নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 5 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • দ্বিতীয়নাম
  • আবু মমিন
  • মাহিন রহমান সাকিফ
  • রবিঊল
  • পৃথু স্যন্যাল

নতুন যাত্রী

  • রবিঊল
  • কৌতুহলি
  • সামীর এস
  • আতিক ইভ
  • সোহাগ
  • রাতুল শাহ
  • অর্ধ
  • বেলায়েত হোসাইন
  • অজন্তা দেব রায়
  • তানভীর রহমান

আপনি এখানে

যেভাবে শুরু হল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ


মানব সভ্যতার ইতিহাসে প্রথম এত অস্ত্র এবং রক্তের লড়াই ছিল 'প্রথম বিশ্বযুদ্ধ'। ১৯১৪ সালে যদি গ্যাভ্রিলো প্রন্সিপের অস্ত্রের মুখ থেকে গুলিটা না বের হত, তাহলে হয়ত মানবজাতিকে এত রক্তক্ষয়ী একটা যুদ্ধ দেখতে হত না। ১৯১৪ সালের ২৮ জুলাই অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি'র সার্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনার মধ্য দিয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয় এবং ১৯১৮ সালের ১১ নভেম্বর মিত্রপক্ষের সাথে জার্মানীর যুদ্ধবিরোধী চুক্তি সাক্ষরের মধ্যে দিয়ে শেষ হয়।

কিন্তু এই যুদ্ধ শুরুর আছে একটা দীর্ঘ ইতিহাস। কেনো শুরু হয়েছল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সেটা জানতে হলে আমাদেরকে আরো ৪০ বছর পিছনে যেতে হবে। আমি খুব সহজ ভাষায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরুর গল্পটা তুলে ধরার চেষ্টা করব।

১৮৭০ আধুনিক জার্মানের প্রতিষ্ঠাতা বিসমার্কের (Prince Otto von Bosmark) এর নেতৃত্বে জার্মানি আর ইটালীর একত্রীকরণের কাজ সম্পূর্ন হয়। একই সাথে ইউরোপে দুই দুইটা বড় শক্তির আত্মপ্রকাশের ফলে ইউরোপের শক্তিসাম্য বা Balance of Power এর বিরাট পরিবর্তিন ঘটে। এই সময়টায় ইউরোপের দেশগুলো আফ্রিকা মহাদেশ এবং মধ্য এশিয়ায় সাম্রাজ্য বিস্তারে বেশ আগ্রহী এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী ছিল। ইউরোপের দেশগুলো মূলত আফ্রিকাতেই তাদের রাজ্য বিস্তারে বেশি আগ্রহী ছিল কারণ আফ্রিকায় প্রচুর কাঁচামাল পাওয়া যায়। পূর্ব এশিয়ার জাপানও রাজ্য বিস্তারে বেশ তৎপর ছিল। জার্মানীর একত্রীকরণের শেষ পর্যায়ে বিসমার্ক Franco-Prussian War (ফ্রাঙ্ক-প্রুশিয়ান যুদ্ধ) এ ফ্রান্সের পরাজয়ের সুযোগে আলসেস (Alsace) ও লরেন (Lorraine) প্রদেশ দুটো জার্মান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত করেন।

এর ফলে ফ্রান্স আর জার্মানির চিরশত্রুতা নতুন করে বৃদ্ধি পায়। সেই সাথে জার্মানির কবল থেকে হারানো প্রদেশ দুটো পুনরুদ্ধারের জন্য ফ্রান্স সুযোগ খুঁজতে থাকে। কিন্তু চতুর বিসমার্ক তো সে সুযোগ দেন ই নি বরং যাতে কূটনৈতিকভাবে এবং ইউরোপিয়ো রাজনীতি থেকে ফ্রান্সকে বিচ্ছিন্ন করা যায়, সে সুযোগ খুঁজতে থাকেন। এজন্য প্রথমে তিনি ১৮৭৯ তিনি জার্মানি ও অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির মধ্যে দ্বৈত মৈত্রীচুক্তি (Duel Alliance) করেন। এরপর ১৮৮১ সালে জার্মান সম্রাট কাইজার, অস্ট্রিয়ার সম্রাট (যিনি হাঙ্গেরির সম্রাট হিসেবেও পরিচিত) এবং রাশান সম্রাট জার এর মধ্যে তিন সম্রাটের মৈত্রীচুক্তি সম্পাদন করেন। যেটা League of Three Emperor's নামে পরিচিত।

এরপর ইটালির সাথে বিসমার্কের ভাল সম্পর্ক থাকার দরুন তিনি ১৮৮২ সালে দ্বৈত মৈত্রীচুক্তিতে ইটালিকেও অন্তর্ভূক্ত করেন। এদিকে আবার আগে থেকেই অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি এবং রাশিয়ার মধ্যে সম্পর্কটা খারাপ। আবার রাশিয়া এবং অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি দুই সাম্রাজ্যেরই রাজার দ্বারা পরিচালিত একনায়কতন্ত্র। তাই জার্মানি - ইটালি - অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির এক হওয়াটা রাশিয়া যাতে মনে না করে যে এটা তাদের বিরুদ্ধে এজন্য বিসমার্ক রাশিয়ার সাথে ১৮৮৭ সালে পুননিশ্চিত চুক্তি বা Reinsurance Treaty সম্পাদন করেন। মূলত এটা ছিল লোক দেখানো। কিন্তু এরমধ্য দিয়ে ইউরোপীয় রাজনীতি থেকে ফ্রান্স ছিটকে পড়ে।

কিন্তু কথায় আছে রাজনীতিতে শেষ বলে কিছু নেই। বিপত্তিটা ঘটল যখন ১৮৮৮ সালে সম্রাট দ্বিতীয় উইলিয়াম (William II) জার্মানির নতুন কাইজার হন। যিনি বিশ্বরাজনীতির (Weltpolitik) প্রবক্তা হিসেবে পরিচিত। এই নতুন কাইজারের সময় ফ্রান্স তার বেড়াজাল থেকে বের হওয়ার সুযোগ পায়। এই নতুন কাইজার ছিলেন উচ্চাভিলাষী। তিনি বহির্বিশ্বে জার্মান উপনিবেশ স্থাপন এবং বিশেষত বলকান উপদ্বীপে সম্প্রসারণবাদী নীতির উপর জোর দেন। বিসমার্ক এতে বাঁধা দেন। ফলে কাইজার ১৮৯০ সনে বিসমার্ককে চ্যান্সেলরের ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেন। এর ফলে বিগত বছরগুলোতে আনা বিসমার্কের সকল চুক্তি ব্যবস্থাও ভেঙ্গে পড়ে। ফলে সুবিধাটা হল ফ্রান্সের।

ফ্রান্স তার বিচ্ছিন্ন অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে ১৮৯৪ সালে রাশিয়ার সাথে আঁতাত (Entente) গড়ে তোলে। এতদিন ব্রিটেন ইউরোপীয় রাজনীতি থেকে দূরে সরে ছিল এবং দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করছিল। ইতোমধ্যে ১৮৯৭ সালে জার্মানি নতুন আইন করে ব্রিটেনের সাথে উপনিবেশিক প্রতিযোগিতার জন্য জার্মানি বিরাট নৌবহর তৈরি করা শুরু করে। যেটা অ্যাডমিরাল তিরপিজ'স ল (Admiral Tirpitz's Law) নামে পরিচিত ছিল। এর ফলে নড়েচড়ে বসে ব্রিটেন। জলপথে তাদের আধিপত্য হুমকীর সম্মুখীন হয়। ফলে ব্রিটেন ইউরোপীয় রাজনীতিতে পুনরায় ফিরে আসার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে এবং ১৯০৪ সালে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ দিপাক্ষিক চুক্তি (Entente Cordiale) সম্পাদিত হয়।

১৯০২ সালে ব্রিটেন আর জাপান মৈত্রীচুক্তি করে। ১৯০৪-০৫ সালে রুশ-জাপানীজ যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে তৎকালীন সাম্রাজ্যবাদী জাপান সাম্রাজ্যের কাছে রাশিয়ার পরাজয় ঘটে। যুদ্ধ পরাজয়ের হলে রাশিয়া একদম একাকি হয়ে পড়ে। তখন তারা একরকম বন্ধুহীন অবস্থা পার করছিল। তারা ইউরোপের দেশগুলোর সাথে মৈত্রীতে আসার সুযোগ খুঁজতে থাকে।

এরমধ্যে ১৯০৫-০৬ সালে আরেকটি উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হচ্ছে "মরক্কো সমস্যা (The Moroccan Crisis)। ফ্রান্স ও ব্রিটেনের মধ্যে যে নতুন Entente Cirdiale বা আঁতাত হয়েছে সেটা পরীক্ষা করার জন্য জার্মানি একটা কূটনৈতিক চাল চালার চেষ্টা করে। জার্মানি মরক্কো'র স্বাধীনতা বা অধীনতার প্রশ্নে মরক্কোর সুলতানকে তাদের স্বাধীনতা বজায় রাখার জন্য সব রকম সাহায্য করার কথা ঘোষনা দেয়। আফ্রিকার একমাত্র এই দেশটাই তখন কোন ইউরোপিয়ান দেশের অধীনে ছিল না এবং সেই সময় ফ্রান্স মরক্কো দখলের পঁয়তারা করছিল এবং ইজিপ্ট বা মিশর ব্রিটিশদের অধীনে ছিল। এর জন্য জার্মানি মরক্কোর ভবিষ্যতের জন্য একটা আন্তর্জাতিক সম্মেলনের দাবী করে যেটা দুবছর পর ১৯০৬ সালে স্পেনের আলজিসিরাস এ অনুষ্ঠিত হয়। জার্মানি দেখতে চাচ্ছিলো এতে ফ্রান্স আর বৃটেনের প্রতিক্রিয়া কি হয়! কিন্তু জার্মানি এ পরীক্ষায় হেরে যায়। তাছাড়া জার্মানি ফ্রান্স আর ব্রিটেনের চুক্তি বিশ্বাস করত না কারণ তারা জানত অ্যাংলো-ফ্রান্স সম্পর্কের একটা বৃহৎ ইতিহাস আসে। এটা জার্মানীর একটা বড় পরাজয় ছিল যার ফলে ফ্রান্স-ব্রিটেন তাদের মৈত্রীচুক্তিকে সামরিক রূপ দিতে বাধ্য হয়।

এ পর্যন্ত ইউরোপীয় রাজনীতিতে একটি বড় শক্তি গড়ে ওঠে। সেটি হচ্ছে:
- জার্মানি
- অস্ট্রিয়া - হাঙ্গেরি
- ইটালি
ফ্রান্স- ব্রিটেন এ পর্যন্ত বড় শক্তি হয়ে উঠতে পারেনি যদিও দুই দেশের অস্ত্রে শস্ত্রে সজ্জিত। বড় হগে ওঠেনি কারণ ব্রিটেন ছিল ইউরোপের মূল ভূখণ্ড থেকে দূরে। আর জার্মানি, ইটালি এবং অস্ট্রিয়া - হাঙ্গেরি ছিল ফ্রান্সের তিন দিকে ঘেরা। সুতরাং ইউরোপের অন্য তিন দিকে তখনো ফ্রান্সের বন্ধু কেউ ছিল না। আর ফ্রান্সকে আগেই জার্মানি ইউরোপের মূল রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে।

এ পর্যন্ত আমরা ১৯০৬ সালে মরক্কো সমস্যা পর্যন্ত আলোচনা করেছি এবং তিন বৃহৎ মিত্রশক্তি দেখেছি। যারা হচ্ছে যথাক্রমে জার্মানি, ইটালি এবং অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি। বিশ্বযুদ্ধ শুরুর কয়েকটি পয়েন্ট যদি দাঁড় করাই তাহলে পাই,
১. ব্রিটেন আর জার্মানির মধ্যে নৌযান প্রতিযোগিতা। কারণ ১৯০৬ সালে ব্রিটেন তাদের প্রথম 'ড্রেডনাউট (Dreadnought)' ব্যাটলশিপ তৈরি করে। আর জার্মানিও ততোদিনে বেশ উন্নতি করেছে ১৮৯৭ সালের 'Tirpitz's Navy Law' এর আওতায়।
২. ১৮৭১ সালের ফ্রাঙ্কো-প্রুশিয়ান যুদ্ধে ফ্রান্স জার্মানদের কাছে আলসেস আর লোরিন হারানো
৩. ১৯০৭ সালে ব্রিটেন আর রাশিয়া মৈত্রীচুক্তি করে। এরমধ্যে দিয়ে ব্রিটেন, রাশিয়া এবং ফ্রান্স মৈত্রীচুক্তির আওতায় পরে এবং জার্মানী এটাকে তাদের বিরুদ্ধে চক্রান্ত বলে অভিযুক্ত করে।
৪. বসনিয়ান সমস্যার পর অস্ট্রিয়া বসনিয়া তাদের দখলে নিলে রাশিয়া বলকান দেশগুলোতে অস্ট্রিয়ার উপস্থিতিতে ভীয় হয়ে পড়ে।
৫. সার্বিয়ান জাতীয়তা। এটাই সবচেয়ে বড় কারণ ছিল। সার্বরা সবসময় সার্বভৌমত্ব চেয়ে এসেছে। হ্যাবসবার্গ সাম্রাজ্যের অধিনে থাকা যুগোস্লাভিয়া অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির দখলে ছিল। যেখানে বহু সার্ব আর ক্রোট রা থাকত এবং সার্বিয়া সবসময় তাদের এক করতে চেয়েছিলো। আর এই হার্বসবার্গ সাম্রাজ্যে বহু জাতীয়তার মানুষ ছিল যেমন, জার্মান, চেক, স্লোভাক, পোলিশ, রোমানিয়ান, স্লোভেন, হাঙ্গেরিয়ান, সার্ব, ক্রোট। এর মধ্যে থেকে যদি সার্ব এবং ক্রোটরা বের হয়ে যায় তবে অন্যান্য জাতিগুলোও আলাদা হতে চাইবে ফলে ভেঙ্গে যেতে পারে হ্যাবসাবার্গ সাম্রাজ্য। এজন্য অস্ট্রিয়া একটা "প্রতিরোধক যুদ্ধ (Preventive War)" চেয়েছিল যাতে সার্বিয়ার আগ্রহকে দমিয়ে রাখতে পারে এবং যাতে সার্বিয়া বড় কোন শক্তি হয়ে উঠতে না পারে।

এই কারণগুলো ছিল বিশ্বযুদ্ধ শুরুর কিছু প্রত্যক্ষ কারণ। আরো কিছু উল্লেখযোগ্য কারণ আছে। এক এক করে আলোচনা করছি। ইয়োমধ্যে মরক্কো সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেছি। এরপর আসি ১৯০৭ সালে।

১৯০৭ সালে ব্রিটেন আর রাশিয়ার মাঝে মৈত্রীচুক্তি হয়। জার্মানদের কাছে যেটা একটা বড় পরাজয় ছিল। ১৮৯৪ সালে রাশিয়া আর ফ্রান্স চুক্তি করে আর ফ্রান্স হচ্ছে ১৯০৪ সালের করা ফ্রান্স-ব্রিটেনের "Entente Cordiale" চুক্তি করা ব্রিটেনের সহযোগী। এর আগে ব্রিটেন রাশিয়াকে তাদের একটা বড় হুমকি মনে করত ভারতবর্ষে ব্রিটেন সাম্রাজ্যের কারণে। কিন্তু ইতোমধ্যে অবস্থা পাল্টেছে। ১৯০৪-০৫ সালের রাশিয়া-জাপান যুদ্ধে রাশিয়ার হারার ফলে তাদের শক্তি অনেক কমে যায় এবং ব্রিটেন বুঝতে পারে রাশিয়ার সক্ষমতা। আর রাশিয়া খুঁজছিলো এক দীর্ঘসময়ের বন্ধু। এছাড়া শিল্পবিপ্লবের ফলে রাশিয়াতে নতুন যন্ত্রাংশ ব্যবহারে যে জটিলতা ছিল তা অনেকাংশে শিথিল হয়ে পরে। এবং রাশিয়া ব্রিটেনের শিল্পবিপ্লবের দিকে আগ্রহী হয়ে পড়ে। এই চুক্তির ফলে রাশিয়া এবং ব্রিটেনের মাঝে যে দূরত্বগুলো ছিল সেগুলো অনেকাংশে দূর হয়। এটা কোন সামরিক চুক্তি ছিল না। কিন্তু এ চুক্তির ফলে ফ্রান্স, রাশিয়া আর ব্রিটেন যে মৈত্রীতে আবদ্ধ হয় জার্মানী সেটাকে তাদের বিরুদ্ধে গঠিত শক্তি হিসেবে মনে করে।

এরপর ১৯০৮ সালে হয় 'বসনিয়া সমস্যা'।
এটা একটা বড় সমস্যার সৃষ্টি করেছিল। বসনিয়ায় ছিল তুরস্কের বর্ধিতাংশে দেখা দেয় বিপ্লব। এর সুযোগ নেয় অস্ট্রিয়া। তারা দখল করে বসনিয়া। এদিকে অন্যদেরও বসনিয়া নিয়ে আগ্রহ ছিল ব্যাপক। বসনিয়া সার্বিয়ার পাশের রাষ্ট্র। বসনিয়া নিয়ে সার্বিয়ারও আগ্রহ ছিল চূড়ান্ত কারণ বসনিয়ায় ৩০ লক্ষের মত সার্বরা থাকত যার মধ্যে সার্ব ছাড়াও ছিল ক্রোট এবং মুসলিম। সার্বিয়া তাদের ঘনিষ্ঠ সার্বদের কাছে সাহায্য চায়। রাশিয়া বিশ্বব্যাপী একটা সম্মেলন ডেকে ব্রিটেন আর ফ্রান্সের সমর্থন চায়। কিন্তু ব্যাপারটা পাল্টে গেল অন্যভাবে যখন সবাই দেখলো যদি এখানে যুদ্ধ শুরু হয় তবে জার্মানি অস্ট্রিয়াকে সবরকম সামরিক সহযোগিতা দিবে। ফ্রান্স বলকান অঞ্চলে কোন যুদ্ধে জড়িত হওয়ায় আগ্রহি ছিল না। ব্রিটেন তাদের আভিজাত্য থেকে কখনোই চাইত না জার্মানদের সাথে যুদ্ধে যেতে। আর জাপানের কাছে যুদ্ধে হারার পর রাশিয়া তখনো চুপচাপ। আরেকটা যুদ্ধের জন্য তারা ঝুঁকি নিতে আগ্রহী ছিল না। ফলে সার্বিয়া সাহায্যের জন্য কাউকেই সাথে পেল না। কোন আন্তর্জাতিক সম্মেলনও হল না। অস্ট্রিয়া বসনিয়াকে তাদের দখলেই রাখলো। জার্মানি-অস্ট্রিয়া সম্পর্কের এটা প্রথম বড় কোন অগ্রগতি ছিল। কিন্তু এর ফলে দুইটা বড় সমস্যা দেখা দেয়:

১. সার্বিয়া আবারো অস্ট্রিয়ার নিচে পড়ে থাকে এবং সার্বদের ভেতরে ক্ষোভ বাড়তেই থাকে।
২. রাশিয়া তাদের অসহায় অবস্থা থেকে সরে আসে এবং বড় একটা সামরিক বাহিনী গঠন শুরু করে। যাতে এরপর সার্বিয়া যদি আবার কোন সাহায্য চায় তবে তারা যেন সাহায্য করতে পারে।

আগাদির সমস্যা, ১৯১১ সাল
এটা ছিল মরক্কো সমস্যারই একটা পরিবর্তিত রূপ। ফ্রান্সের ট্রুপস মরক্কোর রাজধানী 'ফেজ' দখল করে যাতে সুলতানের বিরুদ্ধে একটা বিদ্রোহ করা যায়। ফ্রান্স মরক্কোকে তাদের বর্ধিতাংশ বানাতে চেয়েছিল। অন্যদিকে জার্মানি তাদের সশস্ত্র জাহাজ 'প্যানথার' মরক্কোর 'পোর্ট অফ আগাদির' এ প্রেরণ করে। তারা আশা করছিল যে তারা ফ্রান্সের উপর চাপ দিয়ে মরক্কো'র পালটা দখল নিবে, সেই সাথে ফরাসি কঙ্গোও দখলে আনবে। আগাদির জার্মানদের দখলে যাওয়ায় ব্রিটেন উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে কারণ এতে তাদের ট্রেড রুট হুমকির মুখে দাঁড়ায়। এর প্রেক্ষিতে ব্রিটেনের Chancellor of Exchequer, লয়েড জর্জ একটি ভাষণ দেন, যেখানে তিনি জার্মানিকে সতর্ক করে বলেন যে, যেখানে ব্রিটেনের সার্থে আঘাত করা হবে সেখানে ব্রিটেন দাঁড়িয়ে থাকবে না বরং সামনে বাড়বে। এদিকে ফ্রান্সও তাদের অবস্থানে অনড় ছিল। শেষ পর্যন্ত জার্মানি আগাদির থেকে তাদের গানবোট সরায়। এটা অক্ষশক্তির একটা বড় জিয় ছিল।

এরপর প্রথম ও দ্বিতীয় বলকান যুদ্ধ ১৯১২-১৯১৩
যুদ্ধটা শুরু হয় যখন সার্বিয়া, গ্রিস, মন্টিনেগ্রো এবং বুলগেরিয়া (যারা 'বলকান লীগ' হিসেবে পরিচিত ছিল), তুরস্কে আঘাত করে। জলদিই জার্মান সরকার এবং ব্রিটেন ফরেইন সেক্রেটারি স্যার এডওয়ার্ড গ্রে লণ্ডনে একটি শান্তি সম্মেলনের আয়োজন করেন যেটা শেষ হয় তুরস্ককে বলকান লীগের দেশগুলোর মধ্যে ভাগ করে দেয়ার মাধ্যমে। কিন্তু এ নিয়ে সার্বিয়া খুশি ছিল না। তারা আলবেনিয়া চেয়ে বসে যাতে তারা সহজেই সমুদ্রপথ ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু অস্ট্রিয়া জার্মান এবং ব্রিটেনের সহযোগিতায় ঘোষনা করে যে আলবেনিয়া একটা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবেই থাকবে। সার্বিয়াকে শক্তিশালি হওয়া থেকে বিরত রাখাতে এটা অস্ট্রিয়ার আরেকটি জয় ছিল।

এরপর দ্বিতীয় বলকান যুদ্ধ শুরু হয় যখন বুলগেরিয়া তাদের প্রাপ্তি নিয়ে অখুশি হয় এবং মেসিডোনিয়াকে চেয়ে বসে। বুলগেরিয়া সার্বিয়াকে অ্যাটাক করে কারণ এর বেশিরভাগ অঞ্চল সার্বিয়ার ভাগ্যে পরে। কিন্তু বুলগেরিয়ার পরিকল্পনা ভণ্ডুল হয় যখন গ্রিস, তুরস্ক, এবং রোমানিয়া সার্বিয়াকে সহযোগিতা দেয়। বুলগেরিয়া পরাজিত হয় 'বুখারেস্ট চুক্তি ১৯১৩' দ্বারা যেটাতে বুলগেরিয়া প্রথম যুদ্ধ থেকে তারা যা পেয়েছিল তাই হারায়। কিন্তু এখানে দু'টো সমস্যা দেখা দেয়।
১. অস্ট্রয়া সার্বিয়ার এ জয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে।
২. অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির মাঝে বসবাসরত সার্ব এবং ক্রোটরা হুমকির মুখে পড়ে যায়।

ইতোমধ্যে সার্বিয়া এবং অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির দ্বন্দ্ব এবং অন্যদিকে ব্রিটেন-ফ্রান্সের সাথে জার্মানির বিভেদ চরমে পৌছে গেছে। বিশ্ব তখন যুদ্ধের দ্বারপ্রান্ত। শুধু একটি উপলক্ষ বাকি। এই উপলক্ষটুকুও শিঘ্রই এসে গেল।

১৯১৪ সালের ২৮ জুন। বসনিয়া ভ্রমণকালে বসনিয়া'র রাজধানী সারজেভোতে "গার্ভিলো প্রিন্সিপ" নামে একজন অস্ট্রিয়ার আর্চডিউক "ফ্রাঞ্জ ফার্ডিন্যান্ড" এবং তার স্ত্রীকে গুলি করে হত্যা করে। পরে সে স্বীকার করে সে একজন সার্ব। অস্ট্রিয়া এতে সার্বিয়াকে দোষী বলে দাবি করে এবং সার্বিয়ান সরকারকে আল্টিমেটাম দেয়। সার্বিয়ান সরকার অস্ট্রিয়ার রিপোর্টের বেশিরিভাগ পয়েন্টই স্বীকার করেছিল। কিন্তু জার্মানির সমর্থনে অস্ট্রিয়া এই ঘটনাটিকে যুদ্ধ শুরুর কারণ হিসেবে চালাতে চেয়েছিল।

অবশেষে ২৮ জুলাই অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সার্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করে। অস্ট্রিয়া আবার সার্বিয়ার উপর চরাও হওয়াতে এবার রাশিয়া সার্বিয়ার উপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং তাদের সৈন্য সাজাতে নির্দেশ দেয় সেনাবাহিনীকে। জার্মানি এটা বন্ধ করতে বলে কিন্তু রাশিয়া তা উপেক্ষা করে। ফলে ১ আগস্ট রাশিয়া এবং ৩ আগস্ট ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। যখন জার্মান সৈন্যরা ফ্রান্স অ্যাটাক করার জন্য বেলজিয়ামের পথকে বেছে নেয় তখন ব্রিটেনও নড়েচড়ে বসে। কারণ ১৮৩৯ সালে বেলজিয়ামের সাথে চুক্তি অনুযায়ি বেলজিয়ানকে নিরপেক্ষ রাখতে ব্রিটেন প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিল। কিন্তু জার্মানি ব্রিটেনের নিষেধ অমান্য করায় ব্রিটেন ৪ আগস্ট যুদ্ধে প্রবেশ করে। অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি এবার ৬ আগস্ট রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করে। অন্যান্য দেশগুলো আরো পরে যুদ্ধে যোগ দেয়।

"মনরো মতবাদ" অনুসরণ করে যুক্তরাষ্ট্র এ যুদ্ধ থেকে বিরত ছিল। অন্য মহাদেশে যুদ্ধের ব্যাপারে তারা আগ্রহী ছিল না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ১৯১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্র অক্ষশক্তি সাথে যুদ্ধে যোভ দেয়।

মানবজাতির ইতিহাসে এ যুদ্ধের ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী। এটা ছিল মানবজাতির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। অথচ যুদ্ধের পিছনে কারণটা আর কিছুই ছিল না। ছিল শুধু ক্ষমতার লোভ।

"মনরো মতবাদ" এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি নিয়ে এরপরের কোন লেখায় আলোচনা করব। আজ এ পর্যন্তই শেষ করলাম।

বিবলিওগ্রাফি:
১. International Relations between two world 1919-1939 war by E.H. Carr
২. Mastering Modern World History by Norman Lowe
৩. History of International Relations by Abdul Halim
এবং উইকিপিডিয়া।

মন্তব্যসমূহ

সুব্রত শুভ এর ছবি
 

কয়েকটা সাল মনে হয় টাইপ মিসটেক হয়েছে-১৯৮৮ লেখা আছে।

কিন্তু কথায় আছে রাজনীতিতে শেষ বলে কিছু নেই। বিপত্তিটা ঘটল যখন ১৯৮৮ সালে সম্রাট দ্বিতীয় উইলিয়াম (William II) জার্মানি নতুন কাইজার হন।

আর জার্মানিও ততোদিনে বেশ উন্নতি করেছে ১৯৯৭ সালের 'Tirpitz's Navy Law' এর আওতায়।

----------------------------------
মুক্তি আসুক যুক্তির আলোয়।

 
জলের গান এর ছবি
 

ওহ হ্যা।
ধন্যবাদ।
অনেক বড় লেখা তো

.
.
.
________________________
হ্যালোজেন রোদ চিলতে বারান্দায়
টিকটিকি তাই বলছে ভবিষ্যৎ...

 
নুর নবী দুলাল এর ছবি
 

চমৎকার লিখেছেন। এই ধরনের ইতিহাস ভিত্তিক লেখা অনলাইনে থাকা প্রয়োজন। কিছু বানান ভুল আছে। সম্ভব হলে ওগুলো ঠিক করে দেন।

 
জলের গান এর ছবি
 

ধন্যবাদ

.
.
.
________________________
হ্যালোজেন রোদ চিলতে বারান্দায়
টিকটিকি তাই বলছে ভবিষ্যৎ...

 
অরুন আলো এর ছবি
 

বেশ ভাল লাগল ।

অরুন আলো

 
জলের গান এর ছবি
 

ধন্যবাদ

.
.
.
________________________
হ্যালোজেন রোদ চিলতে বারান্দায়
টিকটিকি তাই বলছে ভবিষ্যৎ...

 

নতুন কমেন্ট যুক্ত করুন

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

জলের গান
জলের গান এর ছবি
Offline
Last seen: 4 দিন 10 ঘন্টা ago
Joined: বৃহস্পতিবার, অক্টোবর 31, 2013 - 10:15অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

কু ঝিক ঝিক

ফেসবুকে ইস্টিশন

SSL Certificate
কপিরাইট © ইস্টিশন.কম ® ২০১৬ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর