নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 2 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • নুর নবী দুলাল
  • শাম্মী হক

নতুন যাত্রী

  • চয়ন অর্কিড
  • ফজলে রাব্বী খান
  • হূমায়ুন কবির
  • রকিব খান
  • সজল আল সানভী
  • শহীদ আহমেদ
  • মো ইকরামুজ্জামান
  • মিজান
  • সঞ্জয় চক্রবর্তী
  • ডাঃ নেইল আকাশ

আপনি এখানে

কেন হিন্দুরা এরকম? | তথাগত রায়


তথাগত রায়ঃ মানুষের চেয়ে অনেক নীচ প্রাণী, একটা সাপ বা বেড়ালের লেজে পা পড়লে সে ফোঁস করে উঠে। মানুষের মধ্যেও অতি দরিদ্র, আধুনিক সভ্যতার সঙ্গে সম্পর্কবিহীন অরণ্যবাসীরও যদি ঘর ভেঙ্গে দেবার চেষ্টা করা হয়, বা মহিলাদের দিকে লোভের হাত বাড়ানো হয়, তাহলে সে উল্টে মারতে চেষ্টা করে। পৃথিবীর যে কোনও প্রান্তের যে কোনও মানুষকে যদি কোনওভাবে হেনস্থা করা হয়, তাহলে সে প্রত্যুত্তর দেবার চেষ্টা করবেই, প্রতিপক্ষ যদি প্রবল হয়, তবুও। এর আধুনিকতম উদাহরণ পাকিস্তানে ওসামা বিন লাদেন নামক নরপশুকে খুঁজে বের করে আমেরিকার তাকে হত্যা। কারণ সে আমেরিকার মাটিতে বহু নিরপরাধ মানুষের হত্যা ঘটিয়েছিলে। শুধু একটি ব্যতিক্রম আছে। তার নাম — হিন্দু।

এই ব্যতিক্রমের চেহারাটা কী ? সংক্ষেপে বলা যায়, বাংলা প্রবাদ —কিল খেয়ে কিল চুরি করা। হিন্দুর, অন্তত বহু হিন্দুর স্বভাবের মধ্যে আমরা কুকীর্তি গোপন করার একটা অদ্ভুত চেষ্টা দেখতে পাই। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, সে কুকীর্তি নিজের নয়, অন্যের এবং নিজের বিরুদ্ধে ধাবিত। আমি যদি মানুষ খুন করি ,লোকের ঘরে আগুন দিই, নারীহরণ করি, তাহলে সেটা গোপন করার চেষ্টা আমি করবই। সেটা গর্হিত, কিন্তু একই সঙ্গে স্বাভাবিক। অপরপক্ষে আমাকে যদি কেউ খুন করার চেষ্টা করে, আমার ঘরে আগুন দেয়, আমার মা -বোনের হাত ধরে টানাটানি করে তাহলে আমার স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া কি হবে ? অবশ্যই, যে কোনও আত্মসন্মানসম্পন্ন মানুষের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হবে —'প্রতিবাদ করা, প্রতিরোধ করা, প্রয়োজন হলে প্রতিশোধ নেওয়া ’। কিন্তু যদি উল্টে আমি সেই হত্যাকারী, ঘরপোড়ানো বা কামুকের কাজের সপক্ষে সাফাই দেবার চেষ্টা করি, তাহলে আমাকে কি বলা হবে ? 'মহান' ? 'ক্ষমাশীল’ ? 'উদার ’? নাকি বলা হবে ক্লীব, নপুংসক ?

কোন্ টা বলা হবে সেটা মূল্যবোধের উপর নির্ভর করে। কিন্তু মূল্যবোধ ঠিক না ভূল সেটা কি করে সাব্যস্ত হবে ? সম্ভবত এটাই সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন। মূল্যবোধ সামাজিক অবস্থার উপরে, ক্রমবিকাশের উপরে, ধর্মীয় বিশ্বাসের উপরে, এমনকী ভৌগলিক অবস্থানের উপরেও নির্ভর করে। একটা ছোট উদাহরণ দিই —শীতপ্রধান দেশের মানুষের কাছে রোদ জিনিসটা এতো প্রিয়, যে সামান্য রোদ উঠুক বা একেবারে চাঁদিফাটা গড়মই পড়ুক, তারা রোদ উপভোগ করার জন্য পাগল হয়ে যায় এবং স্ত্রী পুরুষ নির্বিশেষে সমুদ্রতীরে এসে প্রায় নগ্ন বা সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় শুয়ে থাকে। এটা পুরোপুরি ভৌগলিক অবস্থাজনিত এবং আমাদের চোখে বিকট, কিন্তু ওদের জিজ্ঞাসা করলে ওরা আশ্চর্য্য হয়ে বলবে, এতে আপত্তি করার কি আছে ? আমি নগ্ন হয়ে রোদে শুয়ে আছি, আমি তো কারুর কোনও ক্ষতি করছি না! অপরপক্ষে, ধর্মীয় বিশ্বাস এই একই ব্যপারে মানুষকে এমন উল্টোপথে চালনা করে যে, ভাদ্র মাসের অসহ্য ভ্যাপসা গরমেও রক্ষণশীল মুসলমান মহিলাকে বোরখা পরিধান করে ঘুরতে হয়। সেই মহিলা যে সবসময় ব্যাপারটা ইচ্ছার বিরুদ্ধে করেন তা নয়, প্রবল ধর্মবিশ্বাসে চালিত হয়েই হয়ত করেন, এবং কেউ আপত্তি করলে একই উত্তর দিতে পারেন —আমি তো কারুর ক্ষতি করছি না।

সামাজিক অবস্থার উপর মূল্যবোধের ভিত্তিটা প্রায় স্বতঃসিদ্ধ -এই হিন্দু বাঙ্গালী সমাজেই, কলকাতার উচ্চবিত্ত পরিবারে ধরা যাক, মদ্যপানের বিষয়ে যে মূল্যবোধ বিদ্যমান তা গ্রামের বা মফঃস্বল শহরের নিন্মবিত্ত মানুষের মূল্যবোধ থেকে অনেকটাই আলাদা। ক্রমবিকাশের উপরেও মূল্যবোধ নির্ভরশীল। একসময় দস্যু, তস্করদের ও পতিত হিন্দুদের মধ্যে নরবলি দিয়ে ভদ্রকালীর পূজা করা প্রচলতি ছিল। আজকের দৃষ্টিতে এর প্রথমটি ঘৃণ্য, দ্বিতীয়টিও নিরানব্বই শতাংশের দৃষ্টিতে পরিহারযোগ্য। খৃস্টানদের মধ্যে মধ্যযুগে অবিশ্বাসী বা ডাইনি সন্দেহে মানুষকে খুঁটিতে বেঁধে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারা হত (যেমন জোয়ান অফ আর্ক -কে হয়েছিল)। পোপ দশম লিও ঘুষ নিয়ে লোকের পাপস্খলন করে দিতে (যার প্রতিবাদে মার্টিন লুথার, কলভিন ইত্যাদিরা পোপের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন)। আজকের খৃস্টান সমাজে নিশ্চই কেউ এসব সমর্থন করবেন না। এই ক্রমবিকাশ ব্যাপারটা কিন্তুু থমকে দাঁড়িয়েছে ইসলাম ধর্মে। ইসলামে কোন প্রশ্ন করার বা সন্দেহ প্রকাশ করার সুযোগ নেই। কোরান (অর্থাৎ আল্লাহতালার মুখনিঃসৃত বাণী) এবং হাদিস (অর্থাৎ শেষ নবী হজরত মহম্মদ যা বলতেন, করতেন, বা অনুমোদন করতেন) -কে একেবারে অনুভাবে মানতে হবে। যারা তা মানবে না তাদের বলা হবে 'মুনাফেক'। অর্থাৎ মুসলিম মূল্যবোধ পুরোপুরি কোরান -হাদিস -আশ্রয়ী এবং আদৌ ক্রমবিকাশযোগ্য নয়। এমনকি ইসলাম ব্যখ্যারও সুযোগ নেই। বলা হয়ে থাকে ব্যাখ্যা বা 'ইজতেহাদ'-এর দরজা খৃষ্টিয় সপ্তম শতাব্দীতে বন্ধ হয়ে গেছে।

এত কথা বলা হলো শুধু এটা বোঝানোর জন্য যে, যে কোনও সমাজের মূল্যবোধ তৈরির নানা উপাদান আছে। সেই উপাদানের ভিত্তিতে মূল্যবোধ তৈরি হয় কিন্ত যে চারটে উপাদানের কথা বলা হলো, সেগুলো ছাড়া কি মূল্যবোধের অন্য কোনও উপাদান আছে ? উত্তর, হ্যাঁ আছে, অন্তত ভারতীয় হিন্দুদের ক্ষেত্রে আছে। সেই উপাদানের নাম রাজনীতি। এবং এই নিবন্ধে আমার প্রমাণ করার উদ্দেশ্য যে এই পঞ্চম উপাদানটি (অর্থাৎ রাজনীতি) একটি ভয়ঙ্কর উপাদান এবং এটি হিন্দুর মূল্যবোধকে আমুল বিকৃত করেছে। বস্তুত, 'হিন্দুরা কেন এরকম’ -এই প্রশ্নের উত্তর নিহিত আছে এই পঞ্চম উপাদানের মধ্যেই। এবং (আমার মতে) হিন্দুর আসন্ন সর্বনাশের কারণ মূলত এর মধ্যেই নিহিত আছে।

কেন রাজনীতি ভয়ঙ্কর.? তা তো আমি বলিনি, রাজনীতি মোটেই ভয়ঙ্কর নয়, রাজনীতিবিহীন শাসনব্যবস্থা হচ্ছে পাকিস্তানে যা চলে। কিন্তু রাজনীতির উপর ভিত্তিকৃত মূল্যবোধ ভয়ঙ্কর। কারন, রাজনীতি ভিত্তি নীতি নয়, রাজনীতির ভিত্তি বৃহৎ এবং ক্ষুদ্র স্বার্থ, সেই স্বার্থের ভিত্তিতে টানাপোড়েন, কিছু দেওয়া, কিছু ছাড়া গোছের মনোবৃত্তি। সাময়ীক লাভের জন্য দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ জলাঞ্জলি দেওয়া, ক্ষমতার জন্য নীতিকে বর্জন করা। রাজনীতির মধ্য নিশ্চইয় আদর্শের একটা বড় জায়গা আছে, থাকা উচিৎ। অতীব দুঃখের বিষয়, সে জায়গাটা স্বাধীন ভারতে উত্তরোত্তর ক্ষুদ্রতর হয়ে আসছে। এহেন রাজনীতির উপর যদি মূল্যবোধ ভিত্তিকৃত হয় তাহলে সর্বনাশ অবশ্যম্ভাবী। দুঃখের বিষয়, আজকের হিন্দু সমাজ এই সর্বনাশের শিকার এবং এই সর্বনাশ আমাদের হিন্দু সমাজকে আরও সমূহ সর্বনাশ অর্থাৎ অস্তিত্ব লোপের দিকে টেনে নিয়ে চলেছে। কি করে সেটাই দেখা যাক।

এর সূচনা হয়েছিল ১৯২০ -র দশকে, খেলাফৎ নামক এক আন্দোলনে হিন্দু সমাজকে সামিল করতে গিয়ে। করতে গিয়েছিলেন মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। প্রথম মহাযুদ্ধে (1914-18) তুরস্ক জার্মানীর পাশে ছিল এবং হেরে যায়। এই যুদ্ধের আগে ইসলামী তীর্থ মক্কা -মদিনা তুরস্কের সুলতানের অধিনায়ক ছিল, ফলে সুলতানের অন্যতম উপাধি ছিল খলিফা অর্থাৎ সমস্ত মুসলিমদের প্রধান। যুদ্ধ পরবর্তী পরিস্থিতিতে সুলতানের এই খলিফা পদ কেড়ে নেওয়া হয়, এবং তারই প্রতিবাদে খেলাফৎ আন্দোলন। এটি একটি সম্পূর্ণ পশ্চাদমুখী, মৌলববাদী আন্দোলন, এতে ভারতের মুসলমানের জড়িত থাকার কোনও কারণ নেই। হিন্দুর তো নেই -ই। কিন্তুু গান্ধী 'হিন্দু -মুসলিম ঐক্য জোরদার করার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এই আন্দোলনে হিন্দু সমাজকে সামিল করতে চেষ্টা করলেন এবং তারই ফলে সর্বনাশের সূত্রপাত।

গান্ধী অসাধারণ বুদ্ধিমান রাজনৈতিক নেতা ছিলেন এবং বুঝেছিলেন যে ভারতবাসী ধর্ম ছাড়া কিছু ভাবতে পারে না। স্বামী বিবেকানন্দ যে বলেছিলেন, ভারতবাসীর হৃদয় থেকে ধর্মকে উৎখাত করার চেষ্টা গঙ্গাকে সাগর থেকে ঠেলে হিমালয়ে তুলে নতুন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টার তুল্য। গান্ধী তাতে পুরোপুরি বিশ্বাসী ছিলেন (যদিও কখনও খোলসা করে তা বলেননি)। সেজন্য তিনি রাজনীতিকের পোষাক না পরে সাধুর পোষাক পরলেন -খালি গা, হেঁটো ধুতি, রামধুন গান সম্বল করলেন। ফলে ভারতবাসীর যে ধর্মবিশ্বাসের ভিত্তিতে মূল্যবোধ তৈরি হবার কথা ছিল, তার ব্যাখ্যা করে দিলেন রাজনীতিক গান্ধী। তিনি ধর্মের মোড়কে রাজনীতিকে দেশবাসীর কাছে এগিয়ে দিলেন। গান্ধী জানতেন, এই জিনিস হিন্দু সমাজ নিয়ে নেবে। এও জানতেন যে ইসলাম শুধু religion নয়, religion এবং politics, খোলা তরোয়াল হাতে যুদ্ধ করে এবং শত্রুকে ইসলাম কবুল করাবার বা শিরচ্ছেদ করার মাধ্যমেই ইসলাম ছড়িয়েছে। এই দুই রাজনীতিকে গান্ধী মেলাবার চেষ্টা করলেন, ভাবলেন এতে হিন্দু -মুসলমান -ঐক্য তৈরি হবে।

সেরকম কিছু হলো না, কিন্তু তুরস্কেই খেলাফৎ আন্দোলন ঘা খেল, প্রগতিবাদী, কোরান -হাদিস -বিরোধী কামাল আতার্তুক ক্ষমতায় এসে খেলফতই তুলে দিলেন, পর্দাপ্রথা ও ফেজটুপি পরা বেআইনি ঘোষণা করলেন এবং তুর্কি ভাষাকে আরবী হরফের বদলে রোমান হরফে লিখবার নির্দেশ দিলেন। কিন্তুু এই খেলাফত আন্দোলন করতে গিয়ে ভারতবর্ষের মসজিদে মসজিদে যে অস্ত্র জড়ো করা হয়েছিল তার কি হবে ? সে অস্ত্র একবার প্রয়োগ হলো হিন্দুর বিরুদ্ধে। মালাবার অঞ্চলের (বর্তমান কেরালা) তথাকথিত মোপলা বিদ্রহে প্রায় তিন হাজার হিন্দু খুন হলো, উত্তর -পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের (বর্তমান পাকিস্তানের খাইবার -পাখতুনখোয়া প্রদেশ) কোহাট শহরেও চলল হিন্দুমেধ যজ্ঞ। অমুসলমানকে নিধন করা কোরাণ -হাদিসে উচ্চ -প্রশংসিত পূণ্য কর্ম।

এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে গান্ধী কিন্তু নীরব রইলেন। শুধু তাই নয়, খেলাফৎ আন্দোলনের প্রধান ধ্বজাধারী দুই ভাই, মৌলানা শওকত আলী ও মহম্মদ আলীকে প্রভূত প্রশংসা করতে লাগলেন। আলী ভাতৃদ্বয় কিন্তু পাল্টা প্রশংসা করলেন না। এর আর এক ফল হলো, একজন অত্যন্ত পশ্চিমী মনোভাবাসম্পন্ন মুসলমান ব্যরিস্টার, নাম মহম্মদ আলী জিন্না, যিনি শুয়োরের মাংস খেতেন এবং নমাজ পড়া জানতেন না, তিনি গান্ধীর রকমসকম দেখে ঠিক করলেন, তিনিও. religion কেন্দ্রিক রাজনীতি করবেন এবং তাই ঠিক করলেন। তিনি মুসলিম লীগের নিতৃত্ব দিলেন, কালক্রমে পাকিস্তান দাবি করলেন এবং সেই পাকিস্তান হাসিলও করলেন।

কিন্তু গান্ধী হিন্দু -মুসলিম ঐক্যের ছক ছাড়তে পারলেন না। হিন্দু সমর্থন তো তাঁর আছেই, এটা ধরে নিয়ে তিনি মুসলিম সমর্থন জোগাড় করার জন্য মুসলিম লীগের সঙ্গে (তোল্লা) পাল্লা দিতে মনস্থ করলেন। মুসলিমরাও অংশত তাঁর এই ডাকে সাড়া দেবার ফলে, কংগ্রেসের নীতিই হয়ে গেল, যে কোন মূল্যে মুসলিম সমর্থন জোগাড় করতে এবং ধরে রাখতে হবে, এবং সে জন্য কখনোই কোনও অবস্থাতেই কোনও মুসলিমের কাজের নিন্দা চলবে না। পুরোপুরি রাজনৈতিক উদ্দ্যেশ্যে প্রনীত এই নীতি নেহেরুও সাগ্রহে মেনে নিলেন, মৌলানা আজাদ তো এর পক্ষে স্বাভাবিকভাবেই ছিলেন। কংগ্রেসের মধ্যে এর একমাত্র শক্তিশালী বিরোধী রইলেন সর্দার প্যাটেল। এই কঠোর বাস্তববাদী নেতা চিরকালই মনে করে এসেছেন, এই মুসলিম তোষণ অন্যায়, হিন্দু দোষ করলে যেমন তার নিন্দা করতে হবে, মুসলিম দোষ করলেও তাই -ই করতে হবে।

গান্ধীর এই নীতির বিরোধিতা করেছিলেন আর একজন, তাঁর নাম বিনায়ক দামোদর সাভারকার। কালক্রমে সাভারকারের সঙ্গে এসে যোগ দিলেন এক যুগপুরুষ, বাংলার বাঘ আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় পুত্র ভারতকেশরী শ্যামাপ্রসাদ।

চল্লিশের দশকের গোড়ার দিকে ‘মুসলিম কোনও দোষ করলে চোখ বুজে থাকতে হবে’— এই গান্ধী প্রবর্তিত নীতির ভিত্তি অনেকটাই এঁরা টলিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু চল্লিশের দশকে ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলনের’ জেরে কংগ্রেস নেতারা জেলে গেলেন এবং দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শেষে (১৯৪৫) যখন জেলে থেকে ছাড়া পেলেন তখন হিন্দু জনমত তাঁদের সংগ্রামী নেতার মর্যাদা দিয়ে বরণ করে নিল, সাভারকার ও শ্যামাপ্রসাদ বেশিরভাগ হিন্দুসমর্থন হারালেন। ইতিমধ্যে কংগ্রেসের মুসলিম সমর্থন কিন্তু প্রায় সম্পূর্ণভাবে মুসলিম লীগের কাছে চলে গিয়েছে। ১৯৪৫ -৪৬ নাগাদ যখন ভারতের রাজনীতি সম্পূর্ণভাবে হিন্দু -মুসলিম ভিত্তিতে কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগের মধ্যে মেরুকৃত তখনও কিন্তু গান্ধী-নেহেরু সেই ঐক্যের গান গেয়ে যাচ্ছেন। এরই বশবর্তী হয়ে তাঁরা কলকাতার দাঙ্গা এবং নোয়াখালীর হিন্দু হত্যার সামান্যতম প্রতিবাদও করলেন না, কিন্তু বিহারে যখন এর পাল্টা দাঙ্গা আরম্ভ হল তখন নেহেরু বড়লাটকে পরামর্শ দিলেন, বিমান বাহিনী দিয়ে বিহারে হিন্দুদের উপর বোমা ফেলতে।

এই সব করতে করতে পাকিস্তান হয়ে গেল, এবং পূর্ব (ভারতীয়) পাঞ্জাব ও পশ্চিম (পাকিস্তান) পাঞ্জাব থেকে যথাক্রমে সমস্ত মুসলিম এবং হিন্দু -শিখ বিতাড়িত বা নিহত হল। হিন্দু -মুসলিম ঐক্যের কথা বলেও কোনও পক্ষকেই নিরস্ত্র করা গেল না। কিন্তু গান্ধী পাঞ্জাবে না গিয়ে কলকাতায় চলে এলেন এবং ১৯৪৭ সালের ১৫ আগষ্ট বেলেঘাটায় এক বাড়িতে প্রার্থনা সভা করে পশ্চিমবঙ্গ -পূর্ববঙ্গ লোক বিনিময় রুখে দিলেন। ১৯৪৬ সালের দাঙ্গায় ঘাতক সোহরাওয়ার্দীকেও বাঁচিয়ে দিলেন। পূর্ব -পাঞ্জাবে এবং পশ্চিম পাঞ্জাবে লোক বিনিময় পাঁচ মাসের মধ্যে সম্পূর্ণ হয়ে গেল, কিন্তু পূর্ববাংলা ও পশ্চিম বাংলায় কোনও বিনিময় হলো না। তারপর পাকিস্তান সরকার নিজেরা কোরাণ -হাদিস -নির্দিষ্ট পথে অত্যাচার করে দাঙ্গা বাধিয়ে হিন্দুদের পূর্ববাংলা ছাড়া করতে আরম্ভ করল।

শ্যামাপ্রসাদ তখন কেন্দ্রে মন্ত্রী। ১৯৫০ সালের যখন হিন্দু হত্যা ভয়ানক আকার ধারণ করল, তখন শ্যামাপ্রসাদ নেহেরুকে পরামর্শ দিলেন, পাঞ্জাবের মত বাংলাতেও লোক বিনিময় করতে। নেহেরু তখন আবার ঐক্যের স্বপ্নে ভাসছেন। ইতিমধ্যে পশ্চিমবাংলায় কিছু পাল্টা মুসলিম বিতাড়ন হল। নেহেরু তখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীকে (লিয়াকৎ আলি খান) ডেকে এক চুক্তি করলেন, যার মূল কথা, দুটি দেশই নিজের নিজের সংখ্যালঘুদের দেখবে, তাদের যত্ন করবে। অর্থাৎ যে ডাকাতরা পূর্ববাংলার হিন্দুর ঘরে আগুন দিয়েছিল, তাদেরই ভার দিয়ে দিলেন সেই হিন্দুদের দেখভাল করার জন্য। ফল যা হবার তাই হলো। শ্যামাপ্রসাদ মন্ত্রসভা থেকে ইস্তফা দিলেন, কিন্তু নেহেরুর ঐক্যের স্বপ্ন টোল খেল না। প্রসঙ্গত, এই ব্যাপারটায় প্যাটেল আগাগোড়া শ্যামাপ্রসাদের পক্ষে ছিলেন, কিন্তু নেহেরুর উপর জোর খাটাবার কোনও চেষ্টাই করেননি।

১৯৫০ সালের ডিসেম্বরে প্যাটেল মারা গেলেন। ১৯৫৩ সালের জুন মাসে এক জঘন্য চক্রান্তে শ্যামাপ্রসাদের মৃত্যু হলো। নেহেরুর উপর কথা বলার কেউ রইল না।

১৯৫৩ সাল থেকে ১৯৬৪ নিজের মৃত্যু পর্যন্ত নেহেরু ভারতের একচ্ছত্র সম্রাটের মতো রাজত্ব করেছেন। নিজের অলীক ঐক্যভাবনা দিয়ে দেশভাগ ঠেকাতে না পারলেও অবশিষ্ট দেশের উপর তা পুরোমাত্রায় প্রয়োগ করেছেন। এও আবিস্কার করেছেন যে, যে মুসলিমরা পাকিস্তানে না গিয়ে ভারতে থেকে গেলেন, তারা কংগ্রেসের বাঁধা ভোটার, এঁদের একটু তৈলমর্দন করলে প্রচুর ফায়দা মিলবে। তার ফলে ‘হিন্দু কোড’ তৈরি করেছেন, কিন্তু মুসলিমদের ক্ষেত্রে পুরুষের বহুবিবাহ বা একতরফা বিচ্ছেদ (তিন -তালাক) -এর মতো বিশ্রী প্রথা লোপ করার কোনও উৎসাহ দেখাননি। এবং এইসব সমর্থন করার জন্য সেই ‘বহুর মধ্যে ঐক্য’ ‘সেকুলারবাদ’ ইত্যাদি মন্ত্র জপ করে গিয়েছেন।

(নেহেরু নিজের বিষয়ে বলেছেন- I am a Hindu by accident, a Muslim by culture, and English by education and intellect, and a worshipper of the Soviet sun.। নেহেরু কমিউনিস্ট ছিলেন বলেই কমিউনিস্ট ভূপেশ গুপ্ত -র সঙ্গে নিজকন্যা ইন্দিরার বিবাহের কথা ভেবেছিলেন। ইন্দিরা ফিরোজ খান -কে বিয়ে করলেন। নেহেরু ও তাঁর পরিবারের মুসলিমপ্রীতি এবং হিন্দুবিদ্বেষ সর্ব্বজনবিদিত, ওদের আত্মীয়মহলেও। -ভাঃ সঃ)

কালক্রমে নেহেরুর পাশে বহু স্তাবক জুটেছে। তাঁরা বুঝে ফেলেছেন পণ্ডিতজী কি বললে খুশি হন এঁরা অনেকেই কংগ্রেসী নন, বরং কমিউনিস্ট ভাবাপন্ন -কিন্তু এই বাবদে কংগ্রেসী ও কমিউনিস্টে প্রভেদ সামান্যই। তাই তাঁরা ইতিহাস বিকৃত করেছেন। মুসলিম অত্যাচারের কথা, বলপূর্বক ধর্মান্তরণের কথা গোপন করেছেন। বলেছেন, নিম্নবর্ণের হিন্দু উচ্চবর্ণের কাছে অত্যাচারিত হয়ে সাম্যের মন্ত্র ইসলাম কবুল করেছেন। তা সত্ত্বেও কেন দেশে এত তথাকথিত নিম্নবর্ণের মানুষ থেকে গেলেন তার কোনও জবাব দেননি। অভীষ্ট ফল ফলেছে, পণ্ডিতজী খুশি হয়েছেন, এঁদের বড় বড় পদ দিয়েছেন, বিদেশ পাঠিয়েছেন। তার ফলে এঁদের কথারও ওজন বেড়েছে। এবং কালক্রমে এই সব কথা, গান্ধী -নেহেরুর চিন্তাই হিন্দু সমাজের বৃহদংশের মূল্যবোধ পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, হিন্দু -মুসলিম প্রশ্নে বেশিরভাগ হিন্দুর যে মূল্যবোধ, যার মূল কথা হল ‘মুসলিমের দোষ দেখা চলবে না, দেখলেও চুপ করে থাকতে হবে’-এর মূল নিহিত আছে রাজনীতিতে। রাজনীতি থেকে উদ্ভূত মূল্যবোধের বিপদ কোথায় তা নিয়ে আগেই আলোচনা হয়েছে। এর সঙ্গে এক নতুন উপসর্গ যোগ হয়েছে। দেশে মসজিদ-মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার নামে হু -হু করে সৌদি আরবের টাকা ঢুকেছে। সেই টাকা কিছু অংশ যাচ্ছে সাংবাদিকদের পকেটে, কিছু অংশ রাজনীতিকদের পকেটে। ইন্ধন জোগাচ্ছে এই সর্বনাশা মূল্যবোধকে আরও জোরদার করার।

তাই আজকে আমাদের তথাকথিত বুদ্ধিজীবিরা গত নয় বছর ধরে ভারতের সফলতম মূখ্যমন্ত্রীকে আক্রমণ করে যাচ্ছে। কিন্তু কাশ্মীর থেকে সারে তিন লক্ষ হিন্দু বিতাড়নের ব্যাপারে তারা চুপচাপ। তাই পূর্ববঙ্গ থেকে বিতাড়িত পশ্চিমবঙ্গের এক কোটি ‘বাঙ্গাল’দের বৃহদাংশ পুরনো কথা মনে করতে চান না। তাই তৃণমূলের এম পি হাজি নুরুল ইসলাম এক মারাত্মক অস্ত্রধারী জনতাকে নিয়ে এসে হিন্দু মন্দির ভাঙচুর করে, আর সেটা জানাবার জন্য সাংবাদিক সম্মেলন করলেও সাংবাদিক জোটে না। তাই তসলিমা নাসরিনকে কলকাতা -ছাড়া হতে হয়। তাই স্টেটসম্যান পত্রিকায় সম্পাদককে ঐতিহাসিক তথ্যে ঋদ্ধ একটি প্রবন্ধ ছাপার জন্য, কেবল সেটি মুসলমানদের অপ্রিয় হওয়ার কারণে, হাজতবাস করতে হয়। কারণ, মূল্যবোধ অনুযায়ী, মুসলমান কোনও অন্যায় করতে পারে না।

এই বিকৃত মূল্যবোধ থেকে যদি হিন্দু সমাজ বেরিয়ে আসতে না পারে, তাহলে ভারতে হিন্দুধর্মের মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। মুসকিল হচ্ছে, এ সম্বন্ধে কজন সজাগ.? মূল্যবোধ বদল করা সহজ কাজ নয়। কিন্তু যদি না করা হয়, তাহলে যা হবার তাই হবে। এখনও সময় আছে।

Comments

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

মাটির ছেলে
মাটির ছেলে এর ছবি
Offline
Last seen: 3 years 3 months ago
Joined: শনিবার, মে 3, 2014 - 11:20পূর্বাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

ফেসবুকে ইস্টিশন

কপিরাইট © ইস্টিশন ব্লগ ® ২০১৮ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর