নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 4 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • রাজর্ষি ব্যনার্জী
  • বিকাশ দাস বাপ্পী
  • রসিক বাঙাল
  • এলিজা আকবর

নতুন যাত্রী

  • সাতাল
  • যাযাবর বুর্জোয়া
  • মিঠুন সিকদার শুভম
  • এম এম এইচ ভূঁইয়া
  • খাঁচা বন্দি পাখি
  • প্রসেনজিৎ কোনার
  • পৃথিবীর নাগরিক
  • এস এম এইচ রহমান
  • শুভম সরকার
  • আব্রাহাম তামিম

আপনি এখানে

‘বাল্যবিবাহ নিরোধ বিল ২০১৭’ - একটি পর্যালোচনা


‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৬’ শীর্ষক খসড়া আইনের বিশেষ বিধান- একটি পর্যালোচনা
সীমা দত্ত ও অনুপম সৈকত শান্ত

গতবছর ৮ ডিসেম্বর ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন-২০১৬’ শীর্ষক বিল জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে। এর আগে গত ২৪ নভেম্বর এই খসড়া বিল মন্ত্রীপরিষদ চুড়ান্ত অনুমোদন করে। সংসদে উত্থাপিত এই বিলে বলা হয়েছে, “এই আইনের অন্যান্য বিধানে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, কোনো বিশেষ প্রেক্ষাপটে অপ্রাপ্ত বয়স্ক কোনো নারীর সর্বোত্তম স্বার্থে, বিধি দ্বারা নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণক্রমে, বিবাহ সম্পাদিত হইলে উহা এই আইনের অধীন অপরাধ বলিয়া গণ্য হইবে না”। বৃহস্পতিবার বিলটি উত্থাপন করেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে শুরু হওয়া সংসদ অধিবেশনে বিলটি উত্থাপনের বিরোধিতা করেন বিরোধী দল জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য মো. ফখরুল ইমাম। স্বাভাবিকভাবেই একতরফা এই সংসদে তার প্রস্তাব কণ্ঠভোটে নাকচ হয়ে যায়। পরে বিলটি অধিকতর পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ করে কমিটিকে এক মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

দুই বছর আগে ২০১৪ সালের ১৫ সেপ্টেম্বরেও মন্ত্রী পরিষদ একবার ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৪’ খসড়া আইন নীতিগত অনুমোদন দিয়েছিল। এই খসড়ায় বাল্যবিবাহের সাথে জড়িতদের সাজা ও জরিমানা উভয়ই বাড়ানোর প্রস্তাব থাকলেও একই সাথে এটি নারী ও পুরুষ উভয়েরই বিয়ের ন্যুনতম বয়স কমানোর প্রস্তাব করেছিল। সে সময়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রীসভার বৈঠকে অনুমোদিত খসড়া আইনে প্রস্তাব করা হয়েছিল- নারীর ন্যুনতম বিয়ের বয়স ১৬ এবং পুরুষের ন্যুনতম বিয়ের বয়স হবে ১৮ বছর। ব্যাপক প্রতিবাদের মুখে সরকার সেবারে পিছিয়ে এসেছিল। দুই বছর অপেক্ষা করে মন্ত্রীসভা এবার এই খসড়ার চুড়ান্ত অনুমোদন দিলো। আগেরবার যদি মেয়ের বিয়ের বয়স দুই বছর কমানোর প্রচেষ্টা হয়ে থাকে, এবারে সেটি কমানো হয়েছে পুরা ১৮ বছরই। কেননা এই খসড়া আইনে ‘বিশেষ বিধান’ নামক ১৯ নম্বর ধারায় "বিশেষ প্রেক্ষাপটে আদালতের অনুমতি নিয়ে অপ্রাপ্ত বয়স্ক মেয়েদের সর্বোত্তম স্বার্থে” বিয়ে দেয়ার বিধান রাখার যে অদ্ভুতুড়ে ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, তাতে ন্যুনতম কোন বয়সের কথা উল্লেখ নেই, অর্থাৎ এতে করে আদালতের অনুমতি মিললে মাত্র জন্ম নেয়া শিশুকেও বিয়ে করার ক্ষেত্রে কোন আইনগত বাঁধা থাকবে না।

বর্তমানে প্রচলিতবাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ১৯২৯ (১৯৮৪ সালে সংশোধিত) এর ধারা ২(ক) ও (খ) অনুযায়ীঃ "(ক) শিশু বলতে ঐ ব্যক্তিকে বুঝায়, যার বয়স পুরুষ হলে একুশ বৎসরের নীচে এবং নারী হইলে আঠার বৎসরের নীচে। (খ) বাল্যবিবাহ বলতে ঐ বিবাহকে বুঝায় যার চুক্তিবদ্ধ পক্ষগণের যেকোন একপক্ষ শিশু"। অর্থাৎ বাংলাদেশের বর্তমান প্রচলিত আইন অনুযায়ী ১৮ বছরের কম বয়সের নারী শিশু হিসেবে পরিগণিত এবং ১৮ বছরের নীচের নারীশিশুকে বিবাহ করা বাল্যবিবাহ হিসাবে আইনত দন্ডনীয়।বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ১৯২৯ (১৯৮৪ সালে সংশোধিত) এর ধারা ৪ (একুশোর্ধ পুরুষ বা ১৮ বছরের বেশি নারী যথাক্রমে কোন শিশু নারী বা পুরুষকে বিয়ে করলে), ধারা ৫ (বাল্যবিবাহ পরিচালনাকারী), ধারা ৬ (অভিভাবক) অনুযায়ী শাস্তি ছিলঃ “এক মাস পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাবাসে, এক হাজার টাকা পর্যন্ত বর্ধনযোগ্য জরিমানায় বা উভয়বিধ দণ্ডে শাস্তিযোগ্য হবেন”। আইনগতভাবে এই বাধা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের হার বিশেষ কমেনি, বরং বাংলাদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি বাল্যবিবাহের হারের দেশগুলোর মধ্যে উপরের সারিতে অবস্থানকারী দেশ। এর কারণ এই বাল্যবিবাহ আইনের প্রয়োগে দুর্বলতা, আইন অমান্যের জন্যে কঠোর শাস্তির অভাব, আইন প্রয়োগের জন্যে বিশেষ ক্ষমতা প্রাপ্ত ভ্রাম্যমান আদালত- মেজিস্ট্রেট প্রভৃতির অনুপস্থিতি এবং অন্যান্য আইন- বিশেষ করে নারী ও শিশু নির্যাতন আইন ২০০০ (২০০৩ সালে সংশোধিত ) এর সাথে বিরোধ প্রভৃতি। এই কারণগুলো দূর করা, তথা শাস্তির পরিমাণ বৃদ্ধি করা, বিশেষ করেআইন প্রয়োগকারী সংস্থার বিধান, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের দুর্বলতা দূর করা প্রভৃতি দাবি দীর্ঘদিন ধরেই আমাদের দেশের প্রগতিশীল অংশ তথা নারী অধিকার রক্ষায় সংগঠনগুলো তুলে এসেছিল। সেদিক দিয়ে পুরাতন বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন বাতিল করে আধুনিক ও যুগোপযোগী আইন গড়ে তোলা ছিল প্রত্যাশিত। কিন্তু, প্রস্তাবিত খসড়া আইন পুরাতন আইনকে বদলে আধুনিক করার পরিবর্তে একে আরো পিছনের দিকেই ঠেলে দেয়া হলো।

(কার্টুনঃ প্রথম আলো)

বাল্যবিবাহ নারীর মানবাধিকারের চরম লংঘন। আর “অপ্রাপ্তবয়স্ক”নারীর বিবাহ মানে তা শিশু বিবাহ। শিশু বিবাহের কারণে নারী শারীরিক-মানসিক, যৌন ও আর্থিক নির্যাতনের শিকার হয়। শিক্ষার অধিকার থেকেও বঞ্চিত হয়। সরকারের পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, বাংলাদেশে ৬৬ শতাংশ বাল্যবিবাহ হচ্ছে। আর ইউনিসেফ প্রকাশিত হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ২০১৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে ৭১ শতাংশ এবং শহরে ৫৪ শতাংশ মেয়েদের ১৮ বছরের নিচে বিবাহ হয়। সরকার ২০২১ সালে বাল্যবিবাহ ১০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার জন্য আর্ন্তজাতিকভাবে যে ঘোষণা দিয়েছে তার সঙ্গেও এই আইন সাংঘর্ষিক। ১৯২৯ সালের বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনে বাল্যবিবাহ ছিল শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কেবল শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচ্য নয়, বাল্যবিবাহ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার দাবিতে এদেশের প্রগতিশীল নারী সংগঠনসমূহ দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছে। অথচ সরকার বাল্যবিবাহ নিরোধের নামে যে খসড়া আইন প্রণয়ন করছে, তাতে অপ্রাপ্তবয়স্কমেয়েদের বিবাহ তথা শিশু বিবাহকে কার্যত বৈধতা দেয়া হবে।

এই আইন বাংলাদেশের সংবিধানের মৌলিক অধিকারের ২৭ ও ২৮ অনুচ্ছেদের পরিপন্থী। শিশু অধিকার সনদ ও সিডও সনদকেও তা লংঘন করেছে। একই সাথে জাতীয় শিশুনীতি ২০১১ ও শিশু আইন ২০১৩ কে লংঘন করেছে। শুধু তাই নয় পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন ২০১০, মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (২০০৩ সালে সংশোধিত) সহ অন্যান্য বিধি-বিধানের বিপরীতে সরকার এই আইন পাশ করতে যাচ্ছে। এই আইনের ফলে বাংলাদেশের কিশোরীদের শিক্ষাজীবন ক্ষতিগ্রস্ত হবে, বাড়বে স্বাস্থ্যঝুঁকি, সংকুচিত হবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ, বাড়বে নারী নির্যাতন। সর্বোপরি পরিবারে-সমাজে-রাষ্ট্রে নারীর সমঅধিকার-সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠার সামাজিক আকাঙ্ক্ষা ভূলুণ্ঠিত হবে। নারীর মতামত প্রদান ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ বাধাগ্রস্ত হবে। ফলে নারীর প্রতি সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি আরো পাকাপোক্ত হবে ও নারীর অধস্তনতা বৃদ্ধি পাবে। একই সাথে সরকারের এই সিদ্ধান্ত পশ্চাৎপদ চিন্তার প্রসার ঘটিয়ে মৌলবাদী শক্তির হাতকে আরো শক্তিশালী করবে। আর নিরাপত্তাহীনতার যে অজুহাত তোলা হয়েছে, তার দায়ভার নারীর উপর চাপিয়ে দেয়া অনৈতিক ও অযৌক্তিক। এসব কারণে বাংলাদেশের নারী সংগঠনগুলোসহ প্রগতিশীলগোষ্ঠী‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৬’শীর্ষক খসড়া আইনের বিশেষ বিধান বাতিল করে মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৮ বছর বহাল রাখার দাবি করছে।

নারী ও শিশু নির্যাতন আইন ২০০০ (২০০৩ সালে সংশোধিত )
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন- ২০০০ (২০০৩ সালে সংশোধিত) এ ধর্ষণের সংজ্ঞায় পেনাল কোড ১৮৬০ এর XLV Act এর অনুরূপ বিধান রাখা হয়েছে। পেনাল কোডের ৩৭৫ ধারা অনুযায়ী ১৪ বছরের চাইতে কম বয়সী শিশুকন্যাদের ক্ষেত্রে সম্মতি সহ বা বিনা সম্মতিতে যৌন সম্পর্ক স্থাপন ধর্ষণ বলে অভিহিত হবে (Fifthly. With or without her consent, when she is under fourteen years of age)। তবে দণ্ডবিধির ধারা ৩৭৫ এর “ব্যতিক্রম”অনুযায়ী “যদি কোনও পুরুষ তার স্ত্রীর সাথে যৌন সহবাস করে এবং স্ত্রীর বয়স যদি ১৩ বৎসরের কম না হয় তবে ধর্ষণ বলে গণ্য হবে না।”(Exception. Sexual intercourse by a man with his own wife, the wife not being under thirteen years of age, is not rape.)নারী ও শিশু নির্যাতন আইন২০০০ (২০০৩ সালে সংশোধিত) এর ধারা ২ (ট) এ বলা হয়েছেঃ "'শিশু' অর্থ অনধিক ১৬ বৎসর বয়সের কোন ব্যক্তি" এবং ধারা ৯ (১) এ বলা হয়েছে- "যদি কোন পুরুষ বিবাহ বন্ধন ব্যতীত ১৬ বৎসরের অধিক বয়সের কোন নারীর সহিত তাহার সম্মতি ব্যতিরেকে বা ভীতি প্রদর্শন বা প্রতারণামূলকভাবে তাহার সম্মতি আদায় করিয়া, অথবা ১৬ বৎসরের কম বয়সের কোন নারীর সহিত তাহার সম্মতিসহ বা সম্মতি ব্যতিরেকে যৌন সঙ্গম করেন, তাহা হইলে তিনি উক্ত নারীকে ধর্ষণ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবেন"।

১৯৯৫ ও ২০০০ সালে করা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে যৌন সম্মতির বয়স (Age of consent) ছিল ১৪, যেটি ২০০৩ এর সংশোধনীতে করা হয়েছে ১৬, যদিও পেনাল কোড অনুযায়ী এটি অবিবাহিত নারীর ক্ষেত্রে ১৪ এবং বিবাহিতের ক্ষেত্রে ১৩। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনানুযায়ী শিশু’র সংজ্ঞা হচ্ছে অনধিক ১৬ বছরের ব্যক্তি, আবার বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ১৯২৯ অনুযায়ী শিশু হচ্ছে অনধিক ১৮ বছরের নারী। ফলে এই সমস্ত আইন পারষ্পরিক সাংঘর্ষিক বলে নারী আন্দোলনের কর্মীরা প্রথম থেকেই নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের সংশোধনীর দাবি তুলেছিল, দাবি করেছিল এখানেও শিশু’র সংজ্ঞা এবং যৌন সম্মতির বয়স পরিবর্তন করে অনধিক ১৮ বছর করার। ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০’ সংশোধন করা হয় ২০০৩ সালে। সংশোধনীতে ২(ট) ও ৯(১) ধারায় ১৪ বছরের জায়গায় শিশুর বয়স এবং যৌন সম্মতির বয়স ১৬ বছর করা হয়। স্বভাবতই, বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন-১৯২৯ (১৯৮৪ সালে সংশোধিত) এর সাথে ফাঁক থেকেই যায়। নারী আন্দোলনকর্মীরা এই ফাঁক নিরসনে ২(ট) ও ৯(১) ধারা সংশোধন করে শিশুর বয়স ১৮ বছর করার এবং ২(ঙ) ধারায় ধর্ষণের সংজ্ঞা থেকে পেনাল কোডের ৩৭৫ ধারা উল্লেখ এর বদলে বর্তমান আইনের ৯(১) ধারায় থাকা সংজ্ঞা দ্বারা প্রতিস্থাপন করার দাবি জানিয়ে এসেছে।

অথচ আইনগুলোর মধ্যকার এই বিরোধ নিরসনে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন পরিবর্তন না করে- সরকার ২০১৪ সালে ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৪’ এর খসড়ায় নারীর ন্যুনতম বিয়ের বয়সই কমিয়ে ১৬ বছর করার প্রস্তাব করেছিল। প্রতিবাদের মুখে সেখান থেকে পিছিয়ে এলেও, আবারো বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৬ এর খসড়ায় নারী শিশুর সংজ্ঞায় অনধিক ১৮ বছর রাখা হলেও “বিশেষ বিবেচনায়” আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে যেকোন বয়সের শিশুর সাথে বিবাহের অনুমোদন দেয়া হলো! আদতে এর মাধ্যমে বাল্যবিবাহ নিরোধের বদলে বাল্যবিবাহের আইনগতভাবে বৈধতা প্রদান করা হলো। সেকারণে এই আইনকে "বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন" এর বদলে "বাল্যবিবাহ বৈধকরণ আইন" হিসেবে অভিহিত করা যায়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যুক্তি
গত ৭ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে এই খসড়া আইনের পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে বলেন, “বাল্য বিবাহ আইন নিয়ে ঘাবড়ানো কিংবা চিন্তিত হবার কিছু নেই। আমাদের দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা বিবেচনায় নিতে হবে। যারা কোন দিন গ্রামে বাস করেনি, গ্রামের সমাজ সম্পর্কে জানে না, শুধু একবার গেলাম আর দেখলাম, কথা বললাম- এসব করে সমাজ সম্পর্কে জানা হয় না। দিনের পর দিন গ্রামে বসবাস করলে গ্রামের বাস্তব অবস্থা ও গ্রামের আর্থ-সামাজিক অবস্থা সেটা উপলব্ধি করা যায়, জানা যায়”। প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমরা সব কিছু বিবেচনা করে এই বাল্যবিবাহ আইনটা করেছি। বাস্তবতাকে সামনে রেখেই করা হয়েছে। কিছু কিছু আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এটা নিয়ে অনেক কথা বলছে। যারা কথা বলছেন, তারা কিন্তু একটানা দুই-চার বছর গ্রামে বসবাস করেননি। তাই এ সম্পর্কে তাদের কোন ধারণাই নেই”। তিনি বলেন, “আমাদের দেশে কিছু বিষয় আছে, সে বিষয়গুলো নিয়ে তারা কখনও ভাবে না। যেহেতু বাস্তবতা থেকে তারা অনেক উর্ধ্বে। রাজধানীতে বসবাস করে, রাজধানীর পরিবেশ তারা দেখেন। বাস্তব অর্থে গ্রামীণ অবস্থা সম্পর্কে তারা জানে না”। যুক্তি উপস্থাপন করে সরকার প্রধান বলেন, “প্রত্যেক আইনেই যদি কোন অনাকাঙ্খিত অবস্থার সৃষ্টি হয়, তাহলে সেখানে কি করণীয় তার একটা সুযোগ অবশ্যই দিতে হবে। সেটা যদি না দেয়া হয় তাহলে এই সমাজের জন্য অনেক বড় একটা বিপর্যয় নেমে আসবে”। তিনি বলেন, “আমরা ১৮ বছর বিয়ের বয়স নির্দিষ্ট করে দিয়েছি। কিন্তু আপনারা চিন্তা করেন, একটা মেয়ে যে কোন কারণেই হোক যদি ১৩/১৪ বছর বয়সে পেগনেন্ট (গর্ভবতী) হয়ে গেলো, তাকে এ্যাবরসন (গর্ভপাত) করানো গেলো না। যে শিশুটি নেবে সেই শিশুটির অবস্থানটা কোথায় হবে? তাকে কি সমাজ গ্রহণ করবে? তাকে কি বৈধভাবে নেবে? বাস্তবতা হচ্ছে নেবে না”। প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন রেখে বলেন, “এ রকম যদি কোন একটা ঘটনা ঘটে তাহলে কি হবে? যে শিশুটার জন্ম হলো তার কি হবে? যে মেয়েটা সন্তান জন্ম দিলো তার অবস্থাই বা কি হবে? এই ধরণের যদি কোন অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটে সেখানে যদি বাবা-মা এবং কোর্টের মতামত নিয়ে বিয়ে দিয়ে দেয়া হয় তাহলে মেয়েটা বেঁচে গেলো। আর যে বাচ্চাটা হলো সেও বৈধতা পেলো। এই শিশুটি একটা ভবিষ্যত পেলো”। তিনি আরো বলেন, “ওয়েস্টার্ন কান্ট্রির (পশ্চিমা বিশ্বে) অনেক দেশে ১৪ বছর বিয়ের বয়স। কোথাও আছে ৯ বছর বিয়ের বয়স। সেই সব জায়গায় বিশেষ করে ইউরোপ-ইংল্যান্ড-আমেরিকায় টিনএজ মাদার এর সংখ্যা অসংখ্য। এটা একটা সামাজিক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে গেছে। কারণ এই সমস্ত বাচ্চা মেয়েরা ১২/১৩/১৪ বছরে মা হয়ে যায়। কারণ তারা কিন্তু এ্যাবরসন করাতে চায় না। বাচ্চাটাকে যদি লেখাপড়া করাতে হয় তাহলে ঐ দেশে কিন্তু প্রশ্ন করে না বৈধ সন্তান না অবৈধ সন্তান। বাবা-মায়ের নাম কী এটা কিন্তু জিজ্ঞেস করবে না। কিন্তু আমাদের দেশে আগে জিজ্ঞেস করবে বাপের নাম কি, মায়ের নাম কি? বাচ্চাকে বিয়ে দিতে গেলে ছেলে হোক মেয়ে হোক, অবৈধ সন্তান বিয়ে হবে না। চাকুরী দেবে না”। প্রধানমন্ত্রী বলেন, “ওয়ের্স্টান কান্ট্রিতে এটা কোন বিষয় না। আমাদের দেশে এটা নেই। বাবা-মা অবৈধ সন্তান জন্ম দেয়া মেয়েটাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে, ভবিষ্যতে মেয়েটাকে পতিতালয়ে যেতে হবে। আমাদের এখানে যারা বাল্যবিবাহ আইন নিয়ে কথা বলছেন, তারা কি এই বাস্তবতাটা চিন্তা করেন? তারা তো এই বাস্তবতা চিন্তা করেন না বলেই নানা কথা বলেন”। ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “তারা দুইটা এনজিও করে পয়সা কামায়। আমি যতক্ষণ সরকারের আছি আমি মনে করি এটা আমার দায়িত্ব যে, সমাজে সে সন্তানটাকে জায়গা করে দেয়া। এ কারণেই বাল্যবিবাহ আইনে এই বিশেষ বিধানটা আমি রেখেছি। এটা অত্যন্ত একটা বাস্তবসম্মত চিন্তা, যেটা সম্পর্কে এনাদের (বিরোধীতাকারী) কোন ধারনা নেই। আমরা এ ব্যাপারে জনসচেতনতা সৃষ্টির চেষ্টা করছি”।

প্রধানমন্ত্রীর বিক্ষোভের কারণ অননুমেয় নয়। দীর্ঘদিন ধরেই সরকার এই আইনটি পরিবর্তনের চেস্টা করে আসছে এবং প্রতিবারই প্রবল সমালোচনার সম্মুখীন হচ্ছে। ফলে, তাদের ক্ষোভের যথেষ্ট কারণ আছে বৈকি। প্রধানমন্ত্রী তাই এই খসড়া আইন সমূহের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারী অংশকে “দুইটা এনজিও করে পয়সা কামানো” বলে অভিহিত করে জানিয়েছেন তারা গ্রামে যায় না, গ্রামীণ বাস্তবতা বুঝতে পারে না ... প্রভৃতি। অথচ, প্রধানমন্ত্রী মহোদয় আমাদের গ্রামীণ বাস্তবতায় যে বাল্যবিবাহের অভিশাপ সবচেয়ে প্রকট সেটিই আড়াল করেছেন। প্রধানমন্ত্রী যুক্তি করেছেন, অনাকাঙ্খিত সন্তান চলে আসলে বিবাহ দেয়াই একমাত্র উপায় হতে পারে, সেরকম ক্ষেত্রে এই বিশেষ বিধান বিশেষ কাজে লাগবে। বাস্তবে, এর মধ্য দিয়ে ধর্ষণকেই উৎসাহিত করা হয়েছে। কেননা, শিশুদের সাথে সম্মতিতেও যৌন সম্পর্ক করা হলে ধর্ষণ হিসেবে বিবেচনা ক’রে (নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (২০০৩ সালে সংশোধিত) দ্রষ্টব্য) যেখানে ধর্ষককে কঠোর শাস্তির মাধ্যমে এরকম ঘটনার প্রকোপ কমানোর কথা, সেখানে ধর্ষণের ফলে অনাগত শিশুর ভবিষ্যতের কথাকে অযুহাত হিসাবে ধর্ষককে কেবল দায়মুক্তিই দেয়া হচ্ছে না,ধর্ষকের সাথে বিবাহের ব্যবস্থা উপহার স্বরূপ দেয়া হচ্ছে। কেবল শিশু ধর্ষণের ক্ষেত্রেই নয়, যেকোন বয়সের নারীকে ধর্ষণের ক্ষেত্রেই অনাগত শিশুর কি হবে- এটি একটি মানবিক প্রশ্ন। প্রচলিত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ এর ১৩ নম্বর ধারা অনুযায়ী “ধর্ষণের ফলশ্রুতিতে জন্মলাভকারী শিশু সংক্রান্ত বিধান” এ ধর্ষণের ফলশ্রুতিতে জন্মলাভকারী শিশুর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে স্পষ্ট বিধান আছে, কিন্তু এখানে ধর্ষকের সাথে বিয়ের কথা বলা হয়নি। ফলে, সংসদে প্রদত্ত প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য প্রচলিত আইন পরিপন্থী। এর বাইরে তিনি পাশ্চাত্য সমাজের সাথে যে তুলনা টেনেছেন, সেটিও অপূর্ণাঙ্গ ও ভ্রান্ত। জাতিসংঘের রিপোর্ট অনুযায়ী শিশু মাতৃত্বের হার এখনো আফ্রিকা ও বাংলাদেশ সহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশসমূহে সর্বোচ্চ। ইউরোপ আমেরিকায় অল্প বয়সে মাতৃত্বের সমস্যাটি তারা গুরুত্বের সাথে দেখছে মানে এই না যে, আমাদের মত দেশগুলোর মতই সেখানে এই শিশু মাতৃত্বের হার উচ্চ। এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলোতে যেখানে শিশু মাতৃত্বকে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য ও সাদরে বরণ করা হয়, সেখানে পাশ্চাত্যের এই দেশগুলোতে শিশু মাতৃত্বকে একটি সামাজিক ব্যধি হিসাবে দেখা হচ্ছে। কোনমতেই – পাশ্চাত্যের উদাহরণ টেনে আমাদের দেশে শিশু মাতৃত্বের কথা বলে শিশুদের বিবাহকে উৎসাহিত করার উপায় নেই, কেননা আমাদের দেশে শিশু মাতৃত্বের বড় কারণ শিশুবিবাহ তথা বাল্যবিবাহ।

(ছবিঃ অমৃতবাজার পত্রিকা)

এই প্রেক্ষাপটে, আমরা বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনের খসড়াটিকে পর্যালোচনা করতে চাই।

এই আইন নারীর গণতান্ত্রিক অধিকারের পরিপন্থী
একটা গণতান্ত্রিক সমাজে আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্য কি হবে? অবশ্যই তা জনসাধারণের গণতান্ত্রিক অধিকার ও সকল মানুষের সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য থেকে প্রণীত হবে। শাসকদের অগণতান্ত্রিক শাসনের ফলে সমাজে বা রাষ্ট্রে যে পশ্চাদৎদতা তৈরি হয়েছে, তাকে স্থায়ী করতে আইন প্রণীত হলে তাতে ভোটের রাজনীতির সুবিধা হয়, কিন্তু সমাজ আরো পিছিয়ে যায়। ইতিহাস থেকে আমরা জানি- ব্যক্তিস্বাধীনতা, নারীর সমঅধিকার, সমমর্যাদার দাবি হঠাৎ করে আসেনি। তার জন্য শত শত বছর লড়তে হয়েছে। পরাধীন ভারতবর্ষে বেগম রোকেয়ার মত মানুষদের সমাজের পশ্চাৎপদতা, ধর্মীয় গোঁড়ামীর বিরুদ্ধে লড়তে হয়েছে। ‘৭১ এ এতবড় রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যে স্বাধীনতা আমরা অর্জন করেছিলাম, তার প্রধান আকাঙ্ক্ষা ছিল সমাজ থেকে সকল প্রকার বৈষম্যের অবসান ঘটবে, শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবে। ধর্মের দৃষ্টিতে রাষ্ট্র মানুষকে বিবেচনা করবে না। পূর্ববর্তী স্বৈরাচারী শাসনের অবসান হয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকেই গত ৪৬ বছর ধরে বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি এ লক্ষ্যের বিপরীতে পরিচালিত হয়েছে। প্রস্তাবিত এ আইনটি তাই একদিকে যেমন সমাজ বিকাশের ধারায় গণতান্ত্রিক অধিকারের পরিপন্থী, অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনারও পরিপন্থী।

বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনের বিশেষ বিধান জাতীয়, আর্ন্তজাতিক সনদ ও বিধি-বিধানের লঙ্ঘন
১. আইনে উল্লেখিত “বিশেষ ক্ষেত্র”বা “বিশেষ প্রেক্ষাপট”কথাটি বাংলাদেশ সংবিধানের মৌলিক অধিকারের ২৭ ও ২৮ অনুচ্ছেদের সম্পূর্ণ বিরোধী। অনুচ্ছেদ-২৭ এ বলা হয়েছে, ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয়লাভের অধিকারী। অনুচ্ছেদ-২৮(১) এ বলা হয়েছে, ‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোন নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করবে না।’উল্লেখিত দুইটি অনুচ্ছেদে নাগরিক হিসেবে নারীর যে অধিকার লাভের কথা বলা হয়েছে এই আইনের বিশেষ বিধান তাকে খর্ব করেছে।

২. এই “বিশেষ ক্ষেত্র”কথাটি মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণা ১৯৪৮, সিডও সনদ ১৯৭৯ ও শিশু অধিকার সনদ ১৯৮৯ এর সাথেও সাংঘর্ষিক। শিশু অধিকার সনদে ১৮ বছরের নিচে সকল মানব সন্তানকে “শিশু”হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

৩. জাতীয় শিশু নীতি ২০১১ এবং শিশু আইন ২০১৩-এ ১৮ বছরের নিচের সকল ব্যক্তিকে “শিশু”বলে অভিহিত করা হয়েছে। “শিশু আইন ২০১৩”এর ৪ ধারায় উল্লেখ আছে ‘বিদ্যমান অন্য কোন আইনে ভিন্নতর যাহা কিছুই থাকুক না কেন, এই আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে অনুর্ধ্ব ১৮ (আঠার) বৎসর বয়স পর্যন্ত সকল ব্যক্তি “শিশু”হিসাবে গণ্য হবে।’

৪. পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন ২০১০ এ ১৮ বছরের নিচের মানব সন্তানকে “শিশু”বলে অভিহিত করা হয়েছে।

৫. মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ অনুযায়ী, বিবাহের ৫টি শর্তের মধ্যে প্রথম শর্ত হলো বয়স, দ্বিতীয় শর্ত সম্মতি। “অপ্রাপ্তবয়স্ক”মেয়েদের বিবাহের ক্ষেত্রে এই প্রধান দুইটি শর্তকে উপেক্ষা করা হবে যা বিবাহ সংক্রান্ত আইনের লংঘন। কেননা এই আইন অনুযায়ী বিবাহ একটি সামাজিক ও দেওয়ানী চুক্তি। চুক্তি সম্পাদিত হয় মূলত প্রাপ্তবয়স্কসুস্থ মস্তিষ্কের দুইজন মানুষের মধ্যে। বাল্যবিবাহের বিশেষ বিধান চুক্তির এই শর্তকেও লংঘন করেছে।

৬. নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (২০০৩ সালে সংশোধিত ) এর ৯(১) ধারায় বলা হয়েছে, ‘বিবাহ ব্যতিত ১৬ বছরের অধিক বয়সের কোন নারীর সাথে তার অসম্মতিতে বা ভীতি প্রদর্শন বা প্রতারণামূলক ভাবে সম্মতি আদায় করে অথবা ১৬ বছর বয়সের কম কোন নারীর সম্মতিসহ বা সম্মতি ছাড়া যৌন সর্ম্পক স্থাপন করলে তা নারী ধর্ষণ হিসেবে গণ্য হবে।’ফলে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনের বিশেষ বিধান বিবাহের মাধ্যমে শিশু ধর্ষণকে আইনসম্মত করেছে এবং অন্যদিকে ধর্ষকের অপরাধকেও আইনসিদ্ধ করেছে।

৭. সাবালকত্ব আইন ১৮৭৫ অনুযায়ী একজন ব্যক্তির বয়স ১৮ বছর হলেই সে সাবালক হয় এবং সে তার মতামত প্রকাশ ও প্রদান করতে পারে। বাল্যবিবাহের বিশেষ বিধান এই আইনেরও লংঘন।
স্পষ্টতই বোধগম্য “বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৬”শীর্ষক খসড়া আইনটি জাতীয় ও আর্ন্তজাতিক বিভিন্ন আইন ও সনদের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

বাংলাদেশের বর্তমান চিত্র
বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক এন্ড হেলথ সার্ভে ২০০৭-এর তথ্য অনুযায়ী ১৮ বছরের আগে ৬৬ শতাংশ মেয়ে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছে। গত দুই দশক ধরে এ হার অপরিবর্তিত রয়েছে। আবার ঐ ৬৬ শতাংশের এক তৃতীয়াংশ ১৯ বছর হওয়ার আগেই গর্ভবতী হচ্ছে। বাল্য বিবাহ সম্পর্কিত জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিল বিষয়ক কার্যক্রম (ইউএনএফপিএ)র প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, পৃথিবীর সেরা ১০টি দেশের মধ্যে বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অধিক ঝুঁকিপূর্ণ। সেভ দ্যা চিলড্রেন-এর ২০১০ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের ৬৯ শতাংশ নারীর ১৮ বছর বয়স হওয়ার আগেই বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। জাতীয় কন্যা শিশু অ্যাডভোকেসি ফোরাম-এর তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের বাল্য বিবাহের হার ২০০৯ সালে ছিল ৬৪ শতাংশ, যা ২০১১ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ৬৬ শতাংশে। বাংলাদেশে ১৫ বছর বয়স হওয়ার আগেই বিয়ের হার ৩৯ শতাংশ!গ্রাম শহরের পার্থক্যটাও উল্লেখযোগ্য - গ্রামের ৭১% মেয়ে আর শহরের ৫৪% মেয়ের বিয়ে ১৮ বছরের আগে হচ্ছে। বাংলাদেশ আর সব জাতিসংঘের মিলেনিয়াম গোলে খুব ভালো সক্ষমতা দেখাতে পারলেও, যে দুটিউদ্দেশ্য পূরণেএকদমই পেছনে পড়ে আছে- সেই দুটি হচ্ছে, বাল্যবিবাহের হার কমানো এবং শিশুকালীনগর্ভধারণের হার কমানো।

শিক্ষাক্ষেত্রে ঝরে পড়ার হার বাড়বে
বাংলাদেশ শিক্ষা, তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী, প্রাথমিক শিক্ষায় ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা সমান। মাধ্যমিক স্তরে ৫৩ শতাংশ, কলেজ পর্যায়ে ৪৭ শতাংশ এবং উচ্চশিক্ষায় ৩৩ শতাংশ মেয়েরা শিক্ষাগ্রহণ করছে। ইউনিসেফের ‘উইমেন্স লাইফ চয়েস এন্ড এটিচুডস ২০১৪’এর গবেষণায় দেখা গেছে, বিবাহ সংক্রান্ত কারণে ২৪ শতাংশ মেয়েদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। আর সরকারের অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রাথমিক পর্যায়ে ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের সংখ্যা বেশি হলেও মাধ্যমিক পর্যায়ে তাদের সংখ্যা ৩০ শতাংশে দাঁড়ায়। অর্থাৎ ৭০ শতাংশ কিশোরী লেখাপড়া থেকে বাদ পড়ে যায় (২২ নভেম্বর ২০১৬ প্রথম আলো)। আমাদের দেশের মেয়েদের পশ্চাৎপদ অবস্থানের চিত্র বুঝতে এই তথ্যই যথেষ্ট। এক্ষেত্রে স্মরণ করা যায়,সুনামগঞ্জের ধরমপাশা উপজেলার মধ্যনগর পাবলিক বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্রী মিতু মালাকারের কথা। সহপাঠিরাই তার বাল্যবিবাহ ঠেকিয়েছিল। আবার ঝালকাঠির রাজাপুর পাইলট স্কুলের দশম শ্রেণীর ছাত্রী শারমিন আক্তার, নিজেই নিজের বাল্যবিবাহ ঠেকিয়েছিল। শারমিন তার প্রতিক্রিয়ায় বলেছিল, ‘বাংলাদেশে যেন বাল্যবিবাহ শব্দটি না থাকে’ এবং অভিভাবকদেরকে আহবান জানিয়েছিল, ‘মেয়েদের লেখাপড়ার সুযোগ করে দিন। কোন মেয়ে যেন অসহায় না থাকে। দুই কোটি কিশোরী মিলে দেশকে জয় করব।’ শারমিন গ্রামেরই মেয়ে। সেদিন সাহসের সাথে মিতুর সহপাঠিরা ও শারমিন যদি প্রতিবাদ না করত তাহলে তারা দুজনেই এসএসসি উত্তীর্ণ হওয়ার পূর্বেই শিক্ষাক্ষেত্র থেকে ঝরে পড়ত। ১৮ বছরের আগে বিয়ে নয়, এই বক্তব্যের সাথে তারা পরিচিত ছিল বলে এই পদক্ষেপ নিতে পেরেছিল। তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল শিক্ষক ও স্থানীয়ইউপি চেয়ারম্যান ও টিএনও। কিন্তু বর্তমান আইনে বিশেষ বিধান বহাল থাকলে মিতু ও শারমিনদের পাশে যেমন আইন থাকবে না, তেমনি থাকবেন না শিক্ষক সমাজ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসন। ফলে এই আইন ঐ কিশোরীদের জীবনে ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে।

মাতৃমৃত্যুর হার ও মাতৃস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়বে

(ছবিঃ হাফিংটন পোস্ট)

১৮ বছরের পূর্বে নারীর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ হয় না। ফলে শিশুর ওজন কম হবে, অপুষ্টিতে ভুগবে, সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে শিশু বিকশিত হতে পারবে না। ভগ্ন স্বাস্থ্যের মা ভগ্নস্বাস্থ্যের শিশু জন্ম দিবে- এটাই স্বাভাবিক। সন্তান যখন গর্ভে থাকে তখন মাকে পুষ্টিকর খাবার দেয়ার মতো সামর্থ্য আমাদের দেশের কয়জন মানুষের আছে? মানব উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮৭টি দেশের মধ্যে ১৪৭তম। বাংলাদেশে দারিদ্রসীমার নিচে বাস করে ৪৫ শতাংশ মানুষ। যদিও সরকারের হিসাব মতে তা ২২.৪ শতাংশ। দি ইন্টারন্যাশনাল এইড ট্রান্সপারেন্সী ইনিশিয়েটিভ এর তথ্যমতে, ‘বাংলাদেশে সন্তান প্রসবের সময় প্রতি লাখে ১৭০ জন নারী মৃত্যুবরণ করে। প্রতি হাজারে ২৪ শতাংশ নবজাতক মৃত্যুবরণ করে, এই নবজাতকের মৃত্যুহারে পৃথিবীর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৬ষ্ঠ। ৭১ শতাংশ নারীর পারিবারিক আয়োজনে প্রসবকালীন সেবা দেয়া হয় এবং মাত্র ৩৬ শতাংশ নারী দক্ষ ধাত্রীর সহযোগিতা পায়।’এরূপ পরিস্থিতিতে সরকার যখন শিশুর বিবাহকে আইনে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করছে তখন নারীসমাজ হতবাক।

বাল্যবিবাহের কারণে নারীরা যৌনরোগ, গর্ভকালীন জটিলতা, প্রসবকালীন স্বাস্থ্যঝুঁকি, জরায়ূ মুখে ক্যান্সার ও ফিস্টুলা সহ নানাবিধ রোগে আক্রান্ত হবে। বহু বছর আগে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বাল্যবিবাহের কুফল সম্পর্কে বলেছিলেন, “..... সকল সুখের মূল যে শারীরিক স্বাস্থ্য তাহাও বাল্য পরিণয়যুক্ত ক্ষয় পায়। ফলতঃ অন্যান্য জাতি অপেক্ষা অম্মদ্দেশীয় লোকেরা যে শারীরিক ও মানসিক সামর্থ্যে নিতান্ত দরিদ্র হইয়াছে, কারণ অন্বেষণ করিলে পরিশেষে বাল্যবিবাহই ইহার মূখ্য কারণ নির্ধারিত হইবেক সন্দেহ নাই”। আজ থেকে প্রায় ১২৫ বছর আগে বিদ্যাসাগর বাল্যবিবাহ সম্পর্কে এই বক্তব্য রেখেছিলেন এবং বাল্যবিবাহ বন্ধের জন্য আন্দোলন করেছিলেন। অথচ তথাকথিত ডিজিটাল বাংলাদেশে “অপ্রাপ্তবয়স্ক” মেয়েদের বিয়ের জন্য সরকার আইনে বিশেষ বিধান রেখেছে।

অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে নারীর অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্ত হবে
অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা নারীর ক্ষমতায়নের অন্যতম সূচক। বাংলাদেশে ১৮ বছরের আগে নারী বা পুরুষ কেউ নাগরিক অধিকার লাভ করে না। ফলে বিশেষ ক্ষেত্রে “অপ্রাপ্তবয়স্ক”নারীর বিবাহকে আইনসিদ্ধ করলে তা ঐ নারীর জন্য বিপদ ডেকে আনবে। কারণ ১৮ বছরের নিচে যখন একজন নারী মা হবে তখন ঐ ভগ্ন স্বাস্থ্য নিয়ে কোন অর্থনৈতিককর্মকান্ডে অংশ নেয়া কঠিন হবে।

বিশেষ বিধান কি নারীর নিরাপত্তাহীনতা কমাবে?
দেশে প্রতিদিন ৩ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয় (ঢাকা ট্রিবিউন, জুলাই ০১, ২০১৬)। সরকারের পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৫ সালের তথ্যানুযায়ী, দেশে বর্তমানে বিবাহিত নারীদের শতকরা ৮০ জনই কোনো না কোনোভাবে নির্যাতনের শিকার হন। সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হয় স্বামীর হাতে। আর কিশোরীরা প্রতিদিন তটস্থ থাকে কখন বখাটেরা তদের উত্ত্যক্ত করে ! আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে, ২০১৬ সালে ১৪৮টি উত্তক্ত্যতার ঘটনা ঘটেছে। ২০১৬ সালে শিশু ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে ১৪ শতাংশ। এরূপ পরিস্থিতিতে কোনো মা-বাবা কি তাদের মেয়েদেরকে বিয়ে দিয়ে বাঁচাতে পারবেন? বিয়ের পর সন্তান ধারণের ঝুঁকি, আর্থিক অনটন, অপুষ্টিসহ যে দুর্বিষহ অবস্থায় তারা পতিত হবে, সেখানে সে বাঁচবে কি করে?

আবার নিরাপত্তাহীনতার কারণেই বাবা-মা মেয়েকে যদি বিয়ে দেয় তাহলে কি মেয়ে নিরাপদ থাকবে? গত ১১ ডিসেম্বর টাঙ্গাইলে যৌতুকের কারণে ফাতেমা আক্তার লিয়াকে তার স্বামী নির্মম ও নৃশংসভাবে নির্যাতন করেছে। ১৮ ডিসেম্বর সিলেটে ৫ লাখ টাকা যৌতুকের জন্য সোমা বেগমের জিহ্নবা কেটে নিয়েছে তার স্বামী (সূত্র: প্রথম আলো)। ফলে বিবাহ নারীর জন্য নিরাপদ থাকার একমাত্র পথ নয়, পথ হলো মনুষ্যত্ব-বিবেক-সমমর্যাদা ও সমঅধিকার নিয়ে বাঁচার লড়াই। যে মা-বাবা মেয়ের নিরাত্তাহীনতার কথা ভাবছেন আপনারা কি এই সমাজে নিরাপদ? সকালে বাড়ি বা বাসা থেকে বের হলে নিরাপদে ঘরে ফিরবেন, তার নিশ্চয়তা কি সমাজে বা রাষ্ট্রে আছে? উত্তর, নেই। আপনার নিরাপত্তা নেই, আর এক্ষেত্রে মেয়েদের নিরাপত্তাহীনতা আরো বেশি। ফলে সরকার মেয়েদের নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে ভাবছেন না, ভাবছেন ক্ষমতার নিরাপত্তা নিয়ে।

নারীর সমঅধিকার-সমমর্যাদা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও মতামত প্রকাশ বাধাগ্রস্ত হবে
আইনের বিশেষ বিধান নাগরিক হিসাবে নারী-পুরুষের সমঅধিকার-সমমর্যাদা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও মতামত প্রকাশের অধিকারকে খর্ব করেছে। বর্তমান পুঁজিবাদী সমাজে নারী একদিকে পুঁজির শোষণের শিকার, অন্যদিকে পিতৃতান্ত্রিক এ সমাজব্যস্থায় নারী পুরুষের অধীন। খসড়া এই আইনের ফলে নারীর উপর উল্লেখিত দ্বৈত শোষণ আইনিভাবে আরো পাকাপোক্ত হবে। নারীর প্রতি সমাজমননে যে নেতিবাচক ধারণা আছে তাও শক্ত ভিতের উপর দাঁড়াবে। পারিবারিক আইনসহ সকল ক্ষেত্রে নারী এখনও দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক। সরকার নারীর ক্ষমতায়ন ও উন্নয়নের কথা বললেও সিডও সনদের ধারা (২) এর ‘বৈষম্য বিলোপ নীতি’ও ধারা (১৬) এর ১ (গ) এ উল্লেখিত ‘বিবাহ ও বিচ্ছেদকালে নারী এবং পুরুষের একই অধিকার এবং দায়িত্বের বিষয়টি এখনও সংরক্ষিত রেখেছে। নারীর গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সিডও সনদের পরিপূরক করে আইন তৈরির বিপরীতে সমাজের কূপমন্ডূক চিন্তা-ধারণা, প্রচলিত প্রথা ও রীতিনীতিকেই সরকার পৃষ্ঠপোষকতা করছে। আমরা মনে করি, সমাজে নারীর সমঅধিকার-সমমর্যাদা, মতামত প্রদান ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সমঅংশগ্রহণের জন্য সকল নাগরিকের জন্য একই ধরনের আইন প্রণয়ন করতে হবে। বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনের বিশেষ বিধান নারী সমাজের এই আকাঙ্ক্ষার সাথেও সাংঘর্ষিক।

আমরা আশা করি, সরকার তার সিদ্ধান্ত থেকে সরে দাঁড়াবে। আর এর জন্যে নারী সমাজের জন্য অবমাননাকর এই আইনের বিশেষ বিধান বাতিলের দাবিতে দেশের বিবেকবান মানুষের আন্দোলন গড়ে তোলার বিকল্প নেই।

আমরা দাবি তুলিঃ
১।“বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৬”শীর্ষক খসড়া আইনের ১৯ ধারার বিশেষ বিধান বাতিল করতে হবে। শর্তহীন ভাবে এই আইনে মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৮ বছর রাখতে হবে।
২। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (২০০৩ সালে সংশোধিত) এ শিশুর বয়স ও যৌন সম্মতির বয়স (Age of consent) ১৮ বছর করতে হবে, ধর্ষণের সংজ্ঞা থেকে পেনাল কোড ৩৭৫ কে বাদ দিতে হবে।
৩। ঘরে-বাইরে নারী নির্যাতন বন্ধ করতে হবে। নারী-শিশু নির্যাতনকারীদের গ্রেফতার ও বিচার করতে হবে। সর্বত্র নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
৪। সিডও সনদের ২ এবং ১৬ এর ১(গ) থেকে সংরক্ষণ প্রত্যাহার করে সিডও সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করতে হবে
৫। সর্বক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমঅধিকার, সমমর্যাদা, সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ায় সমঅংশগ্রহণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ইউনিফরম সিভিল কোড চালু করতে হবে।

তথ্যসূত্রঃ
১। বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ১৯২৯: http://bdlaws.minlaw.gov.bd/pdf_part.php?id=149
২। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০: http://bdlaws.minlaw.gov.bd/bangla_pdf_part.php?id=835
৩। পেনাল কোড ১৮৬০- ধারা ৩৭৫: http://bdlaws.minlaw.gov.bd/pdf_part.php?id=11
৪। সিডঅ সনদ : http://www.un.org/womenwatch/daw/cedaw/text/econvention.htm
৫। “‘তবে’ রেখেই হচ্ছে বাল্যবিয়ে নিরোধ আইন” – বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ২৪ নভেম্বর ২০১৬ : http://bangla.bdnews24.com/bangladesh/article1247619.bdnews
৬। বাল্যবিবাহ নিরোধ বিল সংসদে উত্থাপন; যুগান্তর, ০৮ ডিসেম্বর, ২০১৬ : http://www.jugantor.com/online/national/2016/12/08/33303
৭। বাস্তব কারণেই বাল্যবিবাহ আইনে বিশেষ বিধান: প্রধানমন্ত্রী; বাংলা ট্রিবিউন, ডিসেম্বর ০৭, ২০১৬ : http://www.banglatribune.com/national/news/163597
৭। বিয়ের বয়স কমানো শুভঙ্করের ফাঁকি হবে নিজস্ব প্রতিবেদক; অক্টোবর ০১, ২০১৪ : http://www.prothom-alo.com/bangladesh/article/335221

লেখক পরিচিতঃ
সীমা দত্ত, সভাপতি, বাংলাদেশ নারীমুক্তি কেন্দ্র, কেন্দ্রীয় কমিটি
অনুপম সৈকত শান্ত- প্রকৌশলী ও লেখক

তথ্যসংযোগঃ অবশেষে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ তারিখে একতরফা সংসদে কন্ঠভোটে "বাল্যবিবাহ নিরোধ বিল - ২০১৭" পাশ হয়। আলোচ্য প্রবন্ধটি সংসদে এই বিল পাশের পূর্বে লিখিত এবং আনু মুহম্মদ সম্পাদিত সর্বজনকথা, ফেব্রুয়ারি-এপ্রিল, ২০১৭ সংখ্যায় প্রকাশিত। আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে প্রবন্ধটি ইস্টিশন ব্লগে প্রকাশিত হলো।

যেহেতু, প্রবন্ধটি কিছুটা আগে লিখিত, সাম্প্রতিক প্রাসঙ্গিক কিছু তথ্য যুক্ত করা হলোঃ
** গত ডিসেম্বরে সংসদে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৬ বিল উত্থাপন করা হয়, যেখানে নারী ও পুরুষের ন্যুনতম বিয়ের বয়স যথাক্রমে ১৮ ও ২১-ই রাখা হলেও "বিশেষ প্রেক্ষাপট" নামে একটি অনুচ্ছেদ যুক্ত করে- আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে পিতামাতার সম্মতিতে অরাপ্তবয়স্ক নারীর বিয়ের বিধান দেয়া হয়। এই বিলটি মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে একমাসের মধ্যে রিপোর্ট দেয়ার জন্যে পাঠানো হয়। একটা ক্ষীণ আশা অনেকে করেছিলেন যে, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় হয়তো- নারীর জন্যে ক্ষতিকর এই বিশেষ প্রেক্ষাপট নামক বিশেষ বিধানের তামাশাটি বাতিলের সুপারিশ করবে। কিন্তু, সে আশায় গুড়ে বালি ... তারা জেণ্ডার ইকুয়ালিটির সুপারিশ করেছেন।
** মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়- সুপারিশ করেছে, বিশেষ প্রেক্ষাপট থেকে "অপ্রাপ্তবয়স্ক কোনো নারীর" এর বদলে শুধু "অপ্রাপ্তবয়স্ক" করার সুপারিশ করেছে। অর্থাৎ- যেটি দাঁড়াচ্ছে - এর ফলে বিশেষ প্রয়োজনে আদালতের অনুমতি নিয়ে কেবল নারী নয়- পুরুষেরও যেকোন বয়সে বিয়ের বাধা থাকছে না।
** বিশেষ প্রেক্ষাপট সম্পর্কে আরেকটি সুপারিশ তারা করেছে- "মাতা-পিতার সম্মতিক্রমে" এর সাথে "প্রযোজ্যক্ষেত্রে অভিভাবকের সম্মতি" যুক্ত করেছে। অর্থাৎ কেবল মাতা-পিতা নয়, চাচা, মামা, ভাই প্রভৃতির অভিভাবকের কাছে পালিত নারী- পুরুষের বিয়ের সম্মতিও তারাও দিতে পারবেন। বলাই বাহুল্য যে- আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এরকম ক্ষেত্রে চাচা- মামা- বড় ভাই- খালা - ফুপু এর কাছে লালিত পালিত শিশুকে 'আপদ বিদেয়' করার লক্ষে দ্রুত বিয়ে দেয়ার হার অনেক বেশি।
অর্থাৎ- সুপারিশকৃত বিশেষ প্রেক্ষাপটের বিশেষ বিধানটি দাড়াচ্ছেঃ
“এই আইনের অন্যান্য বিধানে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, কোনো বিশেষ প্রেক্ষাপটে ['অপ্রাপ্তবয়স্ক কোনো নারীর' জায়গায় 'অপ্রাপ্তবয়স্কের'] সর্বোত্তম স্বার্থে আদালতের নির্দেশনাক্রমে এবং ['মাতা-পিতার' জায়গায় 'মাতা-পিতার ও প্রযোজ্য ক্ষেত্রে অভিভাবকের'] সম্মতিক্রমে বিধি দ্বারা নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণক্রমে বিবাহ সম্পাদিত হইলে উহা এই আইনের অধীন অপরাধ বলিয়া গণ্য হইবে না।”
** অবশেষে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ তারিখে একতরফা সংসদে কন্ঠভোটে "বাল্যবিবাহ নিরোধ বিল - ২০১৭" পাশ হয়।
** তথ্যমত্রী হাসানুল হক ইনুও প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিধ্বনি করে বিশেষ প্রেক্ষাপটের ব্যাখ্যা দিয়েছেন এভাবেঃ "একটি মেয়েকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর সে যদি অন্তঃসত্ত্বা হয়, তখন মেয়েটির কী করবে। এ রকম ক্ষেত্রে আদালতের আদেশে দুই পরিবারের সম্মতিতে বিয়েই সমাধান"! শুধু তাই নয়, পুরো বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনের কেবল বিশেষ প্রেক্ষাপট নিয়ে এত আলাপ-আলোচনা-সমালোচনায় তিনি ভীষণ ক্ষোভও প্রকাশ করেছেন।

বিভাগ: 

Comments

পৃথু স্যন্যাল এর ছবি
 

বাল্য বিবাহ নিয়ে একটি চমৎকার উপস্থাপনার জন্য অশেষ কৃতজ্ঞতা। দাবীগুলো কিভাবে বাস্তবায়ন করা যায় সেদিকে মনযোগ দিতে হবে।

*************************************
আমি কারো দেখানো পথে চলি না।
আমার ইচ্ছে মত পথের তৈরী করি।
^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^

 
নুর নবী দুলাল এর ছবি
 

দারুণ পর্যালোচনা।

 
রেজ্জাকুল চৌধুরী এর ছবি
 

শান্ত ভাই,, চমৎকার আলোচনার জন্য ধন্যবাদ I//
সমস্যার সাথে আপোষ করে যে কোনো পদক্ষেপ নুতুন নুতুন সমস্যার জন্ম দেয় I সমাজের উন্নয়নকল্পে যারা মিনিমাম চিন্তা ভাবনা করেন তারা জানেন যে কোনো আইন সমাজ প্রগতির সহায়ক যদি না হয়, সামাজিক ক্ষতের চিকিৎসার পরিবর্তে ক্ষত লুকানোর মলম হিসাবে আইনকে ব্যবহার করা হয়, অথবা আইনের মাধ্যমে সমাজ প্রগতির অন্তরায় সৃষ্টি করে যা কিছু , সে সব কিছুকে তথাকথিত বাস্তবতার নাম বাঁচিয়ে রাখা হয়, তখন বুজতে হবে এ রকম রাষ্ট্র ও তার প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে সার্বিক প্রতিরোধ আন্দোলন করার সময় এসেছে I রাষ্ট্র আইনের মাধ্যমে নুতুন বাস্তবতা সৃষ্টি করে , এমনকি বুর্জোয়া রাষ্ট্র বিজ্ঞানেও এটা স্বীকৃত I রাষ্ট্র যদি সমাজের বিদ্ধমান সকল অপসংস্কৃতি , সকল অন্নায়,, সকল পশ্চাদ্পদটাকে বাস্তবতার (?) নামে প্রতিরোধ না করে আপোষ করে তখন সেই রাষ্ট্র ও তার পরিচালনা পরিষদ সরকারের ক্ষমতায় থাকার স্বাভাবিক অধিকার থাকে না I ‘এ রকম হয়' এর করণে এ আইন না বলে রাষ্ট্রের উচিত 'এ রকম হতে হবে'’ বলা, তাতেই রাষ্ট্রের সার্ভভৌম শক্তির বহিঃপ্রকাশ ঘটে I নতুবা বুজতে হবে তেতুল হুজুর, বাবুনগরীরাই সার্বভৌম ক্ষমতা রাষ্ট্রের কাছ থেকে অনেকটাই ছিনিয়ে নিয়ে গেছে I ক্ষমতাসীনরা কি জানেন 'তোমারে বধিবে যে গোকুলে বাড়ছে সে '…..//

 
রুশদী এর ছবি
 

এখনকার ছেলে-মেয়েদের ব্যাপারটা বেশ কঠিন হয়ে গেল। একটা সম​য় ছিল যখন ছেলে-মেয়েদের প্রেম- ভালবাসা শারিরীক পয্রায়ে যাবার অগেই মা-বাবা বিয়ের কথা ভাবতেন্। কিন্তু এখন আর সেটি সম্ভব হবে না। ফলে অনেক ছেলে-মেযেদেরকে গ্রেফতার জেল্-জরিমানা এড়াতে বিয়ে না করেই স্বামী-ব​ঊ হয়ে থাকতে হবে লুকিয়ে লুকিয়ে । বেশ কঠিন হয়ে গেল ছেলে-পেলের জন্য্।

 

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

অনুপম সৈকত শান্ত
অনুপম সৈকত শান্ত এর ছবি
Offline
Last seen: 1 week 3 দিন ago
Joined: রবিবার, অক্টোবর 5, 2014 - 4:02অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

ফেসবুকে ইস্টিশন

SSL Certificate
কপিরাইট © ইস্টিশন.কম ® ২০১৬ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর