নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 5 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • সাইয়িদ রফিকুল হক
  • রাজর্ষি ব্যনার্জী
  • ড. লজিক্যাল বাঙালি
  • মোমিনুর রহমান মিন্টু
  • রহমান বর্ণিল

নতুন যাত্রী

  • আদি মানব
  • নগরবালক
  • মানিকুজ্জামান
  • একরামুল হক
  • আব্দুর রহমান ইমন
  • ইমরান হোসেন মনা
  • আবু উষা
  • জনৈক জুম্ম
  • ফরিদ আলম
  • নিহত নক্ষত্র

আপনি এখানে

বাংলাদেশ রাষ্ট্রে ধর্মীয় মৌলবাদ । মুঘলদের উত্তরাধিকার (প্রথম কিস্তি)


১৫২৬ সালে পাণিপথের যুদ্ধ জয়ের মাধ্যমে বাবর ভারতবর্ষে মুঘল সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করেন। বাবর বলতেন, তিনি মঙ্গোলীয় বীর তৈমুর লঙের অধস্তন ষষ্ঠ পুরুষ, আর মায়ের দিক থেকে ছিলেন আরেক মঙ্গোল বীর চেঙ্গিস খাঁর বংশধর! তথাপি ইতিহাসবেত্তাদের মত হচ্ছে, তিনি মঙ্গোল ছিলেন না। তিনি ছিলেন পারস্য থেকে আগত এক সেনাপুত, আর তার বাহিনীতে ছিল পারসিক, তুর্কী ও আফগানরা। বাবর ছিলেন সুদক্ষ তীরন্দাজ। তার পুত্র হুমায়ুনও বীর যোদ্ধা ছিলেন, যদিও তার ভাগ্য ততটা প্রসন্ন ছিল না। বাবর মারা যান ১৫৩০ সালের ২৬ ডিসেম্বর। জ্বরের প্রকোপে তিনি দিল্লীতে মৃত্যুবরণ করেন। যদিও নিজ ইচ্ছামাফিক তার সমাধি হয় কাবুলে!

মুঘল শাসনামলের প্রথম দিকটা ছিল ভারতের নতুন নতুন বিস্তীর্ণ এলাকা দখল, তার প্রত্যাঘাত ও পুনর্দখলের হাঙ্গামায় পরিপূর্ণ! তবে এই ভোগান্তিটা প্রধানত গিয়েছিল হুমায়ুনের ওপর দিয়েই! হুমায়ুনের প্রথম কাজ হলো জৌনপুরের (চানপুর) বিদ্রোহ দমন করা। এরপর তিনি গেলেন গুজরাটের বিদ্রোহী রাজা বাহাদুর শাহের বিরুদ্ধে। ১৫৩৫ সালে হুমায়ুন গুজরাটের বাহিনী ধ্বংস করে, বাহাদুর শাহের আশ্রয় নেয়া চাম্পানি দুর্গ দখল করেন। ১৫৩৭ সালে বঙ্গ আক্রমণকারী দিল্লীর ঘুর রাজবংশের উত্তরাধিকারী শের খাঁ ওরফে শের শাহের বিরুদ্ধে হুমায়ুন সবিশেষ ব্যস্ত থাকাতে বাহাদুর শাহ আবার গুজরাট জয় করে মালব আক্রমণ করেন। ১৫৪০ পর্যন্ত হুমায়ুন শের শাহের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত ছিলেন। ১৫৩৯ সালে গঙ্গাতীরে অবস্থিতে হুমায়ুনের শিবিরে শের শাহ কৌশলী অভিযান পরিচালনা করে হুমায়ুনকে নাজেহাল করে দেন। হুমায়ুন পালাতে বাধ্য হন, আর শের শাহ বঙ্গ দখল করে নেন।

১.
১৫৪০ সালে কনৌজ অভিযানের মাধ্যমে হুমায়ুন আবার উদ্যোগী হলেন। আবারও পরাজয়! পলায়নের সময় অল্পের জন্য গঙ্গায় ডুবে মরার হাত থেকে রক্ষা পান। এখান থেকে শুরু হলো তার পালিয়ে বেড়ানো। প্রথমে গেলেন সিন্ধু, তারপর মাড়বার (যোধপুর), এরপর ঘুরত থাকলেন জয়সলমীরের মরুভূমিতে। এখানেই হামিদার গর্ভে ১৫৪২ সালের ১৪ অক্টোবর জন্ম নেন আকবর। মরুভূমিতে পরিবার ও সন্তানকে নিয়ে ১৮ মাস ঘুরে বেড়ান হুমায়ুন। এরপর তিনি এক পর্যায়ে কান্দাহার গিয়ে তার শাসনকর্তা আপন ভাই মির্জা আশকারীর দ্বারস্থ হন। কিন্তু আশকারী তাকে সাহায্য করতে রাজী না হলে, এবার পালিয়ে যান পারস্যে।

হুমায়ুন মুঘল শাসকদের মধ্যে সবিশেষ! তিনি ক্ষমা, উদারতার এক অনন্য নজির স্থাপন করেন যা অপরাপর মুসলিম শাসকদের মধ্যে খুব কমই দেখা গিয়েছিল। পুত্র আকবরও পিতার এই উদারতা দ্বারা চালিত হয়েছিলেন। পারস্যের রাজা তামাস্প হুমায়ুনকে সূফী ধর্ম গ্রহণের পরই কেবল সাহায্য করতে রাজী হন। হুমায়ুন ও তার সুপ্রসিদ্ধ পুত্র আকবর- উভয়ের ওপরই এই সূফী ধর্মের বিরাট প্রভাব দেখা যায়। তামাস্পের কাছ থেকে ১৪ হাজার ঘোড়সওয়ারের এক বাহিনী নিয়ে হুমায়ুন ভারতে ফেরত আসেন। ১৫৪৫ সালে কান্দাহার জয় করেন, কিন্তু আশকারীকে ছেড়ে দিলেন। যদিও তার সেনাপতিরা ভাইকে হত্যার প্ররোচণা দিয়েছিল, কিন্তু হুমায়ুন তাকে ক্ষমা করে দেন।

১৫৪৮ সালে বিদ্রোহী ভ্রাতা কামরান আবার হুমায়ুনের সঙ্গে হাত মেলায়। যদিও ১৫৫১ সালে পুনরায় বিদ্রোহ করলে আবারও তাকে হুমায়ুন পরাজিত করেন। এবারও ক্ষমা করে দেন। ১৫৫৩ সালে আবারও গন্ডগোল দেখা দিলে হুমায়ুন তাকে হত্যার অনুমতি কিছুতেই দিতে রাজী হলেন না। শেষ পর্যন্ত কামরানকে বন্দী করে অন্ধ করে দেয়া হয়। কাবুল দখলের সময় ১৫৪৫ সালে হুমায়ুন অপর ভাই হিন্দালকেও ক্ষমা করেছিলেন।

এর মধ্যে ১৫৪০ সালে দিল্লী জয় করে নেন শের শাহ। ১৫৪৫ সালে চিতোর অবরোধের সময় কামানের গোলাউ অতর্কিতে মৃত্যু হয় তার। ক্ষমতায় আসে তার কনিষ্ঠ পুত্র জালাল খাঁ। তিনি সেলিম শাহ সুর নাম ধারণ করে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। ১৫৫৩ তে সেলিম সুরের মৃত্যুর পর সিংহাসনে বসে তারই বড় ভাই আদিল খাঁ। প্রথমেই তিনি সেলিম সুরের নাবালক পুত্রকে হত্যা করেন। আমোদ প্রমোদে দিন কাটাতে থাকেন তিনি। বছর না পেরোতেই পরিবারের আরেক সদস্য ইব্রাহিম সুরের নেতৃত্বে বিদ্রোহ সংগঠিত হলো।

আদিল খাঁকে তাড়িয়ে ইব্রাহিম সুর আগ্রা ও দিল্লী দখল করলেন। এ সময় পাঞ্জাব, বঙ্গ ও মালব অধীনতা অস্বীকার করল। এসব বিশৃঙ্খলার কথা শুনে হুমায়ুন ১৫৫৫ সালে বাহিনীসমেত এগিয়ে এসে জুলাই নাগাদ শের শাহের বংশধরদের হাত থেকে নিজের ফেলে যাওয়া সমগ্র রাজ্যই পুনর্দখল করেন। কিন্তু সুখ তার কপালে সইল না। ১৫৫৬ সালের জানুয়ারিতে মার্বেলে পা হড়কে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। আকবরের বয়স তখন ১৩। পিতার মন্ত্রী বৈরাম খাঁর তত্ত্বাবধানে আকবর সিংহাসনে বসলেন। মূলত তার ১৮ বছর বয়স অবধি বৈরাম খাঁই ছিল দিল্লীর শাসক। এ সময় সংগঠিত আদিল খাঁর বিদ্রোহও বৈরামের নেতৃত্বেই দমন হলো। আদিল খাঁর মন্ত্রী হিমুকে স্বহস্তে হত্যা করে বৈরাম। এ সময় বৈরামের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। কিন্তু ১৫৬০ সালে আকবর নিজ হাতে শাসনভার নিয়ে বৈরাম খাঁকে সরিয়ে দেন। গুপ্তঘাতকের হাতে বৈরামের মৃত্যু ঘটে। আকবরের তখন বয়স ১৮ বছর। আর রাজ্য সীমানা সীমাবদ্ধ ছিল দিল্লী ও আগ্রার আশেপাশের অঞ্চলে এবং পাঞ্জাবে।

ভারতে মুসলিম শাসনের ইতিহাসের দিকে তাকালে হুমায়ুনকেই বেশি দয়ালু মনে হয়। এর কারণ এই নয় যে, তিনি যুদ্ধবিরোধী বা বিরাট শান্তিকামী ছিলেন। বরং নিজের ভাইকে না মেরে চোখ উপড়ে দিয়ে বন্দি করে রেখেছিলেন। ভারতে মুসলিম শাসনের ইতিহাস এতটাই রক্তাক্ত যে, কোনো শাসক যদি হাজারের চেয়ে কম হত্যাকান্ড ঘটিয়ে থাকেন, তাকে রীতিমতো মহানুভব আখ্যা দেয়া যায়।

২.
১৩৫৮ সালে ইলিয়াস শাহের মৃত্যুর পর তার বংশধরেরা যথানিয়মে পরম্পরা অনুসারে যোগ্য শাসকদেরই ক্ষমতায় বসায়। সিকান্দর শাহ, জালালউদ্দীন মুহম্মদ শাহ, নাসিরউদ্দীন মাহমুদ শাহ, রুকনউদ্দীন বারবক শাহ, ইউসুফ শাহ ও জালালউদ্দীন ফতেহ শাহের মতো শাসকরা তাদের সহিষ্ণুতা ও শিক্ষার জন্য প্রসিদ্ধ ছিলেন। ইলিয়াস শাহী বংশ একটানা ক্ষমতায় থাকতে পারেনি। ১৪১১ সালে গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র সাইফুদ্দিন হামজা শাহ সিংহাসনে বসেন। এক বছর শাসন করার পর ১৪১২ খ্রিস্টাব্দে তিনি ক্রীতদাস শিহাবউদ্দিনের হাতে নিহত হন। ‘শিহাবউদ্দিন বায়াজিদ শাহ’ নাম ধারণ করে বাংলার সিংহাসনে বসার পর দুই বছরের মাথায় ১৪১৫ সালে তিনিও ষড়যন্ত্রকারীদের হাতে নিহত হন। এ সময় ক্ষমতা দখল করেন রাজা গণেশ।

শাহ বংশের রাজারা তাদের আমলে হিন্দুদেরও উচ্চপদে নিয়োগ দিতেন। দিনাজপুরের রাজা গণেশও আজম শাহের দরবারে আমাত্য হিসেবে নিয়োগ পান। তার বংশের রাজত্বকাল স্থায়ী হয় ৩০ বছর। ক্ষমতায় আরোহণ করেই তিনি মুসলিম আমাত্যদের একাংশকে হত্যা করেন, যার মধ্যে অনেক সূফী-দরবেশও ছিল। এ সময় দরবেশ নূর কুতুব-উল-আলমের অনুরোধে জৌনপুরের সুলতান ইব্রাহিম শর্কি বাংলায় অভিযান পরিচালনা করেন। তিনি গণেশের পুত্রকে মুসলমান বানিয়ে তাকে সিংহাসনে বসিয়ে যান। যদিও সে ফিরে যাওয়ার পরেই আবার গণেশ তার ছেলেকে হিন্দু ধর্মে ফিরিয়ে এনে নিজে ক্ষমতায় বসেন। গণেশ বংশের পতন ঘটে ১৪৩৩ সালে। ক্ষমতায় বসেন আরেক ক্রীতদাস নাসির খান। কিন্তু আমাত্যরা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে তাকে উৎখাত করে আবার মাহমুদ নামে ইলিয়াস শাহের এক বংশধরকে ১৪৫২ খিস্টাব্দে গৌড়ের সিংহাসনে বসান। ইতিহাসে তিনি নাসিরউদ্দিন মাহমুদ শাহ নামে পরিচিত। ইলিয়াস শাহের বংশধরদের পুনরায় ক্ষমতায় আসাটা ইতিহাসে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তারা যে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন ও জনগণের ভালোবাসা পেয়েছিলেন, এটা তার প্রমাণ বহন করে। নাসিরউদ্দিন একজন দক্ষ সেনাপতি ও ন্যায়পরায়ন শাসক ছিলেন। যশোর ও খুলনা অঞ্চল নাসিরউদ্দিন মাহমুদ শাহের রাজত্বকালে মুসলমান সাম্রাজ্যভুক্ত হয়েছিল। পশ্চিম বঙ্গ, পূর্ববঙ্গ, উত্তরবঙ্গ ও বিহারের কতকাংশ তাঁর সাম্রাজ্যভুক্ত ছিল। তিনি নিজ নামে মুদ্রাও জারি করেছিলেন।

১৪৫৯ খ্রিষ্টাব্দে নাসিরউদ্দিন মাহমুদ শাহ মৃত্যুবরণ করেন। এরপর তাঁর পুত্র রুকনউদ্দিন বরবক শাহ বাংলার সিংহাসনে বসেন। বরবক শাহই প্রথম অসংখ্য আবিসিনীয় ক্রীতদাস (হাবসী ক্রীতদাস) সংগ্রহ করে সেনাবাহিনী ও রাজপ্রাসাদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ করেন। নিয়োগকৃত এ হাবসী ক্রীতাদাসের সংখ্যা ছিল আট হাজার। এরাই পরবর্তীতে ইলিয়াস শাহ বংশের ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বরবক শাহের ন্যায় উদার মনোভাবাপন্ন শাসক শুধু বাংলার ইতিহাসে নহে, ভারতবর্ষের ইতিহাসেও দুর্লভ। হিন্দু ও মুসলমান উভয় ধর্মেরই বিদ্বান ও পণ্ডিত ব্যক্তি তাঁর পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেছিলেন। বৃহস্পতি মিশ্র ছিলেন গীতগোবিন্দটীকা, কুমারসম্ভবটীকা, রঘুবংশটীকা প্রভৃতি গ্রন্থের লেখক। ‘শ্রীকৃষ্ণ বিজয়’ নামক বিখ্যাত বাংলা কাব্যের রচয়িতা মালাধর বসু এ সময়ের একজন শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত ছিলেন। বাংলা রামায়ণের রচয়িতা কৃত্তিবাস বরবক শাহের অনুগ্রহ লাভ করেছিলেন। বাসুদেবও বরবক শাহের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেন। এ সময়ের মুসলিম কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে ইব্রাহিম কাইয়ুম ফারুকী, আমীর জয়েনউদ্দীন হারাভী, আমীর শিহাবউদ্দীন কিরমানী ও মনসুর শিরাজীর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

বরবক শাহ ১৪৭৪ সালে মৃত্যুবরণ করেন। আর তার পৌত্র জালালউদ্দীন ফতেহ শাহের রাজত্বকালের শেষের দিকে ১৪৮৭ সালে হাবশী ক্রীতদাসগণ তাকে হত্যা করে বাংলার সিংহাসন দখল করে। এভাবে বাংলায় হাবশী শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। এ সময় বাংলার রাজ্যসীমা পশ্চিমে উড়িষ্যা এবং পূর্বে সিলেট পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। বলতে গেলে, সমগ্র বাংলা এবং পশ্চিম ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিকটবর্তী কিছু এলাকা বাংলা সালতানাতের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। বাংলায় হাবশী (আবিসিনীয়) শাসন ১৪৮৭ থেকে ১৪৯৩ সাল পর্যন্ত প্রায় ছয় বছর স্থায়ী হয়েছিল। এই ছয় বছরে চার জন সুলতান পর পর দেশ শাসন করেন। এ সময় দরবারে ব্যাপক রক্তপাত ঘটে। এর মধ্যে কেবল মালিক আন্দিল গরীব ও নিঃস্বদের প্রতি তাঁর বদান্যতার জন্য ঐতিহাসিকদের ভূয়সী প্রশংসা পেয়েছেন। ১৪৯০ সালে ক্ষমতায় বসা শামসুদ্দীন আবু নছর মুজাফফর শাহ বাংলায় সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন। প্রতিদ্বন্দ্বীদের কবল থেকে মুক্তির জন্য তিনি গৌড় রাজধানীর অনেক পন্ডিত, ধার্মিক ও অভিজাতদের হত্যা করেন। তিনি প্রজাদের কাছ থেকে উচ্চহারে রাজস্ব আদায় করতেন। তবে তিনি সূফী, দরবেশদের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।

মুজাফফর শাহের নিপীড়নমূলক শাসনের ফলে তিনি সকল শ্রেণীর লোকের সহানুভূতি হারান। ফলে তার আরব বংশোদ্ভূত প্রধান উজির সৈয়দ হুসাইনের নেতৃত্বে এক গণবিদ্রোহ সংগঠিত হয়। মুজাফফর শাহ নিহত হন এবং তাঁর হত্যার সঙ্গে সঙ্গেই বাংলায় হাবশী শাসনের অবসান ঘটে। এর মধ্য দিয়ে বাংলার রাজ দরবারে গোড়াপত্তন ঘটে হোসেনশাহী আমলের। এ বংশের প্রতিষ্ঠাতা আলাউদ্দীন হোসেন শাহ সিংহাসন অধিকার করেন। তার রাজত্বকালে বাংলার সালতানাতের ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটে। কামরূপ ও কামতা জয় করে তার সৈন্যবাহিনী আসামের ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার আরও উত্তরে অগ্রসর হয়। উড়িষ্যা ও ত্রিপুরার একাংশ তার রাজ্যভুক্ত করতে সক্ষম হন। চট্টগ্রাম ছিল তার রাজ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। হোসেন শাহের রাজত্বের শেষ দিকে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের উদ্দেশ্যে পর্তুগিজ প্রতিনিধিদল বাংলায় আসে। ১৫১৯ খ্রিস্টাব্দে হোসেনের রাজত্বের সমাপ্তি ঘটে। তার রাজত্বকালে দেশে নিরবছিন্ন শান্তি বিরাজ করছিল। সমসাময়িক কবি বিজয় গুপ্ত তাকে ‘নৃপতি-তিলক’, ‘জগৎ-ভূষণ’ ও ‘কৃষ্ণ-অবতার’ রূপে আখ্যায়িত করেছেন। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রতি তার নীতি ছিল সহিষ্ণু ও উদার। তিনি তাদের উচ্চ রাজপদে নিয়োগ করেন এবং তাদের ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করেন।

আলাউদ্দীন হোসেন শাহের মৃত্যুর পর তার জ্যেষ্ঠপুত্র নুসরত সুলতান নাসিরউদ্দীন নুসরত শাহ উপাধি ধারণ করে ১৫১৯ খ্রিস্টাব্দে সিংহাসনে আরোহণ করেন। উত্তর ভারতে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুযোগে নুসরত ত্রিহুত (উত্তর বিহার) পর্যন্ত তার রাজ্য সম্প্রসারণ করেন। এ সময় ভারতে বাবরের বিজয় অর্জিত হয় পাণিপথের যুদ্ধে। নানা কৌশল সত্ত্বেও নুসরত শাহ বাবরের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষ এড়াতে পারেননি। গোগরার যুদ্ধে পরাজিত হয়ে নুসরত বাবরের সঙ্গে সন্ধি করে বাংলাকে আসন্ন বিপর্যয় থেকে রক্ষা করেন। তার রাজত্বকালে পর্তুগিজরা বঙ্গোপসাগরে সক্রিয় ছিল। নুসরত বাংলা সাহিত্যের একজন মহান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন; সাহিত্যে বারবার তার নাম উল্লেখিত হয়েছে। কথিত আছে যে, গৌড়ে তার পিতার সমাধি জিয়ারতকালে তার এক ক্রীতদাস তাকে হত্যা করে।

শেষ হোসেনশাহী সুলতান গিয়াসউদ্দীন মাহমুদ শাহ ক্ষমতায় আসেন ১৫৩৩ সালে। দিল্লীতে তখন হুমায়ুনের ক্ষমতা। গুজরাটে হুমায়ুনের ব্যস্ততার সুযোগে শের শাহ ১৫৩৫ সালে ভাগলপুর পর্যন্ত এলাকা দখল করে নেন। ১৫৩৬ খ্রিস্টাব্দে শেরখান তেলিয়াগড়ে উপস্থিত হন। পর্তুগিজ সৈন্যদের সহায়তায় মাহমুদের সৈন্যদল তাকে প্রতিহত করে। মাহমুদ পর্তুগিজদের স্থানীয় জনগণের কাছ থেকে রাজস্ব আদায়ের অধিকারসহ চট্টগ্রাম ও সাতগাঁওয়ে তাদের দুর্গ ও বাণিজ্যকুঠি নির্মাণের অনুমতি দান করেছিলেন। এতে বাংলায় পর্তুগিজদের ক্ষমতা বহুল পরিমাণে বৃদ্ধি পায়। ১৫৩৭ খ্রিস্টাব্দে বিহারে শেরখানের অবস্থান ছিল নিরাপদ। তিনি আবারও গৌড়ে উপস্থিত হন এবং গৌড় অবরোধ করেন। শেষ মুহূর্তে মাহমুদ শেরখানের বিরুদ্ধে হুমায়ুনের সঙ্গে যোগ দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু গৌড়ে আফগানরা তার দু পুত্রকে হত্যা করলে মাহমুদ মানসিক যন্ত্রণায় বিপর্যস্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। ১৫৩৮ সালে বাংলার স্বাধীন সালতানাতের অবসান ঘটে। এর মধ্য দিয়ে বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্যকর এক যুগের সূচনা হয়। দীর্ঘদিন পর্যন্ত বাংলার জনজীবনে এ অবস্থা বিরাজ করছিল।

৩.
ভারতে ও বাংলায় ইসলামের আগমণের পর থেকে ১৫৪০ পর্যন্ত এর প্রভাব ও বিস্তৃতির প্রক্রিয়াটা এবার আমলে নেয়া দরকার। উপরোক্ত ঐতিহাসিক বর্ণনা ওই সময়ের শাসন কাঠামো বুঝতে সাহায্য করে মাত্র। কিন্তু বাস্তবে ধর্ম কিভাবে জনজীবনে ভূমিকা রাখছিল, বা শাসকরা কিভাবে ধর্মের বিকাশ ঘটাচ্ছিলেন তা এ থেকে মূর্ত হয় না। তাই আমাদের চলে যেতে হবে আরও গভীরে। এই লেখার সূচনাতে, অর্থাৎ ভূমিকাপর্বেই আমরা উল্লেখ করেছিলাম, মুসলিমদের দুটি ধারা ভারতে ধর্ম প্রচার করতে এসেছিল। একটি ধারা হচ্ছে সূফীবাদ বা মারেফাত, যা ছিল ইরান থেকে বিস্তৃত পারসিক সভ্যতার মিশেল পাওয়া ইসলাম। অন্যটি ছিল রাজধর্ম ইসলাম, যা নবী মুহাম্মদের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত খেলাফতের হাত হয়ে রাজধর্ম হিসেবে সৈন্যবাহিনীসমেত ভারতবর্ষে অষ্টম শতাব্দীতে এসে হাজির হয়। এই দ্বিতীয় ধারাটি ইসলামের শরিয়তি বিধানের প্রতিনিধিত্ব করত। কিন্তু রাজধর্ম আকারে হাজির হওয়ায় তাদের পক্ষে পূর্ণ শরিয়ত প্রতিষ্ঠা সম্ভব ছিল না।

হীরেন স্যান্যাল লিখেছেন, ‘আরব মুসলিমগণ পারসিক সাম্রাজ্যবাদের প্রাচীন মতবাদ স্বীকার করে নিয়ে বিজিত জাতির (পারসিক) সাংস্কৃতিক সহজ শিকারে পরিণত হোল।’ পারসিক সাম্রাজ্যবাদ রাজকীয়। বিলাস, বৈভব, ভোগ, সম্পদ এগুলিই এ সভ্যতার অঙ্গ। অতএব কোরানের শিক্ষায় সংলগ্ন থাকা দূরূহ।’ (ভারতীয় সমাজ বিকাশের বৈশিষ্ট্য, পৃ: ৮৪)। অর্থাৎ রাজধারার ইসলামে বিত্ত-বৈভব আর ভোগের প্রাধান্যের কারণে শরিয়তি ইসলাম প্রতিষ্ঠা তাদের দ্বারা সম্ভব ছিল না। তবুও রাজা তথা সুলতানরাই ছিলেন শরিয়তের প্রতিনিধি। রোমিলা থাপার লিখেছেন, ‘শেষ পর্যন্ত তাঁকে ইসলামের নাম করেই আনুগত্য লাভ করতে হতো। এই কারণে তাঁকে অন্তত প্রকাশ্যে ইসলামী ঐতিহ্য ও শরিয়ার অনুশাসন মেনে চলতে হতো।’ (ভারতবর্ষের ইতিহাস, পৃ: ২১৯)

আমাদের আলোচ্য পর্বে অর্থাৎ ভারতে ইসলামের পূর্ণ প্রকাশেরও ৩০০ বছর পর, ১৫০০ সালের দিকে ভারতে চাষী সম্প্রদায়গুলো থেকে নতুন নতুন ধর্ম বা আচারগোষ্ঠী গড়ে উঠছিল। বিষয়টা এমন ছিল না যে, ইসলামের আগমনে ও মুসলিম শাসকদের প্রণীত আইনবিধিতে হিন্দুদের জাতপাত প্রথা সঙ্কটে পড়েছিল, নিম্নবর্ণের হিন্দুরা দলে দলে মুসলিম হয়ে যাচ্ছিল এবং তার বিকল্প হিসেবে বা জাতভেদের পরিপূরক হিসেবে এসব ধর্ম গড়ে উঠছিল। বরং মূলত এই ধর্মগুলো ছিল জাতভেদ প্রথার বিরোধী। মুসলিম শাসনের জের হিসেবে ভারতের বিভিন্ন সমাজে গড়ে-ওঠা গোষ্ঠীগুলোই এই নতুন সম্প্রাদায়ের সৃষ্টি করেছিল। ১৫ শতকের শেষদিকে যে বিরাট ধর্ম আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তা ছিল এদেরই বিকাশের ফল।

ইরফান হাবিব লিখেছেন, ‘এইসব গোষ্ঠীর বেশির ভাগেরই প্রধান ধ্যানধারণা ছিল একই ধরনেরঃ আপসহীন একেশ্বরবাদ, আচার-অনুষ্ঠানমূলক পূজা-অর্চনা বর্জন এবং সমস্তরকম জাতের বাধা ও সম্প্রদায়-ভেদ অস্বীকার। এইসব ধ্যানধারণার সারকথার মতো তাদের প্রচারের কায়দাও ছিল সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সমস্ত প্রচারই চলত জনগণকে উদ্দেশ্য করেঃ আঞ্চলিক উপভাষাই তার মাধ্যম আর ধর্মগুরু, প্রচারক ও শিষ্যদের বেশির ভাগই ছিলেন নীচুশ্রেণীর লোক। বৈরাগীদের মহান গুরু কবীর (আনু. ১৫০০) ছিলেন জোলা; দাদূপন্থীদের শিক্ষক দাদূ (আকবরের সমসাময়িক) গ্রামে ধুনুরির কাজ করতেন; নিরঞ্জীদের গুরু নানক ছিলেন শস্য-ব্যবসায়ী। এই গুরুদের কেউই (কবীর ও নানক তো একেবারেই নয়) বিনয় ও বৈরাগ্য ছাড়া আর কোনো আচরণবিধি প্রচার করেননি।’ (মুঘল ভারতের অর্থনীতি, পৃঃ ৩১১)

একই বিষয়ে রোমিলা থাপার লিখেছেন, ‘ইসলামের আগমনের ফলে রাজনৈতিক সংগঠনগুলিতে কোনো বড় পরিবর্তন হয়নি। কিন্তু ভক্তি আন্দোলন থেকে বোঝা যায় যে, প্রচলিত সামাজিক রীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সরব হয়ে উঠছিল। রাজনৈতিক আনুগত্যের চেয়ে বর্ণভিত্তিক আনুগত্য বেশি শক্তিশালী ছিল বলে ইসলামের প্রকৃত প্রভাব পড়েছিল সামাজিক কাঠামোর ওপর। বর্ণভিত্তিক ভারতীয় সমাজে আরো অনেক নতুন উপবর্ণ ও গোষ্ঠীকে গ্রহণ করা হল এবং এদের অনেকেই ইসলামী আদর্শের দ্বারা প্রভাবিত ছিল। এর আগের যুগেও ভারতীয় সমাজে বিদেশীদের এইভাবেই অঙ্গীভূত করে নেওয়া হয়েছিল।’ (ভারতবর্ষের ইতিহাস, পৃ: ২৪২)

সাধারণত ইতিহাসে বলা হয় যে, মুসলিমদের আগমনে জাতপাত প্রথায় জর্জরিত ভারতীয় সমাজের দরিদ্র্য হিন্দুরা দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করে। কারণ ইসলাম ছিল একেশ্বরবাদী, পূজা-অর্চনামুক্ত, জাতপাতবিরোধী ও সমানাধিকারমূলক। কিন্তু আমরা ঐতিহাসিকের বয়ান থেকে পাচ্ছি, ইসলামের আগমন অষ্টম শতাব্দীতে ঘটার ৭০০ বছর পর এখানে এমন সব ধর্ম বিকশিত হচ্ছিল যা কিনা ইসলামেরই বিকল্প। ইসলামকে যতটা একেশ্বরবাদী, পূজা-অর্চনামুক্ত, জাতভেদমুক্ত ও সমানাধিকারমূলক বলে প্রচার করা হয়েছে, এসব ধর্মে এ বিষয়গুলো ইসলামের চেয়েও বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। দলে দলে মানুষ মুসলিম হয়ে গেলে এসব ধর্মের বিকাশ ঘটত না। অর্থাৎ ভারতীয় পন্ডিতরা ইসলামের মধ্যে সমাধান দেখেননি। তারা অতি দ্রুত ইসলামের ইতিবাচক বিষয়গুলো গ্রহণ করে নিয়েছিলেন। কিন্তু ইসলামকে তারা গ্রহণ করেননি। রোমিলা থাপার বলছেন, ভারতীয় সমাজে এরকম বাইরের মতাদর্শকে নিজেদের মতো করে গ্রহণ করার প্রবণতা আগে থেকেই ছিল। এ কারণেই গরিবদের মধ্যে ইসলাম নয়, এক ধরণের ধর্মীয় গোষ্ঠীর বিকাশ আমরা দেখতে পাই, যারা কিনা ইসলামের চেয়েও বেশি জাতপাতবিরোধী ও সমানাধিকারমূলক, কিন্তু তাদের চরিত্রটা ভারতীয়।

অনেকে মনে করেন, ইসলামে জাতভেদ নেই, সব মুসলিম ভাই-ভাই, সব মুসলমানের সমান অধিকার। এটা যদি সত্য হতো, তাহলে ইসলামের আগমনের পর নতুন ওসব ধর্মের বিকাশ ঘটত না, বরং আক্ষরিক অর্থেই দলে দল হিন্দুরা সব মুসলিম হয়ে যেত। বাস্তবে ইসলামেও জাতভেদের উপস্থিতি ছিল। ভারতীয় ইতিহাসবিদ রোমিলা থাপারের লেখায় এ ব্যাখ্যাটা সবচেয়ে পরিষ্কারভাবে এসেছে। তিনি লিখেছেন, ‘ইসলামের সাক্ষ্যমূলক মতবাদের প্রচার সত্বেও বর্ণপ্রথা লুপ্ত হয়নি। ভারতবর্ষে এসে ইসলাম বর্ণভিত্তিক সমাজকে মেনে নিয়েছিল এবং এই কারণেই ইসলামের সামাজিক প্রগতিশীলতা দুর্বল হয়ে পড়ল। মুসলিম সমাজেও শেখ ও সৈয়দদের (এরা ছিল উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন আশরফ গোষ্ঠীভুক্ত) একটা আলাদা মর্যাদা ছিল। ঠিক যেমন, হিন্দুসমাজে দ্বিজ’র পৃথক মর্যাদা। অতএব এরপর ইসলামের কাছ থেকে হিন্দুধর্মের বর্ণপ্রথার ভয়ের কারণ থাকতে পারে না। যে বর্ণের হাতে শাসনক্ষমতা, সামাজিক মর্যাদাও চিরকাল তারই বেশি ছিল।’ (ভারতবর্ষের ইতিহাস, পৃ: ২৪২)

তিনি এ বিষয়ে আরও পরিষ্কার করে একই গ্রন্থে উল্লেখ করেন, ‘ইসলামে বর্ণপ্রথায় কোনো স্থান না থাকলেও মুসলিম সমাজজীবনে বর্ণপ্রথাকে একেবারে বাদও দেওয়া হয়নি। মুসলিম বর্ণপ্রথার ভিত্তি হল জাতিগত পার্থক্য। বিদেশী বংশোদ্ভুত যেমন, তুর্কী, আফগান বা পারস্যদেশীয় পরিবারগুলি সমাজে উচ্চতম বর্ণ হিসেবে স্বীকৃত হল। এদের বলা হতো ‘আশরফ’ (আরবী ভাষায় এই শব্দের অর্থ হল ‘সম্মানীয়’), এর পরের বর্ণ হল ধর্মান্তরিত উচ্চবর্ণের হিন্দু। যেমন মুসলিম রাজপুত। বৃত্তিজাত বর্ণগুলিকে নিয়ে আরো দুটি শ্রেণীভেদ আছে। তাদের মধ্যে একটি হল ‘পরিচ্ছন্ন’ বর্ণ এবং অন্যটি হল ‘অপরিচ্ছন্ন’ বর্ণ। প্রথমটির মধ্যে আছে কারিগর ও অন্যান্য পেশার লোক। আর, অন্য বর্র্ণভুক্ত মানুষ হল ঝাড়ণ্ডদার ও মেথর শ্রেণীর লোক,- যারা নোংরা কাজ করে।’ (পৃ:২২৬)।

জাতভেদ বা বর্ণভাগ সাধারণের কাছে এসেছিল একটু ভিন্নভাবে। হীরেন স্যান্যাল লিখেছেন, ‘মুসলিম শাসকদের বুঝতে ভুল হয়নি। ব্রাক্ষ্মণের হাঁকডাক কমাতে না পারলে রাজনৈতিক ক্ষমতা যে পোক্ত হবে না এ মোক্ষম কথাটি ঠিকই বুঝেছিলেন। অতএব ব্রাক্ষণ এখন থেকে সর্বত্রই অনাদৃত। রাজদরবারের সম্মান, আইন প্রণয়ণের ক্ষমতা, শাসকের পরামর্শদাতার অধিকার, সকলই অপহৃত। অধুনা এ স্থানের দখলদার উলেমাগণ।’ (ভারতীয় সমাজ বিকাশের বৈশিষ্ট্য, পৃ: ৮৭)। অর্থাৎ ভারতের জনগণ দেখেছে হিন্দুদের ছিল ব্রাহ্মণ, আর মুসলিমদের আছে ওলামা।

একইভাবে সাধারণ মানুষ আরও দেখেছেন, সুলতানরা নিজেদের (ধর্মীয়) কর্তব্য পালন করতেন না। রোমিলা থাপার উল্লেখ করেছেন, ‘সুলতানরা তো ঈশ্বরেরই প্রতিনিধি, সেজন্যে তাঁদের কর্তব্যও মহান। এই কথা বলার অপরাধে বরনিকে নির্বাসিত করা হয়েছিল। এইসব অভিযোগ উলেমাদের কাছ থেকেই আসা উচিত ছিল, কিন্তু তাঁরা কখনো এসব ব্যাপারে মুখ খুলতেন না।’ (ভারতবর্ষের ইতিহাস, পৃ: ২১৯) এমনকি শাসনের প্রয়োজনে আইন-কানুন পরিবর্তন হতো হরদম। ‘মৃত্যুদণ্ড দিতে হলে সুলতানের অনুমতি প্রয়োজন হতো।... অ-মুসলমানরা তাদের নিজস্ব আইন বজায় রাখতে পারত।... আইনের নির্দিষ্ট ব্যাখ্যার ব্যবস্থা ছিল না বলে প্রয়োজন অনুসারে আইনের ব্যাখ্যা অদল-বদল হতে পারত।’ (ভারতবর্ষের ইতিহাস, পৃ: ২১৯)

হীরেন স্যান্যাল আরও দেখিয়েছেন যে, সাধারণের কাছে ক্রমশ শাসক হিসেবে হিন্দু ও মুসলিম, উভয়েই সমার্থক হয়ে যেতে থাকে। নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে প্রমাণ হতে থাকে যে, হিন্দু ও মুসলিম, উভয় ধারার শাসকরাই ধর্মের নামে ক্ষমতায় থাকলেও, শাসনকার্য পরিচালনায় বারবার ধর্মের কথা বললেও নিজেদের স্বার্থের প্রশ্ন এলে তারা ধর্মকে থোড়াই কেয়ার করে। লিখেছেন, ‘গোলকোণ্ডা, বিদর, বেরার প্রভৃতি রাজ্যের শাসক মুসলমান। এরাও একে অপরের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত। এমনকি প্রতিদ্বন্দ্বীকে শায়েস্তা করার জন্য কোন এক মুসলিম শাসক বিজয়নগরের হিন্দুরাজার সাহায্যপ্রার্থী। বর্ণহিন্দুরা মসলমান শাসকের পক্ষপুটাশ্রয়ী এমন ঘটনাও আকছার। সেক্ষেত্রে রাজনৈতিক উচ্চাকাঙক্ষাই কারণ।’ (ভারতীয় সমাজ বিকাশের বৈশিষ্ট্য, পৃ: ৮২-৮৩)

ঐতিহাসিকদের এসব সাক্ষ্য প্রমাণ আমাদের সামনে ১৫০০ সাল অবধি রাজধারা ইসলামের বিকাশের খুঁটিনাটি তুলে ধরছে। আগের দুই পর্বের আলোচনাকে একত্র করলে দেখা যাবে, ৮০০ থেকে ১৫০০, এই সময়পর্বে ইসলাম প্রধানত এ অঞ্চলে যুদ্ধ-বিগ্রহ, লুটপাট ও রক্তপাতের মধ্য দিয়েই ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে তার আসন গেঁড়েছে। তারা শরিয়তের প্রতিনিধিত্ব করেছে, কিন্তু নিজেরা শরিয়ত মান্য করেনি। মুখে বর্ণপ্রথামুক্ত বললেও বাস্তবে দেখা গেছে তারা বর্ণভেদ বজায় রেখেছে। ক্ষমতাটাই ছিল আরাধ্য, এজন্য ধর্ম বিসর্জনও দিতে দেখা গেছে। আবার এর বিপরীতে মসজিদ স্থাপন, মন্দির ভাঙা আর জোরপূর্বক ধর্মান্তর, এগুলোর চর্চা হয়েছে। শাসনকাঠামোর এই রূপটা ভারতে শেষ পর্যন্ত টিকে গেছে।

শাসকরা মুখে এক বলবেন, কিন্তু করবেন ভিন্ন রকম। শাসক হবেন ধর্মাবতার, কিন্তু তার নিজের জন্য কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। মোটকথা, ধর্ম হলো শাসকদের সুবিধা নেয়ার এক হাতিয়ার। ভারতে এর আগে হিন্দু শাসকদের কাছে ধর্ম যেমন নিজেদের সুবিধা লাভের হাতিয়ার ছিল, মুসলিমরা এখানে এসে কার্যত সেই ধারাবাহিকতাতেই এগিয়ে গেল। রাজধারা ইসলাম অস্ত্রের শান আর দরবারের শওকত ছাড়া ভারতকে নতুন কিছু দিতে পারল না। বরং রাষ্ট্রক্ষমতার সঙ্গে ধর্মের বন্ধনটাকে আরও শক্তিশালী করল। যে ধারা আকবর কিছুটা স্তিমিত করতে পারলেও বিনাশ ঘটাতে পারেননি। বরং তার বংশধর আওরঙ্গজেবের আমলে তা চরমভাবে বিকশিত হয়।

ধর্ম ও রাষ্ট্রক্ষমতার এই পারষ্পরিক নির্ভরতা ভারতবর্ষের সমাজগুলোতে মৌলবাদীকরণকে বিকশিত করতে থাকে, আজ যার পরিপূর্ণ রূপ আমরা দেখতে পাচ্ছি। ১৫০০ সাল থেকে সারা পৃথিবী অনেক পথ এগিয়ে গেলেও আমরা এখনও সেই ধর্মরাষ্ট্রের প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারিনি। বিপরীতে বাংলায় ইলিয়াস শাহী বংশের শাসন, হুমায়ুনের উদারতা ও বিভিন্ন জনপদে ইসলামের যে বিকাশ দেখা যায়, তা ছিল সূফী ধারার ইসলামের প্রভাব।

৪.
সূফী ধারার ইসলাম নিয়ে নানা পক্ষের ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়। কট্টর শরীয়তপন্থী মুসলিমরা, যেমন ইবনে তাইমিয়্যাহ ও তার অনুসারীরা মনে করেন, সূফীবাদ আসলে সর্বেশ্বরবাদ বা পৌত্তলিকদের ধারাবাহিকতা। তারা সূফীদের অমুসলিম বা কাফির আখ্যা দিতেন। কিন্তু সূফীরা নিজেরা আবার আল্লাহকে পাওয়ার জন্যই সবকিছু করেন। এর বাইরে তারা দুনিয়াবি কাজ-কর্ম থেকেও ছুটি নেন। সূফীরা দাবি করেন যে, আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান এবং মানুষের অন্তরে তিনি বাস করেন। তাই মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্কটা হবে প্রেমের। অন্যদিকে শরিয়তপন্থীরা দাবি করেন, স্বয়ং আল্লাহ নিজে কোরানে দাবি করেছেন যে, তিনি আরশে অবস্থান করছেন। তারা এও বলেন যে, মানুষ আল্লাহর দাস, আল্লাহর সঙ্গে প্রেম কেবল নবীর, মানুষের সঙ্গে নয়। কট্টর মুসলিমরা সূফীবাদকে মূলত হাদিস ও কোরান দিয়ে আক্রমণ করেন।

কোরানের সূরা হাদীদের ২৭ নং আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আর বৈরাগ্য তারা নিজেরা প্রবর্তন করে নিল, আমি তাদের উপর তা (বৈরাগ্য) বিধিবদ্ধ করিনি, যদিও তারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য (নিজেদের ইচ্ছা অনু্যায়ী) এ অবস্থা অবলম্বন করেছিল কিন্তু তারা যথোপযুক্তভাবে এর সংরক্ষণ করেনি।’ এই আয়াতটির সঙ্গে যোগ হয় আরেকটি আয়াত ও একটি সহীহ্ হাদিস। কোরানের সূরা সাজদাহের ৪নং আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ, যিনি আসমান ও যমীন এবং এ দু’য়ের মধ্যে যা কিছু আছে, তা ছয়দিনে সৃষ্টি করেছেন। তারপর তিনি আরশের উপর অবস্থান করছেন।’

হাদিসে এসেছে, আনাস ইবনু মালিক (রাযি.) বর্ণনা করেন, তিন ব্যক্তির একটি দল, রসূলুল্লাহ (স.) এর ইবাদত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করার জন্য আগমন করল। তাদেরকে এ সম্পর্কে অবগত করানো হলো। নবী (স.) এর ইবাদতের পরিমাণ কম মনে করে তারা বললঃ আমরা নবী (স.) এর ইবাদতের পরিমাণ কম মনে করে তারা বলল, আমরা নাবীর সমকক্ষ হই কি করে যার আগের ও পরের সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে। এ সময় তাদের মধ্য থেকে একজন বললঃ আমি বিরতহীনভাবে সারা বছর সিয়াম পালন করব। অন্য জন বললঃ আজীবন সারা রাত সালত পড়তে থাকব। তৃতীয় ব্যক্তি বললঃ আমি ইবাদতের জন্য সর্বদা নারী বিবর্জিত থাকব এবং কখনও বিবাহ করব না। (এ কথা শুনে) নবী তাদের কাছে আসলেন এবং বললেন, তোমরা কি সেই লোক যারা এরূপ কথাবর্তা বলেছ? আল্লাহর কসম, আমি আল্লাহর প্রতি তোমাদের চেয়ে বেশী অনুগত এবং তাকে তোমাদের চেয়ে বেশী ভয় করি। অথচ তা সত্ত্বেও আমি সিয়াম পালন করি আবার বিরতিও দেই। রাতে নিদ্রাও যাই, সলাতও পড়ি। আর বিবাহও করি। সুতরাং যারা আমার সুন্নাতের প্রতি বিরাগ পোষন করবে তারা আমার উম্মাতের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত নয়। (সহীহ বুখারী হাঃ নং ৪৬৯০)।

অন্যদিকে সূফীরা নিজেদের নবীর আমলের আহলে সুফ্ফাহ’র অনুসারী মনে করেন। আহলে সুফ্ফা বলা হতো সেই সাহাবীদের, যারা কিনা বৈষয়িক বিষয়াদি থেকে দূরে থাকত, মসজিদে প্রার্থনায় ব্যস্ত থাকত। আল্লাহ এদের সম্পর্কে নবীর উদ্দেশ্যে বলেন, ‘এবং আপন আত্মাকে তাদেরই সাথে সম্পর্কযুক্ত রাখুন যারা সকাল সন্ধ্যায় আপন প্রতিপালককে আহ্বান করে, তাঁরই সন্তুষ্টি চায় এবং আপনার চক্ষুদ্বয় যেন তাদেরকে ছেড়ে অন্য দিকে না ফেরে; আপনি কি পার্থিব জীবনের শোভা-সৌন্দর্য কামনা করবেন? আর সেই ব্যক্তির কথা মানবেন না, যার অন্তরকে আমি আমার স্মরণে অমনোযোগী করে দিয়েছি এবং সে আপন খেয়াল-খুশির অনুসরণ করেছে আর তার কার্যকলাপ সীমা অতিক্রম করে গেছে।’ (সুরা কাহাফ, ২৮ নং আয়াত)।

তাদের পক্ষে কোরানের আরও আয়াত আছে। ‘আর যখন আমার বান্দা আপনাকে আমার সম্পর্কে প্রশ্ন করে, তখন আপনি বলুন নিশ্চয়ই আমি নিকটবর্তী।’ (সূরাহ আল-বাকারাহ, আয়াত-১৮৬)। তিনি আরো বলেন, ‘আর আমি তার কণ্ঠনালীর চেয়েও অধিক নিকটবর্তী।’ (সূরাহ ক্বাফ, আয়াত-১৫)। ইসলামের প্রথম যুগের ধর্মীয় দলিলাদিতে আসা এসব বক্তব্য প্রমাণ করে যে, গোড়াতেই ইসলামপন্থিদের মধ্যে এহেন বিভেদ জারি ছিল। আর নবী নিজেও মুসলিম হিসেবে এদের অস্তিত্ত্ব স্বীকার করে নিয়েছিলেন। সূফীবাদের বিকাশের সঙ্গে মিশর ও ইরানের নাম ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। ইসলাম যখন এসব এলাকায় প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন স্থানীয় দর্শনগুলো এর সঙ্গে সমঝোতা করে নতুন যে ধারার জন্ম দেয় তাই সূফীবাদ। সূফীরা কট্টর মুসলিমদের আক্রমণের শিকার হওয়ার মূল কারণ ছিল, তারা ইসলামের ব্যবহারিক ও আচরণগত যেসব বিষয় ছিল, যেমন নামাজ পড়া, রোজা রাখা, হজ করা, এগুলোকে পাত্তা দিতেন না।

ভারতে সূফীবাদের ইতিহাসে প্রথম দিকে তিনটি নাম উল্লেখযোগ্য। শাহ সুলতান রুমি তার গুরু সৈয়দ শাহের সঙ্গে বাংলায় এসেছিলেন ১০৫৩ সালে। ময়মনসিংহ জেলার নেত্রকোনার মদনপুরে তার কবর ও দরগাহ রয়েছে। সৈয়দ নথর শাহ’ই সর্বপ্রথম দক্ষিণ ভারতে সূফী মতবাদ পৌঁছে দেন। তাঁর দরগাটি চেন্নাইয়ের (মাদ্রাজ) ত্রিচিনপল্লীতে অবস্থিত। ১০৩৯ সালে এই সাধক ইন্তেকাল করেন। দাতা গনজ বখশ এর মাজারটি লাহোরে। তিনি ১০৭২ সালে ইন্তেকাল করেন। তবে ভারতে সূফীদের আগমন ঘটে দুই পর্বে। প্রথম পর্বে দশম শতাব্দীতে ঘুরী কর্তৃক দিল্লী দখলের পর ১২০০ সাল পর্যন্ত। এরপর ব্যাপক আগমন ঘটে দ্বাদশ শতকে। ড্রাগন বর্ষ নামে পরিচিত ১২২০ সাল থেকে ১২৫০ সালের মধ্যে পুরো মুসলিম সাম্রাজ্য চেঙ্গিজ খান ও তার বাহিনীর আক্রমণের শিকার হয়। পরাক্রমশালী খারেজম সাম্রাজ্যের রাজধানী গুরগঞ্জ, তার প্রধান শহর বোখারা, সমরখন্দ ও বাগদাদসহ বড় শহরগুলো মোঙ্গোলরা ধ্বংস করে দেয়। নদী কেটে গুরগঞ্জে ঢুকিয়ে দেয়া হয় এবং খারেজম সাম্রাজ্য ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। এ সময় মুসলিম সাম্রাজ্যের আমীর-উমরাহরা তাদের সম্পত্তি ছেড়ে না আসতে পারলেও বৈষয়িক জীবনের প্রতি উদাসীন সূফীরা ঠিকই দলবল নিয়ে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে পাড়ি জমান।

রোমিলা থাপার তার ভারতবর্ষের ইতিহাস গ্রন্থে ব্যাখ্যা করেছেন যে, কিভাবে ও কেন সূফীরা ভারতে সমাদৃত হলো। তিনি লিখেছেন। ‘ভারতবর্ষে প্রাক-ইসলাম যুগে গুরু ও সন্ন্যাসীদের ঐতিহ্যের ফলে তাঁদের তুলনীয় মুসলিম পীর ও মাশায়েখদের সমাদৃত হবার রাস্তা তৈরীই হয়েছিল। এরা অপেক্ষাকৃত নির্জনে বাস করতেন। সকলের ধারণা ছিল, এরা প্রভূত আধ্যাত্মিক ক্ষমতার অধিকারী। তাই, প্রয়োজন হলে এরা সাধারণ মানুষকে নেতৃত্ব দিতে পারতেন। তাঁদের ক্ষমতা সম্পর্কে রাষ্ট্রও অবহিত ছিল। সুলতান যে এইসব সন্ন্যাসীদের শ্রদ্ধা দেখাতেন, তার মধ্যে সুলতানের একটা অনুচ্চারিত অনুরোধ থাকত যে, সন্ন্যাসী যেন তাঁর ভক্তদের সুলতানের আনুগত্য দেখানোতে উৎসাহ দেন। কোনো কোনো সন্ন্যাসী নিয়মিত বৃত্তি পেতেন এবং এই অর্থের সাহায্যে তাঁদের ও তাঁদের উত্তরসুরীদের জীবন নিশ্চিতভাবেই কেটে যেত। ভারতীয় ও ইসলাম সংস্কৃতির মিলনের সবচেয়ে সুষ্ঠু প্রকাশ দেখা যায় শহরের কারিগর ও গ্রামের কৃষকদের মধ্যে। এই যুগের ধর্মীয় ও সামাজিক চিন্তায় এই মিলনের প্রমাণ আছে। এযুগের স্থাপত্যের মধ্যেও পারস্পপিরক প্রভাবের পরিচয় আছে। অভিজাত শ্রেণীর তুলনায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মধ্যে দুই ধর্মের পারস্পরিক প্রভাব অনেক বেশি পড়েছিল। বিভিন্ন উৎসব অনুষ্ঠান যেমন, জন্ম, বিবাহ ও মৃত্যুর আচারে দুই ধর্মের সামাজিক প্রথার মিলন লক্ষ্য করা যায়। কোনো হিন্দু ধর্মান্তর গ্রহণ করার পরও তার হিন্দু পূর্বপূরুষের উত্তরাধিকারী হিসেবে ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পারত। পবিত্র ইসলামী অনুষ্ঠানের কোনো কোনোটি হিন্দু অনুষ্ঠানের ওপর তাদের ছাপ ফেললো।’ (পৃ:২২৬)।

অর্থাৎ ভারতে সূফীদের বিকাশের শর্ত আগে থেকেই বিরাজ করছিল, আর তা হয়েছিল ঐতিহ্যগত কারণেই। রোমিলা থাপার আরও উল্লেখ করেছেন যে, ‘মুসলমানরা ভারতবর্ষে সবসময়েই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। এ থেকে প্রমাণ হয় যে, অধিকাংশ হিন্দুই এমন কিছু দুরবস্থার মধ্যে বাস করত না যার জন্যে ধর্মান্তর গ্রহণের প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল। সমাজের নিম্নবর্ণের মানুষের পক্ষেও ইসলামধর্ম গ্রহণের ফলে তেমন কিছু সুযোগ-সুবিধা হয়নি। মুসলিম সমাজের অধিকাংশ মানুষই প্রাক্তন হিন্দু হওয়ার ফলে দেশের মূল জনসমাজের জীবনধারণের পদ্ধতির সঙ্গে মুসলিমদের তেমন কোনো পার্থক্য দেখা যায়নি।’ (পৃ:২১৭)। এই তথ্য প্রমাণ করে যে, মুসলিম শাসকরা নও মুসলিমদের জন্য তেমন কোনো বিশেষ সুযোগ সুবিধা রাখতেন না। যদি অভিজাত বর্ণহিন্দুরা মুসলিম হতো তারা হয়তো কিছু সুযোগ সুবিধা পেত। কিন্তু সাধারণ গরিব কৃষক ও শহরের কারিগরদের মধ্যে ইসলামের বিকাশের শর্ত তৈরী করেছিলেন সূফীরাই। তারা এই মানুষগুলোকে জয় করেছিলেন।

সূফীরা অধিকাংশই ছিলেন শিক্ষিত, তারা কিছুমাত্রায় চিকিৎসাবিদ্যাও আয়ত্ত্ব করতেন। তারা ছিলেন গল্পকথক, সূফী মতবাদ প্রচারের মাধ্যম হিসেবে মরমি গান বা ভক্তি গানের প্রচলন ছিল। এর প্রত্যেকটিই ভারতে তাদের মতবাদ প্রচারের কাজকে সহজতর করে দেয়। ভারতে সবচেয়ে বড় সূফীবাদী নেতা হচ্ছেন খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী। এর পরে আছেন নিজামুদ্দিন আউলিয়া। বঙ্গে প্রসিদ্ধ খাজা খান জাহান, বায়েজিদ বোস্তামি, শাহ জালাল, প্রমূখ। সূফীরা মুসলিম হলেও ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যেও তারা জনপ্রিয় ছিলেন এবং এখনও তাদের সেই জনপ্রিয়তা টিকে আছে। এটা ঘটেছে তাদের উদারতা ও সচ্চরিত্রের কারণে। ইতিহাসেও আমরা দেখি যে, যখনই কোনো রাজা সূফীবাদের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়েছেন, তখনই রক্তপাত ও তরবারির ধার কমেছে। হুমায়ুনের মধ্যে যে উদারতার ছাপ পাওয়া যায়, যে কারণে তার নাম হয়েছে ‘বাদশাহ্ নামদার’, তার কারণ হচ্ছে পারস্য গিয়ে তার সূফীবাদ গ্রহণ করা। আকবরের যুদ্ধবাজ পরিচয় থাকলেও তিনি যে ধর্মীয় মৌলবাদীতে পরিণত হননি, তার পেছনে সূফীবাদের বিরাট প্রভাব রয়েছে।

সূফীবাদ গণপরিসরে ইসলামের বিকাশ ঘটায়, রাষ্ট্রের চরিত্রেও কখনও কখনও প্রভাব বিস্তার করে। কিন্তু চূড়ান্ত অর্থে তা সূফীদের মতোই নির্জনে রয়ে গেছে। বর্তমান বাংলাদেশ বা ভারতবর্ষের এ অঞ্চলের বর্তমান রাষ্ট্রগুলোর দিকে তাকালে আমরা দেখব, রাষ্ট্রযন্ত্র এই উত্তরাধিকার কোনোক্রমেই বহন করছে না। অসহিষ্ণুতা বরং রাষ্ট্রগুলোর সর্বত্র গেঁথে আছে। অর্থাৎ এ অঞ্চলে ইসলামের যে শরিয়তি ধারা ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত ছিল, তাকে মোকাবেলা করতে গিয়ে অন্য ধর্মগুলোর কট্টর ধারাগুলোই রাষ্ট্রক্ষমতার দিকে ধাবিত হয়েছে। কট্টর হিন্দুরা ভারত রাষ্ট্রে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করেছে। বার্মায় দেখতে পাই একইভাবে কট্টর বৌদ্ধদের রাষ্ট্র। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে তো সরাসরি আওরঙ্গজেবের ভূত!

চলবে...

গ্রন্থপঞ্জি
১. ভারতীয় সমাজ বিকাশের বৈশিষ্ট্য। হীরেন স্যান্যাল। দে’জ পাবলিশিং, ১৯৯০।
২. মুঘল ভারতের কৃষি ব্যবস্থা (১৫৫৬-১৭০৭)। ইরফান হাবিব। কেপি বাগচী, ১৯৯৯।
৩. ভারতের পুঁজিতন্ত্রে উত্তরণের পূর্বশর্ত। ভ ই পাভলভ। প্রগতি প্রকাশন, ১৯৮৪।
৪. ভারতবর্ষের ইতিহাস প্রসঙ্গ। ইরফান হাবিব। এনবিএ, ২০০৯।
৫. ভারতের নৃতাত্ত্বিক পরিচয়। অতুল সুর। সাহিত্যলোক, ২০১৪।
৬. Elphinstone, The history of India, London, 1843.
৭.ভারতবর্ষের ইতিহাস। কোকা আন্তোনভা, গ্রিগোরি কতোভ্স্কি, গ্রিগোরি বোন্গার্দ-লেভিন। প্রগতি প্রকাশন। মস্কো, ১৯৮৮।
৮. ভারতে মুসলিম শাসন ব্যবস্থার ইতিহাস। এ কে এম আবদুল আলীম।মওলা ব্রাদার্স; ২০১৪।
৯. বাংলার ইতিহাস (১২০৪-১৭৬৫)। ড. সৈয়দ মাহমুদুল হাসান। অনন্যা প্রকাশনী; ২০০৯।
১০. ভারতবর্ষের ইতিহাস। রোমিলা থাপার। ওরিয়েন্ট ব্ল্যাকসোয়ান, কলকাতা, ২০১৩।
১১. কার্ল মার্কস। ভারতীয় ইতিহাসের কালপঞ্জী (৬৬৪-১৮৫৮)। প্রগতি প্রকাশন, মস্কো। ১৯৭১।
১২. JN Sarkar (ed), History of Bengal, II, Dhaka, 1948.
১৩. সুখময় মুখোপাধ্যায়, বাংলার ইতিহাসের দুশো বছর: স্বাধীন সুলতানদের আমল, কলকাতা, ১৯৬২
১৪. আব্দুল করিম, বাংলার ইতিহাস: সুলতানী আমল, ঢাকা, ১৯৮৭।

Comments

মধ্যরাতের ট্রেন এর ছবি
 

পূর্বের দুইটা পর্ব পড়েছিলাম। ইতিহাসকে খুব সহজভাবে উপস্থাপন সহজ বিষয় না। খুব আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করি এই সিরিজটার জন্য। অনেক দেরিতে পাচ্ছি। অনুরোধ রইল পরবর্তী পর্বগুলো দ্রুত দেওয়ার জন্য।

 
অতিথি এর ছবি
 

এলেক্স রাদারফোর্ড এর বইয়ের নাম রেফারেন্সে নেই যে !!! না পড়ে থাকলে পড়বেন যেন...কারন আপনি হয়ত অনেক কিছুই জানেননা কিংবা ভুল লিখেছেন

 
নুর নবী দুলাল এর ছবি
 

ভুল কি লিখছি স্পষ্ট করে জানালে ব্যাখ্যা দিতে পারতাম।

 
সাইফুল ইসলাম মজুমদার এর ছবি
 

পরের কিস্তির অপেক্ষায় রইলাম।

সত্যকে সত্য আর মিথ্যাকে মিথ্যা বলার ক্ষমতা রাখি বলেই দাবী করি আমি মানুষ।
আমার সব পোষ্ট আমার ব্যক্তিগত ব্লগে সংরক্ষীত

 
নুর নবী দুলাল এর ছবি
 

হ্যাঁ ভাই, দ্রুত দেওয়ার চেষ্টা করব।

 
অতিথি এর ছবি
 

প্রথমত উপরোক্ত লেখায় রেফারেন্সের ছড়াছড়ি যা আপনার লেখনির স্বকীয়তা বিনষ্ট করেছে...
দ্বিতীয়ত আপনি বেশীরভাগ হিন্দু লেখকদের রেফারেন্স নিয়েছেন,যেগুলো আসলে একান্তই তাদের ব্যাক্তিগত দর্শনের মত...আর মুঘলদের সাথে ধর্মীয় মৌলবাদ ব্যাপারটা পুরোপুরি যাচ্ছেনা...

 
দিপ্ত শিখা এর ছবি
 

স্যার সময়ের সল্পোতার কারণে শেষ পর্যন্ত পড়তে পারলাম না।যেটুকু পড়েছি তাতে খুব ভাল লেগেছে।

 
মহাকাশ যাত্রী এর ছবি
 

আপনার প্রশংশা করার যোগ্যতা আমার এখনো হয় নি।লেখক হিসেবে আপনি দারুন।
শুভেচ্ছা রইলো নূর নবী ভাই।

jim

 

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

নুর নবী দুলাল
নুর নবী দুলাল এর ছবি
Offline
Last seen: 2 ঘন্টা 41 min ago
Joined: শনিবার, জানুয়ারী 19, 2013 - 3:35অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

কু ঝিক ঝিক

ফেসবুকে ইস্টিশন

SSL Certificate
কপিরাইট © ইস্টিশন.কম ® ২০১৬ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর