নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 4 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • পৃথু স্যন্যাল
  • নুর নবী দুলাল
  • সজয় সরকার
  • আমি মানুষ বলছি

নতুন যাত্রী

  • নিনজা
  • মোঃ মোফাজ্জল হোসেন
  • আমজনতা আমজনতা
  • কুমকুম কুল
  • কথা নীল
  • নীল পত্র
  • দুর্জয় দাশ গুপ্ত
  • ফিরোজ মাহমুদ
  • মানিরুজ্জামান
  • সুবর্না ব্যানার্জী

আপনি এখানে

দাগ


ঢাকার খুবই নামকরা একটি কমিউনিটি সেন্টারের লাল আলোয় প্রিসিলার পাশে বরের জন্য সংরক্ষিত আসনটিতে বসে বিয়ের জন্য বিশেষভাবে ভাড়া করা প্রফেশনাল ক্যামেরাম্যান এবং অচেনা ও অচেনা অসংখ্য মানুষের মোবাইলের শিকার হতে হতে হঠাৎ সাজ্জাদের চোখ পড়লো সামনের উপচে পড়ার ভিড়ের এক কোণে আর যা দেখলো তাতে তার রক্ত জমে হিম হয়ে গেলো। এক মুহূর্তের জন্য। কিন্তু সুরভিকে চেনার জন্য এক মুহূর্তের বেশি সময় লাগার কথা না সাজ্জাদের। হ্যাঁ, অই তো, ওখানেই সে দাঁড়িয়ে ছিলো। কড়া মেকআপ নিয়ে হালকা হাসিতে মত্ত চোখধাঁধানো পোষাকপরিহিতা- বিয়ের দিন কনের সাথে যারা সবাই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামে সৌন্দর্যের- মেয়েদের ভিড়ে সাধাসিধে জীর্ণ বস্ত্রে একা দাঁড়িয়ে ছিলো সুরভি। যেমন করে এই শহরের সবচে বনেদি এলাকাগুলোর অজস্র অট্টালিকার আশেপাশেই নিজের জন্য জায়গা করে নেয় ধূলিমলিন বস্তির ঘরগুলো। সে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলো সাজ্জাদের দিকে, আর সবচে আশ্চর্যের কথা চোখে কোন রাগ বা ঘেন্নার চিহ্নটুকুও নেই, বরং কি একটা প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার আকুলতা ছিলো যা সাজ্জাদকে আরো কুঁকড়ে দিলো ভেতর থেকে।

এক মুহূর্তের জন্য।

সাজ্জাদ সুরভিকে মাথা থেকে তাড়ানোর চেষ্টা করলো, কারণ এখন সে বসে আছে প্রিসিলার পাশে, এটাই তার প্রেজেন্ট। সুরভিকে তার অতীত এবং একটা অনিচ্ছাকৃত অতীত। একটা ভুলে ঘটে গেছে সাজ্জাদ, সেটা সংশোধন করা হয়েছে অনেক আগেই, কাপ থেকে কফি ছলকে পড়ে জামায় লাগলে যেমন ইমিডিয়েটলি তা মুছে ফেলার ব্যবস্থা নেয়া হয়। চোরের একবার প্রিসিলার দিকে তাকালো। নতুন বৌয়ের সাজে প্রিসিলাকে অপূর্ব লাগছে দেখতে। রূপকথার রাজকুমারীর মতো। মাখনের মতো গায়ের রঙ প্রিসিলার, আর গ্রিক দেবীদের মতো নিখুঁত ফিগার ওর, যে-কোনো পুরুষ যাকে পেলে পাগল হয়ে যাবে আজ রাতে সাজ্জাদ তাকে পাচ্ছে সারা জীবনের জন্য এটা ভেবে তার হাড়ের ভেতর দিয়ে যেনো ঠাণ্ডা জলের আনন্দধারা বয়ে গেলো।

প্রিসিলার সাথে সাজ্জাদের খাতির ছিলো সাত বছরের, কলেজ লাইফ থেকে, তবে তাদের মধ্যে কখনোই প্রেম ছিলো না। সাজ্জাদ দেশের একটা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে হায়ার স্টাডিজ কমপ্লিট করলেও প্রিসিলা স্কলারশিপ নিয়ে জার্মানি গেছিলো, ফিরেছে অতিসম্প্রতি। ওদের বাবার সাজ্জাদের বাবার বিশিষ্ট বন্ধু হন। আশির দশকে দুজনে একইসাথে ভাগ্য পরিবর্তন করেছেন। হাই সোসাইটিতে যাকে বলে সেলফ মেইড ম্যান, উনারা ঠিক তাই, খুব সাধারণ অবস্থা থেকে উঠে আসা লোক। জীবনে অনেক দুঃখ সয়েছেন, অনেক স্ট্রাগল করেছেন। প্রিসিলা আর সাজ্জাদ সেই তুলনায় খুবই সৌভাগ্যশালী, ওরা জন্মেছেই প্রাচুর্যের মধ্যে, অভাবের সাথে পরিচয় ঘটে নি ওদের।

সুরভির সাথে সাজ্জাদের দ্যাখা হওয়ার কথা না, হয়েছে, সাজ্জাদ মনে করে সে শুধু সাজ্জাদের বাবার বাতিকগ্রস্ততার কারণেই। হ্যাঁ, বাতিকগ্রস্ততাই তো, তা ছাড়া আর কি। শেকড়ের প্রতি টান? শেকড় মাই ফুট! আরে বাবা, তুমি সত্তরের দশকে গ্রাম থেকে এসেছিলে বুঝলাম, তাই বলে সারাজীবন গ্রামের সাথে সম্পর্ক ধরে রাখতে হবে এটা কোনো কথা? আর রাখতে হলে মাঝেমধ্যে কিছু মসজিদমাদ্রাসাএতিমখানা বানানোর টাকা পাঠালেই হয়, না, শীতের দিনে সাতসকালে বৌবাচ্চাকে ঘুম থেকে তুলে উনার গ্রামে নিয়ে যেতেই হবে বছরের বিশেষ কয়েকটা সময়। বাবার যদি এই বিতিকিচ্ছিরি অভ্যাসটা না থাকতো, সাজ্জাদ ভাবে, তাহলে আজকে সুরভি হঠাৎ বিয়ের অনুষ্ঠানে এভাবে অলৌকিকভাবে হাজির হয়ে আমাকে এই অস্বস্তির অনুভূতিটায় ফেলে দিতে পারতো না।

সে সুরভিকে প্রথম দ্যাখে পনেরো বছর বয়সে। তাদের বাড়িতে এখন আর কেউ থাকে না, দাদী মারা গেছেন অনেক আগেই, দেখভাল করার জন্য লোক রাখা হয়েছে যে সে থাকে পরিবার নিয়ে। বাবা একমাত্র ছেলে, সাজ্জাদের এক ফুপি আছে সিডনিতে থাকেন দীর্ঘদিন, দেশে ফিরলেও গ্রামে যাওয়ার ব্যাপারে আগ্রহহীন তিনি। সাজ্জাদের বাবার আগ্রহেই গ্রামের বাড়িটা এখনো আছে, নইলে, ওটা এতোদিনে দখল হয়ে যেতো। সুরভি ছিলো তাদের বাড়ির সেই কেয়ারটেকারের মেয়ে। মায়াকাড়া চেহারা, ওর বিষাদকাজল চোখ দুটি দেখলে মনে হবে যেনো একহাজার একরাত না ঘুমিয়ে আছে, এতো ক্লান্তি আর কোনো চোখে দ্যাখে নি সাজ্জাদ। সাজ্জাদের সাথে তার সখ্যতা গড়ে ওঠে সেইবারই প্রথম, আস্তে আস্তে সেই সখ্যতা হৃদয়াবেগে রূপ নেয়, দুই দিকের আগ্রহেই।

কিন্তু ভুলটা সেবার নয়, ঘটেছে এর পরেরবার। সুরভির শরীরটা সাজ্জাদকে চুম্বকের মতো টানতে থাকে, আর সুরভিও কেমন করে তাকায় তার দিকে, মনে হয় সাজ্জাদের। সে চাইছে, আমি জানি, সেও আমাকে চাইছে। এরপর একসময় গ্রামটা হয়ে ওঠে ইডেন গার্ডেন, এক বিকেলে সুরভিকে এপ্রোচ করে বসে সাজ্জাদ, আদিশয়তানের চেয়েও সতর্কতায়। সুরভি মানে করে নি, একবার, জাস্ট একবার। এমন কিছু নয়। ছেলেদের জীবনে দুয়েকটা ভুল তো হতেই পারে।

তবে ভুল করলে মেয়েরা অন্তঃস্বত্তা হয়ে যায়। সমস্যাটা হচ্ছে এখানে। এবং একটা কেয়ারটেকারের মেয়ে কখনোই সৈয়দ ইফতেখার মাহমুদের ছেলের বৌ হতে পারে না।

সৈয়দ সাহেব প্রথম যখন সংবাদটা শোনেন, তাঁর ইচ্ছে হয় সাজ্জাদকে মাটিতে পুঁতে ফেলতে, এই কুলাঙ্গারের জন্য তাঁর এতোদিনের তিল তিল করে গড়ে তোলা শক্ত অবস্থান থেকে উৎসারিত সামাজিক সম্মান বেনো জলে ভেসে যাবে? সাজ্জাদ জ্যান্ত কবরস্থ হওয়ার হাত থেকে বেঁচে যায়, আর আপুর ইন্টারভেনশনে, শৈশবে মায়ের মৃত্যুর পর থেকে ওর এই বোনটাই ওর কাছে মায়ের মতন। রিনভি তার ভাইটাকে বড্ড বেশি ভালোবাসে, এতো হীরার টুকরা ছেলে এই জামানায় আরেকটা পাওয়া যাবে না, খানকি মাগি ছলাকলা করে ওর বোকাসোকা ভাইটার মাথা খেয়ে পেট বাঁধিয়ে বসেছে এটা কি সাজ্জাদের দোষ নাকি? ঘটনা প্রকাশ পেলে আব্বুর রেপুটেশন নষ্ট হবে। পুরো ব্যাপারটা ঠাণ্ডা মাথায় ডিল করতে হবে। রিনভির পরামর্শে সৈয়দ সাহেব রীতিমতো চমৎকৃত হন, তাঁর আদরের মেয়ের মাথা কি ঠাণ্ডা, একেবারেই সাজ্জাদের মতো নয়। জামা থেকে দাগ মোছার প্রক্রিয়া শুরু হয়।

সুরভির বাবার পায়ে ধরে ক্ষমা চান সৈয়দ সাহেব, লোকটাকে বলেন এক্ষুনি বিয়ে হবে আর টাকাপয়সা যা লাগে সব তিনিই দেবেন, মেয়ের বাপের কোনো খরচ করা লাগবে না। আপাতত কাজী ডেকে তিন কবুল হয়ে যাক, সুরভিকে নিয়ে তিনি সপরিবারে রওনা দেবেন ঢাকায়, পরে সুরভিকে বাবা আর তার দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মানুষজনকে ঢাকায় ডেকে ধূমধাম করে আনুষ্ঠানিকতা সাড়া যাবে। সুরভির বাবা সৈয়দ ইফতেখার মাহমুদকে বিশ্বাস করেন। এরই মধ্যে একবার সৈয়দ সাহেবের মন বিদ্রোহ করে বসে, মেয়েটাকে একটা ক্লিনিকে নিয়ে গিয়ে গোপনে এমআর করিয়ে ফেললেই তো হয়ে যেতো, এতো ঝামেলায় যাওয়ার প্রয়োজন ছিলো না। কিন্তু পরমুহূর্তেই তিনি তার সেন্স ফিরে পান। এতো প্রাইমারি স্টেইজে এমআর করানো যায় না। দেরী করলে লোকজানাজানি হয়ে কেলেংকারি ঘটে যাবে।

সেই ঝড়বৃষ্টির রাতে, সাজ্জাদের আদরের আগুনে যখন গলে যাচ্ছিলো সুরভি, তখন সে কল্পনায়ও ছিলো না যে বায়াত্তর ঘণ্টার ভেতরে একটা ইটের ভাটায় তাকে ফেলে দেয়া হবে এবং তার দেহ গলে যাবে আক্ষরিকার্থিক আগুনে। সুরভির বাবাও হঠাৎ করেই গুম হয়ে যান, সব ব্যবস্থা পাকা করে রাখা হয়েছিলো, এই ঘটনায় পুলিশ একটা টুঁ শব্দ করে নি। সৈয়দা রিনভি আহমেদের পরিকল্পনায় ফাঁক থাকে না, আর তার বাবার হাত অনেক লম্বা, আইনের হাতের চেয়েও লম্বা।

সাজ্জাদ শুরুতে রিনভির ওপর ভীষণ রাগ করেছিলো। কিন্তু ওর ধৈর্যশীল বোন ওকে বিষয়টা বুঝিয়েছে। হাতের পাঁচ আঙুল সমান হয় না ভাইয়াটা। তোর সাথে তো প্রিসিলার বিয়ে দেবে আব্বু। ও কতো সুন্দর মেয়ে, কতো উচ্চশিক্ষিত মেয়ে, ওকে আমরা রাণী করে রাখবো বাসার। আর আমাদের দুই ফ্যামিলির বন্ডটাও দৃঢ়তর হবে। অই ফকিন্নি মেয়েটার কথা ভুলে যা বাবু, ওটা একটা একসিডেন্ট, জাস্ট ভুলে যাবে।

আস্তে আস্তে সাজ্জাদ বুঝতে পেরেছে রিনভিই ঠিক। একটা একসিডেন্ট জীবন গড়ে দিতে পারে না। জামায় দাগ পড়লে তা মুছে ফেলতে হয়, আর অনাকাঙ্খিত দাগের, কোনো অধিকার নেই কাউকে স্মৃতিকাতর করে তোলার।

রিনভির প্রতি কৃতজ্ঞতায় ভরে উঠলো সাজ্জাদের মন। আমার বুদ্ধিমতি আপুটা। ও না থাকলে আমি এখন জেলে যেতাম।

ওর দুলাভাইটা এই সবের কিছু জানে না। সে ব্যস্ত তার ইন্টারন্যাশনাল বিজনেসের জগত নিয়ে। আজ সিঙ্গাপুর থাকে তো কাল থাকে দুবাই। জানলেও অবশ্য তেমন কোনো সমস্যা হতো না। বৌয়ের ফ্যামিলির ব্যাপারে তাঁর আগ্রহ অত্যন্ত সীমিত। সাজ্জাদদের সাথে সে একটা দূরত্ব বজায় রাখে। সাজ্জাদ অনেক চেষ্টা করেছে এর কারণ উদঘাটনের জন্য, কিন্তু পারে নি, শেষে বিরক্ত হয়ে হাল ছেড়ে দিয়েছে।

আজ অনেকদিন পর, প্রিসিলার পাশে বসে যখন নিজেকে রাজকুমার মনে হচ্ছিলো সাজ্জাদের, তখন এই রঙিন উৎসবের দিনে মানুষের স্মৃতির মতোই ধূসর সুরভির আকস্মিক অনাকাঙ্খিত উপস্থিতি - হোক না দৃষ্টিভ্রমে – সাজ্জাদকে যেনো মাটিতে নামিয়ে আনলো। সুরভির চোখে কি প্রশ্ন ছিলো তা সে পুরো অনুষ্ঠান জুড়েই ভাবলো, থাকলো অন্যমনস্ক, বাসররাতে প্রিসিলার সাথে গল্প করার সময়টা থেকে শুরু করে তাঁকে বিবস্ত্র করার সময়টা পর্যন্ত এই চিন্তা তাঁকে রেহাই দিলো না। ফজরের সময় যখন প্রিসিলা উন্মত্তের মতো তার পিঠে খামচি দিয়ে যাচ্ছে, বীর্যস্খলন ঘটছে তার, ঠিক সেই মুহূর্তে সাজ্জাদ বুঝতে পারলো সুরভির ক্লান্ত চোখ দুটির প্রশ্নটা কি ছিলো।

“তোরা আমার মাসুম বাচ্চাটারে খুন করলি ক্যান?”

বিভাগ: 

Comments

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

ইরফানুর রহমান রাফিন
ইরফানুর রহমান রাফিন এর ছবি
Offline
Last seen: 1 week 4 দিন ago
Joined: মঙ্গলবার, এপ্রিল 12, 2016 - 3:38অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

কু ঝিক ঝিক

ফেসবুকে ইস্টিশন

SSL Certificate
কপিরাইট © ইস্টিশন.কম ® ২০১৬ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর