নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 4 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • রাজর্ষি ব্যনার্জী
  • বিকাশ দাস বাপ্পী
  • রসিক বাঙাল
  • এলিজা আকবর

নতুন যাত্রী

  • সাতাল
  • যাযাবর বুর্জোয়া
  • মিঠুন সিকদার শুভম
  • এম এম এইচ ভূঁইয়া
  • খাঁচা বন্দি পাখি
  • প্রসেনজিৎ কোনার
  • পৃথিবীর নাগরিক
  • এস এম এইচ রহমান
  • শুভম সরকার
  • আব্রাহাম তামিম

আপনি এখানে

বাংলা একাডেমীর স্বায়ত্বশাসন


অনেকেই অমর একুশে বইমেলাকে বাংলা একাডেমীর খপ্পর থেকে বের করার দাবী তুলছেন। অনেকে বলছেন- এটা বেআইনি বা আইন অনুযায়ী বইমেলা করার কোন এখতিয়ারই বাংলা একাডেমীর নেই। অনেকে বাংলা একাডেমী আইন ২০১৩ দেখিয়ে জানাচ্ছেন, মহাপরিচালকের শ্রাবণ প্রকাশনীকে নিষিদ্ধ করার কোন আইনি এখতিয়ার নেই। অমর একুশে বইমেলাকে বাংলা একাডেমীর হাত থেকে বের করে কার হাতে কিভাবে ছেড়ে দেয়া যায়- সেটার ব্যাপারে অনেকে জানাচ্ছেন- প্রকাশকরা মিলে এটা করবে।

যাহোক, এসমস্ত বক্তব্যের সাথে, দাবীর সাথে এমমত হওয়ার যুক্তিসঙ্গত কারণ দেখছি না। আইনি এখতিয়ার সম্পর্কিত বক্তব্যগুলোকেও কিছুটা ভুল মনে হচ্ছে; তার চাইতেও বাংলা একাডেমী নামের এই প্রতিষ্ঠানটির প্রতি বিরক্তি আমাদের এমন পর্যায়ে চলে গিয়েছে যে, একে আমরা একেবারেই ছেড়ে দিয়ে, কেবল অমর একুশে বইমেলাকে কোনরকমে বা যেনতেন প্রকারে বাঁচানোর চেস্টা করছি- প্রচেস্টাটি এরকম বলে মনে হচ্ছে।

কয়েকটা ব্যাপারে তাই সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইঃ
১/ সকল প্রকাশকদের এরকম কোন সংস্থা বা সমিতি নেই যার হাতে জাতীয় পর্যায়ের এরকম বইমেলা আয়োজনের ভার দেয়া যায়। দুটো সমিতির কথা জানতে পারি। বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতি এবং বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি- দুটোরই গড়ে ওঠার উদ্দেশ্য ও লক্ষ প্রধানত প্রকাশকদের ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষা করা। এটাও ভুলা উচিৎ হবে না যে, প্রকাশকরা মূলত ব্যবসায়ী। আমি ব্যবসায়ীদের চাইতে শিক্ষাবিদ- সাহিত্যিক- লেখক- চিন্তাবিদদের নিয়ে গড়া কোন স্বায়ত্বশাসিত গোষ্ঠীর হাতে এরকম বইমেলার দায়িত্ব ছেড়ে দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবো।

২/ এরকম বইমেলা করার ক্ষেত্রে আমাদের রাষ্ট্রের ভূমিকা, পৃষ্ঠপোষকতা দরকার। সেইদিকটি আমরা ভুলে যাচ্ছি। বাংলা একাডেমী কেবল ঢাকায় কেন্দ্রীয়ভাবে একুশে বইমেলাই নয়- সারাদেশের পাবলিক লাইব্রেরিগুলোর উদ্যোগে ও আয়োজনে- বইমেলার উদ্যোগ নিক - সেটাই চাই বেশি করে। বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি নিয়ে গবেষণা এবং এর প্রসারে বাংলা একাডেমীর মত প্রতিষ্ঠানের আবশ্যকীয়তা অস্বীকার করা ভয়ানক ভুল।

৩/ বাংলাদেশে মননশীল, সৃজনশীল, গবেষণাধর্মী গ্রন্থগুলোর পৃষ্ঠপোষকতাও বাংলা একাডেমীর অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। ব্যবসায়ী প্রকাশনাগুলো তো বাজার কাটতি বই ছাপাবে, বিক্রি বাট্টা করবে। এরকম মননশীল গবেষণাধর্মী বই প্রকাশের জন্যে বাংলা একাডেমী কিন্তু বইও প্রকাশ করে (কেবল অভিধান প্রকাশ নয়, অন্যান্য বই প্রকাশ করাও বাংলা একাডেমীর কাজ), সেই অর্থে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ প্রকাশনী সংস্থাও বটে। অন্যান্য প্রকাশনা সংস্থার সাথে এর পার্থক্য হচ্ছে- এর চরিত্র অ-ব্যবসায়ী, অর্থাৎ মুনাফা মূল উদ্দেশ্য নয় বা এর টিকে থাকার জন্যে তথা পরবর্তী বই প্রকাশের জন্যে আগের বই এর বিক্রি হওয়ার - বই বিক্রি থেকে যথাযথ রিটার্ণ আসা- এসব শর্তের সংযোগ নাই। সে জায়গা থেকেও বাংলা একাডেমীর হাতে বইমেলার দায়িত্ব রাখতে চাই- যার মূল উদ্দেশ্যই হবে- বাংলাদেশের মানুষের হাতে বাংলা বই তুলে দেয়া, দেশের সব ধরণের প্রকাশনা সংস্থাগুলোকে একত্রিত করে একটা জায়গা দেওয়া যাতে করে লেখক- পাঠক- প্রকাশকদের মিলনমেলা ঘটে এবং প্রকাশকদেরও নানা ধরণের বই বিক্রি বাট্টার মাধ্যমে তাদের বেঁচে থাকা নিশ্চিত হয়। ফলে- এখানে বাংলা একাডেমীর ভূমিকা প্রকাশনা সংস্থাগুলোর প্রতি সহায়তামূলক। কিন্তু প্রকাশনা সংস্থাগুলো নিজেরা বইমেলা করলে- তখন তাদের নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থটাই প্রধান হবে। নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা, বড় প্রকাশনা – ছোট প্রকাশনার মধ্যে ন্যায্যতা বিধান- এসব কনফ্লিক্টিং বিষয়ও সামনে চলে আসবে।

৪/ ইস্টিশন ব্লগে আমার গত পোস্টে বাংলা একাডেমীর ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করেছি। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে গবেষণা- বই প্রকাশ, বাংলাদেশের অপরাপর জাতিভাষা সমূহ নিয়েও গবেষণা- বই প্রকাশ, ভাষা ও সংস্কৃতির প্রসার, বিস্তার- প্রভৃতির জন্যে বাংলা একাডেমীর গুরুত্ব অসীম। সেই জায়গা থেকে এরকম বইমেলা আয়োজন করাও বাংলা একাডেমীর কাজ বলে মনে করি। বাংলা একাডেমীর মধ্যকার ঝামেলা দেখে তাকে আর সমস্ত দায়িত্ব থেকে সরিয়ে কেবল অভিধান করার কাজে নিয়োজিত করার আওয়াজ তোলা তাই আমার কাছে ক্ষতিকর প্রবণতাই মনে হয়। বরং এই বাংলা একাডেমীর আজকের এই অবস্থা, এই চরিত্র – এটাকে পাল্টানোর জন্যে কাজ করাটা অধিক জরুরি। বাংলা একাডেমীর সমস্যার স্বরূপটি উদঘাটন করাও খুব জরুরি।

৫/ বাংলাদেশ একাডেমী আইন ২০১৩ অনুযায়ী বইমেলা করার এখতিয়ার বাংলা একাডেমীর নাই- এটা বলতে গিয়ে অনেকে আইনের ১০ নাম্বার ধারা (একাডেমীর কার্যাবলী) দেখিয়ে বলছেন এখানে বাংলাদেশে বইমেলা করার কথা নাই (আছে বিদেশে বইমেলা করার কথা)। প্রথমত বুঝতে হবে- এখানে যেসব কার্যাবলীর কথা বলা হয়েছে- তার বাইরে কিছু করা এখতিয়ার বহির্ভূত বলা যায় কি? আইনে যে কাজের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা বা অমুক- তমুক কাজ করতে পারবে না- বলে যদি কোন ধারা উপধারা থাকতো, তবে সেটিকে এখতিয়ার বহির্ভূত বলা যেত, কিংবা বাংলা একাডেমীর মূল উদ্দেশ্যের সাথে সরাসরি কোন সাংঘর্ষিক কিছু হলে সেটিকে এখতিয়ার বহির্ভূত বলা যায়; কিন্তু অমর একুশে বইমেলা অনুষ্ঠানের কথা সরাসরি না থাকা মানে এটি বেআইনি- এমনটা বলা কি সম্ভব? দ্বিতীয়ত- এই ১০ নাম্বার ধারার ১ নাম্বার উপধারায় বলা হয়েছেঃ জাতীয় আশা আকাঙ্খার সহিত সঙ্গতি রাখিয়া বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির উন্নয়ন, লালন ও প্রসার সাধন- এই উদ্দেশ্যের সাথে অমর একুশে বইমেলার আয়োজন কি সঙ্গতিপূর্ণ নয়? একই ধারার ২২ নাম্বার উপধারায় বলা হয়েছেঃ এই আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে প্রয়োজনীয় অন্য কোনো কার্য সম্পাদন- ফলে বুঝাই যাচ্ছে, এই আইন অনুযায়ীই একাডেমীর কাজের পরিধিকে বিস্তৃত করা হয়েছে। একইভাবে আইনের ২৪ নাম্বার ধারায় (নির্বাহী পরিষদের কার্যাবলী) বলা হয়েছেঃ (খ) একাডেমির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও প্রয়োজনে, নীতি নির্ধারণ; ... (ঙ) সরকার বা সাধারণ পরিষদ কর্তৃক প্রদত্ত অন্য কোনো দায়িত্ব পালন। এই "প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ, নীতি নির্ধারণ", "অন্য কোনো দায়িত্ব পালন"-ও কিন্তু একাডেমীর কাজের পরিধিকে বিস্তৃত করে। ফলে কোনভাবেই একুশে বইমেলা আয়োজনকে বেআইনি বলার উপায় নেই।

৬/ এছাড়া এই আইনের ৪১ (১) নাম্বার ধারায় বাংলা একাডেমিকে নিজস্ব প্রবিধান প্রণয়নেরও অধিকার দেয়া আছেঃ এই আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে, একাডেমি, সরকারের পূর্বানুমোদনক্রমে, সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, এই আইন বা বিধির সহিত অসামঞ্জস্যপূর্ণ নহে, এইরূপ প্রবিধান প্রণয়ন করিতে পারিবে।
বইমেলা আয়োজনের জন্যে আরেকটা নীতিমালা আছে। সেটা পুরোটা এখনো হাতে পাইনি- কিন্তু কিছু কিছু ধারা দেখেছি, যেগুলো খুবই আপত্তিকর, জঘণ্য। রাষ্ট্র ও ধর্মকে কটাক্ষ করা হয় বইমেলায় এমন কোন বই রাখা যাবে না। বইমেলার নীতিমালার ১৩ অনুচ্ছেদে বলা হচ্ছে- অশ্লীল ও রুচিগর্হিত বই প্রকাশ করলে স্টল বরাদ্দ বাতিল করা হবে। সেই সঙ্গে আর কোনো সময় সেই স্টলকে বরাদ্দ দেওয়া হবে না। এরকম বইমেলায় স্টল বরাদ্দের যোগ্যতা- অযোগ্যতার নানারকম কথাও সেখানে আছে (যেমন, কতটি প্রকাশিত বই থাকবে, চিরায়ত বই কাউন্ট হবে কি না ইত্যাদি) ... দেখা দরকার- এইসব নীতিমালায়- বাংলা একাডেমির কোন সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করলে, সমালোচনা করলে, প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাড়ালে- বইমেলায় স্টল পাওয়ার অযোগ্যতা হিসেবে সেটাকে উল্লেখ করার কথা সেখানে আছে কি না ... (তবে ধারণা করি, সবচেয়ে মুশকিলে একটা ধারা এরকম সমস্ত নীতিমালায় থাকে- বরাদ্দ সংক্রান্ত সিদ্ধেন্তের ক্ষেত্রে কমিটির সিদ্ধান্তই চুড়ান্ত- সেটাও এই নীতিমালায় আছে, সেইটাও দুই বছরের জন্যে স্টল বরাদ্দ না দেয়ার একটা ঢাল হতে পারে)

৭/ শ্রাবণকে নিষিদ্ধ করে বাংলা একাডেমী বেআইনি বা এখতিয়ার বহির্ভূত কাজ করছে বলে অনেকে বলছেন, বাস্তবে বুঝতে হবে যে- বাংলা একাডেমী শ্রাবণ প্রকাশনী সংস্থাকে নিষিদ্ধ করেনি, সেটা তারা পারেও না। তারা যেটা পারে সেটিই করেছে- তাদের আয়োজনের একুশে বইমেলায় শ্রাবণকে আগামী দুই বছরের জন্যে নিষিদ্ধ বাঁ অযোগ্য বা অবাঞ্ছিত করেছে। এই এখতিয়ার তাদের আছে এবং সাধারণভাবে যেকোন মেলা কমিটিরই এই স্বাধীনতা থাকে- সেই মেলাকে কাকে বরাদ্দ দিবে না দিবে। সেখানে দুর্নীতি যাতে না হয়, ফেয়ার বরাদ্দ যাতে হয় – সেজন্যে কিছু নীতিও থাকে। সেরকম নীতিমালা বাংলা একাডেমীরও আছে- কেবলমাত্র বইমেলা আয়োজন করার জন্যেই নীতিমালা। ফলে, বাংলাদেশ একাডেমী আইন ২০১৩ দেখিয়ে শ্রাবণকে নিষিদ্ধ করা বেআইনি বলার কোন স্কোপ নেই। এখানে বইমেলা আয়োজনের নীতিমালা দেখা উচিৎ। সেই সাথে আমাদের সংবিধান প্রদত্ত মত প্রকাশের, সংগঠন ও সমাবেশের স্বাধীনতা সংক্রান্ত অধিকারকে সামনে আনা উচিৎ।

৮/ আমার মতে, এই সমস্ত আলাপ আলোচনার একটা মূল ভারকেন্দ্র আমরা হারিয়ে ফেলছি। সেটি হলো- বাংলা একাডেমীর চরিত্র ও স্বরূপ কেমন হবে? এরকম একটি প্রতিষ্ঠানের স্বায়ত্বশাসিত হওয়াটা একেবারেই প্রাথমিক শর্ত হওয়া উচিৎ। জ্ঞানকান্ডের সাথে জড়িত বা যুক্ত যেকোন প্রতিষ্ঠান, তা সে বিশ্ববিদ্যালয় হোক আর বাংলা একাডেমী হোক আর গবেষণা প্রতিষ্ঠান হোক, তার সরকারের প্রভাবমুক্ত হওয়া খুব দরকার, স্বাধীনভাবে জ্ঞান সৃষ্টি, জ্ঞানের প্রসার প্রভৃতির জন্যে। রাষ্ট্রায়ত্ব বা পাবলিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময়েই সরকার এই যুক্তিতে খবরদারি করার প্রচেস্টা চালায় যে, যেহেতু এই সমস্ত প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নের দায়িত্ব সরকার পালন করছে। অথচ, সরকার যেমন জনগণের অর্থে জনগণের কল্যাণে নিয়োজিত ও পরিচালিত, একইভাবে এইসমস্ত পাবলিক প্রতিষ্ঠানকে পরিচালনার অর্থও সরকারের নয়- জনগণের।

৯/ বিভিন্ন জায়গায় বাংলা একাডেমীকে একটি স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করা হলেও- আমি অবাক হয়ে খেয়াল করলাম- বাংলা একাডেমী আইন ২০১৩ এর কোথাও “স্বায়ত্বশাসন” শব্দটির উপস্থিতি নেই। অথচ, সেই পাকিস্তান আমলে দি বেংগলি একাডেমি অ্যাক্ট ১৯৫৭ এ বাংলা একাডেমীকে স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবেই উল্লেখ করা হয়েছিল। সেই বাংলা একাডেমীর উপরে সরকারের নিয়ন্ত্রণ জারি করা শুরুও হয় পাকিস্তান আমলে, ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দের ২৬ জুলাই এর ‘দি বেংগলি একাডেমী (এমেন্টমেন্ট) অর্ডিন্যান্স’ এর মাধ্যমে। স্বাধীন বাংলাদেশেও আইয়ুব খানের সেই ধারাবাহিকতা রক্ষা হয়।

১০/ ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দের ১৭ মে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ‘দি বাংলা একাডেমি অর্ডার, ১৯৭২’ জারি করেন, এতে কাউন্সিলের নাম পরিবর্তন করে ‘কার্যনির্বাহী পরিষদ’ করা হয় এবং মহাপরিচালকের পদ সৃষ্টি করা হয় বাংলা একাডেমীর প্রধান নির্বাহী হিসেবে। এরপর ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দের ৬ জুন ‘দি বাংলা একাডেমি অর্ডিন্যান্স, ১৯৭৮’ জারি করা হয়। ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দের ২৫ মে তারিখে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের এক আদেশবলে কিছু পরিবর্তন করা হয় এবং সর্বশেষ ২০১৩ সালে বাংলা একাডেমী আইন ২০১৩ করা হয়। সব সময়ই স্বায়ত্বশাসনের প্রসঙ্গটিকে সযত্নে এড়িয়ে যাওয়া হয়।

১১/ বাংলা একাডেমী আইন – ২০১৩ এ কেবল স্বায়ত্বশাসন শব্দটি অনুপস্থিতই নয়- এই আইনের ধারায় ধারায় বাংলা একাডেমীর উপরে সরকারের নিয়ন্ত্রণকে নিশ্চিত করতে ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এভাবেই একে সরকারের একটি ক্রীড়াযন্ত্রে পরিণত করা হয়েছে। সেরকম কিছু ধারার দিকে লক্ষ দেয়া যাকঃ

প্রথমতঃ বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক নামক পদটির সৃষ্টির মাধ্যমে সভাপতি পদটিকে কেবল আলংকারিক করা হয়েছে। এবারে সভাপতি ও মহাপরিচালকের নিয়োগ সংক্রান্ত ধারা দুটো দেখিঃ

ধারা ৬: (১) রাষ্ট্রপতি একাডেমির সভাপতি নিয়োগ করিবেন। (২) প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ, পন্ডিত, সাহিত্যিক অথবা স্বাধীনতা পদক বা একুশে পদকপ্রাপ্ত ব্যক্তিগণের মধ্য হইতে একাডেমির সভাপতি নিযুক্ত হইবেনঃ তবে শর্ত থাকে যে, বাংলাদেশের নাগরিক নহেন এমন কোনো ব্যক্তিকে সভাপতি হিসাবে নিয়োগ করা যাইবে না।

ধারা ২৬: (১) একাডেমির একজন মহাপরিচালক থাকিবেন। (২) বাংলাদেশের নাগরিক এইরূপ কোনো ফেলো অথবা প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ বা গবেষকদের মধ্য হইতে সরকার মহাপরিচালক নিয়োগ করিবে এবং তাহার চাকুরির শর্তাবলি সরকার কর্তৃক স্থিরীকৃত হইবে

এর মাধ্যমেই বাস্তবে মহাপরিচালককে একজন সরকারের আজ্ঞাবহ সরকারী কর্মচারী বানানো হয়েছে।

দ্বিতীয়তঃ নির্বাহী পরিষদের গঠন। পাকিস্তান আমলে এটি ছিল কাউন্সিল। এই কাউন্সিল এর সদস্য নির্বাচিত হতো ফেলো ও সদস্যদের নির্বাচনের মাধ্যমে। অথচ, নির্বাহী পরিষদের কেবল ৭ জন সদস্য ফেলো ও সাধারণ সদস্যরা নির্বাচিত করে পাঠাতে পারে (৩ জন ফেলো এবং ৪ জন সাধারণ সদস্য)। ধারা ২৩ (১) অনুযায়ীঃ
২৩। (১) একাডেমির একটি নির্বাহী পরিষদ থাকিবে, যাহা নিম্নবর্ণিত সদস্য সমন্বয়ে গঠিত হইবে, যথা :- (ক) মহাপরিচালক, পদাধিকারবলে, যিনি ইহার সভাপতিও হইবেন; (খ) সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক মনোনীত অন্যূন যুগ্ম-সচিব পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা; (গ) অর্থবিভাগ কর্তৃক মনোনীত অন্যূন যুগ্ম-সচিব পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা; (ঘ) কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা, ভাষাতত্ত্ব ও ইংরেজি বিভাগ এবং বিজ্ঞান অনুষদ হইতে সরকার কর্তৃক মনোনীত একজন করিয়া সর্বমোট চারজন অধ্যাপক; (ঙ) সরকার কর্তৃক মনোনীত একজন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও একজন বিশিষ্ট তথ্যপ্রযুক্তিবিদ; (চ) নির্বাহী পরিষদ কর্তৃক মনোনীত একজন বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও একজন বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী; (ছ) ফেলোগণ কর্তৃক নির্বাচিত তিনজন ফেলো; (জ) সাধারণ পরিষদ কর্তৃক নির্বাচিত চারজন সদস্য; (ঝ) সচিব, যিনি ইহার সদস্য-সচিবও হইবেন।
ধারা ৩০ (১) অনুযায়ীঃ একাডেমির একজন সচিব থাকিবেন, যিনি সরকার কর্তৃক নিযুক্ত হইবেন এবং তাঁহার চাকুরির শর্তাবলি সরকার কর্তৃক স্থিরীকৃত হইবে

অর্থাৎ, নির্বাহী পরিষদের মহাপরিচালক এবং সদস্য সচিব উভয়ই সরকার মনোনীত ও সরকারের আজ্ঞাবহ, এছাড়া এটায় থাকছে সংস্কৃতি ও অর্থ মন্ত্রনালয়ের দুজন আমলা, সরকার মনোনীত একজন বিজ্ঞানী, সরকার মনোনীত একজন তথ্য প্রযুক্তিবিদ, সরকার মনোনীত চারজন অধ্যাপক। উল্লেখ্য যে, মহাপরিচালকের অবর্তমানে মহাপরিচালক নিয়োগের আগ পর্যন্ত সচিব ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করবে এবং আর সচিবের অবর্তমানে একাডেমীর একজন কর্মকর্তা ভারপ্রাপ্ত সচিবের দায়িত্ব পালন করবে- কিন্তু এই কর্মকর্তাকে নির্বাহী/ সাধারণ পরিষদ নয়, সরকার ঠিক করে দিবে।

তৃতীয়তঃ মহাপরিচালকের অপসারণ সরকারের হাতে রাখা হয়েছে। সভাপতির অপসারণ এবং মহাপরিচালকের অপসারণ সংক্রান্ত ধারা দুটো দেখলেই পার্থক্য বুঝা যাবে।
ধারা ৬ (৫) এ সভাপতির অপসারণ সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ এই আইন লঙ্ঘন বা গুরুতর অনিয়ম বা অসদাচরণের অভিযোগে সাধারণ পরিষদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য একাডেমির সভাপতির বিরুদ্ধে লিখিতভাবে অনাস্থা জ্ঞাপন করিলে, নির্বাহী পরিষদ উহা রাষ্ট্রপতির নিকট প্রেরণ করিবে এবং রাষ্ট্রপতি স্বীয় বিবেচনায় তাহাকে অপসারণের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।

অন্যদিকে ধারা ২৮ - এ মহাপরিচালকের অপসারণ সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ (১) এই আইন লঙ্ঘন বা গুরুতর অনিয়ম বা অসদাচরণের অভিযোগে নির্বাহী পরিষদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য লিখিতভাবে একাডেমির সভাপতির নিকট মহাপরিচালকের বিরুদ্ধে অনাস্থা জ্ঞাপন করিলে, একাডেমির সভাপতি উক্ত বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকারকে অনুরোধ করিবেন এবং সরকার তাঁহাকে অপসারণের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করিবে।
(২) উপ-ধারা (১) এ যাহা কিছুই থাকুক না কেন, সরকার মহাপরিচালককে তাঁহার পদ হইতে অপসারণ করিতে পারিবে, যদি তিনি- (ক) কোনো উপযুক্ত আদালত কর্তৃক দেউলিয়া ঘোষিত হন; (খ) পারিশ্রমিকের বিনিময়ে স্বীয় দায়িত্ব-বহির্ভূত অন্য কোনো পদে নিয়োজিত হন; (গ) কোনো উপযুক্ত আদালত কর্তৃক অপ্রকৃতস্থ ঘোষিত হন; বা (ঘ) নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হন।

রাষ্ট্রপতি সভাপতিকে নিয়োগ দিলেও তিনি এককভাবে তাকে অপসারণ করতে পারছেন না, সাধারণ পরিষদের দুই তৃতীয়াংশ সদস্য সুনির্দিষ্ট অভিযোগের প্রেক্ষিতে অনাস্থা জ্ঞাপন করলে নির্বাহী পরিষদ রাষ্ট্রপতির নিকট প্রেরণ করলেই কেবল রাষ্ট্রপতি বিবেচনা করবেন। অথচ মহাপরিচালকের অপসারণের ক্ষেত্রে নির্বাহী পরিষদের দুই তৃতীয়াংশ অনাস্থা আনলে যেমন সভাপতি সরকারের বিবেচনার কাছে পাঠাবে, তেমনি সরকার নিজেও চাইলে চারটি অভিযোগের কারণে অপসারণ করতে পারবে। আরেকটি বিষয় লক্ষণীয় যে- মহাপরিচালকের অপসারণের ক্ষেত্রে সাধারণ পরিষদের কোন এখতিয়ার রাখা হয়নি, রাখা হয়েছে নির্বাহী পরিষদের কাছে- যে নির্বাহী পরিষদের ৬০ শতাংশ সরকার মনোনীত অর্থাৎ এর মাধ্যমে মহাপরিচালকের একমাত্র দায়বদ্ধতা সরকারের কাছে রাখা হয়েছে। (উল্লেখ্য যে সাধারণ পরিষদ গঠিত হয়- সভাপতি, মহাপরিচালক, একাডেমীর ফেলোবৃন্দ এবং সদস্যবৃন্দের সমন্বয়ে)

চতুর্থতঃ নির্বাহী পরিষদের কার্যাবলীতে সরকারের আদেশ নির্দেশ পালনের বিষয়টি যুক্ত করে এই আইনের মাধ্যমে সম্পূর্ণভাবেই একটি সরকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হয়েছে। ধারা ২৪ (১) (ঙ) অনুযায়ীঃ সরকার বা সাধারণ পরিষদ কর্তৃক প্রদত্ত অন্য কোনো দায়িত্ব পালন”

পঞ্চমতঃ সাধারণ পরিষদের কর্তৃত্ব নামেই সর্বময়, কার্যক্ষেত্রে একে কোন দায়িত্ব বা ক্ষমতা দেয়া হয়নি। এমনকি সাধারণ পরিষদের সাধারণ সভার সভাপতিত্ব একাডেমীর সভাপতি করলেও- এর আলোচ্যসূচি নির্ধারণ করবে মহাপরিচালক ও নির্বাহী পরিষদ। সভাপতির অনুপস্থিতিতে কোন ফেলো সভার সভাপতিত্ব করবে- সেটিও ঠিক করে দিবে নির্বাহী পরিষদ। এ ভাবেই বাংলা একাডেমীর ভার শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক, চিন্তাবিদদের হাত থেকে নিয়ে পাকাপোক্তভাবে সরকার ও সরকারের আজ্ঞাবহদের কাঁধে দেয়া হয়েছে। আর সে কারণেই বাংলা একাডেমীর যেকোন অন্যায় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সাধারণ পরিষদ কোন ভূমিকাও রাখতে পারে না। আনু মুহম্মদ স্যাকে তাই দেখি একজন সদস্য হিসেবে বাংলা একাডেমীর বাইরে দাঁড়িয়ে বাঁ বিবৃতি দিয়ে প্রতিবাদ জানাতে হয়, অজয় রায় স্যারদের হতাশা প্রকাশ করা ছাড়া আর কিছুই থাকে না।

১২/ শ্রাবণকে বইমেলা থেকে নিষিদ্ধ করার বিরুদ্ধে যেভাবে তীব্র প্রতিবাদে সকলে সোচ্চার হয়ে বাংলা একাডেমীকে কিছুটা পিছু হটতে বাধ্য করা যাচ্ছে- একইভাবে বাংলা একাডেমীকে রক্ষার জন্যে বাংলা একাডেমীর স্বায়ত্বশাসনের জন্যে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলা দরকার। মহাপরিচালক ও নির্বাহী পরিষদের গঠন, তার অপসারণ- পুরো কর্তৃত্ব সাধারণ পরিষদের হাতে আনতে হবে। নির্বাহী পরিষদে সরকারী কোন মন্ত্রণালয় বা আমলার উপস্থিতি কোনভাবেই রাখা যাবে না। নির্বাহী পরিষদের অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞানী, বিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ প্রমুখের নিয়োগ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত সাধারণ পরিষদ থেকে আসতে হবে। সরকার কোন ক্ষেত্রেই বাংলা একাডেমীকে নির্দেশনা দিতে পারবে না, বরং বাংলা একাডেমী সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সরকারকে নির্দেশনা, পরামর্শ দেয়ার এখতিয়ার রাখবে। একটা বিষয় মনে রাখা দরকার, সরকারে থাকা রাজনৈতিক দলগুলো ভোটের রাজনীতির কারণে হেফাজতে ইসলামী দলগুলোর কাছে যেভাবে বাঁধা থাকে, সাধারণ পরিষদের শিক্ষাবিদ, চিন্তাবিদ, সংস্কৃতি ব্যক্তিত্ব, সাহিত্যিক, দার্শনিক প্রমুখের কিন্তু ওদের প্রতি কোন দায়বদ্ধতা নেই।

Comments

 

ভালো লাগলো।
শুভেচ্ছা আপনাকে।

আমি মানুষ। আমি বাঙালি। আমি সত্যপথের সৈনিক। আমি মানুষ আর মানবতার সৈনিক। আর আমি ত্বরীকতপন্থী-মুসলমান। আমি মানুষকে ভালোবাসি। আর আমি বাংলাদেশ-রাষ্ট্রকে ভালোবাসি। জয়-বাংলা। জয়-বাংলা। জয়-বাংলা।...
সাইয়িদ রফিকুল হক

 
অনুপম সৈকত শান্ত এর ছবি
 

আপনাকেও ধন্যবাদ।

 
অনুপম সৈকত শান্ত এর ছবি
 

এখানে এত বড় ই আসলো কিভাবে বা কেন?

 

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

অনুপম সৈকত শান্ত
অনুপম সৈকত শান্ত এর ছবি
Offline
Last seen: 1 week 3 দিন ago
Joined: রবিবার, অক্টোবর 5, 2014 - 4:02অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

ফেসবুকে ইস্টিশন

SSL Certificate
কপিরাইট © ইস্টিশন.কম ® ২০১৬ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর