নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 3 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • ড. লজিক্যাল বাঙালি
  • দীব্বেন্দু দীপ
  • নুর নবী দুলাল

নতুন যাত্রী

  • রিপন চাক
  • বোরহান মিয়া
  • গোলাম মোর্শেদ হিমু
  • নবীন পাঠক
  • রকিব রাজন
  • রুবেল হোসাইন
  • অলি জালেম
  • চিন্ময় ইবনে খালিদ
  • সুস্মিত আবদুল্লাহ
  • দীপ্ত অধিকারী

আপনি এখানে

প্রবাসের অখ্যাত গল্প-২


সকাল থেকেই স্টকহোল্মের পাতাল ট্রেনে চড়ে শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে উদ্দেশহীন ভাবে ঘুরে বেড়াই, যে দিকেই যাই দেখে মনে হয় শহরটা যেন কোন এক চিত্রকর তার রং তুলির আঁচড়ে অপরূপ করে সাজিয়ে রেখেছেন, মানুষগুলো খুবই কম কথা বলে তবে কাউকে সাহায্য করতে তাদের একাগ্রতার কোনই অভাব থাকেনা, এদেশের মানুষগুলোর ভদ্রতা দেখে নিজেকে খুবই অপরাধী মনে হয় কারণ আমি কোনদিনই ঢাকায় বিপদে পরা মানুষকে রাস্তা ঘাটে এতটা আন্তরিক ভাবে সাহায্য করতে এগিয়ে আসি নাই, এই অপরাধ বোধটা আমাকে নিদারুণ ভাবেই বিবেককে দংশন করে | রাস্তার পাশের পার্কগুলোতে হাজার রকমের বাহারি ফুলের সমাহার কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে মানুষজন ঠিক ফুলের দোকান থেকেই প্রয়োজনে ফুল কিনে নিচ্ছে, কেউ ভুলেও গাছের একটা ফুল ছিঁড়ে নিচ্ছে না | যতই দেখছি ততই অবাক হচ্ছি এদেশের মানুষের মানসিকতা দেখে, প্রতিটি মানুষ যেন মানুষের পাশে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতেই সকাল থেকে ঘুম থেকে জেগে ওঠে।

অপরাধ প্রবণতা নাই বললেই চলে, জেলখানাগুলো কয়েদীর অভাবে খা খা করছে, শুনেছি অনেক জেলখানা কয়েদীর অভাবে বন্ধ করে দিচ্ছে | ভাবতেই অবাক লাগে মানুষের আচার ব্যবহার ভৌগোলিক ও পরিবেশগত ভাবে কতই না পার্থক্য | ইউরোপের এই মানুষগুলো সভ্য হয়েছে অনেক পরিশ্রম আর অধ্যবসায়ের পর, এখানকার মানুষরাও একসময় অসভ্য ছিল, চারশত বছরের আগে ইউরোপের হানাহানির ইতিহাস পড়লে আজও শিহরিত হই, এই ইউরোপ এডলফ হিটলারের জন্ম, ভাইকিংদের বর্বরতা নিয়ে একটি মহাকাব্য লেখা যেতে পারে, এই ইউরোপেই ধর্মীয় শাসন আমলে রাস্তা ঘাটে পিতৃহীন সন্তানের মা ও যুবতীদের জন সম্মুখে পুড়িয়ে মারা হয়েছে, ১৬০০ শতাব্দীর ব্রিটেনের দারিদ্র্যতার কথা আমরা অনেক পড়েছি যখন মানুষ পাগল বা অক্ষম ভান করতো সামান্য খাবারের জন্যে বা বেঁচে থাকার তাগিদে, সমাজে দুর্নীতি আর অপরাধ প্রবণতা ছিল অসহনীয় পর্যায়ে, ইউরোপের মধ্যযুগের দারিদ্র্যতার সম্পর্কে খুব বেশি কিছু লেখা হয়নি। ইউরোপের দারিদ্রতার ইতিহাসকে কখনই গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়নি তবে ধনী এবং শক্তিশালীদের সম্পর্কে লেখা হয়েছে প্রচুর | আজ ঠিক এতগুলো বছর পর সভ্যতার উৎকর্ষতায় ঝলমল করছে এখানকার সমাজ, মানুষ ও গণতন্ত্র | যতই ভাবি আমার শুধুই অবাক হবার পালা, কি মোহে আমি যে ইউরোপে চলে আসি আমার নিজেরই জানা নাই তবে আমি যে এখানে এসে ভুল করিনি সে বিষয়ে নিশ্চিত, জানার আর দেখার তো শেষ নাই, কি জানি এক জীবনে এতো কিছু জানা হবে কি না !
থাকার জন্যে আপাতত এক পরিচিত পারার বড় ভাইয়ের স্টুডেন্ট এপার্টমেন্ট এক জনের বাসায় আমার গাদাগাদি করে ৪ জন থাকি, আমি থাকি দোতলাতে মানে দোতলার বিছানার উপরের তলাতে, রান্নাবান্না করার জন্যে করিডোরের একটাই কমন রান্না ঘর তাই রান্না করার সময় দেশীয় মসল্লার সুগন্ধির সুবাসে বাকী সবাই প্রশংসায় পঞ্চমুখ, এভাবেই দিন কেটে যায়, কেটে যাবে, কেটে যাচ্ছে |

সামারের পরেই আমার ভাষা শিক্ষার ক্লাস শুরু হবে, তিন মাস হাতে প্রচুর সময় ঘুরেফিরে দেখার জানার শেখার তো আর শেষ নাই, দিনের চাইতে রাতের সময়টাই বেশ ভাল লাগে বিশেষ করে ডিস্কতে যেতে পারলেই যেন জীবনের ষোলকলা পূর্ণ হলো | সুইডেনে বাঙালিদের সংখ্যা ঠিক কত সেটা আমার সঠিক ভাবে জানা নাই, সাত থেকে আট হাজার হবে হয়তো তবে পারত পক্ষে বাঙালিদের এড়িয়ে চলতেই অভ্যস্ত হয়ে গেছি তার অবশ্য একটা বিশেষ কারণ ছিল, বুঝতে পারতাম আমার চিন্তাধারার সাথে সংখ্যা গরিষ্ঠ বাঙালিদের মাঝে বিস্তর ফারাক, রাস্তার পাশে রেস্তরাতে বসে দু গ্লাস বিয়ার টেনে নেয়া বা বান্ধবীদের নিয়ে পার্কে বসে আড্ডা দেয়া কি সাথে একজন স্বর্ণকেশী বান্ধবী থাকাটা বাঙালী সমাজ, ধর্ম, জাতি সব কিছুরই বিপক্ষে চলে যায়, সহসাই উপলব্ধি করতে শুরু করলাম কেন যেন তারা আমাকে বাঙালী সমাজের এক কুলাঙ্গার বৈ অন্য কিছুই ভাবছেন না, এমত অবস্থায় নিজেকে বাঙালি সমাজ থেকে গুটিয়ে রাখা ছাড়া অন্য কোন পথও আমার সামনে খোলা নাই |

বাংলাদেশের কুসংস্কার পূর্ণ ধর্মীয় শাসনের কঠিন বেড়াজাল থেকে বেড়িয়ে এসে মুক্ত স্বাধীন সমাজ ব্যবস্থায় আমার অবস্থা অনেকটা অল্প পানির মাছ গভীর পানিতে হাবুডুবু খাওয়ার মত, কোন কিছুই স্বাভাবিক ভাবে নিতে খুব সংকোচের মাঝে পরে যাচ্ছি | দেশে থাকতে মনের গহীনে মেনে নিয়েছিলাম একটি ছেলের সাথে একটি মেয়ের ভালোবাসা সংক্রান্ত বিষয়গুলো খুবই গোপনীয় আর তাদের দেখা সাক্ষাৎ মানেই বিশাল এক যুদ্ধ জয়ের মত ঘটনা, সমাজ পরিবেশ নিয়ম আচার সব কিছুই তো ভালোবাসা প্রকাশের কঠিন অন্তরায়, নিজেকে খুব ভাগ্যবান মনে হচ্ছে, আজ সুইডেনে এলাম বলেই ভালোবাসায় যে জাত ধর্ম বর্ণ গোত্র এসবের ঊর্ধ্বে তা শুধু বই পুস্তকেই পড়েছি কিন্তু বাস্তবে তা উপলব্ধি করার বা দেখার সুযোগ জীবনে এই প্রথম ঘটলো | সূর্য ঝলমল দিনের আলো ফুটে উঠতেই এ দেশের মানুষের মাঝে যেন বাধ ভাঙ্গা ভালোবাসা উথলে ওঠে, পাতাল ট্রেনের কামরার এক প্রান্তে বসে আছি, গন্তব্যে পৌঁছতে আরও আধঘণ্টার মত বাকী, দরজার পাশেই দুজন আঠারো কি বিশ বছরের যুবক যুবতী দাড়িয়ে আছে, হয়তো আমার বয়সেরই হবে তাদের চোখে মুখে একের প্রতি অপরের জনের স্বর্গীয় অপলক দৃষ্টি বিচ্ছুরিত হচ্ছে আর আমার মনটাকে উথাল পাতাল করে দিচ্ছে, একজন অপর জনের গায়ের সাথে নিবিড় ভাবে লেপটে আছে একজনের ঠোট অপরজনের ঠোটের মাঝে স্বর্গের স্বাদ আহরণ করছে, মনে হচ্ছে এই ট্রেনের কামরাটা একটা স্বাধীন মুক্ত বাধাহীন ভালোবাসা প্রকাশের উন্মুক্ত জায়গা, ট্রেনের অন্য সব যাত্রীরা যে যার মত বসে আছে এই অপরূপ দৃশ্যের প্রতি কারুরই কোনই ভ্রূক্ষেপ নেই অথচ আমি গোগ্রাসে এই অপরূপ দৃশ্য অবলোকন করছি আর ভাবছি আমার জন্মটাই যেন আজন্মের পাপ আমি নিজে কেন এমন ভাগ্য নিয়ে জন্ম নিতে পাড়ি নাই, কেন এমন সমাজে জন্ম নিলাম যেখানে উন্মুক্ত ভালোবাসা মানেই অন্যায় অপরাধ অশ্লীল ? পাশের বাসার রমিতাকে তো আমারও খুব ভাল লাগতো কই আমিতো কোনদিন আমার ভালোবাসার অনুভূতি তার কাছে এমন উন্মুক্ত ভাবে প্রকাশ করতে পারিনি, বড়জোর তাদের বাসার আসে পাশে সন্ধেবেলা দুএকবার শীষ দিয়ে আমার ভালোবাসার কথা জানান দিয়েছি, জানালার ধারে রমিতাকে হয়তো দুএকবার দেখেছি ভেবেছি একদিন আমাদের প্রেম হবে কাছে আসবো, দুজনাতে সমুদ্রের পাড় ঘেঁষে হাত ধরে হেটে যাবো বহুদূর উদ্দেশ্যহীন অন্ত-হীনভাবে, তারপর একদিন সেই রমিতা জীবন থেকে হারিয়ে গেল, বিয়ে করলো একজন জুয়েলার্সের মালিকের ছেলেকে, শুনেছি সুখেই ছিল ভাল ছিল তার জীবন, দূর থেকে বুকে কষ্ট নিয়ে আমার এই সুপ্ত ভালোবাসা আর তাকে জানানো হয়নি, প্রবাস থেকে দেশে গিয়ে তাকে একবার দেখার ইচ্ছা শুধুই মাত্র একবার তাকে দেখার আশা বুকে লালন করে খবর নিয়ে জানতে পারলাম দুবছর আগেই রমিতা মরণ ব্যাধি ক্যান্সারে পৃথিবীর সকল মায়া ত্যাগ করে চলে গেছে, আর আমি ফিরে গেলাম সেই প্রবাসেই | বেচে আছি বেঁচে থাকতে হয়, আজো স্বপ্ন দেখি একটু মুক্ত স্বাধীন ভালোবাসার সমাজ দেখবো বলে, মানুষ মানুষকে ভালবাসবে যেখানে থাকবে না কোন জাত কোন ধর্ম কোন বর্ণ, প্রত্যাশা করি একটি সুস্থ সুন্দর কুসংস্কার মুক্ত ভালোবাসার সমাজ |
/// মাহবুব আরিফ কিন্তু

Comments

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

কিন্তু
কিন্তু এর ছবি
Offline
Last seen: 2 দিন 10 ঘন্টা ago
Joined: শুক্রবার, এপ্রিল 8, 2016 - 5:41অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

কু ঝিক ঝিক

ফেসবুকে ইস্টিশন

SSL Certificate
কপিরাইট © ইস্টিশন.কম ® ২০১৬ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর