নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 16 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • বিজয়
  • আল আমিন হোসেন মৃধা
  • পৃথু স্যন্যাল
  • রাজিব আহমেদ
  • নীল কষ্ট
  • জেন রসি
  • নুর নবী দুলাল
  • সার্জিন শরীফ
  • মূর্খ চাষা
  • তায়্যিব

নতুন যাত্রী

  • গোলাম মাহিন দীপ
  • দ্য কানাবাবু
  • মাসুদ রুমেল
  • জুবায়ের-আল-মাহমুদ
  • আনফরম লরেন্স
  • একটা মানুষ
  • সবুজ শেখ
  • রাজদীপ চক্রবর্তী
  • নাজমুল-শ্রাবণ
  • চিন্ময় ভট্টাচার্য

আপনি এখানে

পাহাড়ের এক মা ও তাঁর হাজার সন্তানের কান্না


হাতে হাতকড়া, তার সাথে দড়ি বাঁধা রয়েছে। দড়ির একপ্রান্তে পুলিশ দাঁড়িয়ে। শুধু হাতকড়া নয়, পায়ে ডান্ডাবেরি ও গায়ে বুলেটপ্রুপ জ্যাকেট। এ যেন এক কুখ্যাত খুনী বা দাগী কোন অপরাধীকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আর সে তখন চোখে অশ্রু নিয়ে তার মাকে শেষ বিদায় জানাচ্ছিল।
হ্যাঁ, বিপুলের কথাই বলছি। আমার বন্ধু বিপুল, কলেজের সহপাঠী বিপুল, রাজনীতির কমরেড বিপুল আর পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক বিপুল চাকমা।

মায়ের শেষকৃত্যে বিপুল যেন অংশগ্রহণ করতে পারে সেজন্য কিছু ঘন্টার জন্য (৭ঘন্টার কথা বলা হলেও সময়টা কমিয়ে আনা হয় আইনি জটিলতার কথা বলে) সাময়িকভাবে প্যারোলে মুক্তি দেয়া হয় তাকে। কিন্তু তার সাথে আচরণ করা হয় যেন ফাসিঁর কোন আসামিকে এক জেলখানা থেকে আরেক জেলখানায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে!!!!

এ এক সভ্য রাষ্ট্রের আচরণ, এ এক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের আচরণ একজন রাজনৈতিক নেতার প্রতি, একজন সন্তানের প্রতি, একজন মানুষের প্রতি। ২৩ অক্টোবর যখন বিপুল চাকমা তার ক্যান্সারে আক্রান্ত মাকে নিয়ে পানছড়ি থেকে চট্টগ্রামে যাচ্ছিল, তখন নিরুদেবী চাকমা রক্তবমি করছিলেন। শরীরের অবস্থা ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছিল। তাই চট্টগ্রামের ভালো কোন হাসপাতালে পৌছানোর তাড়া ছিল খুব বেশি। এজন্য মাইক্রোবাসে করে নিয়ে যাচ্ছিল বিপুল তার বাবাকে সাথে করে।
এর আগেও তার মা কয়েক মাস ধরেই অসুস্থ বোধ করছিলেন। খাগড়াছড়ি হাসপাতালেও সপ্তাহখানেক ভর্তি হয়েছিলেন মাথার তীব্র ব্যথা যা পরে ক্যান্সার হিসেবে ডাক্তাররা সন্দেহ পোষণ করেছিলেন। তাই উন্নত চিকিৎসার জন্য বিপুল তার মাকে নিয়ে যাচ্ছিল বিরাট ঝুকিঁ নিয়ে। পাহাড়ের রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের প্রতি প্রশাসনের এমনিতেই বিরূপ মনোভাব ছিল। তাই, যে কোন কিছু হওয়ার আশঙ্ক্ষা থাকা সত্ত্বেও মাকে চট্টগ্রামে নিয়ে যাওয়ার জন্য নিজের গ্রাম লোগাং এ ফিরেছিল বিপুল।
চট্টগ্রাম যাওয়ার পথে পানছড়ি পুলিশ থানার সামনে তাদের মাইক্রোবাসটি আটকানো হয়। এরপর পানছড়ি থানার ওসি জব্বার বিপুলের উদ্দেশ্যে গালিগালাজ করতে শুরু করে। বিপুল তখন অনুরোধ করে অসুস্থ মায়ের সামনে যেন গালিগালাজ করা না হয়। কিন্তু তার এই অনুরোধ মানা হয়নি বরং ক্ষীপ্ত হয়ে আরো উচ্চস্বরে গালির বর্ষণ চালায় ওসি। এরপরে তাকে মাইক্রোবাস থেকে টেনে-হিচড়ে নামানো হয় এবং থানায় আটক করা হয়।

এদিকে তার মা নিরুদেবী নিজের একমাত্র ছেলের প্রতি পুলিশের আচরণ দেখে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন এবং আরো অসুস্থ হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। পরে তাকেঁ খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। বিপুলের পরিবারের এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা এগিয়ে আসেন। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, উপজেলা চেয়ারম্যানরা বিপুলের আটকের ঘটনায় ওসির সাথে দেখা করেন। তখন বিপুল বলেছিল,” জেলে যাচ্ছি যখন নিয়ে যাক। কিন্তু আমার মা ভীষণ অসুস্থ, আপনারা একটু দেখে রাখুন।“ আটকের ঘন্টাখানেক পড়েই তাকে পানছড়ি থানা থেকে খাগড়াছড়ি সদর থানায় স্থানান্তর করা হয়।
কিন্তু নিরুদেবী চাকমা এই ধাক্কা আর সহ্য করতে পারেননি। সেদিনই রাত ৩টার সময় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
গতকাল ২৫ অক্টোবর বিপুলের মায়ের শেষকৃত্য করা হয়। তখন, মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিপুলকে সাময়িক মুক্তি (প্যারোল) দেয়া হয় যেন সে শেষকৃত্যে যেতে পারে!!!!!
অসুস্থ মায়ের সামনে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজের পর টেনে-হিচড়ে নিয়ে গ্রেপ্তার করার পর মায়ের চিতায় আগুন দেয়ার জন্য সাময়িক মুক্তি, এ যেন এক অবাস্তব কোন ঘটনা। কিন্তু বিপুলের জীবনে এটাই বাস্তব হয়ে এসেছে। যে বিপুল চাকমা একটি বৃহৎ সংগঠনের নেতৃত্ব পর্যায়ে থাকা সত্ত্বেও কখনো ক্ষমতার অপব্যবহার করেনি, কোনরূপ সংঘাতের সাথে ব্যক্তিগতভাবে নিজেকে জড়ায়নি, কখনো উচ্চস্বরে কাউকে কথা বলতেও আমি দেখিনি কখনো, আজ তারই সামনে এটি সত্য হয়ে এসেছে। নিজের সংগ্রামের প্রতি, নিজের দলের প্রতি, নিজের জাতিসত্তার প্রতি তার যে ত্যাগ, এ পিছনে তার মায়ের অনুপ্রেরণা মোটেও কম নয়।

বরং সবচেয়ে বেশি। পরিবারের একমাত্র ছেলে সন্তান হওয়ার পরও তার মা তাকে ঠেলে দিয়েছে সংগ্রামের পথে, মুক্তির পথে। যে সমাজে মা-বাবারা চান তাদেঁর ছেলে বা মেয়ে পরিবারের ভরণপোষণ করুক, চাকরি করুক সে সমাজের একজন হিসেবে তিনি তা চাননি। এ যেন জাহানারা ইমামের মতোই আরেক মা, যিনি মা হিসেবে তাঁর ছেলেকে উৎসর্গ করেছিলেন জাতিসত্তার মুক্তির সংগ্রামের জন্য। তাই আজ এই মা আজ শুধু বিপুলের মা নন, নিরুদেবী চাকমা আজ পাহাড়ের প্রতিটি সংগ্রামী মানুষের মা। সেই মায়ের মৃত্যু আজ আমাদের পাহাড়কে কাঁদিয়েছে, সেই মায়ের মৃত্যু আজ কিছু তেজোদীপ্ত মানুষের জন্ম দিয়েছে যারা শোককে শক্তিতে পরিণত করার সাহস রাখে।
মায়ের মৃতদেহের সামনে দাঁড়িয়ে চোখে কান্না আর বুকে আগুন নিয়ে বিপুলের বক্তব্য,

আমি জেলে আছি। পুলিশ আমাকে ধরে নিয়ে গিয়েছে। তা নিয়ে আমার কোন আফসোস নেই। নির্যাযিত-নিপীড়িত মানুষের পাশে থাকার প্রত্যয়ে রাজপথে থাকার সংগ্রামে যদি আমাকে ভোগান্তির শিকার হতে হয়, যদি সারা জীবনও আমাকে জেলের অন্ধ প্রকোষ্ঠে কাটাতে হয়, যদি আমার জীবনকেও উৎসর্গ করতে হয় তাকে আমি বরণ করে নেবো। এ নিয়ে আমার কোন আফসোস নেই। কিন্তু আফসোস একটাই, আমি আমার শেষ আশীর্বাদ নিতে পারলাম না। তার শেষ কথা আমি শুনতে পারলাম না। আমার মায়ের জন্যও আফসোস হয়, আমার মা শেষ বারের জন্য মা ডাকটি শুনতে পেলো না। আমার মা নেই, কিন্তু আমি মনে করি আমি যে পথের অনুসারী, আমি যে সংগঠনের হয়ে কাজ করে যাচ্ছি, এই আদর্শবাদী সংগঠনের একজন হিসেবে আমি রাজনীতিতে যুক্ত আছি, এই রাজনীতির পথে যদি আমি অবিচল থাকতে পারি তবে শুধু আমার মা কেন, পুরো পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিটি মা আমার পাশে থাকবে। আমার বা আমার পরিবারের যে কোন বিপদে তারা পাশে এসে দাঁড়াবে এ আশা আমি ব্যক্ত করছি।

এ এক মায়ের সন্তান হিসেবে, পাহাড়ের সন্তান হিসেবে, পাহাড়ের মুক্তি সংগ্রামের একজন হিসেবে পাহাড়ের প্রতিটি মায়ের প্রতি ভালোবাসা-আস্থার বহিঃপ্রকাশ যেন।
আমরা এক নিষ্ঠুর সমাজে বাস করছি। যে সমাজ নৈতিক ভাবে মানুষকে স্খলিত হতে শেখায়, মানুষের প্রতি মানুষের বিশ্বাসহীনতা শেখায়, সবকিছু নিজের করে নিতে শেখায় সে সমাজের একজন মা হিসেবে নিরুদেবী চাকমা এক অনন্য হয়ে থাকবেন। বিপুল প্রতিটি মাকে তার নিজের করে নিতে চেয়েছে, কিন্তু আমরা তার জন্মধাত্রী মাকে নিজের মা হিসেবে আজ বরণ করে নিলাম। আমার আরেক মায়ের নাম নিরুদেবী চাকমা।

আজ আমার এই মা পৃথিবীতে নেই। কিন্তু পরে তিনিই পাহাড়ের প্রতিটি মায়ের বুকে দ্রোহের এই আগুন সৃষ্টি করবেন, প্রতিটি মাকে তিনি প্রেরণা যোগাবেন যুগের পর যুগ ধরে।
মৃত মায়ের প্রতি তার হাজারো সন্তানের একজন হিসেবে শ্রদ্ধা ও গভীর ভালোবাসা প্রকাশ করছি।

বিভাগ: 

Comments

মুশারফ হোসেন সৈকত এর ছবি
 

আইনে যা আছে, তা ভঙ্গ করলে শাস্তি পেতেই হবে, কোনো কৈফিয়ত না। যদি এক বিপুল চাকমাকে তার অপরাধ অগ্রাহ্য করতে বলা হয়, তাহলে সেই একই অগ্রাহ্যকরন আমিসহ সবার জন্য করা হোক।

 
অজল দেওয়ান এর ছবি
 

বুঝায়ে বলবেন ভাই??? কথাটা একটু কটমটে লাগছে।

অজল দেওয়ান

 
মুশারফ হোসেন সৈকত এর ছবি
 

কথাটা যা, তাই। বিপুল চাকমা যা অপরাধ করেছে, তার জন্য সেটা আদালতের হাতে ছেড়ে দেওয়া হোক। রাজনীতির কমরেড বা যাই পদ হোক না কেনো, পরিবারের যাই অবস্থা হোক না কেনো, সেটা নিয়ে নাকিকান্না কেনো?

 
ইকারাস এর ছবি
 

বিপুল চাকমা কি অপরাধ করেছে সৈকত সাহেব? আপনি কি তার অপরাধ সম্পর্কে জানেন? রাষ্ট্র বিনা অপরাধে কি আটক-হয়রানী করছে না?

 
অজল দেওয়ান এর ছবি
 

বিপুল চাকমার অপরাধের কিছু বর্ণনা দেই।

প্রধানমন্ত্রী একবার খাগড়াছড়িতে এসেছিলেন। তখন ইউপিডিএফ তার অধিকার আদায়ের দাবি নিয়ে অবরোধ কর্মসূচী দিয়েছিল। তারা প্রধানমন্ত্রীর সামনে কাচুমাচু না হয়ে আন্দোলন করেছিল। এটাই ছিল বড় অপরাধ।

এর চেয়ে আর কি বড় হতে পারে কোন অপরাধ????

অজল দেওয়ান

 
অজল দেওয়ান এর ছবি
 

হুম। কথা যা সেটাই। তাই তো এতদিন ধরে বিপুল খাগড়াছড়িতে আছে তখন তাকে গ্রেপ্তার করা হয়নি কেন?? তার মা যখন হাসপাতালে ভর্তি ছিল তখন পুরোটা সময়ই তার মায়ের সাথে ছিল। তখন পুলিশের গোয়েন্দা কোথায় ছিল?? নাকি দেখতে পায়নি???

বিপুল রাজনৈতিক মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছে। সরকার পিসিপি'র নেতাকর্মীদের পিছনে মামলার লাইন লাগিয়ে রেখেছে। আচ্ছা, ঠিক আছে। আইন ভঙ্গ বলে কথা!!! কিন্তু অপরাধটা কি ছিল??? জাতিসত্তার মুক্তি আন্দোলনে যুক্ত থাকা?? নাকি পাহাড়ে রাষ্ট্রযন্ত্র-আর্মিদের বিরুদ্ধে কথা বলা???
/////রাজনীতির কমরেড বা যাই পদ হোক না কেনো, পরিবারের যাই অবস্থা হোক না কেনো, সেটা নিয়ে নাকিকান্না কেনো?/////

কে নাকি কান্না করছে??? নাকি কান্না দেখতে পান, আধিপত্যবাদ বিস্তার দেখতে পান না????

অজল দেওয়ান

 
নিশান চাকমা এর ছবি
 

সেই মায়ের মৃত্যু আজ আমাদের পাহাড়কে কাঁদিয়েছে, সেই মায়ের মৃত্যু আজ কিছু তেজোদীপ্ত মানুষের জন্ম দিয়েছে যারা শোককে শক্তিতে পরিণত করার সাহস রাখে।

এই মানুষগুলোকে ভীষণ দরকার এখন, সময়ের প্রয়োজনে।

 

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

অজল দেওয়ান
অজল দেওয়ান এর ছবি
Offline
Last seen: 2 weeks 3 দিন ago
Joined: শুক্রবার, জুন 6, 2014 - 11:16পূর্বাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

কু ঝিক ঝিক

ফেসবুকে ইস্টিশন

SSL Certificate
কপিরাইট © ইস্টিশন.কম ® ২০১৬ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর