নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 7 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • নুর নবী দুলাল
  • মিশু মিলন
  • সাহাবউদ্দিন মাহমুদ
  • দ্বিতীয়নাম
  • রাজর্ষি ব্যনার্জী
  • পৃথু স্যন্যাল
  • সাইয়িদ রফিকুল হক

নতুন যাত্রী

  • জোসেফ হ্যারিসন
  • সাতাল
  • যাযাবর বুর্জোয়া
  • মিঠুন সিকদার শুভম
  • এম এম এইচ ভূঁইয়া
  • খাঁচা বন্দি পাখি
  • প্রসেনজিৎ কোনার
  • পৃথিবীর নাগরিক
  • এস এম এইচ রহমান
  • শুভম সরকার

আপনি এখানে

প্রবাসের অখ্যাত গল্প-৩


সুইডিশদের তথা স্কেন্ডেনেভিয়ানদের সাথে প্রকৃতির এক নিবিড় সম্পর্ক, মনে হয় জন্মসূত্রেই প্রকৃতির সাথে তাদের সম্পর্ক এক নিবিড় সুতার বাধনে আবদ্ধ, তাদের নামের সাথে পাহাড় পর্বত, নদী বাতাস আকাশ আলো শব্দগুলো জড়িত থাকে, অতএব বুঝতেই পারছেন প্রকৃতির সাথে তাদের সম্পর্কটা অনেকটা জন্মগত |

বছরে অন্তত একবার হলেও সপ্তাহ খানেকের ছুটির অবকাশে বিশাল অংশের সুইডিশ নাগরিকরা “ফিয়াল ভান্দ্রিং” এ চলে যায়, মানে পরিবার পরিজন বা বন্ধু বান্ধব নিয়ে পাহাড় পর্বত কি বনজঙ্গলে তবু খাটিয়ে রাত্রি যাপন ও ঘুরে বেড়ানোই হচ্ছে এই ফিয়াল ভান্দ্রিং এর মূল উদ্দেশ্য | আশি দশকের প্রথম দিকে আমারও সুযোগ হয়েছিল এরকম একটি দলের সাথে উদ্দেশ্যহীন ভাবে শুধুই প্রকৃতিকে ভালোবেসে ঘুরে বেড়ানোর, সে এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা যাকে বলা যেতে পারে | কাঁধে ব্যাক প্যাকে কিছু শুকনো খাবার ও জীবন ধরণের জন্যে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সাথে নিয়ে বন্ধু বান্ধবীরা মিলে সুইডেনের উত্তরের একটি শহর লুলিয়তে পৌঁছে যাই | প্রথম রাতটা এক বান্ধবীর বাসায় কাটিয়ে পরদিন সকালেই আমাদের বনবাসে মানে ফিয়াল ভান্দ্রিং শুরু হবে, আমারা বোডেন নামক একটি শহরে গাড়ী পার্ক করে সবাই একত্রে এই যাত্রা শুরু করে দেই, দিনের বেশীর ভাগ সময় বনজঙ্গল নদী প্রকৃতির মাঝে ঘুরে বেড়ানো আর নির্জন প্রকৃতির অপরূপ দৃশ্য অবলোকন করার মাঝে ধীরে ধীরে আমি এক স্বর্গীয় জগতের মাঝে চলে যাচ্ছি, আধুনিক সভ্যতার জগৎ থেকে এ জগতটার অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত, জন মানবহীন এই প্রকৃতি যে কতটা অপরূপ হতে পারে তা অভিজ্ঞতা না থাকলে অনুধাবন করা যাবে না, আধুনিক সভ্যতার যন্ত্রের মাঝে আমাদের সাথে আছে একটি দিক নির্দেশনা যন্ত্র ও যার যার হাত ঘড়ি , মোবাইল টেলিফোনের যুগ তখনও আসেনি তাই সেই সময়ে মোবাইল টেলিফোন সাথে থাকার প্রশ্নই ওঠেনা | নিজেকে প্রকৃতির একটি অংশ হিসাবে প্রকৃতির মাঝে নিজেকে বিলিয়ে দিতে যে অফুরন্ত আনন্দ তা এই প্রথম অনুভব করলাম আর এই জাতির প্রতি আরও একবার শ্রদ্ধায় মাথা অবনত হয়ে আসলো | দিনের বেলা আমাদের জঙ্গলে ঘোরাঘুরি ফাকে লক্ষ্য করলাম বেশ কয়েকজনের হাতে কিছু ছবি যুক্ত বই নিয়ে বনজঙ্গল থেকে কিছু উদ্ভিদ জাতিও আমরা সচরাচর বেঙের ছাতা বলে থাকি তুলে নিয়ে যে যার ঝুড়িতে রাখছে, একজনের কাছে প্রশ্ন রাখতেই উত্তর দিল ঘুরে বেড়ানোর ফাঁকে ফাঁকে রাতের খাবারও জোগাড় করে নিচ্ছি আমরা, তাই ছবি দেখে বা পড়াশোনা করে যে সব মাশরুমগুলো খাবার যোগ্য সেগুলোকে বাছাই করে তুলে নিচ্ছে সবাই, কারণ অনেক বিষাক্ত মাশরুমও দেখতে অনেকটা অবিকল খাবার উপযুক্ত মাশরুমের মত, কাজেই অনভিজ্ঞ কেউ এই কাজটি থেকে বিরত থাকাই উত্তম আর সেই দলে আমিও একজন | বেশ কিছুদূর হেটে যাবার পর গভীর জঙ্গলের ঠিক মাঝখানে একটু খোলামেলা মাঠের মত জায়গাতে একটি কাঠের ঘর, কি আশ্চর্য এই গহীন জঙ্গলে জন মানবহীন শূন্য এলাকায় একটি ঘর ! আমার সত্যি অবাক হবার পালা, জানতে পারলাম শুধু মাত্র বিশ্রাম পালনের জন্যে বিগত বহু বছর যাবত এই এলাকার অধিবাসীরা জঙ্গলের ভেতরে রাত্রি যাপন ও বিশ্রামের জন্যে জনসাধারণের সুবিধার্থে এ রকম বেশ কিছু কাঠের ঘর তৈরি করে রেখেছে, আর এই প্রথা চলে আসছে বংশানুক্রমে | ঘরের ভেতরে বেশ কটি দোতলা খাট ও প্রয়োজনীয় আনুষঙ্গিক জিনিস পত্র রাখা আছে, হারিকেনও রাখা আছে তিন চারটা তাতে জালানিও ঢেলে দেয়া হলো | আমি আরও একবার অবাক হলাম কারণ ঘরের বাইরে একটা ঢাকনা লাগানো ডাস্টবিন মানে ময়লা ফেলার পাত্রে যে যার পকেট থেকে জমিয়ে রাখা কাগজ ও ময়লা আবর্জনা সেই ডাস্টবিনে রেখে দিচ্ছে, বুঝতে পারলাম এদেশের মানুষ প্রকৃতিকে এতটাই ভালোবাসে যে চকলেটের কাগজ ও যে কোন ধরনের আবর্জনা জঙ্গলে যেখানে সেখানে না ফেলে নিজেদের পকেটে জমিয়ে রেখেছিলো, সরকারী বন বিভাগের কর্মীরা বছরে একবার কি দুবার এই ময়লাগুলো সংগ্রহ করে নিয়ে যায় | প্রকৃতির কাছে মানুষের যে দায়বদ্ধতা তা আজ স্বচক্ষে দেখতে পেলাম | ঢাকার রাস্তায় একটি খালি সিগারেটের প্যাকেট ছুড়ে ফেলে দিতে আমার কখনই সামান্যতম দ্বিধাবোধ জন্ম নেয়নি, নিজের বিবেকের কাছে আজ আমি সত্যি অপরাধী, মানুষ হয়ে জন্ম নিয়ে প্রকৃতি কি জিনিস তা এই প্রথম অনুধাবন করছি | বেশ কয়েকজন সাথে করে মাছ ধরার ছিপ নিয়ে খানিক দুরে একটি নদীর ধারে চলে গেল, মৌমাছি জাতিও বড়শি নদীর পানির উপর ছুড়ে মেরে সুতা টেনে টেনে আনতেই বড়শিতে খুবই সুস্বাদু বেশ কিছু সালমন জাতিও মাছ ধরা হয়ে গেল | জঙ্গল থেকে শুকনো কাঠ জোগাড় করে ক্যাম্প ফায়ারের ব্যবস্থা করা হলো, গোল হয়ে গান ও আড্ডার আয়োজন হয়ে গেল সেই সাথে রান্নাবান্না বলতে মাশরুমের সাথে সালমন মাছ ঝলসে রাতের খাবারের আয়োজন, পৃথিবীর উত্তর প্রান্তের কোন এক গহীন জঙ্গলে রাত্রি যাপন ও প্রকৃতির সাথে মানুষের এই অপূর্ব সম্মেলন বিষয়টা আমার ভেতরে শিহরণ জাগিয়ে তুলেছে, নিজেকে খুবই ভাগ্যবান মনে হচ্ছে, যদিও রাত বলতে এই গহীন জঙ্গলে অন্ধকার নেমে আসে না, সুর্যটা এখনও ঠিক পশ্চিম আকাশে একটু হেলে আছে তবে প্রখরতা দিনের মত, ঘড়ির হিসেবে রাত এগারোটা হবে হয়তো| থাকার যে ঘরটি ঠিক তার পাশেই একটি ছোট ঘর যেখানে শুকনো কাঠ জালিয়ে বাষ্প স্নান বা ইংরেজিতে স্টিম বাথের (সুইডিশ ভাষায় যাকে বাসতু ”bastu” বলা হয়ে থাকে) ব্যবস্থা করা হয়েছে, রাতের খাবারের পর ঘুমাতে যাবার আগে সেখানে আর একবার আড্ডা হবে, প্রথম দিকে এই বাসতু বিষয়টি আমার মাথায় ঢুকছিল না, বন্ধু বান্ধবীদের মাঝে কয়েকজন বাসতু ঘরে কাঠের আগুনের তাপকে আবদ্ধ করে ঘরটাকে বেশ গরম করে নিচ্ছে এবার আমাদের সেই ঘরে ঢুকে যাবার পালা, ভেতরে ঢুকেই কিছু বুঝে ওঠার আগেই নিঃসংকোচে সংঘবদ্ধ ভাবে সবাই কাপড় জমা খুলে সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে বেঞ্চের উপর একে একে বসে যাচ্ছে, আমার মাথাটা বনবন করে ঘুরতে শুরু করলো, ঘটনাটা মেনে নিতে বা বুঝে উঠাতে খুব কষ্ট হচ্ছিলো, ভাবছি আমি কি ভুল করে এই ফিয়াল ভান্দ্রিং করতে চলে এলাম, প্রকৃতিকে ভালোবাসা মানেই যে অতি প্রাকৃতিক হয়ে যেতে হবে বিষয়টা মেনে নিতে পারছিলাম না, ভাবছিলাম এই অসভ্যতার কারণটা কি, এতো সভ্য একটা জাতি, কি অসাধারণ তাদের আচার ব্যবহার নম্রতা আর তারাই কি আমারই সামনে আজ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ভাবে নিঃসংকোচে উলঙ্গ হয়ে গেল ? আমি মনে মনে স্থির করে ফেলেছি আমি এই অসভ্যতার মাঝে নিজেকে সমর্পণ করতে পারবনা, আমাকে এখান থকে পালাতে হবে কিন্তু পালাবো কি ভাবে আমি যে গহীন এক জঙ্গলে বন্ধুদের সাথে ফিয়াল ভান্দ্রিং করতে এসেছি | নিজের উপর বেশ রাগ হচ্ছিলো, ভাবছি বিষয়টি আমার আগে থেকেই জেনে আসা উচিত ছিল, প্রকৃতিতে প্রাকৃতিক হতে গিয়ে যে এই জাতি সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে পরে সেটা জানলে হয়তো আমার এতটা প্রাকৃতিক হবার খায়েশ হতো না | যখন সবার চোখের দিকে তাকালাম আস্তে আস্তে বুঝতে পারছি আসলে অশ্লীল ও কুৎসিত চিন্তা ভাবনাটা শুধু আমারই মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল, অন্যরা খুবই স্বাভাবিক ভাবেই একে অপরের সাথে চোখে চোখ রেখেই গল্প আর আড্ডায় ব্যস্ত, কেউ ভুলেও কারুর উলঙ্গতাকে উৎসুক দৃষ্টি নিয়ে অবলোকন করছে না, বিষয়টা এতোই স্বাভাবিক এতটা প্রাকৃতিক যে আমার মত অসভ্য একজন অশিক্ষিতের মাথায় সেটা বোধগম্য না হবারই কথা, কারণ সেই দৃষ্টি আর চিন্তা করার মত সমাজ বা পরিবেশে আমার জন্ম হয়নি, নগ্নতা যে একটি প্রাকৃতিক বিষয় সেটা বোঝার মত শিক্ষা ও জ্ঞান আমি আজও রপ্ত করতে পারিনি | পুরো বিষয়টা অনুধাবন করার পর নিজেকে খুব অসভ্য আর বিবেকহীন মনে হচ্ছে, আজই প্রথম বুঝতে পারছি সভ্যতার আলো আমার হৃদয়ে আজও পৌঁছায়নি | আমারা বন্ধু বান্ধব যারাই আজ প্রকৃতির সৌন্দর্যের স্বাদ গ্রহণ করতে সভ্যতাকে পেছনে ফেলে গহীন জঙ্গলে ঘুরে বেড়াচ্ছি তারা সবাই প্রকৃতির সম্পদ এখানে জাত ধর্ম বর্ণ গোত্র কিছুই প্রাধান্য পায় না | আমরা সবাই মানুষ, সবাই মানুষ গোত্রে অন্তর্ভুক্ত আর এটাই আমাদের বড় পরিচয় |
//// মাহবুব আরিফ কিন্তু

Comments

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

কিন্তু
কিন্তু এর ছবি
Offline
Last seen: 4 দিন 22 ঘন্টা ago
Joined: শুক্রবার, এপ্রিল 8, 2016 - 5:41অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

ফেসবুকে ইস্টিশন

SSL Certificate
কপিরাইট © ইস্টিশন.কম ® ২০১৬ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর