নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 3 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • আকাশ লীনা
  • নুর নবী দুলাল
  • সীমান্ত মল্লিক

নতুন যাত্রী

  • এম এম এইচ ভূঁইয়া
  • খাঁচা বন্দি পাখি
  • প্রসেনজিৎ কোনার
  • পৃথিবীর নাগরিক
  • এস এম এইচ রহমান
  • শুভম সরকার
  • আব্রাহাম তামিম
  • মোঃ মনজুরুল ইসলাম
  • এলিজা আকবর
  • বাপ্পার কাব্য

আপনি এখানে

বাংলার মুসলমান অথবা বাঙালি মুসলমানের জাতীয়তাবাদী ভাবধারার রূপান্তর (পঞ্চম পর্ব)


বাঙালি মুসলমানের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উত্তরাধিকার:

একটা বৃহত্তর জাতীয়তাবাদের ভেতরেই অনেকগুলো উপ-জাতীয়তাবাদ(sub-nationalism) থাকতে পারে। সেইভাবে ভারতবর্ষে অনেকগুলো উপ-জাতীয়তাবাদ এবং একটি সর্বভারতীয় জাতীয়তাবাদ একইসাথে বিরাজমান থাকা তাত্ত্বিকভাবে সম্ভব ছিল, যদিনা সৈয়দ আহমদ প্রবর্তিত মুসলিম বিচ্ছিন্নতাবাদ মুসলিম লীগের হাত ধরে উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেত। কিন্তু ব্রিটিশদের ডিভাইড এ্যান্ড রুল পলিসি, ভারতের হিন্দু মুসলমান উভয়েই তার সহজ শিকারে পরিণত হওয়া,কংগ্রেসের ভেতরে হিন্দু সাম্প্রদায়িকতাবাদীদের উত্থান ও ক্রমেই প্রাধান্য বিস্তার করা, হিন্দুত্ববাদের পুনরুজ্জীবন,মুসলমানদের ধর্মীয় বিচ্ছিন্নতাবাদ এবং পরিণতিতে সাম্প্রদায়িকতার উত্থান এবং সর্বোপরি আগেভাগেই অভিন্ন শত্রু হিসেবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকে চিহ্নিত করতে না পারা ভারতবর্ষকে একত্রিত এবং অখন্ড রাখাকে অসম্ভব করে তোলে। এবং তার দুঃখজনক এবং রক্তক্ষয়ী পরিণতি হলো দ্বিজাতি তত্ত্বের মত ভুঁইফোড় ধারনার উপর ভিত্তি করে ভারত উপমহাদেশকে দ্বিখণ্ডিত করা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পাঁচ বছরের মধ্যেই এশিয়াতে যে নয়টির মতো স্বাধীন দেশ জন্ম নেয় ভারত ও পাকিস্তান তাদের অন্যতম দুটো দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান পাওয়া গেল বটে।কিন্তুু হিন্দু - মুসলমান আলাদা আলাদা দুটো জাতি এই তত্ত্বের প্রথম প্রবক্তা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ-একথা বললে আরেকজনের প্রতি অবিচার করা হয়। সেই আরেকজন হচ্ছেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। 'ভারতকলঙ্ক' প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন "হিন্দু জাতি ভিন্ন পৃথিবীতে অন্য অনেক জাতি আছে। তাহাদের মঙ্গলমাত্রেই আমাদের মঙ্গল হওয়া সম্ভব নহে। ....অপরিচিত,যেমন তাহাদের মঙ্গলে আমাদের অমঙ্গল ঘটিতে পারে, তেমনি আমাদের মঙ্গলে তাহাদের অমঙ্গল ঘাটিতে পারে। হয় হউক,আমরা সেজন্য আত্মজাতির মঙ্গল সাধনে বিরত হইব না ;পরজাতির অমঙ্গল সাধন করিয়া আত্মমঙ্গল সাধিত হয়, তাহাও করিব"।এটাকে তিনি মনে করেছেন জাতি প্রতিষ্ঠার প্রথম ভাগ। এর পূর্বে সকল হিন্দুকে "একপরামর্শী, একমতাবলম্বী, একত্র মিলিত হইয়া" কাজ করার জ্ঞানকে জাতিপ্রতিষ্ঠার 'প্রথম ভাগ' বলে মত দিয়েছেন। দুটো বিষয় এখানে লক্ষ্য করার মতো। এক,জাতি গঠনের উপায় সম্পর্কে তাঁর মতামত।বলা নিষ্প্রয়োজন যে জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে বঙ্কিমের ধারণা ইউরোপ থেকে আগত। পরে আমরা দেখবো জাতি গঠনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে তাঁর এই মত কতটা শক্তিশালী। দুই,হিন্দুকে তিনি একটা 'জাতি' বলে উল্লেখ করছেন। বিশ শতকের জিন্নাহর দ্বিজাতি তত্ত্বের উনিশ শতকীয় সংস্করণ বটে!

আহমদ ছফা লিখেছেন "বঙ্কিম ছিলেন আধুনিক বাংলা তথা ভারতের সর্বপ্রথম রাষ্ট্রবেত্তা। তিনিই সর্বপ্রথম একটি হিন্দুু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন। .....রাষ্ট্রচিন্তাই তাঁর মুখ্য মনোযোগের বিষয়। অন্যবিধ চিন্তাসমূহকে রাষ্ট্রচিন্তার সহায়ক হিসেবে তিনি দাঁড় করিয়েছেন। তাঁর ছিল একমুখী মন। যা-ই লিখুন না কেন একটি হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন তাঁর মনে কম্পাসের কাঁটার মত হেলে থাকত। তিনি তাঁর সমস্ত কল্পনাশক্তিকে একটি হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কামানের গোলার মত ছুঁড়ে দিয়েছিলেন।.....বাংলাদেশ বিভাগ করার জন্য কোন একজন ব্যক্তিকে দায়ী করতে হয়, তিনি অবশ্যই বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। ("শতবর্ষের ফেরারি:বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় " নির্বাচিত অরাজনৈতিক প্রবন্ধ, আহমদ ছফা, ২০১১)কিন্তু শুধু বঙ্কিমচন্দ্রকে দোষ দিলেই কি সবটা বলা হয়? আরো যে প্রবক্তা আছেন!

অন্য একজনের ভূমিকা এক্ষেত্রে স্বীকার করে নিতে হবে আমাদের। তিনি স্যার সৈয়দ আহমদ খান। উত্তর ভারতের আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক বিখ্যাত "আলিগড় আন্দোলনের"প্রাণপুরুষ। ১৮৮৮ ভারতীয় কংগ্রেসের এলাহাবাদ সম্মেলনে তাকে কংগ্রেসের প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দিয়ে কংগ্রেসের ভেতর থেকেই মুসলিম স্বার্থরক্ষার জন্য আহ্বান জানিয়েছিলেন বদরুদ্দিন তৈয়বজী। এর উত্তরে তিনি চিঠি লেখেন ২৪ ফেব্রুয়ারি ১৮৮৮। লিখলেন "এই অন্যায়ভাবে জাতীয় কংগ্রেস নামধারণকারী সংগঠনটি কেবল আমাদের সম্প্রদায়ের পক্ষেই ক্ষতিকর নয়, সমগ্র ভারতের পক্ষে ক্ষতিকর। ভারতকে এক জাতি মনে করে এমন যে কোন ধরনের কংগ্রেসে আমার আপত্তি রয়েছে।" দ্বিজাতিতত্ত্বের আদি পুরুষ ইনিই। আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে স্যার সৈয়দ আহমদ মুসলিম রাজনীতিকে ব্রিটিশ সহযোগীরা ভূমিকায় দৃঢ়ভাবে প্রোথিত করেছিলেন। নানা মুসলিম এডুকেশন কনফারেন্সে বক্তৃতায়, এডুকেশন কমিশনের সামনে সাক্ষ্যদান ও আইন পরিষদের বিতর্কে অগ্রসর ও সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সমাজের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া অসম্ভব এই যুক্তিতে স্যার সৈয়দ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা, কংগ্রেসের মত গণপ্রতিষ্ঠান বা কোন নির্বাচনমূলক শাসনসংস্কার সযত্নে পরিহার করতে বলেছিলেন মুসলিমদের। (অমলেশ ত্রিপাঠী :১৯৯২) বিচ্ছিন্নতাবাদের সুর প্রথম ধ্বনিত হয় তার কন্ঠ্যে। সারা ভারত তথা বাঙালি মুসলমান অবশ্য তাকেই মাথায় করে রেখেছে আজও।

সিপাহী বিদ্রোহের সময় বাঙালি একবার স্বাধীন হতে চেয়েছিল।যে বেঙ্গল আর্মি প্রথম বিদ্রোহ করেছিল ১৮৫৭ সালে উত্তর ভারতে, তাদের অধিকাংশই উচ্চবর্ণের হিন্দু হলেও মুসলমানেরও স্বতস্ফুর্ত অংশগ্রহণ ছিলো।বাংলায় ঢাকা, চট্টগ্রাম আর ব্যারাকপুরে তারা বিদ্রোহ করেছিলো। সেই বিদ্রোহের মধ্যে জাতিচেতনা কতখানি ছিলো সেটা স্পষ্ট নয়। অনেক ইতিহাসবিদ সেই বিদ্রোহকে 'জাতীয়' পদবাচ্যের অর্ন্তভূক্ত মনে করেন না। আবার কার্ল মার্ক্স সেটাকে "ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম" বলে উল্লেখ করেছেন। একথাও স্মরণ করতে হবে যে এই বিদ্রোহের সূত্রপাত হয়েছিল ধর্মীয় সংস্কারের দ্বারা, বিশুদ্ধ রাজনৈতিক চেতনা থেকে নয়।তবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সামরিক কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সিপাহীদের শোষণ ও নির্যাতন সিপাহীদের বিদ্রোহী হয়ে ওঠার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তুু হিন্দু মুসলমান সিপাহীদের এই সম্মিলিত বিদ্রোহ বা সংগ্রাম বাংলাদেশের হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে উচ্চশ্রেণী বা মধ্যবিত্তশ্রেণী কোনোটারই সমর্থন লাভ করেনি।কারন নির্ণয় করতে গেলে মূল কারন হিসেবে দেখতে পাই 'শ্রেণীস্বার্থ'। ব্রিটিশ শাসন ব্যবস্থা ততদিনে হিন্দু ও মুসলমান বাঙালি উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে-যাদের অধিকাংশই জমিদার, তালুকদার প্রভৃতি ভূস্বামী, আইনজীবী, ব্যবসায়ী এবং অল্পবিস্তর ইংরেজি শিক্ষিত লোক - ব্রিটিশের স্বার্থের সাথে একতাবদ্ধ করে ফেলেছে। অর্থাৎ ব্রিটিশ শাসন থাকলেই ওই শ্রেণীর সুবিধা হয়, না থাকলেই বিপদ। সেইজন্যেই তারা সিপাহীদের সংগ্রামে সমর্থন দেয়নি। ব্রিটিশরা যখন প্রচার করে যে এই অভ্যুত্থান মুসলমানদের কাজ, তখন যুক্তপ্রদেশের প্রভাবশালী মুসলমান ব্যক্তিত্ব স্যার সৈয়দ আহমদ খান, এবং বাংলাদেশের নবাব আব্দুল লতিফ প্রভৃতি নেতারা ব্রিটিশ ভারতীয় সরকারকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে এই অভ্যুত্থানের সাথে তাদের কোন সম্পর্ক নেই।যাইহোক,তখনই স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব হয়নি,এবং হিন্দু মুসলমান কেউই 'জাতীয়তাবাদ' দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়নি। মার্ক্সের মতো করে সিপাহী বিদ্রোহকে যদি স্বাধীনতার সংগ্রাম বলে ধরে নিই তাহলে বলতে হবে সেই সংগ্রাম ব্যর্থ হয়েছে জাতীয়তাবাদী চেতনার অভাবে, তবে সংগ্রাম অব্যাহত থেকেছে। দুঃখজনকভাবে সেই সংগ্রাম ক্রমান্বয়ে সাম্প্রদায়িক রূপ লাভ করতে শুরু করে ।

একসময় স্বাধীনতা আকাঙ্ক্ষার আড়ালে হিন্দুত্ববাদ বা হিন্দু জাতীয়তাবাদ জেগে ওঠে। কংগ্রেস ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ গ্রহণ করলেও মুসলমানেরা সেখানে আশ্বস্ত হতে পারেনি যদিও মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বিশের দশক পর্যন্ত কংগ্রেসেই ছিলেন।এছাড়া স্যার সৈয়দ আহমদ খান, সৈয়দ আমীর আলী এবং নবাব আব্দুল লতিফের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিদের তীব্র কংগ্রেস বিরোধিতা সত্ত্বেও কংগ্রেসের প্রথম দিকের অধিবেশনগুলোতে বেশকিছু সংখ্যক মুসলমান প্রতিনিধি যোগ দিয়েছিলেন।সৈয়দ আহমদ ছিলেন একইসাথে কংগ্রেস এবং বাঙালিবিদ্বেষী।তিনি যেমন মনে করতেন যে ভারতে প্রতিনিধিত্বশীল নির্বাচন ব্যবস্থা চালু হলে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে হিন্দুরাই আধিপত্য বিস্তার করবে এবং মুসলমানেরা স্থায়ী সংখ্যালঘুতে পরিণত হবে, তেমনি মনে করতেন যে জ্ঞান, বিদ্যা বুদ্ধি, স্বাধীনতা ও দেশপ্রেমে বাঙালিরা যথেষ্ট এগিয়ে থাকার দরুন এবং কংগ্রেসে বাঙালিদের প্রভাবশালী ভূমিকা থাকার কারনে মুসলমানদেরকে প্রতিনিধিত্বশীল নির্বাচন ব্যবস্থায় প্রকৃতপক্ষে বাঙালিদের অধীনেই থাকতে হবে। তাঁর এই চিন্তার প্রকাশ ঘটেছে ১৮৮৬ এবং ১৮৮৭ সালে যথাক্রমে কলকাতায় ও মাদ্রাজে কংগ্রেসের দ্বিতীয় ও তৃতীয় অধিবেশনের আগে দেওয়া দুটো বক্তৃতায়। আব্দুল লতিফের চিন্তাভাবনাও এর থেকে ভিন্ন কিছু নয়। সৈয়দ আমির আলী ১৮৮৬ সালে কলকাতায় কংগ্রেসের দ্বিতীয় অধিবেশনের আগে কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদকের কাছে চিঠি লেখেন কেন তিনি কংগ্রেসের অধিবেশনে যোগ দিতে অপারগ।সেই চিঠির মূলকথা এই যে কংগ্রেসের এই অধিবেশনে যেসব বিষয় আলোচ্য নির্ধারণ করা হয়েছে সেসব বিষয় নিয়ে ব্রিটিশ সরকার ভাবছে। এমতাবস্থায় গবর্নমেন্টের প্রতি অবিশ্বাস করা এবং আন্দোলন করার কোন প্রয়োজন। এই সমস্ত কারনে তিনি কংগ্রেসের সভায় যোগ দিতে পারছেন না। ব্রিটিশ আমলে শুধু বাঙালি ইিন্দু মুসলমানের একার না, সর্বভারতীয় রাজনীতির চরিত্রটাই ছিলো এমন।তবে কংগ্রেস শুরুতে আবেদন নিবেদনের রাজনীতি করলেও ক্রমান্বয়ে হয়ে ওঠে স্বাধীনতাপন্থী। কংগ্রেস নেতা হসরত মোহানী এবং পরে সুভাষ বসুর স্বাধীনতা প্রস্তাব তার সাক্ষ্য দেয়। শিক্ষায় এগিয়ে থাকা হিন্দুরা যখন যোগ্যতাবলেই সরকারি চাকরিতে অনেক জায়গা দখল করতে সমর্থ হয়েছে,তখন ইংরেজি শিক্ষায় পিছিয়ে থাকা অপেক্ষাকৃত অনগ্রসর মুসলমানদের জন্য মুসলমান সম্প্রদায়ের নেতারা হিন্দুদের তুলনায় ব্রিটিশদের কাছ থেকে একটু বেশী আনুকূল্য লাভ, চাকরিতে বেশী পদ পদবী পাওয়া প্রভৃতি সাম্প্রদায়কেন্দ্রিক উন্নয়ন চিন্তা করেছে এবং অধিকমাত্রায় ব্রিটিশের আজ্ঞাবহ হয়েছে।এসব প্রাপ্তির বিনিময়ে তারা আরো বেশী করে ব্রিটিশদের সহযোগিতা করতে প্রস্তুত ছিলো।প্রভুর কাছে এই ধরনের আকুতি মিনতি নতুন কিছু নয়। দেখা যায় ১৮৮৫ এর ডিসেম্বরে অক্টোভিয়ান হিউমের উদ্যোগে এবং উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের সভাপতিত্বে মুম্বাইয়ের যে অধিবেশনে ইন্ডিয়ান ন্যাশন্যাল কংগ্রেসের জন্ম হয়, এবং এর দুই বছর পূর্বে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং আনন্দমোহন বসুর নেতৃত্বে কলকাতার অ্যালবার্ট হলে ১৮৮৩ র ২২ ডিসেম্বর যে সভা বসে- যেটাকে ভারতের কংগ্রেসের মহড়া বলে মনে করেন অনেক ইতিহাসবিদ-এই উভয় সম্মেলনে উত্থিত প্রস্তাবগুলো প্রায় এইরকম। প্রস্তাবের মধ্যে ছিলো -ইংল্যান্ড ও ভারতে একই সময়ে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা গ্রহণ, ঐ সার্ভিসে ঢোকার সর্বোচ্চ বয়স ২২ বছর করা, আইন পরিষদে অধিক সদস্য নির্বাচন ইত্যাদি। আবার ঢাকায় মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার কয়েকমাস আগে ৩৫ সদস্যের একটা মুসলিম প্রতিনিধি দল যার ভেতর ৮ জন ছিলেন বাংলা ও বিহারের, সিমলায় ভাইসরয় মিন্টোর সাথে দেখা করে যে দাবীগুলো পেশ করেন তার মধ্যে রয়েছে সামরিক ও বেসমারিক চাকরিতে, হাইকোর্টে, মিউনিসিপ্যালিটি, জেলা বোর্ড এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট ও সিনেটে মুসলমানদের জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যক সংরক্ষিত আসনের নিশ্চয়তা প্রদান। এছাড়াও রয়েছে প্রাদেশিক কাউন্সিল এবং ইম্পিরিয়াল কাউন্সিলে পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা এবং মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবী। উল্লেখ্য এই দাবীর অনেকগুলোই মেনে নিয়েছিলেন ভাইসরয়। একইভাবে ঢাকায় মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠার সময় এই নতুন দলের যে সকল নীতি ঘোষিত হয় তার অন্যতম হলো ব্রিটিশ সরকারের প্রতি আনুগত্য বৃদ্ধি এবং মুসলমানদের রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষা ও বিকাশ ঘটানো। সৈয়দ আহমদ, আব্দুল লতিফ এবং সৈয়দ আমীর আলির মতো ব্যক্তিদের ন্যায় দল হিসেবে মুসলিম লীগও ব্রিটিশদের আনুগত্য স্বীকার এবং আপোসের পথ ধরেছেন।সেটা ধরেছেন মূলত শ্রেণীস্বার্থে এবং বাঙালি মুসলমান এদের দ্বারাই সবচেয়ে অনুপ্রাণিত এবং প্রভাবিত হয়েছে।এই প্রভাব বাঙালি মুসলমানের মধ্যে বহুকাল স্থায়ী হয়েছে। তারই ফল হচ্ছে যখন কংগ্রেস নিজেকে সারা ভারতের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছে( এই চেষ্টায় ত্রুটি ছিলো সেকথা আগেই বলেছি) এবং ব্রিটিশ উপনিবেশের হাত থেকে স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করছে, মুসলিম লীগের সাথে তাল মিলিয়ে ভারতের সবচেয়ে প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী ও দেশপ্রেমী বাংলা প্রদেশের মুসলমান উচ্চ ও মধ্যবিত্তরা তখন হিন্দুর আধিপত্য থেকে রক্ষার নামে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য চেষ্টা করেছে।

বাঙালি মুসলমানের রাজনৈতিক চিন্তায় আরো কিছু বিষয়ের প্রভাব আছে।মুঘল রাজত্বে বিশেষ করে সম্রাট আকবরের সময়ে যখন উপমহাদেশ উদার মতাদর্শের প্রসারের অনুকূল ছিলো এবং তারই ফলে পরমতসহিষ্ণুতা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির একটা সমন্বয়ধর্মী সংস্কৃতি গড়ে উঠছিল, সেই সময় এক শ্রেণীর ধর্মান্ধ,রক্ষণশীল ওলামা সোচ্চার হয়ে উঠেছিলেন। শেখ আহমদ সিরহিন্দ ছিলেন এদেরই প্রতিভূ। তাঁর নেতৃত্বে এক ইসলামী পুনর্জাগরণ আন্দোলনের শুরু হয় যার প্রধান লক্ষ্য ছিল পবিত্র কোরান ও সুন্নাহর বিধি অনুযায়ী মুসলমানদের জীবনযাত্রাকে পরিচালনা এবং পুনর্গঠন করা এবং শরিয়তের বিধানকে কঠোরভাবে পালন করা। তিনি হিন্দুদের সাথে কোন প্রকার আপস করার প্রবণতার তীব্র বিরোধিতা করেন। (বাংলাদেশ :অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ ;সালাহ্উদ্দীন আহমদ)। ভারতের হিন্দু সমাজের ভেতর যখন উনিশ শতকে বিশেষ করে কলকাতাকেন্দ্রিক সুবিদিত ধর্ম ও সমাজ সংস্কার আন্দোলন জারি ছিলো, তখন বাংলায় চলেছে ওয়াহাবী আন্দোলন। উত্তর ভারতের রায়বেরিলির শাহ সৈয়দ আহমদের দ্বারা প্রচারিত ওয়াহাবী আন্দোলনকে বাংলায় চালু করেছিলেন তিতুমীর।কিছু পরে হাজী শরীয়তউল্লাহর ফরায়েজী আন্দোলনও চালু হয়। দুটোরই উদ্দেশ্যে ইসলামের শুদ্ধিকরণ। দুটো আন্দোলনই ছিলো যথার্থ অর্থে প্রতিক্রিয়াশীল এবং প্রগতি বিমূখ।বহুশতাব্দী ধরে গ্রাম বাংলায় যে সমন্বয়ধর্মী মানবতাবাদী লোকসংস্কৃতি বিরাজ করছিল, এসমস্ত ইসলামী পুনর্জাগরণধর্মী আন্দোলন সেই সংস্কৃতির মূলে কুঠারাঘাত করেছিল। বাংলার সমাজ এখনো তার ফল বহন করে চলছে।তবে আন্দোলনদ্বয় যেহেতু চালিত হয়েছিলো গ্রামীণ সমাজে, কৃষক শ্রেনীর মধ্যে তাই ধর্মীয় আন্দোলন হিসেবে পশ্চাৎমুখী হলেও রাজনৈতিক দিক দিয়ে একটা প্রগতিশীল মাত্রা আছে আন্দোলনদুটোর। উভয় আন্দোলনই কৃষকেদের সমর্থন লাভ করে এবং জমিদারশ্রেণীর বিরুদ্ধে লড়াই করে। তবে ওয়াহাবীরা ব্রিটিশ শাসনের বিরোধিতা করতে যেয়ে ইংরেজি ভাষা শিক্ষা, পাশ্চাত্য জ্ঞান বিজ্ঞান শিক্ষারও বিরোধিতা করে। দেখা যায় যে আন্দোলনের মধ্যে অত্যাচারীর বিরুদ্ধে একটা সংগ্রামী চেতনা আবার একইসাথে সাম্প্রদায়িক এবং প্রবল প্রতিক্রিয়াশীল ভাবনা কার্যকরী রয়েছে।এসব আন্দোলন সংগ্রামের দ্বারাও বাঙালি মুসলমান আন্দোলিত ও প্রভাবিত হয়ে চেতনার উত্তরাধিকার বহন করেছে এবং বিশ শতকের মুসলিম লীগের রাজনীতির সংস্পর্শে সেগুলো আরো পোক্ত হয়ে বাঙালির জাতীয়তাবাদী চিন্তায় আসন গেড়েছে যার সচেতন বা অবচেতন বহিঃপ্রকাশ দেখা যাবে পরবর্তীকালে।

Comments

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

সুবিনয় মুস্তফী
সুবিনয় মুস্তফী এর ছবি
Offline
Last seen: 10 ঘন্টা 9 min ago
Joined: শুক্রবার, নভেম্বর 4, 2016 - 4:58অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

ফেসবুকে ইস্টিশন

SSL Certificate
কপিরাইট © ইস্টিশন.কম ® ২০১৬ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর