কথা না বাড়িয়ে তাড়াহুড়া করেই বাসায় ফিরে এসে গায়ে আরও বেশী করে গরম কাপড় পড়ে নিলাম, মাথার টুপিটা কান পর্যন্ত ঢেকে নিয়ে আপাতত ভাবছি নাকটা কি ভাবে সামাল দেবো | কাঁধের ব্যাগে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আর হালকা খাবার গুছিয়ে তিনটি স্নো স্কুটারে আমারা ছয়জন চেপে বসলাম যদিও সাথে মাছ ধরার ছিপ, কিন্তু মাছটা ধরবো কোথায় চিন্তাটা মাথা থকে ঝেড়ে ফেলতে পারছি না |

পথ ঘাট মাঠ জঙ্গল পেরিয়ে আমাদের যাত্রা শুরু হলো লুলিও থেকে বোডেন পর্যন্ত একটা লম্বা পথ, আমাদের স্কুটার বরফে ঢাকা পথ ধরে ছুটে চলেছে, আকাশে সূর্য কখনোই ওঠে না তবে বাইরে খানিক আলো দেখতে পাওয়া যাচ্ছে বটে, এই আলো হয়তো বেশিক্ষণ থাকছে না তাই স্কুটারের গতি বাড়িয়ে দিয়ে প্রচণ্ড বেগে ছুটে চলেছি আর আমার নাকের ডগাতে সেই আগের মতই কোন বোধ খুঁজে পাচ্ছিনা, মনে হচ্ছে নাকের ডগাটা হারিয়ে ফেলেছি | চোখে ডুবুরীদের মত চশমা লাগানো তবে ভাগ্যিস গায়ে সামান্য পরিমাণ ঠাণ্ডা অনুভূত হচ্ছেনা বলে রক্ষে | আমরা একটা খোলা মাঠের মত তুষারে ঢাকা জায়গায় এসে দাড়িয়ে গেলাম আর এখানেই আমাদের মাছ ধারার আয়োজন, মাথায় কিছুতেই ঢুকছে না এই শক্ত বরফে ঢাকা খোলা জায়গাটায় লেকে পানির বিন্দু মাত্র বংশ খুঁজে পাচ্ছিনা | স্কুটার চালিয়ে খোলা জায়গাটার ঠিক মাঝ খানটায় চলে আসি, আমাদের মাঝে একজন স্কুটারের পেছনে ঝুলানো ব্যাগ থেকে একটা লম্বা আকৃতির যন্ত্রের মাথায় আর একটা খাঁজ কাটা যন্ত্র জুড়ে দিল, একটা হাতলে লাগানো সুতা ধরে জোরে টান দিতেই যন্ত্রটা ভটভট শব্দে চালু হয়ে গেল | যন্ত্রটার সামনের দিকটার সেই বিশালাকায় ড্রিল দিয়ে পুরো বরফের মাঝে দুচারটা ফুটো করে দিতেই লেকের নীচে কাঁচের মত স্বচ্ছ পানির দেখা পাওয়া যাচ্ছে, এতটাই স্বচ্ছ পানি যেন লেকের নীচে মাটি পর্যন্ত টর্চের আলো ফেলে দেখা যাচ্ছে | দিনের হালকা আলো হয়তো আর বেশিক্ষণ থাকছে না কিছুক্ষণ পর আবার সেই অন্ধকার নেমে আসবে, আর এই অল্প সময়ের মাঝেই যে যার ব্যাগ খুলে বলগা হরিণের পশম লাগানো চামড়া বরফের উপর ফেলে তার উপর শুয়ে ফুটো দিতে বড়শি ফেলতেই টপটপ করে প্রতি জনেই দু’চারটা করে মাছ ধরে নিলাম | এই পুরু বরফে ঢাকা জায়গাটি যে একটি গভীর লেক তা এতক্ষণ পড়ে বোধগম্য হলো | নিজের বোকামির জন্যে হাসি পাচ্ছে | আকাশে আলো বলতে কিছুই নেই তারপরও সাদা বরফে ঢাকা লেকের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে দেবদারু আর পাইন গাছগুলো সমস্ত গা জুড়ে তুষারে ভর নিয়ে বৃদ্ধ মানুষদের মত ঠায় দাড়িয়ে আছে , একজন আমার নাকের ডগায় পুরু করে সাদা ক্রিম লেপে দিল যেন নাকের ডগাটা ঠাণ্ডায় একেবারেই খসে না পড়ে | আমাদের প্রত্যেককে দেখতে উদ্ভট কিমাকার প্রকৃতির কোন জন্তুর মত মনে হচ্ছে | ইতিমধ্যে বরফের ফুটো দিয়ে বেশ কিছু মাছ ধরাও হয়ে গেল, বন্ধুদের মাঝে একজন তড়িৎ গতিতে মাছের পেট কেটে পরিষ্কার করে লেকের ফুটতে জমানো পানি দিয়ে ধুয়ে নিলো | অন্ধকার নেমে এলো, হঠাৎ এতো ঘুটঘুটে অন্ধকার ভাবতেই অবাক লাগছে কারণ সময় মাত্র বিকেল তিনটা বেজে বিশ মিনিট | ফিরে যাবার পালা, স্নো স্কুটার ছুটে চলেছে, হাত পা সব কিছুই পরিপাটি করে হাত মোজা আর মোটা মাফলার দিয়ে গলা পর্যন্ত সম্পূর্ণই ঢাকা, চোখের উপর ডুবুরীদের মত চশমা যা কিনা মুখের প্রায় পুরোটাই ঢেকে রেখেছে , কোথাও বাতাস ঢুকে পরার সুযোগ একেবারেই নেই, লেক পেরিয়ে জঙ্গলের এক কোনায় চলে এসেই আমার থেমে গেলাম , দু’একজন জঙ্গলের ভেতর তুষারে ঝেড়ে কিছু শুকনো ডালপালা জোগাড় করে নিয়ে এলো, বলগা হরিণের পশম লাগানো চামড়া মাটিতে ফেলে গোল হয়ে বসে পড়লাম সবাই , সাথে আনা অল্প কিছু কেরোসিনে ভেজানো কাঠ জ্বেলে কুড়িয়ে আনা ডালপালা গুলো জড় করে আগুন জ্বলিয়ে বিকেল বেলার এই ঘুটঘুটে অন্ধকারে পিকনিক করতে বসে গেলাম, প্রচণ্ড শীতে বরফে ঢাকা উত্তর মেরুতে শূন্যের নীচে তাপমাত্রা যখন ছাব্বিশ, এমন একটি জায়গাতে বসে পিকনিক করা যায় তা আমার বিশ্বাস হতো না যদিনা সেই অভিজ্ঞতা নিজে অর্জন না করতাম | আগুনের এতই তাপ যে তার পাশে বসে থাকার উপক্রম নেই, এই ফাকে দেখছি সবাই গায়ের কাপড় চোপড় একটু ঢিলা করে আগুনের তাপে শরীরটাকে গরম করে নিচ্ছে সেই সাথে কাঠির আগায় মাছগুলোকে আগুনের তাপে ঝলসে নিয়ে লবণ দিয়ে খেতে বসে গেল | সচরাচর বই পুস্তকে পড়েছি আদিম যুগে মানুষ গুহায় থাকতো, পশু পাখী শিকার করে এভাবেই আগুনে ঝলসে নিত, আজ আমরা পৃথিবীর শেষ প্রান্তে এসে আদিম যুগের মানুষের মত বরফে আচ্ছাদিত পৃথিবীর বুকে বসে নিজ হাতে শিকার করা মাছ ঝলসে নিচ্ছি | আসলে এই অপরূপ প্রকৃতিতে মানুষ তার স্বভাব জাত কিছু প্রক্রিয়াকে কখনোই পরিবর্তন করতে পারে না, প্রকৃতির সাথে মানুষের এই বন্ধনটা যেন চিরন্তন | আজ কিনা এই সুন্দর প্রকৃতিকে আমাদের আধুনিক মানুষ সভ্যতার নামে ধংশের মুখে নিয়ে যাচ্ছি, কলকারখানার কার্বন নির্গমনের কারণে বায়ু মণ্ডলের তাপ মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে আমাদের সবার অজান্তেই |

রাতের অন্ধকারে প্রকৃতর এই অপূর্ব পরশের প্রতিটি মুহূর্ত আমার মাঝে এক স্বর্গীয় অনুভূতি এনে দিচ্ছে, আড্ডা আর গল্পের মাঝে আমাদের সময়টা কেটে যাচ্ছে বেশ | ঘড়ি ছাড়া এখানে রাত আর দিনের পার্থক্য বোঝার উপায় নাই , কখন যে রাত এগারোটা বেজে গেল বোঝার উপায় নাই | বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদের উপর আমার বিশ্বাস সেই ছোট বেলা থেকেই তাই ধর্ম কর্মটা আমার কাছে কখনোই তেমন গুরুত্ব পায় নাই, ধর্মের আদিপান্ত আমার কিছুই জানা নাই তবে মাথার ভেতর হঠাৎ করেই যে বিষয়টা ঘুরপাক খাচ্ছে সেটা হচ্ছে, রোজা আর নামাজের সাথে সময়ের বিষয়টা যদিও অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত, যদি তাই হয় তবে এই উত্তর মেরুতে যখন শীতকালে সূর্য ওঠেনা বা গ্রীষ্মকালে অস্তও যায় না ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা সেই নিয়মগুলো মেনে চলে কিসের উপর ভিত্তি করে ? এ বিষয়ে জানার আগ্রহটা আপাতত বাদ দিয়ে আমরা সবাই ফিরে যাবার পায়তারা করছি | একটি স্নো স্কুটারের সাথে একটি স্লেজ গাড়ী বাধা আছে আর তার উপর আমাদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র দড়ি দিয়ে শক্ত করে বাধা, একজন একটি কুঠার নিয়ে জঙ্গলের দিকে রওনা হয়ে গেল সাথে করে নিয়ে এলো প্রায় ছফুট লম্বা একটা ক্রিস্টমাস গাছ যেটা স্লেজ গাড়ীর ওপরে দড়ি দিয়ে বেধে নেয়া হলো | যদিও ক্রিস্টমাস আসতে আরও কিছুদিন বাকী, এই গাছটাকে ঘরে নিয়ে বড়দিনের উৎসবের জন্যে সাজানো হবে, গাছের নীচে রাখা থাকবে উপহার দেবার ও পাবার সব বাক্সগুলো | পঁচিশে ডিসেম্বর রাতের বেলা হাতে হারিকেন আর ঘণ্টা বাজিয়ে সানতা ক্লাওস এসে সবার উপহার বিলি করবেন, প্রতিটা ঘরের শিশুরাই এই সানতা ক্লাওসের আগমনের অপেক্ষায় অধীর আগ্রহে দিন গুনছে, বিষয়টি এদেশের সমাজের সংস্কৃতির একটা অংশ, ধর্মীয় আচার, নিয়ম কানুন এই সংস্কৃতি থেকে নির্বাসনে গেছে অনেক আগেই, উৎসব পালনের বিশেষ দিনগুলো যেন শুধু মাত্র সামাজিক রীতির একটি অংশ | সুইডেনের তরুণ সমাজের যেন সর্ব ক্ষেত্রেই ধর্মের প্রতি চরম অনীহা আর সেই কারণেই এখানকার একটি বিশাল অংশের নাগরিকদের নাস্তিক বলা যেতে পারে | সারাটা দিন এই শীতের সৌন্দর্যকে উপভোগ করে ঘরে ফেরার পালা , কিন্তু পথিমধ্যে হঠাৎ করেই থেমে যেতে হলো, অন্ধকারকে ভেদ করে মাথার উপর সবুজ মিশ্রিত হলুদ রঙের আলোর নাচন যেন ঢেউ খেলে খেলে আকাশের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে চলে যাচ্ছে সেই সাথে কানের মাঝে ক্ষীণ একটা কসমিক শব্দে শুনতে পারছি, জীবনে অনেক ধরনের আলোর খেলা দেখছি বটে কিন্তু আকাশের উপর এ ভাবে আলোর নাচন দেখে বিস্ময়ে তাকিয়ে আছি | কোথাও কোন শব্দ নেই, পুরো পৃথিবীটা যেন নির্জনতাকে ভালোবেসে ঘুমিয়ে আছে, মনে হচ্ছে স্নো স্কুটারের এই ছয় জন যাত্রী এই নির্জনতাকে প্রাণের সমস্ত আবেগ দিয়ে অনুভব করছে, মিনিট দশেক পর এই আলোক নৃত্য আস্তে আস্তে হারিয়ে গেল | এই উজ্জ্বল আলোর নৃত্য আসলে সূর্য থেকে বৈদ্যুতিক চার্জ নিয়ে পরমানু কণা সমূহ পৃথিবীর বায়ু মণ্ডলে প্রবেশ করার সময় এক সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়ে, যা কিনা উত্তরে 'অররা বোরিয়ালিস' এবং দক্ষিণে 'অররা অস্ট্রিরিয়িস' নামে সবুজ মিশ্রিত হলুদ রঙের আলোর ঢেউ তৈরি করে, কখনও কখনও এই আলোর রং লাল, হলুদ, সবুজ, নীল, এবং ভায়োলেটের মত দেখায়, বায়ু মণ্ডলে জমে থাকা জলীয়বাষ্পের সাথে সংস্পর্শে এলেই এ ধরনের আলোর ঢেউয়ের উৎপত্তি ঘটে | উত্তর ও দক্ষিণ মেরুতে এই অপরূপ দৃশ্য মনের কোনে দাগ কেটে যায় | ঘড়ির কাটা না দেখলে উপায় নেই যে কখন রাত আর কখন দিন | পেটের মাঝে অস্বাভাবিক রকম খুদা অনুভব হচ্ছে, যদিও ঘণ্টা খানেক আগেই বরফ ঢাকা লেকের উপর বসে বরফের নীচ থেকে ধরে আনা মাছ গুলো আগুনে কাবাব বানিয়ে পেট ভোরেই খেয়ে ছিলাম, লক্ষ্য করলাম সবার পেছনের স্কুটারটা কি কারণে যেন কতটুকু পেছনে পড়ে গেছে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না, তবে বুঝতে পারছি শীতের এই গভীর রাতে আমাদের তিনটা স্কুটারই একটার পেছনে আর একটা থাকাই ভালো, কারণ একটা বিকল হয়ে পেছনে পড়লে বড়ই বিপদ | বনে বাদারে তুষারের রাজ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে বটে তবে মানুষগুলো হয়তো ঠাণ্ডায় আইসক্রিমে রূপান্তরিত হয়ে যাবে ততক্ষণে | বেশ চিন্তিত হয়ে পরি, ভাবছি এই ঠাণ্ডায় পেছনে পড়ে থাকা দুইজনকে খুঁজতে গেলে আমার নিজেরাই বেশিক্ষণ বাইরে ঘোরাঘুরি কারণে জমে আইসক্রিম হয়ে না যাই | বান্ধবী একজন আমার স্কুটারের চালক, প্রশ্ন করতে বলে উঠলো-“চিন্তা করার কি আছে, এখনি জেনে নিচ্ছি ওরা কোথায়” বলেই ডান পকেট থেকে একটা ওয়াকিটকি বের করে সেটা দিয়ে তাদের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছে, মোবাইল টেলিফোনের যুগ তখনও পুরোপুরি আসেনি, তাই ওয়াকি টকিই আমাদের ভরসা | ক্ষনিকের মাঝেই তাদের সাথে যোগাযোগ করে জানতে পারলাম, ওদের খিদে পেয়েছিলো তাই স্কুটার থামিয়ে রুটি দিয়ে শুকনো কাঁচা মাংশ খেয়ে নিচ্ছে | স্টকহোল্ম থেকে আমার যে বন্ধুটি আমার সাথে এসেছে সে হচ্ছে পেছনের স্কুটারের চালক আর উত্তরের এই নিয়ম কানুনগুলো তার জানা নাই যে এই গহীন অরণ্যে সবাইকে এক সাথে থাকার নিয়ম, যেন কেউ সহজে হারিয়ে না যায় | যাক বাবা, ভাগ্যিস আমাদের কাছে ওয়াকিটকি ছিল | কিছুক্ষণ পর গহীন জঙ্গল থেকে আমরা বড় রাস্তার উপর চলে এলাম, রাত কত হবে জানা নাই তবে বাসায় পৌঁছতে বেশিক্ষণ দেরী হলো না, পরদিন ঘুম থেকে উঠেই লুলিও শহরে বরফে তৈরি ভাস্কর্য দেখতে যাবো, আজ না হয় কাঁচা হরিণের মাংসের শুটকি চাকু দিয়ে কেটে কেটে রুটির উপর ফেলে স্যান্ডুইচ বানিয়ে খেয়েদেয়ে শুয়ে পরার পালা |

/// মাহবুব আরিফ কিন্তু

Comments

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

কিন্তু
কিন্তু এর ছবি
Online
Last seen: 1 ঘন্টা 7 min ago
Joined: শুক্রবার, এপ্রিল 8, 2016 - 5:41অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

ফেসবুকে ইস্টিশন

SSL Certificate
কপিরাইট © ইস্টিশন.কম ® ২০১৬ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর