নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 5 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • সাইয়িদ রফিকুল হক
  • রাজর্ষি ব্যনার্জী
  • ড. লজিক্যাল বাঙালি
  • মোমিনুর রহমান মিন্টু
  • রহমান বর্ণিল

নতুন যাত্রী

  • আদি মানব
  • নগরবালক
  • মানিকুজ্জামান
  • একরামুল হক
  • আব্দুর রহমান ইমন
  • ইমরান হোসেন মনা
  • আবু উষা
  • জনৈক জুম্ম
  • ফরিদ আলম
  • নিহত নক্ষত্র

আপনি এখানে

অভিনয় নিয়ন্ত্রণ আইন, আওয়ামীলীগ ও সুন্দরবন বাহাস!


বৃটিশ আমলে নীলকর ও ম্যাজিস্ট্রেটদের শোষণ ও অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসাবে তখনকার সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিক সমাজ নাটক রচনা ও পরিবেশনা শুরু করেন ভারতবর্ষে । বৃটিশ বিরোধী জনসচেতনতা সৃষ্টিতে এসব নাটক বেশ কার্যকরী ভুমিকা পালন করে। বাংলায় দীনবন্ধু মিত্রের নীল-দর্পণ, মধুসূদন দত্তের বুড়ো সালিকের ঘাড়ে রো এবং একেই কি বলে সভ্যতা, কিরণ চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরোজিনী, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের পুরুবিক্রম, দক্ষিণাচরণ চট্টোপাধ্যায়ের চা-কর-দর্পণ, উপেন্দ্রনাথ দাসের সুরেন্দ্র বিনোদিনী ও অন্যান্য নাটক দেখতে প্রচুর লোক ভীড় জমাতেন সেই সময়। উল্লেখিত নাটকগুলোতে নীলকর ও ম্যাজিস্ট্রেটদের শোষণ, নির্যাতন ও অমানবিক আচরণের যন্ত্রণাদায়ক দৃশ্যগুলো সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী মনোভাবের উদ্রেক করত। বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার রিচার্ড টেম্পল এসব নাটক মঞ্চায়নকে নাশকতামূলক কার্যকলাপ বলে ব্যাখ্যা করেন। তিনি ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের কারণ হিসেবে নানা গুজবের ভূমিকার কথা কেন্দ্রীয় সরকারকে স্মরণ করিয়ে দেন। সরকারকে এ মর্মে আরও সতর্ক করে দেন যে, দেশে ইতোমধ্যে স্থানীয়ভিত্তিক কৃষক বিদ্রোহ ব্যাপকভাবে ঘটে চলেছে যা ভবিষ্যতে একটি জাতীয় বিপ্লবের আকারে সংগঠিত হতে পারে। হিন্দু মেলার বার্ষিক সম্মেলনগুলোতে যেসব দেশপ্রেমমূলক ও ব্রিটিশ বিরোধী নাটক মঞ্চস্থ হয় সরকার সেগুলোর প্রতি বিশেষ দৃষ্টি যেন দেন। রিচার্ড টেম্পল সরকারের নিকট এ সুপারিশ পেশ করেন যে, যেহেতু বিদ্যমান আইনে এ ধরনের নাটকগুলো নিষিদ্ধ করার কোনো ক্ষমতা সরকারের নেই, সেহেতু সরকারের বিরুদ্ধে কুৎসাপূর্ণ ও নাশকতামূলক নাটকাদি রচনা ও মঞ্চায়ন নিষিদ্ধ করে অবিলম্বে একটি আইন প্রণয়ন করা উচিত। না হয় এই নাটকগুলো সাধারণ মানুষকে বৃটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী করে তুলবে বলে লেফট্যান্ট গভর্নর স্যার রিচার্ড টেম্পল মতামত দেন কেন্দ্রিয় সরকারকে।

বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার রিচার্ড টেম্পল এর সুপারিশের প্রেক্ষিতে ১৮৭৬ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি ভারত সরকার বাংলা সরকারকে সরকার বিরোধী নাটক মঞ্চায়ন নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা দিয়ে একটি অধ্যাদেশ জারি করে। অধ্যাদেশে বলা হয়,

যখন লেফটেন্যান্ট গভর্নর মনে করবেন যে মঞ্চস্থ হয়েছে বা হতে যাচ্ছে এমন কোনো নাটক, পুতুলনাচ বা অন্য নাট্যকর্ম সরকারের বিরুদ্ধে কুৎসাপূর্ণ বা সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের বিরুদ্ধে বক্তব্যধর্মী বা নাশকতামূলক প্রকৃতির বা তা থেকে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ সৃষ্টি হতে পারে বা সে ধরনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত কোনো ব্যক্তি/ব্যক্তিবর্গের জন্য ক্ষতিকর, নৈতিকভাবে হানিকর হতে পারে বা অন্য কোনোভাবে জনস্বার্থের পক্ষে হানিকর হয়, তাহলে সরকার আদেশবলে সে ধরনের অনুষ্ঠান নিষিদ্ধ করতে পারেন। অধ্যাদেশে আরও বলা হয় যে, ওই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলে শুধু যে প্রযোজক, পরিচালক এবং অভিনেতা অভিনেত্রীরাই আইনত শাস্তিযোগ্য হবেন তা নয়, দর্শক এবং থিয়েটার বা মঞ্চের মালিকরাও আইনত শাস্তির যোগ্য হবেন।

মাত্র ১৪ দিনের মধ্যে বাংলার জন্য তৈরি করা অধ্যাদেশটি ১৮৭৬ সালের ১৪ মার্চ সমগ্র ভারতবর্ষে আইনে পরিণত হয়। আইনটি অভিয়ন নিয়ন্ত্রণ আইন নামে পরিচিত ছিল। সেই সময় থেকে পুরো পাকিস্তান আমল, ২০০১ সালের আগ পর্যন্ত স্বাধীনতার পরবর্তী সকল সরকার অভিনয় নিয়ন্ত্রণ আইনের মাধ্যমে সংস্কৃতি ও নাট্যচর্চাকে রুদ্ধ ও নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেছেন। ১৮৭৬ সালে এই আইন প্রণয়নের পর সেই সময়ে তখনকার বাংলার বুদ্ধিজীবি সমাজ, সংবাপত্র, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন এই কালো আইন বাতিলের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল। বৃটিশ সরকার আইনটি বাতিল করে নাই। দেশভাগের পর পাকিস্তানের সামরিক সরকার এই কালো আইনটির অপপ্রয়োগ করেছেন। অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে পাকিস্তান সরকারের হাতে বন্দী হন। ১৯৫৩ সালে বন্দী থাকা অবস্থায় তিনি তাঁর বিখ্যাত নাটক 'কবর' রচনা করেন। প্রতিবাদী এই নাটকটি সেই সময় দেশব্যাপী বিভিন্ন সংস্কৃতি সংগঠন প্রদর্শন করলে পাকিস্তানী সামরিক জান্তার অন্তরআত্মা কাঁপিয়ে দিয়েছিল। বৃটিশদের তৈরি করা অভিনয় নিয়ন্ত্রন আইনের মাধ্যমে সেই সময় পাকিস্তানী জান্তা দেশের বিভিন্ন জায়গায় 'কবর' নাটকের প্রদর্শনী বন্ধ করে দিয়েছিল। সংস্কৃতি কর্মীদের প্রচন্ড দাবীর মুখেও পাকিস্তানী সামরিক জান্তা এই কালো আইনটি বাতিল করে নাই।

ভারত বিভক্তির পর ১৯৫৪ সালে মাদ্রাজ হাইকোর্ট, ১৯৫৬ সালে এলাহাবাদ হাইকোর্ট এবং ১৯৫৮ সালে পাঞ্জাব হাইকোর্ট এ আইনকে অকার্যকর ঘোষণা করে। ১৯৬২ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ওয়েস্ট বেঙ্গল ড্রামাটিক পারফরম্যান্স বিল নামে আইনের একটি নতুন খসড়া তৈরি করে। কিন্তু গণপ্রতিবাদের মুখে সরকার ১৯৬৩ সালে বিলটি প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। কিন্তু বৃটিশদের তৈরি করা এই কালো আইন স্বাধীনতার পরও বাংলাদেশে দীর্ঘদিন বহাল তবিয়তে ছিল। মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে স্বাধীন বাংলাদেশে শিল্প-সংস্কৃতি-সংস্কৃতিতে গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনকে সবচেয়ে সফল ও স্বার্থক বলে শিল্প-সাহিত্যবোদ্ধারা মনে করেন। কিন্তু দুৎখজনক হলেও গ্রুপ থিয়েটার কর্মীদের অভিনয় নিয়ন্ত্রন আইন বাতিলের জন্য দীর্ঘদিনের দাবীকে কোন সরকারই গ্রাহ্য করেনি। স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের আমলেও এই কালো আইনের মাধ্যমে প্রতিবাদী নাট্য আন্দোলনকে নিয়ন্ত্রন করার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু সেই সময়ে সাংস্কৃতিকর্মীদের স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলন শক্তিশালী হয়েছিল। সম্মিলিত সাংস্কৃতি জোট ও বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের দীর্ঘদিনের আন্দোলনের ফলে বাংলাদেশে ২০০১ সালের ৩০ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে অভিনয় নিয়ন্ত্রণ আইন ১৮৭৬ বাতিল করা হয়। সেই সময় ক্ষমতায় ছিলেন বর্তমানের আওয়ামীলীগ সরকার।

সেই আওয়ামীলীগ সরকার বর্তমানে ক্ষমতায় আছে নির্বাচনবিহীন ভোটের মাধ্যমে। জনমতকে অগ্রাহ্য করে ভারতের স্বার্থ রক্ষার করার জন্য সুন্দরবনকে ধ্বংস করে বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করছে সরকার। একটি গণতান্ত্রিক দেশে সরকারের ভুল পদক্ষেপের বিরুদ্ধে মানুষের কথা বলার অধিকার আছে। আমাদের সংবিধান সেই অধিকার আমাদের দিয়েছে। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ভাষা আন্দোলন, ৬৯ এর গণ অভ্যুত্থান, ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ, ৯০ এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে এদেশের সংস্কৃতি কর্মীদের অবদান রাজনৈতিক দলগুলোর চেয়ে কোন অংশে কম নয়। বরং রাজনৈতিক জনসচেতনতা তৈরিতে সংস্কৃতিক কর্মীদের অবদান রাজনৈতিক দলগুলোর চেয়ে অনেক বেশি। সংস্কৃতি কর্মীদের দীর্ঘদিনের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনের রাজনৈতিক সুবিধা ভোগ করছেে বাংলাদেশের সবগুলো রাজনৈতিক দল। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংস্কৃতি কর্মীদের অসাম্প্রদায়িক আন্দোলনের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী বর্তমান আওয়ামীলীগ সরকার। একটি গণবিরোধী সরকারী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গতকাল (২০ জুলাই, ২০১৬) শিল্পকলা একাডেমীতে তীরন্দাজ নাট্যদল তাদের নতুন প্রতিবাদী নাটক ‘কন্ঠনালীতে সূর্য’ নাটকটির প্রদর্শনীর পুর্বে সুন্দরবন ধ্বংসকারী দেশ বিরোধী সরকারী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে একটি বাহাসের আয়োজন করেছিল। বাহাসে বিভিন্ন অতিথির সাথে সুন্দরবনে বিদ্যুৎকেন্দ্র বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ উপস্থিত থাকার কথা ছিল এবং তিনি এসেছিলেন।

নাটক প্রদর্শনীর পূর্বে দর্শকরা নাটক দেখতে এসে জানতে পারেন শিল্পকলা একাডেমী কর্তৃপক্ষ তীরন্দাজ এর নাটক প্রদর্শনী ও সুন্দরবন নিয়ে বাহাস অনুষ্ঠান বাতিল করেছেন। এ বিষয়ে সাংস্কৃতিক কর্মী ব্রাত্য আমিন এর ফেসবুক স্ট্যাটাসটি এখানে কোড করা হল:

আজ এক ভয়ঙ্কর সত্যের মুখোমুখি হলাম বিকেলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীতে গিয়ে। আমি গিয়েছিলাম তীরন্দাজ নাটকের দল আয়োজিত 'কন্ঠনালীতে সূর্য' নাটক এবং নাটকের পূর্বে সুন্দরবন বিষয়ে আনু মুহম্মদের সঙ্গে বাহাস অনুষ্ঠানটি দেখা, সুন্দরবনের পাশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পক্ষে-বিপক্ষের যুক্তিগুলো পরিষ্কার করে শোনা ও বোঝার জন্য। কিন্তু একি! আমাকে শিল্পকলার ভেতরে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না! কারন? কারন এখানে একটা নাটকের দল সুন্দরবন বিষয়ে আলোচনার আয়োজন করেছে যা কর্তৃপক্ষ নাকি আগে থেকে জানতো না! কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ভাবলাম, আমি ২০০১ সাল থেকে থিয়েটারের সাথে যুক্ত, এই প্রথম আমি শিল্পকলার ভেতরে ঢুকতে পারছি না কারন একটি নাটকের দল সরকারের গৃহীত একটি সিদ্ধান্তকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে বলে! মানে আমরা সংস্কৃতিকর্মীরা সরকারের কোনো কার্যকলাপ বা সিদ্ধান্তের পক্ষে-বিপক্ষে এখন থেকে আলোচনা পর্যন্ত করতে পারবো না!!! করলে সেটা সরকার বিরোধী আখ্যা দিয়ে বন্ধ করে দেয়া হবে!!! এ আচরন ভয়ানক। এই ভয়ানক আচরনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের সকল সংস্কৃতিকর্মী, শিল্পীগোষ্ঠী, গণমাধ্যমকর্মী, থিয়েটার ফেডারেশন, সাংস্কৃতিক জোট, এমনকি গণমাধ্যম কি ভুমিকা নেয় তা দেখার অপেক্ষায় থাকলাম। প্লিজ নিজের অবস্থান পরিষ্কার করুন। আপনি কি জনস্বার্থবিরোধী সুন্দররবন সংলগ্ন কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পক্ষে নাকি বিপক্ষে?? এই প্রসঙ্গে আপনি চুপ থাকার মানে খুবই পরিষ্কার - হয় আপনি সরকারী দলের খাস চাটুকার, অথবা ভয়ঙ্কর স্বার্থপর, ভন্ড, নিজের বর্তমানের বাইরে এক বিন্দুও ভাবতে নারাজ। এই ধরণের মানুষদের প্রতি ঘৃণা, করুণা।

বাংলাদেশের একটি নাট্য সংগঠনের দেশের স্বার্থবিরোধী সরকারী সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করার অধিকার কি নাই? শিল্পকলা একাডেমী কোন আইনে তীরন্দাজ নাট্যদলের নাট্য প্রদর্শনী ও বাহাস অনুষ্ঠান বন্ধ করে দিল? অভিনয় নিয়ন্ত্রণ আইন নামের সেই কালো আইন এখন আর নাই, তাহলে কোন আইনে একটি নাট্য সংগঠনের শিডিউল নাট্য প্রদর্শনী বন্ধ করা হল? পুর্বের নির্ধারিত নাটক ও বাহাস দেখার জন্য দর্শকরা শিল্পকলা একাডেমীতে এসে সরকারের এমন সিদ্ধান্তে হতবাক হয়ে গেছেন অনেকে। দর্শক হিসাবে নাটকটি দেখতে না পেরে অনলাইন এক্টিভিস্ট বাকি বিল্লাহ ফেসবুকে তার অভিমত ব্যক্ত করেছেন। নীচে কোড করা হলঃ

প্রথম ছবিটা শিল্পকলা একাডেমীর মূল মিলনায়তনে ওঠার সিড়ির ঠিক সামনে। পেছনে যে একটা কাঠের ফ্রেম দেখা যাচ্ছে ওটা অস্থায়ী। ব্যারিকেডের মত করে ওটাকে ফেলে দিয়ে সিড়িকে অবরুদ্ধ করা হয়েছে যাতে করে কেউ মিলনায়তনের দিকে না যেতে পারে। এটা রাখা হয়েছে বিকেল থেকে। তখনো তীরন্দাজ নাট্যদলের আজকের মিলনায়তন বুকিং বাতিল করা হয়েছে এরকম কোনো খবর তাদেরকে দেয়া হয়নি।
.
সাম্প্রতিক সময়ে তীরন্দাজ বাংলাদেশের নাট্যজগতে এক বিশেষ নাম। তীরন্দাজ, বটতলার মত নাটকের দলগুলো সমসাময়িক সময়কে ধারালো ছুরির ফলার মত প্রতিফলিত করছে মঞ্চে। তীরন্দাজের নতুন নাটক ‘কন্ঠনালীতে সূর্য’এর প্রদর্শনী ছিল আজ সন্ধ্যা ছয়টায়, শিল্পকলার মূল মিলনায়তনে। নাটকের আগে সুন্দরবনের বুকে রামপাল কয়লাবিদ্যুত প্রকল্প প্রসংগে বিতর্ক আহ্বান করেছিল তারা- কন্ঠনালীতে সূর্য নাটকের বিষয়বস্তুও এই প্রসংগ। বিতর্কে রামপাল প্রকল্পের বিরুদ্ধে কথা বলার জন্য অধ্যাপক আনু মুহাম্মদকে ডেকেছিল তীরন্দাজ, প্রকল্পের পক্ষে কথা বলার জন্য অন্যদেরও আহবান জানিয়েছিল তারা। আর এ বিষয়ে বিতর্কের দূ:সাহস করার খেসারত দিতে হলো তাদের।
.
বিকেল পৌনে ছ’টার দিকে শিল্পকলা গিয়ে দেখি সাজ সাজ রব। প্রচুর পুলিশ,মূল ফটক বন্ধ করে রাখা হয়েছে। নাটকের টিকিট দেখে দেখে ভেতরে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে। আমি কাউন্টারে তীরন্দাজের শো’এর টিকিটি কাটতে গিয়ে দেখি ওখানে কেউ নেই। আরো দুটি নাটকের শো ছিল,ওগুলির টিকিট বিক্রি হচ্ছে। দীপক সুমনকে ফোন দিয়ে শুনতে পেলাম- তাদের বুকিং বাতিল করে দেয়া হয়েছে। এই বোধবুদ্ধি নিয়ে শিল্পকলা চালান কর্তাব্যক্তিরা। সরকার বিব্রত হবেন বলে নাটকের শো বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে- এর নাম শিল্প সংস্কৃতি চর্চা? কোথায় গিয়ে দাড়াচ্ছি আমরা? কথা বলতে দিতে এত ভয়?
তীরন্দাজের বন্ধুরা ছেড়ে কথা বলেননি। তাদের প্রতিবাদী স্পিরিটকে অভিনন্দন। কিন্তু অন্যরা কোথায় ছিলেন? অন্যান্য নাটকের দলগুলির কাছে প্রত্যাশা- আপনারা এই অন্যাায্য সিদ্ধান্তের প্রতিবদ করুন। তীরন্দাজের পাশে দাঁড়ান। অন্যথায় এইসব শিল্পচর্চা আর ভেড়া চরানোর মধ্যে পার্থক্য থাকে না।

সরকারের এই হীন সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করে আরেক অনলাইন এক্টিভিস্ট সাইয়েদ ফয়েজ আহমেদ বলেন,

শিল্পকলা একাডেমীতে নাটক শুরু হবার আগে ভাষনে রামপাল নিয়ে কথা বলায় শো বন্ধ এবং আনু মোহাম্মদকে হেন্সথা। অবশ্য আনু মোহাম্মদ এর বক্তব্য এখন এমনিতেই মেইন্সট্রিম মিডিয়াতে আসে না।এই কাহিনীও আসবে না, হয়তো।
.
অনেক টাকা পয়সা খরচ করে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বাড়াতে বৃটিশ কোম্পানী ভাড়া করা হয়েছে কিন্তু তাতে তো লাভ হয়ইনাই উলটা জার্মানিতে ডিরেক্ট কার্গো শিপমেন্ট বন্ধ। জার্মানি আমাদের জন্য অন্যতম বৃহত্তম বাজার। সেইখানে ডিরেক্ট শিপমেন্ট বন্ধ হইলে প্রভাব বেশ খারাপ হবে। এরপর হয়তো প্যাসেঞ্জার শিপমেন্ট ও বন্ধ করে দিবে কিনা কে জানে। এই কাহিনীও মিডিয়াতে আসবে না, হয়তো।
.
ফেসবুকে এইগুলা লেইখাও লাভ নাই, কিছুই হবে না, জাহান্নামের চৌরাস্তায় দাড়ায়ে আইয়ুব খান কানতে কানতে বলতেসে, তাবেদারী মিডিয়া আর ফেসবুক এই দুইটা জিনিস আমার আমলে থাকলে আমি মরার আগপর্যন্ত এই দেশের মানুষরে শাসন কইরা যাইতাম। এগো স্বাধীনতার তো প্রশ্নই আসে না, আমার শাসন থিকাও ছাড়া পাইতো না।


নাটক প্রদর্শনী ও বাহাসে আমন্ত্রিত অতিথি আনু মুহাম্মদ সংবাদ মাধ্যমকে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছে

অদ্ভুত উঠের পিঠে চলছে স্বদেশ। সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে এই পোস্ট লেখা পর্যন্ত গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশ কিংবা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট কোন প্রতিবাদ জানায়নি। এই দুটি সংগঠন দেশের সংস্কৃতি নিয়ে একসময় যতটা সোচ্চার ছিল, তার ছিটেফোঁটাও আমরা দেখতে পাইনা। সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব সরকারের তাবেদারীতে ব্যস্ত। অবাক লাগল এমন একটি খবর কোন সংবাদ মাধ্যমে আসেনি। দেশের সকল জায়গায় সরকার যেভাবে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে, মানুষের বাক-স্বাধীনতাকে হরণ করছে, আমাদের প্রতিদিন আতংকিত করে দিচ্ছে। যেই আওয়ামীলীগ সংস্কৃতিকর্মীদের দীর্ঘদিনের দাবী অভিনয় নিয়ন্ত্রণ আইনকে বাতিল করার সাহসী উদ্যেগ নিয়েছিল, সেই আওয়ামীলীগ তীরন্দাজ এর নিয়মিত নাটক প্রদর্শনী বন্ধ করে দেওয়ার পর সরকারকে প্রচন্ড গণবিচ্ছিন্ন ও ৯০ এর স্বৈরাচার এরশাদের চেয়েও ঘৃন্যতম শাসক বলে গন্য করা অযৌক্তিক হবে না। সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সমগ্র দেশের সংস্কৃতি ও নাট্যকর্মীরা আন্দোলনে নেমে গণবিচ্ছিন্ন এই সিদ্ধান্ত গ্রহনের অযৌক্তিকতা তুলে ধরে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে বাধ্য করা হোক। সরকারের এই ঘৃণ্য সিদ্ধান্ত ও সুন্দরবন ধ্বংস করে বিদ্যুৎকেন্দ্র বানানোর বিরুদ্ধে সারাদেশের সংস্কৃতিক কর্মীদের রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করা উচিত।

Comments

 

সামান্য একটি নাটকে রাষ্ট্রের এতো ভয়! বিষয়টি স্পষ্ট সরকার কাউকেই কথা বলতে দিতে রাজি নয়।

----------------------------------
মুক্তি আসুক যুক্তির আলোয়।

 
নুর নবী দুলাল এর ছবি
 

গণবিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে বলে সরকার মানুষের কাঁশি শুনে আতঙ্কিত হচ্ছে। আওয়ামীলীগের শাসনকালগুলোর দিকে নজর দেন, দেশের মানুষের কণ্ঠরোধ করা, এককভাবে দেশের শাসন ক্ষমতা ভোগ করা আওয়ামীলীগের রাজনৈতিক কর্মসুচী।

 
ইকারাস এর ছবি
 

সরকার ভয়ে ভবিষ্যতে গৃহিনীদের রান্না ঘর নিয়ন্ত্রন করা শুরু করবে বলে মনে হচ্ছে। ৯০ এর দশকে প্রেমিক এরশাদ শাসনের শেষ দিকে এমন পাগলা কুত্তা হয়ে গেছিলো। শেখ হাসিনার অবস্থাও সেই রকমের। পালাবার জায়গা পাবেনা শেষ পর্যন্ত। মাঝখানে দেশটাকে ধ্বংস করে দিয়ে যাবে। আজ এরশাদকে মানুষ যেরকম ঘৃণাভরে স্মরণ করে, একই অবস্থা হবে শেখ হাসিনার। আমরা এতদিন ভুল মানুষকে সমর্থন দিয়েছিলাম।

 
নুর নবী দুলাল এর ছবি
 

সহমত। আমাদের সমর্থন নিয়ে আজ আওয়ামীলীগ অসুরের মত সওয়ার হয়েছে আমাদের ঘাড়ে।

 
মূর্খ চাষা এর ছবি
 

আল্লাহ যাদের সহায় তারা জনতাকে এত ভয় পায় ক্যান ?

.....................................................................................................................................
হিন্দু , মুসলিম, বৌদ্ধ, খৃস্টান, আলীগ, বিনপি হওয়ার আগে মানুষ হতে হয় ।

 
নুর নবী দুলাল এর ছবি
 

আল্লাহ তাদের কাছে রাজনৈতিক ভণ্ডামী। তাই ভরসা করতে পারেনা।

 
Swapan Majhi এর ছবি
 

আমরা প্রবেশ করছি, 'তাসের দেশ' -এ ।

 
নুর নবী দুলাল এর ছবি
 

হ্যাঁ, 'তাসের দেশ' এ আমরা ঢুকে গেছি। হুড়মুড় করে ভেঙে যাওয়া দেখার অপেক্ষায় বসে আছি।

 
অরুন আলো এর ছবি
 

এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি!!!!!
আসলে দেশটা কেমন জানি বৃটিশ বা পাকিস্থানি আমলের মত হয়ে যাচ্ছে।
ইচ্ছা করলেই নিজের মনের অভিব্যক্তিটি নিজের মত করে প্রকাশ করা যাচ্ছেনা। বর্তমান সরকার বাক স্বাধীনতার উপর সেন্সরসীপ আরোপ করে দিচ্ছে। ৭১ এ কি এমনি কথা ছিল?

অরুন আলো

 
নুর নবী দুলাল এর ছবি
 

গনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জবাবদিহীতা না থাকলে সরকারগুলোর রূপ এমন হয়ে যায়। আর আওয়ামীলীগ তার সরকারের স্বরূপ রাজনৈতিকভাবে এমনটায় রূপান্তরিত করেছেন। সকল গনতান্ত্রিক ইনিস্টিটিউটগুলোর শৃঙ্খলা ভেঙে দিয়েছেন। বিরোধী মতগুলোকে দমন করছেন শক্ত হাতে। ছোটছোট মত প্রকাশের জায়গাগুলোতে আঘাত করতেছে একক আধিপত্য বজায় রাখার জন্য।

 
উদয় খান এর ছবি
 

আওয়ামিলীগ অলরেডি একটা গালিতে পরিনত হয়েছে। আমাদের প্রশ্রয়েই এই প্রেতাত্না আজ সিন্দাবাদের রাক্ষসের মতো আমাদের ঘাড়ে চেপে বসেছে। তবে যা-ই হোক, একদিন অবশ্যই ঘাড় থেকে নামবে, কিন্তু আমরা বা আমাদের দেশ টিকে থাকবে কি না, সেটাই চিন্তার বিষয়।

 
মুন্না সন্দ্বীপী এর ছবি
 

একেবারেই থ! হয়ে গেলাম। জানিনা ভবিষ্যৎ কি,মনে হয় বর্তমান নিয়ে চিন্তা করাই শ্রেয়।
ধন্যবাদ

munna

 
 

ইন্টারনেট থেকে কিছুটা দূরে ছিলাম কিছুদিন । এ খবরটা জানতাম না । এত ভয় ! কালো অধ্যায়ের পূণরাবৃত্তি ! ছি: !

আর একটা কথা, পোষ্টে দেয়া ছবিগুলো প্রদর্শিত হলোনা কেন ?

শ্রীঅভিজিৎ দাস

 
ড. লজিক্যাল বাঙালি এর ছবি
 

সব সরকারগণই কমবেশি প্রতিবাদকে ভয় পায়। আগে নাটক, সিনেমা প্রতিবাদের প্রধান নিয়ামক ছিল। এখন ব্লগ, সোসাল মিডিয়া তথা ফেসবুক সরকারগুলোর ভয়ের প্রধান কারণ! এটা বাংলাদেশসহ অনেক দেশে কমবেশি বিদ্যমান।

===============================================================
জানার ইচ্ছে নিজেকে, সমাজ, দেশ, পৃথিবি, মহাবিশ্ব, ধর্ম আর মানুষকে! এর জন্য অনন্তর চেষ্টা!!

 

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

নুর নবী দুলাল
নুর নবী দুলাল এর ছবি
Offline
Last seen: 2 ঘন্টা 42 min ago
Joined: শনিবার, জানুয়ারী 19, 2013 - 3:35অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

কু ঝিক ঝিক

ফেসবুকে ইস্টিশন

SSL Certificate
কপিরাইট © ইস্টিশন.কম ® ২০১৬ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর