নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 4 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • অনিন্দ্য
  • নুর নবী দুলাল
  • আরণ্যক রাখাল
  • রুদ্র মাহমুদ

নতুন যাত্রী

  • মাইনুদ্দীন স্বাধীন
  • বিপু পাল
  • মৌন
  • ইকবাল কবির
  • সানসাইন ১৯৭১
  • রসরাজ
  • বসন্ত পলাশ
  • মারুফ মোহাম্মদ বদরুল
  • রাজীব গান্ধী
  • রুবেল মজুমদার

আপনি এখানে

স্যাপিয়েন্সঃ মানবজাতির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস by Yuval Noah Harari অধ্যায় ১ - বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লব (প্রথম দুই ভাগ )


অধ্যায় ১
বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লব


গুরুত্বহীন এক প্রাণী

প্রায় ১৩.৫ বিলিয়ন বছর আগে বিগ ব্যাংয়ের মাধ্যমে বস্তু, শক্তি, সময় আর স্থান অস্তিত্ব লাভ করেছিল। আমাদের মহাবিশ্বের এই মৌলিক বৈশিষ্টের গল্পকে বলে পদার্থবিদ্যা।

উদ্ভবের ৩০০,০০০ বছর পরে, বস্তু আর শক্তি একসাথে হয়ে পরমাণু নামে জটিল একটা কাঠামো গঠন করেছিল, যেটি তারপরে বস্তুকণায় সংগঠিত হয়েছিল। পরমাণু, বস্তুকণা আর তাদের অন্তর্ক্রিয়াকে বলা হয় রসায়ন।

প্রায় ৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে পৃথিবী নামের গ্রহটিতে কিছু পদার্থকণা একসাথে যুক্ত হয়ে জীবযৌগ নামে বিশাল আর জটিল কাঠামো গঠন করেছিল। জীবযৌগের গল্পকে বলা হয় জীববিদ্যা।
প্রায় ৭০,০০০ বছর আগে, হোমো স্যাপিয়েন্স প্রজাতিতে অন্তর্ভুক্ত জীবেরা সংস্কৃতি নামে আরো বেশি বিশদ কাঠামো গঠন করতে শুরু করে দিয়েছিল।এই মানব সংস্কৃতির পরবর্তী উন্নয়নকে আমরা বলি ইতিহাস।

তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিপ্লব ইতিহাসের পরিক্রমাকে একটা নির্দিষ্ট আকৃতি দিয়েছিলঃ বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লব ইতিহাসকে যাত্রা শুরু করিয়ে দিয়েছিল ৭০,০০০ আগে। কৃষি বিপ্লব একে গতি দান করেছিল প্রায় ১২,০০০ বছর আগে। বৈজ্ঞানিক বিপ্লব, যেটি ৫০০ বছর আগে শুরু হয়েছিল, তা ইতিহাসকে সমাপ্তিতে আনতে এবং সম্পূর্ণ নতুন কিছু শুরু করতে পারত। কেমন করে এই তিনটি বিপ্লব মানবজাতি আর তাদের সহ-প্রাণীদেরকে প্রভাবিত করেছে, সেই গল্পই এই বইয়ে বলা হয়েছে।

ইতিহাসের অস্ত্বিত্বের অনেক আগেই মানুষের অস্ত্বিত্ব ছিল। আধুনিক মানুষের মতো দেখতে প্রাণীর উদ্ভব হয়েছিল আজ থেকে প্রায় ২.৫ মিলিয়ন বছর আগে। কিন্তু অসংখ্য প্রজন্ম ধরে তারা কিছু সংখ্যক প্রাণী থেকে আলাদা হতে পারেনি যাদের সাথে তারা তাদের বাসস্থান ভাগ করে নিয়েছিল।
২ মিলিয়ন বছর আগে পূর্ব আফ্রিকায় এক অভিযানে আপনি হয়তো মানবীয় বৈশিষ্টের পরিচিত শ্রেণির মুখোমুখি হতে পারেনঃ উদ্বিগ্ন মায়েরা তাদের বাচচাদের কোলে নিয়ে আদর করছে আর মুক্ত শিশুর ঝাক কাদার মধ্যে খেলা করছে; মেজাজী তরুণেরা সমাজের স্বৈরনীতি আর ক্ষয়ে যাওয়া বয়োজ্যোষ্ঠদের নিয়ে হাসি-তামাশা করছে, যারা কিনা কেবল শান্তিতে বসবাস করতে চেয়েছিল; বুক-থাপড়ানো শক্তিমানেরা স্থানীয় সুন্দরীদের আকর্ষণের চেষ্টা করছে আর জ্ঞানী বৃদ্ধ মাতৃতান্ত্রিকেরা যারা এসবের সবকিছুই দেখে এসেছে। এই প্রাচীন মানবেরা ভালবেসেছিল, খেলেছিল, গভীর বন্ধুত্ব গড়ে তুলেছিল আর মর্যাদা আর শক্তির জন্য লড়াই করেছিল – কিন্তু তাই করেছিল শিম্পাঞ্জী, বেবুন আর হাতিরা। মানুষের মধ্যে বিশেষ কিছু ছিল না। কারোই এমনকি মানুষের নিজেরদের মধ্যেও এমন কোনো আভাস ছিল না যে তাদের উত্তরসূরীরা একদিন চাঁদের বুকে হাটবে, পরমাণুকে ভেঙ্গে দেখবে, জেনেটিক কোড পরিমাপ করবে আর ইতিহাসের বইপত্র লিখবে। প্রাথমিক দিগকার মানুষের সম্পর্কে যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানা প্রয়োজন যে তারা ছিল গুরুত্বহীন প্রাণী যাদের গরিলা, জোনাকী পোকা বা জেলিফিশের মতোই পরিবেশের উপর কোনো প্রভাবই ছিল না।

প্রাণীবিদরা প্রাণীদের প্রজাতিতে ভাগ করেছেন। প্রাণীদের একই প্রজাতিভুক্ত বলা হয় তাদের যাদের কি না একের সাথে অন্যের মেলামেশার আর উর্বর সন্তান জন্মদানের প্রবণতা থাকে। ঘোড়া আর খচচরদের একটি কমন পূর্বপুরুষ রয়েছে আর তারা একই রকম শারিরীক বৈশিষ্টের কিছু ভাগ করে নিয়েছে। কিন্তু তারা একে অপরের সাথে খুব কম যৌন আগ্রহ দেখিয়ে থাকে। তারা মিলিত হবে যদি তাদেরকে সেটা করানো হয় – কিন্তু তাদের সন্তান খচচর হয় বন্ধ্যা। গাধার মধ্যে বিবর্তন তাই কখনো ঘোড়ার ডিএনএর উপরে যেতে পারে না, অথবা ঘোড়াটাও পারে না গাধার উপর যেতে। আলাদা বিবর্তনের পথ ঘুরে দুই ধরণের প্রাণী তাই যুগপতভাবে দুটি ভিন্ন প্রজাতি হিসেবে বিবেচিত হয়। বিপরিত দিকে, একটা বুলডগ আর একটা স্প্যানিয়েলকে আলাদা মনে হতে পারে, কিন্তু তারা একই প্রজাতির সদস্য, যারা কি না একই রকম ডিএনএ বহন করে। তারা আনন্দের সাথে মিলিত হতে পারবে আর তাদের সন্তানগুলোও অন্য কুকুরদের সাথে জুড়ি বেঁধে আরো কুকুরের বাচচা উতপাদন করতে পারবে।
একই ধরণের পূর্বসূরী থেকে বিবর্তিত হওয়া প্রজাতিদের একসাথে করা হয় ‘জেনাস’ (জাত) শিরোনামের অধীনে। সিংহ, বাঘ, চিতাবাঘ আর জাগুয়ার হলো প্যানথেরা জেনাসের অধিনে বিভিন্ন প্রজাতি। জীবিবিজ্ঞানীরা প্রাণীদের দুই অংশের একটা ল্যাটিন নাম দিয়ে চিহ্নিত করেন, যেখানে জেনাসের বা জাতের পরে আসে প্রজাতি। উদাহরণস্বরুপ সিংহকে বলা হয় ‘প্যানথেরা লিও’, লিও প্রজাতি প্যানথেরা জেনাস বা জাতের অধীনে। পুর্বের ধারণা থেকেই বলা যায়, যারা এই বইটি পড়ছেন, তারা সবাই হোমো স্যাপিয়েন্স – হোমো (মানুষ) জেনাস বা জাতের স্যাপিয়েন্স (জ্ঞানী) প্রজাতি।

জাত পরিণতিতে ফ্যামিলি বা পরিবারে দলবদ্ধ হয়, যেমন বিড়াল (সিংহ, চিতা, গৃহপালিত বিড়াল), কুকুর (নেকড়ে, শিয়াল, গৃহপালিত কুকুর) আর হাতি (হাতি, ম্যামথ, ম্যাস্টোডন)। পরিবারের সব সদস্য একটি মাতৃ বা পুরুষ প্রতিষ্ঠাতার সাথে বহুকাল ধরে সম্পর্কযুক্ত। ক্ষুদ্র বাসাবাড়ির বিড়াল থেকে শুরু করে হিংস্র সিংহ পর্যন্ত সব বিড়ালই এক একই ধরণের বিড়ালজাতীয় পূর্বসূরী আছে যারা ২৫ মিলিয়ন বছর আগে বাস করত।

হোমো স্যাপিয়েন্সও একটি পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। এই নীরস বিষয়টি ইতিহাসের অন্যতম গভীরভাবে পাহারা দেয়া গোপন ব্যাপার হিসেবে চলে এসেছে। হোমো স্যাপিয়েন্স অনেক আগে থেকেই প্রাণীদের থেকে নিজেদের আলাদা করে দেখতে পছন্দ করত, পরিবার থেকে বনচিত এক এতিম হিসেবে, যাদের ভাইবোন বা চাচাতো ভাইবোনের অভাব ছিল, আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, পিতা-মাতা ছাড়াই। কিন্তু, সেটা আসল ব্যাপার ছিল না। একে পছন্দ করুন আর নাই করুন, আমরা বিশাল আর কোলাহলপূর্ণ এক পরিবারের সদস্য যাকে বলা হয় গ্রেট এপ বা বনমানুষ। আমাদের নিকটতম জীবন্ত আত্মীয়দের মধ্যে রয়েছে শিম্পাঞ্জী, গরিলা আর ওরাং ওটাং। মাত্র ৬ মিলিয়ন বছর আগে কোনো একটা একক মহিলা এপের ছিল দুটি মেয়ে সন্তান। একটি হয়েছিল সব শিম্পাঞ্জীর পুর্বসূরী, আরেকজন ছিল আমাদের নিজেদের পুরাতন দাদীমা।

কাছেই পাওয়া কঙ্কালগুলো

হোমো স্যাপিয়েন্স এমনকি একটি আরো বেশি আলোড়িত করার মতো গোপন ব্যাপার লুকিয়ে রেখেছিল। আমরা শুধুমাত্র প্রচুর পরিমাণে অসভ্য চাচাত-মামাত ভাইবোনই ছিল না, কোনো এক সময়ে আমাদের কিছু ভাই আর বোনও ছিল। আমরা আমাদের জাতকেই শুধুমাত্র একক মানবজাতি হিসেবে দেখি, কারণ বিগত ১০,০০০ বছর ধরে, আমাদের প্রজাতিটিই একমাত্র টিকে থাকা মানব প্রজাতি। যদিও হিউম্যান বা মানুষ শব্দটির প্রকৃত অর্থ হলো ‘হোমো জেনাস বা জাতে অন্তর্ভুক্ত একটি প্রাণী’, আর এই জাতের আরো অনেক প্রজাতি ছিল হোমো স্যাপিয়েন্স ছাড়াও। অধিকন্তু, এই বইয়ের শেষ অধ্যায়ে আমরা যেমনটা দেখতে পাব, খুব বেশি দূরের ভবিষ্যতে নয়, আমাদের হয়তো নন-স্যাপিয়েন্স মানুষ হিসেবে সন্তুষ্ট থাকতে হবে। এই বিষয়টা পরিস্কার করতে, আমি ‘স্যাপিয়েন্স’ শব্দটি হোমো স্যাপিয়েন্স প্রজাতির সদস্যদেরকে বোঝাতে ব্যবহার করব, আর ‘হিউম্যান’ বা ‘মানুষ’ শব্দটি হোমো জাতের এখনও বিদ্যমান সব সদস্যকে বোঝাতে ব্যবহার করবো। মানুষের প্রথম উতপত্তি হয়েচ্ছিল পূর্ব আফ্রিকায় আজ থেকে প্রায় ২.৫ মিলিয়ন বছর আগে প্রাথমিক এক এপ জাত ‘অস্ট্রেলোপিথিকাস’ থেকে, যার অর্থ ‘দক্ষিণের এপ’। প্রায় ২ মিলিয়ন বছর আগে, এই প্রাচীন নারী আর পুরুষের কিছু অংশ তাদের জন্মভূমি ত্যাগ করেছিল উত্তর আফ্রিকা, ইউরোপ আর এশিয়ায় যাত্রা করে সেখানে থিতু হতে। যেহেতু উত্তর ইউরোপের বরফাচ্ছন্ন বনে বেঁচে থাকার জন্য ভিন্নতর বৈশিষ্টের প্রয়োজন ছিল, যারা কিনা ইন্দোনেশিয়ার জলধারার পার্শ্ববর্তী বনে তাদের চেয়ে, মানুষের জনসংখ্যা বিস্তৃত হয়েছে বিভিন্ন দিকে। ফলাফল ছিল কয়েকটি ভিন্ন প্রজাতির উদ্ভব, যাদের বিজ্ঞানীরা জাঁকালো ল্যাটিন নাম দিয়েছে।

ইউরোপ আর পশ্চিম এশিয়ার মানুষেরা বিবর্তিত হয়েছিল হোমো নিয়ান্ডারথালনেসিসে (‘নিয়ান্ডার উপত্যকার মানুষ’), যা সুপরিচিত ‘নিয়ান্ডারথাল’ নামে। আমাদের স্যাপিয়েনসের থেকে ভারী আর বেশি পেশিবহুল নিয়ান্ডারথালরা বরফ যুগের পশ্চিম ইউরেশিয়ার শীতল আবহাওয়ার সাথে ভালভাবে মানিয়ে নিতে পেরেছিল। যত বেশি এশিয়ার পূর্ব এলাকা ‘খাড়া মানুষ’ হোমো ইরেক্টাস দ্বারা জনাকীর্ণ হচ্ছিল, যারা কি না সেখানে ২ মিলিয়ন বছরের কাছাকাছি টিকে ছিল, তারা পরিণত হয়েছিল সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী মনুষ্য প্রজাতি হিসেবে। এই রেকর্ড মনে হয় আমাদের প্রজাতির পক্ষেও ভাঙ্গা সম্ভব হবে না। সন্দেহ আছে যে হোমো স্যাপিয়েন্স আগামী এক হাজার বছর পরেও পৃথিবীতে বিচরণ করবে কি না, তাই ২ মিলিয়ন বছর আসলেই আমাদের প্রয়াতির আয়ত্ত্বের বাইরে।

ইন্দোনেশিয়ার জাভা দ্বীপে, বাস করতো হোমো সোলনেসিস, ‘সলো ভ্যালির মানুষ’, যারা ক্রান্তীয় জীবনে টিকে থাকার জন্য মানানসই ছিল। আরেকটি ইন্দোনেশিয়ান দ্বীপ ফ্লোরেসে প্রাচীন মানবেরা বামনত্বের প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়ে গিয়েছিল। মানুষ প্রথমে ফ্লোরেসে পৌঁছেছিল যখন সাগরের উচচতা ছিল বিশেষভাবে কম এবং আর দ্বীপগুলোকে মূল ভূখণ্ড থেকে সহজেই যাওয়া যেত। যখন সাগরের উচচতা আবারো বেড়ে গিয়েছিল, তখন কিছু মানুষ দ্বীপে আটকা পড়েছিল, যেগুলো প্রাকৃতিক সম্পদের দিক থেকে ছিল দীনহীন।

বড় মানুষেরা, যাদের অনেক খাদ্যের দরকার ছিল, তারা প্রথমে মারা গিয়েছিল। অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্রকায়রা একটু ভালোভাবে বেঁচে থাকতে পেরেছিল। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে, ফ্লোরেসের লোকেরা খর্বকায় হয়ে গিয়েছিল। বিজ্ঞানীদের কাছে ‘হোমো ফ্লোরেনসিস’ নামে পরিচিত এই অনন্য প্রজাতিটি খুব বেশি হলে এক মিটারের মতো লম্বা হতে পেরেছিল আর পচিশ কেজি পর্যন্ত ওজনে পৌঁছেছিল। তারা কিন্তু পাথরের যন্ত্রপাতি তৈরিতে সক্ষম ছিল, আর এমনকি মাঝে মাঝে দ্বীপের হাতিগুলোর কয়েকটি শিকার করতে সক্ষম হয়েছিল – যদিও, সত্যি বলতে, সেখানকার হাতিগুলোও ছিল বামন প্রজাতির।
২০১০ সালে বিস্মৃতিত অতল থেকে আরেকটি ভাইবোনকে উদ্ধার করা হয়েছিল, যখন সাইবেরিয়ার ডেনিসোভা গুহায় খননরত বিজ্ঞানীরা একটা ফসিলিভূত আঙ্গুলের হাড় আবিস্কার করেছিলেন। জেনেটিক বিশ্লেষণ প্রমাণ করেছে যে আঙ্গুলটি একটি অজানা মনুষ্য প্রজাতির, যাকে নাম দেয়া হয়েছিল হোমো ডেনিসোভা। কে জানে আমাদের আর কত হারিয়ে যাওয়া আত্মীয়রা অন্য গুহায়, অন্য দ্বীপে, আর অন্য জলবায়ুতে আমাদের আবিস্কারের অপেক্ষায় রয়েছে।

যখন এই মানুষেরা ইউরোপ আর এশিয়ায় বিবর্তিত হচ্ছিল, পূর্ব আফ্রিকায় বিবর্তন প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। মনুষত্বের দোলনা ক্রমাগত বিভিন্ন নতুন প্রজাতিকেগুলোকে নাড়াচাড়া করছিল, যাদের মধ্যে ছিল ‘হোমো রুড্ডলফেনসিস’ (লেক রুডলফের মানুষ), ‘হোমো ইরগাস্টার’ (সক্রিয় মানুষ’, আর পরবর্তীতে আমাদের নিজস্ব প্রজাতিটি যাদেরকে আমরা আমরা নাম দিয়েছি ‘হোমো স্যাপিয়েন্স’ (জ্ঞানী মানুষ)।
এইসব প্রজাতিগুলোর কয়েকটির সদস্যরা ছিল বিশাল আর অন্যরা ছিল বামন। কেউ ছিল ভয়ানক শিকারী, আর অন্যরা ছিল শান্ত লতাপাতা সংগ্রহকারী।কেউ একটা একক দ্বীপে বাস করত, আর অন্যরা মহাদেশব্যাপী ঘুরে বেরিয়েছিল। কিন্তু তাদের সবাইই মানুষ জাতের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তারা সবাই ছিল মানুষ।

এটা ভেবে নেয়া একটা সাধারণ ভুল যে এই প্রজাতিদের একই সরলরেখায় উদ্ভব হয়েছে সেটা ভাবা, যেখানে ইওরগাস্টারের থেকে ইরেক্টাসের, ইরেক্টাসেওর থেকে নিয়ান্ডারথাল, নিয়ান্ডারথাল থেকে আমাদের উদ্ভব হয়েছে। এই সরলরেখার কাঠামো ভুল ধারণা দেয় যে কোনো বিশেষ একটা সময়ে এক ধরণের মানুষ পৃথিবীতে বসবাস করতো, আর সকল পূর্বেকার প্রজাতি কেবল আমাদের আগেকার প্রতিকৃতি। সত্য হলো প্রায় ২ মিলিয়ন বছর আগে থেকে ১০,০০০ বছর আগ পর্যন্ত, পৃথিবী বিভিন্ন ধরণের মানব প্রজাতির আবাসস্থল ছিল। আর কেনই বা নয়? আজ দুনিয়ায় বিভিন্ন প্রজাতির শিয়াল, ভালুক আর শুকর আছে। আজ থেকে শত হাজার বছর আগের পৃথিবীতে কমপক্ষে ছয় ধরনের মানুষ হেটে বেরিয়েছে। বিভিন্ন প্রজাতির অতীত নয় বরং আমাদের বর্তমানের অনন্যতা যা হলো অদ্ভুত – আর সম্ভবত দোষ-প্রদায়ক। যেমনটা আমরা শিগগিরই দেখবো যে আমাদের স্যাপিয়েন্সদের আমাদের ভাই-বোনদের স্মৃতি অবদমিত করে রাখার অনেক কারণ রয়েছে।

চিন্তার মাশুল

অনেক পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও, সব মনুষ্য প্রজাতি কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্টের অধিকারী ছিল। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য, অন্য প্রাণীদের তুলনায় মানুষের বড় আকৃতির মস্তিস্ক ছিল। ষাট কেজি ওজনের স্তণ্যপ্রায়ী প্রাণীর মস্তিস্কের গড় আকৃতি থাকে ২০০ ঘন সেন্টিমিটার। ২.৫ মিলিয়ন বছর আগের প্রথমদিকের নারী আর পুরুষের ছিল ৬০০ ঘন সেন্টিমিটারের মস্তিস্ক। আধুনিক স্যাপিয়েন্স বহন করে ১,২০০-১,৪০০ ঘন সেন্টিমিটারের মস্তিস্ক। নিয়ান্ডারথালদের মস্তিস্ক ছিল এমনকি তার থেকেও বড়।
বিবর্তনের বেছে নেয়া বড়মাপের মস্তিস্কের ব্যাপারটিকে আমাদের অনেকের কাছেই অবোধগম্য মনে হতে পারে। আমরা আমাদের উচচ বুদ্ধিবৃত্তির প্রেমে এতই প্রেমাসক্ত যে যখন মাথার ক্ষমতার কথা আসে, বেশি কিছুই সেখানে ভাল। কিন্তু তাই যদি ব্যাপার হয়ে থাকে, বিড়াল পরিবারও এমন বিড়াল উতপাদন করতে পারত যারা কি না ক্যালকুলাসের অংক করতে পারে আর ব্যাং ইতোমধ্যে তাদের মহাকাশ কর্মসূচী শুরু করে দিত। কেন বিশাল মস্তিস্ক প্রাণী রাজ্যে কেন এত বিরল?

ব্যাপারটা হলো একটা জাম্বো আকৃতির মস্তিস্কের জন্য শরীরে বড় আকৃতির পরিবহনতন্ত্র থাকতে হবে। এটা বহন করা সহজ নয়, বিশেষ করে যখন তা একটা বিশাল খুলির ভিতরে থাকে। এমনকি তাতে জ্বালানী প্রদান করাও অনেক কঠিন। হোমো স্যাপিয়েনসের ক্ষেত্রে, মস্তিস্ক পুরো শরীরের ওজনের মাত্র ২-৩ শতাংশ, কিন্তু এটি শরীরের শক্তির ২৫ শতাংশ খরচ করে যখন শরীর বিশ্রামে থাকে। প্রাচীন মানুষেরা তাদের বিশাল মস্তিস্কের মূল্য চুকিয়েছে দুই উপায়ে। প্রথমতো, তারা খাদ্যের সন্ধানে বেশি সময় ব্যয় করেছিল। দ্বিতীয়ত, তাদের পেশি ছিল হালকা-পাতলা। যেমন করে সরকার প্রতিরক্ষা থেকে অর্থ শিক্ষাক্ষেত্রে স্থানান্তর করে, মানুষও শক্তি পেশি থেকে মস্তিস্কের নিউরনে স্থানান্তর করে। এটা কদাচিত একটা ভুলে যাওয়া উপসংহার হবে যে এটি সাভানাতে বেঁচে থাকার জন্য একটা ভাল কৌশল। একটা শিম্পাঞ্জী একটি হোমো স্যাপিয়েনসের সাথে কখনো তর্কাতর্কিতে জয়ী হতে পারবে না, কিন্তু এপ একটা মানুষকে কাপড়ের কোনো পুতুলের মতোই ছিড়ে টুকরো টুকরো করতে পারে।
আজকে আমাদের মস্তিস্ক সুন্দরভাবে তার মূল্য পরিশোধ করছে, কেন না আমরা গাড়ি আর বন্দুক তৈরি করতে পারি যা আমাদেরকে শিম্পাঞ্জিদের থেকে দ্রুততর নড়াচড়া করতে আর মল্লযুদ্ধের পরিবর্তে নিরাপদ দূরত্বে থেকে তাদেরকে গুলি করতে সাহায্য করে। কিন্তু, গাড়ি আর বন্দুক হচ্ছে সাম্প্রতিক বিষয়বস্তু। ২ মিলিয়ন বছর ধরে মানুষের নিউরাল নেটওয়ার্ক বেড়েই চলেছে, চকমকি পাথরের ছুঁরি আর নিক্ষেপ করার লাঠিকে ছাড়িয়ে মানুষের আরও নিখুঁত ছোট্ট কিছু দেখানোর দরকার ছিল। তাহলে গত ২ মিলিয়ন বছরে কি জিনিস মানব মস্তিস্কের বিবর্তনকে সামনে নিয়ে গিয়েছে? সংক্ষেপে বলতে, আমরা তা জানি না।

আরেকটি অনন্য মানব বৈশিষ্ট হচ্ছে আমরা দুই পায়ে খাঁড়াভাবে হাটতে পারি। দাঁড়িয়ে থেকে খেলা করা বা শত্রুর খোঁজে সাভানাকে নজরে রাখা সহজতর, আর হাত দ্রুতগতিতে চলারে চাইতেও অন্য উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়েছে, পাথর ছোঁড়া বা সংকেত দেওয়ার উদ্দেশ্যে। যত বেশি কাজ এই হাতগুলো করতে পেরেছিল, তত বেশি এর মালিকেরা সফল হতে পেরেছিল, তাই বিবর্তনের চাপ স্নায়ু আর নিপুণভাবে নিয়ন্ত্রিত তালু আর আঙ্গুলের পেশির উপরে বর্ধিষ্ণু গুরুত্ব প্রয়োগ করেছিল। ফলাফল হিসেবে, মানুষ তার হাত দিয়ে অনেক জটিল কাজ সমাধা করতে পারে। বিশেষ করে, তারা আধুনিক যন্ত্রপাতি তৈরি আর ব্যবহার করতে পারে। যন্ত্রপাতি উতপাদনের প্রথম সময় পাওয়া যায় আজ থেকে ২.৫ মিলিয়ন বছর আগে, আর যন্ত্রপাতির উতপাদন আর ব্যবহারের পদ্ধতি দ্বারা প্রত্নতাত্বিকেরা প্রাচীন মানুষদের চিনতে পারেন।

যদিও খাড়াভাবে চলার কিছু অসুবিধাও রয়েছে। আমাদের প্রাচীন পুর্বসুরীদের মাথার খুলি মিলিয়ন বছর ধরে গড়ে উঠেছিল প্রাণীটিকে তার চার পায়ের সবটাতেই হাঁটায় সাহায্য করতে যাদের তুলনামূলক ছোট মাথা ছিল। খাড়া অবস্থায় মানিয়ে নেয়া ছিল পুরোপুরিই একটা চ্যালেঞ্জ, বিশেষ করে ভার নেয়ার সামর্থ্যকে একটা অতিরিক্ত ওজনের মাথার খুলি বহন করতে হয়েছিল। মানবজাতি তার উচচ আকাঙ্ক্ষা আর পরিশ্রমি হাতের মূল্য পরিশোধ করেছে তার পিঠের ব্যাথা আর শক্ত হয়ে যাওয়া ঘাড়ের মাধ্যমে।
নারীরা মূল্য পরিশোধ করেছে অতিরিক্তভাবে। একটা খাঁড়া চলনভঙ্গির প্রয়োজন ছিল অপেক্ষাকৃত সংকীর্ণ নিতম্ব, যা গর্ভাশয়কে সংকুচিত করেছিল – আর এটা হয়েছে যখন বাচচার মাথা হয়েছে বড় থেকে বড়। সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মৃত্যু মনুষ্য নারীদের ক্ষেত্রে একটা বড় বিপদ হিসেবে দেখা দিয়েছিল। নারিরা যারা আগেভাগে সন্তান জন্ম দিয়েছিল, যখন নবজাতকের মস্তিস্ক আর মাথা তুলনামূলকভাবে ছোট আর নমনীয় থাকে, তারা ছিল ভালো অবস্থায় আর বেঁচে ছিলেন আরো সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য। নিউরাল নির্বাচন যুগপতভাবে আগেভাগে জন্ম দেওয়াটাকে সমর্থন করেছিল। আর, প্রকৃতপক্ষেই, অন্যান্য প্রাণীদের চেয়ে মানুষ অপরিণতভাবে জন্ম নেয়, যখন তাদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা তখনো অনুন্নত থাকে। একটা ঘোড়ার বাচচা জন্মের কিছুক্ষণ পরেই হাঁটতে পারে; একটা বিড়ালের বাচচা তার মাকে ছেড়ে খাবারের খোজ করতে পারে যখন এর বয়স থাকে মাত্র কয়েক সপ্তাহ। মানব শিশুরা থাকে অসহায়, নির্ভরশীল অনেক বছরের জন্য তাদের বয়স্কদের উপর নির্ভরতা, প্রতিরক্ষা আর শিক্ষার জন্য।

এই বিষয়টি মানবজাতির অসাধারণ সামাজিক সামর্থ্য আর অনন্য সামাজিক সমস্যার ক্ষেত্রে বিপুলভাবে পথ দেখিয়েছে। একা মা তার সন্তানের আর তার নিজের জন্য খুব কমই খাবার জোগাড় করতে পারত, কোলে অভাবী সন্তানকে নিয়ে। সন্তান লালন-পালনের জন্য পরিবারের অন্য সদস্য আর প্রতিবেশিদের সবসময়ের সাহায্যের প্রয়োজন ছিল। একটা মানুষের বেড়ে উঠার জন্য একটা গোত্রের প্রয়োজন ছিল। বিবর্তন তাই সাহায্য করেছে তাদের যারা শক্তিশালি সামাজিক বন্ধন গড়ে তুলতে সামর্থ্যবান ছিল। তার উপর, যেহেতু মানুষেরা অপরিণতভাবে জন্মে, তাদের অন্য যে কোনো প্রাণীর চাইতে বেশি শিক্ষা প্রদান আর সামাজিকীকরণ করা যেত। বেশিরভাগ স্তন্যপায়ীই জরায়ু থেকে বের হয়ে আসে তেমনভাবে যেমন করে চকচকে মাটির জিনিসপত্র কুমারের যন্ত্র থেকে বের হয়ে আসে- তাদের নতুন করে ছাঁচে নেওয়ার চেষ্টা তাদেরকে কেবল দাগ ফেলে বা ভেঙ্গে দিবে।মানুষেরা জরায়ু থেকে বের হয়ে আসে ফার্নেস থেকে ছাঁচে ঢালা গলিত কাচের মতো যাদেরকে চমকপ্রদক মাত্রার স্বাধীনতার সাথে ঘুরানো, টানা বা আকার দেওয়া যেতে পারে। আর তাই আজকে আমরা আমাদের সন্তানদের খ্রিষ্টান বা বুদ্ধ, পুজিবাদী বা সাম্যবাদী, যুদ্ধবাজ বা শান্তিকামী হিসেবে শিক্ষিত করতে পারি।

আমরা মনে করি যে বিশাল মস্তিস্ক, যন্ত্রপাতির ব্যবহার, দ্রুত শেখার ক্ষমতা আর জটিল সামাজিক কাঠামো হলো বিপুল সুবিধার। এটাকে নিজেদের ক্ষেত্রে প্রমাণিত মনে হয় যে এসব মানবজতিকে দুনিয়ার বুকে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রাণিতে পরিণত করেছে। কিন্তু মানুষ পুরো ২ মিলিয়ন বছর ধরে যে সময়টাতে তারা দুর্বল আর প্রান্তিক প্রাণী ছিল। তাই যে মানুষেরা এক মিলিয়ন বছর আগে বসবাত করেছিল, তাদের বিশাল মস্তিস্ক আর ধারালো পাথরের হাতিয়ার সত্ত্বেও, তারা বসবাস করত শিকারীদের ভয়ে ভীত হয়ে। কদাচিত তারা বিশাল শিকার করত, আর বেঁচে ছিল প্রধানত লতা-প্রাতা সংগ্রহ করে, পোকামাকড় খুড়ে বের করে, ছোটখাট প্রাণীকে শিকার করে, আর অন্যান্য শক্তিশালী মাংশাসী প্রাণীর রেখে যাওয়া অবশিষ্টাংশ খেয়ে।

প্রাথমিক দিগকার পাথরের হাতিয়ারের অন্যতম সাধারণ ব্যবহার ছিল খোলা হাড় ভেঙ্গে মজ্জা বের করা। কিছু গবেষক বিশ্বাস করেন এটি ছিল আমাদের আসল কর্মবৈশিষ্ট। যেমন করে কাঠঠোকরারা গাছের গুড়ি থেকে পোকা বের করায় বিশেষজ্ঞ, প্রথম দিগকার মানুষেরা তেমনি করে হাড় থেকে মজ্জা বের করায় বিশেষজ্ঞ ছিল। মজ্জা কেন? ভালো, ধরুণ আপনি একটা সিংহের দলকে একটা জিরাফ শিকার করতে আর গলাধকরণ করতে দেখলেন। আপনি ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করবেন তাদের কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত। কিন্তু তখনো আপনার পালা আসেনি কেন না প্রথমে আছে হায়েনা আর শিয়ালেরা – আর আপনি তাদের মধ্যে হস্তক্ষেপ করতে সাহস করেন না – অবশিষ্টাংশটুকু নিয়ে নিতে। কেবল তারপরই আপনি আর আপনার দল ছিন্ন মরদেহটির দিকে অগ্রসর হতে সাহস করবেন, ডানে-বামে সতর্কতার সাথে তাকিয়ে – আর খাওয়ার মতো মাংস ভিতর থেকে খুঁড়ে বের করতেন।

এটি আমাদের ইতিহাস আর মানসিকতা বোঝার জন্য একটা চাবিকাঠি। খাদ্য শৃংখলে হোমো জাতের অবস্থান, পুরো বর্তমান পর্যন্ত হলো একেবারে মাঝামাঝি। মিলিয়ন বছর ধরে মানুষ ছোটখাট প্রাণী শিকার করেছে আর যেটুকু পারে জড়ো করেছে - বিশাল শিকারি প্রাণীদের শিকার করা অংশবিশেষ। মাত্র ৪০০,০০০ বছর আগে মানুষের বিভিন্ন প্রজাতি নিয়মিতভাবে বড় ধরণের শিকার করতে শুরু করেছিল, আর বিগত ১০,০০০ বছরে- হোমো স্যাপিয়েনসের উত্থানের সাথে – মানুষ খাদ্য শৃংখলের উপরে হুমকি হয়ে এসে পড়েছিল।

মধ্য থেকে শুরু করে একেবারে উপরে চলে আসার কিছু ব্যাপক পরিণতি ছিল। সিংহ আর হাঙ্গরের মতো পিরামিডের একেবারে উপরের দিকে থাকা প্রাণিরা সেই অবস্থানে ধীরে ধীরে বিবর্তিত হয়ে এসেছিল, মিলিয়ন মিলিয়ন বছর ধরে। এটি বাস্তুসংস্থানকে চেক আর ব্যালেন্স পদ্ধতির মাধ্যমে সুষমতা রক্ষা করতে সমর্থ করেছিল সিংহ আর হাঙ্গরকে বেশি পরিমাণে ধ্বংস আনা থেকে বিরত রেখে। যখন সিংহ বেশি ভয়ানক হয়ে গিয়েছিল, তৃণভূমির হরিণ বিবর্তিত হয়েছিল অধিক জোরে দোঁড়ানোর জন্য। হায়েনাদের হতে হয়েছিল বেশি পরিমাণে সাহায্যে সহায়ক, আর গণ্ডারকে অধিক পরিমাণে হতে হয়েছিল বদমেজাজী। বিপরীতে, মানুষ এত দ্রুত উপরে উঠে গিয়েছিল যে বাস্তুসংস্থানকে মানিয়ে নেয়ার সময় দেয়া হয়নি। অধিকন্তু, মানুষ নিজেই মানিয়ে নিতে ব্যর্থ হয়েছিল। পৃথিবীর বেশিরভাগ শীর্ষ শিকারী প্রাণীই হচ্ছে জাদুকরী সব প্রাণী। মিলিয়ন বছরের আধিপত্য তাদেরকে আত্ম-বিশ্বাসে পূর্ণ করে তুলেছিল। স্যাপিয়েন্স, অন্যদিকে, বলতে গেলে ছিল ব্যানানা প্রজাতন্ত্রের একনায়কের মতো। সম্প্রতি সাভানার অন্যতম আন্ডারডগ হওয়ার কারণে, আমরা আমাদের অবস্থান নিয়ে ভীতি আর উদ্বেগে পরিপুর্ণ, যেটা আমাদের দ্বিগুণ নিষ্ঠুর আর বিপজ্জনকে পরিণত করেছে। ভয়ানক যুদ্ধ থেকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো অনেক ঐতিহাসিক দুর্ঘটনা এই অতি-হন্তদন্ত লাফের ফলাফল হিসেবে এসেছে।

পাঁচকের জাতি

শীর্ষে যাওয়ার পথে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ছিল গৃহস্থালির কাজে আগুনকে ব্যবহার করা। কিছু মানব প্রজাতি প্রায় ৮০০,০০০ বছর আগে মাঝেমধ্যে আগুনের ব্যবহার করত। প্রায় ৩০০,০০০ বছর আগে থেকে হোমো ইরেক্টাস, নিয়ান্ডারথাল আর হোমো স্যাপিয়েনসের পিতৃপুরুষেরা দৈনন্দিনভাবে আগুনের ব্যবহার করত। মানুষের এখন আলো আর উষ্ণতার আর থাবা বাড়ানো সিংহের বিরুদ্ধে নির্ভরযোগ্য উতস হয়ে গেল। বেশি পরে নয়, মানুষেরা হয়ত ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের প্রতিবেশী এলাকায় আগুন জ্বালিয়ে দেয়া শুরু করল। কোনো সতর্কভাবে জ্বালিয়ে দেয়া আগুন অনতিক্রম্য কোনো জঙ্গলকে মুহূর্তে খেলাচ্ছলে ঘাসের এলাকা বানিয়ে দেয়া যায়। যখন আগুন নিভে যেত পাথরযুগের উদ্যোক্তারা ধোঁয়া ওঠা ধ্বংসাবশেষের মধ্যে দিয়ে হেঁটে গিয়ে পোড়া জীবজন্তু, বাদাম আর শিকড়বাকড় সংগ্রহ করতে পারতেন।
কিন্তু সেরা যে কাজটি আগুন করত তা ছিল রান্না করা। যে খাদ্যগুলো স্বাভাবিকভাবে মানুষেরা সরাসরি হজম করতে পারে না - যেমন গম, চাল আর আলু – আগুনের কারণে আমাদের প্রধান খাদ্যে পরিণত হলো। আগুন শুধুমাত্র খাদ্য রসায়নই পরিবর্তন করে দেয়নি, এটি শরীরবিদ্যাতেও পরিবর্তন এনেছে। রান্না খাদ্যকে পঁচিয়ে ফেলা জীবাণু আর পরজীবিকেও মেরে ফেলে। মানুষের তাদের পুরাতন অছন্দনীয় ফলমূল, বাদাম পোকামাকড় আর পঁচা পুরনো মাংস চাবানোর আর হজম করার সহজতর উপায় ছিল যদি সেগুলো রান্না করা হয়ে থাকে। যেখানে শিম্পাঞ্জীরা দিনে পাঁচ ঘন্টা ব্যয় করে কাঁচা খাবার চাবাতে, মানুষের জন্য রান্না করা খাবার খাওয়ার জন্য একঘন্টাই যথেষ্ট। রান্নার উদ্ভব মানুষকে বেশি রকমের খাবার খেতে, খাবারের পেছনে কম সময় ব্যয় করতে, আর ছোট দাঁত আর ক্ষুদ্রতর পরিপাকতন্ত্র নিয়ে চলতে সামর্থ্যবান করেছে। কোনো কোনো পন্ডিত বিশ্বাস করেন রান্নার আবিস্কারের সাথে সাথে মানুষের খাদ্য-হজম নালী ছোট আর মস্তিস্ক বড় হওয়ার সম্পর্ক আছে। যেহেতু লম্বা পরিপাকতন্ত্র আর বিশাল মস্তিস্ক উভয়েই অনেক শক্তি খরচ করে, তাই দুটোই থাকা কঠিন ছিল। পরিপাকতন্ত্রকে ক্ষুদ্র আর তার শক্তি খরচকে কমিয়ে ফেলার মাধ্যম হিসেবে রান্না অপ্রত্যাক্ষভাবে নিয়ান্ডারথাল আর স্যাপিয়েনসের বিশাল মস্তিস্কের জন্য রাস্তা খুলে দিয়েছিল।
আগুন মানুষ আর প্রাণীদের ভিতর প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বিভাজন-রেখা খুলে দিয়েছিল। অন্য প্রায় সব প্রাণীর শক্তি তাদের শরীর, পেশির শক্তি দাতের আকার, তাদের পাখার প্রশস্ততার উপর নির্ভর করত। যদিও তারা বাতাস আর পানির স্রোত উপভোগ করত, তারা এগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে অক্ষম ছিল, আর সবসময় তাদের শারিরীক কাঠামো দ্বারা তারা সীমাবদ্ধ ছিল। উদাহরণস্বরুপ, ঈগল মাটি থেকে ওঠা তাপমাত্রার কলামকে চিহ্নিত করতে, তাদের বিশাল পাখা ছড়িয়ে গরম বাতাসকে কাজে লাগিয়ে তাদেরকে আরো উঁচুতে নিতে পারে। কিন্তু, ঈগল কলামগুলোর অবস্থানকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, আর তাদের সর্বোচচ বহন করার যোগ্যতা তাদের পাখনার দৈর্ঘ্যের সাথে সমানুপাতিক।

যখন মানুষ আগুনকে কাজে লাগাতে পেরেছিল, তারা একতা অনুগত ও সম্ভাবনাময় সীমাহীন শক্তির নিয়ন্ত্রণ নিতে পেরেছিল। ঈগলের থেকে ভিন্নভাবে মানুষ কোথায় ও কখন আগুন জ্বালাতে হবে, তা বেছে নিতে পারে, আর তারা আগুনকে কাজে লাগিয়ে যে কোনো সংখ্যক কাজ করতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে আগুনের শক্তি মানব শরীরের রকম, গঠন বা শক্তির দ্বারা সীমাবদ্ধ নয়। একজন মাত্র মাত্র নারী চকমকি পাথর বা আগুনের লাঠির সাহায্যে কয়েক ঘন্টার মধ্যে পুরো বনকেই পুঁড়িয়ে দিতে পারে। আগুনের গৃহস্থকরণ ছিল অনেক ভবিষ্যত জিনিসেরই পূর্বাভাস।

আমাদের রক্ষাকর্তা ভাইয়েরা

আগুনের সুবিধা সত্ত্বেও আজ থেকে ১৫০,০০০ বছর আগে মানুষ তখনো ছিল এক প্রান্তিক প্রাণী। তারা তখন সিংহকে দূরে তাড়িয়ে দিতে পারত, নিজেদেরকে উষ্ণ রাখতে আর মাঝে-মধ্যে বনজঙ্গল জ্বালিয়ে দিতে পারত। কিন্তু সব প্রজাতি মিলে গণনা করলে, সেখানে ইন্দোনেশিয়ার দ্বীপপুঞ্জ আর আইবেরিয়া উপত্যকা মিলে মনে হয় না এক মিলিয়নের বেশি মানুষ ছিল, যা ভূপ্রাকৃতিক রাডারে একটা ক্ষুদ্র বিন্দুর মতোই ছিল।

আমাদের নিজস্ব প্রজাতি, হোমো স্যাপিয়েন্স, ইতোমধ্যে পৃথিবীর মনচে ছিল, কিন্তু তারা আফ্রিকার এক কোণে নিজেদের কাজ নিয়েই ব্যস্ত ছিল। আমরা জানি না কোথয় আর কিভাবে প্রানীগুলোকে হোমো স্যাপিয়েন্স নামে শ্রেণিবদ্ধ করা যেত যাদের কিনা উদ্ভব হয়েছিল কিছু প্রাথমিক পর্যায়ের মানুষ থেকে, কিন্তু বেশিরভাগ বিজ্ঞানী একমতো যে ১৫০,০০০ বছর আগে পূর্ব আফ্রিকা হোমো স্যাপিয়েনসে পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল যাদেরকে আমাদের মতো দেখাত। যদি তাদের মধ্যে কাউকে আধুনিক মর্গে উল্টেপাল্টে দেখা হয়, স্থানীয় স্বাস্থ্যবিদরা অদ্ভুত কিছু আবিস্কার করবেন না। আগুনের আশীর্বাদে তারা তাদের পূর্বপুরুষদের থেকে ছোট দাঁত আর চোয়াল পেয়েছিল, যেখানে তাদের মস্তিস্কও ছিল আমাদের মতো আকারে বড়সড়।

বিজ্ঞানীরা এক্ষেত্রেও একমতো যে প্রায় ৭০,০০০ বছর আগে স্যাপিয়েন্সরা পূর্ব আফ্রিকা থেকে আরবীয় উপত্যকায় ছড়িয়ে পড়েছিল, আর সেখান থেকে দ্রুত তারা পুরো ইউরেশিয়ান ভূমিতে চলে গিয়েছিল।
যখন হোমো স্যাপিয়েন্স আরবে অবতরণ করেছিল, ইউরেশিয়ার বেশিরভাগ অন্য মানব প্রজাতিতে ভরে গিয়েছিল। তাদের ভাগ্যে কি ঘটেছিল? এই ব্যাপারে দুটো সাংঘর্ষিক তত্ত্ব রয়েছে। ‘আন্তপ্রজনন তত্ত্ব’ বলে আকর্ষণ, যৌনতা আর মেলামেশার গল্প। যখন আফ্রিকা থেকে অভিবাসীরা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছিল, তারা অন্য মানব জনসংখ্যার সাথে প্রজননে গিয়েছিল, আর আজকের দিনের মানুষেরা এই অন্তঃপ্রজননের ফসল।

উদাহরণস্বরুপ, যখন স্যাপিয়েন্সরা মধ্যপ্রাচ্য আর ইউরোপে পৌঁছেছিল, তাদের সাথে নিয়ান্ডারথালদের মোকাবেলা হয়েছিল। এই মানুষরা স্যাপিয়েন্সদের থেকে বেশি পেশীবহুল ছিল, তাদের ছিল বৃহত্তর মস্তিস্ক, আর তারা শীতল আবহাওয়ার বেশি মানিয়ে নিতে পারত। তারা হাতিয়ার আর আগুন ব্যবহার করত, ছিল ভাল শিকারী, আর প্রত্যক্ষভাবে তাদের অসুস্থ আর অশক্তদের দেখাশোনা করত। (প্রত্মতাত্বিকেরা নিয়ান্ডারথালের হাড় আবিস্কার করেছেন যারা বেশ কিছু শারিরীক অক্ষমতা সত্ত্বেও অনেক বছর বেঁচে ছিল, যা প্রমাণ করে তারা তাদের আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে যত্মআত্মি পেত।) নিয়ান্ডারথালদের নিয়ে প্রায়ই কার্টুন আঁকা হত যেখানে তাদের পশুতূল্য আর বোকা ‘গুহাবাসী লোক’ হিসেবে দেখানো হত, কিন্তু তাদের সম্পর্কে প্রাপ্ত সাম্প্রতিক প্রমাণ তাদের ইমেজে পরিবর্তন এনেছে।

আন্তঃপ্রজনন তত্ত্ব অনুসারে, যখন স্যাপিয়েনস্রা নিয়ান্ডারথলদের ভূমিতে ছড়িয়ে গিয়েছিল, স্যাপিয়েন্স তাদের সাথে প্রজননে গিয়েছিল যতক্ষণ পর্যন্ত না দুটো প্রজাতি একসাথে হয়। যদি তাই হয়ে থাকে, তাহলে আজকের ইউরেশিয়ানরা খাঁটি স্যাপিয়েন্স নয়। তাদের মধ্যে স্যাপিয়েন্স আর নিয়ান্ডারথালের সংমিশ্রণ রয়েছে।

তেমনি যখন স্যাপিয়েন্স পূর্ব আফ্রিকার পৌঁছেছিল, তারা স্থানীয় ইরেক্টাসের সাথে আন্তঃপ্রজনন করেছিল, তাই চাইনিজ আর কোরিয়ানরা স্যাপিয়েন্স আর ইরেক্টাসের সংমিশ্রণ।

বিপরীত মতোবাদ, যাকে বলে ‘স্থানান্তর তত্ত্ব’, সেটি বলে এক দারুণ অন্যরকম গল্প – বৈপরীত্য, আকস্মিক পরিবর্তন, আর এমনকি গণহত্যার গল্প। এই তত্ত্ব অনুসারে, স্যাপিয়েন্স আর অন্য মানুষদের ছিল ভিন্নরকমের শারিরীক বৈশিষ্ট, আর সম্ভবত ভিন্নরকম সংগ অভ্যাস আর শরীরের গন্ধ। তাদের একের প্রতি অন্যের খুব কম যৌন আগ্রহ ছিল। আর যদিও এক নিয়ান্ডারথাল রোমিও আর স্যাপিয়েন্স জুলিয়েট প্রেমে পরেও থাকে, তারা উর্বর সন্তান উতপাদন করতে পারেনি, কারণ যে জেনেটিক বিভাজনরেখা দুটো জনসংখ্যাকে আলাদা করেছিল, সেটা ছিল ইতোমধ্যেই অসংযোগযোগ্য। দুটো জনসংখ্যা একেবারে আলাদা থেকে গিয়েছিল, আর যখন নিয়ান্ডারথাল একেবারেই সবাই মারা গিয়েছিল, তাদের জিনগত বৈশিষ্ট্যও তাদের সাস্থে মারা গিয়েছিল। এই তত্ত্ব অনুসারে, স্যাপিয়েন্স সব ধরণের মানব প্রজাতির স্থলাভিষিক্ত হয়েছিল তাদের সাথে যুক্ত না হয়েই। যদি তাই হয়ে থাকে, সব আধুনিক মানুষের সংযোগ বের করা যাবে, পিছনের দিকে, বিশেষ করে, পূর্ব আফ্রিকায় ৭০,০০০ বছর আগে ফিরে গিয়ে। আমরা তাহলে সবাই হব খাঁটি স্যাপিয়েন্স।

এই বিতর্কে অনেক কিছুই আছে। বিবর্তনের দৃষ্টিকোণ থেকে ৭০,০০০ বছর তুলনামূলক ছোটখাট বিরতি। যদি স্থানান্তর তত্ত্বটি সঠিক হয়ে থাকে, সব বেঁচে থাকা মানুষের একই জেনেটিক বৈশিষ্ট রয়েছে, আর তাদের জাতিগত পার্থক্য একেবারেই অনুল্লেখ্য। কিন্তু যদি আন্তপ্রজনন তত্ত্ব সঠিক হয়ে থাকে, আফ্রিকান, এশিয়ান আর ইউরোপিয়ানদের মধ্যে ভালরকম জিনগত পার্থক্য থাকতে পারে যা আছে শত হাজার বছর ধরে। এটি রাজনৈতিক ডিনামাইট, যা বিস্ফোরণযোগ্য জাতিগত তত্ত্বের জন্য জ্বালানী সরবরাহ করতে পারে।

বর্তমান দশকগুলোতে স্থানান্তর তত্ত্ব এই ক্ষেত্রে সাধারণ প্রজ্ঞা হিসেবেও দেখা দিয়েছে। এটির জোরালো প্রত্নতাত্বিক পটভুমিকা ছিল, আর এটি রাজনৈতিকভাবে বেশি সঠিক (বিজ্ঞানীদের জাতিগত পার্থক্যের প্যান্ডোরার বাক্স খোলার কোনো ইচ্ছে ছিল না আধুনিক জনসংখ্যার মধ্যে বিশদ জিনগত বৈপরীত্য দাবি করে)। কিন্তু তার সমাপ্তি ঘটে ২০১০ সালে, যখন নিয়ান্ডারথালের জিন মানচিত্র তৈরির চার বছরের চেষ্টা প্রকাশিত হয়েছিল। জীন বিজ্ঞানীরা ফসিল বা জীবাশ্ম থেকে যথেষ্ট পরিমাণে অক্ষত নিয়ান্ডারথাল ডিএনএ সংগ্রহ করতে সমর্থ হয়েছিলেন এটির সাথে আধুনিক মানুষের ডিএনএর বিশদ তুলনা করার জন্য। ফলাফল বিজ্ঞানী সম্প্রদায়কে বিস্মিত করে দিয়েছিল।

এতে প্রকাশিত হয়েছিল যে মধ্যপ্রাচ্য আর ইউরোপের আধুনিক মানুষের ডিএনএ’র ১-৪ শতাংশ হচ্ছে নিয়ান্ডারথালের ডিএনএ। সেটি বিশাল পরিমাণে নয়, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয় ধাক্কাটি এসেছিল কয়েক মাস পরে, যখন যখন ডেনিসোভার জীবাশ্মকৃত আঙ্গুল থেকে ডিএনএও সংগ্রহ করে তার মানচিত্র তৈরি করা হয়েছিল। ফলাফল প্রমাণ করেছে যে আধুনিক মেলানেসিয়ান বা অস্ট্রেলিয়ান আদিবাসীর অনন্য মানব ডিএনএ হলো ডেনিসোভান ডিএনএ।

যদি এই ফলাফলগুলো সঠিক হয়ে থাকে – আর এটি মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে আরো গবেষণার কাজ এগিয়ে চলছে আর তা এইসকল উপসংহারকে জোরালো বা ভিন্নরকম করতে পারে – আন্তঃপ্রজনন তত্ত্বের সমর্থকেরা অন্তত কিছু ব্যাপারে সঠিক। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে স্থানান্তর তত্ত্ব একেবারে ভুল। যেহেতু নিয়ান্ডারথাল আর ডেনিসোভানরা আমাদের আজকের দিনের জিনে খুব কম পরিমাণে অবদান রেখেছে, স্যাপিয়েন্স আর অন্য মানব প্রজাতির ভিতরে একত্রীকরণের ব্যাপারটা সঠিক বলা অসম্ভব। যদিও তাদের মধ্যকার পার্থক্য তাদের উর্বর যৌন-মিলনের ক্ষেত্রে পুরোপুরি দূরে রাখার মতো নয়, কিন্তু তা সেরকম সংস্পর্শকে খুবই বিরলভাবে অনুমোদন দেয়।

এখন কেমন করে আমরা স্যাপিয়েন্স, নিয়ান্ডারথাল আর ডেনিসোভানদের শারিরীক সম্পর্কের ব্যাপারটা বুঝবো? স্বাভাবিকভাবেই তারা ঘোড়া আর গাধার মতো পুরো ভিন্ন প্রজাতি নয়। অন্যদিকে তারা বুলডগ আর স্প্যানিয়েলের মতো একই প্রজাতির সম্পূর্ন ভিন্ন জনসংখ্যা নয়। শারিরীক বাস্তবতা ফাকা আর সাদা নয়। দূসর অংশও সেখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ। প্রতি দুই প্রজাতি যারা একই ধরেণের পূর্বপুরুষ থেকে উদ্ভব হয়েছিল, যেমন ঘোড়া আর গাধা, একসময় তারা ছিল একই প্রজাতির দুটি ভিন্ন প্রাণী, বুলডগ আর স্প্যানিয়েলের মতো। সেখানে অবশ্যই একটা বিষয় থাকা উচিত যে কখন দুটো দুটো জনসংখ্যা একেবারে একে অপরের থেকে আলাদা, কিন্তু তখনো খুব কম সংখ্যকবার যৌন মিলন আর উর্ব সন্তান উতপাদনে সক্ষম ছিল। তারপর আরেকটি রুপান্তর এই শেষ সুতার সাথে যোগাযোগে সাহায্য করেছিল, আর তারা তাদের আলাদা বিবর্তনের পথে গিয়েছিল।

মনে হয় প্রায় ৫০,০০০ বছর আগে স্যাপিয়েন্স, নিয়ান্ডারথাল আর ডেনিসোভান যুদ্ধরত অবস্থায় ছিল। তারা ছিল প্রায়, কিন্তু পুরোপুরি নয়, একেবারেই আলাদা প্রজাতি। যেমনটি আমরা পরবর্তী অধ্যায়ে দেখব যে স্যাপিয়েন্স নিয়ান্ডারথাল আর ডেনিসোভানদের থেকে জেনেটিক সংকেত আর শারিরীক বৈশিষ্টের দিক থেকেই ভিন্নরকম ছিল না, পাশাপাশি তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক আর সামাজিক সক্ষমতাতেও, যদিও মনে হয় এটি তখনো সম্ভব ছিল, বিরল পর্যায়ে, স্যাপিয়েন্স আর নিয়ান্ডারথালের উর্বর সন্তান জন্মদানের ব্যাপারটা। সুতরাং, দুইটি জনসংখ্যা একসাথে সংযুক্ত হয়নি। কিন্তু কিছু সৌগাব্যবান নিয়ান্ডারথালের জিন স্যাপিয়েনসের গাড়িতে উঠে গিয়েছে। এটা আলোড়িত করার মতো- সম্ভবত রোমামচকরও – এটা চিন্তা করা যে আমরা স্যাপিয়েন্সরা ভিন্ন প্রজাতির প্রাণী রুপের সাথে একসময় হয়তো যৌনমিলন করেছে, আর একসাথে সন্তান উতপাদন করেছে।

কিন্তু, যদি নিয়ান্ডারথাল, ডেনিসোভান আর অন্য মানব প্রজাতিরা স্যাপিয়েনসের সাথে যুক্ত না হয়, তাহলে কেমন করে তারা অদৃশ্য হয়ে গেল? একটা সম্ভাবনা হলো হোমো স্যাপিয়েন্স তাদেরকে বিলুপ্তির দিকে নিয়ে গিয়েছিল। কল্পনা করুন একদল স্যাপিয়েন্স বলকান উপত্যকায় পৌঁছচ্ছিল যেখানে নিয়ান্ডারথালরা শত হাজার বছর ধরে বসবাস করছিল। আগমণ করা নতুনরা হরিণ শিকার আর বাদাম সংগ্রহ করতে শুরু করে দিয়েছিল যা কিনা নিয়ান্ডারথালের ঐতিহ্যবাহী প্রধান খাদ্য ছিল।

স্যাপিয়েন্সরা বেশি পরিমাণে দক্ষ শিকারী আর সংগ্রাহক ছিল – যার মূলে ছিল উন্নততর প্রযুক্ত আর সুনিপুণ সামাজিক দক্ষতা –তাই তারা সংখ্যায় বেড়ে গিয়েছিল আর ছড়িয়ে পড়েছিল। কম সরঞ্জাম থাকা নিয়ান্ডারথালদের তাদের নিজেদের খাবার জোগাতে কঠিন হয়ে পড়ল। জনসংখ্যাটি ভেঙ্গে পড়েছিল আর তারা ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল, সম্ভবত দুই-একজন ছাড়া যারা স্যাপিয়েন্সদের দলে যোগ দিয়েছিল।

আরেকটা সম্ভাবনা হলো সম্পদের জন্য লড়াই করা তাদের মধ্যে সংঘর্ষ আর গণহত্যাকে ছড়িয়ে দিয়েছিল। সহিষ্ণুতা স্যাপিয়েনসের চিহ্নিত বৈশিষ্ট ছিল না। আধুনিক সময়ে গায়ের রঙ, ভাষা আর ধর্মে সামান্য পার্থক্য একদলকে স্যাপিয়েন্সকে আরেকদলে দ্রুত দূরে সরিয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। প্রাচীন স্যাপিয়েনসরা কি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের এক মানব প্রজাতির প্রতি বেশি পরিমাণে সহিষ্ণু ছিল। এটাই হয়ত হয়েছিল যে স্যাপিয়েন যখন নিয়ান্ডারথালের মুখোমুখি হয়েছিল, ফলাফল ছিল ইতিহাসের প্রথম আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জাতিগত শুদ্ধি অভিযান।

যেভাবেই এটি হয়ে থাকুক, নিয়ান্ডারথাল (আর অন্যান্য মানব প্রজাতি) ইতিহাসের বিরাট এক ‘যদি’র জন্ম দিয়েছে। কল্পনা করুন যদি হোমো স্যাপিয়েনসের পাশাপাশি নিয়ান্ডারথাল বা ডেনিসোভানরা টিকে থাকত, তাহলে সবকিছু কেমন হত। কি ধরণের সংস্কৃতি, সমাজ আর রাজনৈতিক কাঠামোর উদ্ভব হত সেই পৃথিবীতে যেখানে বিভিন্ন মানব প্রজাতি সহাবস্থান করত। উদাহরণস্বরুপ, কেমন করে ধর্মীয় বিশ্বাসের বিষয়াবলী উন্মোচিত হত। বুক অব জেনেসিস কি ঘোষণা করত যে নিয়ান্ডারথাল আদম আর হাওয়া থেকে এসেছে, যিশু কি ডেনিসোভানদের পাপের কারণে মারা যেতেন, আর কোরান কি স্বর্গে সব পূণ্যবান মানুষের জন্য আসন ঠিক করত, তার প্রজাতি যাই হোক না কেন? নিয়ান্ডারথালরা কি রোমান লিজিওন বাহিনীতে অথবা রাজকীয় চায়নার জটিল আমলাতন্ত্রে সেবা দিত? আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণা কি সপ্রমাণিত সত্য হিসেবে এটাই ধারণ করত যে হোমো জাতের সব সদস্য একই সমান? কার্ল মার্কস কি সব প্রজাতির শ্রমিককে এক হওয়ার আহবান জানাতেন?

গত ১০,০০০ বছরে হোমো স্যাপিয়েন্স একমাত্র মানব প্রজাতি হিসেবে এত গ্রহণযোগ্যভাবে বেড়ে উঠেছে যে আমাদের অন্য কোনো সম্ভাবনা গ্রহণ করা বেশ কঠিন। আমাদের ভাই আর বোনদের অভাব আমাদের এটা কল্পনা করতে সহজতর করে দিয়েছে যে আমরা সৃষ্টির সেরা আর একটা যাদুকরী হাত আমাদের বাকি প্রাণী জগত থেকে পৃথক করে দিয়েছে। যখন চার্লস ডারউইন নির্দেশ করেছিলেন যে হোমো স্যাপিয়েন্স হলো কেবল এক ধরণের প্রাণী, লোকজন ক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছিল। এমনকি আজকেও অনেকে এটি বিশ্বাস করতে অস্বীকার করে। যদি নিয়ান্ডারথাল বেঁচে থাকত, আমরা কি আমাদের প্রাণীজগত থেকে ভিন্ন কিছু হিসেবে কল্পনা করতাম? সম্ভবত এই কারণেই আমাদের পূর্বপুরুষেরা নিয়ান্ডারথালকে নিঃশেষ করে দিয়েছিল। তারা মনযোগ না দেওয়ার জন্য খুব একটা পরিচিত ছিল না, কিন্তু সহ্য করার বাইরে আলাদা ধরণের ছিল।

স্যাপিয়েন্সকে দায়ি করা যায় আর না যায়, যখনই তারা নতুন অবস্থানে গিয়েছিল, তারপর পরই স্থানীয় জনসংখ্যা বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। হোমো সোলেনসিসের শেষ চিহ্ন পাওয়া যেত আজ থেকে প্রায় ৫০,০০০ বছর আগে। হোমো ডেনিসোভা তার কিছু পরেই বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। নিয়ান্ডারথাল মোটামুটি ৩০,০০০ বছর আগে বিদায় নিয়েছিল। ফ্লোরেস দ্বীপ থেকে শেষ বামন-সদৃশ্য মানুষ অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল ১২,০০০ বছর আগে। তারা কিছু হাড়, পাথরের যন্ত্রপাত, আমাদের ডিএনএ’তে কিছু জিন আর অনেক জবাবহীন প্রশ্ন রেখে গেছে। তারা পেছনে রেখে গেছে আমাদের - হোমো স্যাপিয়েন্স - শেষ মানব প্রজাতিকে।

কি ছিল স্যাপিয়েনসের সাফল্যের গোপনীয়তা? কেমন করে আমরা এত বেশি পরিমাণে ভূপ্রাকৃতিকভাবে ভিন্ন আবাসস্থলে এত দ্রুত থিতু হতে সফল হয়েছিলাম। কেমন করে আমরা অন্য সব মানব প্রজাতিকে বিস্মৃতিতে পাঠিয়ে দিয়েছি? কেন শক্তিশালী, মেধাবী, শীত-নিরোধী নিয়ান্ডারথালরা আমাদের বিতারনে বেঁচে থাকতে পারেনি? বিতর্ক উত্তপ্ত হতেই থাকবে। সবচেয়ে প্রত্যাশিত উত্তরটিই হচ্ছে সেই জিনিস যা বিতর্ককে সম্ভব করে তোলেঃ সবকিছুর উপরে হোমো স্যাপিয়েন্স বিশ্বকে জয় করতে পেরেছে তাদের অনন্য ভাষার কারণে।


জ্ঞানবৃক্ষ

আগের অধ্যায়ে আমরা দেখেছি যে যদিও ১৫০,০০০ বছর আগে স্যাপিয়েন্স ইতোমধ্যে পূর্ব আফ্রিকায় জনবসতি গড়েছিল, তারা পুরো দুনিয়াকে উলটে দিতে আর অন্য মানব প্রজাতিকে বিলুপ্তির দিকে নিয়ে যেতে শুরু করেছিল মাত্র প্রায় ৭০,০০০ বছর আগে। পরবর্তী হাজার বছরে যদিও এই প্রাচীন স্যাপিয়েনসে দেখতে আমাদের মতোই লাগত এবং তাদের মস্তিস্ক আমাদেরটাই মতোই বড় ছিল, তারা অন্য মানব প্রজাতিদের উপর কোনো চিহ্নিত সুবিধা ভোগ করেনি, কোনো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য আধুনিক হাতিয়ার তৈরি করেনি, আর অন্য কোনো বিশেষ কর্ম সম্পাদন করেনি।

প্রকৃতপক্ষে, স্যাপিয়েন্স আর নিয়ান্ডারথালের ভিতর প্রথম যুদ্ধে নিয়ান্ডারথালরা জয়লাভ করেছিল। প্রায় ১০,০০০ বছর আগে কিছু স্যাপিয়েন্স দল উত্তরে লেভান্তের দিকে সরে গিয়েছিল, যেটি ছিল নিয়ান্ডারথালের অনচল, কিন্তু তারা সেখানে শক্ত অবস্থান করে নিতে ব্যর্থ হয়েছিল। এটা সম্ভবত হয়েছিল নোংরা প্রতিবেশী, রুক্ষ জলবায়ু, অথবা স্থানীয় পরজীবিদের কারণে। যে কারণেই হোক, স্যাপিয়েন্সরা পিছিয়ে এসেছিল, নিয়ান্ডারথালকে মধ্যপ্রাচ্যের প্রভু হিসেবে ছেড়ে দিয়ে।
অর্জনের দুর্বল রেকর্ড পণ্ডিতদের এটা প্রকাশ করতে বাধ্য করেছিল যে এইসব স্যাপিয়েন্সদের মস্তিস্কের অভ্যন্তরীণ কাঠামো আমাদেরটার থেকে ভিন্ন ছিল। তারা আমাদের মতোই দেখতে ছিল, কিন্তু তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতাগুলো – শেখা, স্মরণ করা, যোগাযোগ করা – ছিল অনেক বেশি সীমাবদ্ধ। এরকম কোনো প্রাচীন স্যাপিয়েন্সকে ইংরেজি শেখানো, তাকে খ্রিষ্টান ধর্মের মতবাদ গ্রহণে বাধ্য করা, অথবা তাকে বিবর্তনের তত্ত্ব বোঝানোর চেষ্টা করা সম্ভবত হতাশাজনক একটা কাজই হত। বিপরীত দিকে, আমাদের তার ভাষা শিখতে আর তার চিন্তার গতিপথ বুঝতে ভালোরকম সমস্যায় পড়তে হত।

কিন্তু তখন, ৭০,০০০ বছর আগে থেকে শুরু করে হোমো স্যপিয়েনস খুব বিশেষ কিছু করতে শুরু করে দিয়েছিল। প্রায় সেই সময়ে স্যাপিয়েনসের দল দ্বিতীয়বারের মতো আফ্রিকা ছেড়ে গিয়েছিল। এইবার তারা শুধু মধ্যপ্রাচ্য থেকেই নয়, বরং পৃথিবী থেকেই নিয়ন্ডারথাল আর অন্য মানব প্রজাতিকে হটিয়ে দিল। উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সংক্ষিপ্ত সময়ে, স্যাপিয়েন্স ইউরোপ আর পূর্ব আফ্রিকায় পৌঁছে গিয়েছিল। প্রায় ৪৫,০০০ বছর আগে, তারা যে কোনোভাভেই হোক, খোলা সমুদ্র পাড়ি দিয়ে অষ্ট্রেলিয়ায় অবতরণ করেছিল – যে মহাদেশে তখনো মানুষের পায়ের ছাপ পড়েনি। ৭০,০০০ বছর থেকে ৩০,০০০ বছর আগের সময়কাল দেখেছিল নৌকা, তেলের বাতি, তীর-ধনুক আর সুঁইয়ের আবিস্কার (জরুরী ছিল গরম কাপড় সেলাই করার জন্য)। প্রথম যে জিনিসটাকে শিল্প বলা যায় তা ছিল এই যুগে পাওয়া যায় (খাড়া সিংহ-মানব), যেমন যায় ধর্ম, বাণিজ্য আর সামাজিক সন্তুষ্টির প্রথম পরিষ্কার প্রমাণ।

বেশিরভাগ গবেষকরা বিশ্বাস করেন এইসব অভাবনীয় অর্জন ছিল স্যাপিয়েনসের বুদ্ধিবৃত্তিক দক্ষতার বিপ্লবের ফসল। তারা মনে করেন যে মানুষেরা নিয়ান্ডারথালকে বিলুপ্তির দিকে নিয়ে গিয়েছিল, অস্ট্রেলিয়ায় থিতু হয়েছিল, আর স্ট্যাডেল সিংহকে খোদাই করেছিল, তারা ছিল আমাদের মতোই বুদ্ধিমান, সৃষ্টিশীল আর ক্রিয়াশীল। যদি আমরা স্ট্যাডেল গুহার শিল্পীর সাথে পরিচিত হতে পারতাম, আমরা তাদের ভাষা আর তারা আমাদেরটা শিখতে পারত। আমরা আমাদের জানা সবকিছুই তাদের কাছে ব্যাখ্যা করতে পারতাম – এলিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ডের অভিযান থেকে শুরু করে কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যার প্যারাডক্স পর্যন্ত – আর তারা আমাদের শেখাতে পারত তাদের লোকেরা কেমন করে পৃথিবীকে দেখে।

৭০,০০০ থেকে ৩০,০০০ বছর আগেকার চিন্তা আর যোগাযোগের নতুন পদ্ধতির আগমণ বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লবকে সংগঠিত করেছে। এর কারণ কি ছিল? আমরা নিশ্চিত নই। সবচেয়ে পরিচিত তত্ত্ব বলে দুর্ঘটনামূলক জেনেটিক রুপান্তর স্যাপিয়েনসের মস্তিস্কের ভিতরকার সংযোগপ্রণালী পরিবর্তন করে দিয়েছিল, যা তাদের অভাবনীয়ভাবে চিন্তা করতে আর নতুন ধরণের ভাষাতে যোগাযোগ করতে সক্ষম করেছিল। এটাকে আমরা বলতে পারি জ্ঞান রুপান্তরের বৃক্ষ। কেন এটা নিয়ান্ডারথালের ডিএনএ’তে না হয়ে স্যাপিয়েনসের ডিএনএ’তে হয়েছিল? যতটুকু পর্যন্ত আমরা বলতে পারি, এটা ছিল খাঁটি সুযোগের ব্যাপার।কিন্তু জ্ঞানের রুপান্তর বৃক্ষের ফলাফল বোঝা বেশি গুরুত্বপূর্ণ এর কারণের চাইতে। স্যাপিয়েন্সদের নতুন ভাষাতে এমন কি বিশেষ কিছু আছে যা আমাদের দুনিয়াকে জয় করতে সক্ষম করেছে?

এটা প্রথম ভাষা ছিল না। প্রতিটি প্রাণীরই কিছু বিশেষ প্রকৃতির ভাষা আছে। এমনকি মৌমাছি আর পিঁপড়ার মতো পোকামাকড়ও জানে সুনিপুণ পন্থায় যোগাযোগ করতে, একে অন্যকে খাদ্যের আদ্যোপান্ত সম্পর্কে জানাতে। এটা প্রথম কথা বলা ভাষাও ছিল না। সব ধরণের এপ আর বানরসহ অনেক প্রাণীরই মৌখিক ভাষা রয়েছে। উদাহরণস্বরুপ, সবুজ বানর বিভিন্ন রকম ডাক ব্যবহার করে যোগাযোগ করতে। প্রাণীবিজ্ঞানীরা এক ধরণের ডাক চিহ্নিত করেছে যার অর্থ ‘সাবধান! একটা ঈগল!’ সামান্য একটু ভিন্ন ধরণের ডাক সতর্ক সংকেত দেয় ‘সাবধান! একটা সিংহ!’ যখন গবেষকরা একদল বানরের কাছে প্রথম ডাকটির রেকর্ড বাজিয়েছিলেন, বানরেরা তারা যা করছিল তা থামিয়ে ভয়ে ভয়ে উপরের দিকে তাকিয়ে ছিল। যখন একই দল দ্বিতীয় ডাকটির রেকর্ড করা শব্দ শুনতে পেয়েছিল, যা ছিল সিংহের সম্পর্কে সতর্কবার্তা, তখন তারা দ্রুত একটা গাছ ধরে উপরে উঠে গিয়েছিল। স্যাপিয়েন্স সবুজ বানরের থেকে অনেক বেশি স্বতন্ত্র শব্দ উচচারণ করতে পারে, কিন্তু তিমি আর হাতিরও একইরকম মুগ্ধকর ক্ষমতা রয়েছে। একটা তোতাপাখি তাই বলতে পারবে যা আলবার্ট আইনস্টাইন বলতে পারত, পাশাপাশি ফোনের রিং, দরজা সশব্দে বন্ধ হয়ে যাওয়া আর সাইরেনের চিতকারের শব্দও অনুকরণ করতে পারে। যে সুবিধা তোতপাখির চেয়ে আইনস্টাইনের মধ্যে ছিল, এটা কন্ঠস্বর নয়। তাহলে, আমাদের ভাষায় এমন বিশেষত্ব কি আছে?

সবচেয়ে সাধারণ উত্তর হলো আমাদের ভাষা আশ্চর্যজনকভাবে নমনীয়। আমরা সীমিত সংখ্যক শব্দ আর সংকেত দিয়ে অসীম সংখ্যক বাক্য তৈরি করতে পারি।, যার প্রতিটির আলাদা অর্থ রয়েছে। এইভাবে আমরা আমাদের চারপাশের দুনিয়া সম্পর্কে দানবীয় পরিমাণে তথ্য গলাধকরণ, মজুদ আর যোগাযোগ করতে পারি। একটা সবুজ বানর তার সঙ্গীদের প্রতি হাঁক ছাড়তে পারে, ‘সাবধান! একটা সিংহ!’ কিন্তু একজন আধুনিক মানুষ তার বন্ধুকে বলতে পারে যে এই সকালে নদীর বাঁকের কাছে সে একটা সিংহকে দেখেছে একদল বাইসনকে অনুসরণ করতে। সে তখন সঠিক অবস্থানটি বলতে পারে, সেই এলাকায় যাওয়ার ভিন্ন ভিন্ন পথগুলোসহ। এই তথ্যের মাধ্যমে তার দলের সদস্যরা সবাই মিলে চিন্তা করতে পারে যে তারা নদীর কাছে পৌঁছবে আর সিংহটিকে পেরিয়ে বাইসন শিকার করবে কি না।
দ্বিতীয় তত্ত্বটি বলে যে আমাদের অনন্য ভাষার উদ্ভব হয়েছে পৃথিবী সম্পর্কে তথ্য ভাগ করে নেয়ার একটা উপায় হিসেবে। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে তথ্যের পরিবহন হওয়া প্রয়োজন তা ছিল তা সিংহ আর বাইসন সম্পর্কে নয়। আমাদের ভাষার উদ্ভব হয়েছে গল্পের মাধ্যম হিসেবে। এই তত্ত্ব অনুযায়ী হোমো স্যাপিয়েন্স প্রাথমিকভাবে হলো সামাজিক জীব। সামাজিক সহযোগিতা আমাদের বেঁচে থাকা আর পুনঃউতপাদনের চাবিকাঠি। প্রত্যেক নারী আর পুরুষের জন্য সিংহ আর বাইসনের আদ্যোপান্ত জানাই যথেষ্ট নয়। এটা তাদের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ যে তাদের দলে কে কাকে ঘৃণা করে, কে কার সাথে শোয়, কে সৎ, আর কে প্রতারক।

যে পরিমাণে তথ্য একজন অবশ্যই সংগ্রহ করবে আর জমা রাখবে এমনকি কয়েক ডজনের সদা-পরিবর্তনশীল সম্পর্কের হদিস রাখতে তা অত্যন্ত ব্যাপক। (পনচাশ জনের একটি দলে ১২২৫টি পারস্পারিক সম্পর্ক আর অগুণতি আরো বেশি সামাজিক সমন্বয় বিদ্যমান।)সব এপই সামাজিক তথ্যাবলিতে প্রচন্ড আগ্রহ রাখে, তাদের কার্যকরীভাবে কথোপকথনে সমস্যা রয়েছে। নিয়ান্ডারথাল আর প্রাচীন হোমো স্যাপিয়েনসেরু সম্ভবত একে অন্যের পিছনে সমালচনা করার ক্ষেত্রেও কঠিন সমস্যায় পড়তে হয়েছিল – একটি মারাত্মক দক্ষতা যেটা বিশাল সংখ্যকের সাথে সাহায্য-সহযোগিতা করায় প্রকৃতপক্ষে দারুণ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। নতুন ভাষাগত দক্ষতা যা আধুনিক স্যাপিয়েন্স আজ থেকে সত্তর হাজার বছর আগে অর্জন করেছিল তাদেরকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করতে সমর্থ করেছে। কাকে বিশ্বাস করা যায় এই নির্ভরযগ্য তথ্যের অর্থ ছিল ছোট দলগুলো বড় দলে সম্প্রসারণ করতে পারে আর স্যাপিয়েন্সরা পারস্পারিক লেনদেনের আটসাট আর আরো বেশি আধুনিক পন্থা বের করতে পারে।
গল্পগুজবের তত্ত্বকে রসিকতার মতো মনে হতে পারে, কিন্তু অসংখ্য পর্যবেক্ষণ একে সমর্থন করেছে। এমনকি আজকেও বিরাট অংশের মানব যোগাযোগও – ইমেইল, ফোন কল বা সংবাদপত্রের কলাম – হলো গল্পগুজবই। এটা এত প্রাকৃতিকভাবে এসেছে যেন আমাদের ভাষার শুধু এই উদ্দেশ্যেই উদ্ভব হয়েছে। আপনি কি চিন্তা করতে পারেন যে ইতিহাসের অধ্যাপকেরা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণ সম্পর্কে আলাপ করেন যখন তারা মধ্যাহ্ন ভোজের জন্য একসাথে হন, অথবা পারমাণবিক পদার্থবিদরা তাদের বৈজ্ঞানিক সম্মেলনের কফি বিরতিতে কোয়ার্ক নিয়ে আলাপ করেন? কখনো কখনো। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, সেই অধ্যাপক সম্পর্কে গল্প করেন যে তার স্বামীকে প্রতারণা করার সময় হাতে-নাতে ধরে ফেলেছিল, অথবা বিভাগীয় প্রধান আর ডিনের মধ্যে লাগা ঝগড়া, অথবা তাদের সহকর্মী সম্পর্কে গুজব যে সে তার গবেষণার তহবিল লেক্সাস কেনার জন্য ব্যায় করে। গল্পগুজব সাধারণত ভুল কাজগুলোকে ফোকাস করে। গুজবের কারবারীরা আসলে প্রকৃত চতুর্থ স্তম্ভ, যা সাংবাদিকেরা সমাজকে অবহিত করে এভাবে প্রতারক আর সুবিধাবাদীদের হাত থেকে রক্ষা করে।
সবচেয়ে বড় কথা হলো গল্প-গুজব তত্ত্ব আর ‘নদীর কাছে সিংহ আছে’ উভয় তত্ত্বই সঠিক। যদিও আমাদের ভাষার সত্যিকার অনন্য বৈশিষ্ট মানুষ আর সিংহ সম্পর্কে তথ্য সরবরাহ করার সামর্থ্যটি নয়। বরং এটি এটি হলো যে জিনিস আসলেই নেই, সে সম্পর্কে তথ্য সরবরাহ করার সামর্থ্য। যতটা আমরা জানি, শুধু স্যাপিয়েন্সই পারে সেই ধরনের জিনিস সম্মন্ধে কথা বলতে যা তারা কখনো দেখেনি, ছোঁয়নি বা গন্ধ নেয়নি।

কিংবদন্তী, উপকথা, ইশ্বর আর ধর্মের বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লবের সাথে সাথেই প্রথমবারের মতো উদ্ভব ঘটেছিল। অনেক প্রাণী আর মানব প্রজাতি আগে বলতে পারত, ‘সাবধান! একটা সিংহ!’ বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লবের কারণেই হোমো স্যাপিয়েন্স তা বলার ক্ষমতা অর্জন করেছিল যে, ‘সিংহ আমাদের গোত্রের রক্ষাকর্তা শক্তি।’ কাল্পনিক বিষয়াবলি সম্মন্ধে কিছু বলার এই সামর্থ্য স্যাপিয়েনসের ভাষার সবচেয়ে অনন্য বৈশিষ্ট।

এটা মেনে নেয়া তুননামূলক সহজ যে শুধু হোমো স্যাপিয়েন্সই সেইসব জিনিস সম্পর্কে কথা বলতে পারে যার আসলে কোনো অস্তিত্বই নেই, আর সকালের নাস্তার আগেও ছয়টি অবশ্বাস্য জিনিস বিশ্বাস করতে পারে। আপনি কখনো একটা বানরকে আপনাকে একটা কলা দিতে রাজি করাতে পারবেন না তাকে তার মৃত্যুর পর বানরের স্বর্গে অফুরন্ত কলা দেওয়ার লোভ দেখিয়ে। কিন্তু তাহলে এটি গুরুত্বপূর্ণ কেন? মোটের উপর, কল্পকাহিনী ভয়াবহভাবে ভুল পথে নিতে পারে বা পথ থেকে সরিয়ে দিতে পারে। যে লোকেরা বনে পরী আর ইউনিকর্নের খোঁজ করে, তাদের সেইসব মানুষের থেকে বেঁচে থাকার সুযোগ অনেক কম যারা কিনা মাশরুম আর হরিণের খোজে সেখানে যায়। আর যদি আপনি ঘন্টার পর ঘণ্টা অস্তিত্বহীন রক্ষাকর্তা শক্তির উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করেন, সেটা কি আপনার মূল্যবান সময় নষ্ট করে না? খাবারে খোঁজে, যুদ্ধে বা লুচচামি করার জন্য কি সময় ভালভাবে অতিবাহিত হয় না?

কিন্তু কল্পকাহিনী আমাদের শুধু বিভিন্ন জিনিস কল্পনা করে নিতেই সমর্থ করেনি, বরং তা অত্যন্ত সংগঠিত উপায়ে করতে সমর্থ করেছে। আমরা বাইবেলিকাল সৃষ্টির গল্প, আদিবাসী অস্ট্রেলিয়ানদের দিবাস্বপ্নের উপকথা, আর আধুনিক রাষ্ট্রের জাতীয়তাবাদী উপকথা তৈরি করতে পারি। সেইরকম উপকথাগুলো বিশাল সংখ্যক স্যাপিয়েন্সকে নমনীয়ভাবে একে অপরের সাথে লেনদেনের অভাবনীয় ক্ষমতা দান করেছে। বিশাল সংখ্যক পিঁপড়া আর মৌমাছিও একসাথে মিলে একসাথে কাজ করতে পারে, আর তারা এটি খুব অনমনীয়ভাবে করে আর করে শুধু নিকট আত্মীয়দের সাথে। নেকড়ে আর শিম্পাঞ্জীরা পিঁপড়ের থেকে এটি অনেক নমনীয়ভাবে করে থাকে, কিন্তু তারা তা করে স্বল্প সংখ্যকভাবে নিজেদের অত্যন্ত ভালভাবে পরিচিতদের সাথে। স্যাপিয়েন্স অত্যন্ত নমনীয় পন্থায় অসংখ্য অপরিচিতদের সাথে সমন্বয় করতে পারে। আর তাই, স্যাপিয়েন্স দুনিয়াকে শাসন করে, যেখানে পিপড়া আমাদের উচ্ছিষ্ট্য খায় আর শিম্পাঞ্জীরা চিড়িয়াখানা আর গবেষণা ল্যাবরেটরীতে আবদ্ধ তাকে।

পিউগটের কিংবদন্তী

আমাদের শিম্পাঞ্জী চাচাতো ভাইবোনরা সাধারণত কয়েক ডজনের ছোট দলে বাস করে। তারা ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব গড়ে তোলে, একসাথে শিকার আর বেবুন, চিতা আর শত্রু শিম্পাঞ্জিদের বিরুদ্ধে কাঁধে কাধ মিলিয়ে লড়াই করে। তাদের সামাজিক কাঠামো আধিপত্য-পরম্পরামূলক হয়ে থাকে। আধিপত্যকারী সদস্য, যে প্রায় সবসময়ই পুরুষ হয়ে থাকে, তাকে বলা হয় ‘আলফা পুরুষ।’ অন্য নারী আর পুরুষেরা আলফা পুরুষের কাছে মাথা ঝুঁকিয়ে নিজেদের আনুগত্য প্রদর্শন করে ঘোঁতঘোঁত শব্দ করে, যার সাথে মানব প্রজার রাজার সামনে ঝুঁকে সম্মান জানানোয় খুব একটা পার্থক্য নেই। আলফা পুরুষ তার নিজের দলে সামাজিক সংহতি বজায় রাখতে প্রাণপণ চেষ্টা করে। যখন দুই শিম্পাঞ্জী লড়াই করে, তখন সে হস্তক্ষেপ করে আর সংঘর্ষ থামিয়ে দেয়। কম উদারতার সাথে, সে হয়তো লুকিয়ে রাখা খাবারে নিজের একাধিপত্ব প্রতিষ্ঠা করতে আর নিচুর-সারির পুরুষদেরকে মেয়েদের সাথে মেলামেশায় দূরে রাখতে পারে।
যখন দুটো পুরুষ আলফা অবস্থানের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে, তারা তা করে দলের মধ্যে সমর্থকদের ব্যাপক জোট গঠন করে, যাতে নারী-পুরুষ উভয়ই থাকে। জোটের সদস্যদের মধ্যে বন্ধন নির্ভর করে প্রতিদিনকার ঘনিষ্ঠ স্পর্শের উপর- আলিঙ্গন করা, স্পর্শ করা, চুমো দেওয়া, দলবাঁধা আর পারস্পারিক আনুকল্য দেওয়া। যেমন করে নির্বাচনী অভিযানে মানব রাজনীতিবিদেরা চারপাশে ঘুরে করমর্দন করেন আর বাচচাদের চুমো খান, আর সেরকমই শিম্পাঞ্জীদের দলে নেতৃত্বাকাংখীরা প্রচুর সময় ব্যায় করে আলিঙ্গন, পিঠ-চাপড়ানো আর শিশু শিম্পাঞ্জীদের চুমো খাওয়াতে। আলফা পুরুষ তার অবস্থা অর্জন করে এজন্য নয় যে সে শারিরীকভাবে শক্তিশালী, বরং এই কারণে যে একটা বিশাল আর স্থায়ী জোটকে নেতৃত্ব দেয়। এইসব জট শুধু আলফা পুরুষ অবস্থানের জন্য সংগ্রামের ক্ষেত্রে মূখ্য ভূমিকা পালন করে না, বরং প্রায় সব দৈনন্দিন কাজেও তা করে থাকে। জোটের সদস্যরা একসাথে বেশি সময় কাটায়, খাবার ভাগ করে নেয়, আর বিপদের সময় একে অপরকে সাহায্য করে।

এই ধরনের দল গঠন আর ধরে রাখার জন্য দলের নির্দিষ্ট আকার রয়েছে। কাজ করার জন্য, দলের সব সদস্যকে একে অপরকে ঘনিষ্ঠভাবে চিনতে হয়। দুইটি শিম্পাঞ্জী যারা কিনা কখনো দেখা-সাক্ষাত করেনি, লড়াই করেনি, আর পারস্পারিক কাজকর্মের অংশ নেয়নি, তারা জানতে পারবে না তারা একে অপরকে বিশ্বাস করতে পারে কিনা, একে অন্যকে সাহায্য করা মূল্যবান কিছু হবে কিনা, আর তাদের মধ্যে কার অবস্থান উঁচুতে। স্বাভাবিক অবস্থায়, একটা সাধারণ শিম্পাঞ্জী দলে বিশ থেকে পনচাশজন থাকে। একটি দলে শিম্পাঞ্জীদের সংখ্যা বাড়তে থাকলে সামাজিক নিয়ম-কানুন শিথিল হয়ে যায়, পরবর্তীতে যা সম্পর্কছেদ আর কিছু অন্য শিম্পাঞ্জীদের দ্বারা নতুন দল গড়ে তোলার দিকে যায়। শুধু কিছু হাতে গোনা যায় এমন কিছু ক্ষেত্রে প্রাণিবিদরা একশজনের বেশি সংখ্যক শিম্পাঞ্জীর দলকে পর্যবেক্ষণ করেছেন। আলাদা দল খুব কমই একে অপরকে সহযোগিতা করে, আর তাদের মধ্যে অনচল আর খাবার নিয়ে প্রতিযোগিতা করতে দেখা যায়। গবেষকরা বিভিন্ন দলের মধ্যে দীর্ঘ যুদ্ধবাজি, এমনকি একটি ক্ষেত্রে ‘গণহত্যা’ প্রত্যক্ষে করেছেন, যেখানে একটি দল সুসংগঠিতভাবে প্রতিবেশী দলের বেশিরভাগকে খুন করে ফেলেছিল।

একইরকম ব্যাপার-স্যাপার সম্ভবত প্রাচীন হোমো স্যাপিয়েন্সসহ প্রথম দিগকার মানুষের সামাজিক জীবন নিয়ন্ত্রণ করেছিল। শিম্পাঞ্জীদের মতোই মানুষেরও সামাজিক প্রবৃত্তি ছিল যা আমাদের পূর্বসূরীদের বন্ধুত্ব আর আধিপত্য-পরম্পরা তৈরি করতে আর একসাথে শিকার আর লড়াই করতে সক্ষম করেছে। কিন্তু, শিম্পাঞ্জিদের সামাজিক প্রবৃত্তির মতোই মানুষেরাও ছোট অন্তরংগ দলের জন্য মানানসই। যখন দলটি সংখ্যায় বেড়ে যায়, এর সামাজিক শৃংখলা শিথিল হয়ে আর দলটি ভেঙ্গে যায়। এমনকি একটি নির্দিষ্ট উর্বর উপত্যকা ৫০০ স্যাপিয়েন্সকে খাওয়াতে পারে, তাই অনেক অপরিচিত লোক যে একসাথে বাস করবে সেই উপায় নেই। কেমন করে তারা একমত হবে যে কে নেতা হবে, কে কোথায় শিকার করবে, অথবা কে কার সাথে মিলিত হবে?

বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লবের উত্থানে, গল্পগুজব হোমো স্যাপিয়েন্সদের বড়সর আর অধিক থিতু দলকে গড়তে সাহায্য করেছে। কিন্তু, এমনকি গল্প-গুজবেরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সামাজিক গবেষণা দেখিয়েছে যে গল্পগুজবের দ্বারা সীমাবদ্ধ দলের সর্বোচচ ‘স্বাভাবিক’ আকার হলো প্রায় ১৫০ জন। বেশিরভাগ লোকই না একে অপরকে জানতে, আর না কার্যকরভাবে গল্পগুজব করতে পারে, ১৫০ জনের বেশি লোকের সাথে।

এমনকি আজকেও, মানবীয় সংগঠনগুলোর জটিল সীমানা কোনো না কোনোভাবে এই জাদুকরী সংখ্যার ভিতরে পড়ে। এই সীমানার নিচে, সম্প্রদায়, ব্যাবসায়, সামাজিক যোগাযোগ আর সামরিক সত্ত্বাগুলো নিজেদেরকে ধরে রাখতে পারে অন্তরং পরিচয় আর গুজবের কারবারের উপর নির্ভর করে। আনুষ্ঠানিক পদ, খেতাব আর আইনের বইয়ের দরকার নেই শৃংখলা ধরে রাখতে। ত্রিশজন সঈনিকের প্লাটুন অথবা একশত সৈন্যের দল ভাল্ভাবে কাজ করতে পারে সর্বনিম্ন পর্যায়ের আনুষ্ঠানিক শৃংখলা নিয়ে অন্তরঙ্গ সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে। একজন সম্মানীয় সার্জেন্ট ‘কোম্পানীর রাজা’ হতে পারে আর এমনকি কমিশনপ্রাপ্ত অফিসারের উপরও কতৃত্ব খাটাতে পারেন। চোট একটা পারিবারিক ব্যাবসায় টিকে থাকতে আর বৃদ্ধি পেতে পারে পরিচালনা পরিষদ, একজন প্রধান নির্বাহী অফিসার বা একটা হিসাবরক্ষণ বিভাগ ছাড়াই।

কিন্তু যখন ১৫০ জনের সীমানা পেরিয়ে যায় ব্যাপার-স্যাপারগুলো সেভাবে কাজ করে না। আপনি হাজার হাজার সঈন্য নিয়ে গড়া একটা ডিভিশন সেইভাবে চালাতে পারবেন না যেভাবে আপনি একটা প্লাটুন চালাতে পারেন। সফল পারিবারিক ব্যবসায়গুলো সাধারণত সংকটে পড়ে যখন সেগুলো বিশাল হয়ে যায় আর অনেক কর্মী নিযুক্ত করে। যদি তারা নিজেদেরকে নতুনভাবে পুনর্গঠন না করতে পারে, তারা বিস্ফোরিত হয়ে যায়।

কেমন করে হোমো স্যাপিয়েন্স এই জটিল সীমানা পার হতে সক্ষম হলো হলো, আর পরবর্তীতে দশ হাজারের মতো লোক নিয়ে শহর আর শত মিলিয়ন মানুষ নিয়ে সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে পারল? এর রহস্য সম্ভবত ছিল কল্পকাহিনীর আবির্ভাবের ভিতর। বিপুল সংখ্যক অপরিচিত একসাথে কাজ করতে পারে সফলভাবে সাধারণ কোনো উপকথায় বিশ্বাস করে। যে কোনো বিশাল আকৃতির মানবীয় সংগঠন – হতে পারে একটা আধুনিক রাষ্ট্র, একটা মধ্যযুগীয় চার্চ, একটা প্রাচীন শহর বা গোত্র – গাঁথা আছে সাধারণ উপকথায় যার বসবাস শুধু মানুষের সম্মিলিত কল্পনাশক্তিতে। চার্চগুলো গ্রথিত সাধারণ ধর্মীয় বিশ্বাসে। দুইজন ক্যাথলিক যারা কখনো একজন আরেকজনের সাথে দেখা করেনি তারা কিন্তু একসাথে ক্রুসেডে যেতে বা হাসপাতাল তৈরি করার জন্য তহবিল সংগ্রহে যেতে পারে কারণ উভয়েই বিশ্বাস করে ইশ্বর মানব শরীরে পুনরুত্থিত হয়েছিলেন আর নিজেকে ক্রুশবিদ্ধ করেছিলেন আমাদের পাপ থেকে মুক্ত করতে। রাষ্ট্রগুলো গ্রথিত হয়েছে সাধারণ জাতীয় উপকথায়। দুইজন সার্ব যারা কখনো একসাথে দেখা করেনি হয়তো একজন আরেকজনকে বাচানোর জন্য জীবনের ঝুঁকি নিতে পারে কারণ উভয়েই সার্বিয়ান রাষ্ট্র, সার্বিয়ান জাতি আর সার্বিয়ান পতাকার অস্তিত্বে বিশ্বাস করে। বিচারিক পদ্ধতি গ্রথিত হয়েছে সাধারণ আইনগত উপকথার উপর ভিত্তি করে। দুইজন আইনজীবি যাদের আগে কখনো দেখাই হয়নি তারা কিন্তু অপরিচিত একজনকে বাচাতে নিজেদের চেষ্টা একজোট করবে কেন না তারা উভয়েই আইন, বিচার, মানবাধিকার – আর ফি হিসেবে আসা অর্থে বিশ্বাস করে।

যদিও এসবের কিছুই সেইসব গল্পের বাইরে অস্তিত্বশীল থাকে না যা লোকজন তৈরি করে আর একে অপরকে বলে। বিশ্বে কোনো ইশ্বর, কোনো জাতি, কোনো অর্থ, কোনো মানবাধিকার, কোনো আইন আর কোনো বিচারের অস্তিত্ব নেই মানুষের সাধারণ কল্পনাশক্তির বাইরে।

লোকজন সহজেই বুঝতে পারে যে ‘প্রাচীনরা’ তাদের সামাজিক বন্ধনকে জোরালো করেছিল ভূত আর আত্মায় বিশ্বাস করে, আর প্রতি পূর্ণিমার রাতে আগুনের চারিদিকে একসাথে দলবেধে নেচে। যা আমরা সাধুবাদ দিতে ব্যর্থ হয়েছি তা হলো আমাদের আধুনিক ইনস্টিটিউশনগুলো একইরকম্ভাবে কাজ করে। উদাহরণ হিসেবে ব্যাবসায়িক কর্পোরেশনগুলোর দুনিয়াটা চিন্তা করুন। আধুনিক ব্যাবসায়ী আর আইনজীবীরা, প্রকৃতপক্ষে, শক্তিশালী সক্রেটিস। তাদের আর গোতীয় শামানের মধ্যে প্রধান পার্থক্য হলো যে আধুনিক আইনজীবীরা আরো অনেক বেশি আজব গল্প বলে। পিউগটের কিংবদন্তী আমাদের ভাল একটা উদাহরণ প্রদান করে।

এটি একটি প্রতীক যা স্ট্যাডেল সিংহ মানবের সাথে মিলে যায়, যেটি কিনা আজকে প্যারিস থেকে সিডনিতে কার, ট্রাক, মোটরসাইকেলে দেখা যায়। এটি পিউগটের তৈরি করা ঢাকনার অলঙ্কার, যে পিউগট ইউরোপের অন্যতন পুরাতন আর বৃহত্তম কারনির্মাতা। পিউগট স্ট্যাডেল গুহার মাত্র ৩০০ কিলোমিটার দূরে ভ্যালেন্টিগনি গ্রামে চোট পারিবারিক ব্যবসা হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল। আজকে কোম্পানীটি সারা দুনিয়ায় ২০০,০০০’র মতো চাকুরে নিযুক্ত করেচ্ছে, যাদের বেশিরভাগই একে অপরের কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত। এই অপরিচিতরা এত কার্যকরীভাবে একে অপরকে সহায়তা করেছিল যে ২০০৮ সালেপিউগট পিউগট ১.৫ মিলিয়নের বেশি মোটরকার উতপাদন করে প্রায় ৫৫ বিলিয়নের মতো ইউরো রাজস্বয়ায় করেছিল।

কোন অর্থে আমরা বলতে পারি যে পিউগট এসএ’র (কোম্পানীর প্রাতিষ্ঠানিক নাম) অস্তিত্ব আছে? অনেক অনেক পিউগট গাড়ি রয়েছে, কিন্তু এগুলো অবশ্যই কোম্পানী নয়। যদি দুনিয়ার প্রত্যেক পিউগট যুগপতভাবে বাতিল হয়ে যায় আর ভাঙ্গারি লোহা হিসেবে বিক্রি করে দেয়া হয়, পিউগট এসএ অদৃশ্য হয়ে যাবে না। এটি নতুন কার উতপাদন চালিয়ে যেতে থাকবে আর বাতসরিক প্রতিবেদন প্রকাশ করতে থাকবে। কোম্পানী কারখানা, যন্ত্রপাতি, শোরুম স্বত্ত্বাধিকার করে, আর মেকানিক, হিসাবরক্ষক, আর সচিব নিযুক্ত করে, কিন্তু এসব মিলেও পিউগট হয় না। কোনো দুর্ঘটনা হয়তো পুইগটের প্রতিটি চাকুরেকে মেরে ফেলতে পারে আর এর সব উতপাদন প্রক্রিয়া আর নির্বাহীদের কার্যালয়কে ধ্বংস করে দিতে পারে। এমনকি, তখনো কোম্পানিটি টাকা ধার করতে, নতুন কর্মী নিযুক্ত করতে, নতুন কারখানা তৈরি করতে আর নতুন যন্ত্রপাতি কিনতে পারবে। পিউগটের ব্যবস্থাপকেরা আর শেয়ারহোল্ডাররা আছেন, কিন্তু তারাও কোম্পানী গঠন করতে পারে না। সব ব্যবস্থাপকদের চাকরিচ্যূত আর সব শেয়ারকে বেঁচে দেয়া হতে পারে, কিন্তু কোম্পানী নিজে তাতেও অক্ষুণ্ন থাকবে।

এটার অর্থ এই নয় যে পিউগট এসএ হলো অভঙ্গুর বা অমর। যদি কোনো বিচারক রায় দেয় কোম্পানিকে ভেঙ্গে দিতে, এটার কারখানাগুলো ডাড়িয়েই থাকবে আর এর কর্মী, হিসাবরক্ষক, ব্যবস্থাপক আর শেয়ারহোল্ডাররা বেঁচে থাকবে – কিন্তু পিউগট এসএ তাতক্ষণিকভাবে অদৃশ্য হয়ে যাবে। সংক্ষেপে, পিউগট এসএ’র বস্তুগত দুনিয়ার সাথে মনে হয় না কোনো সম্পর্ক আছে। আসলেই কি তার কোনো অস্তিত্ব আছে?

পিউগট হল আমাদের সম্মিলিত কল্পনাশক্তির আবিস্কার। আইনজীবীরা একে বলে ‘আইনগত কল্পকাহিনী।’ এটাকে নির্দেশ করা যায় না; এটা কোনো বস্তুগত জিনিস নয়। কিন্তু এটি একটা বৈধ সত্ত্বা হিসেবে টিকে অস্তিত্বশীল থাকে। আপনার বা আমার মতো, এটি যে দেশে পরিচালিত হয়, সে দেশের আইন দ্বারা এটি সীমাবদ্ধ। এটি ব্যাঙ্ক হিসাব খুলতে পারে আর সম্পত্তির মালিকানা ধারণ করতে পারে। এটা কর প্রদান করে, এটাকে জরিমানা বা দণ্ড প্রদান করা যেতে পারে যে ব্যক্তিরা এতে মালিকানায় থাকে বা কাজ করে তাদের থেকে আলাদা করে।

পিউগট আইনগত কল্পকাহিনীর এক বিশেষ জাতে অন্তর্ভুক্ত যাকে বলে ‘সীমাবদ্ধ দায়সম্পন্ন কোম্পানি।’ এই ধরণের কোম্পানির পিছনের চিন্তাটি মানবতার সবচেয়ে বিচক্ষণ উদ্ভাবনের মধ্যে পড়ে। হোমো স্যাপিয়েন্স অজানা সংখ্যক হাজারবর্ষ এটিকে ছাড়া বেছে ছিল। লিপিবদ্ধ হওয়া ইতিহাসের বেশিরভাগ জুড়ে রক্ত মাংসের মানুষেরাই সম্পত্তি অধিকৃত করতে পারত, যারা কিনা দুই পায়ে দাড়াত আর বরসড় একটা মস্তিস্ক যাদের ছিল। যদি তের শতকে ফ্রাঙ্ক জিন একটা ওয়াগন-প্রস্তুতকারী কারখানা স্থাপন করতেন, তাহলে তিনি নিজেই হতেন একটা ব্যবসায়। যদি তার তৈরি করা ওয়াগন সেটি কেনার এক সপ্তাহের মধ্যে ভেঙ্গে যেত, অসন্তুষ্ট ক্রেতা জিনকে ব্যাক্তিগতভাবে জরিম্না করতে পারত। যদি জিন ১,০০০ সোনার মুদ্রা ধার করতেন ব্যবসায় শুরু করার জন্য আর ব্যবসায়টি ব্যর্থ হত, তাকে তার ব্যক্তিগত সম্পত্তি বিক্রি করে ঋণ শোধ করতে হত – তার বাসা, তার গরু, তার জমি। তার এমনকি তার সন্তানদেরকে কাজ করার জন্য বিক্রি করে দিতে হতে পারত। যদি সে ঋণ পরিশোধ করতে অক্ষম হত, তাকে রাষ্ট্র কতৃক জেলে পাঠিয়ে দেয়া হত বা তার পাওনাদাররা তাকে কৃতদাস বানাতে পারত। তিনি নিজেই দায়ী থাকতেন, সীমাহীনভাবে, তার কারখানায় ঘটা সব কৃতকর্মের জন্য।
যদি আপনি সেই সময়ে বাস করতে ফিরে যেতেন, আপনি হয়তো নিজে একটা ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান খোলার আগে দুইবার চিন্তা করতেন। লোকজন ব্যবসায় শুরু করতে আর অর্থনৈতিক ঝুঁকি নিতে ভয় পেত। এরকম কোনো সুযোগ নেয়া খুব কমই মূল্যবান হত যার মাধ্যমে তাদের পরিবারকে নিরুদ্দেশ্যের মধ্যে পরে যেতে হয়।

আর তাই মানুষ সম্মিলিতভাবে সীমাবদ্ধ দায়সম্পন্ন কোম্পানির অস্তিত্ব কল্পনা করতে শুরু করেছিল। সেরকম কোম্পানি যারা সেটিকে প্রতিষ্ঠা করেছে, অথবা সেটিতে অর্থ বিনিয়োগ করেছে,অথবা ব্যবস্থাপনা করেছে, তাদের থেকে আইনগতভাবে স্বাধীন। গত কয়েকশতাব্দি ধরে এরকম কোম্পানী অর্থনৈতিক অঙ্গনে প্রধান খেলয়াড়ে পরিণত হয়েছে, আর আমরা সেগুলতে এত অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি যে আমরা ভুলে যাই যে তাদের অস্তিত্ব আছে শুধু আমাদের কল্পনায়। যুক্তরাষ্ট্রে, একটি সীমাবদ্ধ দায়সম্পন্ন কোম্পানির কৌশলগত নাম হলো ‘কর্পোরেশন’, যেটি আশ্চর্যজনক, কারণ নামটি এসেছে ‘কর্পাস’ (ল্যটিনে যার অর্থ শরীর) থেকে – যে একটি জিনিসের এই কর্পোরেশনের অভাব রয়েছে। তাদের কোনো সত্যিকার শরীর না থাকার পরও আমেরিকান আইনগত ব্যবস্থা কর্পোরেশনকে আইনত একজন ব্যক্তি হিসেবে দেখে, যেন তারা রক্তমাংসের মানুষ।

আর ১৮৯৬ সালে ফরাসি আইনি ব্যবস্থা তাই করেছিল, যখন আরমান্দ পিউগট, যে তার পিতামাতার কাছ থেকে একটা লোহার কাজের কারখানা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিলেন যা কিনা স্প্রিং, করাত,আর বাইসাইকেল তৈরি করত, সেখান থেকে মোটরগাড়ির ব্যবসায়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সেই প্রান্ত থেকে তিনি একটি সীমাবদ্ধ দায়সম্পন্ন কোম্পানী তৈরি করেছিলেন। তিনি নিজের নামে কোম্পানির নাম দিয়েছিলেন, কিন্তু এটা তার থেকে স্বাধীন ছিল। যদি কারগুলোর কোনো একটি ভেঙ্গে পরে, ক্রেতা পিউগটের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারে, কিন্তু আরমান্দ পিউগটকে নয়। যদি কোম্প[আনিটি মিলিয়ন মিলিয়ন ফ্রাঙ্ক ঋণ করে আর তারপর নিঃশেষ হয়ে যায়, আরমান্দ পিউগট তার ঋণদাতাদের কাছে এক পয়সাও দেনাদার থাকেন না। কারণ ঋণটি দেয়া হয়েছিল পিউগটকে, হোমো স্যাপিয়েন্স আরমান্দ পিউগটকে নয়। আরমান্দ পিউগট ১৯১৫ সালে মারা গিয়েছিলেন, কোম্পানিটি এখনো বেঁচে আছে এবং ভাল করছে।

আসলে কেমন করে আরমান্দ পিউগট মানুষটি পিউগট কম্পানিটি সৃষ্টি করেছিলেন? সেভাবেই যেভাবে ইতিহাসজুড়ে পাদ্রী আর জাদুকরেরা দেবতা আর দৈত্যদের সৃষ্টি করেছিল, আর যেভাবে হাজার হাজার ফরাসি কুরি পায়রিসের চার্চে প্রতি রোববার এখনো খ্রিষ্টের দেহ সৃষ্টি করে যাচ্ছে। এসবই লোকদের গল্প বলা আর তা বিশ্বাস করতে রাজি করানোকে ঘিরে উদ্ভাবিত হয়েছে। ফরাসি কুরিদের ক্ষেত্রে গুরুত্বপুর্ণ গল্প ছিল খ্রিষ্ট্রের জীবন আর মৃত্যু যেমনটা বলেছিল ক্যাথলিক চার্চ। এই গল্প অনুসারে, যদি একজন পাদ্রী সৌম্যভাবে পবিত্র পোশাক পরে সঠিক সময়ে সঠিক কথাটি বলে, শুকনো রুটি আর ওয়াইন পরিণত হয় ইশ্বরের মাংস আর রক্তে। পাদ্রী উচচস্বরে বলেন, ‘হোক এস্ত কর্পাস মিউম!’ (‘এই শরীর আমার’র ল্যাটিন) আর হোকাস পকাস – রুটি পরিণত হয় ইশ্বরের মাংসে। এটি দেখে পাদ্রী সঠিক আর গভীরভাবে সকল প্রক্রিয়াকে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন, আর মিলিয়ন মিলিয়ন অনুগত ফরাসি ক্যাথলিক এমনভাবে আচরণ দেখিয়েছিল ইশ্বর ইশ্বর পবিত্র রুটি আর ওয়াইনে অস্তিত্বশীল আছেন।

পিউগট এসএ’র ক্ষেত্রে গুরুত্বপুর্ণ গল্প ছিল ফরাসি আইনের ধারাগুলো , যেভাবে ফরাসি আইনসভা লিখেছিল। ফরাসি আইন অনুসারে, যদি একজন সনদপ্রাপ্ত আইনজীবী যদি সব গণ-প্রার্থনা সংক্রান্ত বিষয়াবলী আর রীতিনীতি অনুসরণ করেন, একটি চমৎকারভাবে সাজানো কাগজের টুকরোয় সব প্রয়োজনীয় মন্ত্র আর শপথ লেখেন, আর নথিপত্রের নিচে তার অলঙ্কারিক স্বাক্ষর দেন, তখন হোকাস পোকাসের সাথে একটা নতুন কোম্পানী জন্ম নেবে। যখন ১৮৯৬’তে আরমান্দ পিউগট তার কোম্পানী গঠন করতে চেয়েছিলেন, তিনি একজন আইননীবীকে ভাড়া করেছিলেন এইসব পবিত্র প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়ে যাওয়ার জন্য। যখনি আইনজীবী সকক সঠিক রীতিনীতি পালন করেছিলেন আর সকল প্রয়োজনিয় মন্ত্র আর শপথ আওড়িয়েছিলেন, মিলিয়ন সংখ্যক অভিজাত ফরাসি নাগরিক এমনভাবে প্রতিক্রিয়া দেখহিয়েছিলেন যেন পিউগট কোম্পানী আসলেই অস্তিত্বশীল ছিল।

কার্যকর গল্প বলা সহজ নয়। সমস্যা গল্প বলায় ছিল না, কিন্তু তা ছিল সবাইকে তা বিশ্বাস করতে রাজি করানোতে। ইতিহাসের অনেকটাই এই প্রশ্নকে ঘিরে উদ্ভাবিতঃ কেমন করে একজন মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষকে দেবতা, বা জাতি, বা সীমাবদ্ধ দায়সম্পন্ন কোম্পানীতে বিশ্বাস ক্রতে রাজি করায়? কিন্তু, যখন এটি সফল হয়, তখন তা স্যাপিয়েনকে বিপুল ক্ষমতা দান করে, কারণ এটা লক্ষ লক্ষ অপরিচিত লোককে নির্দিষ্ট লক্ষ্যের জন্য সহযোগিতা আর একসাথে কাজ করতে সমর্থ করে। চিন্তা করতে চেষ্টা করুন এটা কতটা কঠিন হত রাষ্ট্র, বা চার্চ, বা আইনগত ব্যবস্থা তৈরি করা যদি আমরা নদী, গাছ আর সিংহ’র মতো যে সকল জিনিসের অস্তিত্ব আছে, সেইসব নিয়ে কথা বলতাম।

বছরের পর বছহর ধরে, মানুষ গল্পের অবিশ্বাস্য জটিল সংযোগ গ্রথিত করেছে। এই সংযোগের ভিতর, পিউগটের মতো কল্পকাহিনি শুধু অস্তিত্বশীলই নয়, বরং বিপুল শক্তি সংগ্রহ ককরেছে। এই গল্পের সংযোগের মাধ্যমে মানুষ যে জিনিস তৈরি করেছে তা প্রাতিষ্ঠানিক পরিবৃত্তে পরিচিত ‘কল্পকাহিনী’, ‘সামাজিক নির্মাণ’, বা ‘কাল্পনিক বাস্তবতা’ নামে। একটা কাল্পনিক বাস্তবতা মিথ্যে কিছু নয়। আমি মিথ্যে বলি যখন আমি বলি বলি যে নদীর ধারে একটা সিংহ আছে যখন কিনা আমি ভালভাবেই জানি যে সেখানে কোনো সিংহ নেই। মিথ্যের মধ্যে কোনো বিশেষত্ব নেই। সবুজ বানর আর শিম্পাঞ্জিরা মিথ্যে বলতে পারে। উদাহরণস্বরুপ, একটা সবুজ বানরকে দেখা গিয়েছিল ‘সাবধান! একটা সিংহ! ডাক দিতে যখন আশেপাশে কোনো সিংহ ছিল না। এই সতর্ক সংকেত তার এক সহ-বানরকে ভীত করে দিয়েছিল যে কেবলই একটা কলা খুঁজে পেয়েছিল, আর সে তার কলাটিকে ফেলে রেখেছিল মিথ্যবাদীটার জন্যই তার মিথ্যের পুরস্কার হিসেবে।

মিথ্যার থেকে আলাদাভাবে একটা কাল্পনিক বাস্তবতা হলো এমন কিছু যা সবাই বিশ্বাস করে, আর যতক্ষণ পর্যন্ত এই সাম্প্রদায়িক বিশ্বাস ক্রিয়াশীল থাকে, কাল্পনিক বাস্তবতা দুনিয়ায় তার শক্তি দেখিয়ে দেয়। স্ট্যাডেল গুহার ভাস্কর হয়তো সত্যিকারভাবে সিংহ-মানব রক্ষাকর্তা শক্তিতে বিশ্বাস করেছিল। কিছু জাদুকর হলো প্রতারক, কিন্তু তারা সবচেয়ে সত্যিক্রভাবে দেবতা আর দৈত্যের গল্প বিশ্বাস করে। বেশিরভাগ কোটিপতিই নির্ভেজালভাবে অর্থ আর সীমাবদ্ধ দায়সম্পন কোম্পানির অস্তিত্বে বিশ্বাস করে। বেশিরভাগ মানবাধিকার কর্মী মানবাধিকারের অস্তিত্বে বিশ্বাস করে। কেউই মিথ্যে বলেনি যখন, ২০১১ সালে, জাতিসংঘ লিবিয়ান সরকারের কাছে তার নাগরিকদের মানবাধিকারকে সম্মান জানানোর আহবান জানিয়েছিল, যদিও জাতিসংঘ, লিবিয়া আর মানবাধিকার- সবই আমাদের উর্বর কল্পনার ফসলমাত্র।

তখন থেকেই বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লবের সময় থেকে স্যাপিয়েন্স এইভাবে দ্বৈত বাস্তবতায় বসবাস করে আসছে। একদিকে, নদী, গাছ আর সিংহের বস্তুগত বাস্তবতা; অপরদিকে, দেবতা, জাতি আর কর্পোরেশনের কাল্পনিক বাস্তবতা। সময়ের পরিক্রমার সাথে সাথেই কাল্পনিক বাস্তবতা এমনকি বেশি শক্তিশালী হয়ে পড়েছে, আর তাই আজকে নদী, গাছ আর সিংহের বেঁচে থাকা ব্যাপার যুক্তরাষ্ট্র আর গুগলের মতো কাল্পনিক অস্তিত্বের দয়ার উপর নির্ভর করে।

জিনকে অতিক্রম করে

দুনিয়ার বাইরের কাল্পনিক বাস্তবতা সৃষ্টি করার ক্ষমতা বিপুল সংক্যক অপরিচিত মানুষকে একসাথে কার্যকরভাবে সহযোগিতা করতে সামর্থ্যবান করেছে। কিন্তু, এটা তার থেকেও বেশি কিছু করেছে। যেহেতু বড়-আকারের মানব সহযোগিতা উপকথার উপর ভিত্তি করে আছে, যেভাবে মানুষ একে অপরকে সহায়তা করে তা পরিবর্তন করা যেতে পারে তার উপকথাগুলোকে পরিবর্তন করে – বিভিন্ন ধরণের গল্প করে। সঠিক পরিবেশ-পরিস্থিতিতে উপকথা দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে। ১৭৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লব একরাতের মধ্যেই রাজার স্বর্গীয় অধিকারের উপকথা থেকে জনগনের সার্বভৌমত্বে বিশ্বাসের উপকথাতে পরিবর্তিত হয়েছিল। যুগপতভাবে, বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লবের সময়কাল থেকে হোমো স্যাপিয়েন্স তার আচার-ব্যবহারকে দ্রুত সংশধন করে নিতে পারে পরিবর্তিত প্রয়োজন অনুযায়ী। এটি সাংস্কৃতিক বিবর্তনের দ্রুতগামী রাস্তা খুলে দিয়েছিল, জেনেটিক বিবর্তনের ত্র্যাফিক জামকে অতিক্রম করে। এই দ্রুতগামী রাস্তা দিয়ে গতিতে অগ্রসর হয়ে, হোমো স্যাপিয়েন্স অন্য সব মানুষ আর প্রাণী প্রজাতিকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে তার সহযোগিতা করার সক্ষমতার দিক থেকে।

অন্যান্য সামাজিক প্রাণীর আচার-ব্যবহার বিরাট পরিমাণে তাদের ডিএনএ দ্বারা নির্ধারিত হয়ে থাকে। ডিএনএ কোনো একক নিয়ন্ত্রক নয়। প্রাণীদের আচরণ পরিবেশের বিষয়াবলী আর ব্যক্তিগত বৈশিষ্টের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে থাকে। কিন্তু, একই ধরণের পরিবেশে একই প্রজাতির প্রাণীর একইভাবে আচরণ প্রদর্শন করার কথা। সামাজিক আচরনে বর ধরণের পরিবর্তন ঘটবে না, সাধারণভাবে, জেনেটিক রুপান্তর ছাড়া। উদাহরণস্বরুপ, সাধারন শিম্পাঞ্জীদের একজন আলফা পুরুষ্কতৃক নেতৃত্বাধীন একটা আধিপত্য-পরম্পরার দলে বাস করার জেনেটিক মনোবৃত্তি রয়েছে। শিম্পাঞ্জীর কাছাকাছি প্রজাতি বেবুনের দলের সদস্যরা সাধারণত মেয়েদের জোটাধীন বেশি সমঅধিকারভিত্তিক দলে বাস করে। সাধারণ মেয়ে শিম্পাঞ্জীরা তাদের বনবো আত্মিয়দের থেকে শিক্ষা নিয়ে একটা নারীবাদী বিপ্লব ঘটাতে পারে না। উরুষ শিম্পাঞ্জীরা কোনো সাংবিধানিক আইনসভায় একসাথে হয়ে আলফাপুরুষের কার্যালয় ভেঙ্গে দিয়ে ঘষণা করতে পারে না যে এখন থেকে সব শিম্পাঞ্জীকেই সমানভাবে দেখা হবে। সেরকম নাটকীয় আচ্রণগত পরিবর্তন আসবে যদি শিম্পাঞ্জীদের দিএনএ’তে কিছু পরিবর্তন এসে যায়।

একই কারণে, প্রাচীন মানুষেরা কোনো বিপ্লব শুরু করতে পারেনি। যতটুকু আমরা বলতে পারি, সামাজিক কাঠামোতে পরিবর্তন, নতুন প্রযুক্তির আবিস্কার আর অজানা বাসস্থানে থিতু হওয়া এসেছে সাংস্কৃতিক উদ্যোগের চেয়ে জেনেটিক রুপান্তর আর পরিবেশগত চাপের কারণে। আর তাই মানুষের এইসকল ধাপ দিতে শত হাজার বছর লেগেছে। দুই মিলিয়ন বছর আগে জেনেটিক রুপান্তর ফলাফল লাভ করেছিল হোমো ইরেক্টাস নামে নতুন মানব প্রজাতির আগমনের মধ্য দিয়ে। এটির উদ্ভবের সাথে সঙ্গী হয়েছিল নতুন পাথরের হাতিয়ারের প্রযুক্তি, যেটি এখন এই প্রজাতির নির্ণায়ক বঈশিষ্ট হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। যতক্ষণ পর্যন্ত হোমো ইরেক্টাস পরবর্তী জেনেটিক বদলের মধ্য দিয়ে যায়নি, এতির পাথরের হাতিয়ার একইরকম ছিল – প্রায় ২ মিলিয়ন বছর ধরে।

বিপরীতে, বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লবের সময়কাল থেকে, স্যাপিয়েন্স দ্রুত তাদের আচরণ পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়েছিল, কোনো ধরনের জিনগত বা পরিবেশগত পরিবর্তন ছাড়াই নতুন আচরণ পরবর্তী প্রজন্মে পরিবাহিত করে। জ্বলজ্যান্ত উদাহরণ হিসেবে, ক্যাথলিক পাদ্রীত্ব, বুদ্ধদের সন্নাস-রীতি আর চাইনিজ খোজা আমলাতন্ত্র মতো সন্তানহীন অভিজাতদের পুনঃপুন আগমণকে বিবেচনা করুন। এই ধরনের অভিজাতদের অস্তিত্ব প্রাকৃতিক নির্বাচনের সবচেয়ে মৌলিক নীতিমালার বিরুদ্ধে যায়, যেহেতু সমাজের এই প্রভাবশালী সদস্যরা ইচ্চাকৃতভাবে প্রজননকে পরিত্যাগ করে। যেখানে আলফা শিম্পাঞ্জী তার ক্ষমতাকে ব্যবহার করে যত বেশি সম্ভব মেয়ের সাথে যৌনমিলন করে – আর যুগপতভাবে তাদের দলের তরুণদের একতা বড় অংশকে জন্মদান করে – সেখানে ক্যাথলিক আলফা পুরুষ যৌনমিলন আর সন্তান লালন-পালন থেকে পুরোপুরি বিরত থাকে। এই নিবৃত্ত থাকা খাধ্যের সংকট বা সম্ভাবনাময় সঙ্গীর অভাবের মতো অনন্য পারিপার্শ্বিক অবস্থার কারণে হয়নি। আর না এটি কোনো হাতুড়ে জেনেটিক রুপান্তরের ফলাফল। ক্যাথলিক চার্চ শতাব্দীর পর শতাব্দী টিকে থেকেছে, এক পোপ থেকে আরেকজনের উপর ‘কৌমার্য-ব্রতের জিন’ স্থানান্তর করে নয়, বরং নিউ টেস্তামেন্টের গল্প আর ক্যাথলিক গির্জার আইনকানুন স্থানান্তর করে।

অন্যভাবে বলতে গেলে, যেখানে প্রাচীন মানুষের আচরণ দশ হাজার বচর ধরে একইরকম ছিল, স্যাপিয়েনস্রা তাদের সামাজিক কাঠামো, ব্যাক্তিগত সম্পর্কের প্রকৃতি, তাদের অর্থনঈতিক কার্যকলাপ আর এরকম আরো অন্যান্য আচরণ স্থানান্তর করতেপারে এক বা দুই দশকের মধ্যেই। একজন বার্লিনের অধিবাসীর কথা চিন্তা করুন যিনি ১৯০০ সালে জন্ম নিয়েছিলেন এবং আর একশত বছরের চূরান্ত সময়কাল পর্যন্ত বেঁচেছিলেন। তিনি তার শঈশব কাটিয়েছিলেন উইলহেম দ্বিতীয়ের সাম্রাজ্যে হোহেনজোলার্নে; তার প্রাপ্তবয়স্ক সময়কাল ওয়েইমার প্রজাতন্ত্র, নাতসী তৃতীয় রাইখ আর সমাজতান্ত্রিক পূর্ব জার্মানীতে কাটিয়েছিলেন; আর তিনি গণতান্ত্রিকার পুনঃএকত্রিত জার্মানীতে মারা গিয়েছিলেন। তিনি পাচটি খুব ভিন্ন আধিউনিক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছিলেন, যদিও তার ডিএনএ ঠিক একইরম রয়ে গিয়েছিল।

এটিই ছিল স্যাপিয়েন্সের সাফল্যের চাবিকাঠি। একটি একের সাথে আরেকজনের যুদ্ধে একজন নিয়ান্ডারথাল সম্ভবত একজন স্যাপিয়েন্সকে হারিয়ে দিয়ে থাকবে। কিন্তু, শতশত লোকের যুদ্ধে নিয়ান্ডারথালের কোনো সুযোগই ছিল না। নিয়ান্ডারথল সিংহ সম্পর্কে আদ্যোপান্ত জানাতে পারত, কিন্তু তারা সম্ভবত বলতে – আর পুনর্ব্যক্ত করতে পারত না – গোত্রীয় অনুভুতি নিয়ে কোনো গল্প। কোনো কল্পকাহিনী তৈরি করার যোগ্যতা না থাকায়, নিয়ান্ডারথালরা বিপুল সংখ্যায় একে অপরকে সহযোগিতা করতে অক্ষম ছিল, আর না তারা তারা সামাজিক আচরণকে দ্রুত পরিবর্তনশীল চ্যালেঞ্জের সাথে মানাতে পারত।

যেহেতু আমরা কোনো নিয়ান্ডারথালের মনের ভিতরে যেতে পারব না তারা কিভাবে চিন্তা করত তা বোঝার জন্য, আমাদের কাছে বরং তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী স্যাপিয়েনসের তুলনায় তাদের অবধারনের সীমানার পরোক্ষ প্রমাণ রয়েছে। ইউরোপের কেন্দ্রে ৩০,০০০ বছরের পুরনো স্যাপিয়েনসের বিচরণভূমি খনন করতে গিয়ে প্রত্নতাত্মিকেরা সেখানে প্রায়ই ভূমধ্যসাগর আর আটলান্টিক উপকূলের সামুদ্রিক ঝিনুকের সন্ধান পেয়েছিলেন। যেটা হয়েছিল, তা হচ্ছে এই ঝিনুক বা কড়িগুলো মহাদেশীয় প্রান্ত ধরে স্যাপিয়েন্সদের বিভিন্ন দলের কাছে দূর-বাণিজ্যের উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হত। নিয়ান্ডারথালদের বিচরণভূমিতেসেরকমকোনো বাণিজ্যের প্রমাণের অভাব রয়েছে। প্রতিটি দলই স্থানীয়ভাবে প্রাপ্ত উপকরণ দিয়ে নিজস্ব জিনিসপত্র তৈরি করত।

আরেকটি উদাহরণ আসে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে। নিউ গিনির উত্তরে নিউ আয়ারল্যান্ডের দ্বীপগুলোতে বাস করা স্যাপিয়েনসের দলগুলো আগ্নেয় শিলা নামে একটা আগ্নেয়গিরি-নি;সৃত কাঁচ দিয়ে বিশেষভাবে শক্তিশালী আর ধারালো হাতিয়ার তৈরি করত। কিন্তু, নিউ আয়ারল্যান্ডের অবসিডিয়ানের কোনো প্রাকৃতিক ভান্ডার ছিল না। গবেশণাগারের পরীক্ষা প্রকাশ করেছে যে তাদের ব্যবহার করা আগ্নেয় শিলা ৪০০ কিলোমিটার দূরের দ্বীপ নিউ ব্রিটেনের ভান্ডার থেকে আনা হত। এইসব দ্বীপের কিছু অধীবাসী অবশ্যই দক্ষ নাবিক ছিল যারা দির্ঘ দূরত্বে দ্বীপ থেকে দ্বীপে বাণিজ্য করত।

বাণিজ্যকে মনে হগতে পারে খুব বাস্তবসম্মতো কাজকর্ম, যেটির কনোকাল্পনিক ভিত্তির দরকার নেই। কিন্তু সত্য হলো এই যে স্যাপিয়েন্স ছাড়া আর কোনো প্রাণী বাণিজ্যে যুক্ত হয় না, আর সবগুলো স্যাপিয়েনসের বাণিজ্য সংযোগ যাদের সম্পর্কে আমাদের বিস্তারিত প্রমাণ আছে তা ছিল কল্পনারুপর ভিত্তি করে। বাণিজ্য বিশ্বাস ছাড়া টিকে থাকতে পারে না, আর অপরিচিতদের বিশ্বাস করা খুব কঠিন। আজকের বৈশ্বিক বাণিজ্যের সংযোগ ডলার, ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাঙ্ক, আর কর্পোরেশনের টোটেমিক ট্রেডমার্কের মতো কাল্পনিক সত্ত্বার উপর আমাদের বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত।যখন একটি গোত্রীয় সমাজের দুজন অপরিচিত লোক বাণিজ্য করতে যেত, তখন তারা প্রায়ই বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করত একজন সাধারণ ইশ্বর, উপকথার অঊর্বপুরুষ বা টোটেমিক প্রাণীর আবেদনের মাধ্যমে।
যদি সেরকম কল্পকাহিনীতে বিশ্বাস করা প্রাচীন স্যাপিয়েন্সরা ঝিনুক আর কালো রঙের আগ্নেয় শিলার মাধ্যমে বাণিজ্য করে থাকে, এটা বলাই যায় যে তারা তথ্যও লেনদেন করেছিল, আর সেভাবে অনেক বেশি ঘন আর প্রশস্ত জ্ঞানের সংযোগ সৃষ্টি করেছিল নিয়ান্ডারথাল আর অন্যান্য প্রাচীন মানুষের চেয়ে।

শিকার করার কৌশল এই পার্থক্যের আরেকটি ব্যাপার তুলেধরে। নিয়ান্ডারথাল সাধারণত একা বা ছোট দলে শিকার করত। অন্যদিকে, স্যাপিয়েনস্রা এমন কঊশলের উদ্ভাবন করেছিল যা অনেক ব্যাক্তির মধ্যে সহযোগিতার উপর নির্ভর করত, এবং তা হতো এমনকি বিভিন্ন দলের ভিতরেও। একটি বিশেষ কার্যকরী পদ্ধতি ছিল কোনো এক পুরো প্রাণীর, যেমন বুনো ঘোড়ার, দলকে পুরোপুরি ঘিরে ফেলা আর কাছ থেকে তাদের ধাওয়া করা, যেখানে তাদের বেশি পরিমাণে শিকার করা সম্ভব হত। যদি সব পরিকল্পনামাফিক হত, দলটি সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি নির্দিষ্ট বিকেলে টনকে টন মাংস, চর্বি আর চামড়া সংগ্রহ করতে পারত, আর হয় তারা এই সম্পদগুলো ব্যাপক পরিমাণে হজম করতে পারত, অথবা সেগুলোকে শুকাতে, পড়াতে বা হিমায়িত করতে পারত পরবর্তী ব্যবহারের জন্য। প্রত্নতত্মবিদেরা এরকম কিছু অবস্থান আবিস্কার করেছেন যেখানে পুরো পশুর পালকে এভাবে বার্ষিকভাবে জবাই করা হত। এমনকি এমন অবস্থানও পাওয়া গেছে যেখানে বেড়া আর বাঁধা তোলা হয়েছিল কৃত্রিম ফাঁদ আর জবাইয়ের ক্ষেত্র তৈরি করতে।

আমরা পূর্বানুমান করতে পারি যে নিয়ান্দারথালরা তাদের ঐতিহ্যগত শিকারের ক্ষেত্রটিকে স্যপাইয়েনসদের নিয়ন্ত্রিত কসাইখানায় পরিণত হতে দেখতে পেয়ে সন্তুষ্টি ছিল না। কিন্তু, যদি দুটি প্রজাতির মধ্যে সংঘর্ষ লেগে যেত, নিয়ান্ডারথালরা বুনো ঘোড়ার থেকে ভাল অবস্থানে থাকত না। গতবাধা আর ধীরগতিতে কাজ করা পনচাশজন নিয়ান্ডারথাল ৫০০ বৈচিত্রসম্পন্ন আর উদ্ভাবনী স্যাপিয়েনসের জন্য কোনোমতেই যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না। এমনকি যদি স্যাপিয়েনস্রা প্রথমবার হেরেও যেত, তারা দ্রুত নতুন কিছু পদ্ধতি বের করে ফেলত, যা তাদের পরের বার বিজয়ী করতে সক্ষম করত।

বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লবে কি ঘটেছিল?

নতুন ক্ষমতা বিশদ ফলাফল
হোমো স্যাপিয়েনসের চারপাশের দুনিয়া সম্মন্ধে বিপুল পরিমাণে তথ্য সনচারিত করার ক্ষমতা জটিল কাজকর্মের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন, যেমন সিংহ থেকে দূরে থাকা আর বাইসন শিকার করা
স্যাপিয়েন্সদের সামাজিক সম্পর্ক সম্মন্ধে বিপুল পরিমাণে তথ্য সনচারিত করার ক্ষমতা বৃহত্তর আর শৃংখলাবদ্ধ দলে, যার সংখ্যা ছিল ১৫০ পর্যন্ত
যে জিনিসের অস্তিত্ব আসলে নেই সেই জিনিস সম্মন্ধে তথ্য সনচারিত করার ক্ষমতা, যেমন গোত্রীয় অনুভূতি, জাতি, সীমাবদ্ধ দায়সম্পন্ন কোম্পানি আর মানবাধিকার

ক. বিশাল সংখ্যক অপরিচিতের মধ্যে সহযোগিতা

খ. সামাজিক আচরণের দ্রুত উদ্ভাবন

ইতিহাস আর জীববিদ্যা

স্যাপিয়েনসের উদ্ভাবন করা কল্পকাহিনীর বিশাল বৈচিত্র, আর তার ফলাফলে হওয়া আচরণগত কাঠামোর বৈচিত্র হলো যাকে আমরা ‘সংস্কৃতি’ বলি তার প্রধা উপাদান। যখনি সংস্কৃতির উদ্ভব হলো, সেটি কখনো পরিবর্তন বা উন্নিতকরণের পথে থেমে যায়নি, আর এই বিরতিহীন পরিবর্তনকে আমরা বলি ‘ইতিহাস।’

বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লবই হলো আসল সেই নির্দেশক যখন ইতিহাস জীববিদ্যা থেকে তার স্বাদীনতা ঘোষণা করেছিল। বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লবের আগ পর্যন্ত, সব মানব প্রজাতির কাজকর্ম জীববিদ্যার রাজ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল, অথবা, আপনি বলতে পারেন একে ‘প্রাক-ইতিহাস (আমি ‘প্রাক-ইতিহাস’ শব্দটি এড়িয়ে যেতে চাই, কেন না এটা ভুলভাবে দেখিয়ে দেয় যে এমনকি বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লবের আগে মানুষের একটা নিজস্ব শ্রেণিবিভাগ ছিল)। বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লব থেকে সামনের দিকে এগোলে ইতিহাসের আখ্যান হোমো স্যাপিয়েনসের উন্নতির ব্যাখ্যাদানের প্রাথমিক উপায় হিসেবে শারিরীক তত্ত্বের স্থান দখল করে। ক্রিশ্চিয়ানিটি বা ফরাসি বিপ্লবের উত্থান বুঝতে জিন, হরমোন আর প্রাণীসত্তাকে বোঝাই যথেষ্ট নয়। আইডিয়া, চিত্রকল্প আর কল্পনাকেও হিসেবে নেয়া গুরুত্বপুর্ণ।

এর অর্থ এই নয় যে হোমো স্যাপিয়েন্স আর মানব সংস্কৃতি শারিরীক নিয়ম-কানুন থেকে বাদ পরে গিয়েছিল। আমরা এখনো প্রাণী, আর আমাদের শারিরীক, আবেগগত আর বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতাগুলো এখনো আমাদের দডিএনএ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। নিয়ান্ডারথাল বা শিম্পাঞ্জীরা যে নির্মাণ কাঠামো থেকে তৈরি, আমাদের সামাজিক কাঠামোও সেখান থেকে তৈরি, আর যতই আমরা এই নির্মাণ কাঠামোকে – বোধশক্তি, আবেগ, পারিবারিক বন্ধনকে পরীক্ষা-নিরিক্ষা করব – ততই আমরা আমাদের আর অন্যান্য এপের থেকে কম পার্থক্য খুঁজে পাব।

কিন্তু, ব্যক্তিগত বা পারিবারিক পর্যায়ে পার্থক্য খোজা একতা ভুল কাজ। একের সাথে এক, বা দশের সাথে দশ তুলনাকরলে আমরা বিব্রতকরভাবে শিম্পাঞ্জীদের সমান। গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য উদয় হতে শুরু করে যখন আমরা ১৫০ জনের সীমারেখা পার হতে শুরু করি, আরামরা যখন ১,০০০-২,০০০০ জনের সংখ্যায় পৌছে যাই, পার্থক্যটা তখন হয় বিস্ময়কর। আপনি যদি হাজার হাজার শিম্পাঞ্জীকে তিয়েন আনমেন স্কয়ার, ওয়াল স্ট্রীট, ভ্যাটিকান অথবা জাতিসংঘের সদর দপ্তরে একসাথে নিয়ে আসেন, তাহলে ফলাফল হবে হৈ চৈ পূর্ণ অস্বাভাবিক বিচ্চৃংখলা। বিপরীতভাবে, স্যাপিয়েন্স এসব স্থানে নিয়মিত একসাথে হয় হাজারে হাজারে। একসাথে তারা শৃংখলাপূর্ণ কাঠামো তৈরি করে – যেমন বাণিজ্য সংযোগ, গণ উদযাপন আর রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানসমূহ – যা তারা আলাদা হয়ে কখনো তৈরি করতে পারত না। আমাদের আর শিম্পাঞ্জিদের মধ্যকার প্রধান পার্থক্য হলো উপকথার আঠাটি আমাদের বিপুল সংক্যক ব্যক্তি, পরিবার আর দলকে একসাথে জড়া লাগিয়ে রাখে। এই আঠাটি আমাদের সৃষ্টির প্রভু বানিয়ে দিয়েছে।

অবশ্যই আমাদের অন্যান্য দক্ষতারও প্রয়োজন ছিল, যেমন হাতিয়ার বানানো আর ব্যবহার করার ক্ষমতা। তারপরও হাতিয়ার তৈরির খুব ক্ষুদ্র উপযোগিতা আছে যতক্ষণ পর্যন্ত না এর সাথে অনেকের সাথে মিলে সহযোগিতার সক্ষমতা তৈরি হয়। এতা কেমন যে আজ আমাদের নিউক্লিয়ার যুদ্ধাস্ত্র সম্বলিত অন্তমহাদেশিয় ক্ষেপনাস্ত্র আছে, যেখানে আজ থেকে ৩০,০০০ বছর আগে আমাদের শুধু চকমকি পাথরের বর্শাযুক্ত লাঠিই ছিল? শারিরীকভাবে গত ৩০,০০০ বছরে আমাদের হাতিয়ার তৈরির সামর্থ্যে গুরুত্বপূর্ণ কোনো উন্নতি হয়নি। আলবার্ট আইনস্টাইন একজন প্রাচীন শিকারি সংগ্রাহকের থেকে তার হাতের দিক থেকে অনেক কম পারদর্শী ছিলেন। কিন্তু, বিপুল সংখ্যক অপরিচিতের সাথে আমাদের সহযোগিতা করার ক্ষমতার নাটকিয় উন্নতি ঘটেছে। প্রাচীন চকমকি পাথরের বর্শা কয়েক মিনিটের মধ্যেই একজন লোক কতৃক তঈরি হতে পারত, যে তার কিছু অন্তরং বন্ধুর পরামর্শ আর সাহায্যের উপর নির্ভর করত। আধুনিক নিউক্লিয়ার যুদ্ধাস্ত্র তৈরির জন্য পৃথিবীর সর্বত্র কয়েক মিলিয়ন অপরিচিত লোকের সহায়তার প্রয়োজন হয় – কর্মীরা যারা মাটির গভীরে খনি থেকে ইউরেনিয়াম আকরিক সংগ্রহ করে তাদের থেকে শুরু করে তাত্ত্বিয় পদার্থবিদ যারা প্রমাণু কণার অত্নক্রিয়াকে বর্ণনা করে লম্বা গাণিতিক ফর্মূলা লেখেন তারা পর্যন্ত।
বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লবের পর জিববিদ্যা আর ইতিহাসের সম্পর্ককে সংক্ষেপে বলতে গেলেঃ

ক. জীববিদ্যা হোমো স্যাপিয়েনসের আচরণ আর সামর্থ্যের মৌলিক মাত্রা ঠিক করে দেয়। ইতিহাসের সবটুকুই ঘটে জীববিদ্যার সীমানার ভিতরেই।

খ. কিন্তু, এই ক্ষেত্রটি অভাবনীয়ভাবে বিশাল, যা স্যাপিয়েন্সকে একটা বিস্ময়কর বৈচিত্রের খেলা খেলার সুযগ করে দেয়। তাদের কল্পকাহিনী উদ্ভাবনের ক্ষমতার কারণে, স্যাপিয়েন্স অনেক অনেক বেশি জটিল খেলা তৈরি করতে পারে, যেটি প্রতিটি প্রজন্ম উন্নয়ন ঘটায় আর আরো সামনের দিকে নিয়ে যায়।

গ. যুগপতভাবে, স্যাপিয়েন্স কিভাবে আচরণ করে সেটা বোঝার জন্য, আমাদের অবশ্যই তাদের কাজকর্মের অঈতিহাসিক বিবর্তনের বর্ণনা দিতে হবে। শুধুমাত্র শারিরীক সীমাবদ্ধতাকে দেখাতে গেলে তাহবে একজন রেডিও ক্রীড়া ধারাভাষ্যকারের মতো যে বিশ্বকাপ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশীপে উপস্থিত থেকে তার শ্রোতাদের শুধু খেলার মাথেরই বিশদ বর্ণনা দেয়, খেলোয়াড়েরা কি করছে তার বদলে।

আমাদের পাথর যুগের পুর্বসূরীরা ইতিহাসের ক্ষেত্রে কি খেলা খেলেছে? যতদুর আমরা জানি, ৩০,০০০ বছর আগে যে মানুষটি স্ট্যাডেল সিংহ-মানব খদাই করেছিল, তার আমাদের মতোই শারিরীক, আবেগগত আর বুদ্ধিবৃত্তিক সামর্থ্য ছিল। তারা কি করতো যখন সকালে জেগে উঠত? তারা সকালের নাস্তায় কি খেত – আর মধ্যাহ্ন ভোজে? তাদের সমাজ কি রকম ছিল? তাদের কি একগামী সম্পর্ক আর একক পরিবার ছিল? তাদের কি অনুষ্ঠান, নৈতিক বিধি, খেলাধুলার প্রতিযোগিতা আর ধর্মীয় রীতিনীতি ছিল? তারা কি যুদ্ধ করেছিল? পরবর্তী অধ্যায়টি কালের পর্দার পিছনের দৃশ্যাবলী তুলে ধরেছে, পরীক্ষা-নিরিক্ষা করেছে বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লব আর কৃষি বিপ্লবকে আলাদা করা সহস্রাব্দতে জীবন কি রকম ছিল তা নিয়ে।

মন্তব্যসমূহ

শেহজাদ আমান এর ছবি
 

এটা আমার নিজস্ব অনুবাদ, কেউ যেন কপি-পেস্ট মনে না করেন... Smile

============================================
মানবতাহীন, অসামাজিক, নীতি-নৈতিকতাহীন, উগ্র ও অশ্লীল যুক্তিবাদী নাস্তিকদের চেয়ে অন্ধবিশ্বাসী কিন্তু মানবিক, নীতিবান ও নৈতিকতাসম্পন্ন, মধ্যপন্থী মুসলমানরাই আমার কাছে বেশী প্রীতিকর।
============================

 
অজল দেওয়ান এর ছবি
 

নুসরাত জাহান আপু কিছুদিন আগে ইস্টিশনে যে অনুবাদটা দিয়েছিলেন, এটা কি একই অনুবাদ??

অজল দেওয়ান

 
শেহজাদ আমান এর ছবি
 

একই অনুবাদ না, তবে একই বইয়ের ভিন্ন অনুবাদ! Biggrin

============================================
মানবতাহীন, অসামাজিক, নীতি-নৈতিকতাহীন, উগ্র ও অশ্লীল যুক্তিবাদী নাস্তিকদের চেয়ে অন্ধবিশ্বাসী কিন্তু মানবিক, নীতিবান ও নৈতিকতাসম্পন্ন, মধ্যপন্থী মুসলমানরাই আমার কাছে বেশী প্রীতিকর।
============================

 
অজল দেওয়ান এর ছবি
 

Yes 3

অজল দেওয়ান

 
নুর নবী দুলাল এর ছবি
 

অসাধারণ একটা কাজে হাত দিয়েছেন। অনুবাদের কাজ পুরোটা শেষ হলে ইস্টিশন থেকে ই-বুক করতে পারেন। সারা বিশ্বের বাংলা ভাষার মানুষদের কাজে লাগবে।

 
শেহজাদ আমান এর ছবি
 

ধন্যবাদ! অনুবাদের কাজ প্রায় শেষ করে এনেছি। ৩/৪ ভাগ হয়েছে। শেষ হলে এডিট-কারেকশন শেষে রোদেলা প্রকাশনী থেকে বের করবো আশা রাখি। আর ই'বুক হিসেবে তো অবশ্যই আপনাদেরকে দেব। Smile

============================================
মানবতাহীন, অসামাজিক, নীতি-নৈতিকতাহীন, উগ্র ও অশ্লীল যুক্তিবাদী নাস্তিকদের চেয়ে অন্ধবিশ্বাসী কিন্তু মানবিক, নীতিবান ও নৈতিকতাসম্পন্ন, মধ্যপন্থী মুসলমানরাই আমার কাছে বেশী প্রীতিকর।
============================

 
nusrat.jahan.sipa@gmail.com এর ছবি
 

শেহজাদ, আমি এই বইটা অনুবাদ করার কাজে হাত দিয়েছিলাম মাসছয়েক আগে,প্রথম পর্ব করে ব্লগে দেওয়ার পর দেখি আরো অনেকেই করছে, তাই আর করিনি। ইন ফ্যাক্ট, একজন সাংবাদিক (এখন নাম ভুলে গেছি) আমাকে বলেছেন উনি নাকি লেখা প্রায় শেষ করে ফেলেছেন, এবছর বইমেলায় বের হবে। আসলে বইটা এত আকর্ষণীয় তাই হয়তো অনেকেই এটার অনুবাদের কাজে হাত দিয়েছে। দুঃক্ষজনক ব্যপার হল, আমাদের দেশে ভাল অনুবাদ এম্নিতেই কম হয়, আবার একটা বই এতজন করলে আসলে এখানে সম্পদের ব্যপক অপচয়। এর একটা উপায় বের করতে পারলে ভাল হত। আপনার অনুবাদ খুব ভাল হচ্ছে। শুভকামনা।

 
শেহজাদ আমান এর ছবি
 

সুইট সিস্টার, আপনি নিশ্চয় একজন মুক্তমনের যুক্তিবাদী মানুষ। এত হতাশাবাদী কথাবার্তা কি আপনাকে মানায়?
অন্য কেউ অনুবাদ শুরু করেছে বলে কি আপনি আপনার কাজ বন্ধ করে দেবেন? বরং, আপনার কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই কি ভালো নয়? কারণ, যতবেশি মানুষ এর অনুবাদ করবে, ততবেশি সংখ্যক মানুষের কাকছে বিজ্ঞানের বাণী পৌছে যাবে। নয় কি?
আপনি আপনার অনুবাদ চালিয়ে যান। বই আকারে প্রকাশ করেন। হতাশ হবেন না...। মন খারাপ করে থাকবেন না।

============================================
মানবতাহীন, অসামাজিক, নীতি-নৈতিকতাহীন, উগ্র ও অশ্লীল যুক্তিবাদী নাস্তিকদের চেয়ে অন্ধবিশ্বাসী কিন্তু মানবিক, নীতিবান ও নৈতিকতাসম্পন্ন, মধ্যপন্থী মুসলমানরাই আমার কাছে বেশী প্রীতিকর।
============================

 
nusrat.jahan.sipa@gmail.com এর ছবি
 

শেহজাদ, বইটি আমি মাস ছয়েক আগে অনুবাদ করা শুরু করি। প্রথম পর্ব অনুবাদ করে প্রকাশ করার সাথে সাথেই জানতে পারি আরো দুয়েকজন কাজটি করছে। একজন সাংবাদিক (এখন নাম ভুলে গেছি, সম্ভবত ফজল) আমাকে জানালেন যে একজন প্রকাশক নাকি বাংলাদেশে বইটির গ্রন্থসত্ব কিনে নিয়েছেন এবং উনি অনুবাদ কাজটি করছেন, উনার বইটি এবছরই বইমেলায় প্রকাশ হওয়ার কথা ছিল, জানিনা হয়েছে কিনা। তবে শোনার পর আমি কাজ বন্ধ করে দিয়েছি।
আসলে আমাদের দেশে ভাল অনুবাদ এম্নিতেই কম হয়, তার ওপর যদি একই অনুবাদ অনেকে করে, তাহলে সীমিত সম্পদের ব্যপক অপচয়। এর একটা উপায় বের করে পারলে ভাল হত।
যাই হোক আপনার অনুবাদ বেশ ভাল হয়েছে। শুভকামনা রইল।

 
নুর নবী দুলাল এর ছবি
 

আপনি অন্য আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ অনুবাদের কাজ শুরু করে দেন। আমাদের এই ধরনের প্রচুর অনুবাদগ্রন্থ প্রয়োজন।

 
শেহজাদ আমান এর ছবি
 

এটাও উনি শেষ করুন না...। কারণ, যতবেশি মানুষ এর অনুবাদ করবে, ততবেশি সংখ্যক মানুষের কাকছে বিজ্ঞানের বাণী পৌছে যাবে। নয় কি?

============================================
মানবতাহীন, অসামাজিক, নীতি-নৈতিকতাহীন, উগ্র ও অশ্লীল যুক্তিবাদী নাস্তিকদের চেয়ে অন্ধবিশ্বাসী কিন্তু মানবিক, নীতিবান ও নৈতিকতাসম্পন্ন, মধ্যপন্থী মুসলমানরাই আমার কাছে বেশী প্রীতিকর।
============================

 
শেহজাদ আমান এর ছবি
 

সুইট সিস্টার, আপনি নিশ্চয় একজন মুক্তমনের যুক্তিবাদী মানুষ। এত হতাশাবাদী কথাবার্তা কি আপনাকে মানায়?
অন্য কেউ অনুবাদ শুরু করেছে বলে কি আপনি আপনার কাজ বন্ধ করে দেবেন? বরং, আপনার কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই কি ভালো নয়? কারণ, যতবেশি মানুষ এর অনুবাদ করবে, ততবেশি সংখ্যক মানুষের কাকছে বিজ্ঞানের বাণী পৌছে যাবে। নয় কি?
আপনি আপনার অনুবাদ চালিয়ে যান। বই আকারে প্রকাশ করেন। হতাশ হবেন না...। মন খারাপ করে থাকবেন না।...

============================================
মানবতাহীন, অসামাজিক, নীতি-নৈতিকতাহীন, উগ্র ও অশ্লীল যুক্তিবাদী নাস্তিকদের চেয়ে অন্ধবিশ্বাসী কিন্তু মানবিক, নীতিবান ও নৈতিকতাসম্পন্ন, মধ্যপন্থী মুসলমানরাই আমার কাছে বেশী প্রীতিকর।
============================

 
অজল দেওয়ান এর ছবি
 

এটি একদিকে ঠিক যে যে কাজটি শুরু হয়েছে তা শেষ করা উত্তম। নইলে কাজের গতি নষ্ট হয়।

কথাপ্রসঙ্গে বলি, "একবার গোলাম হোসেন হাবীব স্যারকে বলেছিলাম আপনি মার্কেসের আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস কেন অনুবাদ করছেন না? উনি আমাকে তপন শাহেদের অনুবাদ বইটি দেখিয়ে দেন। আমি বললাম, ওনার অনুবাদ পড়েছি তবে আপনার অনুবাদে পড়তে খুবই ভালো লাগবে। তিনি বলেছিলেন যে কাজ সম্পন্ন করাই হয়েছে সে কাজে হাত না দেয়ার চেয়ে অন্য একটি কাজে হাত দেয়া উত্তম। কত বই অনুবাদের জন্য পড়ে রয়েছে!!"

ইশরাত আপুর অনুবাদ পড়ার পর শেহজাদ ভাইয়ের অনুবাদও পড়লাম। দুইটাই ভালো অনুবাদ হয়েছে এবং এত জটিল একটি বিষয় খুব সহজেই বোধগম্য হয়েছে। আপনাদের দুইজনের জন্যই শুভকামনা।
আশা করি, এই বইটির পর সামনে আরো অনেক ভালো ভালো বইয়ের অনুবাদ আমরা হাতে বা ব্লগে পাচ্ছি Yahoo

অজল দেওয়ান

 
শেহজাদ আমান এর ছবি
 

আশা করি, এই বইটির পর সামনে আরো অনেক ভালো ভালো বইয়ের অনুবাদ আমরা হাতে বা ব্লগে পাচ্ছি

অবশ্যই! বেচে থাকলে, ভালো থাকলে অবশ্যই পাবেন। স্যাপিয়েন্সের পর হারারির 'হোমো ডিউজ' নিয়েও কাজ করার ইচ্ছে রয়েছে। Smile

============================================
মানবতাহীন, অসামাজিক, নীতি-নৈতিকতাহীন, উগ্র ও অশ্লীল যুক্তিবাদী নাস্তিকদের চেয়ে অন্ধবিশ্বাসী কিন্তু মানবিক, নীতিবান ও নৈতিকতাসম্পন্ন, মধ্যপন্থী মুসলমানরাই আমার কাছে বেশী প্রীতিকর।
============================

 
অজল দেওয়ান এর ছবি
 

ভবিষ্যতে যা করার ভাবনা করছেন তার জন্য অবশ্যই বেঁচে থাকবেন Smile

পরবর্তী কঠিন শ্রমের জন্য আগাম ধন্যবাদ ও শুভকামনা।

অজল দেওয়ান

 
নুসরাত_জাহান এর ছবি
 

আসলে অনুবাদ অনেক সময়সাপেক্ষ ব্যপার। চারটা অধ্যায় অনুবাদ করতে আমাকে অফিসের পাশাপাশি নাওয়া খাওয়া ভুলে অনেক প্রায় ৩ মাস প্রচুর কাজ করতে হয়েছে। তাই বলছি আর করবনা। আসলেও তো, অন্য অনেক কিছু লেখার আছে, সেগুলো লেখার চেষ্টা করছি এখন। ডুপ্লিকেশানের মানে হয়না। আগেই বলেছি এতে মূলয়বান সময়ের সদব্যবহার হয়না। আপনিও আপনার মত করে যেটা লিখতে ইচ্ছা করে সেটা লেখা চালিয়ে যান, আমাদের এভাবেই সামনে এগুতে হবে। শুভকামনা রইল Smile

নুসরাত

 
শেহজাদ আমান এর ছবি
 

চারটা অধ্যায় অনুবাদ করতে আমাকে অফিসের পাশাপাশি নাওয়া খাওয়া ভুলে অনেক প্রায় ৩ মাস প্রচুর কাজ করতে হয়েছে।

আপনার পরিশ্রম তাহলে পণ্ড হয়ে গেল না? আপনি ভূতের বেগার খেটেছেন তাহলে?
আর আপনি কি অন্যের লেখা কপি-পেস্ট করেছে যে ডুপ্লিকেশন হবে?

============================================
মানবতাহীন, অসামাজিক, নীতি-নৈতিকতাহীন, উগ্র ও অশ্লীল যুক্তিবাদী নাস্তিকদের চেয়ে অন্ধবিশ্বাসী কিন্তু মানবিক, নীতিবান ও নৈতিকতাসম্পন্ন, মধ্যপন্থী মুসলমানরাই আমার কাছে বেশী প্রীতিকর।
============================

 

নতুন কমেন্ট যুক্ত করুন

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

Facebook comments

বোর্ডিং কার্ড

শেহজাদ আমান
শেহজাদ আমান এর ছবি
Offline
Last seen: 2 weeks 2 দিন ago
Joined: শনিবার, জানুয়ারী 4, 2014 - 10:15পূর্বাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

কু ঝিক ঝিক

ফেসবুকে ইস্টিশন

SSL Certificate
কপিরাইট © ইস্টিশন.কম ® ২০১৬ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর