নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

There is currently 1 user online.

  • ড. লজিক্যাল বাঙালি

নতুন যাত্রী

  • অন্নপূর্ণা দেবী
  • অপরাজিত
  • বিকাশ দেবনাথ
  • কলা বিজ্ঞানী
  • সুবর্ণ জলের মাছ
  • সাবুল সাই
  • বিশ্বজিৎ বিশ্বাস
  • মাহফুজুর রহমান সুমন
  • নাইমুর রহমান
  • রাফি_আদনান_আকাশ

আপনি এখানে

জোডিয়াকঃ এক ভয়ংকর সিরিয়াল কিলার ও তার পাঠানো চিঠি


(ভূমিকাটুকু সানন্দে স্কিপ করতে পারেন)
সিরিয়াল কিলারদের নিয়ে আমার আগ্রহটা বহুদিনের। ঠিক কোন কারণে একজন মানুষ একের পর একে হত্যা করে, হত্যা করে সে আনন্দই বা পায় কেন, কীভাবে একজন প্রশাসনের নজর এড়িয়ে একের পর এক খুন করে চলে- এমন সব প্রশ্ন মাথায় তেলাপিয়া মাছের পোণার মত হোৎলায়। সবচেয়ে বেশি কৌতূহল জাগায়, সেসব সিরিয়াল কিলার, যাদের পরিচয় এখন পর্যন্ত অপ্রকাশিত- শত প্রচেষ্টা করেও যাদের সম্পর্কে বিস্তারিত কিছুই খুঁজে পায়নি ইনভেস্টিগেটরেরা।

সেই আগ্রহের পরদ আরেক কাঠি চড়িয়ে দিল ডেভিড ফিঞ্চার পরিচালিত জোডিয়াক মুভিটি। ক্যালিফোরনিয়ার এক সিরিয়াল কিলার ও তার হত্যাকাণ্ড নিয়েই গড়িয়ে চলে এর কাহিনী। অভিনয় করেছেন মার্ক রাফালো, রবার্ট ডাউনি জুনিয়রের মত বিশ্বখ্যাত অভিনেতারা। প্রায় তিন ঘণ্টার মুভিটি নিয়ে গিয়েছিল ষাট ও সত্তরের দশকের ক্যালিফোর্নিয়াতে। চোখের সামনে দৃশ্যায়ন করিয়েছে মার্ডারগুলো।

এক সিরায়াল কিলার, যে ‘জোডিয়াক’ নামেই পরিচিত হতে বেশি আগ্রহী, ৬০ এর দশকের শেষ থেকে ৭০ এর দশকের শুরু পর্যন্ত চালিয়ে গিয়েছে তার হত্যা মিশন। তা শিকারেরা ছিল প্রধানত নারী। পুলিশ রিপোর্ট অনুসারে এই সিরিয়াল কিলার হত্যা করেছে অন্তত পাঁচজনকে; আর তার নিজের দাবি, তার হাতে প্রাণ হারিয়েছে ৩৭ জন! খুন করেই চুপ থাকেনি জোডিয়াক। সেই খুনের বিবরণ দিয়ে চিঠিও লিখেছে বিভিন্ন পত্রিকা অফিসে! সেসবে থাকতো, তার করা সর্বশেষ খুনের খুঁটিনাটি বর্ণনা, যেসব শুধু তার পক্ষেই জানা সম্ভব যে খুনগুলো করেছে।

এতোসব কারবারের পরও, আজ তক তাকে খুঁজে পায়নি এফএসপিডি(সান ফ্রানসিস্কো পুলিশ ডিপার্টমেন্ট) থেকে শুরু করে এফবিআই পর্যন্ত। ইতিহাসে যে অল্পকজন সিরিয়াল কিলার অজ্ঞাত রয়েছে, যাদের সম্পর্কে কূলকিনারা পাওয়া যায়নি এপর্যন্ত- তাদের মধ্যে একজন ‘জোডিয়াক’। জোডিয়াক, জ্যাক দ্যা রিপারের মত অতোটা চাঞ্চল্য সৃষ্টি করতে না পারলেও, পেয়েছিল মিডিয়া কাভারেজ। তাকে নিয়ে লেখা বইগুলো হয়েছে বেস্টসেলার। প্রচুর মিথ, হাইপোথিসিস, থিয়োরি ছড়িয়ে পড়েছে মানুষের মনে। আর এখনো সে কৌতূহল জাগিয়ে চলেছে আমার মত কিছু মানুষের।

নেট ঘেঁটে, উইকিপিডিয়া, বায়োগ্রাফি ডট কম ও অন্যান্য ওয়েবসাইট ঘোরাঘুরি করে তার সম্পর্কিত তথ্য পেলাম কিছু। আর পেয়েছি তার পাঠানো চিঠিগুলো। সেসবের কয়েকটা চিঠি অনুবাদ করেছি বাংলায়- যদিও আমার অনুবাদদক্ষতা করুণা করার মত।
আজকেই ব্লগটা সেই জোডিয়াককে নিয়েই।


জোডিয়াক সম্পর্কে বলার আগে, সিরিয়াল কিলার ব্যাপারটা নিয়ে সামান্য একটু আলোচনা করে নেই ছোট্টকরে। এনিয়ে সবারই ধারণা আছে মোটামুটি, জানি। তবুও লিখছি- যারা এব্যাপারে জানেন ভালো করেই, প্যারাটা স্কিপ করে যেতে পারেন দুবার না ভেবে।

সিরিয়াল কিলারের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে নানা গুণী নানা মত দিলেও, সর্বজন মান্য সংজ্ঞাটা হচ্ছে- যে ব্যক্তি তার অস্বাভাবিক মনের বাসনা পূরণ করতে কোন স্বার্থ ছাড়াই, এক মাস বা তার অধিক সময় ব্যাপী তিন বা তার অধিক মানুষকে নিয়মিত বিরতিতে হত্যা করে, সেই সিরিয়াল কিলার!

অবশ্য এফবিআই এর মতে, কেউ দুই বা তার বেশি মানুষকে নিয়মিত বিরতিতে ব্যক্তিগত স্বার্থ ছাড়া খুন করলে, সে সিরিয়াল কিলার হিসেবে পরিগণিত হবে। অন্যান্য গুণীদের মতও এমন। পার্থক্য শুধু খুনের সংখ্যায়।

যদিও অস্বাভাবিক মনের কামনা পূরণের তাগিদেই সিরিয়াল কিলারেরা হত্যা করে থাকে একের পর এক- কিন্তু বেশিরভাগ সময় দেখা যায় এর সাথে যৌনতাও জড়িত অঙ্গাঙ্গী ভাবে। রেপ- অতঃপর হত্যা- সিরিয়াল কিলারের বেলায় এটা খুব স্বাভাবিক। প্রত্যেক সিরিয়াল কিলার অন্তত একজন হলেও সেক্স ওয়ার্কার বা যৌনকর্মীকে হত্যা করেছে। অনেক সিরিয়াল কিলার আবার পেডোফিলিক- শিশুকামী। সাধারণত তাদের লক্ষ্য হয় শিশু ও কিশোরী- অনেকসময় অল্পবয়সী ছেলেরাও।

রাগ, এডভেঞ্চারের প্রচণ্ড নেশা, আলোচনায় আসতে চাওয়ার বাসনা- এসবও অনেক সময় কারণ হয় সিরিয়াল কিলিং এর। তবে সিরিয়াল কিলিং এর মূল কারণ- বাজে অতীত। দেখা গিয়েছে, বেশিরভাগ সিরিয়াল কিলারেরই শৈশবে কিংবা কৈশোরে এমন কোন অভিজ্ঞতা হয়েছে যা তাদের মধ্যে জন্ম দিয়েছে প্রচণ্ড রাগ ও ঘৃণা- শেষে তা রুপ নিয়েছে মানসিক বৈকল্যে এবং অসুস্থতায়। পরিবার, বিশেষ করে পিতা মাতা- একটা শিশুর জীবনকে যতোটা প্রভাবিত করে, ততটা অন্য কিছু বা কেউ করতে অক্ষম। অনেক সিরিয়াল কিলারই শৈশবে পিতামাতার অত্যাচারের শিকার হয়েছে কোন না কোন ভাবে। হয়তো তাদের মনোযোগ পায়নি, হয়তো অবহেলা পেয়েছে কিবা তার পিতামাতার দাম্পত্য জীবন ছিল অসুখী। কিংবা হয়েছে মারধোরের শিকার। যৌন নির্যাতনও করা হয়েছে কারো কারো উপর।

মানসিকভাবে কিংবা শারীরিকভাবে নির্যাতিত শিশু অসুস্থ হতে বাধ্য। এই অসুস্থতাই জন্ম দিতে পারে একজন সিরিয়াল কিলারের।

অসুস্থ পারিবারিক প্রেক্ষাপট যে সিরিয়াল কিলার জন্ম দিতে পারে, এর সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ, টেড বান্ডি। টেড বান্ডি ছিল অত্যন্ত সুন্দর চেহারার অধিকারী। কোন মেয়ের মন জয় করতে তার খুব বেশি বেগ পেতে হতো না। অথচ কী করেনি সে? সিরিয়াল কিলিং, নারী নির্যাতন, প্রতারণা থেকে শুরু করে ডাকাতি পর্যন্ত খুব কম জঘন্য কাজ আছে, যা সে করেনি! এই টেড বান্ডির পারিবারিক অবস্থা ছিল টালমাটাল। সে জন্মের পর থেকেই মানুষ হয়েছে তার নানা-নানির কাছে। তাদেরই সে বাবামা হিসেবে জানতো। আর নিজের মাকে সে ভাবতো বোন! কিন্তু একদিন, সে জানতে পারে, এতোদিন থেকে যাদের সে মাবাবা হিসেবে জেনে আসছে, তারা তার নানা-নানি। আর তার বোনই তার আসল মা। অবশ্য সে তার বাবার পরিচয় জানতে পারেনি কোনদিনও। টেড বান্ডির নানা ছিলেন অত্যন্ত কড়া মেজাজের লোক। একদিন তিনি খুব বেশি ঘুমানোর কারণে, টেডের খালাকে সিড়ি থেকে আছড়ে ফেলে দিয়েছিলেন। তিনি মারধোর করতেন তার বৌকে। এমনকি তাদের বাড়ির কুকুরটাও তার মারধোর থেকে রেহাই পাইনি।

এমন পরিবেশেই জন্ম ও বেড়ে ওঠা টেড বান্ডির, যে পরবর্তিতে রুপান্তরিত হয় ইতিহাসের সবচেয়ে নিকৃষ্ট সিরিয়াল কিলারে। তার নির্মমতা আর হত্যার কথা বিতং করে বলবো না। শুধু এটুকু বলি, সে তার ভিক্টিমদের হত্যা করার পর তাদের ছবি তুলে ঘরে জমিয়ে রাখতো পরবর্তিতে রসিয়ে দেখার জন্য। তার ভিক্টিমেরা ছিল বেশিরভাগই মেয়ে- সে এতোটাই নির্মম ছিল যে, হত্যার পরও ভিক্টিমদের ছাড়ত না; সঙ্গম করত মৃতদেহগুলোর সাথে। ইতিহাসে যে অল্পকজন নেক্রফিলিক(মৃতকামী) আছে, তাদের মধ্যে টেড বান্ডি একজন।

অন্যদিকে, অনেক সিরিয়াল কিলার ছিল বাস্তব জীবনে প্রচণ্ড সফল ও মেধাবী। জ্যাক দ্যা রিপার হয়তো সবচেয়ে বিখ্যাত ও পরিচিত সিরিয়াল কিলার বিশ্বব্যাপী। লন্ডনের হোয়াইটচ্যাপেলে তিনি তার হত্যাকান্ডগুলো চালিয়েছেন। তার ভিক্টিমেরা ছিল মূলত পতিতা। হত্যার পর তিনি ভিক্টিমের শরীরে কাটিকুটি করতেন। গলা, পেট, যৌনাঙ্গ কাঁটার পর বের করে নিতেন বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের মতে, এসব নির্দেশ করে তার প্রখর মেডিকেল জ্ঞান। ধারণা করা হয়, কোন না কোন ভাবে চিকিৎসাশাস্ত্রের সাথে তিনি পরিচিত ছিলেন। যদিও তার পরিচয় আজ শত বছর পরও পাওয়া যায়নি।

আবার ‘হ্যারল্ড শিপম্যান’ নামের একজন সিরিয়াল কিলার ছিলেন সফল চিকিৎসক। ছাত্র জীবনে রাগবি খেলোয়াড় ছিলেন তিনি- স্কুল জীবনের শেষদিকে হয়েছিলেন অ্যাথলেট টিমের ভাইস ক্যাপ্টেন। গ্রানাডা টেলিভিশনে সাক্ষাৎকারও দিয়েছিলেন তিনি চিকিৎসা শাস্ত্রের কোন এক বিষয়ের উপর!
অথচ হ্যারল্ড শিপম্যানের ভিক্টিমের সংখ্যা অন্তত ২৫০ জন।

দেখা যাচ্ছে, অনেকেই যেমন নির্যাতনের শিকার হয়ে- বাজে অতীতের তাড়ায় কিংবা মানুষের নিষ্ঠুর অবহেলার কারণে সিরিয়াল কিলিং বেঁছে নিয়েছে, তেমনি অনেকই একের পর হত্যা করেছে হত্যা করারই নেশায়। খেলাচ্ছলে। জীবন নিয়ে খেলার চাইতে থ্রিলিং খেলা আর কী হতে পারে?

বেশিরভাগ সিরিয়াল সিলারই ধরা পড়েছে ইনভেস্টিগেটরের হাতে। অনেকেই করেছে আত্মসমর্পন। কিন্তু এখন পর্যন্ত খতরনাক কিছু কিলারের খোঁজ পাওয়া যায়নি। হয়তো যাবেও না কোনদিন। বা গেলেও করা যাবে না শাস্তির ব্যাবস্থা। জোডিয়াক- যাকে নিয়ে লিখবো এখন, তাদের মধ্যে একজন।

জোডিয়াক


হঠাৎ একটি খুন
২০ ডিসেম্বর, ১৯৬৮। স্থানঃ বেনিসিয়া সিটি
বেটি জেনসেন ও ডেভিড ফ্যারাডের প্রথম ডেট ছিল সেদিন। তাদের পরিকল্পনা ছিল, একটা ক্রিসমাস কন্সার্ট উপভোগ করার। কিন্তু সেদিন পরিকল্পনা মাফিক হচ্ছিল না কিছুই। কনসার্টের পরিবর্তে এক বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে তারা কিছুটা সময় কাটায়। এরপর একটা রেস্টুরেন্টে কিছু খেয়ে ‘লেক হেরমান রোড’ ধরে গাড়ি ড্রাইভ করে যাচ্ছিল তারা। রাত প্রায় সোয়া দশটা নাগাদ ফ্যারাডে তার গাড়িটা পার্ক করে ‘লাভার’স লেন’এ।

এর কিছুক্ষণ পর, রাত ১১ টা নাগাদ তাদের মৃতদেহ পাওয়া যায়। স্টেলা বোর্গেস নামের এক পথচারী মৃতদেহ দুটি খুঁজে পান।

ফরেনসিক ডাটা রিপোর্ট বিশ্লেষণ করে, বিশেষজ্ঞরা ধারণা করেছেন- রাত ১১ টার দিকে ঠিক বেটি জেনসেন ও ডেভিড ফ্যারাডের কারের পাশে আরেকজন এসে তার কার পার্ক করে। ২য় কারের চালক, তাদের গাড়ি থেকে বেরুতে আদেশ করলে, বেড়িয়ে আসতে শুরু করে তারা দুজন। সম্ভবত, ফ্যারাডে বের হওয়ার আগেই জেনসেন বেড়িয়ে আসে। আর সাথে সাথেই গুলি করে বসেন সেই আগুন্তক, ফ্যারাডের মাথায়। বেটি জেনসেন পালানোর চেষ্টা করলে, আততায়ী গুলি করে তার পিঠে।

বেটি জেনসেনের লাশটা পাওয়া গিয়েছিল ফ্যারাডের মৃতদেহ থেকে আটফুট দূরে। তার পিঠ ভেদ করেছিল পাঁচটা গুলি।

দ্বিতীয় খুন
৪ জুলাই, ১৯৬৯। স্থানঃ ভায়েহো, ক্যালিফোর্নিয়া।

ডারলেন ফেরিন ও মিসেল ম্যাগিউ মধ্যরাতের খানিক আগে পৌঁছল ‘ব্লু রক স্প্রিং পার্কে’। পার্কটা ১৯৬৮ সালের সেই হত্যাস্থল থেকে মাত্র ৪ কিলোমিটার দূরে। যখন তারা দুজন কারের ভিতরে বসে ছিল, আরেকটা কার এসে থামে তাদের পিছনে। কিন্তু ২য় কারটি সাথে সাথেই চলেও যায়। প্রায় ১০ মিনিট পর কারটি ফিরে আসে আবার।

২য় কারের চালক নেমে এসে এগিয়ে যায় ফেরিন ও মিসেলের দিকে। তার হাতে ছিল একটা ফ্ল্যাশলাইট ও একটা ‘নাইন মিলিমিটার লুগার’। আগন্তুক ফ্ল্যাশলাইটের তীব্র আলো সরাসরি ফেরিন ও মিসেলের চোখে ফেলে। এরপর গুলি করেন পরপর পাঁচবার।
দুজনই আহত হন এতে। কয়েকটা বুলেট ঢুকেও যায় তাদের দেহে।
আততায়ী গুলি করে চলে যাচ্ছিল, কিন্তু ম্যাগিউ এর গলার আওয়াজ পেয়ে সে আবার ফিরে আসে। এবারে দুজনের দিকে দুটো করে গুলি চালায় আততায়ী।

পরদিন, ভায়েহো পুলিশ ডিপার্টমেন্টে ফোন আসে একটা। ফোনের ওপারের ব্যক্তি দাবি করে, সেই গতদিনের হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ি। ছমাস আগে, ডেভিড ফ্যারাডে ও বেটি জেনসেনের মৃত্যুও হয়েছে তারই হাতে।

পুলিশ সেই ফোনটা ট্রেস করতে সক্ষম হয়। ফোনটা করা হয়েছিল একটা গ্যাস স্টেশন থেকে, যেটা ভেয়েহো পুলিশ ডিপার্টমেন্ট থেকে মাত্র কয়েক ব্লক দূরে!
এই হত্যাচেষ্টায় বেঁচে যায় ম্যাগিউ- যদিও গুলি লেগেছিল তার বুকে, মুখে ও গলায়। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও ফেরিসকে বাঁচাতে পারেননি চিকিৎসকেরা।

একটি অপ্র্যতাশিত চিঠি

১৯৬৯ সালের পহেলা আগস্ট। তিনিটি পত্রিকা- ‘ভায়েহো টাইমস হেরাল্ড’, সানফ্রানসিসকো ক্রনিকাল ও দ্যা সানফ্রানসিসকো এক্সামিনার- পায় একটি করে রহস্যজনক চিঠি। তিনটা চিঠির দাবি প্রায়ই এক। চিঠি লেখকের দাবি, সে-ই লাভাসস লেন ও ‘ব্লু রক স্প্রিং পার্কের’ হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটিয়েছে। প্রত্যেক চিঠির সাথে ছিল একটি করে ক্রিপ্টোগ্রাম। লেখক বলছেন, এই ক্রিপ্টোগ্রামের মধ্যেই লুকায়িত আছে তার পরিচয়। দ্যা ক্রনিকাল সেই ক্রিপ্টোগ্রামটি প্রকাশ করে। কারণ, লেখক হুমকি দিয়েছিল, যদি তার ক্রিপ্টোগ্রামটি পত্রিকায় না ছাপানো হয়, তবে সে আরও অন্তত এক ডজন মানুষ হত্যা করবে!

চিঠিটি অনুবাদ করে দিলাম-

সম্পাদক সমীপেষু,
আমি সেই মার্ডারার বলছি, যে গত ক্রিসমাসে দুজন টিনএজারকে লেক হেরমানের পাশে ও ৪ জুলাই ভায়েহো গলফ কোর্সের পাশে একটা মেয়েকে হত্যা করেছে। সেই হত্যাগুলো যে আমিই করেছি, তার প্রমাণস্বরূপ কিছু বিষয় তুলে ধরবো, যেসব শুধুমাত্র পুলিশ আর আমিই জানি।

ক্রিসমাস
১। গুলিটির ব্র্যান্ড নাম হলো সুপার-এক্স।
২। মোট দশবার গুলি করা হয়েছিল
৩। ছেলেটা চিত হয়ে পড়েছিল, তার একটা পা ছিল গাড়ির দিকে তাক করা।
৪। মেয়েটি তার বাম পাশে ভর দিয়ে ছিল, পা ছিল পশ্চিম দিকে
৪ জুলাই
১। মেয়েটার পরনে ছিল ‘paterned slacks’
২। ছেলেটার হাঁটুতে গুলি করা হয়েছিল
৩। গুলিটির প্রস্তুতকারক ওয়েস্টার্ন
চিঠিগুলোর সাথে সাইপারের একটা অংশ যুক্ত করা হলো, বাকি দুটো অংশ পাঠানো হবে ভায়েহো টাইমস ও সানফ্রানসিসকো এক্সামিনারের সম্পাদকের ঠিকানায়।
আমি চাই এই সাইপারটি আপনাদের পত্রিকার প্রথম পাতায় ছাপানো হোক। এর মধ্যেই লুকায়িত আছে আমার পরিচয়।
যদি সাইপারটি পহেলা আগস্ট, শুক্রবারের সান্ধ্য সংখ্যায় ছাপানো না হয়, আমি আমার হত্যানুষ্ঠান [killing rampage] শুরু করে দেব। রাতের অন্ধকারে হত্যা করব নিঃসঙ্গ মানুষদের। তারপর আবার। যতক্ষণ না এক ডজন পূর্ণ হচ্ছে।

সেই ক্রিপ্টোগ্রাম বা সাইপারটি সানফ্রানসিসকো ক্রনিকালের চতুর্থ পৃষ্ঠায় ছাপানো হলে, এক শিক্ষক দম্পতী ক্রিপ্টগ্রামটা সমাধান করতে সক্ষম হন। কিন্তু খুনি তার নিজের পরিচয় প্রকাশ করেনি সেখানে।

ক্রিপ্টোগ্রামটা যা বলছে-

“আমি মানুষ হত্যা করতে পছন্দ করি, কারণ এটা একটা মজা। এটা বন্য জন্তু হত্যা করার চাইতেও বেশি মজাদার। কারণ মানুষ সবচাইতে ভয়ংকর জন্তু [MOST DANGEROUS ANIMAL OF ALL]। কোন কিছু হত্যা করলেই আমার অত্যন্ত রোমাঞ্চক অভিজ্ঞতা হয়। এটা এমনকি কোন মেয়ের সাথে শোয়ার চাইতেও ভালো অভিজ্ঞতা। এর সবচেয়ে ভালো দিকটা হলো, আমি মারা যাওয়ার পর স্বর্গে পুনর্জন্ম নেব; আর যাদের আমি হত্যা করেছি, তারা হবে আমার ক্রীতদাস। আমি তোমাদের আমার নাম জানাবো না। কারণ তোমরা আমার পরজন্মের জন্য ক্রীতদাস সংগ্রহকে মন্থর ও বন্ধ করে দেবে। “EBEOPIETEMETHHPITI”

উল্লেখ্য, ক্রিপ্টগ্রামটিতে কয়েকটা বানান ভুল ছিল।

দ্যা সানফ্রানসিসকো ক্রিনিকালে ক্রিপ্টোগ্রামটির সাথে একটি আর্টিকেল প্রকাশিত হয়। সেখানে মার্ডারারের ব্যাপারে অসন্তোষ প্রকাশ করে বলা হয়, সে যেন আবারও একটা চিঠি লেখে। সেই চিঠিতে যেন মার্ডারগুলো সম্পর্কে আরও তথ্য থাকে, যাতে তার ব্যাপারে মানুষের কোন সন্দেহ না থাকে।

এর কিছুদিন পর, ৭ আগস্ট, সানফ্রানসিসকো এক্সামিনার আরেকটা চিঠি পায় সেই আর্টিকেলের জবাবে। চিঠিটা শুরু হয় এভাবে- “Dear Editor, This is the Zodiac speaking.” । প্রথমবারের মত জোডিয়াক নামটা উচ্চারিত হয় এই চিঠি পাওয়ার পর। সে চিঠিতে হত্যা করার মুহূর্তগুলোকে ‘গুড টাইমস’ হিসেবে আখ্যায়িত করে জোডিয়াক।

“সম্পাদক সমীপেষু,
জোডিয়াক বলছি।
আপনার ভায়েহোতে আমার কাটানো ‘ভাল সময়’ সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানতে চেয়েছেন, তারই জবাব লিখছি। আপনাদের সে সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানাতে পেরে আমি অত্যন্ত আনন্দিত। বাই দ্যা ওয়ে, পুলিস কি আমার পাঠানো কোডের সাথে ‘ভালো সময়’ কাটাচ্ছে? তাদের বলুন, আরো উজ্জীবিত হতে, কারণ তারা কোডটা ভাঙতে পারলেই আমাকে ধরতে পারবে।

৪ জুলাইয়ের ঘটনাবলীঃ
আমি কারের দরজা খুলিনি, জানালাটা অলরেডি নামানোই ছিল। ছেলেটা আসলে ফ্রন্ট সিটে বসে ছিল, যখন আমি গুলি চালানো শুরু করি। আমি যখন তার মাথায় প্রথমবার গুলিটা করি, সে লাফিয়ে পিছনে সরে যায়, এতে লক্ষ্যভ্রষ্ট হই আমি। সে সবশেষ পিছনের সিট থেকে ফ্লোরে চলে যায়। সে পা ছুড়ছিল এলোপাথাড়ি। এভাবেই আমি তার পায়ে শুট করি। আমি হন্তদন্ত হয়ে খুব জোরে গাড়ি চালিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করিনি, যেমনটা ভায়েহো টাইমস দাবি করেছে। আমি আস্তেসুস্থে ঘটনাস্থল থেকে কেটে পড়ি, যাতে কেউ আমার কারকে লক্ষ্য না করে। যে লোকটা বলেছে, আমার কারের রঙ ছিলও ব্রাউন, সে বয়স ৪০-৪৫ এর ময়লা জামাজুতো পরিহিত এক নিগ্র। আমি যখন একটা ফোনবুথে দাঁড়িয়ে ভায়েহো পুলিশদের সাথে মজা নিচ্ছিলাম, সে তখন পাশ দিয়ে হেঁটে গিয়েছিল। আমি ফোন রাখার পর সেই বালের জিনিসটা বেজে উঠেছিল আর সেটাই আমার আর আমার কারের দিকে তার মনোযোগ আকর্ষণ করে।

গত ক্রিসমাসঃ
সেই এপিসোডে, পুলিশ ভেবে পাচ্ছিল না, কীকরে আমি অন্ধকারে ভিক্টিমদের দিকে গুলি চালাতে ও আঘাত করতে পেরেছি। কিন্তু তারা খোলসা করে না বলে শুধু ইঙ্গিত দিয়েছিল যে, জায়গাটা সে রাতে যথেষ্ট আলোকিত ছিল। আমি দিগন্ত রেখা দেখতে পারছিলাম। কিন্তু সব ছিল পাহাড় আর গাছে ঢাকা।

আমি যেটা করেছিলাম সেটা হলো, টেপ দিয়ে আমার বন্দুকের ব্যারেলের সাথে একটা পেনসিল ফ্ল্যাশলাইট আটকে দিয়েছিলাম। লক্ষ্য করে দেখবেন, যদি কোন টর্চ অন্ধকারে কোন ওয়ালে বা সিলিং এ তাক করেন, তবে একটা ৩-৬ ইঞ্চি অন্ধকার অংশ দেখতে পাবেন একেবারে কেন্দ্রে। যদি বন্দুকের সাথে টেপ দিয়ে ফ্ল্যাশলাইট লাগান, তবে গুলিটা এক্কেবারে সেই অন্ধকার অংশের কেন্দ্রে গিয়ে লাগবে। আমাকে শুধু পানি ছিটানোর মত করে সেটা করতে হয়েছিল।
আপনারা আমাকে ফ্রন্ট পেজে জায়গা দেননি, এটা দেখে মোটেও খুশী হইনি আমি।

চিঠিটার শেষে কোন ঠিকানা লেখা ছিল না।

লেক বেরিয়াসা অ্যাটাক
৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৬৯।

প্যাসিফিক ইউনিয়ন কলেজের ছাত্র ব্যারিয়ান হার্টনেল ও সিসিলিয়া শেপার্ড লেক বেরিয়াসার একটা ছোট্ট আইল্যান্ডে পিকনিক করছিলেন। জায়গাটা নির্জন- কোলাহল থেকে দূরে। অনেক ভাগ্য করলে মানুষের মুখ দেখা যায়।

আচমকা, একজন কালো হুডি পরিহিত ব্যাক্তি এগিয়ে আসে তাদের দিকে। অনাহুত ব্যক্তিটির মুখ কালো কাপড়ে ঢাকা ছিল, চোখে ছিল সানগ্লাস। তার হাতে ছিলো ফোরটি ফাইভ অটোম্যাটিক কোল্ট পিস্তল। সে পিস্টলটি ব্যারিয়ান ও সিসিলিয়ার দিকে তাক করে বলে, তার কিছু টাকা ও একটি কার লাগবে মেক্সিকো পালিয়ে যেতে। কারণ সে মন্টনার একটা শহরে একজন গার্ডকে হত্যা করেছে।

তার কাছে প্ল্যাস্টিকের দড়ি ছিল। আগুন্তক দড়িটা শেফার্ডের দিকে ছুড়ে দিয়ে বলে হার্টনেলকে শক্ত করে বাঁধতে। শেফার্ড হার্টনেলকে বাঁধলে আগুন্তক নিজেই বাঁধে শেফার্ডকে। তারপর শুইয়ে দেয় দুজনকেই।
তারা ভেবেছিল এটা একটা সাধারণ ডাকাতি। কিন্তু আগন্তুক একটা ছুরি বের করে এলোপাথাড়ি তাদের পিঠে কোপ মারতে থাকে বারংবার। এরপর চলে যায় সে।
যাওয়ার আগে হার্টনেলের কারে একটা বৃত্তাকার সিম্বল আঁকে। তার নিচে লেখে, “Vallejo/12-20-68/7-4-69/sept 27-69-6.30/by knife”

উল্লেখ্য, ১২-২০-৬৮ অর্থাৎ ১৯৬৮ সালের ডিসেম্বরের ২০ তারিখে বেটি জেনসেন ও ডেভিড ফ্যারাডেকে হত্যা করা হয় ও ১৯৬৯ সালের ৪ জুন তারিখে ফেরিন ও ম্যাগিউ এর উপর আক্রমণ চালায় অজ্ঞাত একজন; যে আক্রমণে নিহত হয় ফেরিস। আর সেপ্টেম্বর ২৭ ছিল সে দিনটিই। ৬.৩০ আক্রমণের সময়। মার্ডারার বোঝাতে চেয়েছে, এই দুইজনকে যেমন যে ছুরি দিয়ে হত্যা করেছে, তেমনি হত্যাযজ্ঞে মেতে উঠেছিল উল্লেখিত দিনগুলিতেও।

আক্রমণের ঠিক এক ঘণ্টা পর, 7.30PM এ খুনি নাপা কাউন্টির শেরিফের অফিসে ফোন করে লেক বেরিয়াসার হত্যার দায় স্বীকার করে। ফোনটা করা হয়েছিল শেরিফের অফিস থেকে মাত্র কয়েক ব্লক দূরে। আক্রমণস্থল থেকে সেটা ছিল ২৭ মাইল দূরে।
এই আক্রমণে সিসিলিয়া শেফার্ড মৃত্যুবরণ করেন, বেঁচে যান বেরিয়ান হার্টনেল।
আক্রমণের ধরণ, কারের সেই চিহ্ন ও নোট থেকে ধারণা করা হয়, হামলাটি করেছে জোডিয়াক।

এক ট্যাক্সি ড্রাইভার খুন
১১ অক্টোবর, ১৯৬৯। লেক বেরিয়াসা অ্যাটাকের দুই সপ্তাহ পর।

পল স্টাইনের ট্যাক্সি ক্যাবে উঠল এক প্যাসেঞ্জার। সে সানফ্রানসিসকো থেকে ওয়াশিংটন যেতে চায়। পল স্টাইন তাকে নিয়ে চললেন ওয়াশিংটন। কিন্তু অজ্ঞাত এক কারণে যেখানে প্যাসেঞ্জারের নামার কথা ছিল, সেখানে নামলো না সে। ট্যাক্সি ক্যাবটা থামলো গন্তব্য থেকে এক ব্লক পেরিয়ে। ঠিক তখনি শোনা গেল গুলির শব্দ।

পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেখতে পায়, পল স্টাইনের ওয়ালেট আর ট্যাক্সির চাবি মিসিং! গুলি করা হয়েছে তার মাথায়। আততায়ী যাওয়ার সময় তার শার্টের একটা অংশ খুবলে ছিঁড়ে নিয়েছে।
এই হত্যাকান্ডের প্রতক্ষ্যদর্শী ছিল তিনজন টিনএজার, যারা তাদের বাড়ির জানলা দিয়ে দেখেছে পুরো ঘটনাটা। সবকিছু হয়েছে মাত্র ৫ থেকে ১০ সেকেন্ডের মধ্যে।

১৪ অক্টোবর, ১৯৬৯। হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হওয়ার তিনদিন পর, দ্যা ক্রনিকাল আরেকটা আরেকটা চিঠি পায় জোডিয়াকের। সেই যে খুনটা করেছে সেই ট্যাক্সি ড্রাইভারের, এর প্রমাণস্বরূপ সে চিঠির সাথে পাঠিয়েছে, তার শার্ট থেকে খুবলে নেয়া কাপড়ের রক্তাক্ত একটা অংশ!
এই চিঠিটা ছিল, জোডিয়াকের পাঠানো অন্য সব চিঠির ভয়ংকর। নিজেই পড়ে দেখুন কেন!

This is the Zodiac speaking.
আমি সেই হত্যাকারী যে গতকাল রাতে ওয়াশিংটনের ম্যাপেল স্ট্রিটে ট্যাক্সি ড্রাইভারের খুনটা করেছি। এটা প্রমাণ করতে তার শার্টের একটা রক্তাক্ত অংশ পাঠানো হলো। আমিই সে ব্যাক্তি সে ‘নর্থ বে এরিয়া’র খুনগুলো করেছি।
কাল রাতে এসএস পুলিশ(সানফ্রানসিসকো পুলিশ) আমাকে ধরতে পারতো, যদি তারা মোটরসাইকেলে রাস্তায় রাস্তায় পাগলের মত না ঘুরে পার্কটা খুঁজে দেখতো ভাল করে। কার ড্রাইভারদের উচিৎ ছিল, কারগুলো চুপচাপ পার্ক করে আমার জন্য অপেক্ষা করা।
স্কুলের বাচ্চারা ভালো টার্গেট। আমার মনে হয়, একদিন আমি স্কুল বাস আক্রমণ করবো। শুধু বাসের ফ্রন্ট ট্যায়ারে গুলি করলেই হলো। তারপর বাচ্চারা লাফাতে লাফাতে যখন বেড়িয়ে আসবে, তখন তাদের তুলে নেব।

অবশ্য সৌভাগ্যের ব্যাপার, জোডিয়াক কোনদিন একাজটি করেনি। করলে কতো বাচ্চার মারা পড়ত, গুণতিতে আনা হয়তো সম্ভব হতো না।

লাইভ টিভিশোতে জোডিয়াকের ফোন

জিম ডানবার নামের একজন সেসময় লোকাল টেলিভিশনে A.M. San Francisco নামের একটি লাইভ অনুষ্ঠান হোস্ট করতেন। অনুষ্ঠানটা ছিল মোটামুটি জনপ্রিয়। ২০ অক্টোবর কেউ একজন অকল্যান্ড পুলিশ ডিপার্টমেন্টে ফোন করে বলে, সে জোডিয়াক। সে চায় দুইজন লইয়ার যেন সেই লাইভ শোতে উপস্থিত থাকেন। কারণ সে সেখানে তাদের সাথে কথা বলতে চায়, আর চায় পুরো পৃথিবী শুনুক তার কণ্ঠ।

নির্দিষ্ট দিনে উপস্থিত হন দুইজন লইয়ার সে অনুষ্ঠানে। জিম ডানবার দর্শকদের অনুরোধ করেন, যাতে জোডিয়াক ছাড়া কেউ সেসময় ফোন না করে। কিছুক্ষণ পর, ফোন আসে জোডিয়াকের। কয়েকবার কথা বলে সে অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথিদের সাথে। বারংবার অভয় দিয়ে, তাকে নাম জিজ্ঞেস করা হলে, সে বলে, তার নাম “স্যাম”। সে লইয়ার এফ লি বিলির সাথে দেখাও করতে চায়। কিন্তু সে কথা রাখেনি। ব্লাফ মেরেছিল।

এটা ছিল একটা নিষ্ঠুর কৌতুক। গোটা আমেরিকার মানুষকে, সে যেন জানিয়ে দিচ্ছিল, তারা কতোটা অসহায়।

জোডিয়াকের হাত থেকে বেঁচে ফেরা এক মহিলার কথা

২২ মার্চ, ১৯৭০। সেদিন রাতে ক্যাথলিন জোনস তার নিজের গাড়ি ড্রাইভ করে পেটালুমাতে যাচ্ছিলেন, তার মায়ের সাথে দেখা করতে। তিনি ছিলেন সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা আর তার সাথে ছিল তার দশ মাস বয়সের শিশুকণ্যা।

তিনি যখন হাইওয়েতে ছিলেন, ড্রাইভ করছিলেন মোডেস্ট শহর থেকে খানিক দূরে, তিনি শুনতে পান, পেছনের একটা কার থেকে তাকে উদ্দেশ্য করে বারংবার হর্ন বাজাচ্ছে চালক। গাড়িটা রাস্তার পাশে পার্ক করেন তিনি। কার থেমে নেমে পিছনের কারের চালককে হর্ন দেয়ার কারণ জিজ্ঞেস করেন তিনি। সে বলে, সে অনেকক্ষণ থেকে দেখছে, তার কারের রেয়ার হুইলটা নড়ছে ভয়ংকরভাবে। সে বলে, ক্যাথলিন চাইলে হুইলটা সে ঠিক করে দিতে পারে। ক্যাথলিন ধন্যবাদ জানিয়ে তাকে হুইলটা ঠিক করে দিতে অনুরোধ করেন।

আগুন্তক ঠিক করে দেয় হুইলটা। কিন্তু গাড়িটা স্টার্ট দিতে এবারে খুলে পড়ে পুরো হুইলটাই। আগুন্তক তাকে লিফট দেয়। তার কথা ছিল ক্যাথলিনকে সে পরের ফিলিং স্টেশন পর্যন্ত লিফট দেবে। কিন্তু কয়েকটা ফিলিং স্টেশন পেরিয়ে যাওয়ার পরও গাড়িটা থামায়নি আগন্তুক। এতে প্রচণ্ড ভয় পেয়ে যান ক্যাথলিন জোনস। তিনি কয়েকবার আগন্তুককে কার থামাতে বললেও, সে থামায়নি। অবশেষে, কোন এক কারণে চালক গাড়ি থামালে লাফিয়ে নেমে পড়েন ক্যাথলিন জোনস। জায়গাটা ছিল নির্জন- রাস্তার দুপাশে খোলা মাঠ যতদূর চোখ যায়। ক্যাথলিন তার দশ মাসের বাচ্চাকে লুকিয়ে রাখেন একটা ঝোপে। তারপর নিজেও লুকিয়ে পড়েন। চালক কয়েকবার চিৎকার করে অভয় দিয়ে বলে, সে তার কিছু করবে না। কিন্তু সাড়া না পেয়ে অগত্যা স্থানত্যাগ করে।

এ ঘটনার পর ক্যাথলিন সরাসরি যোগাযগ করেন পুলিশ স্টেশনে। সেখানে তাকে জোডিয়াকের সম্ভাব্য একটা স্কেচ দেখানো হলে, তিনি চিহ্নিত করেন, এই লোকটাই লিফট দিয়েছিল তাকে।
পুলিশ ক্যাথলিনের সেই কারের কাছে পৌঁছে কিছুক্ষণ পর। সেখানে তারা দেখতে পায়, কেউ একজন কারটাকে গুড়িয়ে দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছে!

জোডিয়াকের অন্যান্য সম্ভাব্য হত্যাকান্ড ও আক্রমণগুলো

জোডিয়াক হত্যাগুলো করেছেন নিজেস্ব স্টাইলে। প্রত্যেক সিরিয়াল কিলারের একটা করে নিজেস্ব হত্যার ধরণ থাকে। এটা তারা সচেতনভাবে করতে না চাইলেও হাতের লেখার মতই ভিন্ন হয় হত্যার ধরণ। জোডিয়াক প্রত্যেকবার হত্যা করার পর, চিঠি লিখত পত্রিকা অফিসে। সে যে এটেনশনসিকার ছিল, এটা তার চিঠির ভাষা দেখলেই বোঝা যায়। সে চায় সবাই জানুক তার কথা, সবাই ভয় পাক তাকে। সবার ভীতিটাকে উপভোগ করত জোডিয়াক।
ঠিক এমন একটি মার্ডার- হয়েছিল ১৯৬৬ সালেও। হত্যার পর, মার্ডারার চিঠি লিখেছিল পুলিশ স্টেশন ও পত্রিকা অফিসে।

৩০ অক্টোবর, ১৯৬৬ তে রিভারসাইড কমিউনিটি কলেজ স্টুডেন্ট চেরি জো বেটসের মৃতদেহ পাওয়া যায় কলেজ লাইব্রেরী থেকে সামান্য দূরে। বিভিন্নসূত্রে পাওয়া তথ্যানুসারে, বেটস সন্ধ্যা থেকে সাড়ে নয়টা পর্যন্ত- লাইব্রেরী বন্ধ না হওয়া অবধি ছিল লাইব্রেরীতেই। এরপর রাত সাড়ে দশটা নাগাদ প্রতিবেশিরা একটা আর্তচিৎকার শুনতে পায়। কিন্তু তারপরই সব চুপ। তারাও গা করেনি।

পরদিন সকালে চেরি জো বেটস এর মরদেহ পাওয়া যায় লাইব্রেরী থেকে অল্প দূরেই। তাকে প্রচণ্ড প্রহার করে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া হয়। আর ছুরি আঘাত সইতে সইতেই মারা যায় সে।
হত্যাস্থলে একটা ঘড়ি আর একটা রিস্টব্যান্ড ছাড়া আর কিচ্ছু পাওয়া যায়নি।
কিছুদিন পর রিভারসাইড পুলিশ ও দ্যা রিভারসাইড এন্টারপ্রাইজ একটি চিঠি পায়। চিঠিতে দাবি করা হয়, এর লেখকই হত্যাকাণ্ডটির জন্য দায়ি। চিঠিটির টাইটেল ছিল, “the confession” [স্বীকারোক্তি নামা]।

দ্যা কনফেসন
মেয়েটি তরুণী ছিল, সুন্দরীও। কিন্তু এখন সে এখন টুকরোটুকরো হয়ে গেছে, সে এখন মৃত। সেই প্রথম নয়, শেষজন নয় সে [she is not the first, she will not be the last]।
আমি রাতকে রাত কাটিয়ে দেই আমার ভিক্টমদের কথা হবে ভেবে ভেবে। হতে পারে সে কোন সুন্দরী ব্লন্ড, যে প্রতিদিন সৈকতে হাঁটতে আসে আর সন্ধ্যা সাতটায় ফেরে ঘরে। কিংবা সে কোন নীল চোখের সুন্দরী যে আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছিল যখন আমি তাকে ডেটে যাওয়ার কথা বলেছিলাম। কিংবা এদের মধ্যে কেউই হবে না সে। কিন্তু আমি তার স্ত্রীঅঙ্গ গুলো সব কেটে ফেলব আর জমা করে রাখবো যাতে সাড়া শহর দেখে তা। কাজটা আমার জন্য সহজ করে দিও না। তোমার বোন, স্ত্রী কিংবা মেয়েকে রাস্তাঘাট আর সরু গলি থেকে দূরে রাখো। বেটস খুব বোকা ছিল। তাকে আমি পশুর মত মেরেছি। সে আমাকে একটু বাঁধা পর্যন্ত দেয়নি।
আমি প্রথমে তার কারের ডিস্ট্রিবিউটার থেকে মাঝের তারটা বের করে ফেলেছিলাম। তারপর ফলো করেছি তাকে। আমি তার জন্য ওয়েট করে ছিলাম লাইব্রেরীতে। তারপর তাকে ফলো করেছিলাম দুই মিনিট। ততক্ষণে তার ব্যাটারি ডেড হয়ে গিয়েছিল।
আমি তাকে সাহায্য করতে চাইলাম। আমার আমার সাথে কথা বলতে আগ্রহী ছিল খুব। আমি তাকে বললাম, আমার কারটা সামনের স্ট্রিটে আছে, আমি তাকে বাড়ি পর্যন্ত লিফট দিতে পারি।
আমরা যখন লাইব্রেরী থেকে কিছুটা দূরে চলে এলাম, তখন তাকে বললাম, “সময় এসে গেছে”। সে জানতে চাইল, কীসের সময়। আমি বললাম, “তোমার মৃত্যু”।
..............আমি অসুস্থ নই, আমি পাগল। কিন্তু এটা আমাকে থামাতে পারবে না। ......চিঠিটা প্রকাশ কর যাতে সবাই পড়তে পারে। এটা হয়তো অনেক মেয়ের জীবন বাঁচাতে পারে। ......

চিঠির ধরণ দেখে সহজেই অনুমান করা যায় সেই খুনটা করেছিল জোডিয়াক। আমি শুধু কয়েকটা খুনের বর্ণনা দিলাম। তার সব খুনের কথা বলতে গেলে বই লিখতে হবে একটা। জোডিয়াক মোট ৩৭ টা খুনের দাবি করে চিঠি লিখেছে আঠারোটি। তার মধ্যে চারটা ছিল সাইপার বা ক্রিপ্টোগ্রাম; যার মধ্য মাত্র একটা এপর্যন্ত সমাধান করতে সক্ষম হয়েছে বিশ্ববাসী; কিন্তু তিনটাই এখনো আছে আনসলভড। কে জানে, হয়তো সে তিনটা ক্রিপ্টোগ্রাম সমাধান করতে পারলে জানা যেত জোডিয়াকের পরিচয়।

জোডিয়াক তার আঙ্গুলের মাথায় নাচিয়েছিল আমেরিকার পুলিশ, গোয়েন্দা আর সংবাদপত্রগুলোকে। সবাই তাকে খুঁজে পাওয়ার জন্য ছিল মরিয়া। একটা চিঠিতে জোডিয়াক পুলিশ মারার কথা বলেছিল। সে মনে করত, পুলিশ মারা সাধারণ মানুষকে হত্যার চাইতে বেশি রমাঞ্চক কারণ, পুলিশ গুলি চালাতে পারে। জোডিয়াক সবগুলো মার্ডার কভার করেছিলেন পল এভেরি নামের একজন সাংবাদিক। তাকেও রক্তাক্ত শার্টের টুকরা সহ চিঠি দিয়েছে জোডিয়াক। সে পুলিশ, গোয়েন্দা ও পত্রিকাঅফিসে ক্রিসমাসের পোস্টকার্ডও পাঠাতো।

জোডিয়াক সন্দেহে গ্রেফতার করা হয়েছিল অন্তত ২৫০০ জনকে। কিন্তু প্রমাণের অভাবে সবাইকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় পুলিশ। ২০০৪ সালে SFPD জোডিয়াকের কেজটি “inactive” ঘোষণা করে। কিন্তু আরও কিছু প্রমাণ হাতে পেয়ে কেজটা আবার রিওপেন করা হয় ২০০৭ সালে। আমেরিকার অনেক কাউন্টিতেই এখনো জোডিয়াক কেজটা চালু আছে। কিন্তু এপর্যন্ত কেউই জোডিয়াক সন্দেহে গ্রেফতার করতে পারেনি কাউকেই। ২০১৪ সালে একজন দাবি করেছিল, তার বাবাই ছিলেন জোডিয়াক- কিন্তু ইনভেস্টিগেশনে বেড়িয়ে আসে, দাবিটি সম্পর্কে যথেষ্ট প্রমাণ থাকলেও, তার বাবাকেই জোডিয়াক বলার মত প্রমাণ তার কাছে নেই!

জোডিয়াকের পরিচয় কি পাওয়া যাবে কোনদিন? জানা নেই। কিন্তু জোডিয়াকের মত নরপশুগুলো আছে বলেই হয়তো মানুষ ক্রাইম নোভেলকে একেবারে উড়িয়ে দেয় না!

জোডিয়াকে সবগুলো লেটার অনুবাদ করতে আমি পারিনি। সেগুলো সবগুলো পড়তে পারেন এখানে- en.m.wikisource.org/wiki/Zodiac_Killer_letters
জোডিয়াক সম্পর্কে আরো বিস্তারিত পড়তে পারেন এখানে- en.wikipedia.org/wiki/Zodiac_Killer
আপনি যদি ভেবে থাকেন, দুনিয়ার সবচেয়ে খতরনাক সিরিয়াল কিলার সম্পর্কে এতক্ষণ পড়লেন, তবে ভুল ভেবেছেন। কারণ আপনি টেড বান্ডি সম্পর্কে পড়েননি এখনো।- en.wikipedia.org/wiki/Ted_Bundy
সূত্রঃ
১। উইকিপিডিয়া
২। উইকিসোর্স
৩। zodiac unmasked- Robert Graysmith

বিভাগ: 

Comments

আব্দুল মুহাইমিন এর ছবি
 

টেড বান্ডি সম্পর্কে বাংলায় জানতে রোয়ার বাংলার পোস্টটিই সবচেয়ে ভালো লেগেছে। অন্তিকের লেখা পোস্টটি পড়তে এখানে ক্লিক করুন

অসহিষ্ণুতার বীজতলা লণ্ডভণ্ড করতে এসেছি।

 
আরণ্যক রাখাল এর ছবি
 

অন্তিক অনেক ভাল লিখেছেন টেডকে নিয়ে।
তবে উইকিতে অনেক বেশি তথ্য আছে। আর্টিকেলটা রিচ। টেডকে জনার জন্য the stranger beside me বইটা পড়তে পারেন

তুমি প্রতিদিন ভাঙ্গার কথাই বলো
আমি ঈদানিং শান্ত নগরবাসী-
তুমি খুব করে সুতোটা ছিড়ে ফেলো
আমি ঘরকুনো, জানলা নিভিয়ে বসি।

 
আমি অথবা অন্য কেউ এর ছবি
 

উইকি আর্টিকেলটা পইড়া শেষ করলাম। মানুষের কাজকর্ম বোঝা কঠিন।

মরতে মরতে ভুল হয়ে যাবে, শেষ নিঃশ্বাসে রয়ে যাবে পাপ। আমি তো নাদান, আমি যে বান্দা খারাপ...

 
আরণ্যক রাখাল এর ছবি
 

সেইটাই।
মাথা নষ্ট কারবার

তুমি প্রতিদিন ভাঙ্গার কথাই বলো
আমি ঈদানিং শান্ত নগরবাসী-
তুমি খুব করে সুতোটা ছিড়ে ফেলো
আমি ঘরকুনো, জানলা নিভিয়ে বসি।

 
Pavel এর ছবি
 

দারুন গল্প !-

 
আরণ্যক রাখাল এর ছবি
 

thank u

তুমি প্রতিদিন ভাঙ্গার কথাই বলো
আমি ঈদানিং শান্ত নগরবাসী-
তুমি খুব করে সুতোটা ছিড়ে ফেলো
আমি ঘরকুনো, জানলা নিভিয়ে বসি।

 
নুর নবী দুলাল এর ছবি
 

দারুন! Pleasantry

 
আরণ্যক রাখাল এর ছবি
 

অনেক ধন্যবাদ

তুমি প্রতিদিন ভাঙ্গার কথাই বলো
আমি ঈদানিং শান্ত নগরবাসী-
তুমি খুব করে সুতোটা ছিড়ে ফেলো
আমি ঘরকুনো, জানলা নিভিয়ে বসি।

 
 

সিরিয়াল কিলারদের মনস্তত্ত্ব নিয়ে আগ্রহ আছে।

পরম সত্য বলে কিছু নেই।

 

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

আরণ্যক রাখাল
আরণ্যক রাখাল এর ছবি
Offline
Last seen: 2 weeks 6 দিন ago
Joined: বুধবার, এপ্রিল 13, 2016 - 8:05অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

ফেসবুকে ইস্টিশন

SSL Certificate
কপিরাইট © ইস্টিশন.কম ® ২০১৬ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর