নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 7 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • নুর নবী দুলাল
  • হাসান নাজমুল
  • শ্রীঅভিজিৎ দাস
  • মুফতি বিশ্বাস মন্ডল
  • নিরব
  • সুব্রত শুভ
  • কুমকুম কুল

নতুন যাত্রী

  • নিনজা
  • মোঃ মোফাজ্জল হোসেন
  • আমজনতা আমজনতা
  • কুমকুম কুল
  • কথা নীল
  • নীল পত্র
  • দুর্জয় দাশ গুপ্ত
  • ফিরোজ মাহমুদ
  • মানিরুজ্জামান
  • সুবর্না ব্যানার্জী

আপনি এখানে

সৌদির ইতিহাস না জানলে আইএস’র উত্থান বোঝা যাবে না | অ্যালস্টার ক্রুক


[অ্যালস্টার ক্রুক যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা সংস্থা এমআই-সিক্স এর একজন সাবেক কর্মকর্তা। বিখ্যাত বই ‘Resistance: The Essence of Islamic Revolution’ তিনি লিখেছেন। প্রভাবশালী পত্রিকা হাফিংটন পোস্ট এ তিনি You Can’t Understand ISIS If You Don’t Know the History of Wahhabism in Saudi Arabia. শিরোনামে একটি নিবন্ধ লিখেছেন। পোস্টম্যান নামের একটি ওয়েব সাইটে লেখাটির বাংলা অনুবাদ আকারে প্রকাশ হয়েছে। অনুবাদ করেছেন মাহমুদুর রহমান। প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় লেখাটি ইস্টিশন এর পাঠকদের জন্য শেয়ার করা হল।]

বৈরুত। ইরাকের সৎকার মঞ্চে দা’য়িশ তথা আইএস’র উত্থান দেখে পশ্চিমাদের অনেকেই অবাক হয়ে গেলেন। সুন্নি যুবকদের মাঝে আইএস’র প্রতি চুম্বকের মত আকর্ষণ দেখে কিংকর্তব্যবিমুঢ়, আর এদের সহিংস কার্যকলাপে ভীত হয়ে পড়লেন এবং আইএস’র এই প্রকাশের সময়ে তাদের সম্পর্কে সৌদির দোটানা এবং অনির্বচনীয় মনোভাব, ভাবতে বাধ্য করেছে, “সৌদি কি নিজেদের জন্য আইসিসকে হুমকি মনে করে না?”

এটা পরিষ্কার যে সৌদির শাসক গোষ্ঠী এখনও এই প্রশ্নে বিভক্ত। অনেকে বলতে চান যে আইএস আসলে ইরানি শিয়া এবং সুন্নি সংঘাতের জের ধরে শুরু হওয়া একটা যুদ্ধ যার মাধ্যমে একটা নতুন সুন্নি রাষ্ট্র জন্ম নেবে, যা সুন্নিরা নিজেদের বলে দাবী করবে এবং এক্ষেত্রে তারা দা’য়িশ-এর ‘সালাফিস্ট’ তত্ত্ব মেনে চলে।

অন্যান্য সৌদিবাসী আবদুল-আল-আজিজের বিরুদ্ধে ওয়াহাবি ভ্রাতৃত্ব বা বিদ্রোহের ইতিহাসের কথা চিন্তা করে, এ নিয়ে আরও ভীত হয় (‘ওয়াহাবি ইখওয়া’ বা ‘ওয়াহাবী ভ্রাতৃত্ব’ বলতে একটা কথা প্রচলিত আছে, যার সাথে ইসলামী ভ্রাতৃত্বের কোন সংযোগ নেই। এবং এই লেখায় যেসব প্রসঙ্গে ভ্রাতৃত্ব কথাটি ব্যবহার হবে, তা সব ক্ষেত্রেই ওয়াহাবি ভ্রাতৃত্ব, ইসলামি ভ্রাতৃত্ব নয়), যা ১৯২০ সালে সৌদিতে ওয়াহাবি মতবাদকে জনপ্রিয় করে তোলে।

অনেক সৌদিবাসীই এখন দা’ইয়িশের গোঁড়া মতবাদের ব্যপারে প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গি এবং মনোভাব নিয়ে প্রশ্ন তোলা শুরু করেছেন।

সৌদির দ্বৈত নীতি

আইএস নিয়ে সৌদির অভ্যন্তরীণ অনৈক্য এবং উত্তেজনার মূল কারণ, দেশটির সহজাত (এবং অনিশ্চিত) রাজনৈতিক মতবাদ এবং ইতিহাসের দিকে তাকালেই বোঝা যাবে।

সৌদি পরিচয়ধারী প্রভাবশালী একটি অংশ সরাসরি মুহাম্মদ ইবনে আবদুল আল ওয়াহাব (ওয়াহাবী মতবাদ প্রতিষ্ঠাতা)-এর থেকে এসেছে এবং এর গোঁড়া ব্যবহার চলতে চলতে ইবনে সৌদের ‘পিউরিটানিজম’ চলে আসে (পরবর্তীতে তিনি অনেকের মাঝে একজন সামান্য নেতা হয়ে বেদুইনদের সঙ্গে তর্কাতর্কি এবং লড়াইয়ে রত হন আর নেজদ এর মরুবাসীদের আক্রমণ করেন)।

কিংকর্তব্যবিমূঢ় এই দ্বৈততার দ্বিতীয় কারণ ১৯২০ সালে স্বাধীন রাষ্ট্রের দিকে বাদশাহ আবদুল আল আসাদ এর পরবর্তী পদক্ষেপঃ ভ্রাতৃত্বকে দাবিয়ে রাখার প্রচেষ্টা (এটা করা হয়েছিল ব্রিটেন এবং আমেরিকার সাথে কূটনৈতিক সু-সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য); মূল ওয়াহাবী প্রীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দান; ১৯৭০ সালে পেট্রোডলার অর্জনের সুযোগ ছিনিয়ে নেওয়া, যাতে ভ্রাতৃত্ববোধের আগুন প্রশমিত হয়ে রপ্তানি বিষয়ক সমস্যা সূচনা হয়; মুসলিম বিশ্বের “সহিংস বিপ্লবকে” সরিয়ে একটি সাংস্কৃতিক বিপ্লব শুরু করার চেষ্টা।

কিন্তু এই “সাংস্কৃতিক বিপ্লব” কোন নিরীহ সংস্কারবাদ ছিল না। এটা, মূর্তিপূজক ও অন্যান্য মতবাদের প্রতি আবদুল আল ওয়াহাবের তীব্র ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ; এবং তিনি ইসলাম থেকে বেদায়াতি কর্মকাণ্ড দূর করার প্রত্যয় গ্রহণ করেন।

প্রতারক মুসলিম

আমেরিকান লেখক-সাংবাদিক, স্টিভেন কোল লিখেছেন যে চতুর্দশ শতাব্দীর ইসলামী চিন্তাবিদ ইবনে তাইমিয়ার এই উগ্র শিষ্য, আবদুল-আল-ওয়াহাব কি করে সমগ্র আরব থেকে মক্কা পর্যন্ত ঘুরে বেড়ানো ভব্য, শিল্পী, তামাক সেবী, ভাঙের বেপারী, তবলা বাজানো মিশরীয় আর অটোমান অভিজাতদের” অবজ্ঞা করেছেন।

আবদুল-আল-ওয়াহাবের দৃষ্টিতে এরা মুসলিম ছিলেন না; এরা ছিল ছদ্মবেশী মুসলিম, অর্থাৎ প্রতারক। এমনকি ওয়াহাবের দৃষ্টিতে, তিনি স্থানীয় বেদুঈনদের মাঝেও তেমন ভালো আচরণ খুঁজে পাননি। তারা পবিত্র সাধু ব্যক্তিদের প্রতি তাদের অতিরিক্ত শ্রদ্ধা আর মাজার তৈরির মাধ্যমে আহাদের কোপের শিকার হয়। উদাহরণ স্বরূপ কবরকে ঈশ্বরের সঙ্গে যোগাযোগের সেতু বলা হয়েছিল।

আবদুল-আল-ওয়াহাব মতে এগুলো বিদআত, অর্থাৎ ঈশ্বরের নিয়মের বিরোধী কাজ।

তার পূর্বসূরি বা গুরু তাইমিয়ার মত, আবদুল-আল-ওয়াহাব বিশ্বাস করতেন যে নবী মুহাম্মদ যতদিন মদিনাতে ছিলেন, সেটাই ছিল আদর্শ মুসলিম সমাজ (সর্বোৎকৃষ্ট সময়), এবং সেই আদর্শ সব মুসলমানের গ্রহণ করা উচিত (বিশেষত সালাফি তত্ত্বে)।

শিয়া, সূফী এবং গ্রীক দার্শনিকদের বিরুদ্ধে তাইমিয়া যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। খ্রিষ্টানদের উপাসনার সাথে মিল আছে বলে ঘোষণা দিয়ে রসূলের কবর জিয়ারত এবং তার জন্মদিন পালনেরও বিরুদ্ধে অবস্থান নেন তাইমিয়া। পূর্বের এই শিক্ষা আত্তীকরণের সাথে আবদুল-আল-ওয়াহাব বলেন, ইসলাম সম্পর্কে নিজের জানার গণ্ডির ভেতর কোন মানুষ যদি “সন্দেহ বা দ্বিধা” প্রকাশ করে, তবে সে তার জীবন ও সম্পদের নিশ্চয়তা হারাবে।

আবদুল-আল-ওয়াহাবের তত্ত্বের একটা মতবাদ, ‘তাকফির’-এর মূল হয়ে ওঠে। তাকফিরি মতবাদের অধীনে আবদুল-আল-ওয়াহাব বা তার অনুসারীরা, সার্বভৌমত্বের (বা রাজার) বিরুদ্ধে যায় এমন কর্ম সম্পাদনকারীকে কাফের বলে ঘোষণা দিতে পারতো। যে সকল মুসলিম মৃত কিংবা সাধুদের সম্মান দেখায়, ওয়াহাব তাদের নিন্দা করেন। তিনি বলেন এই অনুভূতি স্রষ্টার, একমাত্র স্রষ্টার প্রাপ্য। ওয়াহাবী ইসলাম তাই সাধু-দরবেশ, কিংবা মৃতদের প্রতি সব ধরনের প্রার্থনাকে, মাজারে যাওয়া, দরবেশ কিংবা ইসলামী সাধুদের জন্মদিনে উৎসব পালন করা, এমনকি মহানবীর জন্মদিন পালন করা, সাথে সাথে কবরে নাম ফলক ব্যবহার পর্যন্ত নিষিদ্ধ করে।

আবদুল-আল-ওয়াহাব এমন একটা অনুক্রম দাবী করেন, যা লিখিত এবং বাস্তব ও হাতে কলমে কাজ করবে। তিনি বলেন যে, প্রত্যেক মুসলিমের উচিত ব্যাক্তিগতভাবে একজন মুসলিম নেতার (খলিফা, যদি থাকেন) কাছে আনুগত্য স্বীকার করা। তিনি লিখিত আদেশ জারি করেন, “কেউ যদি এই নিয়ম লঙ্ঘন করে, তবে তাকে হত্যা করা হবে, তার স্ত্রী-কন্যাকে অত্যাচার করা হবে এবং তার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হবে।” আবদুল আল ওয়াহাব যাদের মুসলিম বলে গণ্য করতেন না, সেই সব শিয়া, সূফী আর ‘ধর্মভ্রষ্ট মুসলিম’দের নামের তালিকা তৈরি করে তাদের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেন।

এখানেই দেখা যায় ওয়াহাবীদের সাথে আইএস এর কোন পার্থক্য নেই। ফাটলটা পরে দেখা যাবেঃ পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে মুহাম্মদ ইবনে আবদুল আল ওয়াহাবের তত্ত্বের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ হিসেবে “এক শাসক, একক কর্তৃত্ব, একটি মসজিদ” তিন স্তম্ভ দ্বারা যথাক্রমে সৌদি বাদশাহ, সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ হিসেবে ওয়াহাবী শাসনতন্ত্র, এবং পুরো বিশ্বের উপর তাদের কর্তৃত্ব বোঝানো হয়েছে।

এখানেই ফাটল, ফারাক;আইএস এই তিন স্তম্ভ— যার উপর মুসলিম শাসন টিকে আছে তা—অস্বীকার করে। এই ফারাকটুকু ছাড়া বাকি সব কিছুই ওয়াহাবী আন্দোলনের সদৃশ, যা সৌদি আরবের জন্য হুমকি স্বরূপ।

সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ১৭৪১-১৮১৮

এরকম প্রচণ্ড উগ্রবাদের কারনে আবদুল-আল-ওয়াহাব নিজ শহর থেকে বিতাড়িত হন এবং কিছুদিন পর ১৭৪১ সালে ইবনে সৌদ এবং তার গোত্রের কাছে আশ্রয় লাভ করেন। আবদুল আল ওয়াহাবের দর্শনের মাঝে ইবনে সৌদ আরবের ঐতিহ্য এবং নিয়ম বদলে ফেলার আভাস পেয়েছিলেন এবং তা ছিল ক্ষমতা দখলের পথ।

আবদুল আল ওয়াহাবের তত্ত্ব গ্রহণ করে ইবনে সৌদের দল সহজেই সেসব কাজ করতে পারলো, যা তারা সব সময় করে আসছে। আর তা হল প্রতিবেশী গ্রাম আক্রমন এবং তাদের সম্পদ লুণ্ঠন। এবং এখন এটা তারা আরবের ঐতিহ্য অনুসরণ করে নয়, বরং জিহাদ হিসেবে করছে। ইবনে সৌদ এবং আবদ-আল-ওয়াহাব নতুন করে শহীদি তত্ত্ব টেনে আনলেন। যা বলে জিহাদে মৃত্যুর সাথে সাথে মৃত স্বর্গারোহণ করবে।

শুরুতে তারা কাছাকাছি কিছু এলাকা ধ্বংস করে সেখানে নিজেদের নিয়ম জারি করে ( বিজিত এলাকার অধিবাসীদের দুটি সুযোগ থাকতো, ওয়াহাবী হওয়া, বা মৃত্যু)। এই সম্মিলিত শক্তি ১৭৯০ সনের মধ্যে বেশীরভাগ আরব অঞ্চলে নিজেদের শাসন জারি করে এবং তারপর মদিনা, সিরিয়া ও ইরাকের দিকে ধেয়ে যায়।

তাদের কৌশল—যেমন আজকে আইএস’র—বিজিত অংশের মানুষকে নিজেদের সামনে নত করা। তারা ভীতি ছড়াতে চেয়েছিল। ১৮০১ সালে এই মিত্র শক্তি ইরাকের পবিত্র শহর কারবালা আক্রমণ করে। তারা শিশু ও নারী সহ প্রচুর শিয়া হত্যা করে। অনেক শিয়া কবর, মাজার গুড়িয়ে দেয়। এমনকি মহানবীর নাতি ইমাম হুসেইনের কবরও বাদ যায়নি।

লেফটেন্যান্ট ফ্রান্সিস ওয়ার্ডেন নামক এক ব্রিটিশ অফিসার, প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে লিখেছেন, “তারা পুরো শহরটি লুঠ করে, এবং ইমাম হুসেইনের কবরে হামলা করে, সে সঙ্গে প্রায় পাঁচ হাজার অধিবাসী তাদের চাতুর্যপূর্ণ নিষ্ঠুরতার স্বীকার হয়।”

সৌদি রাষ্ট্রের প্রথম ঐতিহাসিক, ওসমান ইবনে বিশর নাজদি লিখেছেন যে ইবনে সৌদ ১৮০১ সনে কারবালায় ধ্বংসযজ্ঞ চালান। তিনি গর্বের সাথে সে ধ্বংসের বর্ণনা দেন এভাবে, “আমরা কারবালা দখল করি, অধিবাসীদের হত্যা ও দখল (দাস হিসেবে) করি, তারপর আল্লাহর শোকর গুজার হই, তিনিই পৃথিবীর বাদশাহ, এবং কৃতকর্মের জন্য আমরা ক্ষমা না চেয়ে বলি, ‘অন্যান্য অবিশ্বাসীদের জন্যও একি প্রতিষেধক’।”

১৮০৩ সালে আব্দুল আজিজ পবিত্র শহর মক্কায় প্রবেশ করেন, এবং ভীত সন্ত্রস্ত শহর তার কাছে আত্মসমর্পণ করে (মদিনাকেও একই ভাগ্য বরণ করতে হয়)। আবদ-আল-ওয়াহাবের অনুসারীরা তাদের আওতার মধ্যে থাকা ঐতিহাসিক স্মৃতিস্তম্ভ, কবর ও মাজার সমুহ ধ্বংস করে। এবং একদম শেষে তারা শতাব্দী পুরনো ইসলামিক স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেয়।

কিন্তু ১৮০৩ সালে এক শিয়া গুপ্তহন্তার হাতে বাদশাহ আবদুল আজিজ নিহত হন (কারবালা ধ্বংসের প্রতিশোধ হিসেবে তাকে হত্যা করা হয়)। তার পুত্র সৌদ বিন আবদুল আজিজ সিংহাসনে বসেন এবং আরব বিজয় চালিয়ে যান। এরপর অটোমান শাসকগণ আর চুপ করে বসে তাদের সাম্রাজ্য টুকরো হয়ে যাওয়া দেখতে পারলেন না। মিশরীয় বাহিনীর সাথে মিলে অটোমান বহর ১৮১২ সালে ওয়াহাবী শক্তিকে মদিনা, জেদ্দা এবং মক্কা থেকে বিতারন করে। ১৮১৪ সালে সৌদ বিন আবদুল আজিজ জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তার দুর্ভাগা পুত্র আবদুল্লাহ বিন সৌদকে অটোমানরা ইস্তানবুল নিয়ে যায় এবং সেখানে বীভৎসভাবে তাকে হত্যা করা হয় (এক পর্যটক জানান যে আবদুল্লাহ বিন সৌদকে তিন দিন ধরে ইন্তানবুলের পথে পথে লাঞ্ছিত করা হয়, এরপর ফাঁসি দেওয়ার পর শিরচ্ছেদ করা হয়, তার ছিন্ন মস্তক একটি কামানে ভরে ছুড়ে দেওয়া হয় এবং তার শরীর থেকে তার হৃৎপিণ্ড বের করে নেওয়া হয়।)

১৮১৫ সালে মিশরীয়রা (অটোমানদের পক্ষে) যুদ্ধে ওয়াহাবী সেনাদের পর্যুদস্ত করে ফেলে। ১৮১৮ সালে অটোমানরা ওয়াহাবী রাজধানী দারিয়াহ ধ্বংস করে। প্রথম সৌদি রাজ্যের আর অস্তিত্ব রইল না। বেঁচে যাওয়া কিছু ওয়াহাবী মরুভূমিতে আত্মগোপন করে নতুন করে জোট করার চেষ্টা করে এবং উনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত নিশ্চল হয়েই পড়ে থাকে।

আইএস এর মাধ্যমে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি

যারা এই ইতিহাস বুঝতে পেরেছেন, ইতিহাসের সাথে মিলিয়ে সমসাময়িক ইরাকে ইসলামিক স্টেট বা আইএস’র উত্থান বুঝতে তাদের খুব কষ্ট হবেনা। বস্তুত অষ্টাদশ শতাব্দীতে নেজদ-এ ওয়াহাবী তত্ত্ব নির্জীব হয়ে যায়নি, বরং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোলে অটোমানদের জড়িয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে এটি প্রাণ ফিরে পায়।

আল সৌদ বাহিনী—বিংশ শতাব্দীর নবজাগরনে—চতুর রাজনৈতিক আবদুল-আল-ওয়াহাবের দ্বারা একটি সংক্ষিপ্ত তত্ত্বের ভিত্তিতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আরব বেদুঈন গোষ্ঠীকে ভ্রাতৃত্বের নামে একত্রিত করে এবং ওয়াহাব ও ইবনে সৌদের নেতৃত্বে লড়াইয়ে এনেছিল।

অষ্টাদশ শতাব্দীতে ওয়াহাবী ‘মরালিস্ট’দের পরিচালিত উগ্র, আধা-স্বাধীন আন্দোলন আবার পুনরুজ্জীবিত হল। পূর্বের মত আবার, ভ্রাতৃত্বের নামে ১৯১৪ থেকে ১৯২৬ সালের মধ্যে তারা আবার মক্কা, জেদ্দা ও মদিনা দখল করতে সক্ষম হল। আবদুল-আল-আজিজ ভাবতে লাগলেন ‘ভ্রাতৃত্বের’ বিপ্লব তার জন্য হুমকি বয়ে আনতে পারে। ভ্রাতৃত্ব বিদ্রোহ করল এবং তার ফলে শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধ ১৯৩০ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হয়, এবং তাদের পরাজয়ের পর বাদশাহ তাদের মৃত্যুদণ্ড দেন।

বাদশাহ আজিজের জন্য পূর্ববর্তী সময় ছিল অসাধারণ। বিভিন্ন উপদ্বীপে তেলের খনি আবিষ্কৃত হয়েছিল, এবং ব্রিটেন ও আমেরিকা ছিল তার অনুগ্রহ প্রার্থী, যদিও তখনও আরবের প্রকৃত শাসক শরিফ হুসেইনকেই সমর্থন করতেন। আসলে সৌদির উচিত ছিল কূটনৈতিক তৎপরতা আরও জোরদার করা।

এরই মধ্যে ওয়াহাবী আন্দোলনকে একটি বিদ্রোহী বিপ্লবী আন্দোলন বা ধর্মীয় তাকফিরি শুদ্ধিকরণ প্রথা থেকে বের করে একটি রক্ষণশীল সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় দাওয়াত হিসেবে পরিচয় করানো হল এবং রাজকীয় সৌদি পরিবার এবং বাদশাহর প্রতি তাদের আনুগত্য নিশ্চিত করা হল।

তৈল সম্পদ ওয়াহাবী আন্দোলনকে ছড়িয়ে দিলো

তৈল সম্পদের আবির্ভাব নিয়ে ফরাশি পণ্ডিত গাইলস কেপেল লেখেন, সৌদি লক্ষ্য ছিল “মুসলিম বিশ্বে ওয়াহাবী আন্দোলন ছড়িয়ে দেওয়া। ইসলামকে ওয়াহাবী করন, সেজন্য ধর্মের মধ্যে থেকে আওয়াজ তোলার মত মানুষ কমাতে হবে এবং একজন বা একটি নীতিকে সামনে আনতে হবে, এমন একটি আন্দোলন দরকার যা জাতীয়তা অতিক্রম করে মানুষের কাছে পৌঁছাবে। এই মর্মে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ শুরু হল, এখনও যা অব্যাহত।

এই প্রোজেক্টে প্রচুর টাকা খরচ করার চতুরতা করা হল—এবং সৌদি চাইল সুন্নি ইসলামকে আমেরিকার সামনে তুলে আনতে কেননা, এটি ওয়াহাবী নীতিকে শিক্ষা, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিকভাবে গ্রহণ করে সমগ্র ইসলামী বিশ্বে ছড়িয়ে দেবে— যা পশ্চিমা রাজনৈতিক নীতিনির্ধারণকে সৌদির উপর নির্ভরশীল করে তুলবে। এমন এক নির্ভরশীলতা যা বাদশাহ আজিজের সাথে প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের এক রণতরীতে সাক্ষাৎ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছে।

পশ্চিমারা দেশটির দিকে তাকিয়েছেন এবং এর সম্পদ; দৃশ্যমান আধুনিকতা; এবং দক্ষ ইসলামিক শাসন তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তারা ভেবে নিয়েছিলেন যে দেশটি আস্তে আস্তে আধুনিকতার দিকে ঝুকছে এবং ধীরে ধীরে সুন্নি ইসলাম রাষ্ট্রে আধুনিকতা ছড়িয়ে দেবে।

কিন্তু সৌদি ভ্রাতৃত্ব সেইদিকে এগিয়ে যাচ্ছিলো, যা ১৯৩০ সালে আদতে হারিয়ে যায়নি। তারা সেদিকেই ছিল, কিন্তু উপরে উপরে তা কখনও প্রকাশ করত না। একদিকে আইএস ওয়াহাবী তত্ত্ব মানে, অন্যদিকে আবার তারা গোঁড়া। এটিকে ওয়াহাবী আন্দোলনের একটি সংশোধিত রূপ হিসেবে দেখা যেতে পারে। আর এটিই আইএস’র প্রতি সৌদির আজকের দ্বৈত নীতির মূল কারন।

আইএস হল “মদিনা পরবর্তী” একটি আন্দোলন, এটি নবীর নীতির চেয়ে প্রথম দুই খলিফার নীতি বেশি ধারন এবং অনুসরণ করে, এবং তারা সৌদির শাসনের তীব্র বিরোধিতা করে।

তেলের আবিষ্কারের পর সৌদি বাদশাহি আরও দৃঢ় হয় এবং প্রাতিষ্ঠানিক রুপে ফুলে ফেঁপে ওঠে, বাদশাহ ফয়সালের আধুনিকীকরণ প্রচেষ্টার পরও ভ্রাতৃত্বের পয়গাম আবার শক্ত হয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়। “ভ্রাতৃত্ব তত্ত্ব” অনেক বিশিষ্ট নাগরিক নারী ও পুরুষ এবং শেখদের সমর্থন পেয়েছে, এখনও পাচ্ছে। এক হিসেবে ওসামা বিন লাদেন আসলে ভ্রাতৃত্বের একজন পরবর্তী যুগের প্রতিনিধি ছিলেন।

আজকে বাদশাহর শাসনের বৈধতার ক্ষেত্রে আইএস’র চেষ্টা সন্দেহজনক কিছু নয়, বরং এটি সৌদি-ওয়াহাবী তত্ত্বে ফেরার একটি পথ।

সৌদির সঙ্গে পশ্চিমের বিভিন্ন যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত কর্মকাণ্ডে (সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধবাদ, বা’থইজম, নাসেরিজম, সোভিয়েত এবং ইরানী অনুপ্রেরণা), পশ্চিমারা তাদের বক্তব্য স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু ওয়াহাবী আন্দোলনের ব্যপারটি তারা এড়িয়ে যাচ্ছেন।

অথচ অন্য সব ক্ষেত্রে, যেখানেই পশ্চিমা গয়েন্দারা গোঁড়া ইসলামী আন্দোলনের সন্ধান পেয়েছেন সেখানেই মার্কিন সেনা পাঠানোর জন্য তারা উঠেপড়ে লেগেছেন, এমনকি মধ্যপ্রাচ্যের শাসকদের ইচ্ছার বিরুদ্ধেও তাদের যুদ্ধে নামিয়েছেন।

তাহলে সিরিয়ায় প্রেসিডেন্ট আসাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহকালে প্রিন্স বান্দরের সৌদি-পশ্চিমা আদেশপত্র যদি সহিংস, ভীতি উদ্রেককারী নতুন ধারার ভ্রাতৃত্ব আন্দোলন রুপে প্রকাশ করে, আমাদের কি তাতে অবাক হওয়ার কথা? যদি আমরা ওয়াহাবী আন্দোলন সম্পর্কে একদম স্বল্পও জানি, তবু সিরিয়ার বিদ্রোহীরা যে পঙ্খিরাজের মত বিলুপ্ত প্রাণীতে পরিনত হবে, এটা বুঝে কি আমাদের অবাক হওয়া উচিত? কি করে আমরা আশা করি যে গোঁড়া ওয়াহাবী আন্দোলন মধ্যমপন্থী তৈরি করবে? এবং “এক নেতা একক কর্তৃত্ব এবং একটি মসজিদ” তত্ত্ব; যেখানে বলা হয় এটি না মানলে মৃত্যু অবধারিত, সেই তত্ত্ব থেকে আমরা মধ্যমপন্থা বা সহনশীলতা পাওয়ার কথা কি করে ভাবতে পারি?

কিংবা, সম্ভবত, আমরা কখনও ভেবেই দেখিনি।

অনুবাদ: মাহমুদুর রহমান

বিভাগ: 

Comments

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

মেইল ট্রেন
মেইল ট্রেন এর ছবি
Offline
Last seen: 6 months 4 weeks ago
Joined: শনিবার, এপ্রিল 26, 2014 - 5:56অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

ফেসবুকে ইস্টিশন

SSL Certificate
কপিরাইট © ইস্টিশন.কম ® ২০১৬ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর